প্রানেশা পর্ব-০১

0
223

#প্রানেশা
#সূচনা_পর্ব
#জান্নাত_সুলতানা

-“সমুদ্র ভাই গ্রামে এসছে রাশি।”

কথা টা কর্নপাত হতেই অষ্টাদশী কন্যা রাশি তড়িৎ গতিতে ফিরে চাইলো পাশে বসা বান্ধবী মিরার দিকে।
মেয়েটার চোখ মুখ খুব স্বাভাবিক।
কিন্তু রাশি নামক অষ্টাদশী কন্যা স্বাভাবিক থাকতে পারলো না ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে গেলো।
মিরার মতো ফিসফিস করে রাশি নিজেও জিগ্যেস করলো

-“সমুদ্র ভাই গ্রামে এসছে?”

মিরা মাথা ঝাঁকালো যার অর্থ হ্যাঁ বুঝাল।
ক্লাস চলছে তাই দুই জনেই চুপ করে গেলো।
সামনে লেকচার দেওয়া লেকচারার এর দিকে ফের তাকিয়ে রইলো।

কলেজ শেষ দুই বান্ধবী বাড়ির পথে হাঁটা ধরে। রাশি নামের রমণী বরাবরই চুপচাপ শান্তশিষ্ট। কিন্তু পাশের বান্ধবী টা? সে রাশির বিপরীতে এই যে বকবক করে যাচ্ছে লাগাতার। রাশি অবশ্য বিরক্ত হয় না এতে।ভীষণ ভালো লাগে তার।
রাশি দের বাড়ির আর মিরাদের বাড়ি পাশাপাশি। সেই ছোট বেলা থেকে দু’জন এক সাথে খেলাধুলা পড়া লেখা করে।বেশ ভালো বন্ডিং দু’জনের মাঝে।
কলেজ থেকে বেড়িয়ে পশ্চিম দিকে মিনিট তিন মিনিট হাঁটার পর বিশাল বড় একটা হিজল গাছ আছে।এই গাছ টার নিচে সব সময় ছেলেদের একটা দলবল থাকবে থাকবেই।আর সেই দলের লিডার হচ্ছে এলাকার চেয়ারম্যান আজগর শিকদার এর ছোট নাতি সমুদ্র শিকদার। অনেক দিন যাবত সেখানে সেই দল টা দেখা যায় না তার কারণ সমুদ্র গ্রামে ছিল না।কিন্তু আজ ওখানে অনেক গুলো ছেলে রয়েছে তার মানে কি মিরা সত্যি কথা বলে ছিল?সমুদ্র ভাই গ্রামে ফিরে এসছে? কথা টা ভাবতেই রাশির গলা শুকিয়ে এলো। সে চায় না এই লোকটার সামনে পড়তে। লোকটাকে দেখলে বুকের ভেতর কেমন করে।মুখের বুলি ফুরায়।
এই লোকের চাহনিতে কিছু একটা আছে। রাশি লোকটার সাথে কখনো চোখে চোখ রাখতে পারে না। কিন্তু কি আছে চোখে? রাশি সেটা ভেবে পায় না।

-“রাশি সমুদ্র ভাই এদিকে আসছে!”

রাশির ভাবনার মাঝেই মিরা রাশির হাত টা শক্ত করে চেপে ধরে জানালো।রাশি তৎক্ষনাৎ ঘাড় এলিয়ে বা দিকে তাকাতেই দেখা মিলে বলিষ্ঠ শরীর এর সুদর্শন পুরুষ সমুদ্র ভাই সত্যি এদিকে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে
তার লম্বা লম্বা প্রতি টা কদম অষ্টাদশী কন্যা রাশির বুকের মধ্যে ঝড় তুলল।
আকাশী রঙের শার্ট গায়ে কালো প্যান্ট পুরুষ টাকে মারাত্মক সুদর্শন দেখাচ্ছে। আশেপাশে তেমন মানুষ নেই।সমুদ্র ঠিক এগিয়ে এসে ওদের থেকে গুনে গুনে তিন কদম দূরত্ব রেখে দাঁড়াল।
ততটা দূরে যতটা দূরে দাঁড়ালে কেউ খারাপ দৃষ্টিতে তাকাবে না।
সমুদ্রের পেছনে আরও দুইটা ছেলেও দেখা গেলো তবে ওরা সমুদ্রের থেকে অনেক টাই দূরে অবস্থান করছে। আর দৃষ্টি?জমিনের দিকে দৃষ্টি তাদের যেনো সামনে রাজা দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে দেহরক্ষীরা তাকে প্রটেকশন দিচ্ছে।
মিরা হাল্কা হেঁসে সমুদ্র কে ভালো মন্দ জিগ্যেস করে। সমুদ্র জবাব দিলো। নিজেও মুচকি হেঁসে মিরা কে ভালো মন্দ জিগ্যেস করে।
অতঃপর রাশির দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো

-“মেম্বার এর ছেলে কি বলেছে?”

রাশি এতোক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু সমুদ্রের মুখে এমন প্রশ্নে চমকে উঠলো। তড়িৎ গতিতে মাথা তুলে সামনে পুরুষ টার দিকে তাকালো।তবে পুরুষ টার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলো না সঙ্গে সঙ্গে আবারও দৃষ্টি নুইয়ে নিলো।
মিরা নিজেও চমকালো।তবে প্রকাশ করলো না।মিরার চমকানোর কারণ সমুদ্র ভাই কি করে জানলো।এটা তো সে আর রাশি আর সেই ছেলে বাদে আর কেউ জানার কথা না।পরক্ষণেই ভাবলো সমুদ্র ভাইয়ের কাছে এই টা জানা কোনো ব্যাপারই না।

-“বলছো না কেন?”

সমুদ্রের ফের ছোট একটা ধমকে এবার দু’জনে দু’জনের হাত খামচে ধরলো।
রাশির ঠোঁট দু’টি তিরতির করে কাঁপছে তবে কাঁপা কণ্ঠে ত্যাড়া একটা জবাব দিয়ে বসলো

-“আপনাকে কেন বলবো?”

সমুদ্র এমন উত্তর আশা করে নি।তবে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে চোখ বন্ধ করে কোমড়ে দুই হাত রাখে।
পর পরই চোখ খোলে জবাবে বলল

-“সেটা না হয় সময় বলে দেবে।
সামনে পরীক্ষা না!মন দিয়ে পড়বে।”

তার পর মিরার দিকে তাকিয়ে কিছু ইশারা করতেই মিরা রাশির হাত ধরে সেখান হতে চলে এলো।
সমুদ্র সেখানে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো সে দিকে। মেয়ে টা তাকে ভয় পায়, না-কি বিরক্ত হয় সে বুঝে না। তবে এড়িয়ে চলতে চায় সব সময় এটা সে ঠিক বুঝতে পারে।

-“ভাই আপনি সব জানার পরেও কেন এসব প্রশ্ন করলেন?”

সমুদ্র জবাব দিলো না। ছেলে গুলো নিরাশ হলো।এই ব্যাক্তির মাথায় ঠিক কি চলে একমাত্র সে জানে আর আল্লাহ।
তবে সমুদ্র হুকুমজারি করলো

-“কাল ছেলে টাকে একবার নিয়ে আসিস।
আমি দেখতে চাই ওই মেম্বার এর ছেলের কলিজা টা কত বড়!সমুদ্র শিকদার এর কলিজায় হাত দেয়।”

————

চল্লিশ বছর এর বেশি বয়স হবে একটা লোক বগলের তলায় একটা কালো ব্যাগ রেখে আরেক হাতে সেটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে লোকটা হয়তো সহজসরল মানুষ হবে। পান খেয়ে লাল করে রাখা দাঁত গুলো বেড় করে একবার বেকুব হেঁসে সামনে সোফায় বসা আজগর শিকদার কে জানালো

-“স্যার ছোট সাহেব আবার মেয়েটার সাথে কথা বলছে।”

আজগর শিকদার চায়ের কাপ টা নিজের মুখের সামনে ধরে ছিল মাত্র।
কিন্তু এমন কথা শুনে চা টা আর মুখে নিলো না।একটু চিন্তিত হলেন।তবে পরক্ষণেই কিছু ভেবে মুচকি হেঁসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল

-“তুমি চিন্তা করো না রহমত।
আমাদের আর কিছু করতে হবে না। এখন যা করার মেম্বার নিজে ওর ছেলে কে দিয়ে করিয়ে নেবো।”

রহমত আলী কথা গুলোর মানে ঠিক বুঝতে পারে না।তবে তার স্যার এর মাথায় যে ভালো কিছু চলছে না সে ঠিক বুঝতে পারে।
সে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে।কি দরকার এসব করার?সে ভেবে পেলো না পরিবার কেন ছেলেমেয়ের পছন্দ,ভালোবাসা মেনে নিতে পারে না!

-“আর হ্যাঁ, মেয়েটার বাবা কে একবার আমার সাথে দেখা করতে বলে খবর পাঠাও।”

-“আচ্ছা স্যার।”

আজগর শিকদার এর কথার বিপরীতে জানায় রহমত আলী।অতঃপর সালাম ঠুকে স্থান ত্যাগ করলো।
আজগর শিকদার আয়েশ করে চায়ের কাপে চুমুক বসিয়ে বিরবির করে বলল

-“আজ থেকে তিন বছর আগে যা আমি হতে দেই নি,আজ তিন বছর পরে কি করে সেটা হতে দেই!”

———-

-“এতো রাতে এখনে কি করছো মেয়ে?”

হঠাৎ শক্ত কণ্ঠের প্রশ্নে হকচকিয়ে উঠলো মিরা।ডান বামে তাকিয়ে আবার সামনে তাকালো। সে গিয়ে ছিল রাশির কাছে নোট নিতে।নোট নিয়ে ফিরে আসার সময় টিন দিয়ে বেড়ি দেওয়া বাড়ি টার উঠোন পেড়িয়ে রাস্তায় পা রাখতেই দেখা মিলে কেউ একজন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে, ঠোঁটে মিটমিট করে কিছু জ্বলছে। মিরার বুঝতে এক সেকেন্ড সময়ও লাগে না পুরুষ টি কে। কখনো যে সেভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে লোক টা ওর নিকটে এসে পৌঁছেছে সে টেরই পায় নি।মিরা সামনে বরাবর দাঁড়িয়ে থাকা লম্বাটে দেহের তামাটে বর্ণের যুবক টার দিকে তাকালো।
আবছা আলোয়ে এলোমেলো চুল সাদা কালো চেক শার্ট পরিহিত যুবক টা তারই দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে উত্তর এর আশায়।সিগারেটে পোড়া ঠোঁট গুলো দিকে দৃষ্টি পড়তেই বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। লোকটার এই ঠোঁট জোড়া দেখলে বোঝা যায় লোকটার প্রচুর কষ্ট। কিন্তু কিসের এতো কষ্ট লোকটার?অন্যের জন্য কেন নিজের জীবন টা এভাবে নষ্ট করছে?
মিরার ভাবনার মাঝেই সামনে দাঁড়ানো পুরুষ টা আবারও ধমকের স্বরে জিজ্ঞেস করলো

-“কি হলো কথা বলছো না কেন?
এতো রাতে এখানে কি করছো? বলো, বলো মেয়ে!”

মিরা হাল্কা কেঁপে উঠল তবে অন্ধকারে সামনে দাঁড়ানো পুরুষ তা ঠাহর করতে পারলো না।
মিরা এবার মুখ খুলল।মিনমিন করে জানালো

-“আপনাদের বাড়িতে। নোটের জন্য
রাশির কাছে গিয়ে ছিলাম, রিহান ভাই।”

#চলবে…..