দো দিলে জাহান পর্ব-০৬

0
99

#দো_দিলে_জাহান
#পর্বঃ৬
#বর্ষা
১৯.
বেপরোয়া গতিতে আরেকটু হলেই মাঝবয়সী এই লোককে ঠুকে দিতো কেউ।ভাগ্যিস ঠিক সময়ে পৌঁছে মেহের তাকে বাঁচিয়ে নিয়েছে।তবে ওই লোককে বাঁচাতে গিয়ে নিজে মুখ থুবড়ে পড়েছে ফুটপাতে। ঠোঁট অনেকখানি কেটে গেছে।আর হাতেও বেশ ব্যথা পেয়েছে। জারিন তাকে তুলে ইচ্ছে মতো ঝেড়ে দিচ্ছে।আজ যদি ওর কিছু হয়ে যেতো!

-“আরে জান চিন্তা করছ কেন?আমি তো ঠিক আছি।আর ওই আংকেল কই গেলো?”(মেহের)

-“হুম তুই তো ঠিক থাকবিই!হাত কেটে তুই বিন্দাস সেই হাতে পুরো ঢাকা ঘুরতে পারিস।সেখানে এটা তো সামান্য।”(জারিন)

মেহের আর জারিন আশেপাশে তাকায়।দেখে সবাই তাদেরকেই দেখছে। অবশ্য ওই বৃদ্ধলোকটা নেই।হয়তো চলে গিয়েছে।দেখেই মনে হচ্ছিলো বেশ তাড়ায় আছে সে।আজ ঘুরতে বেড়িয়েছিলো দুই বান্ধবী। ভার্সিটি বন্ধ আর এর ফায়দা লুটবে না তা কি হয়!জারিনকে ওর আরামের ঘুম হারাম করে আসতে হয়েছে।

পাশের একটা ফার্মেসি থেকেই ফার্স্ট এইড করিয়ে নেয় ওরা। তখনই জারিন শোর তুলে কাউকে ডাকতে থাকে।ডাক এরকম যে ‘এই,এই শুনছো’।মেহের কপাল চাপড়ায়।তাথ বান্ধবী কি করে একটা নমুনা হলো।এতো মানুষের মাঝে যদি নাম ধরে না ডাকে তাহলে সেই ব্যক্তি শুনবে কি করে!

-“গাধা যারে ডাকতাছোস তার নাম ধরে ডাক।এটা খোলা মাঠ না যে ওই ব্যক্তি বুঝবে তুই তাকেই ডাকতাছোস”

জিহ্বা কামড় বসায় জারিন।এক চোখ ছোট করে কিউটভাবে দুইপাশে মাথা নাড়ায়।ডেকে ওঠে,”সারিম,সারিম”।সারিম নাম শুনে সচেতন দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকায় মেহের।তবে চেনা কাউকে দেখতে পায় না।নিরাশ হয় সে।জারিনের এই হবু জামাইরে দেখা মনে হয় তার কপালে নাই।আর এই শয়তানিটাও ঘুরতে যাবে,একসাথে খাবে তাও একটা ছবি তোলার কথা এর মনে থাকে না। বিরক্তিকর!

-“দোস্ত চলে গেছে মনে হয়!”(জারিন)
-“আরো ডাক এই শুনছো এই শুনছো এমন করে। জীবনে অনেক নমুনা দেখছি তোর মতো দেখি নাই।সর আমি বাসায় যাবো”(মেহের)
-“দোস্ত সরি আর এমন হবে না।”(জারিন)
-“তুই আমার জন্য একটা ছবি তো তুলতে পারছ তাই নয়কি!তা না করে এখন অব্দি শুধু নাম আর কাম বলেই বসিয়ে রাখছিস”(মেহের)
-“হুম আমার বেলায় দোষ।তুই যদি ফুচকা স্টলে আরেকটু থাকতি তাহলেই তো দেখা হইতো। তুইও তো কার সাথে চলে গেলি।কে ছিলো রে?আমি তো এই বিষয়ে ভুলেই গেছিলাম “(জারিন)

মেহের অবাক হয়না।এই মেয়েটা এমনই।সবসময় একটা একটা করে প্রশ্ন করে না। একেবারেই সব প্রশ্ন করে।যখন যেই কথা মনে পড়বে সাথে সাথে ম্যাসেজে জানিয়ে দিবে।এইতো আজকে সকালেই জানিয়েছে ওকে নাকি সারিম গোল্ডের রিং দিয়েছে।আর এইটা ওর মনেই ছিলো না বলতে!

-“তুই বাড়ি যা।যার কারণে আমি হবু দুলাভাইকে দেখতে পারি নাই ওই শয়তানটাকে ধুয়ে আসি।যা”

জারিনকে বাড়ি যেতে বলে নিজেই অন্যদিকে হাঁটা দেয়।অবাক হয়ে জারিন দাঁড়িয়ে রয়।এই মেয়েটাকে প্রশ্ন করলে তার উত্তর পাওয়া যায় না বললেই চলে।প্রশ্ন আজ করলে দশ বারোদিন পর একাই এই উত্তর জারিনের সামনে চলে আসে।আর তা মেহের আনে।এই মেয়ের মন কখন কি বলে কে জানে!

ফোন বেজে ওঠায় রিসিভ করতেই ওপাশের শীতল কন্ঠস্বর জারিনের হৃদয়ে বারি খায়।নাম্বারটা আরেকবার দেখে নেয় সে।মনে মনে কয়েকটা কথা সাজিয়ে নেয়।আজ এই লোকটার জন্য ও বকা খেলো।
-“রাস্তায় দাঁড়িয়ে না থেকে বাড়ি যাও।মেহের তো চলেই গেছে”

সারিমের কন্ঠস্বরে এলোমেলো হয়ে যায় জারিনের সব সাজানো কথা।তবে কপট রাগ দেখিয়ে বলে ওঠে,
-“তা যখন দেখেছেন আমাদের আসলে কি সমস্যা হতো শুনি?আর আপনি কিভাবে জানলেন ও মেহের ছিলো!”

ওপাশটায় যেন আবারো নিরবতা ছুঁয়ে গেলো।ওয়েটারের কন্ঠস্বর ভেসে আসায় জারিন বুঝলো আশেপাশের কোনো রেস্টুরেন্টে বসেই ওকে দেখছে এই বদলোক।এইদিক সেদিক তাকাতে লাগলো সে।তখনই সারিম বললো,
-“এদিক সেদিক তাকাতে হবে না।ব্লু বেরি রেস্টুরেন্টের দোতলায় চলে আসো”
-“এই রেস্টুরেন্ট নতুন খুলেছে।আসবো আসবো বলে আসা হয়নি।আপনি বসেন আমি আসছি”(জারিন)

২০.
ফোনের পর ফোন আসায় বিরক্ততে এবার উঠে বসে তীব্র।রাত দুইটার দিকে ঘুমিয়েছিলো।আর এখন দশটা পঞ্চাশের মতো বাজে।আকাশ একেবারেই মেঘলা।তাই সময়ের আন্দাজ করা খুবই টাফ। বারান্দা দিয়ে একবার বাইরে লক্ষ্য করে ফোন রিসিভ করে সে। তবে ওপাশের রাগান্বিত কন্ঠ শুনে মুখে তার হাসি ফুটে ওঠে।

-“তীব্রর বাচ্চা তোমার জন্য আমি এখনো জারিনের জামাইকে দেখতে পারলাম না।তুমি কোথায় আছো জলদি বলো আজ তোমার খবর আছে।”

মেহেরের কথা শুনে তীব্র ঠোঁট টিপে হাসে।বলে ওঠে,
-“মেহের তোকে এখনো বিয়েই করতে পারলাম না,আমার বাচ্চা আসবে কোথা থেকে!আর জারিন কে?”

মেহের লজ্জা পায়।এই ছেলের কথা ইদানিং তার লজ্জা পাওয়া একটু বেশিই হচ্ছে।ফোনে ঝগড়া করেই এতো লজ্জা পাচ্ছে আর সামনে থাকলে কিই না হতো কে জানে!তীব্র বলে ওঠে,
-“আমি তোকে ঠিকানা টেক্সট করছি।চলে আয়।আর আসার সময় কিছু খাবার কিনে আনিস।আমি রান্না করিনি এখনো”

তীব্রর কথায় বেচারি এবার আরো লজ্জা পায়।তবে এবার লজ্জা পায় এই কারণে যে ছেলেটা এখানে পরিবার ছাড়া থাকছে।ঠিকভাবে খাচ্ছে কিনা এর খবরও রাখেনি ওরা।আর বাইরের খাবার এতো খেলে অসুস্থ হতে দিন দুয়েকও লাগবে না।যা শরীর বানিয়েছে তা বিগড়ে যেতে বেশিদিন একদমই লাগবে না।

ঠিকানা দেখে রিক্সায় উঠে বসে সে।চাল-ডালে রান্নার প্রয়োজনীয় জিনিস ওর্ডার করে নেয়।আর হালকা পাতলা খাবারও ওর্ডার দেয়।রান্না বসালেই তো আর রান্না হয়ে যায়না।সময়ও লাগে।মেহের পৌঁছানোর মিনিট দশেক পরই চাল-ডালের ভাইয়া এসে পৌঁছায়।এতো দ্রুত আশা করেনি মেহের।যদিও সে বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকতো যতক্ষণ না চাল-ডালের ভাইয়া জিনিসপত্র না দিয়ে যেতো। লিফটের পাঁচে চেপে তীব্রর ফ্লাটে পৌঁছায় সে।

-“কিরে হাতে এতো কিছু কি?”(তীব্র)
-“রান্নার জিনিসপত্র”(মেহের)
-“তোকে আমি খাবার আনতে বলেছিলাম।আর তুই জিনিসপত্র তুলে এনেছিস!”(তীব্র)
-“তো কি করবো!বাইরের খাবার খেতে থাকলে তোমার এই সুন্দর বডিটা নষ্ট হয়ে যাবে।”(মেহের)
-“তা রান্না কে করবে?আমি বড্ড ক্লান্ত।তোর ফোনে উঠেছি।আমি রান্না করছি না।যা আমার জন্য এখন খাবার কিনে আন”(তীব্র)
-“অবশ্যই আমিই রান্না করবো।তবে তুমি রান্না করতে জানো তীব্র?”(মেহের)
-“রান্না তো সবাই পারে।রান্না শিখলে কারো ওপর ডিপেন্ডেন্ট হতে হয়না।যেকোনো জায়গায় সার্ভাইব করা যায়।তবে তুই রান্না করতে পারিস তো আদৌ?”(তীব্র)
-“তুমি গিয়ে বসো তো।আমার রান্না খেয়ে আঙুল চাটবে “(মেহের)

তীব্রকে ধাক্কিয়ে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে কিচেন খুঁজে বের করে মেহের।ঢুকে পড়ে কিচেনে।তীব্রর ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় খাবার ছিলো চিকেন চাপ আর ফ্রাইড রাইস।বেশ মজা করেই খেতো।মেহের ঠিক করে নেয় এখন সে তাই বানাবে।যদিও সকাল সকাল এসব খাওয়া ঠিক না।তবে এখন আর সকাল আছে কি!অলরেডি এগারোটা চল্লিশ বাজে। রান্না শেষ হতে হতে বারোটার বেশি হয়েই যাবে।

মেহের কি রান্না করছে উঁকি দিয়ে দুই একবার দেখে গিয়েছে তীব্র।মেহেরের আনা ব্রেডই খাচ্ছে।খিদে পেয়েছিলো তো বেচারার। জরুরী ফোন আসায় ড্রয়িংরুমে ফিরে আসে সে।কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শুনতে পায় কেউ বলছে,
-“বাহ,বাহ বাংলাদেশে আত্মগোপন করেছো!তোমার মতো কাপুরুষের হাতে নাকি গ্র্যান্ডফাদার ক্যানিয়ন তার বিশাল এই রাজত্ব তুলে দিবে ভাবা যায়”

তীব্র নিজের রাগ সংবরণ করে হাসতে হাসতে বলে ওঠে,
-“এস.আর আত্মগোপন করে না। বরং আত্মগোপন করতে বাধ্য করে।তবে পাখি যদি নিজ থেকেই এতো সহজে ধরা দেয় তাহলে কি চলবে!”

তীব্র কথায় ওইপাশ থেকে যে কল কেটে দেয় তা দেখে সে হাসে।কাউকে ম্যাসেজ দিয়ে মোবাইল থেকে নাম্বারটা ডিলিট করে দেয়।নাম্বার চেঞ্জ সে করবে না।নাম্বার চেঞ্জ করলে ঝামেলা আছে।শতশত প্রশ্ন করবে তার পুতুল বউ।

২১.
মাহিন আজ ডেটে যাবে। সুন্দর করে সাজগোজ করেছে। সাজগোজ যদিও মেয়েদের স্বভাব তবে নিজেকে সুন্দর করে পরিপাটি রাখা সবার কাজ।আর এদিকে মাহিন সবচেয়ে সেরা। একদম পরিপাটি পারফেক্ট মানুষ বলা যায়।যদিও কোনো মানুষ পারফেক্ট না।এই যে এতো পারফেক্টনেসের মাঝেও মাহিন তার রক্তের পরিবার থেকে বড্ড দূরে।তারা তো তার খোঁজও নিলো না।বাবা-মা মরলে যে বাবার পরিবার ধীরে ধীরে পর হয়ে যায় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো।তার আম্মু না থাকলে তার কি হতো!হয়তো রাস্তায় রাস্তায় বড় হতো।

চায়ের টাপড়িতে বসে চা খাচ্ছে সে।এই জায়গাটাতেই সে ডেটে এসেছে।আজ অব্দি যতবার ডেট করেছে এখানে এসেছে।তার ভাষ্যমতে যেই মেয়েকে আমাকে ভালোবাসবে সে আমার গরীব কিংবা ধনী হওয়া দেখবে না।আর গরীব কিংবা ধনী হওয়া নিয়ে যদি এতোই সমস্যা থাকে তাহলে তাকে আমার চাইনা।

-“এক্সকিউজ মি আপনি কি মাহিন তালুকদার?”

মাহিন মেয়েলী কন্ঠের দিকে তাকায়।মেয়েটা সুন্দর।প্রথম দেখাতেই এই চিন্তায় এসেছে ওর মাথায়।দোকানটা পুরোপুরি ফাঁকা।ওই দোকানওয়ালা আঙ্কেলকে বলে ঘন্টাখানেকের জন্য কাউকে চা দিতে না করেছে।বলেছে সে এর জন্য তিন হাজার টাকাও দিয়ে দিবে।এই টাকায় কিন্তু বেশ ভালো রেস্টুরেন্টে অনায়াসে যাওয়া যেতো।তবে পরীক্ষামূলক কাজটা হতো না।

-“জি বসুন।”(মাহিন)
-“আপনার পছন্দের জায়গাটা কিন্তু সুন্দর।তবে অনেক নিরিবিলি।কোনো রিক্সাচালক সহজে আসতে চায়না।”(মেয়েটা)
-“জি মিস মারিয়াম।তবে এই জায়গাটা নিরিবিলি না।এখান থেকে একটু আগেই ভিজিটর প্লেস আছে।ওখানে মোটামুটি ভীড় থাকে সবসময়।”(মাহিন)
-“ওহ”(মারিয়াম)
-“আপনার কি অস্বস্তি হচ্ছে?”(মাহিন)
-“না,না তেমন কিছু না।আসলে পাশেই তো জঙ্গল এরিয়া তাই একটু ভয় লাগছে এই আরকি”(মারিয়াম)

ইমপ্রেস হয় মাহিন।মেয়েটা নিজের ভয়ের কথা কি নির্দ্বিধায় না বলে দিলো! সাধারণত কোনো মেয়ে এমন ভাবে নিজের ভয়ের কথা অন্য কারো সামনে বলতে চায় না। কেননা হিতে যদি সে তাকে আরো ভয় দেখায়!এর অর্থ সে কি বুঝবে।মেয়েটা তার সাথে এটাচ হতে চাইছে বিধায় নিজের ভয়ের কথা বলে দিলো।নাকি একটু বেশিই ফ্রি তাই…!

চলবে কি?