প্রেমের তাজমহল পর্ব-০১

0
187

#প্রেমের_তাজমহল
#সূচনা_পর্ব
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

“এমপিদের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র
ফুল যায় পৈ*চা, এমপিরা হয় লু*ইচ্চা”

উক্ত কথায় কিছুটা দূরত্বে দন্ডায়মান পুরুষটির মাঝে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল না। কথাটি প্রভাবে মানুষটির রণ মূর্তি ধারণ করার কথা কিন্তু মানুষটি সম্পূর্ণ শীতল চোখে চেয়ে আছে। নিজের চরিত্র নিয়ে এমন কটু কথা শুনেও একটা মানুষ কিভাবে এতটা নির্লিপ্ত থাকতে পারে তা ধারণা ছিল না আনায়া নামক রমণীর। সামনের মানুষটিকে রাগাতে না পেরে নিজেই কিছুটা ভড়কে গেল। মুহূর্তের ব্যবধানে পুরুষটিকে নিজের অনেকটা কাছে অনুভব করল। কানের কাছে ফিসফিস স্বরে বলল,
“শুরু করবো নাকি?”

আনায়া কিছু না বুঝেই জিজ্ঞেস করল,
“কি?”

আনায়ার বোকামোতে পুরুষটি দুস্টু হাসল। দুস্টু স্বরে বলল,
“লু*চুগিরি”

কথাটা বলেই আনায়ার কানের লতিতে ওষ্ঠ জোড়া ছুঁইয়ে দিল। আচমকা এমন স্পর্শে আনায়া কেঁপে উঠল। ছিটকে স্বরে আসল পুরুষটির কাছ হতে।
সামনে দন্ডায়মান পুরুষটির ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।

আনায়া পূর্ণ দৃষ্টিতে পুরুষটির পানে চাইল। তার সামনে দন্ডায়মান বর্তমান সময়ের এমপি “আশিয়ান সিকদার অর্ণব” দাঁড়িয়ে আছে। মুখে লেগে আছে নজর কাড়া সুন্দর হাসি। নিঃসন্দেহে সে একজন সুঠামদেহী সুদর্শন পুরুষ। তার সৌন্দর্যে যে কেউ মুগদ্ধ হবে। কিন্তু পুরুষটির নজর কাড়া সৌন্দর্য ঘায়েল করতে পারল না আনায়া নামক রমনীকে। সে বর্তমানে রণ মূর্তি ধারণ করেছে। আনায়া রণ মূর্তি ধারণ করে এগিয়ে গেল অর্ণবের দিকে।
“আপনার লজ্জা লাগলো না একটা অপরিচিত মেয়েকে স্পর্শ করতে?”

“লজ্জা মেয়েদের ভূষণ, ছেলেদের না। আর তুমি আমার ভবিষ্যত বউ তোমার কাছে লজ্জা পাওয়ার কিছুই নেই”

আনায়া রাগী স্বরে বলল,
“আমি জীবনেও আপনার মতো লুচু লোককে বিয়ে করবো না। আমি বাবা কে না করে দিবো”

অর্ণব দুইপা এগিয়ে আনায়ার চোখে চোখ রেখে বলল,
“বিয়ে তোমার আমাকেই করতে হবে মেয়ে। আমার কাছ থেকে তোমার নিস্তার নেই”

আনায়া রেগে কিছু বলবে তার পূর্বেই দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এল,
“আপু নিচে তোমাদের ডাকছে। আর কতো কথা বলবে? এখনই প্রেম আলাপ শুরু করে দিলে নাকি?”

আনায়ার রাগে যেন ঘি পড়ল। ইচ্ছে করছে দরজার ওপাশে থাকা মিহি আর অর্ণবকে একসঙ্গে পঁচা পানিতে চুবাতে। আনায়া গিয়ে দরজা খুলে রাগী দৃষ্টিতে মিহির দিকে তাকাল। মিহি কেবলা মার্কা হাসি দিয়ে সেখান থেকে কেটে পড়ল। আনায়া অর্ণবের দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিচে চলে গেল। অর্ণব আনায়ার পিছু পিছু নিচে এল। দুই পক্ষের মাঝে কথা হলো বেশ কিছুক্ষন। অবশেষে সিন্ধান্ত নেওয়া হলো আনায়ার বাবা সবার সাথে আলোচনা করে পড়ে তাঁদের মতামত জানাবেন। অর্ণবের পরিবার হাসি মুখে তাঁদের থেকে বিদায় নিল। অর্ণব যাওয়ার আগে আনায়া কি মনে করে এক বার তাকাল অর্ণবের দিকে। অর্ণব চোখ টিপ দিল আনায়কে। বিষয়টা কেউ না দেখলেও নজর আড়ালো না মিহি আর নীলিমার। দুজনে দুজনের দিকে তাকাল অতঃপর আনায়ার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দিল। আনায়া রাগ করে উপরে চলে এল।

সেহরিশ আনায়া, ব্যবসায়ী আশরাফ খান এবং আশালতা বেগমের একমাত্র কন্যা। আনায়ার বড় দুইজন ভাই রয়েছে।আনায়ার বড় ভাই আব্দুল্লাহ খান আয়ান। আয়ানের স্ত্রী নীলিমা আর তাঁদের চার বছরের কন্যা নাদিরা। ছোটো ভাই আদ্রিয়ান খান আবির। আনায়া দের যৌথ পরিবার। আশরাফ সাহেবরা দুই ভাই,তার ছোটো ভাই আকরাম খান। আকরাম খানের স্ত্রী মালিহা বেগম। তাঁদের দুই ছেলে মেয়ে মাহির এবং মিহি। মাহির অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে এবং মিহি ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। আশরাফ সাহেব, আকরাম সাহেব, আয়ান এবং আবির সবাই মিলে ব্যবসা দেখা শোনা করে।

আশিয়ান সিকদার অর্ণব, ইমতিয়াজ সিকদার এবং মেহনাজ বেগমের একমাত্র ছেলে। অর্ণবের একটা ছোটো বোন অহনা। ইমতিয়াজ সিকদাররা তিন ভাই বোন। ছোটো ভাই ইলিয়াস সিকদার তার স্ত্রী জেসমিন বেগম। তাঁদের দুই ছেলে এক মেয়ে জারিফ, জিহাদ, জিয়া। ইমতিয়াজ সাহেবের একমাত্র বোন রেহানা বেগম। তার একমাত্র মেয়ে লাবণ্য। অর্ণবের দাদা ইশতিয়াক সিকদার ছিলেন একজন তুখোড় রাজনীতিবিদ। সেই সূত্রে তার বাবাও রাজনীতিতে জড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু অর্ণবের চাচা রাজনীতিতে না জড়িয়ে নিজের শখের পেশা ডাক্তারি বেছে নিয়েছেন। অর্ণবের ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল দাদা আর বাবার মতো রাজনীতি করবে। তাই বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে আসে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে। এবার এমপি নির্বাচনে বিপুল ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে।

বিছানায় বসতেই কিছুক্ষন পূর্বের ঘটনা মনে পড়ল।
আনায়া দুপুরে খেয়ে শুয়ে ছিল হটাৎ নীলিমা হাতে কিছু শাড়ি নিয়ে ঘরে এল। কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই নীলিমা হাতে একটা নিল শাড়ি ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“শাড়িটা পড়ে আয়”

আনায়া অবাক হলো হটাৎ শাড়ি পড়ার কথা শুনে। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“হটাৎ শাড়ি পড়বো কেন?”

নীলিমা ঝাড়ি দিয়ে বলল,
“বেশি কথা না বলে শাড়ি পড়ে আয়”

আনায়া কথা না বাড়িয়ে সুন্দর করে শাড়ি পড়ে এল। নীলিমা ওর মাথায় সুন্দর করে ঘোমটা দিয়ে দিল। অতঃপর ওকে নিয়ে নিচে ড্রয়ইং রুমে নিয়ে আনায়ার বাবা আশরাফ সাহেবের পাশে বসিয়ে দিলেন। এতক্ষনে আনায়া বুঝতে পারল শাড়ি পড়ার রহস্য। ভিতরে ভিতরে রাগ করলেও তা প্রকাশ করল না। ভদ্র মেয়ের মতো তাঁদের সালাম দিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল। অর্ণবের মা মেহনাজ বেগম আনায়াকে নিয়ে তার পাশে বসালেন। অনেক প্রশ্ন করলো সে আনায়াকে আনায়া হাসি মুখে সব গুলো প্রশ্নের উত্তর দিল। মেহনাজ বেগম হেসে আশরাফ সাহেবের উদ্দেশ্যে বল,
“ভাই সাহেব আপনার মেয়েকে আমাদের অনেক পছন্দ হয়েছে। আপনার মেয়েকে আমি আমার আরেকটা মেয়ে বানিয়ে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে চাই, আপনি কি বলেন”

আশরাফ সাহেব হাসলেন। হেসে বলেন,
“আমার মেয়ে যদি রাজি থাকে তাহলে আমার অমত নেই”

মাঝ থেকে আবির বলে উঠল,
“বাবা আমার মনে হয় ওদের দুজনকে আলাদা কথা বলতে দেওয়া দরকার, যেহেতু ওদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়”

আশরাফ সাহেব সম্মতি জানালেন। নীলিমা আনায়াকে নিয়ে তার ঘরে এল। পিছু পিছু অর্ণব ও এল। নীলিমা তাঁদের দুজনকে রেখে চলে গেল। এরপরের ঘটনা তো আপনাদের জানা।

আনায়া বিছানায় থেকে উঠে গিয়ে আলমারি খুলল। আলমারির একটি গোপন ড্রায়ার খুলে তার ভিতর থেকে একটা চিঠি বের করল। তাতে গোটা গোটা অক্ষরে লিখা,
“মায়াবতী” তোমার ওই কাজল কালো চোখের মায়ায় পড়েছি আমাকে বারংবার। ডুবেছি তোমার ঝিল আঁখিদয়ে। তোমার আঁখিদয়ের তির্যক চাহনি আমায় ঘুমাতে দেয় না। চোখ বুজলেই তোমার মায়াবী মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠে”

চিঠিটা পড়ে আনায়ার মুখের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। মনে পড়ে গেল মানুষটার কথা। মুহূর্তের ব্যবধানে হাসি মাখা মুখে এক রাশ ঘৃণা লক্ষ্য করা গেল। আনায়া চিঠিটা আগের জায়গায় রেখে আলমারি বন্ধ করে দিল।

চলবে।