প্রিয় আসক্তি পর্ব-০১

0
340

#প্রিয়_আসক্তি🔥
তিতলী
পর্ব _১

❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️

গোধূলির রাঙা আলো মিলিয়ে ধরণীতে নেমে আসছে অন্ধকার। ঘরে ঘরে জ্বলে উঠেছে সাঁঝবাতি।
প্রিয়তা পা টিপে টিপে কিচেনে ঢুকে ফুপির পিছনে দাঁড়ালো।
রোশনি আহমেদ তরকারির চুলার তাপ কমিয়ে পিছন ফিরে প্রিয় তার দিকে তাকালো মুচকি হেসে বলল:

:কখন আসলি প্রিয়তা?
ফুপির কথায় হেসে বলল: এসেছি তুমি দেখতে পাওনি!
কি রান্না করছো ফুপি??
আহমেদ তরকারি নামাতে নামাতে বলল:
: বিভোরটা সেই সকালে বেরিয়েছে। লাঞ্চ করেছে কিনা কে জানে! দুপুরে তো বাসায় আসলো না খেতে। তাই ওর পছন্দের গরুর মাংসের ভুনা আর খিচুড়ি করলাম।
বাটিতে মাংস তুলতে তুলতে প্রিয়তার দিকে এগিয়ে দিয়ে রোশনি আহমেদ বললেন
:দেখ তো প্রিয়তা সব ঠিক আছে কিনা।
প্রিয়তা হেসে বাটিটা হাতে নিয়ে বলল
:ফুপি তোমার হাতের রান্না আবার কখনো খারাপ হয় নাকি??
প্রিয়তা বাটি হাতে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে খেতে লাগলো। দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবলো (বিভোর ভাইয়া আজকে আসতে এত দেরি করছে কেন? আচ্ছা আজকের ব্যাপারটা কি বিভোর হইয়া জেনে গেলো!! ভয়ে সন্তর্পনে ঢোক গিললো প্রিয়তা)
প্রিয়তা। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। প্রিয়তার একটা বড় ভাইও আছে। নাম পিয়ুস। টুকটুকে ফর্সা, কোমড় ছাড়ানো চুল ,গাড়ো কালো মনির বড় বড় চোখ, গোলাপের পাপড়ির মত ঠোঁট, দেখতে একেবারেই পুতুল পুতুল একটা মেয়ে।
প্রিয়তা এবার অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে। প্রিয়তার ভার্সিটি ঢাকাতে হওয়ায় প্রিয়তার বাবা মা আর ভাই ওকে যেতে দিতে চাইছিলো না। বোন কে দুরে পাঠিয়ে বাড়ির কেউই শান্তি পেত না। সেই সময় প্রিয়তার ফুপি ওকে ওর তাদের বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করতে বলেন। প্রিয়তার ফুপি তার পরিবার নিয়ে ঢাকাতেই স্থানীয় বসবাস করেন। প্রিয়তার ফুপা একজন বড় বিজনেসম্যান। তাদের নিজস্ব বড় বিজনেস আছে। প্রিয়তার ফুপির ও দুই ছেলে মেয়ে। বড় ছেলে বিভোর আর মেয়ে বিভা। বিভা এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী। প্রিয়তার লেখাপড়ার সুবিধার জন্য প্রিয়তার বাবা-মা প্রিয়তাকে ফুফির কাছে থেকে লেখাপড়া করতে অনুমতি দিয়েছেন।
তাছাড়া প্রিয়তার ফুপিদের সাথে প্রিয়তার বাবা-মারদের সম্পর্ক খুবই মধুর। প্রিয়তাকে তার ফোপা-ফুপি খুবই ভালোবাসে। বিভা তো প্রিয়তা বলতে পাগল।
আর বিভোর হলো অ্যারোগ্যান্ট, রাশভারী,গম্ভীর। রাগ যেন সবসময় তার নাকের ডগায় থাকে।
দেখতে অসম্ভব সুন্দর । সবুজাভ বিড়াল চোখের অধিকারী বিভোর। ট্রিম করা দাড়ি ফরসা মুখে একটু বেশি মানায়। মাথায় একরাশ সিলকি চুল কপালে এসে পড়ে। সব ফুট উচ্চতার জিম করা বডি যুক্ত বিভোর সবসময় সিমসাম ফিটফাট হয়ে থাকে ।সে তার বাবার সাথে বিজনেস দেখাশোনা করে।মেয়েদের কাছে বিভোর ইন্টারন্যাশনাল ক্রাস।যেখানে সেখানেই মেয়েরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে বিভোরকে দেখে। প্রেস মিডিয়া সবখানেই বিভোরের চর্চা। তার সম্পর্কে নিউজ রোজ পাবলিস্ট হয়। তাকে নিয়ে জার্নালিস্টদের কৌতূহলের শেষ নেই।বিভোরের এসব এ কিছুতেই আসা যায় না। সে থাকে তার এটিটিউডে।

প্রিয়তা বসে বসে ভাবছিলো।ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে উঠলো। কলিংবেলের শব্দে প্রিয়তা চমকে ওঠে হাতের বাটিটা পড়তে পড়তে বেঁচে যায়।
প্রিয়তা উঠতে নিলেই রোশনি আহমেদ এসে বলেন তুই দাড়া প্রিয়তা আমি দেখছি।
রোশনি আহমেদ দরজা খুলতেই গটগট পায়ে হেঁটে ঢুকলো বিভোর। ঢুকতে ঢুকতে প্রিয়তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তারপর বলল

:_আমার রুমে এক কাপ কফি নিয়ে আয় প্রিয়তা।

বিভোরের গম্ভীর কন্ঠে কেঁপে উঠলো প্রিয়তা। এই লোকটাকে সে একটু বেশিই ভয় পায়। তার এক একটা ধমকে বেচারির প্রান যায় যায় অবস্থা। বিভোরের সামনে দাড়ালে তিরতির করে কাঁপতে থাকে প্রিয়তা।
রোশনি আহমেদ কিচেন থেকে কফির কাপটা নিয়ে এসে প্রিয় তার হাতে ধরিয়ে দেয়। প্রতিদিন প্রিয়তাকে কাজটা করতে হয়।
_: যা কফিটা শেষ করে ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে খেয়ে নিতে বলিস!!

প্রিয়তাকার ফুফির হাত থেকে কফির কাপটা নিয়ে আস্তে করে বলে
:_আচ্ছা
তারপর গুটি গুটি পায় এগিয়ে যায় বিভোরের রুমের দিকে।
বিভোরের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ঢোক গিলে কাঁপা হাতে দু বার নক করে প্রিয়তা।
ভেতর থেকে বিভোর যথারীতি গম্ভীর কণ্ঠে বলে
:_ কাম।
প্রিয়তা আস্তে আস্তে রুমের ভেতরে গিয়ে বেডের পাশে টি টেবিলে কফির কাপটা রাখে। তারপর আস্তে করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে
:-ফ্রেশ হয়ে কফি শেষ করে নিচে গিয়ে খেয়ে নিতে বলেছে ফুপি।
বলেই রুম থেকে বেরিয়ে আসতে নিলে পিছন থেকে বিভোর আচমকা হাত টেনে কাছে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
অবাক হয়ে বিভোরের দিকে তাকালো প্রিয়তা। রেগে মেগে লাল হয়ে আছে বিভোরের চোখ। আঁতকে ওঠে প্রিয়তা।
ঢোক গিলে মাথা নিচু করে নেয় সে। ওই বিড়াল চোখে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। তার উপরেও রেগে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে। এদিকে বুকের ভিতর ধুপ ধুপ করছে প্রিয় তার শরীর কাঁপছে সেটা বিভোর প্রিয়তার হাত ধরে রাখাই অনুভব করতে পারছে।

প্রিয় তার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলে
:-ভার্সিটি শেষে কোথায় গিয়েছিলি আজ??

ব্যাস হয়ে গেল। এই ভয়টাই পাচ্ছিলো প্রিয়তা।
আজকে ভার্সিটি শেষে বান্ধবীর সাথে শপিং এ গিয়েছিল প্রিয়তা।অবশ্য নিজের প্রয়োজনে নয়, প্রিয়তার বান্ধবীর রিয়া কিছু কেনাকাটা করবে বলে। প্রিয়তাকে জোর করেই নিয়ে গিয়েছিলো। প্রথমে যেতে না চাইলেও রিয়ার জোরাজুরিতে না করতে পারিনি। এ দিকে প্রিয়তার ফোন চাপ লেগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কল আসলেও বুঝতে পারিনি। তিন ঘন্টা দেরিতে বাসায় এসে ফোন বের করে দেখে বিভরের ১৪৪ টা মিসকল। তা দেখে প্রিয়তার কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে যায়। নিশ্চয়ই বিভোর ভার্সিটিতে পিক করতে গিয়েছিলো। ওকে না পেয়ে কল করেছে। তখন থেকে প্রিয়তা দুশ্চিন্তা নিয়ে বসেছিলো। নিশ্চয় বিভোর এসে ওর 13 টা বাজাবে। আর এই মুহূর্তে বিভোরের সামনে অসহায় ক্ষুদ্র প্রাণী বলে মনে হচ্ছে নিজেকে।

প্রিয়তার জবাব না পেয়ে বিভোর জোরে ধমকে ওঠে বলে
:-চুপ করে আছিস কেন বল কোথায় গিয়েছিলি? আর ফোন কোথায় তোর?
প্রিয়তা মিনমিন করে বলে
:-রিয়ার সাথে শপিংমলে গিয়েছিলাম। ফোন চাপ লেগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তাই বুঝতে পারিনি। সরি!!
বিভরের রাগ যেন আরো বেড়ে যায় প্রিয় তার হাত আর একটু শক্ত করে চেপে ধরে বলে
:-ইম্পরট্যান্ট মিটিং ছেড়ে তোকে পিক করতে যায় আমি রোজ। তোর কি উচিত ছিল না আগেই আমাকে ইনফর্ম করা?? তুই জানতিস না আমি তোকে পিক করতে যাবো?
প্রিয়তা হাতে প্রচন্ড ব্যথা পাচ্ছে,, দেখাই চোখে পানি এসে যায় প্রিয়তার। তবুও চোখমুখ খিচে বলে
:-ভুল হয়ে গেছে। আর কখনো হবে না। এটুকু বলেই গলা কেঁপে উঠে প্রিয়তার।
প্রিয়তার কাঁদো কাঁদো কন্ঠে হুশ ফিরে বিভোরের। হাতের বাঁধন টা ঢিলে হয়ে যায় মুহূর্তেই। চোখে চোখ রাখতেই প্রিয়তার টলটলে দুচোখে আটকে যায় বিভোর।ব্যাস রাগ নিমিষেই খাতাম।
নিজেকে সামলে নিয়ে শক্ত গলায় বলে
:-আউট!!
আশঙ্কা ধমকে প্রিয়তা আবারো কেঁপে ওঠে বিভোরের দিকে তাকাতেই আবারো ধমকে ওঠে বিভোর
;-আই সেইড আউট!!
আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে বেরিয়ে যাই প্রিয়তা।
দুহাতে মাথার চুল টেনে বেডের উপর বসে পড়ে বিভোর, রাগটাকে সামলে নিজেকে স্বাভাবিক করে টানা একটা নিঃশ্বাস ফেলে,,
কফি হাতে নিয়ে দেখে ততক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গেছে। কফি রেখেই টাওয়েল হাতে ওয়াশরুমে ঢুকে যায় বিভোর।

ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে ডাইনিং টেবিলে বসতে বসতেই আশেপাশে চোখ বোলাই বিভোর। প্রিয়তাকে আশেপাশে কোথাও না দেখে মাকে জিজ্ঞাসা করে

:-প্রিয়তা কই?

রোশনি আহমেদ ছেলের প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বলে

:-তখন যে তোকে কফি দিতে গেলো, আর তো নিচে নামেনি।

বিভোর খাবার মুখে দিতে দিতে বলে

:-আজকে কখন বাসায় এসেছিল ও??

রোশনি আহমেদ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে

:- আসতে দেরি করেছিল একটু! চিন্তা হচ্ছিলো কিন্তু ভেবেছিলাম হয়তো তোর সাথে আছে।
পরে বাসায় এসে বললো ও নাকি রিয়ার সাথে শপিংয়ে গেছিলো।
পরে কিছু একটা ভেবে তিনি বললেন
:-হ্যাঁরে আব্বু তুই বকেছিস নাকি ওকে??
বিভোর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল:
:-দুপুরে ওকে পিক করতে গিয়ে দেখলাম ও ভার্সিটিতে নেই। ওকে কল করে দেখলাম ফোন বন্ধ।আশেপাশে কয়েক জায়গায় খোঁজখবর নিয়ে দেখলাম কেউ কিছু বলতে পারলো না। ওকে কলের উপর কল করেছি। ফোনটা রীতিমতো বন্ধ আসছিলো ।
তুমি বুঝতে পারছ মা!! তখন আমার কি অবস্থা হয়েছিলো।হাজারটা কল করেও যখন ওকে কলে পাচ্ছিলাম না,, তোমাকেও জিজ্ঞাসা করতে পারছিলাম না,যদি বাসায় না ফেরে তুমি চিন্তা করবে বলে।
মাথায় হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। আর তুমি এখন জিজ্ঞাসা করছছো ওকে বকেছে কিনা??
রোশনী আহমেদ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে যেনো ভেতরের খবর বুঝতে পারলেন।
ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বললেন

:-পাগলী হয়তো তোর বকা খেয়েই আর নিচে আসেনি। গিয়ে দেখ হয়তো রুমে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে।

:-হ্যা ওইটাই তো পারে তোমার ভাইজি।
ছেলের কথা শুনে হাসলেন রোশনি আহমেদ। ছেলেটা যে কতটা দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল সেটা ছেলের মুখ দেখেই বুঝতে পারছেন। প্রিয়তাকে সে যে ঠিক কতটা আর কেমন করে দেখে মা হয়ে তিনি সেটা ভালোই বুঝতে পারেন।

রোশনি আহমেদ কিছু ভেবে আবার বললেন
:-হ্যাঁরে আব্বু পিয়ুস টা যে অনেক দিন আসলো না। অফিসে কি এখন কাজের চাপ বেশী যাচ্ছে?

:-আছে একটু প্রেশার। আসবে কয়েকদিন পরেই। বিভোর আর কিছু না বলে চুপচাপ খেতে লাগলো।

প্রিয়তার বাবার বিজনেসের এক অংশ বিভোরদের বিজনেসের সাথে জড়িত। সেটাই পিয়ুস হ্যান্ডেল করে। প্রায়ই পিয়ুস আর বিভোর একসাথে কাজ করে। দুজনেই সমবয়সী। ভাই কম বন্ধু বেশি।

এদিকে প্রিয়তা রুমে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। মনে মনে বিভোরকে হাজারটা গালি দিচ্ছে। (গম্ভীর বিড়াল চোখা লোক, আস্ত একটা রাক্ষস, সব সময় ধমকের উপরে রাখে। বউ জুটবে না জীবনেও।পাষান লোক একটা)

বিভা টেবিলে বসে পড়ছিলো। প্রিয়তা কে বিড়বিড় করতে দেখে বললো
:-প্রিয়তাপু ভুতে ধরেছে নাকি তোমারে ?? এমন বিড়বিড় করে কি ভূতের মন্ত্র পড়ছো??

:-ভুতে কেন ধরবে?? ধরেছে তো তোর ভাই!! ওর থেকে বড় ভূত কি আর দুনিয়ায় আছে??
বিভা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে প্রিয়তার দিকে তাকায়।
বিভার দিকে চোখ পড়তেই প্রিয়তার হুশ আসে এতক্ষণ কি বলছিলো। থতমত খেয়ে বলে
:-হা করে তাকিয়ে আছিস কেন?? পড়!!
বিভা ঠোঁট উল্টে আবার বইয়ে ডুব দিলো।

চলবে,,,,