দো দিলে জাহান পর্ব-০৮

0
90

#দো_দিলে_জাহান
#পর্বঃ৮
#বর্ষা
২২.
একেবারে ঈদের পর ভার্সিটি যাবে বলে ঠিক করেছে মেহের।এখন তার আরো কাজ আছে।সেই কাজগুলো সম্পন্ন করতে হবে যে। ম্যানেজমেন্টে পড়াশোনা করছে সে। নিজের ব্যবসা দেওয়ার যদিওবা ইচ্ছে আছে তবে তার এই সুপ্ত বাসনা যে কবে সত্যি হয়ে সামনে আসে তারই অপেক্ষা!

-“আব্বু টাকা দেও ঈদের শপিং করবো”

মেহেরের কথায় মহাসিন তালুকদার পকেট থেকে টাকা বের করতে নিবেন তার আগেই মোবারক তালুকদার বলে ওঠে,
-“হেরে মেহের তোর বোধবুদ্ধি বলতে কিচ্ছুটি নেই নাকি?তোর মা,চাচী, ফুপু,ভাবী,বোন ওরা কি কেউ শপিং করেছে?তাহলে তোর করতে হবে কেন?”

-“দাদা তোমার বউও তো মরে গেছে।তুমি জীবিত আছো কেন?”এই কথাটা মুখে বলতে চাইলেও মেহের চেপে যায়।মহাসিন তালুকদার তাকে টাকা দিয়েছে এই হলো।বৃদ্ধ মানুষ আউল ফাউল বকছে বকুক গিয়ে।তাতে কান দিলে চলবে না তার।গান গাইতে গাইতে সেখান থেকে কেটে পড়ে মেহের। মোবারক তালুকদার বলে ওঠেন,
-“তোর কারণেই তোর মেয়ে বিগড়েছে মহাসিন।একটু শাসন কর। নয়তো দেখবি একদিন এক ছেলের হাত ধরে তোর মান-সম্মান ডুবিয়ে পালাবে”

-“যার ভয়ে গুন্ডারা পলায় সে পালানোর মতো মেয়ে না আব্বা।”মুচকি হেসে মনে মনে বলেন মহাসিন তালুকদার।মেয়ের শিক্ষা-দীক্ষা চালচলন নিয়ে তার চিন্তা নেই। মানুষের মতো মানুষ গড়েছে।তবে ভয় একটাই কারো প্ররোচনায় পড়ে সে যেন তার মেয়েকে শেষ না করে দেয়। মেয়েটা যে ওনার কথায় দ্বিমত করে না।ইশ্,ওবার যদি মাহিনের কথাটা শুনে মেয়ের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করতো তাহলে হয়তো তার মেয়ের চরিত্রে কেউ দাগ লাগাতে পারতো না।তবে তার আফসোস হয় তূর্যয়ের জন্যে।হিরা হারিয়েছে তূর্যয়।

-“ভাবী মা চলো না শপিং এ যাই।”

রান্নাঘরে গিয়ে আর্জি করেছে মেহের।তৃষ্ণা কিছু বলার আগেই নূরিয়া বলে উঠেছে,
-“দেখছো তো রান্না করছি।এখন এসব আবদার করো না যাও তো।”
-“তোমার কাছে কে কি বলেছে?আমি আমার ভাবীকে বলেছি।চলো তো ভাবী”

মেহের টেনে নিয়ে আসে তৃষ্ণাকে।পাশেই টিস্যুর বক্স থেকে দুইটা টিস্যু নিয়ে মাথার ঘাম মুছে দেয়।বলে ওঠে,
-“ভাবী তুমি এই গরমে রান্না ঘরে কেন?আর রান্না তো সকালেই শেষ।তাহলে ওই নটাংকির সাথে তুমি এখানে কেন?”
-“ছুটকি তুমি তো জানো তোমার ভাইয়া সকাল বেলা রাগ দেখিয়ে চলে গেছে।ঠিক মতো খায়নি।আর বাইরে তো খাবে না।তাই আরকি..”(তৃষ্ণা)
-“ওহো তাই আমার ভাবী আমার ছোটদা ভাইয়ের জন্য রান্না করছে স্পেশাল কিছু।ওকে ওকে”(মেহের)
-“হুম।তবে চাইলে কিন্তু আমার ছুটকিও খেতে পারে”(তৃষ্ণা)
-“অবশ্যই ভাবী মা…..।তবে তুমি এখন যাও তো।আমি তোমার রান্না দেখছি।তুমি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেও।বেলা গড়িয়ে যাবে নয়তো”(মেহের)
-“আরে না তুমি ছোট মানুষ।হাত পুড়িয়ে ফেললে…”(তৃষ্ণা)
-“আরে আমায় এখন বিয়ে দিলে দুইদিন পর মামী ডাক শুনবা।যাও তো আমি রান্না পারি তাই চিন্তা করতে হবে না”(মেহের)

তৃষ্ণা মুচকি হেসে উপরে চলে গেছে।মেহের রান্না ঘরে গিয়ে দেখে নূরিয়া তার সুপ নিয়ে যাচ্ছে।একটু আগেই বাড়ি ফিরেছে।হয়তো অডিশন দিতে গিয়েছিলো।যাকগে ওর কথা।মেহের গিয়ে চুলার পাশে দাঁড়িয়ে গুনগুনিয়ে গান গাইতে থাকে।

-‘এই মেহের এখানে কি?”

মায়ের ডাকে সেদিকে তাকায় সে।মুচকি হেসে বলে ওঠে,-“ভাবী ছোটদা ভাইয়ের ফেবারিট ভেজিটেবল রান্না করছে।ফ্রেশ হয়নি এখনো।তাই আমি দেখবো বলে ভাবীকে পাঠালাম”

-“মেয়ে জন্ম দিলাম আমি,বড় করলাম।আর এই মেয়ে একদিনও আমার কষ্ট দেখলো না।তবে ভাবীর কষ্ট ঠিকই চোখে পড়লো।আমায় তো আর ভালোবাসো না দেখবে কিভাবে!”(রাবেয়া বেগম)
-“আহা আম্মু তুমিও না।আমি তো তোমাকে একটু নয় অনেকখানি ভালোবাসি।তবে তোমার কাজ করে দিলে তো তুমি আমায় বকবা না।আর তোমার বকা না খেলে যে আমার শান্তি লাগে না।”(মেহের)
-“শোনো ফাজিল মেয়ের কথা!যাও এই গরমে এখানে থাকতে হবেনা।আমি দেখছি”(রাবেয়া বেগম)
-“না,না তুমি যাও।শুনেছি তো গেস্ট আসবে। গিয়ে রেডি হও।তা আম্মু কারা আসবে?”(মেহের)
-“আসবে না এসেছে তোয়াকে দেখতে।”(রাবেয়া বেগম)
-“তোয়াকে না ছোট চাচু বিয়ে দিবে না।তাহলে এখন..?”(মেহের)
-“তোয়ার পছন্দের ছেলে। পছন্দ করেই যা হওয়ার হচ্ছে।এই দেখাদেখি তো বাকিদের সাথে পরিচয়ের জন্য”(রাবেয়া বেগম)

মেহের আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। রাবেয়া বেগমকে চুলো বন্ধ করতে দেখে উপরের দিকে যেতে নেয়। পথিমধ্যে তূর্যয়ের সাথে দেখা হয়।তবে এড়িয়ে যায় মেহের।হাতের মুঠোফোনটাও সশব্দে বাজতে শুরু করেছে।তোয়ার রুমে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সেখানে না গিয়ে নিজের রুমে চলে আসে সে।ফোন রিসিভ করে কথা বলতে শুরু করে।অপর পাশের কথা শোনা যায় না।
-“গুড নুন স্যার”
-“না,না স্যার আমি দেখছি।জি স্যার সময় বলবে সব”
-“স্যার বিশ্বাস আছে তো।আমি নিজের বাপকেও ছাড়বো না যদি সে ক্রিমিনাল হয়। তবে স্যার আমি সত্যের সাথি হবো”
-“স্যার ভুল বুঝলে বুঝতে পারেন।তবে আমি আইনী ব্যবস্থার মুখাপেক্ষী থাকতে চাইনা। আমাদের দেশের আইনী ব্যবস্থায় এতোই দূর্বল যে কতশত ক্রিমিনাল এখন খোলা আকাশের নিচে বসে বসে নতুন ক্রাইম করার গুটি সাজাচ্ছে”
-“গুড বাই স্যার”

কয়েক মিনিটের কথোপকথনে মেহেরের মুখে লাল আভা ফুটে উঠেছে।চরমভাবে রেগে গেছে সে।দেয়ালে সজোরে আঘাত করে নিজেই নিজেকে বলছে,
-“এই থার্ডক্লাস নিয়ম কানুনের বেড়াজালে কত নির্দোষ বিনা দোষে শাস্তি পাচ্ছে!আর প্রকৃত দোষীরা গায়ে খোলা বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।আই নিড টু ফাইন্ড আউট টাইকুনস লিডার”

২৩.
কফিশপে বসে কারো অপেক্ষা করছে তীব্র। অপেক্ষা একটু বেশিই হয়ে গেছে হয়তো তাই সে প্রচন্ড বিরক্ত।তখনই গেট গিয়ে প্রবেশ করতে দেখা যায় সারিমকে।সঙ্গে আছে জারিনও। তীব্রকে দেখে এগিয়ে আসে এদিকেই ওরা।

-“ভাই”

সারিমকে ইশারা করে বসতে বলে সে।সম্পর্কে দু’জনে চাচাতো ভাই হলেও একে অপরের সিনিয়র জুনিয়র হিসেবেই এখন অবস্থান।দেশেই বসবাস থাকলেও বছর দুয়েক আগে বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে আংকেলের সাথে সারিমের পরিচয়।তারপর থেকে সারিমও যোগ দিলো ওদের সাথে।দেশে এসে ওদের হয়েই কাজ করতে লাগলো।

-“ভাই ও হচ্ছে জারিন।মেহের ভা.. মেহেরের ফ্রেন্ড”(সারিম)
-“আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।কেমন আছেন?”(জারিন)
-“আলহামদুলিল্লাহ।তা তুমি কেমন আছো ছোট আপু?”(তীব্র)

কিছুক্ষণ গল্প করে খাবার আসায় খেয়ে নেয় ওরা।জারিন বিদায় জানিয়ে চলে যায়।আর সারিম ওকে পৌঁছাতে না গিয়ে তীব্রের সামনে বসে থাকে। তীব্র এবার ওকে বলেই ওঠে,
-“ভাই তুই তোর গার্লফ্রেন্ডকে পৌঁছাতে যা।একটু কেয়ার দেখা।মেয়ে মানুষ কেয়ারের পাগল হয়।আর মেহেরের সামনে কিন্তু যাস না চিনে ফেলবে তোকে।পরে কিন্তু মাইর খেলে আমার কিছু করার নাই।”

সারিম মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে চলে যায়। ভাইয়ের সামনে গেলে ভেজা বিড়াল সাজে।আর ভাইয়ের আড়ালে অন্যদেরকে তার সামনে ভেজা বিড়াল সাজতে বাধ্য করে।সারিম বেড়িয়ে দেখে জারিন দাঁড়িয়ে আছে।মনে মনে ভাবে আমি যদি না আসতাম এই মেয়ে কি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকতো!

২৪.
মাহিন-মোয়াজ একসাথে বসে আছে। দুই ভাইয়ের অনেকদিন পর একসাথে হওয়া।মোয়াজ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। এভাবে একসাথে বসা তাদের হয়না অনেকদিন।মাহিন বলে ওঠে,
-“জানিস মোয়াজ আজ আমি তোকে একজনের সাথে দেখা করাবো।”
-“কার সাথে বড়দা ভাই?”(মোয়াজ)
-“আছে কেউ একজন।তবে চল হাঁটা পথে পা বাড়াই।তখনই না দেখা করাতে পারবো”(মাহিন)
-“তোমার কি কিছু হয়েছে?”(মোয়াজ)
-“কেন রে?”(মাহিন)
-“কেমন যেন বিধ্বস্ত লাগছে”(মোয়াজ)

হঠাৎ করেই মাহিন থেমে যায়।মোয়াজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।তার চাপা স্বভাবের ভাইয়ের মনোভাব সে বুঝতে পারেনা।তবে এতোটুকু বুঝে যায় যে তার ভাইয়ের মন ভালো নেই।তার ভাইটা ভালো নেই।

-“মোয়াজ কোনো মেয়ে কেন তার পুরুষের মুখে অন্য মেয়ের নাম সহ্য করতে পারেনা?”(মাহিন)
-“মেয়েরা এমনই হয়।সব দিয়ে দিতে পারলেও নিজের পুরুষের মন-মস্তিষ্কে শুধুই তার আনাগোনা থাকবে এমনটাই চায়।”(মোয়াজ)
-“স্নেহার কথা মনে আছে?”(মাহিন)

আবারো এতোবছর পর ওই শয়তান মেয়েটার নাম ভাইয়ের মুখে শুনে কিছুটা অবাক হয় মোয়াজ।এই মেয়েটার কারণেই তো ওর প্রাণচঞ্চল ভাইটা এমন চুপসে গেলো।আর মেহের এতো চেষ্টা করেও পারলো না ভাইকে আগের মতো করে। ধোঁকা দিয়েছিলো ওই কালনাগিনীটা ওর ভাইকে।ওর ভাইয়ের সাথে একবছর সম্পর্ক চালিয়ে আরেকজন এর সাথে ছাপড়িগিরি কাজকর্ম করা অবস্থায় ধরা পড়েছিলো।

-“ভাই এতদিন পর?”(মোয়াজ)
-“আজ সকালে ও মারা গেছে।বুঝেছিস তো আজ উপলব্ধি করলাম এখনো অব্দি আমি ওর মায়ায় আটকে ছিলাম তাইতো কারো সাথে সম্পর্কে জড়ানোর আগে ওর কথা বলতাম।আর সবাই এড়িয়ে যেতো আমায়”(মাহিন)
-“ভাই আমার কিভাবে মরলো স্নেহা?”(মোয়াজ)
-“এইচআইভিতে আক্রান্ত ছিলো।আজ সকালে হসপিটালে মারা গিয়েছে।ওর বন্ধু সোনিয়া ফোন দিয়েছিলো”(মাহিন)
-“ভাই তুমি কি নতুন করে সম্পর্কে জড়িয়েছো?”(মোয়াজ)

মাহিন অবাক হয়।মাথা ঝাঁকিয়ে সায়ও দেয়।তবে পরক্ষণেই কিছু ভেবে থেমে যায়।মোয়াজকেও থামিয়ে দেয়।বলে ওঠে,
-“মৃতদের সাথে দেখা করার মানে হয়না।আমি ওকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তুই বরং তোর ভবিষ্যৎ ভাবীর সাথে দেখা করতে চল। মেয়েটা বুদ্ধিমান আছে।আম্মুকে বলবো ওর বাসায় প্রস্তাব পাঠাতে।”

চলবে কি?