প্রিয় নিবেদিতা পর্ব-০৬

0
90

#প্রিয়_নিবেদিতা🖤
#লেখিকাঃ #ইশা_আহমেদ
#পর্ব_৬

“এতো ঝামেলা কেনো করো তুমি প্রতিদিন হ্যাঁ? তোমার মামনি বিয়ের কথা বলেছে তাতেই তুমি ক্ষেপে গিয়ে তার দিকে গ্লাস কেনো ছুড়ে মেরেছো?”

স্নিগ্ধা মর্মাহত হলো। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটি নাকি তার বাবা। কষ্টে দুঃখে অশ্রুকণারা ধরা দিলো স্নিগ্ধার আঁখি জোড়ায়। তার মা মারা যাওয়ার পর থেকে গত তিন বছর যাবত শুনে আসছে এমন কটুক্তি। সহ্য হলো না আজ আর। আঁখি জোড়া থেকে বৃষ্টির ফোঁটার ন্যায় অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়তে লাগলো। নিজের মাঝে রাখা এতো দিনের ক্ষোভ বের করার চেষ্টা করলো। চাপা আওয়াজে বলে উঠলো,,,

“তুমি মানুষ? তুমি বাবা? তোমার মতো পাষাণ বাপ আর কারো না হোক। তোমাকে আমি ঘৃণা করি, ভয়ংকর রকম ঘৃণা করি। আমার মা মরতে পারেনি তুমি বিয়ে করে এনেছো এই তোমার ভালোবাসার নমুনা? গত তিন বছর যাবত আমার উপর দিয়ে কি যাচ্ছে জানো তুমি? তোমার নতুন বউ যা বলে তাই শোন, আমার পক্ষের কথাটা শোনার কি প্রয়োজন মনে করেছো কখনো?”

স্নিগ্ধার বাবা আজমল হোসেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন মেয়ের এরূপ কথাবার্তা শুনে। সে তো কল্পনাও করেনি মেয়ের অবস্থা এমন। ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য বেশির ভাগ সময়েই তিনি বাইরে থাকেন। এই শহর ওই শহর করে বেরান। প্রিয়তমা স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একা হয়ে গিয়েছিলো তার মেয়েটা। তখন মেয়ের সঙ্গের প্রয়োজন ছিলো কারণ সে তো সময় দিতে পারছিলো না মেয়েকে। স্নিগ্ধার মানসিক অবস্থা প্রচুর খারাপ ছিলো। মেয়ের কথা চিন্তা করে একজন বন্ধ্যা নারীকে বিয়ে করেন। আজমল হোসেন পাশে থাকা সোফায় ধপ করে বসে পরেন।

যেই মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে আরেকটা বিয়ে করলেন সেই মেয়েকেই সুখ দিতে পারলেন। নিজের উপরই রাগ হলো তার। রাগ ক্ষোভে পরিণত হলো। পাশে থাকা টেবিলের উপরের জিনিস মেঝেতে ছুঁড়ে মারলেন। স্নিগ্ধা চমকে উঠলো। আজমল হোসেনের আঁখিজোড়া রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। স্নিগ্ধা আতঙ্কে দু পা পিছিয়ে গেলো।

“রাহেলা রাহেলা”

আজমল হোসেনের দ্বিতীয় স্ত্রী রাহেলা বেগম শোবার রুম থেকে দ্রুত পায়ে বের হলেন। আজমল হোসেনকে দেখে তিনি ভীত হলেন। ভীতু দৃষ্টিতে তাকালেন আশেপাশে। আজমল হোসেন ঝড়ের গতিতে এসে রাহেলা বেগমের গালে দু’টো চড় বসিয়ে দিলেন। থাপ্পড়ের গতি এতোটাই ছিলো যে তিনি মেঝেতে ছিটকে পড়লেন। রাহেলা বেগম স্নিগ্ধার দিকে তাকাতেই বুঝে গেলেন এই মেয়ে সব বলে দিয়েছেন। তিনি দ্রুত উঠে আজমল সাহেবের কাছে এসে বলেন,,

“তুমি বিশ্বাস করো আমি কিছুই জানি না স্নিগ্ধা বানিয়ে বলেছে সব”

আজমল হোসেনে রাহেলা বেগমকে আরেকটা থাপ্পড় মেরে বলেন,,,
“ছিহ তোমার মতো মহিলাকে আমি আমার স্ত্রী করেছি ভাবতেও ঘৃণা লাগছে। আমার মেয়ের জীবনটা আমি সাজাতে গিয়ে নিজ হাতে নষ্ট করেছি। তোমাকে আমাদের আর প্রয়োজন নেই। তোমার মতো মহিলার সাথে আমি দু মিনিট ও থাকবো না। দয়া করে স সম্মানে বাড়ি থেকে আধাঘন্টার মধ্যে বের হয়ে যাবা। কাবিনের টাকা আর ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিবো”

আজমল হোসেন রাহেলা বেগমকে কথা বলার আর কোনো সুযোগ না দিয়ে স্নিগ্ধার হাত ধরে স্নিগ্ধাকে নিয়ে তার রুমে চলে আসে। স্নিগ্ধা এতোদিন পর বাবার স্নেহ মমতা পেয়ে ঝাপিয়ে পরে তার বুকে। আজমল হোসেনও যত্ন সহকারে মেয়েকে আগলে নেন। অনেক অন্যায় করেছেন মেয়ের সাথে আর নয়। আজ থেকে একটুও দুঃখ পেতে দিবেন না মেয়েকে। বাবা মেয়ের মান অভিমানের পালা শেষ হলো। আজমল হোসেন মেয়েকে কথা দিলেন আর কখনো তাকে কষ্ট পেতে দিবেন না।

“স্যার সকালে গিয়েছিলেন ভার্সিটিতে?”

রাহিয়া কথাটা বলে ঠোঁট টিপে হাসলো। সে তো আগে থেকেই জানে জাহিন গিয়েছিলো। তবে এখন মন চাইলো শুনতে। আসলে মন চাইলো না জাহিনের সাথে কথা বলতে মন চাইলো। জাহিন পড়া বাদে অতিরিক্ত কোনো কথা বলে না। রাহিয়া যদি বলে তাহলে হু হা করে জবাব দেয়।জাহিন চশমাটা ঠিক করে রাহিয়ার দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলো,,“হ্যাঁ গিয়েছিলাম”

রাহিয়ার মনটা ভীষণ খারাপ হলো। পুরুষটি তার দিকে তাকিয়ে কখনো দেখেনি। আচ্ছা তার চেহারা কি খুব খারাপ? যে তার তাকাতেও ইচ্ছে করে না। রাহিয়ার জানতে ইচ্ছে করলো। তবে তা সম্ভব নয়। রাহিয়ার ভাবনার মাঝেই জাহিন আবার বলে উঠলো,,

“কি হলো কোথায় হারালেন রাহিয়া?”

রাহিয়ার হুশ ফিরলো। একটু লজ্জা পেলো বোধ হয় মেয়েটি। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল,,,“কোথাও না স্যার”

“আচ্ছা ঠিক আছে আপনার সমস্যা গুলো বলুন আজ আমি দেখিয়ে দিচ্ছি”

রাহিয়া সব বাদ দিয়ে পড়ায় মনোযোগ দিলো। পড়া সম্পূর্ণ হতেই জাহিন মাথা নিচু করেই বেরিয়ে গেলো। রাহিয়া বিষন্ন মন নিয়ে রাফার রুমে আসলো। রাফা তখন পড়ছিলো। সামনেই পরীক্ষা আছে তার। রাহিয়া এসে বিছানায় বসে বিষন্ন কন্ঠে বলল,,,

“আপু স্যার তো আমার দিকে তাকায়ই না”

রাফা বই বন্ধ করে চেয়ার ঘুরিয়ে বসে রাহিয়ার দিকে তাকায়। তাদের দু বোনের সম্পর্ক খুব ভালো। যদিও রাফার থেকে রাহিয়া চার বছরের ছোট। দু’জন দু’জনকে সব বলে। মিহানের কথাও জানে রাহিয়া। রাফা মৃদু হেসে বলে,,

“বোন যে আমার তার স্যারের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে তা বেশ বুঝতে পারছি। তবে তোর স্যারের দেখ কোনো ভালোবাসার মানুষ আছে কি না। থাকলে তো তুই আর সুযোগ পাচ্ছিস না”

“আপু এমন কথা বলো না।”

রাহিয়া কথাটা বলেই রাফার রুম থেকে বের হয়ে গেলো। রাফা হাসলো। যদি থাকে তখন তো কিছু করার নেই তাই না। তবে সে মনে প্রানে চাইছে না থাকুক। রাহিয়া রুমে এসে দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে পরে। আসলেই তার তো এই কথা মাথায় আসেনি। সত্যিই তো যদি জাহিনের প্রেমিকা থাকে,ভালোবাসার মানুষ থাকে। কি করবে তখন সে। জাহিনকে যে সে অন্য কারো পাশে সহ্য করতে পারবে না। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তার এই কথা ভাবলে। সে কি তবে ভালোবেসে ফেললো জাহিনকে।

“কি মায়ায় বাঁধলেন আমায়, যন্ত্রণা হচ্ছে হৃদয়ের অতলে। এই যন্ত্রণা কমানোর জন্য হলেও আমার আপনার সান্নিধ্যে চাই জাহিন”

ধূসর, নাফিজ, উমেদ এখন ফাহাদের সামনে বসে আছে। ফাহাদ মাথা নিচু করে অপরাধীর ন্যায় বসে আছে। ধূসরের প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। এই ছেলেকে সেদিন তারা কত করে বুঝালো আজ আবার আত্নহত্যা করতে গিয়েছে। ঠিক সময় ফাহাদের বাবা ভাই দেখে ফেলেছিলো বলে আজকের মতো রক্ষা পেয়েছে। উমেদ খুব কষ্টে আটকে রেখেছে ধূসরকে। না হয় এতোক্ষণে ফাহাদের গালে দু’টো থাপ্পড় পড়ে যেতো।

উমেদ ফাহাদকে জিজ্ঞেস করলো,,
“কেনো করতে চাইছিলি এমন?”

ফাহাদ কেঁদে ফেলে। এরপর কম্পিত কন্ঠে বলে,,„“আমি সহ্য করতে পারছি না। সে অন্য কারো তাকে অন্য কেউ স্পর্শ করছে এ ব্যাথা সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। পারছি না আমি।”

তিন বন্ধু বুঝলো এবার। ধূসর খুব ভালো করেই উপলব্ধি করতে পারছে ফাহাদের কষ্ট। সে তো কল্পনা ও করতে পারে না নিবেদিতা অন্য কারো হবে। সেই খানে ফাহাদের ভালোবাসার মানুষ অন্য কারো হয়েছে তার চোখের সামনেই। ধূসর ফাহাদের পাশে এসে বসলো। কাঁধে হাত রাখতেই ছেলেটা ধূসরকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করলো। পুরুষের ভালোবাসা ভয়ংকর, যে নারী পায় সে আসলেই খুব ভাগ্যবতী।

ফাহাদ কিছুটা শান্ত হলে ধূসর বলে,,,
“ফাহাদ শান্ত হ। আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। তিনি তোর জন্য হয়তো আরো ভালো কাউকে রেখেছেন।”

ফাহাদ ধূসরকে থামিয়ে দিয়ে বলে,,“আমার তো ভালো কাউকে চাই না ধূসর আমার তো ওকেই চাই”

“জানি মন মানতে চাইছে না। তবুও কোনো রাস্তা খোলা নেই এখন। সে এখন অন্য কারো চাইলেও তুই তাকে পাবি না। শুধু শুধু নিজেকে কষ্ট দিয়ে কি লাভ?”

“মন যে বুঝতে চায় না”

“বোঝাতে হবে। নিজের অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখতে হবে। যে তোকে চায় না তার জন্য নিজেকে বিষাদে ডুবিয়ে রাখার মানে হয় না। ভুলতে হবে এখন তাকে। সে এখন তোর জন্য নিষিদ্ধ বুঝেছিস?”

ফাহাদ বুঝলো কি না কে জানে। তবে মাথা নাড়ালো। তিন বন্ধু মিলে আরো কিছুক্ষণ বুঝালো তাকে। এরপর বন্ধুর মন ভালো করতে বের হলো তিন জন বাইক নিয়ে। চারজন কিছুক্ষণ এর জন্য না হয় নেটওয়ার্কের বাইরে চলে গেলো।

#চলবে~