দো দিলে জাহান পর্ব-১৯+২০

0
97

#দো_দিলে_জাহান
#পর্বঃ১৯
#বর্ষা
৬৪.
তীব্র নিজেকে সামলে বসে আছে।তারই সামনে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে চারজন পরে আছে।জানে মারেনি।মেহের অবাক হয়ে ওকে দেখছে।এই লোকগুলোর মাঝে দুইজন তো ওরাই যারা ট্রাকে ছিলো সেদিন।তারপর তীব্রর মৃত্যু নিশ্চিত করতে আবার গুলি বর্ষণও তো করেছিলো।(একপর্বের গ্যাপে অনেককিছুই আওলে যায়)।মেহের দেখেছিলো ওদেরকে।

মেহেরকে নিজের দিকে টান দিয়ে বুকের ওপর ফেলতে গিয়ে ব্যথা পায় তীব্র।সেদিন চালানো দুইটা গুলির একটা তো তার বুকে আরেকটা হাতে লেগেছিলো।আর ট্রাক দুর্ঘটনার উছিলায় তো সে নিজের স্মৃতি হারানোর মিথ্যা নাটক সাজিয়েছিলো। রেদওয়ান বাড়ির মানুষদের সে কানাডা পাঠিয়ে দিয়েছে আজকের সকালের ফ্লাইটেই।কারণ দর্শায়নি।যদিও যেতে চায়নি কেউই তবে মেহের কথা দিয়েছে তীব্রর খেয়াল রাখবে।

জারিন মেহেরের সাথেই আছে রেদওয়ান বাড়িতে।সাথে আছে গুটিকয়েক আরো লোক। যাদের জারিন কেন মেহের নিজেই চেনে না।মেহেরের কথায় ওপরে গিয়ে দরজা আটকে বসে আছে সে।রক্তে ফোবিয়া আছে এই মেয়ের।এই যে রঞ্জক পদার্থ দেখলেই জ্ঞান হারায়।

-“কি হচ্ছে এসব তীব্র?”(মেহের)
-“শাস্তি দিচ্ছি। তুমি তো আইনের লোক।জানো ওরা কারা?ওরা তোমাদের ডিপার্টমেন্টেরই লোক”(তীব্র)

মেহের জানে তীব্র মিথ্যা বলছে না। গুটিকয়েক ভালো লোকই আছে তাদের ডিপার্টমেন্টে।বাদ বাকি সবগুলো তো বিক্রিত কারো না কারো কাছে।তবে তীব্র স্মৃতি আছে দেখে বেশ অবাক হয় মেহের।সে ভাবেনি তীব্র তার থেকে সত্যি লুকাবে।তাই হয়তো গভীর আঘাত পেলো।যার কোনো দাগ পরিলক্ষিত নয় বর্হি অংশে।

তীব্র প্রচন্ড চেতে আছে আজ।তার সামনে চারজন ব্যথায় কুকাচ্ছে। একজনের হাতের ভেতর চাকু ঢুকিয়ে দিয়েছে।তো আরেকজনের আঙ্গুলই কেটে ফেলেছে।বাকি দু’জন ছিলো না সেইদিন ট্রাক দুর্ঘটনায়।তাই চেনে না তাদের মেহের। তাদের এখনো অব্দি বাঁশ দিয়ে শুধু পেটানো হয়েছে। মেহের তীব্রর নির্মমতা দেখে ভেতর থেকে বারবার কেঁপে ওঠে। মানুষ এতোটা নির্মম হয়?প্রশ্ন জাগে ওর মন-মস্তিষ্কে।

-“আমাদের ক্ষমা করেন।আমরা জানি না কে বা কারা সেদিন আক্রমণ করতে বলছিলো। আমরা আমরা তো উপরমহলের আদেশে এমন করেছিলাম। আমাদের ছেড়ে দিন”

আহত দুইজনের মাঝে একজন ভাঙা গলায় বলে ওঠে। লোকটার নাম তামিম। রক্তাক্ত আইডি কার্ড থেকে এখনো নামটা দেখা যাচ্ছে।মেহের মাথা গরম হয়ে যায় উপরমহলের আদশ কথাটা শুনে।আজ অব্দি যত হাই প্রোফাইল কেস সে লড়তে গিয়েছে ততবার উপরমহলের সাথে তার ঝামেলা হয়েছে।কতবার সে সাসপেন্ড হয়েছে এই দুই বছরে!তবে প্রেসের কারণে তার সাসপেন্ড টিকতে পারেনি।ভাগ্যিস মিডিয়ার লোকদের মাঝেও ভালো কিছু ক্রাইম রিপোর্টার ছিলো।

-“এই উপরমহলই যত নষ্টের গোড়া।টাকা খাবে একজনের।আর ফ্রিতে কাজ করাবে সরকারি লোকদের দিয়ে।মন তো চায় এদের একেকটাকে গুলি করে মারতে”

মেহেরের কথায় তীব্র হাসে।তীব্রর হাসির কারণও আছে বটে।নিজ ডিপার্টমেন্টের বিরুদ্ধে কথা বলছে না কি ও?তবে মেহেরের ভাবনা একদমই বিপরীত।উপরমহল মানে মন্ত্রী,এমপি আর তাদের বড় বড় কর্মকর্তারা।এই যে তাদের বড় বড় কর্মকর্তা তারাও কিন্তু মন্ত্রীদের থেকেই আদেশটা পায়।আবার তা দিয়ে দেয় জুনিয়রদের ওপর।পুরো ডিপার্টমেন্টে এইভাবে ছড়িয়ে আছে এই খুনখারাবির রেকেটটা।

৬৫.
আংকেল ক্যানিয়ন দেশ ছাড়ার চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত।তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি আসলে কাকে মারার পরিকল্পনা করেছেন!নাবিন গ্রুপকে মারেনি তীব্র। বরং নিজের টিমে যোগ করে নিজের শক্তি বারিয়ে নিয়েছে কয়েকগুণ।সাথে যুক্ত হয়েছে আরো কয়েক আঞ্চলিক গ্যাং।

টাইকুন সাম্রাজ্যে শুরু আংকেল ক্যানিয়নের হাত ধরে হলেও এর ভালো কাজের সুনাম ছড়িয়েছিলো তীব্রর সূত্র ধরে।তবে ক্যানিয়নের সব রহস্য, জারিজুরি তো তিনি নিজেই ফাঁস করেছেন।তূর্যয় আন্ডার গ্রাউন্ড হয়েছে।এখন ওনার কি হবে?তাই ভেবেই তো লোক বল লাগিয়ে আজকের টিকিট কাটা‌।কোরিয়া যাবেন তিনি।

বলে না সিংহ দুই কদম পিছিয়ে গিয়েছে মানে সে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছে এমন না। ঠিক তেমনি তীব্রর নাটকের মানেটাও।সে দেখতে চেয়েছিলো কে কতটা জলে নামতে পারে।আর সিংহের মতো হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।তাইতো নিজেদের শিকারী ভাবা মানুষগুলো নিজেরাই শিকার হচ্ছে। জঙ্গলের রাজা যেমন সিংহ তেমনি মাফিয়াদের রাজা তীব্রকেই ধরতে হবে।

-“হ্যা হ্যা হ্যা আমি বুঝেছি।এতো চিন্তা করো না। টাইকুনের কিং আমিই।আমি সাপোর্ট দেবো।জাস্ট আমাকে বাংলাদেশ থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেও। এয়ার পোর্টে যেতে এখনো মিনিট ত্রিশের পথ।তারওপর জ্যাম লেগেছে।”(ক্যানিয়ন)

————

-“আরে তোমার ঢংয়ের কথা বন্ধ করো।এস.আর কি তোমার কথা জানে নাকি!জানে না তো।জানলে এখনো আস্তো থাকতে না তুমি।ও সিংহ, সিংহের মতো আক্রমণ করেছে। বাঁচতে চাইলে পিছনে না ফিরে পালাতে হবে আমাদের”(ক্যানিয়ন)

————

-“চুপ।সামনে থাকলে চড় মেরে তোমার গাল বেঁকিয়ে ফেলতাম।জীবনে তো অন্যের ওপর ডিপেন্ডেন্ট ছিলে।নিজের তো মুরদ ছিলো না।আমার খেয়ে আমার পড়ে আমাকে হুমকি দিচ্ছো।জানে মেরে ফেলবো”(ক্যানিয়ন)

———–

-“তুমি আমায় এস.আর এর ভয় দেখাতে পারো না।এস.আর আমাকে আংকেল ভেবে রেহাই দেবে। কিন্তু তুমি?তোমাকে কে বাঁচাবে “(ক্যানিয়ন)

ফোনে কারো সাথে ঝগড়া করেন আংকেল ক্যানিয়ন। ইংলিশ ভাষায়।ড্রাইভার বার দুয়েক পেছনে তাকায়।তবে ক্যানিয়নের হাতে বন্দুক দেখে আর ঘুরে না।তার পাশে বসা পুলিশ ইন্সপেক্টরও নিজ ফোনে ব্যস্ত।কিছু তো একটা করছে।হয়তো কাউকে কিছু বলছে/জানাচ্ছে।

৬৬.
তালুকদার বাড়ি আজ পুরো ফাঁকা।বাড়ির মানুষগুলো কই?মাহিন জানে না।সে পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে ফেলেছে।মাথা কাজ করছে না ওর।তখনই টিভি স্ক্রিনে ভেসে ওঠে কারো কন্ঠ।হ্যা হ্যা এতো নূরিয়ার কন্ঠ।।

-“আপনাদের ফ্যামিলিকে তুলে নিয়ে যাচ্ছি।যেদিন তূর্যয় ধরা দিবে সেদিনই ছাড়বো।নয়তো একটাকেও ছাড়বো না।ভালো চাইলে তূর্যয়কে আসতে বলুন”

রেকর্ডের ভিডিও ছিলো।মাহিনের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।পরশু তূর্যয়ের সত্য প্রকাশের পর সে আর ফেরেনি এখানে।গোলাম ফখরুলও তো অজান্তা কোথাও গেলো সেদিন তার ছেলে।

পরিবারের কথা চিন্তা করে বারকয়েক কল করে মাহিন তূর্যয়কে।না,নাম্বার বন্ধ।আর নূরিয়ার নাম্বার?নূরিয়ার নাম্বার তার কাছে নেই।দ্রুত দোতলায় গিয়ে তূর্যয়ের ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে সে।একটা ডাইরি পায়। গুটিকয়েক নাম্বার।আর কিছু সিডি লাগানো ছিলো।মাহিন নিচে চলে আসে দ্রুত।গাড়ি নিয়ে রেদওয়ান বাড়ির দিকে চলে যায়।

রান্নাঘরে কাঁপা কাঁপা হাতে রান্না করছে মেহের।দুপুরের লোমহর্ষক ঘটনার পর একটু পরপরই সে কেঁপে কেঁপে উঠছে।দুপুর পেরিয়ে বিকেল।দুপুরের খাওয়া দাওয়া হয়নি তাদের।জারিনও সাহায্য করছে ওকে।কত কিছুই বলছে, জিজ্ঞেস করছে তবে মেহের মুখের ভাষা হারিয়ে চুলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।কি ভাবছে একান্তই সেই জানে।

-“মেহের তুই ঠিক আছিস?”(জারিন)

মেহেরের কোনো জবাব নেই।জারিন হালকা করে ধাক্কা দিতেই ছিটকে দূরে সরে যায় মেহের।জারিনও ভয় পায়।জারিন প্রশ্ন করে,

-“কিরে কি হয়েছে?”(জারিন)

-“কিছু না”(মেহের)

-“তুই আমার থেকে লুকাতে পারবি না।আমি ঘর থেকে মানুষের চিৎকারের আওয়াজ শুনেছি”(জারিন)

-“আচ্ছা জারিন তুই কি পারবি একজন জেল ফেরত আসামীকে বিয়ে করতে?”(মেহের)

-“মানে?”(জারিন)

-“মানেটা খুব সহজ।সারিম,তীব্র জেলে যাবে খুব শীঘ্রই।”(মেহের)

-“কি আবোলতাবোল বকছিস তুই?তোর মাথা ঠিক আছে?”(জারিন)

-“আমিও নিজেকে এই প্রশ্ন করেই ক্লান্ত রে।আমি সত্যিই খুশি হতাম যদি আমার মাথা খারাপ হয়ে যেতো তাহলে। কিন্তু তা তো নয়। বরং আমার চোখের সামনে আমার ভালোবাসার মানুষটাকে জেলে যেতে হবে।তাও কার জন্য?আমার জন্য।মিস.হাইডের জন্য “(মেহের)

জারিন ইতিমধ্যে কাঁদতে শুরু করেছে।আর মেহের সে নির্বাক তাকিয়ে আছে।সে খুব করে চাচ্ছে আজ মৃত্যুকে। মৃত্যু তার নিকট শ্রেয়।একজন স্বামীর সুখের সাথী যেমন স্ত্রী তেমনি দুঃখের সাথীও তো হতে হয়।তবে মেহের তো তীব্রর ক্রাইম পার্টনার ছিলো না,তাহলে তাকে যে একাই শাস্তি পেতে হবে।আইনের চোখে তীব্র অপরাধী তবে আইনের বাইরে যে বিশাল এক সভ্যতা আছে সেখানে তীব্র উপযোগী নেতা,তার নেতৃত্বে পাপের শাস্তি একমাত্র মৃত্যু।

চলবে কি?

#দো_দিলে_জাহান
#পর্বঃ২০
#বর্ষা
৬৭.
এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে ক্যানিয়নকে কিডন্যাপ করেছে তীব্রর লোকেরা।তিনি হয়তো ভাবেননি যে তিনি যেমন টাকা দিয়ে মানুষ কিনতে পারে ঠিক তেমনি তীব্রও পারে।হয়তো এই ভাবনা তার ছিলোই না।পুলিশ ইন্সপেক্টরই ওকে সাহায্য করেছে।তীব্র একবার ওনার জীবন বাঁচিয়ে এক ছিনতাইকারীর হাত থেকে।তারপর থেকে যোগাযোগ।

এস.আর=সাফায়েত রেদওয়ান।তীব্রর নামের প্রথম অংশ দিয়েই সে মাফিয়া ওয়ার্ল্ডে পরিচিত তবে সর্ট ফর্মে। টাইকুন সাম্রাজ্য মাফিয়া ওয়ার্ল্ডের আতংক। সবচেয়ে সুবিশাল এবং শক্তিধর মাফিয়ারা সঙ্গে আছে এর।মাফিয়াদের মূলত মানুষ ভয় পেলেও দেশ-বিদেশে এই টাইকুন সাম্রাজ্যের সুনাম মূলত দুই কারণে।আপামর জনসাধারণের সহযোগিতাকারী এবং অন্যায়ের বিনষ্টকারী হিসেবে।তবে এ কাজ যে বিশাল সাম্রাজ্যের কয়েক মন্ত্রীর মাঝে একজনের।বাকি সব যে প্রতারক।এমনকি টাইকুন স্রষ্টাও।

মেহের আঠারো নিজের শারীরিক গঠন,মানসিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তার জোরে ইন্টেলিজেন্ট বিউরোতে জয়েন করার সুযোগ পায়। তবে বিশাল এক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর্যায় শেষে!নিজ প্রয়াসে এবং কেস সমাধানের জোরে আজ সে মিস.হাউড।

তো গল্পে আসি…

মাহিনের উপস্থিতিতে তীব্র-মেহের চমকায়।মাহিন নিজেও চমকায় জারিনকে এখানে দেখে।তবে এতো কিছুর ভাবার সময় এখন নেই।আগে পরিবারের কথা ভাবতে হবে!মাহিন মেহেরকে আড়ালে নিয়ে বলে ওঠে পরিবারের কথা। কেননা সেও জানে মেহের প্রশাসনের সদস্য।তবে মাহিন জানে যে সেই একমাত্র যে কিনা এ বিষয়ে অবগত।

তীব্র বোঝেনা ভাই-বোনের গুসুরফুসুরের বিষয়টা।তখনই ওর ফোন বেজে ওঠে।দুইটা সংবাদ পায় আর দুইটাই খারাপ খবর। প্রথমত ক্যানিয়নকে সজ্ঞানে তুলে আনেনি। পালানোর চেষ্টা করায় ক্লোরোফর্ম শুকিয়ে অজ্ঞান করা হয়েছে।জ্ঞান ফিরতে অনেক সময়।আর দ্বিতীয়টা তালুকদারদের তুলে নেওয়া হয়েছে।আর এমপির আত্মীয় হবার সুবিধা লুটেই এই কাজ করেছে নুরিয়া (ষোলো তম পর্বে ক্লিয়ার করা আছে)

-“মাহিন বাসার সবাইকে নাকি…..”(তীব্র)

ছুটে গিয়ে মাহিনকে জিজ্ঞেস করতে নেয় তীব্র।তবে বাসার কথা উঠতেই মাহিন বুঝে যায় কিডন্যাপ হওয়ার কথাই হয়তো তীব্র বলবে। কিন্তু সে কি করে জানে ঐই বিষয়টা বুঝতে পারেনা সে। তাইতো কথার মাঝেই প্রশ্ন করে বসে,

-“তুই কিভাবে জানলি?আমি তো তোকে বলিনি”

মেহের ধরা খাওয়াতে চায়না তীব্রকে।তাইতো ঝটপট মাহিনকে বলে ওঠে,

-“আরে বড়দা ভাই আমি তো ফোনে ওর সাথে ছিলাম।দেখোনি সেসময় আমি কথা বলছিলাম।”

-“ওহ..”

যদিও মাহিনের সন্দেহ যায় না তবে কিছু বলে না।তবে সেসময় ফোনে থাকলেও সে কারো সাথে কথা বলছিলো না। বরং ভয়েস শুনছিলো।কেমন যেন আওয়াজটা।মন শান্ত করা।তীব্রই দিয়েছিলো তাকে।আর নিচে লিখেছিলো,

-“সব ঝামেলা শেষ হোক একদিন যাবো এই মনোরম বাতাস বয় যেথায় সেথায় ”

মেহের জানে না তীব্র সব মূহূর্তকে কিভাবে নরমাল করে দেয়!তবে জানার তার বড্ড শখ। কিন্তু সেই শখ কি আর পূরণ হবে।নাবিন গ্রুপকে শেষ না করলেও দেশের মাঝে যে সে ক্রিমিনালগুলোকে খুন করেছে নির্মমভাবে।প্রমাণ নেই মেহেরের কাছে।তবে সে জানে।কেস সাঈদা এর জানোয়ারগুলো বেকাসুর খালাস হয়েছিলো।সবই টাকা আর ক্ষমতার দাপটে। কিন্তু তীব্র ছাড়েনি।নির্মমভাবে খুন করে রাস্তায় ফেলেছিলো।বড় বড় করে এক কাগজে লেখা ছিলো তারই পাশে।

-“নারী হলো সম্মানীয়।নারীকে সম্মান না করে তাদের প্রতি রাস্তার কীটদের মতো করে তাদের সম্মানে দাগ লাগালে শাস্তি তো পেতেই হবে এমন”

আরেকটা খুন হয়েছিলো দাউদ চৌধুরীর।খুবই নির্মম।ওম্যান ট্রেফিকিং এর সাথে যুক্তি ছিলেন তিনি।পুরান ঢাকার পুরনো ওক কুঠিবাড়িতেই গ্রাম থেকে আসা মেয়েদের চাকরির লোভ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো।তবে যারা একবার গিয়েছিলো সেখানে তারা আর ছাড়া পায়নি।তবে তীব্র সেই লোককে তো খুন করেই ছিলো। পাশাপাশি মেয়েগুলো বাঁচার জন্য অন্য শহরে পাঠিয়ে দিয়েছিলো।এ শহর যে বড্ড নির্মম! মেয়েগুলো তো সম্মান নিয়ে টিকতে পারতো না।লাশের সাথে কাগজ ছিলো।কাগজে লেখা ছিলো,

-“যেই পুরুষ নারী থেকে জন্মে নারীকে ব্যবসার পণ্য মনে করে,সেই পুরুষের আমার চোখে বেঁচে থাকার অধিকার নেই”

মেহের আর ভাবে না।সে এখন তালুকদার বাড়ি নিয়ে ভাবতে চায়। পরিবারের মানুষগুলোর আজ এই দশা একমাত্র ওই হারামী তূর্যয়ের জন্যে।নিজে তো লুকিয়ে আছে কোন খুয়ারের ভেতরে।আর পরিবারের মানুষেরা সাফার করছে।

-“বড়দা ভাই তুমি ভেবো না।মাথা ঠান্ডা করো।প্লিজ মাথা ঠান্ডা করো। তুমি অতিরিক্ত চিন্তা করলে তোমার প্রেশার ফল করে। তুমি বসো আমি দেখছি”(মেহের)

-“হ্যা মাহিন তুই একটু বিশ্রাম নে।আমি আর মেহের দেখছি বিষয়টা”(তীব্র)

মাহিন সোফায় বসে পড়েছে।ওর বড্ড খারাপ লাগছে।এতোটা খারাপ লাগছে বলে বোঝাতে পারবে না সে।তাইতো মাথা ঝুঁকিয়ে বসে থাকে।মেহেরের পিছু গিয়ে ওর বাহু ধরে আটকে নেয় তীব্র। জিজ্ঞেস করে,

-“কোথায় যাচ্ছো?”

-“শোনোনি আমার পরিবারকে কিডন্যাপ করা হয়েছে?আমি ওদের ছাড়াতে যাচ্ছি”(মেহের)

-“তুমি আস্তো একটা গাধা।নূরিয়া কি কিছু না ভেবেই এমন করেছে?ওর আংকেল এমপি।ওনার দাপট কাজে লাগিয়ে এমনটা করেছে।বিষয়টা আমি দেখছি।তোমার ঢুকতে হবে না।আমার সাথে চলো”(তীব্র)

-“কোথায়?”(মেহের)

-“আংকেল ক্যানিয়নকে গ্রেফতার করবা না?”(তীব্র)

-“গ্রেফতার করলে ক্ষমতা বলে ছুটে যাবে।ইনকাউন্টার করে লাশ ঘরে পাঠাবো”(মেহের)

-“দীর্ঘদিন একসাথে থাকলে নাকি স্বামী-স্ত্রীর মেন্টালি একরকম হয়ে যায়। তুমি তো জাস্ট একমাসেই আমার মতো হয়ে গেছো।আই প্রাউড অফ ইউ।বাট সেদিন তোমার আংকেলের সাথে কি কথা হয়েছিলো?”(তীব্র)

মেহের মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা।যেদিন শর্তের বিয়ে করে দু’জন একে অপরের সাথে বাঁধা হবার পর মেহের কথা বলেছিলো আংকেল ক্যানিয়নের সাথে।মেহের তো চেয়েছিলো আংকেল ক্যানিয়ন যেন এই মৃত্যুর খেলা বন্ধ করায়।তখন তো আর সে জানতো না তীব্র এই জানো**গুলোকে মারছে।এখন ওর মনে হচ্ছে যা করেছে বেশ ভালোই করেছে।এরা যে সমাজের জন্য ক্ষতিকারক, বিষধর!

-“আংকেলকে বলেছিলাম এই মৃত্যুর খেলা বন্ধ করতে।তবে এখন মনে হচ্ছে ওইগুলো ঠিকই ছিলো। পৃথিবীর বোঝ বাড়তো শুধু ওদের ভরে।এর চেয়ে বেশি কিছুই হতো না।হতো আরেকটা জিনিস।তা হলো অপরাধ বাড়তো, অপরাধী বাড়তো”

৬৮.
তীব্র মেহেরকে নিয়েই গোডাউন ঘরে এসেছে। আংকেল ক্যানিয়ন অজ্ঞান।গরম পানি ঢেলে দিতেই লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন আংকেল ক্যানিয়ন।তবে রশিতে বাঁধা থাকায় উঠতে পারেন না।চিৎকার করতে থাকেন।চামড়া যেন ঝলসে যাচ্ছে।একেক জায়গায় মুহূর্তেই ঠোসা পড়ে গেছে।

-“এস.আর প্লিজ লিভ মি।ডন্ট ডু দেট।প্লিজ এস.আর প্লিজ। প্লিজ গিফ মি লাস্ট চান্স ”

আকুতি মিনতি করছেন আংকেল ক্যানিয়ন।তবে ছাড়বার পাত্র তীব্র নয়।এই লোকটা ভালো মানুষীর মুখের আড়ালে অনেক অনেক মানুষের প্রাণের বিসর্জন দিয়েছেন। কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন।সবই তো হারামের।আর তিনি কি বলতেন?”তীব্র এইসব হচ্ছে আমার ব্যবসার থেকে আয়।”তীব্র জানতো না তার কি ব্যবসা।বিশ্বাস করতো বলে আগ্রহও দেখায়নি।তবে কে জানতো বিশ্বাস করেই ঠকবে সে!

আজ থেকে সপ্তাহ দুই আগে সে সব জেনে ছিলো।তবে কাউকে বুঝতে দেয়নি।সে ভেঙে পড়েছিলো তবে বাইরে থেকে কেউ আন্দাজ করতে পারেনি।এমনকি মেহেরও পারিনি।তীব্র হেসে খেলেছে।নিজেকে পুরোপুরি আবৃত করে রাখতে জানে সে।

-“আংকেল ক্যানিয়ন আপনাকে এই আমি দুইটা চান্স দিবো।প্রথমত আপনার আজ অব্দি করা প্রত্যেকটা ক্রাইমের স্বীকারোক্তি করে আপনি এখান থেকে দৌড়ে পালাতে পারেন।আর দ্বিতীয়ত গরম কয়লার মাঝে আপনাকে ফেলে দেওয়া হবে।চয়েস ইজ ইয়োরস”(তীব্র)

আংকেল ক্যানিয়ন আঁতকে ওঠে।তবে প্রথম শর্তে রাজি হয় প্রাণের ভয়ে। তাদের মাফিয়াদের নিয়ম।কথা দিয়ে কথা রাখা।তীব্র এই নিয়ম খুব ভালো করেই মানে।তাইতো জীবন বাঁচাতে গুণাহ স্বীকারে রাজি সে।রেকর্ডারে সব রেকর্ড করে নেয় ওরা।ছেড়ে দেয় আংকেল ক্যানিয়নকে।সারাদেহে ঠোসা পড়ে যাওয়ায় খোড়াতে খোড়াতে দৌড়ায় সে।

-“তীব্র উনি একজন ক্রিমিনাল।তুমি ওনায় ছেড়ে দিলে?”(মেহের)

-“না,না বউজান।তোমার তো ইচ্ছে ছিলো ইনকাউন্টার করার।তো করে ফেলো।প্রমাণ আছে।আর আসামী ফারার হতে নেওয়ায় তুমি গুলি চালিয়েছো।কেস ক্লসড”(তীব্র)

মেহেরকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুটি করে তীব্র।দেখে আংকেল ক্যানিয়ন গোডাউনের শেষ অব্দি পৌঁছে গেছেন। তাইতো হুট করে মেহের হাতে বন্দুক ধরিয়ে ট্রিগারে আঙ্গুল চাপ দেয় সে।মেহেরের হাতে শেষ হয়ে যায় এক ক্রিমিনালের চ্যাপ্টার।একবারে মাথায় লেগেছে গুলিটা। বাঁচার সম্ভাবনা শূন্য।

৬৯.
নূরিয়ার আংকেল বেশ চটেছেন।নূরিয়াকে বেশ অপদস্থ করে তালুকদার বাড়ির সবার কাছে মাফ চেয়ে নিজ দায়িত্বে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছেন।এমপি হলেও কি ভয় তো তাদের সেই মাফিয়াতেই আটকে।তাইতো এস.আর এর ফোনে কাপাকাপি তার।নিজে এসে তালুকদারদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং ঘুমন্ত অবস্থাতেই বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে জায়িন,মোয়াজকে।হাই ডোজের ঔষধ দিয়ে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছিলো ওদের।

আসার আগে তৃষ্ণা উকালতি ভাষায় অনেক কথা বলেছে। তবে এমপি ভয়ে তবুও মুখ বন্ধ রেখেছে।প্রতিটা কথায় ক্ষমা চেয়েছে।আর নূরিয়া সে তো ভয়ে চুপ করে আছে। ইতিমধ্যে গাড়ি বেরিয়ে পড়েছে তালুকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে।আর এদিকে নূরিয়া তো ভয়ে ভয়েই আংকেলের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,

-“আংকেল তুমি আমায় মারলে?তাও আবার ওই থার্ড ক্লাস পরিবারের জন্য!যারা নিজেরাই আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাদের জন্য!তুমি কি তাদের ভয় পাও?”

-“নূর (নূরিয়া থেকে নূর আদর করে)!আমি এইসব ছোটখাটো পরিবারকে ভয় পাই না।আর তোমার কি কোনো কাজ নেই?ফ্যাসাদ বাজিয়েছো তাও আবার কার সাথে?এস.আর এর পরিচিতদেরও সাথে।মুর্খ মেয়ে”(এমপি আংকেল)

-“এস.আর কে আংকেল?”(নূরিয়া)

-“এক আতংক “(এমপি আংকেল)

এমপি মনে করতে থাকেন আজকের ঘটনা।বিকেল বেলা হুট করে ফোন দিলো এস.আর।কোনো কথাবার্তা না বলে সরাসরি বললো,”সৎ পথে চলো ভালো লাগে।তাই বলে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে মানুষদের কিডন্যাপ করা,সমাজে ভয়ের সৃষ্টি করা কিন্তু আমার মোটেও পছন্দের না। তাড়াতাড়ি তালুকদারদের ছাড়িয়ে সসম্মানে বাড়ি পাঠাও”কল কেটে যায়।এমপি যেন কিছুই বোঝেন না।কিঞ্চিত সময় বেয়ে পি.এ কে খোজ লাগাতে বলেন।নূরিয়ার করা কিডন্যাপের বিষয় সামনে আসতেই তিনি ছুটে আসেন এখানে।

৭০.
মুহিব আর তোয়ার বিয়ের পরপরই যেতে হয়েছে কোরিয়াতে।মুহিবের চাকরির সূত্রে।তাইতো পরিবারের ওপর এতো ঝড় ঝাপটা যাওয়ার পরও আসতে পারেনি এখানে।মুহিব সামলে নিয়েছে নিজের প্রিয়তমাকে। ভার্সিটিতে এডমিশন করিয়ে দিয়েছে। অবশ্য তোয়া ভালো শিক্ষার্থী হওয়ায় স্কলারশিপে আবেদন করলে নিশ্চিত পাবে বলেই ধারণা মুহিবের।

এই দেশগুলো যত উন্নত।তত খরচও।যদিও মুহিবের ইনকামে ওরা ঠিক চলতে পারতো।তবে তোয়া চায়নি এভাবে চলতে।তার ইচ্ছা একটু একটু করে ভবিষ্যতের জন্য গড়ে রাখা। ভবিষ্যৎ বাচ্চা-কাচ্চাদের ব্যাপারেও তো ভাবতে হবে নাকি।তাইতো পার্টটাইম জব খুঁজছে সে।তাইতো প্রতিদিন একই সাথে বের হয়।তবে ফেরে আলাদা সময়ে।তোয়া আগে আর মুহিব পরে।

-“এইযে মিসেস কি করছেন?”(মুহিব)

মুহিব ফিরেছে দেখে হাসে তোয়া।লোকটা এমনই।কি কার্ড দিয়েই দরজা খুলে ভেতরে আসে।প্রতিদিন সারপ্রাইজ দেয় ওকে।প্রথম কয়েকদিন বেচারি বেশ ভয় পেয়েছিলো।তবে এখন অভ্যাস হয়ে গেছে।দুষ্টু মিষ্টি সংসার চলছে ওদের।

ভাবা যায় গ্যামোফোবিয়ায় আক্রায় তোয়া এতো ভালো সংসার সামলে বাইরেও কাজ, পড়াশোনা সব সামলে নিচ্ছে।হ্যা ভাবা যায়।তবে কঠোর পরিশ্রম লাগে এতে।তোয়ার মাঝে যা আছে।আর তাছাড়া তার ভালোবাসা তাকে সংসারের সাথে বেঁধেছে।বিয়ে তাকে বেঁধেছে মুহিবের সাথে। একজন অপরজনের অর্ধাঙ্গ, অর্ধাঙ্গিনীর পরিচয় পেয়েছে। ভালোবেসে গুছিয়ে নিয়েছে নিজেদের সংসার।বিয়ের বয়স কিন্তু খুব বেশি না।মাসও পূরণ হয়নি ওদের।তবুও ভালো আছে ওরা।ভাগ্যিস না পেয়ে আফসোস করতে হচ্ছে না।

চলবে কি?