দো দিলে জাহান পর্ব-২৪+২৫

0
84

#দো_দিলে_জাহান
#পর্বঃ২৪
#বর্ষা
৭৮.
মেহেরের হাসি মনে হয়না আজ আর থামবে।হলুদের রাত থেকে তীব্র সামনে আসলেই সে হাসছে।আর বেচারা একটু পর পর ওর কাছে এসে কি যেন বলে যাচ্ছে।তার ‘র’ও হয়তো শুনছে না মেহের।তাইতো তীব্র বেজায় চটেছে।

বাড়ির মানুষ হওয়ায় বাড়ির আত্মীয়দের দেখভাল, খাওয়া-দাওয়ার দিকটা দেখতে হচ্ছে ওদের সবাইকেই।মেহেরের সাহায্য করছে তৃষ্ণা আর মারিয়াম।তীব্রর হুটহাট এসে মেহেরকে কিছু বলে যাওয়া দেখে তারা ভাবছে আসলে তীব্র বলছেটা কি!

-”এই মেহের”(তৃষ্ণা)

-“বলো ভাবী”(মেহের)

-“আরে আমি বলছি।এই তীব্র ভাইয়া এভাবে এসে তাড়াহুড়োতে তোমায় কি বলছে?”(মারিয়াম)

মেহেরের মনে পড়ে যায় কালরাতের ঘটনা।বাসায় ফিরে সবার সাথে দেখা করে রুমে যেতে ওর প্রায় একটা বেজেই গিয়েছিলো।তীব্র মাত্র ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে।ছেলেটার আক্কেল জ্ঞান কম।তাইতো রুমের দরজা খুলে রেখে গোসলে গিয়েছিলো।এইযে মেহের হুট করে ঢুকে পড়লো অন্যকেউও তো আসতে পারতো।এই বাড়িভর্তি মেহমানদের মাঝে একটুও সচেতন না এই ছেলে।

-“এই যে এতো কি ভাবছো?যাও দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আসো।কি সেজেছো পুরাই পেত্নি লাগছে”(তীব্র)

মেহের যদিও কিছু বলতে চেয়েছিলো তীব্র কথা শুনে আর বলেনা।এমিনতেই বড্ড ক্লান্ত লাগছে তার।ফ্রেশ হয়ে এসে একটু রেস্ট নেওয়াই ঠিক হবে।কালকে তো আরো ধকল আছে।ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসতেই তীব্র বলে ওঠে,

-“কাল তুমি মেয়ের বাড়ি যাবে না।কাল কেন পরশু যখন মেয়ের ফিরানি হবে তখনও যাবে না”

-“কেন?”(মেহের)

-“অকালে বউ বিয়ে দিয়ে আমি সতিনের ঘর করতে চাইনা “(তীব্র)

মেহের হেসে দেয় তীব্র কথা শুনে।তাইতো হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করে,

-“তা মহাশয় ছেলেদের কি সতিন হয়?আর জারিনের বাড়ি গেলে আপনার সতিন আসবে কোথা থেকে”

তীব্র ওই আন্টির কথাগুলো খুলে বলে মেহেরকে।সেই থেকে যে হাসি শুরু করেছে মেহের!ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বেচারি হেসেছে আর বলেছে,

-“আমার মহাশয় দেখি তার সতিনের মায়ের সাথে দেখাও করেছে!হা হা হা”

মেহেরকে আবারো হাসতে দেখে ধাক্কা মারতে বেচারী ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে।আর হাসতে হাসতে নিজের দুই ভাবীকে সব বলে।তারাও হাসতে থাকে। তৃষ্ণা আর মারিয়াম তো ভাবতেই পারছে না স্বামীর কাছে নাকি স্ত্রীর বিয়ের প্রস্তাব আসে কখনো!তারা তো হেসেই চলেছে।কাজ করবে আর কখন।

৭৯.
ছেলের সাথে বাড়ির কয়েকজন আর ছেলের বন্ধু-বান্ধব পাঁচজন যাবে।আর বাকি সবার জন্য রেদওয়ান বাড়িতেই খাবারের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। মেয়েপক্ষের ওপর এতো চাপ ফেলানোর কোনো ইচ্ছা ছিলো না ওনাদের। আগেই মেয়ের বাবার হাতে হাত রেখে সাফিন রেদওয়ানের ছোট ভাই বলে দিয়েছে

-“ভাইসাব আমরা মেনে নিতে আসবো খুব অল্প কয়জন।এই ধরুন বিশজন।এর একজন বেশিও না,আবার কমও না।”

দুই মাইক্রো প্রাইভেট কার ভাড়া করা হয়েছে আটজন করে দুই গাড়িতে যাবে।আর বাকি চারজন বরের গাড়িতে যাবে।যখন গাড়িতে ওঠার সময় হলো তীব্র মেহেরকে উঠতে দেবে না।আর না উঠবে সে নিজে।তার ইচ্ছা নেই সেখানে যাওয়ার।ঠিক করেছে সারিমের বিয়ের পরপরই মেহেরের নাক ছিদ্র করবে।নাকফুল পড়াবে।যাতে মানুষ একটু হলেও বোঝে তার বউটা বিবাহিত।

-“কিরে তুই উঠছিস না কেন?আর আমার মেহেরকেই উঠতে দিচ্ছিস না কেন?”(সারিম)

-“এক চড় দিয়ে তোর দাঁত ফালাবো।বিয়ে করতে যাচ্ছিস যা বিয়ে করে আয়।আর আমার বউকে তুই তোর বলবি না।বলবি ভাবী।”

মেহের খুব বুঝেছে তার মহাশয় তার ওপর রাগ দেখাতে না পেরে বেচারা সারিমের ওপর লাগ দেখাচ্ছে।সাফিন রেদওয়ান ছেলের পিঠে হালকা থাপ্পর মেরে বলে,

-“কি হয়েছে,গাড়িতে উঠছো না কেন?”

-“আব্বু আমি আর মেহের যাচ্ছি না”(তীব্র)

-“তুমি যাচ্ছো না ভালো কথা।আমার মেহের মাকে আটকাচ্ছো কেন?আম্মু তুমি যেতে চাও?”(সাফিন রেদওয়ান)

মেহের হ্যা সূচক মাথা নাড়তেই সাফিন রেদওয়ান ওকে গাড়িতে উঠতে বলে।এখন আর তীব্র কি করবে!বেচারা সেও গাড়িতে উঠতে নিলে সাফিন রেদওয়ান বলে ওঠে,

-“তুমি না যাবে না..?”

-“তোমার বঊ নিয়ে টানাটানি হলে বুঝতা।”(তীব্র)

সাফিন রেদওয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।সে জিজ্ঞেস করলো কি আর ছেলে উত্তর দিলো কি!তার অবাকতা না কাটিয়েই চলে যায় বরের গাড়ি।আর তার পেছন পেছন যায় আত্মীয়দের গাড়ি দুটো।

সারিমের পাশে বসেছে তীব্র।আর তার পাশে মেহের বসেছে রুহানকে কোলে নিয়ে।আর সামনে তুষার,সাথে সারিমের দুলাভাই ওয়াহেদ চৌধুরী।দুষ্টামি-ফাজলামি করতে করতে সবাই পৌছে যায় মেয়ের বাড়ি।আজ যেন মানুষের সংখ্যা আরো বেশি।বেশ কিছুক্ষণ দরকষাকষি হবার পর গেট দিয়ে ঢোকে ওরা।এই পক্ষে আত্মীয়-স্বজন অনেকজন।

-“তীব্র কি হচ্ছেটা কি?”(মেহের)

-“কই,কি হচ্ছে?”(তীব্র)

-“তুমি আমার পিছে পিছে আসছো কেন?”(মেহের)

-“আমার বউয়ের পিছে আমি আসছি তাতে তোমার কি?”(তীব্র)

মেহের আর ঘাঁটায় না।যদিও একটু ঝগড়া করার ইচ্ছা ছিলো তার।তবে বেশি ঘাটালে এখানে না সিনক্রিয়েট হয়!এমনও হতে পারে তার গুণধর স্বামী তাকে পাঁজাকোলা করে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাবে এখনই।সেই ভয়ে চুপচাপ হাঁটতে থাকে মেহের।জারিনকে দেখে একটু এদিক-সেদিক ঘুরঘুর করে।আর তীব্র আঠার মতো ওর সাথে লেগে থাকে।

-“কি ভাইয়া আমাদের ননদকে একটু আমাদের সাথেও ছাড়ো।তুমিই দেখছি সেই থেকে ওর সাথে সাথে ঘুরছো”(তৃষ্ণা)

-“কি করবো বলেন!এই মহাদয়ার সাথেই তো সারাজীবনের দীর্ঘপথ হাঁটব। এইটুকুন পথ আর বেশি নাকি”(তীব্র)

-“ভাই সত্যিই তুমি দেখছি আমার বোনের পাগল হয়ে গেছে।আমরা এসেছি দেখেও ভাও দিচ্ছো না “(মোয়াজ)

-“বউয়ের সাথে তো তুইও ঘুরছিস।হাত ধরে যে এদিক গেছিস আমিও দেখেছি।”(তীব্র)

-“তীব্র তুমি এখন যাও।আমি ছোটদা ভাই আর ভাবীর সাথে আছি”(মেহের)

-“হুম থাকো।তেরিংবেরিং করতে দেখলে খবর আছে।একটু সারিমের ওখান থেকে আসি”(তীব্র)

তীব্র যেতেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে মেহের।মোয়াজ বোনকে ক্ষেপাতে থাকে।আর মেহেরও কম নাকি সেও তার ছোটদা ভাইকে ক্ষেপাচ্ছে।আর এদিকে দুই ভাই-বোনের কথা শুনে লজ্জায় লাল হচ্ছে তৃষ্ণা।

-“এই তোমরা দুজন থামবে?কিসব বলছো সবাই আড়চোখে দেখছে”(তৃষ্ণা)

-“দেখলে দেখুক আমাদের কি”(মোয়াজ)

-“আচ্ছা ভাবী আমি কিন্তু থেমেছি ছোটদা ভাইকে থামাও “(মেহের)

মেহের এদিক-ওদিক দেখে।সুদূরে দেখা যাচ্ছে মাহিন ভাইকে।তাইতো ওদের থেকে বিদায় নিয়ে সেদিকে ছোটে।মারিয়ামের উপস্থিতিও আছে এখানে। দুইজন ডাক্তার হলে যা হয় আরকি।এখানে তাদের পরিচিত রোগীরাও আছে।এখন তাদের সাথেই বকবক করছে দুইজন।মেহের বোঝে এখানে কথা বলা ঠিক হবে না। তাই ম্যাসেজে আজ রাতে ছাদে আসার কথা বলে জারিনের কাছে চলে যায়।

৮০.
বিয়ে পড়ানো শুরু হবে।স্টেজে বউকে আনতে বলা হয়েছে।সারিম বেচারা রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে।এখন তার শুধু হাসিই পাচ্ছে।এই খুশি তো প্রিয় মানুষকে নিজের করে পাবার আনন্দে।মেহের এখন মেয়ে পক্ষের হয়ে জারিনকে সঙ্গে এনেছে।মোটা অংকের চাঁদা চেয়ে বসেছে সারিমের কাছে।সারিম বেচারা হতভাগ।তার কি ভাগ্য তার ভাবীই এখন মেয়ে পক্ষের হয়ে চাঁদা চাচ্ছে।

-“মেহের একটু ছাড় দে।এতো চাস কেন?”(সারিম)

-“দেখেছো আমরা কতজন?কম দিলে কি হবে নাকি! তাড়াতাড়ি বের কর নয়তো বউকে আড় দেখাবো না।ঘরে নিয়ে গেলাম।”(মেহের)

-“আচ্ছা দাঁড়া।এই নে দুইহাজার আর নাটক করিস না বোন”(সারিম)

-“তুমি আমার দেবর দেখে আর বাড়ালাম না।আচ্ছা এই যে আপুরা বউকে নিয়ে এসে বসাও”(মেহের)

তীব্র ফোনে কথা বলতে একটু বাইরের দিকে গিয়েছিলো।বিয়ে পড়ানোর পরপরই ওরা খেতে বসবে। এখনো বসেনি।ফোনে কথা বলা শেষ করে ভেতরে আসতে নিলেই মেহেরকে সারিমের ওখানে দেখে চমকায় সে।এই মেয়েটার তিড়িং বিড়িং না করলে যেন চলেই না।

পথিমধ্যে তার রাগটা আরো বাড়ে। দুইজন মহিলা কথা বলছে মেহেরকে নিয়েই। গাঢ় কালোর ওপর সোনালি কারুকাজ করা কাতান পড়েছে সে।সাথে আছে হিজাব। অনেক সুন্দর লাগছে ওকে।আর তীব্র কালো সুট পড়েছে।মহিলা দুটির কথোপকথন এমন যে,,,

-“বরের পাশের মেয়েটা সুন্দর আছে।কি মিষ্টি ভাষী!ইশ একটা ছেলে থাকলে মেয়েটার বাসায় প্রস্তাব দিতাম।”

-“আর কিছুদিন আগে দেখলে তো আমার বাবুর বিয়েটা ওর সাথেই দিতাম।এই মেয়েকে বউমাকে করে পেলে যেন ভাগ্য খুলে যেতো”

আর শোনার ইচ্ছা নেই তীব্রর।তার তো রাগ উঠছে কেন তার বউয়ের পেছনেই সবাই পড়েছে।রাগে ফুঁসছে সে।আর তীব্রকে রাগতে দেখে মাহিন ওর দিকে এগিয়ে আসে।তীব্রর কাছে মেহের জন্য প্রস্তাব আসার বিষয়টা মারিয়াম তাকে বলেছে।বেচারাও কিছুক্ষণ হেসেছে।

-“কিরে এভাবে ফুসফুস করছিস কেন?কোনো সমস্যা এসে পড়েছে নাকি?”(মাহিন)

-“না, সমস্যা তো আমার সাথেই থাকে।এ আবার আসবে কোথা থেকে!”(তীব্র)

-“কি সমস্যা হয়েছে?”(মাহিন)

-“তোর সুন্দরী বোনকে সবার মনে ধরেছে এখানে।আফসোস করছে তোর বোনকে নিজের ছেলের সাথে বিয়ে দিতে না পারায়”(তীব্র)

-“দেখেছিস আমার বোনকে কত মানুষ পছন্দ করে।তোর তো খুশি হওয়া উচিত তোর বউকে এতো মানুষ পছন্দ করে দেখে”(মাহিন)

-“তোর বউয়ের ওপর ওনাদের নজর পড়লে পরে বুঝবা ভাই।ওই দেখ মারিয়াম ভাবীর দিকে তাকিয়ে কি যেন বলছে”(তীব্র)

মাহিনকে চেঁতাতে এমন করে তীব্র।যদিও ওনারা মারিয়াম নিয়ে নয় বরং ডেকোরেশন নিয়ে আলোচনা করছিলো তবে মাহিনের মনে হয় হয়তো ওনারা ওর বউকে নিয়েই আলোচনা করছে।বুকের ভেতর ওর ছ্যাত করে ওঠে। ছুটে গিয়ে মানুষের মাঝেই বউয়ের হাত ধরে ফেলে।মারিয়াম যেন অবাক হয়।এই ছেলেই তো তাকে একটু দূরত্ব রাখ বলেছিলো এখানে।আর এখন?এখন নিজেই হাত ধরেছে।

চলবে কি?

#দো_দিলে_জাহান
#পর্বঃ২৫
#বর্ষা
৮১.
সারিমের বিয়ের পর গত হয়েছে দুইদিন।এই দুইদিন আনন্দ মুখর কাটলেও আজকের ভোর যেন শহরের বুকে চাপা আর্তনাদের।তূর্যয়ের লাশ পাওয়া গেছে!তীব্র হতভাগ।সে তো জানতোই না তূর্যয়ের অবস্থান কোথায়।তাহলে কে মারলো তাকে?ছোট থেকেই তূর্যয়ের বেড়ে ওঠা তালুকদার বাড়িতে।এখন যেন শোকসভা চলছে সেখানে। অবশ্য সবার সন্দেহ নূরিয়ার ওপর পড়লেও কেউ কিছুই করতে পারছে না প্রমাণ বিহীন।মুখের বুলিতেই শুধু দোষারোপ করে চলেছে মায়া বেগম।

লাশ হস্তান্তরের ঘটনায় ফরেন্সিকে কাটাকাটির বিষয় পেরিয়ে তারপর বাড়ির মানুষের হাতে দেওয়ার নিয়ম বডি।তারপর না দাফন কার্য সম্পাদন করা হয়।তবে এরকম যেন কিছুই ঘটলো না এক্ষেত্রে। পুলিশের লোকেরা বডি দিয়ে গিয়েই যেন শান্ত।আর মিডিয়ার লোকেরা জেনেও যেন জানছে না তালুকদার বাড়ির খবর।যেই মিডিয়া সবসময় মুখিয়ে থাকে নতুন সংবাদের জন্য তারা নাকি শান্ত!

-“আমার পুলাডারে তুমি মারছো। তুমি আমার পোলার দোষী।একটু শাসন করতে দেও নাই।আজ শাসন করলে আমার পুলা আমারই থাকতো,জীবিত থাকতো”

গোলাম ফখরুলের কলার ধরে চিৎকার করে কাঁদছেন মায়া বেগম।নাড়ি ছেঁড়া ধনের এ দশা যেন তার সহ্যের বাইরে।অদূরেই নিরব অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে তানিয়া। তূর্যয়ের একমাত্র বড়বোন।তবে পরিবার তাকে ত্যাজ্য করেছে অনেক আগেই।কারণ ছিলো পড়াশোনার তাগিদে বিদেশ যেতে চাওয়া।শর্ত ছিলো হয় বিদেশ গিয়ে ত্যাজ্য হও নয়তো দেশে থেকে বিয়ে করে সংসার করে সুখী হও। ভাগ্যিস তানিয়ার সাহস ছিলো।তাইতো আজ সে মস্ত বড় বিজ্ঞানী।নাসাতে গবেষণা করছে।

-“মা তোমার ছেলে এই ইহকালে ভালো ছিলো না যে তার জন্য এভাবে কাঁদছো!ওর বউকে খবর দিয়েছো যে ওর স্বামী মারা গেছে?তোমার ছেলে খারাপ হলেও কারো স্বামী এখন সে।তাই খবর দেওয়া প্রয়োজন”

গোলাম ফখরুল মারতে আসেন তানিয়াকে।বরাবরই মেয়ে তার কাছে খেলার পুতুলের মতো।তাইতো প্রথম সন্তান মেয়ে হওয়ায় বড্ড অসন্তোষ ছিলেন তিনি।আর যখন বিদেশ গেলো তখন থেকে তো পুরোপুরি ঘৃণা করেন মেয়েকে। আধুনিক সভ্যতাতেও মানুষ ছেলে-মেয়েতে ভেদাভেদ করছে,শর্ত দিচ্ছে, ঘৃণা করছে!

-“ভুল করবেন না আংকেল।তানিয়া আপনার মেয়ে হতে পারে তবে এখন সে আমার স্ত্রী,আমার সন্তানদের মা।আমি তাকে আঘাত করতে দিবো না সে ওর বাবা কিংবা মা’ই হোক না কেন”

বিদেশী ধাঁচের ছেলেটার এতো সুন্দর বাংলা দেখে উপস্থিত সবাই চমকায়।এখানে কাঁদছে গুটিকয়েক মানুষ।আর সবার চোখে মুখে সমবেদনা ছাড়া আর কিছুই নেই।যা ঘৃণা ছিলো তা ভুলার চেষ্টা করছে।মা তো আর ঘৃণা করতে পারে না তাই এভাবে কাঁদছে।

তানিয়া মেহেরের কাছে আসে।মেহের যে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো তূর্যয়ের লাশের দিকে। চোখে মুখে তার অবাকতা।মেহের যখন বছর দশের তখন বাড়ি ছেড়েছিলো তানিয়া।তখন সে একুশ বছরের তরুণী।আর আজ দশবছর পর আবারো দেশে তানিয়া।

-“নূরিয়াকে কল দেওয়া উচিত”(তানিয়া)

-“জি আপু।আমি এক্ষুনি জানাচ্ছি”(মেহের)

মেহের সেখানে দাঁড়িয়েই ফোন দিতে নেয় নূরিয়াকে।তবে ওপাশ থেকেই ফোন আসে।খবর দেয় কিছু।তাদের থেকে পাওয়া খবর শুনে হতবাক হয়ে যায় সে।নূরিয়া প্রেগন্যান্ট। ছয়মাসের সংসার ছিলো নূরিয়া-তূর্যয়ের।যার একমাসই তূর্যয় পলাতক ছিলো।আর নূরিয়া তিন মাসের প্রেগন্যান্ট এখন। অর্থাৎ বাচ্চাটা তূর্যয়ের।আজকেই টেস্ট করিয়েছিলো সে।কাউকে ফোনে না পেয়ে শেষমেশ মেহেরকে কল দিয়েছে।

-“আই হ্যাভ অ্যা নিউজ ফর ইউ অলসো”(মেহের)

-“আমার সংবাদের থেকে ভালো সংবাদ নিশ্চয়ই না।আমার তূর্যয় জানতে পারলে নিশ্চিত বাকিদের ভুলে আমার কাছে ফিরে আসবে”(নূরিয়া)

মেহের শেষ কয়দিন উপলব্ধি করেছিলো তূর্যয়কে নূরিয়া ছাড়া কেউ ভালোবাসতে পারবে না।ওর মতো ঠেটা মেয়েই পারবে তূর্যয়কে ঠিক রাখতে।তবে এর মাঝেই কি থেকে যে কি হয়ে গেলো কিছুই মাথায় আসছে না মেহেরের।কিভাবে জানাবে সে ওকে!ওকে জানানো তো ঠিক না এই অবস্থায়।

-“ভাবী আপনার পাশে বড় কেউ থাকলে একটু ফোনটা দিবেন”(মেহের)

-“কেন কি হয়েছে?আমার তূর্যয় ঠিক আছে তো?”(নূরিয়া)

-“প্লিজ একটু বড় কাউকে দিন।কথা ছিলো”(মেহের

-“এই নেও মাম্মামের সাথে কথা বলো”(নূরিয়া)

নূরিয়ার মা হাইকোর্টের উকিল।পাওয়ার আছে আলাদা।তবে মেয়ের মতো পাওয়ারের অপব্যবহার করেননি তিনি।মেয়েকে ঠিকঠাক সময় দিতে পারেননি কখনো।কাজের লোকদের হাতেই বড় হওয়া নূরিয়া আর নওশিনের। তাইতো বখে গেছে দুইজনেই।তূর্যয়ের অবস্থা বলতে নূরিয়ার মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠেন,

-“নূরিয়া আসবে।হ্যাঁ,নূরিয়া আসবে।ওর শাশুড়িকে আগে শান্ত করো।আমার মেয়েকে যেন উত্তেজিত না করে।জানো তো নূরিয়ার হেল্থ কন্ডিশন”

মেহের কল রেখে তানিয়াকে সব বলে।তানিয়ার চোখে মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে ওঠে।দূরে দাঁড়ানো আরিয়ানের দিকে তাকায়। তাদের মেয়েরা আনিশা,আনায়া দুইজনেই বাবার কোলে।তানিয়ার হঠাৎ করে খারাপ লাগতে লাগে।তার ভাইটা নিজের ভবিষ্যৎ সন্তান না দেখেই পরলোক গমন করলো!

৮২.
তীব্রর সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেহের।আজকের কিছু রহস্যজনক ঘটনা সে উপস্থাপন করছে ওরই সামনে।তীব্র মন দিয়ে শুনছে।তার আগে থেকেই সন্দেহ ছিলো মাহিনের বাবা সেজে আসা লোকটার ওপর।তাইতো খোঁজ লাগিয়েছিলো এই লোকের অতীত জানতে।অতীতের কালা কিসসাও সামনে এসেছে অকপটে।

আজ মেহের দেখেছিলো মুবাস্সির আদনানকে কারো সাথে কথা বলতে।রেকর্ডিং অন করে রেখে সে সটকে পড়েছিলো সেখান থেকে‌। অবশ্য পরে সে তার মোবাইল ভাঙা অবস্থায় পেয়েছে।এতোটুকু সিওর হয়েছে লোকটা জেনে গেছে ওর সন্দেহ সম্পর্কে।

-“আচ্ছা তীব্র আপনি কিভাবে এই লোককে মুবাস্সির আংকেল ভেবে আনলেন?”(মেহের)

-“আরে আমি কি জানতাম নাকি উনি মুবাস্সির আংকেল”(তীব্র)

-“তাহলে একে পেলেন কই?”(মেহের)

-“একদিন মনে আছে এক লোককে বাঁচাতে গিয়ে প্রায় গাড়ির সামনে পড়তে নিয়েছিলে?এই সেই লোক। অর্থাৎ বর্তমান মুবাস্সির আদনান।আমি যখন খবর পেলাম লোকটার ওপর রাগ লাগলো প্রচন্ড। সিসিটিভি ফুটেজ খুঁজে লোকটার প্রচ্ছদ দেখলাম।খুব চেনা লাগলো।মাহিন আংকেলের সাথে ওর ছোটবেলার ছবি দেখিয়েছিলো।তারপর চিনে ফেললাম।খবর নিয়ে জানলাম পাগলা গারদ থেকে পালিয়েছে। অনেক বছর ধরেই নাকি ওখানে ছিলো।পরে আমি নিয়ে আসলাম। চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তারপর সামনে আনলাম।”(তীব্র)

-“তোমার সন্দেহ হইনি এই যে হুট করে সে আমার সামনে আসলো,আমি তাকে বাচালাম।আবার তোমার চোখের সামনে এতো সহজেই সে চলে আসলো।এতো বছর পাগলা গারদে থাকলেও চেহারায় তার পরিবর্তন নেই।অবাকতার বিষয় না এগুলো?”(মেহের)

মেহের-তীব্র ভাবে।সত্যিই তো খুবই অবাক করা বিষয়
তীব্রর মনে প্রশ্ন জাগে এগুলো কি তবে আগে থেকেই প্রিপ্ল্যান্ড ছিলো নাকি?প্রিপ্ল্যান্ড না হলে এসবের মানে কি?তাহলে কি এই লোককে তালুকদারদের এখানে এনে ভুল করলো তীব্র!

৮৩.
তূর্যয়ের কবরের পাশে একাধারে কাঁদছে নূরিয়া।মেয়েটা গোলুমোলু হয়েছে কিঞ্চিত।বিগত এক মাসেই!বেচারীকে শেষ দেখাও দেখতে দেয়নি মায়া বেগম আর গোলাম ফখরুল।অনেকেই বুঝিয়েছিলো তাদের যে তূর্যয়ের ওপর ওর স্ত্রীর হক আছে।সে দেখতে পারবে তার স্বামীর মৃতদেহ।তবে নূরিয়ার ভাগ্য বড্ড হতাশাজনক তাইতো পারলো না ভালোবাসার মানুষটিকে শেষবার ছুঁয়ে দিতে,দেখতে।

-“তূর্যয় কেনো তুমি এতো খারাপ মানুষ হলে?কেন তুমি আমাকে, আমাদের ভবিষ্যৎ বেবিকে একা রেখে পালিয়ে গেলে?আচ্ছা তূর্যয় আমার আচরণ কি এতোই উগ্রো ছিলো যে তুমি আমাকে ভালোবাসতে পারোনি!তবে কি আমার ভালোবাসায় খাদ ছিলো যে তুমি আমার হয়েই আমার হয়ে রইলে না!”

দূর থেকে নূরিয়ার মা ওর কান্না দেখছেন।তিনি জানতেন এমনটা একদিন হবে।তিনি মেয়েকে সাবধান করেছিলেন এই ছেলের থেকে দূরে থাকতে।এই ছেলের হয়েই একবার লড়েছিলেন তিনি।অন্যায়কেও অন্যায় না বলে প্রমাণ করেছিলেন।আর তার শাস্তি হয়তো তিনি মেয়ের এই দুঃখের মাধ্যমে পেলেন!

-“নূরিয়া ভাবী এতো কেঁদো না।তোমার তো তোমার বাবুর কথাও ভাবতে হবে।তূর্যয় ভাইয়া যাই করুক না কেন এখন তো তোমায় তোমার বেবির কথা চিন্তা করে বাঁচতে হবে।তূর্যয় ভাইয়া না থাকলেও এখন তোমায় তোমার বেবিকে নিয়ে বাঁচতে শিখতে হবে”

তৃষ্ণার কথায় নূরিয়া ওপরে তাকায়।মারিয়ামও আরেকপাশ দিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখে।এ যেন হঠাৎ আসা ভরসার হাত।মৃদু কেঁপে ওঠে নূরিয়া।মেয়েটা ওদের দুজনকে দুই বাহুতে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।মাহিন-মোয়াজ দূর থেকে দেখে।ওরাই পাঠিয়েছে তৃষ্ণা আর মারিয়ামকে।স্বামী হারা নারী হিসেবে দেখছে ওরা নূরিয়াকে।তাইতো সহানুভূতি দেখাচ্ছে।নয়তো ও যেরকম আচরণ করেছে ওর দিকে কেউ ফিরেও তাকাতো না।

চলবে কি?