পরাণ দিয়ে ছুঁই ২ পর্ব-২৮

0
75

#পরাণ_দিয়ে_ছুঁই (২য় পরিচ্ছেদ)
#পর্বঃ২৮
#Jhorna_Islam

নূর এক দৃষ্টিতে সৌন্দর্যের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে আর চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সৌন্দর্যের মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন নেশা ধরে যাচ্ছে নূরের। লোকটার থেকে চোখ ফেরানো মুশকিল। দিন দিন এই মুখটার প্রতি এই লোকটার প্রতি মারাত্মক ভাবে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে তা নূর ভালো করেই বুঝতে পারছে। সেই আসক্তি থেকে নূর কিছুতেই বের হতে পারছে না অথবা চাইছে না বের হতে।মনে মনে চায় এই নেশা কখনো না কাটুক কখনো না। অনেক তো হলো আর কতো দূরে সরে থাকবে? এই লোকটার সাথেই তো সারাজীবন থাকতে হবে তাকে।তাহলে কেন দূরে সরে থাকা? আজ খুব ভালো করেই নূর উপলব্ধি করতে পারছে মনের ঘরে জায়গা করে নিয়েছে সুন্দর মানুষ টা। নূর এতোটাই আলতো হাতে চুল টেনে দিচ্ছে মনে হচ্ছে সৌন্দর্যের চুলগুলো বুঝি ব্যথা পাবে। সৌন্দর্য নড়েচড়ে বলে,, পরাণ কি করছো,জোরে টানো এভাবে কেউ মাথা মাসাজ করে? বলেই সৌন্দর্য নূরের পেটে মুখ গুঁজে কোমড় জরিয়ে ধরে। সৌন্দর্যের এরূপ ছোঁয়ায় নূরের শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে, গলা শুকিয়ে কাঠ মনে হচ্ছে এখনি পানি না খেলে ভিতর মরুভূমি হয়ে যাবে। সৌন্দর্য নূরকে শক্ত করে ধরে ঘুমিয়ে যায়। নূর স্তব্ধ হয়ে বসে রয় নড়াচড়া করার শক্তি ও পাচ্ছে না যেনো সে। অনেক টা সময় পর নূর বুঝতে পারে সৌন্দর্য ঘুমিয়ে গেছে। হাতের বাঁধন শিথিল হয়ে এসেছে। নূর আস্তে করে সৌন্দর্যের থেকে সরে আসে। টেবিলের উপর থেকে রাখা পানির জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে ঢকঢক করে পুরো গ্লাসের পানি শেষ করে। নিজেকে শান্ত করে সৌন্দর্যের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকায়। আলতো পায়ে এগিয়ে গিয়ে আবার পাশে বসে। চুলের ভিতর হাত ঢুকিয়ে একটু ঝুঁকে আসে সৌন্দর্যের দিকে।

“এই সুন্দর মানুষ আপনি কি জাদু জানেন? কি করেছেন বলুনতো আমাকে? আপনি ছাড়া আমার কিছুই ভালো লাগে না। এই যে আপনার পাশে বসে আছি কি শান্তি লাগছে জানেন? মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ এখন আমি। আপনার কথা শোনার জন্য আমার কান চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করে। চোখ গুলো এই সুন্দর মুখটা দেখার জন্য তৃষ্ণার্থ হয়ে থাকে। আপনি যখন ঐ সময় আমাকে ইগনোর করে কথা না বলে চলে আসছিলেন তখন আমি বুঝলাম আপনি আমার জীবনে কি। সকল নিয়ম ভেঙে এই নূর আপনার কাছে ছুটে এসেছে। কি ছিলাম আমি আর কি হয়ে গেলাম বলুনতো? আপনার মুখে পরাণ ডাক শুনতে আমার কতো ভালো লাগে জানেন আপনি? উহুু জানেন না একদম জানেন না। জানলে হয়তো সারাক্ষণ আমাকে পরাণ ডাকতেন। আচ্ছা আপনার জন্য যা ফিল করি সেটা কি ভালোবাসা সুন্দর মানুষ?

সৌন্দর্যের থেকে কোনো উত্তর আসে না, সে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে।

নূর আবার বলে,,ভালোবাসা কি আমি জানি না তবে আপনি জন্য করা এসব পাগলামো গুলো যদি ভালোবাসা হয় তাহলে বলে নূর চুপ হয়ে যায়। একটা শুকনো ঢুক গিলে ফিসফিস করে বলে,, তাহলে আপনার পরাণ আপনাকে অনেক অনেক ভালোবাসে।”

এসব কথা হয়তো আপনি জাগ্রত অবস্থায় থাকতে বলার সাহস পেতাম না জীবনে ও তাই আপনার ঘুমিয়ে থাকার সুযোগ নিলাম। আপনার পরাণের বাড়িতে চলে আসার সাহস থাকলেও আপনাকে সরাসরি এসব বলার এতো সাহস নেই বুঝলেন?
অনেক টা সময় সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে নূর।এতো কাছ থেকে লোকটা কে দেখার সুযোগ কিছুতেই হাত ছাড়া করতে চায় না। এরমধ্যে নূরের কাঁধের ব্যাগে রাখা ফোনটা ভাইব্রেট হতে থাকে। বুঝতে পারলো যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। উঠে দাঁড়ায় চলে যাওয়ার জন্য। কয়েক কদম গিয়ে ও ফিরে আসে। সৌন্দর্যের কপালে টুপ করে চুমু খেয়ে ঝরের বেগে রুম থেকে বের হয়ে যায়। সৌন্দর্য মুচকি হেসে পাশ ফিরে আরাম করে শোয়।
বিরবির করে বলে,,

❝তোমার ওষ্ঠের ভালোবাসায় থাকব নেশাগ্রস্ত।
যেখানে মৃত্যু নেই
থাকবে অন্তহীন প্রাণ। তোমার ঠোঁটের আঘাতে আমার মৃত্যু হোক। ❞

দুইতলা থেকে আলতো পায়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে নেমে আসে নূর।ভয়ে আছে কেউ এখন দেখে ফেললে খুব লজ্জায় পরতে হবে আর তাছাড়া কিইবা বলবে যখন জিজ্ঞেস করবে এখানে আসার কারণ। ফাতিহা স্কুলে এটা বলতেও পারবে না ফাতিহা কে দেখতে এসেছে। পা টিপে টিপে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে পারলে যেনো বাঁচে। রান্না ঘরের দিকে চোখ যেতেই তখনকার মহিলাটা কে দেখতে পায়।
উফফ এই মহিলা দেখার আগেই এখান থেকে কেটে পরতে হবে নয়তো কি গন্ডগোল লাগায় কে জানে। মহিলাটার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে তারাতাড়ি সদর দরজা দিয়ে বের হয়ে যায় নূর।

এতক্ষন সোফায় বসে থাকা সৌন্দর্যের দাদি মুখের উপর থেকে খবরের কাগজ সরিয়ে শব্দ করে হেসে দেয়। বেচারি সোফায় ভালো করে খেয়ালই করে নি। করলে হয়তো দেখতে পেতো কেউ একজন খবরের কাগজের আড়ালে তাকিয়ে তার কর্মকান্ড সব দেখেছে।

সৌন্দর্যের দাদি হাসতে হাসতে বলে,, এই বয়সটা আমিও পার করে এসেছি। আজ নাতবউ সেই আমার কাহিনী রিপিট করলো।তারাতাড়ি এই বাড়িতে একেবারের জন্য নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে হবে দেখছি।নাহ আর দেরি করা যাবে না একটা অনুষ্ঠান করে তারাতাড়ি দুইটাকে এক করে দিতে হবে। দাদি হিসেবে আমার একটা দায়িত্ব আছে না।

**********

সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই নূরের বিয়ের আলোচনা চলছে। তারা বড় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নূরকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে চায় তাদের বাড়ি। প্রথমে বলেছিল অনার্স শেষ হলে উঠিয়ে নিবে কিন্তু সৌন্দর্যের দাদি উনার নাতবউ কে এখনই নিয়ে যেতে চায়। একদম দেরি করতে চায় না। নূরের বাবা আর সৌন্দর্যের বড় আব্বু রাজি হতে না চাইলে ইমোশনাল ব্লে’ক মেইল করা শুরু করে। শরীর তেমন ভালো না নাত বউ কে নিজের বাড়িতে দেখে যেতে চায় ইত্যাদি ইত্যাদি। অগত্যা কি করার উনার কাছে সকলকেই হার মানতে হলো। বিয়ের ডেইট ফেলা হয় সপ্তাহ খানেক পর। সকলেই তোরজোড় শুরু করে দেয়। একটা বিয়ে মানে অনেক দায়িত্ব। তূর আর ফাতিহা সেই খুশি। এসবের মধ্যে নূর সবচেয়ে বেশি মিস করছে ইসরাত কে। যার সবচেয়ে বেশি আনন্দে থাকার কথা পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখার কথা সে কিনা নিজেকে একলা করে রেখেছে। নূরের সাথে ও তেমন একটা কথা বলে না আর না বাড়ি থেকে খুব একটা বের হয়। অথচ নূরের বিয়ে নিয়ে আগে থেকে কতো প্লেন করে রেখেছে। বিয়ের এক সপ্তাহ আগেই নাকি নূরদের বাড়িতে আসবে সব নিজের হাতে করবে। নূর ইসরাতের কথা ভেবে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। কে যানে বিয়েতে মেয়েটা আসবে কিনা।নূরের কেন জানি মনে হয় বিয়েতে ও আসবে না ইসরাত।

নিজের রুমে বসে বসে এসবই ভাবছিল নূর।ফোন বসার রুমে ফেলে এসেছে। তূর এসে ডাকতে থাকে কল এসেছে বলে।নূর বলে দিয়ে যাওয়ার জন্য। তূর এনে ফোন দিয়ে যায় নূর কে। নূর ফোন নিয়ে দেখে ইসরাতের মা কল দিয়েছেন। কিসের জন্য দিলেন বুঝতে পারলো না হয়তো ইসরাতের এমন হয়ে যাওয়া নিয়েই কথা বলবে।

” হ্যালো আসসালামু আলাইকুম আন্টি। কেমন আছেন?”

“ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি ভালো আছি মা তুমি কেমন আছো? ”

” এইতো আমিও ভালো। ”

— নূর আসলে তোমার সাথে একটা কথা ছিলো।

— হ্যা আন্টি বলুন কি কথা।

— আসলে হয়েছে কি আজ এক জায়গা থেকে ইসরাত কে দেখতে আসার কথা ছিলো। মানে দিন তারিখ ও ঠিক করার কথা ছিলো কিন্তু উনারা চাচ্ছে আজই আকদ টা সেরে ফেলতে,দেরি করতে চাইছে না। আর আমাদের ও কোনো আপত্তি নেই সবকিছু দেখে শুনে নিয়েছি। আজ রাতে আকদ পড়ানো হবে। তুমি এখনই এসে পরো মা। সবতো হুট করে হয়ে গেলো তাই তোমাকে বলতে পারি নি আগে । তুমি বিকেলের মাঝে এসে পরো।

–ইসরাতের মায়ের কথায় নূর বেশ অবাক হয়। কি বলছে এসব হুট করে বিয়ে। আর ইসরাত ও কি রাজি? তালহা স্যারের সাথে কি ঐদিন সব ঠিক হয়নি? এজন্য কি ইসরাত এমন হয়ে গেছে? নাকি বিয়ের কথা চলছে এজন্য। আশ্চর্য মেয়েটা তালহা স্যার কে বলেনি কেন বিয়ের কথা। অনেক অনেক প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। নূরের এসব ভাবনার মাঝেই ইসরাতের মা বলে,,,, আসবে তো মা?

নূর কি করবে বা বলবে কিছু মাথায় ঢুকছে না। যেই মেয়েটা তালহা স্যার বলতে পা’গল সে চুপচাপ অন্য জায়গায় বিয়ে করে নিবে? এটা নূর বিশ্বাস করতে পারছে না। ইসরাতের সাথে তারাতাড়ি কথা বলতে হবে। হাতে সময় বেশি নাই যা করার এখনই করতে হবে। আসবো আন্টি বলে ফোন রাখে নূর।
ইসরাতের ফোনে কল দিতে থাকে কিন্তু মেয়েটা রিসিভ করে না। তালহা কে কল দেয় তালহার ও একই ব্যাপার ফোন তুলছে না। নূরের খুব রাগ হতে থাকে। সারাজীবনের ব্যাপার আর এরা কিনা ফোন ই তুলছে না। উপায় না পেয়ে সৌন্দর্য কে কল করে। সৌন্দর্য সব শুনে বলে আমি দেখছি বিষয় টা তুমি ইসরাতের কাছে যাও।
নূর আর দেরি করে না তারাতাড়ি তৈরি হয়ে ইসরাতের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

#চলব?,,,