প্রেমের তাজমহল পর্ব-১২+১৩+১৪

0
109

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব১২
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

গভীর রাত, নিকষ কালো আঁধার কাটিয়ে ধরণীতে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে চাঁদ। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে আনায়া। এতক্ষন অতীত স্মরণে মগ্ন ছিল। হটাৎ ধ্যান ভেঙ্গে যেতেই নিজের অবস্থান খেয়াল হলো। রাত অনেক হয়েছে তবে আনায়ার সেই খেয়াল নেই। হাত বারিয়ে পাশে থাকা ফোনটা নিয়ে সময় দেখল একটা বেজে ছত্রিশ মিনিট। আনায়া আশেপাশে তাকিয়ে দেখল চাঁদের আলোয় আলোকিত ধরণী। তার জীবনেও যদি এক ফালি আলো নিয়ে কারো আগমন ঘটতো, কাটিয়ে দিতো সকল আঁধার। তবে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেত? সত্যি কি কেউ নেই যে আনায়ার জীবনে আলো নিয়ে আসবে। তাকে এই অতীত নামক আঁধার থেকে মুক্তি দিবে। মনে কোণে উঁকি দিল ‘আশিয়ান সিকদার অর্ণব’ নামটা। আনায়ার মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে মানুষটাকে আঁকড়ে ধরে অতীত ভুলে নতুন করে সব শুরু করতে। মানুষটার মুখে ভালোবাসার কথা শুনে তার প্রেমে পড়তে ইচ্ছে হয়। প্রেম? প্রেম যে অভিশপ্ত। আনায়া মাথা থেকে সকল ভাবনাকে বিদায় দিল। এখন ওর ঘুমানো উচিত রাত অনেক হয়েছে।

ভয়ানক স্বপ্ন দেখে লাফ দিয়ে উঠে বসল আনায়া। ওর গাঁ বেয়ে ঘাম ঝরছে। ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা ওর। আশেপাশে লক্ষ্য করে বোঝার চেষ্টা করলো ও কোথায় আছে। নিজেকে নিজের ঘরে দেখে কিছুটা সস্থির নিঃশ্বাস ফেলল। পাশে টেবিলের ওপর রাখা গ্লাসে পানি নিয়ে ধক ধক করে খেয়ে নিল । এখন কিছুটা ভালো লাগছে। অনেকটা সময় নিয়ে নিজেকে সামলালো। এটা নিছক স্বপ্ন ছাড়া কিছু না, আর স্বপ্ন কখনো সত্যি হয় না। নিজেকে এই বুঝ দিয়ে আনায়া ফ্রেশ হতে চলে গেল।

থাই গ্লাসের পাশে দাঁড়িয়ে আনায়া বাহিরের পরিবেশ দেখছে। পাশে রাখা চায়ের কাপ অবহেলায় পড়ে রয়েছে। চা টা এতক্ষনে বোধ হয় ঠান্ডা হয়ে গেছে। আনায়ার সেদিকে বিন্দু মাত্র খেয়াল নেই। ওর মনটা আজ খুবই অশান্ত। কোনো কাজেই ওর মন বসছে না। কিছুতেই স্বপ্নের কথা ভুলতে পারছে না। মন আনচান আনচান করছে। আচমকা কাল রাতে নিশানের পাঠানো ম্যাসেজ এর কথা মনে পড়ল। নিশান ওর কাছের মানুষ বলতে অর্ণব কে বুজিয়েছে। তার মানে নিশান কি অর্ণবের কোনো ক্ষতি করবে? করতেও পারে, ওই নিকৃষ্ট মানুষটার দ্বারা সবই সম্ভব। আনায়া সময় ব্যায় না করে দ্রুত ডায়াল করলো অর্ণবের নাম্বারে। বাজতে বাজতে ফোন কেটে গেল। কেউ রিসিভ করছে না। আনায়ার ভয় হতে শুরু করলো। নিশান অর্ণবের কিছু করেনি তো? আনায়া পুনরায় অর্ণবের নাম্বারে ডায়াল করলো। এইবারও বাজতে বাজতে কল কেটে গেল। আনায়ার চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে। কিছু হলো নাতো। ও লাগাতার ফোন দেওয়া শুরু করলো অর্ণবের নাম্বারে। ষষ্ঠ বারের বেলায় ফোন তুলল।
ওপর পাশ থেকে তাপস বলল,
“হ্যালো, কে বলছেন?”

আনায়া হন্তদন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনার স্যার কোথায়? সে কেমন আছে? তার কি কিছু হয়েছে? ফোন তুলছে না কেন? কি হলো কথা বলছেন না কেন? জবাব দিন”

আনায়ার এতো এতো প্রশ্নে তাপস বেচারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। কোনো রকম নিজেকে সামলে বলল,
“ম্যাম স্যার মিটিংয়ে আছেন। স্যার একদম সুস্থ আছে। তার কিছুই হয় নি। মিটিংয়ে থাকা কালীন ফোন সাইলেন্ট থাকে তাই খেয়াল করেনি”

“আপনি আপনার স্যার কে ডাকেন। বলেন আমার তার সাথে কথা আছে”

তাপস আনায়াকে লাইনে থাকতে বলে অর্ণবের কাছে গেল। অর্ণব পার্টি অফিসে একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে ব্যাস্ত। তাপস অর্ণবের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“স্যার আপনার ফোন এসেছে, কথা বলুন”

অর্ণব দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুমি জানোনা আমি মিটিংয়ের সময় ফোন রিসিভ করি না, ইডিয়েট। কল কেটে ফোন সাইলেন্ট করে রেখে দেও, যার প্রয়োজন পরবে সে পরে আবার কল করবে”

“স্যার একবার আমার কথা তো শুনুন”

“আর একটা কথা বললে তোমার চাকরি নট করে দিবো আমি”

তাপস অসহায় মুখ করে বাহিরে বেরিয়ে এলো। আনায়াকে অর্ণবের বলা কথা গুলো বলতেই আনায়া রাগী কণ্ঠে বলল,
“আপনার স্যার এর মিটিংয়ের গুল্লি মারি, ওনাকেও বলুন আগে আমার ফোন রিসিভ করতে। নাহলে আমি আপনার মাথা ফাটিয়ে ফেলবো”

তাপস বেচারা পড়েছে ফাঁসাদে। একজন বলছে চাকরি নট করে দিবে, আরেকজন বলছে মাথা ফাটিয়ে ফেলবে। তাপস করবে তো কি করবে? তাপস আবার অর্ণবের কাছে গেল। অর্ণব ওর দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে আছে তাপস সেটা তোয়াক্কা না করে বলল,
“স্যার ম্যাম ফোন দিয়েছে। আপনার সাথে এখনই কথা বলতে চাইছে। আমি তাকে বলেছি আপনি বিজি আপনাকে ডিসটার্ব করা যাবে না কিন্তু ম্যাম বলেছে আপনাকে না বললে ম্যাম আমার মাথা ফাটিয়ে দিবে”

অর্ণব চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“তোমার মাথা ফাটানোই দরকার, ইডিয়েট। আগে বলবে তো যে তোমার ম্যাম ফোন দিয়েছে। তাহলেই এতো কিছু হতো না”

অর্ণব ‘এক্সকিউজ মি’ বলে মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে নিজের কেবিনে গেল। ডায়াল করল আনায়ার নাম্বারে। সাথে সাথে রিসিভ হলো, মনে হচ্ছে ওপর পাশের ব্যক্তি ফোন হাতে নিয়ে বসে ছিল তার অপেক্ষায়। অর্ণব কিছু বলবে তার আগেই আনায়া রাগী কণ্ঠে বলা শুরু করল,
“কোথায় থাকেন সারাক্ষন যে ফোন দিলে পাওয়া যায় না? কোনো মহাভারত অশুদ্ধ করছিলেন?”

অর্ণব দুস্টু হেসে জিজ্ঞেস করল,
“হটাৎ প্রেয়সীর এতটা উতলা হয়ে আমাকে খোঁজার কারণ কি?”

আনায়া অশান্ত স্বরে বলল,
“আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই, এখনই”

“এখনই?”

“হ্যাঁ, কোনো? কোনো সমস্যা?”

“না, কোনো সমস্যা নেই। প্রেয়সীর জন্য অর্ণব সিকদার সব সময়ই ফ্রি থাকে”

অতঃপর দুস্টুমির ছলে বলল,
“প্রেয়সীর ডাক কখনো উপেক্ষা করতে নেই, বলা তো যায় না প্রিয়সী কখনো খুশি হয়ে দু চারটা চুমু দিলেও দিতে পারে”

আনায়া বিড়বিড় করে বলল,
“অ*সভ্য পুরুষ”

আনায়া কল কেটে অর্ণবকে লোকেশন ম্যাসেজ করে দিল। নিজেকে ঠিকঠাক করে কাউকে কিছু না বলে গাড়ি নিয়ে একাই বেরিয়ে গেল।

শুনশান রাস্তায় আনায়া গাড়ি থামিয়ে বসে অর্ণবের অপেক্ষা করছে। অর্ণবের গাড়ি আনায়ার গাড়ি থেকে কিছুটা দূরে দার করালো। অর্ণবের গাড়ি থামতে দেখে আনায়া গাড়ির ভিতর থেকে বের হলো। অর্ণব এগিয়ে এদিকেই আসছে। আনায়া এক ধ্যানে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে আছে। সাদা পাঞ্জাবীতে অর্ণবকে আনায়ার নিকট অনেক স্নিগ্ধ লাগছে। আনায়ার কি হলো ও নিজেও জানে না অর্ণব ওর সামনে এসে দাঁড়াতেই আনায়া ওকে জড়িয়ে ধরল। অর্ণব মুহূর্তের মাঝে ভরকে গেল। কি থেকে কি হলো বুঝতে সময় লাগলো। নিজেকে সামলে যখন দেখল আনায়া ওকে নিজ থেকে জড়িয়ে ধরেছে এটা ওর বিশ্বাসই হচ্ছে না। ও ভেবে পেল না ওর কি করা উচিত। ও কি আনায়াকে জড়িয়ে ধরবে? ভাবতে ভাবতে ও নিজেও আনায়াকে জড়িয়ে ধরল।

আনায়া অর্ণব একে অপরকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। আনায়া আর অর্ণব যখন দুজনাতে মত্ত তখনই বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল।

#চলবে?

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব১৩
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে অর্ণবের শখের গাড়িতে। অর্ণব নিশ্চল চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। ওর বুকে গুটিসুটি মেরে মুখ গুঁজে রয়েছে আনায়া। বিস্ফোরণ এর শব্দে অর্ণব আনায়া কে নিয়ে আনায়ার গাড়ির পাশে সরে আসল। অর্ণব আনায়াকে নিজের থেকে সরাতে চাইলো। কিন্তু দেখল মেয়েটা ওকে অনেক শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে। অর্ণব আনায়াকে নিয়েই আশেপাশে তাকিয়ে খোঁজার চেষ্টা করলো কোথায় বিস্ফোরণ হয়েছে তখনই নিজের চোখের সামনে শখের গাড়িটাকে দাউদাউ করে জ্বলতে দেখল। আনায়া বিস্ফোরণের শব্দে আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে অর্ণবকে। ও এখনো মুখ তুলে দেখেনি। এর মাঝে কোথা থেকে দৌড়ে এলো তাপস। এসে হন্তদন্ত হয়ে বলল,
“স্যার আপনারা ঠিক আছেন তো? কিছু হয়নি তো আপনাদের?”

তাপসকে সামনে দেখতেই অর্ণবের টনক নড়লো। ওর সাথে যে তাপসও এসেছিলো সেটা ওর মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। অর্ণব নিজেকে সামলে বলল,
“আমরা ঠিক আছি। তুমি ঠিক আছো তো? তুমি না গাড়িতে ছিলে?”

“আপনি নামার পর আমি গাড়িতেই বসে ছিলাম। হটাৎ একটা ফোন এলো, গাড়িতে নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছিলো না তাই আমি গাড়ি থেকে অনেকটা দূরে গিয়ে কথা বলছিলাম। হটাৎ বিস্ফোরণের শব্দে তাকিয়ে দেখি গাড়িতে আগুন ধরে গেছে”

“সবাই সেফ আছি এতেই আলহামদুলিল্লাহ। গাড়ি একটা গেছে আরেকটা কেনা যাবে”

অর্ণব তাপসকে বলল ফায়ার সির্ভিস কে ফোন দিতে সাথে ওর দলের লোকেদের ফোন দিতে। তাপস ওদের থেকে একটু দূরে যেতেই অর্ণব আনায়ার পানে চাইল। মেয়েটা এখনো একই ভাবে ওর বুকে মিশে আছে। অর্ণব খেয়াল করলো আনায়া কাঁপছে। অর্ণব আনায়াকে ডাকলো,
“আনায়া, এই আনায়া। কি হয়েছে তোমার? এভাবে কাঁপছো কেন? ভয় পেয়েছো? কি হয়েছে বলো আমাকে?”

আনায়া কোনো উত্তর করলো না। অর্ণব আনায়াকে নিজের থেকে সরাতে গেল। অর্ণব আনায়াকে নিজের থেকে সরিয়ে দাঁড় করাতে যাবে তার আগেই আনায়া হেলে পরে যেতে নিল। অর্ণব সাথে সাথে ওকে ধরে ফেলল। অর্ণব লক্ষ্য করলো আনায়ার চোখ বন্ধ। অর্ণব আনায়াকে কলে তুলে নিল ওকে ওর গাড়িতে বসিয়ে পানি খুঁজা শুরু করল। অর্ণব অনবরত পানির ঝাপ্টা দিয়ে যাচ্ছে আনায়ার মুখে কিন্তু ওর চোখ খোলার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অর্ণব আনায়ার গালে হাত দিয়ে ডাকছে,
“আনায়া, এই মেয়ে। চোখ খুলো। চোখ খুলছো না কেন?”

আনায়ার কোনো সারা শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। অর্ণব তাপস কে বলল এদিকটা দেখতে ও আনায়াকে নিয়ে যাচ্ছে। অর্ণব আনায়াকে ঠিক ভাবে বসিয়ে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসল। আনায়ার মাথাটা নিজের কাঁধে রেখে দিল খুব সাবধানতার সহিত। অর্ণব ওর পার্সোনাল ডক্টর কে কল করে আনায়েদের বাড়িতে আসতে বলল।

আনায়ার মা আশালতা বেগম ও নীলিমা অর্ণবের কোলে আনায়াকে দেখে ছুটে আসলেন। অর্ণব আনায়াকে নিয়ে সোফায় শুয়ে দিল। আশালতা বেগম আনায়াকে এরকম অবচেতন অবস্থায় দেখে অর্ণবকে প্রশ্ন করলো,
“অর্ণব বাবা কি হয়েছে আনায়ার? ওকে তুমি এভাবে কোলে করে নিয়ে এলো? ও না সকালে অফিসে গেল, তোমার সাথে ওর কোথায় দেখা হয়েছে? আর ওর অবস্থাই বা এমন কেন?”

“আন্টি ও অজ্ঞান হয়ে গেছে। আমি ডক্টর কে ফোন দিয়েছি উনি কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে আসবে”

নীলিমা অর্ণবকে উদ্দেশ্যে করে বলল,
“অর্ণব তুমি ওকে নিয়ে ওপরে ওর রুমে গিয়ে শুইয়ে দাও বাকি কথা পরেও শোনা যাবে”

অর্ণব আনায়াকে কোলে তুলে ওপরে ওঠা শুরু করল। আশালতা বেগম আর নীলিমাও ওদের পিছু পিছু গেল। অর্ণব খুব সাবধানে আনায়াকে বিছানায় শুইয়ে দিল। এর মাঝেই ডক্টর চলে এলো। ডক্টর আনায়াকে চেক করছে। অর্ণব চিন্তিত হয়ে পায়চারি করছে। ডক্টরের চেকাপ শেষ হতেই অর্ণব জিজ্ঞেস করলো,
“ডক্টর আঙ্কেল ওর সিরিয়াস কিছু হয়েছে কি? হটাৎ অজ্ঞান হয়ে গেল কেন? কোনো সমস্যা?”

“রিলেক্স অর্ণব, এতটা চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। ও হয়তো কোনো কিছু দেখে অনেক বেশি ভয় পেয়েছে তাই অজ্ঞান হয়ে গেছে। আমি সেলাইন দিয়ে যাচ্ছি কিছুক্ষনের মধ্যে ওর জ্ঞান ফিরে আসবে”

ডক্টর আনায়াকে সেলাইন লাগিয়ে দিয়ে চলে গেল। অর্ণব এক পলক চাইলো আনায়ার মুখের দিকে। অতঃপর নীলিমা আর আশালতা বেগমকে ওর খেয়াল রাখতে বলে চলে গেল। আশালতা বেগম জিজ্ঞেস করেছিলেন আনায়ার কি হয়েছে? সুস্থ মেয়েটা কিভাবে অজ্ঞান হয়ে গেল? অর্ণব ওনাকে বুঝিয়ে বলল ওর কাজ আছে বাকি কথা ও আবিরকে বলে দিবে ওর কাছ থেকে জেনে নিতে। অর্ণব আর এক মুহুর্ত দেরি না করে বেরিয়ে এলো আনায়াদের বাড়ি থেকে। আনায়াদের বাড়ির সামনে আগে থেকেই ওর জন্য গাড়ি রাখা ছিলো। ও তাপসকে বলে দিয়েছিলো ওর জন্য গাড়ি পাঠাতে। অর্ণব গাড়িতে বসে কল করলো কাউকে।
“দুই ঘন্টা সময় দিলাম তোমাকে এর মধ্যে আমাকে জানাবে আমার গাড়ি ব্লাস্ট হলো কিভাবে? দুইঘন্টা মানে দুইঘন্টা মনে থাকে যেন”

অর্ণব কল কেটে ডায়াল করলো আবিরের নাম্বারে। আবির ফোন রিসিভ করতেই ওকে বলার সুযোগ না দিয়ে বলল,
“আনায়া অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো ওকে আমি বাসায় দিয়ে এসেছি। আন্টি বার বার আমাকে ওর অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করছিলো আমি বলেছি তোর থেকে জেনে নিতে। তুই কোনো মতে ওদিকটা সামলে নিস। আমাকে ফ্রি হয়ে তোকে সব কিছু বলবো”

“বনুর কি হয়েছে? ও না অফিসে ছিলো, তুই ওকে কোথায় পেলি”

অর্ণব ওকে ধমক দিয়ে বলল,
“বললাম তো ফ্রি হয়ে বলবো। এদিকে অনেক বড় ঝামেলা হয়ে গেছে, তুই ওদিকটা সামলে নিস”

অর্ণব আবিরকে কিছু বলতে না দিয়ে কল কেটে দিল। ওর মাথায় একটাই চিন্তা হটাৎ করে গাড়িটা এভাবে ব্লাস্ট হওয়ার কারণ কি? এটা কি চক্রান্ত? শিওর না হয়ে কিছুই বলা যাচ্ছে না। অর্ণব ব্লাস্ট হওয়ার জায়গায় চলে এসেছে। এতক্ষনে আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। শুনশান রাস্তা হওয়ায় কারো কোনো ক্ষতি হয়নি। আশেপাশে মিডিয়ার লোকের অভাব নেই। এমপির গাড়ি ব্লাস্ট হয়েছে বলে কথা সব নিউজ রিপোর্টার নিউজ করতে আসবে এটাই স্বাভাবিক। অর্ণব গাড়ির ভিতর থেকে ওর শখের গাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখছে। অর্ণব তাপসকে ফোন করে ডেকে বলল এইদিকটা সামলাতে ওর কিছু ভালো লাগছে না।

আনায়ার জ্ঞান ফিরেছে অনেকক্ষন হয়েছে। জ্ঞান ফিরার পড় সবাই অনেক জিজ্ঞাসা করেছে কিন্তু আনায়া মুখ খুলেনি। ও এখনো ঘোরের মধ্যেই আছে। সবাই ওকে এটা ওটা অনেক কিছু জিজ্ঞেস করেছে আবির ওদেরকে থামিয়ে দিয়ে বলেছে আনায়াকে কিছু জিজ্ঞেস করতে না। ওকে রেস্ট নিতে দিতে, যেন ও নিজেকে সামলে নিতে পারে। আশালতা বেগম মেয়েকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে গেছেন। আনায়া এখনো একই ভঙ্গিতে বসে আছে। ওর চোখের সামনে এখনো ব্লাস্ট হওয়ার ঘটনা ভাসছে। কল্পনা হচ্ছে যদি তখন অর্ণব গাড়িতে থাকতো তাহলে ওর কি অবস্থা হতো? ভাবতেই আনায়ার গাঁয়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে।

অন্ধকারে আছন্ন ঘরে এক যুবক রকিং চেয়ারে বসে পাশে রাখা টেবিলে আঘাত করে বলল,
“সিট্। এবারের মতোও বেঁচে গেল । শা*লার কই মাছের জান”

অতঃপর বিশ্রী হাসি দিয়ে বলল,
“কিন্তু পরের বার আর বেঁচে ফিরতে পারবে না। আমি ওকে ধ্বংস করে দিবো, ধ্বংস”

#চলবে?

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব১৪
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

প্রতিটি নিউজ চ্যানেলে একই নিউজ। এমপি আশিয়ান সিকদার অর্ণবের গাড়ি ব্লাস্ট হয়ে আগুন ধরে গেছে। এটা কি দুর্ঘটনা নাকি চক্রান্ত? আবির বাড়ি এসেছে অনেক আগেই। বোনের অসুস্থতার কথা শুনে চলে এসেছে। সন্ধ্যায় ড্রয়িং রুমে বসে সবাই কথা বলছিলো। আবির হটাৎ নিউজ দেখার জন্য টিভি অন করল।আকস্নিক এরূপ নিউজ দেখে আবির কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কখন হলো এসব? তখন অর্ণবের সাথে কথা বলল ও তো কিছুই জানালো না। আবিরের সাথে সাথে অবাক হলো বাড়ির সবাই। আবির পকেট থেকে ফোন বের করে অর্ণবের নাম্বার ডায়াল করলো। কিন্তু ফলাফল শুন্য কেউ ফোন তুলছে না। বাড়ির সবাই একে একে অনেক প্রশ্ন করতে লাগলো আবিরকে। আবির তাঁদের কি জবাব দিবে ও নিজেই তো কিছু জানে না। তাও কিছু একটা বুঝ দিয়ে সবাই কে শান্ত করল। হটাৎ মাথায় এলো আনায়ার কথা। তাহলে আনায়া কি কিছু জানে? আবির দৌড়ে আনায়ার রুমে গেল। আনায়া এখনো একই ভঙ্গিতে বসে আছে। কোনো নড়চড় নেই। মনে হচ্ছে রোবট বসে আছে। আবির আনায়কে অনেক প্রশ্ন করলো। কিন্তু আনায়ার কোনো হেলদোল নেই। ও আগের মতো একই ভঙ্গিতে বসে আছে। কোনো কথার উত্তর দিচ্ছে না। আবির বুঝল এখন আনায়াকে কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। আবির আনায়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

অর্ণব পার্টি অফিসে নিজের কেবিনে বসে আছে। ওর সামনে তাপস চিন্তিত হয়ে পায়চারি করছে। আকস্মিক টেবিলের ওপর রাখা অর্ণবের ফোন ঝংকার তুলে বেজে উঠল। অর্ণব স্ক্রিনে থাকা নাম্বার দেখে সাথে সাথে রিসিভ করল। ওপর পাশ থেকে কি বলছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। অর্ণব হাত মুষ্ঠী বদ্ধ করল। ওর হাতের রগ গুলো ফুটে উঠেছে। মুখ ধীরে ধীরে রক্তিম বর্ণ ধারণ করছে। তাপস হটাৎ অর্ণবের এমন পরিবর্তন দেখে ঘাবড়ে গেল। অর্ণব ফোন রেখে তাপস এর দিকে তাকাতেই তাপস আটকে উঠল। অর্ণবের চোখ গুলো লাল লাল হয়ে গেছে। অর্ণবকে দেখে বোঝা যাচ্ছে ও প্রচন্ড রেগে আছে। কিন্তু হটাৎ অর্ণবের এভাবে রাগার কারণ খুঁজে পেল না। তাপস কোনো কথা না বলে বেরিয়ে গেল।

তাপস বেরিয়ে যেতেই অর্ণবের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল বাঁকা হাসি। এই হাসিতে মিশে আছে ভয়ংকর কিছু।
“তুই এখনো অর্ণবের ভয়ংকর রূপ দেখিসনি। এই ভদ্র মুখোশের আড়ালের অর্ণব ভয়ংকর, বড্ড ভয়ংকর। ধ্বংস খেলা তুই শুরু করেছিস তবে এর শেষ আমি করবো। অর্ণব ছাড় দেয় তবে ছেড়ে মোটেই দেয় না। তোর ধ্বংস আমার হাতে লেখা আছে, তুই শুধু বসে বসে তোর ধ্বংসের প্রহর গোনা শুরু কর। অর্ণব সিকদার খুব শীঘ্রই তোকে ধ্বংস করতে আসছে”

আবির হন্তদন্ত হয়ে অর্ণবের কেবিনে ঢুকল। অর্ণবকে সামনে পেয়ে সাথে সাথেই জড়িয়ে ধরল।
“দোস্ত তুই ঠিক আছিস ? তোর কিছু হয়নি তো? এতো কিছু ঘটে গেল আর তুই আমাকে বললি ও না। নিউজ না দেখলে তো আমি জানতেই পারতাম না এতো কিছু ঘটে গেছে”

অর্ণব আবিরকে নিজের থেকে সরিয়ে বসতে বলল। দুই বন্ধু মুখোমুখি বসে আছে। অর্ণব আবিরকে ভরসা দিয়ে বলল,
“আমার কিছুই হয়নি। আমি একদম ঠিক আছি। ওই মুহূর্তে আমি খুবই বিজি ছিলাম সাথে অনেক টেনশনও ছিলো তাই তোকে জানানোর সময় পাইনি। তুই যখন ফোন দিয়েছিলি তখন আমি ব্লাস্ট হয়েছে যেখানে সেখানে ছিলাম। ওখানে এতো বেশি ভীড় সাথে আরো কিছু সমস্যা ছিলো তাই তোর ফোন ধরতে পারিনি”

থেমে অর্ণব আবার জিজ্ঞেস করলো,
“আনায়ার কি অবস্থা? ও কেমন আছে? ওকে তখন ওভাবে রেখে আসার পর এদিকের ঝামেলায় ওর কথা মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে”

“বনুর সেন্স ফিরার পর থেকে কারো সাথে কথা বলছে না। বাসার সবাই এতো কিছু জিজ্ঞেস করলো কিন্তু ও পুরোটা সময় নিরুত্তর ছিলো। আম্মু ওকে খাইয়ে দিয়েছে। আমি নিউজে তোর খবর দেখে ওর ঘরে গিয়েছিলাম ওকে জিজ্ঞেস করতে। যেয়ে দেখি ও একই ভঙ্গিতে বসে আছে। জানিনা আমার বোনটার হটাৎ করে কি হলো”

অর্ণব কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
“আসলে যখন ব্লাস্ট হয়েছে তখন আনায়া আমার সাথেই ছিলো”

আবির চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“হোয়াট?”

অর্ণব আবিরকে পুরো ঘটনা খুলে বলল। আবির শুনে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।
“আনায়া হয়তো বিষয়টা এখনো মেনে নিতে পারেনি তাই এমন ব্যবহার করছে। তুই ওর সাথে কথা বলে ওকে বোঝা দেখবি ও আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে”

আবির অর্ণবের কথায় শায় জানালো। আরো কিছু সময় দুই বন্ধু মিলে আড্ডা দিল।

সেই ঘটনার পরে পেরিয়ে গেছে আরো এক সপ্তাহ। এই এক সপ্তাহে আনায়া নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছে। আগের মতো হওয়ার চেষ্টা করছে। তবুও না চাইতেই মাঝে মাঝে চোখের সামনে সেই ভয়ংকর দৃশ্য ভেসে উঠে। তখন আনায়ায় মাঝে ভীতি জেগে উঠে। এই কয়েকদিনে আনায়া বাসায়ই সময় কাটিয়ে। ওকে অফিসে যেতে দেওয়া হয়নি। আনায়া বলেছিলো কাজের মধ্যে থাকলে ওর ভালো লাগবে। তবে ওর মা জিননী সে কথা মানতে নারাজ। তিনি কিছুতেই আনায়াকে পুরোপুরি সুস্থ না হয়ে বাড়ির বাহিরে যেতে দিবে না।

আনায়া বিকেলে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে আর পরিবেশটা উপভোগ করছে। এমন সময় পাশে রাখা আনায়ার ফোন বেজে উঠল। আনায়া ফোনটা হাতে নিয়ে সাইলেন্ট করে রেখে দিল। অর্ণব ফোন দিচ্ছে ওকে। সেদিনের পর অর্ণব আনায়াকে অনেক বার ফোন দিয়েছে। আনায়া এক বারও অর্ণবের ফোন তোলে নি। অর্ণব ওকে অনবরত ফোন দিলে ও ফোন সাইলেন্ট বা বন্ধ করে রাখে। আনায়া আকাশের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলে উঠল,
“আমার এই অভিশপ্ত জীবনের সাথে আমি কাউকে জড়াতে চাই না। আমার জন্য কারো ক্ষতি হোক সেটা আমি সেটা একদমই চাই না। আপনি অনেক ভালো মানুষ এমপি সাহেব। আমি চাই আপনি আমাকে ভুলে অন্য কারো সাথে ঘর বাঁধেন। তাকে নিয়ে সুখের রাজ্যে ভেসে যান। আমার ভাগ্যে আপনি নেই। আমার আঁধারে ঢাকা জীবন আঁধারেই রয়ে যাক”

আনায়ার বিরবির করার মাঝে নিচে হর্ণের শব্দ শোনা গেল। আনায়া নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল ওদের বাড়ির নিচে অর্ণবের পুড়ে যাওয়া গাড়ির মতো হুবহু দেখতে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আনায়া ভেবে পেল না গাড়িটা এখানে কি করছে? আর কারই বা গাড়িটা। ওর সকল ভাবনার অবসান ঘটিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল অর্ণব। নিত্য দিনের মতো সাদা পাঞ্জাবী পড়া। হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। অর্ণব চোখ থেকে চশমা সরিয়ে পাঞ্জাবীর বুঁকের কাছটায় ঝোলালো। আনায়া ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে অর্ণবের কাজকলাপ দেখছিলো। ও ভেবেছে অর্ণব হয়তো ওকে দেখবে না। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে অর্ণব ওর ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে ‘হাই’ দিল। আনায়া প্রথমে ভেবেছিল অর্ণব হয়তো আবিরের সাথে দেখা করতে এসেছে। তবে এখন ও বুঝতে পারছে অর্ণব ওর সাথে দেখা করতেই এসেছে। আনায়াধূপধাপ পা ফেলে রুমে চলে গেল। খুব জোরে শব্দ করে ব্যালকনির থাই গ্লাস লাগিয়ে দিল।
অর্ণব নিচ থেকে আনায়ার সকল কার্যকলাপ দেখল। ও ভেবে পাচ্ছে না হটাৎ করে আনায়ার ওকে ইগনোর করার কারণ কি? অর্ণবভিতরে গেল। সবার সাথে দেখা করে কথা বলল। কিন্তু আনায়ার দেখা পেল না। নীলিমাকে আনায়ার কথা বলতেই নীলিমা অনায়াকে ডাকতে গিয়েছিল তবে ফিরে এসেছে একা। আনায়া কোনো ভাবেই অর্ণবের সামনে আসতে চাচ্ছে না। অর্ণব কে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হলো।

#চলবে?