দো দিলে জাহান পর্ব-১১+১২

0
87

#দো_দিলে_জাহান
#পর্বঃ১১
#বর্ষা
৩৪.
রাত আটটার দিকে শপিং শেষে বাড়ি ফিরেছে মাহিনরা।সবাই বড্ড ক্লান্ত। শপিং শেষে ঘোরাঘুরি, খাওয়া দাওয়া তারপর না বাড়ি ফেরা।মাহিন-মোয়াজ আলাদা আলাদা ভাবে বোনের জন্য কিনেছে।বিশ্রাম নিয়েই বোনের ঘরে যাবে সেই সিদ্ধান্তে দুইজন নিজেদের ঘরে গিয়েছে।
রাত দশটার দিকে খাবার টেবিলে সবাই একত্রিত হয়েছে।মাহিন এদিক সেদিক তাকাচ্ছে।মোয়াজ এখনো আসেনি।আর জায়িন সে তো আবার বেড়িয়েছিলো এখনো ফেরেনি।মাহিন আস্তে করে রাবেয়া বেগমকে জিজ্ঞেস করে,
-“আম্মু মেহের কোথায়?”
-“রুমেই তো সেই সকাল থেকে আছে।দুপুরেও তো খেতে এলো না।”(রাবেয়া বেগম)
-“কি বলছো তুমি আম্মু?ওতো অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে কিংবা ওর সাথে কিছু তো হতে পারে”(মাহিন)
-“মাহিন আগে খাবার খেয়ে নে।মেহেরের কিচ্ছু হয়নি তোর আব্বু ওর সাথে কথা বলেছে”(রাবেয়া বেগম)
-“কিন্তু আম্মু…”(মাহিন)
-“কোনো কিন্তু না। খেতে বস”(রাবেয়া বেগম)

মাহিন বসে রয়।মহাসিন তালুকদার ছেলের সাথে তার হসপিটাল নিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ আলোচনা করেন। ছেলের ওপর তার ভরসা আছে যে এই ছেলেই একদিন ওর বায়োলজিক্যাল বাবা-মায়ের হসপিটাল দেশসেরা পর্যায়ে পৌঁছে দেবে। দায়িত্ববোধ বড্ড বেশি এই ছেলের। পূর্ববর্তী বছর ছেলেটার মাঝে বিস্তার ফারাক আসলেও নিজের কর্তব্য থেকে সরে আসেনি।

-“আব্বু আমি ভাবছিলাম কি আমাদের উচিত ক্যাম্প করা।দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো অনেক মানুষ চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না।আমরা চাইলে ওনাদের সাহায্য করতে পারি ফান্ডের টাকা থেকে।”(মাহিন)
-“গুড আইডিয়া মাহিন।তুমি কাজে লেগে যাও।আর ফান্ডে শর্ট পড়লে জাস্ট আমায় জানাবা।”(মহাসিন)
-“দাদাকে জানাতে হবে না?”(মাহিন)
-“ওইটা তোমার হসপিটাল ছেলে।ওখানে তোমার যা করার করবা তা নিয়ে আবার দাদা জানানোর কি আছে”(মহাসিন)

দুইজন চুপ হয়ে যায়।খেতে থাকেন। মহাসিন তালুকদার খুব ভালো করেই জানেন ওনার বাবাকে যদি এই বিষয়ে জানানো হয় তবে এককথায় না বলতে তিনি প্রস্তুত আছেন।এর চেয়ে ওনাকে না জানানোই উত্তম।আর ছেলের বায়োলজিক্যাল বাবা-মায়ের হসপিটাল ওইটা সেখানে উনি মতামত দিতে পারেন তবে রুখতে পারবেন না।

-“আব্বু,আম্মু মেহের কোথায়?”

মোয়াজের চিৎকার চেঁচামেচিতে বিরক্ত হোন মহাসিন তালুকদার।এই ছেলেটা যে ওনার এইটা ওনার বিশ্বাস হতে চায়না।সবসময় চিৎকার চেঁচামেচি করতেই থাকে।কার মতো অভ্যাস পেয়েছে আল্লাহ জানে।আর মেহেরের কথা জিজ্ঞেস করছে কেন?জেনে গেছে কি মেহের ঘরে নেই!মোয়াজকে কাম ডাউন করতে তৃষ্ণা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। মোবারক তালুকদার ঘুমাচ্ছেন ঘুমের ঔষধ খেয়ে।তাও মিনিট বিশেক হবে।

-“মোয়াজ শান্ত হও।চিৎকার চেঁচামেচি করছো কেন?”(তৃষ্ণা)
-“তৃষ্ণা তুমি সরো।আপাতত আমাকে আমার বোন সম্পর্কে জানতে দেও”(মোয়াজ)
-“মোয়াজ চিৎকার চেঁচামেচি করিস না।আম্মু তো বললো বনু ঘরে আছে”(মাহিন)
-“বড়দা ভাই তোমাকে মিথ্যে বলেছে আম্মু।মেহের ঘরে নেই।এমনকি পুরো বাড়িতেই ও নেই”(মোয়াজ)
-“হোয়াট”(মাহিন)

খাবার টেবিল ছেড়ে দাঁড়িয়ে যায় মাহিন।ফোন দিতে থাকে বোনকে।নট রিচেবল বলছে। মুহুর্তেই মাথা বিগড়ে যায় দুই ভাইয়ের।টানা ফোন দেওয়া সাথে পুরো ড্রয়িংরুম পায়চারি করা তো আছেই।মহাসিন তালুকদার চিন্তিত হতে চেয়েও পারেন না।তিনি জানেন মেয়ের প্রফেশন। শারীরিক ভাবে ফিট এবং মানসিক ভাবে প্রচন্ড বুদ্ধিমতী হওয়ায় আঠারোতেই স্পেশাল ইউনিটে মেয়ে যে চান্স পেয়েছে এই সুখবর পেয়েছিলেন তিনি।তবে তার কথাতেই এই কথা গোপন রাখে মেহের।মেয়ে যে বিগত দুই বছরের অনেক তরক্কি করেছে এটাও ওনার অজানা নয়। সারা দুনিয়ার কাছেই গোপনীয় এই বিষয়।তবে আজ হয়তো খুলাসা করতেই হবে ওনার।

৩৫.
ভোর হয়েছে অনেকক্ষণ।সূর্য মামা তার তেজস্ক্রিয়তা আজ ছড়াতে পারেনি।মেঘেরা পুরো আকাশে রাজস্ব করেছে।জঙ্গলের মাঝে একটা খালের পাশে বসে আছে মেহের।তার পাশেই দাড়িয়ে আছে তীব্র। মেহের যে স্পেশাল ইউনিটের সদস্য তা শুনে স্থির হয়ে গেছে তীব্র।কি বলবে এখন ও মেহের কে?সে তো চাইলেই বলতে পারেনা যে সে কে!সে তো স্বীকার করতে পারেনা সে কে!আসলে সে এখন পুরোপুরি অক্ষম।সে না পারবে স্বীকার করে নিজেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে হস্তান্তরিত হতে আর না পারবে প্রেয়সীকে মিথ্যে বলতে।

-“পুরো বারো ঘন্টা হয়ে গেলো তীব্র। তুমি আমায় জবাব দিলে না।কে তুমি? টাইকুনের বস কে?”(মেহের)

মেহেরের কথা শুনে না শোনার ভান করে তীব্র।সে পারবে না প্রেয়সীকে মিথ্যে বলতে।এর চেয়ে চুপ থাকা উত্তম তার কাছে। মেহের বার কয়েক একই প্রশ্ন করে।তবে তীব্র উত্তর দেয়না।স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে খালের দিকে।

-“তীব্র আই নিড মাই আনসার্স”(মেহের)
-“মেহের বাড়ি যা।বারো ঘন্টা পেরিয়েছে তুই আমার সাথে।সবাই চিন্তা করবে বাড়ি যা”(তীব্র)
-“আমাকে এড়িয়ে যেতে পারো না তুমি তীব্র।আমার উত্তর চাই মানে চাই।”(মেহের)

মেহের দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরে তীব্র।বলে ওঠে,
-“উত্তর আমি দিবো না।কি করবি তুই?বল কি করবি?”
-“তীব্র আমায় ছাড়ো।আমার লাগছে।”(মেহের)
-“যদি না ছাড়ি?তোকে আমি ছাড়তে চাই না।মেহের তুই আমার সম্পর্কে জানতে চাস না।ফিরে যা।”(তীব্র)
-“কেন তুমি পালিয়ে বেড়াচ্ছো তীব্র?তুমি কি অন্যায়ের সাথে জড়িত?”(মেহের)
-“তুই আইনের লোক।তোর কাছে আইনেতে যা অন্যায় তা অন্যায়।তবে কাগজে কলমের সনদ ছাড়াও জীবনটা আরো বৃহৎ।সেখানে আমার কাজ একদম সঠিক।”(তীব্র)
-“তুমি টাইকুনের সদস্য তাই না?নাবিনের খাৎমাতেও তোমার হাত আছে তাইনা?”(মেহের)
-“কি করবি এতো সব জেনে?প্রমাণ তো কিছুই নেই।না পারবি গ্রেফতার করতে।শুধু শুধু আনসলভড কেসের বোঝা মাথায় নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরতে চাস কেন?”(তীব্র)

নিরবতা ঘিরে ধরে দু’জনকে।অনেক প্রশ্ন করার থাকলেও আর একটা প্রশ্নও করেনা মেহের।তীব্র ওকে বুঝতে পারেনি।না বোঝাই ভালো।মেহের তো টাইকুনের লোকদের সাথে আলোচনা করতে চেয়েছিলো।পরিচিতো হতে চেয়েছিলো।আর সবচেয়ে বড় কথা ……!তবে তীব্র ওর কথা তো শুনলোই না।বুঝবে কি করে!

-“তীব্র আমি জানি তুমি টাইকুনের সদস্যদের কাউকে না কাউকে চেনো।এমনও হতে পারে তুমি টাইকুনের সদস্য।আমি আংকেল ক্যানিয়নের সাথে দেখা করতে চাই।”(মেহের)

আংকেলের নাম মেহেরের মুখে শুনে তীব্রের বুঝতে বাকি নেই ডিআইজি থেকে নিয়োগ প্রাপ্ত নতুন ইনভেস্টিগেশন অফিসার মিস.হাইড মেহের।তবে এতো অল্প বয়সে কিভাবে কি কিছুই বোঝে না সে।বোঝার ইচ্ছে করে বটে তবে কিছু জানতে চায় না সে।জানতে চাইলেই হয়তো উত্তর চাইবে। তারচেয়ে নিজ থেকে ভেবে নেওয়াকে উত্তম ভাবে সে।

৩৬.
সকাল যদিও এখন বলা যায় না তবে দুপুর বলা যায়।এগারোটা চল্লিশ বাজে।কাজী অফিস থেকে তীব্র-মেহের মাত্রই বেড়িয়েছে।আজ থেকে দুজনে দুজনার নামে লিখিত হয়েছে।জড়িত হয়েছে অদৃশ্য এক শক্ত বন্ধনে।মেহেরের এখনো মনে পড়ছে তীব্রের দেওয়া শর্তের কথা।তীব্র আংকেল ক্যানিয়নের সাথে কথা বলিয়ে দিতে রাজি হলেও সাথে জুড়ে দিয়েছিলো শর্ত। তার হয়তো মেহেরের প্রতি সন্দেহ ছিলো যে হয়তো আংকেলের লোকেশন ট্রেস করে তাকে ধরে তীব্রকেও ছাড়বে না মেহের।তাইতো শর্ত দিয়ে বসলো,
“মেহের চল বিয়ে করে নেই।তারপর চাইলে তুই আমার সব সত্য জানতে পারিস।দেখা করতে পারিস আংকেল ক্যানিয়নের সাথে।তবে জোর নেই।তোর ইচ্ছা”

মেহেরের সামনে মাহিন আর মোয়াজ দাঁড়িয়ে। ভাইদের ওই ডেকে এনেছে। মহাসিন তালুকদার ছেলেদের সামনে উদ্ঘাটন করেননি যে ওদের বোনের আরো একটা অস্তিত্ব আছে।সারারাত চিন্তায় চিন্তায় আর মহাসিন তালুকদারের মিথ্যে গল্পকে সত্যি ভেবে পার করেছে ওরা।সকাল সকাল মেহেরের ফোনে এখানে ছুটে এসেছে প্রায় দুই ঘন্টা।মাহিন-মোয়াজ যদিও অবাক হয়েছে ওদের হুটহাট বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ায়।তবে তূর্যয়ের সাথে ধুমধাম করে বিয়ের দিন যে ফারা গেলো তা মনে করতেই দুই ভাই কোন কথা না বলেই সাক্ষী দিয়ে বোনকে তুলে দিয়েছে তীব্রর হাতে।

তালুকদার বাড়িতে যাওয়ার পালা এবার।তীব্র-মেহেরের কথা হয়নি বিয়ের পর থেকে আর।একদম সাদামাটাভাবে কালকের পোশাকেই দুজনার বিয়ে হয়ে গেলো।না ছিলো লাল বেনারসি,না ছিলো বিয়ের খাবার।একদম পালিয়ে বিয়ে যাকে বলে তেমন ছিলো।

-“হুটহাট এই বিয়ের মানে কি?আমগো কইলে কি আমরা তুমগো বিয়া দিতাম না নাকি?দেখছোস মহাসিন আমি তোরে বলছিলাম মাইয়া শাসনে রাখ নয়তো পোলা নিয়া পালাইয়া বিয়া করবো।দেখছোস আমগো মান আর রাখলো না।তা পোলা কোনখানের কোন বান্দা আমারেও দেখাও”(মোবারক তালুকদার)

মেহের-তীব্র আলাদা গাড়িতে থাকায় এখনো এসে পৌঁছায়নি। তালুকদার বাড়িতে ইতিমধ্যে যা ঝড় ওঠার উঠে গেছে।এখন ঝড়টা বহমান থাকবে কিছুক্ষণ এই যা।মেহের তীব্রের উপস্থিতিতে কি হবে আল্লাহ ভালো জানে। মোবারক তালুকদারের খুশি হবারই কথা কেননা তীব্র তো আবার ওনার বন্ধুর নাতি।বন্ধুর নাতির সাথে নাতনির বিয়ে মন্দ না।

৩৭.
সারিম হা করে তাকিয়ে আছে মেহেরের দিকে। ইতিমধ্যে ওর পিঠে চার ঘা পড়েছে।মেহের নিজেই মেরেছে।ছোটবেলার বন্ধু,স্কুল-কলেজ জীবনের সিনিয়র ভাই,তীব্রর চাচাতো ছোটভাই সারিম।জারিন তো খুশি বান্ধুবীর বিয়ে তাও আবার সারিমের চাচাতো ভাইয়ের সাথে। দুই বান্ধবী জা হবে কি যে আনন্দ তার!

-“দোস্ত বলে বোঝাতে পারবো না আজ আমি দুইটা ভালো কাজ করলাম।প্রথমত তোর আর সারিমের দেখা করালাম।আর দ্বিতীয়ত আমি বাসায় সারিমের কথা বলে দিছি।”(জারিন)
-“ভাই এই তারছিড়া তোর সেই সারিম জানলে আমি তোরে আগেই না করতাম।এই বলদে তো নিজের হেফাজত নিজে করতে পারেনা তোরটা করবো কেমনে?”(মেহের)
-“বউজান তুমি আমার ভাইকে নিয়ে এভাবে বলো না।তোমার ছোট্ট দেবর বলে কথা।দুষ্টামি করার অনেক জায়গা পাইবা তাই বলে “(তীব্র)

কাশি উঠে যায় মেহেরের।তীব্রের আকস্মিক এমন আচরণ ওর সহ্য হচ্ছে না।তবে যেই কাজের জন্য এই সম্পর্কে জড়ানো সেই কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব তো তারই। তবে এর জন্য তো আর তার আশেপাশের মানুষদের জীবন অস্বাভাবিক হতে দিতে পারেনা সে।তাইতো স্বাভাবিক আচরণ।তবে সারিমের এতোটা নিশ্চুপ্পিতা ওকে ভাবাচ্ছে।মেহের মনে মনে ভাবছে,

-“তীব্রর আকস্মিক এতো পরিবর্তন আর এতোদিন সারিমের আমার থেকে পালিয়ে পালিয়ে থাকার পেছনে কি কোনো যোগসূত্র আছে?আর থাকলেই বা কি হতে পারে? আংকেল ক্যানিয়ন!”

চলবে কি?

#দো_দিলে_জাহান
#পর্বঃ১২
#বর্ষা
বিয়ে স্পেশাল পর্ব:১
৩৮.
দুইদিন পর,,,
মেহের খুব সুন্দর করে সেজেছে আজ।মিষ্টি কালারের সুন্দর একটা গাউন পড়েছে সে।হিজাব পড়েছে, পাশাপাশি একপাশ দিয়ে ওরনা নিয়েছে।অনেক মায়াবী লাগছে ওকে।বিয়ের দিন মেহেরের সাথে তীব্র আসেনি।সেদিনই ওর শেষ দেখা এবং কথা বলা ছিলো।কোথায় যেন হুট করে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলো।বাড়ির সবাইকে তীব্রর কথা বিশ্বাস করানো গেলেও মোবারক তালুকদার মেনে নেননি।তিনি তো জোর গলায় বলেছেন,
-“নিশ্চিত যার লগে বিয়া করছিলো ওই পোলায় ভাগছে। এখন আমার বন্ধুর নাতিরে ফাসাইতে চাইতাছে।”

অবশ্য এতে মেহেরের ওপর তেমন ইফেক্ট পড়েনি। কেননা ক্যানিয়ন আংকেলের সাথে ওর দুই মিনিটের ক্ষুদ্র কথোপকথন হয়েছে।নাম্বার দেয়নি তীব্র।তবে মেহের নাম্বারটা দেখে নিয়েছিলো। এখনো তার স্মরণে আছে।তবে কল দেয়নি।তীব্র ওর আশেপাশে থাকা অবস্থায় কল দিলেই ভালো হবে নয়তো তীব্রর ক্ষতি হতে পারে।হয়তো আংকেল ক্যানিয়ন ওকে ভুল বুঝবে তাই…!

-“ওই পেত্নি রেডি তুই?”

জায়িনের কথায় হাতের বালিশ ছুঁড়ে মারে মেহের।বালিশ হাতেই এতোক্ষণ সব ভাবছিলো সে। তখনই তৃষ্ণাও প্রবেশ করে ওই রুমে।জায়িনকে দেখে বলে ওঠে,
-“কি দেবর জি এখানে মারামারি করছো কেন বোনের সাথে! যাও দ্রুত নিচে যাও।গিয়ে সামলাও সব”
-“তুমি বলবে আর আমি তেমন করবো না এমন তো হয়না,যাচ্ছি ভাবী”(জায়িন)

তৃষ্ণা মেহেরের কাছে এসে থুতনিতে হাত দিয়ে বলে ওঠে মাশাআল্লাহ।চোখ থেকে কাজল নিয়ে কানের পিঠে লাগিয়ে দেয়। রাবেয়া বেগম কখনো এমন করেননি।তার মতে আল্লাহ তায়ালাই তার সন্তানদের রক্ষা।কালো টিপ,কালো কোনো কিছু লাগিয়ে নজর কাটানোর চিন্তা কখনো তার মাথায় আসেনি।তাই মেহেরের কাছে অদ্ভুত লাগে বিষয়টা।

-“কি এতো চিন্তা করছো মেহের?”(তৃষ্ণা)
-“তীব্র…”(মেহের)
-“ওহো বিয়ে করতে না করতেই জামাইয়ের চিন্তায় মশগুল “(তৃষ্ণা)
-“ভাবী তুমি তো জানো সত্যিটা।বড়দা ভাই ছোটদা ভাই না জানলেও তো তুমি জানো।তুমি তো আমায় আরো বছর এক আগে থেকেই চেনো”(মেহের)
-“টাইকুন সাম্রাজ্য…”(তৃষ্ণা)
-“হ্যা ভাবী ওই কারণেই আমার আর তীব্রের বিয়ে হওয়া”(মেহের)

তৃষ্ণা নিশ্চুপ হয়ে রয়।তার ননদের পক্ষে যে সবই সম্ভব তা সে জানে।বছর এক আগে আদালতে দেখা হয়েছিলো ওদের। তৃষ্ণা একজন লয়ার।মোয়াজের সাথে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ইয়ারে পড়লেও ডিপার্টমেন্ট ছিলো একেবারে আলাদা।মোয়াজ পড়েছিলো ম্যানেজমেন্ট আর তৃষ্ণা ওকালতি নিয়ে।

-“মেহের বিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা কিংবা কেস না।এর মাহাত্ম্য অনেক বৃহৎ।বিয়ে তোমায় জুড়ে দেয় একজন মানুষের সাথে।তার কাজের সাথে।তোমায় নির্ভর করে দেয় তার ভালোবাসার ওপর।তুমি কি বুঝতে পারছো আমি তোমায় কি বোঝাচ্ছি?”(তৃষ্ণা)
-“ভাবী আমি জানি।তুমি জানো আমি তীব্রকে ভালোবাসি, অনেক বেশিই ভালোবাসি।নয়তো আমাকে কোনো শর্তে বিয়ে করানো যেতো না।”(মেহের)
-“শর্ত?”(তৃষ্ণা)
-“আংকেলের সাথে কথা বলিয়ে দেওয়ার শর্ত”(মেহের)
-“মেহের তুই জীবনের সাথে খেলা শুরু করেছিস”(তৃষ্ণা)
-“ভাবী তুমি তো একজন উকিল। আমায় বলো এই শর্তে রাজি হয়ে আমি কি কোনো ভুল করেছি।দুইটা কাজই হয়েছে। কিছুদিনের জন্য হলেও প্রিয় মানুষের নামে লিখিত হয়েছি।আর আংকেল ক্যানিয়নের সাথেও কথা হয়েছে”(মেহের)

কিছুক্ষণ চুপ থেকে তৃষ্ণার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় মেহের।খুব মিষ্টি লাগছে ওকে।হলুদ শাড়িতে একদম বউ বউ লাগছে।বাসায় যদিও এমনিতে থ্রী পিস নিত্যদিন পড়ে।তবে আজ সুন্দর লাগছে তৃষ্ণাকে।তোয়ার গায়ে হলুদ আর মেহেদী দুইটাই আজ।আজ এমনিতেও ঈদের আগের দিন মেয়েরা মেহেদী রাত পালন করে। সেক্ষেত্রে আজকের রাতটায় মেহেদী রেখে ভুল করেনি তালুকদাররা।

তৃষ্ণা মেয়েটা ভারী মিষ্টি।বাবা-মা বেঁচে থাকলে হয়তো মুখের হাসিটা আরো প্রশস্ত হতো।বাবা-মা নেই এই কথাটা মানতে গিয়েই হয়তো মুখের হাসিটা গাঢ় হতে গিয়েও আটকে যায়।মেহের ভাবীকে জড়িয়ে বলে ওঠে,
-“ভাবী তোমায় যা লাগছে না আজ।পুরাই ছোটদা ভাইয়ের বউ।চল চল নিচে যাই।আমরা বাড়ির মানুষ হয়েই যদি উধাও থাকি তাহলে কি চলবে নাকি!”

মেহেরের কথায় ননদ-ভাবী মিলে একসাথে নিচে আসে। বেশিরভাগ মানুষই আজ হলুদ শাড়ি পড়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছে। শুধু আমাদের মেহেরই শাড়ি না পড়ে গাউন পড়েছে।আবার তাও হলুদ না মিষ্টি কালারের। সুইমিং পুলের পাশের স্টেজ হয়েছে। সুন্দর ভাবে সাজিয়ে এই বিকেল বিকেল তোয়াকে স্টেজে বসানো হয়েছে।এখন ছোটরা আনন্দ করবে,নাচগান করবে এই যা।আসল অনুষ্ঠান তো হবে রাতে।

৩৯.
গানের তালে কাপল ডান্স করছে মেহের কেউ একজনের সাথে।কেউ একজন বলার কারণ অন্ধকার আকাশের নিচে স্টেজের পাশে নাচছে ওরা।লাইটে কোনো সমস্যা হওয়ায় আলো নেই।দুইজন ছেলে বিষয়টা দেখতে গিয়েছে।আর মেহেরকে জোর করেই কেউ নাচতে স্টেজে নিয়ে এসেছে।অন্ধকারের এই সুযোগে ছেলেটা ওর কানের কাছে বলে উঠলো,

-“এতো সুন্দরভাবে সেজে তুমি কেন অন্যদের সামনে?আমি বড্ড পজেসিভ আমার মানুষদের নিয়ে। তুমি যেহেতু একান্তই আমার তাই কি দরকার অন্যদের এই সৌন্দর্যতা দেখানোর!”
-”তীব্র?”(মেহের)
-“ইয়েস জানু”(তীব্র)

লাইট জ্বলে ওঠে।জায়িনসহ উপস্থিত প্রতিবেশী সবাই অবাক হয় তীব্র আর মেহেরকে ওভাবে দেখে।কেউ কেউ তো কথা বলতেও শুরু করেছে আড়ালে।তীব্র ইশারায় মাইকের দায়িত্বে থাকা ছেলেটাকে ডাকে।মাইক হাতে নিয়ে বলে ওঠে,
-“আসসালামু আলাইকুম আন্টি এন্ড আংকেলস।আমি সাফায়েত রেদওয়ান তীব্র। হাসবেন্ড অফ জাফরান মেহের তালুকদার।দুইদিন যাবৎ আমরা বিবাহিত।সময়ের স্বল্পতায় জানানো হয়নি আপনাদেরকে।তবে তোয়ার বিয়েতে জানিয়ে দিলাম।কেউ আবার আমাদের রোমান্স করতে দেখে আমার বউটাকে নিয়ে বাজে কথা বলবেন না যেন..।নয়তো আমি কাউকে ছাড়বো না”

তীব্রের বলা কথায় মেহের বেশ লজ্জা পায়।বড়রাও উপস্থিত আছে এখানে। তূর্যয় তো ভেতরে ভেতরে জ্বলে পুড়ে শেষ।সে তো আশাই করেনি তার থেকে ভালো ছেলে মেহের পাবে।হাউ স্টুপিড হি ইজ!সে নিজেকে ভালো ভাবে কোন দিক দিয়ে? গোলাম ফকরুলও আশা করেননি মেহেরের জামাই এতো হ্যান্ডসাম হবে।তবে যে তীব্র নির্লজ্জ তা বুঝে ফেলেছেন ওর কথায়।

-“দাদাভাই এভাবে বিয়া করার কি আছে?আমারে কইতা আমি তোমার বিয়া করাই দিতাম ধুমধাম করে”(মোবারক তালুকদার)
-“আহা দাদা ধুমধাম করে বিয়ে করার যে এই যে তোমাদের রেখে বিয়ে করলাম এটার মজাই আলাদা ছিলো।আজ আম্মু আব্বুও আসবে বুঝলে!”(তীব্র)
-“তা তো বুঝলাম।তবে তুমি কোন দুঃখে মেহেররে বিয়া করতে গেলা।ওর থেকেও তো কত ভালো মাইয়া আছে”(মোবারক তালুকদার)
-“তুমি হয়তো হিরা চিনো না দাদা।তবে আমি হিরাও চিনি,এর মূল্যও জানি।থাকো একটু ঘুরে আসি বউয়ের কাছ থেকে “(তীব্র)

তীব্র চলে যেতেই মহাসিন তালুকদার মুখ টিপে হেসে আব্বার উদ্দেশ্যে‌ বলে ওঠেন,
-“আব্বা কালকে খুব করে তো আমার শিক্ষা,আমার মেয়ে নিয়ে কথা বললা।এখন তো মনে হচ্ছে তোমার বন্ধুর নাতিই নাটের গুরু।বড়দের সামনেই কেমন নির্লজ্জ আচরণ করছে”
-“তো ওর বউ ও কইলে দোষ কি!সর সামনে থেকে আমি তোয়ারে হলুদ লাগাইয়া আসি”(মোবারক তালুকদার)

জুনায়েদ তালুকদার আর মহাসিন তালুকদার একত্রে হেসে ওঠেন। ওনাদের আব্বা হেরে গেলেও হার মানবে না।তবে দুইভাই খুশিই হয়েছে।তীব্র,মুহিব কেউই পাত্র হিসেবে খারাপ না। পরিবারের দুই মেয়েই ভালো জামাই পাচ্ছে এই তো সবচেয়ে বড় খুশির খবর।তবে মহাসিন তালুকদারের এখনও চিন্তা রয়ে গেছে।মাহিনের বিয়েটা এখনো দিতে পারলো না।ছেলেটা কি অতীত আঁকড়ে কখনো বিয়ে করবে না?

৪০.

স্টেজের পাশে এক বোরখা ওয়ালীকে গণধোলাই দিচ্ছে সবাই।বোরখার ভেতরে আছে এক পুরুষ তা বুঝতে পেরেই এই মাইর।তবে বোরখা খুলতেই ভেতরে পাত্রকে দেখে সবাই অবাক।এখন হাসবে না কাঁদবে এই ভেবেই নিশ্চুপ সবাই।বড়রা তো চলে গেছে অনেকক্ষণ।রাত তো সাড়ে এগারোটা।পাত্রের বাড়ি যারা গিয়েছিলো তারাও ফিরে এসেছে বেশ অনেকক্ষণ। কাছাকাছি হওয়ায় একঘন্টাও লাগেনি যেতে আসতে।

-“দুলাভাই আমার বোনকে ছাড়া থাকতে কি এতোই কষ্ট হচ্ছিলো যে আর কয়েকঘন্টাও ধৈর্য্যে কুলালো না আপনার!হা হা হা”

জায়িনের কথায় উপস্থিত সবাই হেসে ওঠে।মাহিন যদিও ওখানে উপস্থিত তবে তার ধ্যান জ্ঞান তো পাশে বসা মারিয়ামে নিবদ্ধ।তার ফাজিল বোন নাকি এই মেয়েকে ইনভাইট করেছে।সে তো বুঝতেই পারছে মারিয়ামের খবর পেলো কি করে মেহের!

মেহের তো একবার ভাইকে দেখছো তো আবার মারিয়ামকে দেখছো।মেয়েটা দেখতে খারাপ না। মাশাআল্লাহ বলাই যায়।চোখ দুটো বেশ বড় বড়।যেন এক অসীমতা বিরাজ করছে সেখানে।ওর ভাই কি এই অসীমতায় আটকাতে পারছে না?প্রশ্ন জাগে ওর মনে তবে উত্তর শুধু মাহিনের কাছেই আছে।যেদিন মাহিন-মোয়াজ গিয়েছিলো মারিয়ামের সাথে দেখা করতে সেদিন ওদের দেখেছিলো মেহের।সে তো গিয়েছিলো এস.আর এর খোঁজে।মারিয়ামের নাম্বার জোগাড় করে খোঁজ নেওয়া ওর জন্য বড় বিষয় ছিলো না।তারপর মাহিনের প্রশ্ন করায় সিওর হওয়া আর আজকে ওকে ইনভাইট করা।

নওশিন মেয়েটা বারবার সুযোগ পেলেই মাহিনের আশেপাশে যাওয়ার চেষ্টা করছে।তাকে এলিয়ে দেওয়া মানুষটা যে আর কেউ নয় বরং নূরিয়া তা বেশ বুঝেছে মাহিন।তবে কাউকে কিছু বলতে পারছে না।এদিকে ভেতরে ভেতরে মারিয়াম তো মাহিন আর নওশিন দুইজনের গুষ্টি উদ্ধার করছে।

-“আপু কোনো সমস্যা?”(তৃষ্ণা)
-“দেখছো তৃষ্ণা তোমাদের বড়দা ভাই কেমন?আমি আশেপাশে থাকলে যেন ওকে পিঁপড়ায় কামড়ায় আর এখন কিভাবে বসে আছে।মন তো চাইছে দেই ধরে দুইটা থাপ্পর”(মারিয়াম)

তৃষ্ণা হাসে।মেয়েটার মাঝে রাগ আছে প্রচুর বুঝতে পারে।তবে কিছু বলে না।এই রাগ না থাকলে ভালোবাসা বাড়বে কি করে!মারিয়ামের রেগে যাওয়ার দৃশ্য চোখ এড়ায় না মাহিনের।তাইতো ওকে পৌঁছে দেওয়ার নাম করে নওশিনের থেকে ছাড়া পেয়ে কোনমতে পালিয়ে গাড়ি অব্দি আসে।তবে যার জন্য আসা সেই কথা বলছে না তার সাথে।

এদিকে মার খেয়ে আধমরা হয়ে স্টেজে তোয়ার পাশে বসে আছে মুহিব।বেচার কোন বুদ্ধিতে যে বোরখা পড়ে এখানে এসেছিলো আল্লাহ মালুম।হারাম কাজ করলে এমনই হবে! ছেলেদের জন্য বোরখা পড়া তো হারাম।সব দোষ ওই ফাজিল বন্ধুগুলোর।

-“আপনার কি বেশি লেগেছে?”(তোয়া)
-“আমি ছেলে মানুষ।আমার এটুকু লাগেনা”(মুহিব)
যে লাগা লাগছে তোমারে কেমনে বলি?মান ইজ্জত কমানোর দরকার নাই আমার।(মনে মনে)

তোয়া কি কথা বলবে সে তো খুঁজেই পাচ্ছে না।বড্ড লজ্জা আর আড়ষ্টতায় আটকে পড়ছে সে।মুখে বড় বড় কথা বলতে পারলেও বাস্তবে যে সে বিরাট এক ভীতু তা আজ উপলব্ধি করছে সে।আর মুহিব সে যার সাথে দেখা করতে এসেছিলো দেখা তো তার পেলো তবে উড়াধুরা মাইর তো বোনাস ছিলো।তবে হবু বউটাকে দেখে মনের ভেতর আলাদাই এক শান্তি লাগছে তার। ইশ্ কি মিষ্টি লাগছে তার হবু বউটাকে!মন চাচ্ছে টুক করে একটা কিসি দিয়ে দিতে।

-“ও বউ,বউ এতো আমাকে কি ভুলেই গেছো?এতোদিন পর দেখলা কই আদর যত্ন করে জামাই আদর করে খাওয়াবা তা না পালাই পালাই করছো!”

তীব্র হঠাৎ করে কোথা থেকে এসে লাফিয়ে পড়ে মেহেরের সামনে।বেচারি হঠাৎ এমন লাফিয়ে আসায় বেশ ভয় পেয়েছে।প্রস্তুত ছিলো না যে সে তাই এমন ভাবে কেঁপে ওঠা ওর।তবে তীব্রর কথা শুনে তার এখন বেশ রাগ লাগছে।সেই সন্ধ্যায় বলেছিলো সাফিন রেদওয়ান আর মিসেস মিথিলা সাফিন রেদওয়ান আসবেন। কিন্তু তাদের আসার নাম গন্ধও নেই।তার মাঝে এই ছেলেও নিরুদ্দেশ হয়েছিলো!

-“এই মিথ্যে বলছো কেন তীব্র?এতোদিন কোথায় মাত্র দুইদিন পর দেখা হয়েছে আমাদের।আর কিসের জামাই আদরের কথা বলছো!আমার ভাইরা যে তোমায় খাওয়ালো তাতে হয়নি?আর আমাকে তুমি করে বলবে না অস্বস্তি লাগে।আগের মতোই তুই করেই ডাকবে”(মেহের)
-“আমার বউ আমি ডাকবো তোমার কি জান?আর সব আদর যদি শালারাই দিতে পারতো তাহলে বউদের কি দরকার ছিলো।নিজ হাতেও তো খাইয়ে দিতে পারতে বউজান”(তীব্র)

চলবে কি?