প্রেমের তাজমহল পর্ব-১৮+১৯+২০

0
102

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব১৮
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

অপেক্ষার প্রহর শেষ হতে চলেছে। দেখতে দেখতে শুক্রবার দিনটি চলে এলো। আনায়ার এতো দিনের অপেক্ষার অবসান অবশেষে হবে । আনায়া খুবই এক্সাইটেড তার চিঠির মানুষটাকে সামনাসামনি দেখার জন্য। ভিতরে ভিতরে ভয়ও করছে। আনায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজেকে সাহস দিল এই বলে, “আনায়া তুই এখন আর ছোটো নেই, যথেষ্ট বড় হয়েছিস। এতো সামান্য একটা বিষয়ে এতটা ভয় পেলে চলে? চুরি করতে তো যাচ্ছিস না, তাহলে এতো ভয় কিসের? যাবি মানুষটার সাথে দেখা করবি, সুন্দর করে কথা বলবি, চলে আসবি ব্যাস। এতে এতো ভয় পাওয়ার কি আছে?”।

আনায়া বিকেল হতেই হাল্কা গোলাপি রঙের একটা লং গাউন, সাথে কালো জিন্স। হাতে গোলাপি রঙের হাত ঘড়ি, মুখে হাল্কা পাউডার আর লিপস্টিক। চুলগুলো খোলা ব্যাস এতেই ওর সাজ শেষ। আনায়া নিজেকে নিজে আয়নায় দেখলো না খারাপ লাগছে না ওকে, সুন্দরই লাগছে। কিছুক্ষন পড় অর্ষা এলো। অর্ষা আনায়াকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে বলল,
“দোস্ত তোকে তো পুরো বার্বি ডল, বার্বি ডল লাগছে। মনে হচ্ছে সাজিয়ে রেখে দেই। আজকে তোর চিঠির মানুষটা তোকে দেখে মাথা ঘুরে না পড়লেই হয়”

কিশোরী আনায়া এই সামান্য কথায় লজ্জা পেল। লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল তার গাল । আনায়া অর্ষাকে লাজুক স্বরেই বলল,
“বাজে কথা বাদ দে”

“হয়েছে তোকে আর লজ্জা পেতে হবে না। তাড়াতাড়ি চল নাহলে দেরি হয়ে যাবে”

আনায়া নিচে নেমে ওর আশালতা বেগমকে বলল,
“আম্মু আমি অর্ষার বাসায় যাচ্ছি”

আশালতা বেগম বললেন,
“যাচ্ছ যাও কিন্তু গাড়ি নিয়ে যাও”

আনায়া অসহায় স্বরে বলল,
“সব সময় গাড়িতে যেতে আসতে ভালো লাগে না আম্মু”

আনায়ার সাথে তাল দিতে অর্ষাও বলল,
“আনায়া ঠিক বলেছে আন্টি। আপনি চিন্তা করবেন না আমি যেমন আনায়াকে নিয়ে যাচ্ছি তেমনি আমি ওকে দিয়ে যাবো”

“কিন্তু..”

আশালতা বেগমকে কিছু বলতে না দিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়ল। একটা রিক্সা নিয়ে দুজনে চলে এলো ওদের গন্তব্যে। আনায়ার তর সইছে না তার চিঠির সেই পুরুষটিকে দেখার জন্য। আনায়া গন্তব্যস্থলে এসে দেখল এটা একটা পার্ক। আনায়া আর অর্ষা মিলে পার্কের ভিতরে গেল। আনায়া ভেবে পাচ্ছে না সে কিভাবে তার চিঠির মানুষটাকে খুঁজে পাবে। ও তো মানুষটার বিষয়ে কিছুই জানে না। অর্ষা একটা বেঞ্চে বসল। কিন্তু আনায়া বসল না। ও রীতিমতো পায়চারি করছে আর দাঁত দিয়ে নখ কাটছে। অর্ষা ওকে বসতে বলল। আনায়া অর্ষার কথা কানেই নিল না ও নিজের ধ্যানে আছে। হটাৎ পিছন থেকে ভেসে এলো এক যুবকের কণ্ঠস্বর।
“মায়াবতী”

আনায়া সাথে সাথে পিছু ফিরল। ওর থেকে কিছুটা দূরে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা আসতে আসতে আনায়ার সামনে এসে দাঁড়ালো। আনায়ার কোনো হেলদোল না পেয়ে পুনরায় ডাকলো,
“মায়াবতী”

আনায়া কোনো উত্তর দিতে পারলো না। ও এখনো ঘোরের মধ্যে আছে। অর্ষা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনিই তাহলে চিঠির সেই মানুষটা?”

ছেলেটা হেসে জবাব দিল,
“হ্যাঁ, আমিই সে। আমার নাম নিশান আহমেদ, আপনি?”

অর্ষা হেসে জবাব দিল,
“আমি অর্ষা। আপনার মায়াবতীর বেস্টফ্রেন্ড”

আনায়া তখন ঘোরের মাঝেই আছে। অর্ষা নিশানের সাথে কিছুক্ষন কথা বললো। কিন্ত পুরোটা সময় নিরুত্তর রইল আনায়া। ও ভেবে পেল না এর কারণ। যতটা এক্সাইটমেন্ট ওর মাঝে ছিলো তা যেন নিমিষেই চুর্নবিচুর্ন হয়ে গেল। আনায়া কিছুতেই বুঝতে পারছে না এর কারণটা। কেন যেন ও নিশানকে চিঠির প্রেমিক হিসেবে মেনে নিতে পারছে না। নিজের মনকে বুঝ দিল এই বলে তার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ তাই হয়তো এমনটা হচ্ছে। আনায়া অল্প কিছু সময় থেকে বাহানা দিয়ে অর্ষা কে নিয়ে চলে এলে। আসার পথে অর্ষা ওকে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে তোর? কোনো সমস্যা? ফাইনালি তুই তোর চিঠির মানুষটার দেখা পেলি কিন্তু কথা বললি না কোনো?”

“ভালো লাগছিলো না তাই”

অর্ষা ওকে আর জোর করলো না। সেদিনের পর কেটে গেছে আরো কয়েকটা দিন। এই দিন গুলোতে আনায়া আর কোনো চিঠি পায়নি। আনায়া কিছুটা নিরাশ। একদিন স্কুল শেষে আনায়া বাহিরে বেরিয়ে দেখে নিশান দাঁড়িয়ে আছে। আনায়া নিশানের কাছে যায়। দুজনের মাঝে টুকটাক কথা হয়। তখন আনায়া নিশানকে চিঠির বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে নিশান জানায় এখন থেকে আর কোনো চিঠি নয় ওরা সরাসরি কথা বলবে। আনায়া কথা বাড়ায় না। ও নিশানকে বিদায় দিয়ে বাড়ি চলে আসে। এসে কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে রেখে চিঠি গুলো বের করে। একটা একটা করে আনায়া অনেক গুলো চিঠি পড়ে। চিঠি পড়ার সাথে সাথে আনায়ার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। আনায়া চিঠি গুলো বুকে জড়িয়ে রাখে অনেকক্ষণ সময়।

এভাবেই আনায়ার দিন গুলো কাটতে লাগলো। মাঝে মাঝে নিশানের সাথে দেখা, পড়াশোনা, পড়ার ফাঁকে চিঠি পড়া, পরিবার সব মিলিয়ে আনায়া দিন কাটছিলো। প্রথম প্রথম নিশানের মিষ্টি মিষ্টি কথায় আনায়া ডুবে যেত। কিন্ত দিন যত যেতে লাগলো নিশান আনায়ার প্রতি ততটা এগ্রেসিভ হতে লাগলো। এটা করতে পারবে না, সেটা করতে পারবে না। এটা কোনো করেছো? এখানে কোনো গিয়েছো? আনায়া প্রথমে ভাবল হয়তো নিশান তাকে নিয়ে চিন্তিত তাই এমন করছে। কিন্তু ওর ধারণ ভুল প্রমান করে নিশান দিন দিন সাইকো টাইপ হয়ে যাচ্ছিলো। আনায়া সর্বোচ্চ চেষ্টা করতো মানিয়ে নেওয়া। মাঝে মাঝে নিশানের সাথে আনায়ার তুমুল ঝগড়া লেগে যেত। তখন আনায়ার মনে প্রশ্ন জাগতো আসলেই কি নিশান আনায়ার সেই চিঠির মানুষটা? চিঠির মানুষটা কতটা আবেগ দিয়ে চিঠি লিখতো আনায়ার মনে হতো মানুষটার প্রেমে ডুবে যেতে। কিন্তু নিশানকে দেখে তার তেমনটা কখনোই মনে হয় না। আনায়া নিজের মনের ভুল ভেবে নিজেকে বুঝাতো। এভাবেই নিশানের সাইকোনেস সহ্য করে আনায়ার দিনগুলো চলছিলো।

দেখতে দেখতে আনায়া স্কুল শেষ করে কলেজে উঠেছে । হটাৎ একদিন নিশান আনায়াকে ডাকে দেখা করার জন্য। আনায়া ভদ্র মেয়ের মতো নিশানের সাথে দেখা করতে যায়। তবে ওকে ফিরে আসতে হয় অশ্রুসিক্ত নয়নে। নিশান সেদিন আনায়াকে অনেক কথা শুনায়, অনেক অপমান করে।
“তোমার মতো মেয়ের সাথে রিলেশন কন্টিনিউ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। তুমি খুবই সহজ, সরল মেয়ে যেটা আমার মোটেই পছন্দ না। মেয়ে হতে হবে এট্রাক্টিভ , হট, স্মার্ট, স্টাইলিশ। কিন্তু তুমি কেমন ব্যাকডেটেড। এতটা বড় হয়েছো কিন্তু তোমার মধ্যে এখনো বাচ্চামো রয়ে গেছে যা আমার পছন্দ না। এই পুরো তুমিটাই আমার অপছন্দের। তাই আজ থেকে তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তুমি তো শুধু টাইম পাস ছিলে আমার জন্য। তোমার মতো মেয়ের সাথে টাইম পাস করা যায়, রিলেশন না”

আনায়া সেদিন নিশানের এই তিক্ত কথার বিনিময়ে কোনো কথা বলতে পারেনি। নীরবে শুনেছে সব কিছু। শুধু অশ্রুসিক্ত হয়েছে ওর নয়ন জোড়া, ক্ষত বিক্ষত হয়েছে ওর মন। সেদিনের পর থেকে আনায়া নিজেকে গুটিয়ে নেয়। নিজেকে বদলাতে শুরু করে। ওর এই পরবর্তনে ওর আশেপাশের সবাই অবাক হয়। অর্ষা ওকে অনেক জেরা করে ওর পরিবর্তনের কারণ কি জানতে। আনায়া সেদিন অর্ষাকে সব কিছু খুলে বলে। অর্ষা ওকে বোঝায়।
“একটা বাইরের ছেলের জন্য তুই কেন নিজেকে পরিবর্তন করবি? পরিবর্তন যদি করতে হয় তাহলে নিজের জন্য নিজেকে পরিবর্তন করবি”

আনায়া সেদিন মনোযোগ দিয়ে অর্ষার কথা গুলো শুনেছিলো। সত্যিই তো একটা ছেলের জন্য নিজের পরিবর্তন করার কোনো মানে হয় না। আনায়া নিজেকে আবার স্বাভাবিক রূপে ফিরিয়ে আনে। মাঝে মাঝে চিঠির মানুষটার কথা মনে পড়তেই তিক্ততায় ভরে উঠতো মন। ধীরে ধীরে নিশানের প্রতি আনায়ার মনে ঘৃ*ণার সৃষ্টি হয়। এরপর আনায়া কলেজ শেষ করে সিদ্ধান্ত নেয় দেশের বাইরে যাবে পড়াশোনা করার জন্য। নিজেকে তৈরি করবে নতুন করে। যেই ভাবা সেই কাজ। আনায়া স্কলারশিপ নিয়ে কানাডা চলে যায় পড়াশোনা করতে। সেখানে পড়ার ফাঁকে যেইটুকু সময় পেত সেই সময়টাতে নিজেকে ব্যস্ত রাখতো বিজনেসের কাজে। প্রথমে না পারলেও আনায়া নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতো। সময়ের সাথে সাথে আনায়া নিজেকে নতুন রূপে তৈরি করে। আর ওর মনে এক রাশ ঘৃ*ণা তৈরি হয় নিশানের জন্য।

বর্তমান,
আনায়া স্মৃতি চারণ থেকে ফিরে এলো বাস্তবে। বিরবির করে বলল,
“আমি আপনাকে ঘৃ*ণা করি মিস্টার নিশান আহমেদ। প্রচন্ড ঘৃ*ণা করি আমি আপনাকে”

#চলবে?

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব১৯
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

রোদের তীব্রতায় উত্তপ্ত পরিবেশ। নিস্তব্ধ বাড়িতে একটি মাত্র মানুষ ছাড়া কারো অস্তিত্ব নেই। আনায়া সোফায় শুয়ে কার্টুন দেখছে। ছোটো বেলা থেকেই আনায়া কার্টুন দেখতে পছন্দ করে। বড় হওয়ার পর খুব একটা দেখা হতো না। কারণ ও যখন কার্টুন দেখতে বসতো তখন আবির ওকে এটা ওটা বলে খোঁচাতো তাই আনায়ার কার্টুন দেখা হয় উঠতো না। আজকে কেউ বাসায় নেই তাই আনায়া বিন্দাস মনে কার্টুন দেখছে। অর্ণবদের বাড়িতে আজকে আনায়াদের ইনভাইট করেছে । আনায়া সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে নিচে নামতেই দেখতে পেল সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত। আনায়া নীলিমাকে জিজ্ঞেস করলো,
“ভাবি সবাই এতো ব্যস্ত কোনো? কোথাও যাবে সবাই মিলে?”

নীলিমা জবাব দিলো,
“আজকে অর্ণবদের বাড়িতে আমাদের ইনভাইট করেছে, সেখানে যাওয়া জন্যই এতো ব্যস্ততা”

“আমি তাহলে রেডি হতে যাই”

“তুমি কি কোথাও যাবে?”

“কোনো? তোমাদের সাথে যাবো”

“তুমি তো আমাদের সাথে যেতে পারবে না”

আনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কোনো?”

“বিয়ের আগে শশুরবাড়ি যেতে হয় না, এতে লোকে খারাপ বলবে”

আনায়া অবাক হয়ে বলল,
“আমাদের তো বিয়ে হয়ে গেছে। শশুরবাড়ি আমার আর আমিই যেতে পারবো না এটা কেমন কথা?”

নীলিমা আনায়ার কথায় শব্দ করে হেসে দিল। আনায়ার কাঁধে হাল্কা চাপর দিয়ে বলল,
“বোকা মেয়ে। তোমাদের বিয়ে হলেও তোমাকে তো ওই বাড়িতে উঠিয়ে নেয় নি তাই যেতে পারবে না”

আনায়া মন খারাপ করে বলল,
“যাও তোমরা সবাই”

সবাই রেডি হয়ে অর্ণবদের বাড়িতে চলে গেছে অনেকক্ষণ হবে। আনায়া ওরা চলে যেতেই সেই যে কার্টুন দেখতে বসেছে আর উঠে নি।

অর্ণবদের বাড়িতে আনায়ার পরিবার এসেছে কিছুক্ষন সময় হয়েছে। অর্ণবের মা এতক্ষন রান্না ঘরে ছিলেন বিধায় আসতে পারেন নি। মেহনাজ বেগম হাতের কাজ শেষ করে এলেন সবার সাথে আলাপ করতে। কুশলবিনিময় শেষ হতেই তিনি আশালতা বেগমকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আপা আমার মিষ্টি বউমা কোথায়? তাকে তো দেখছি না”

আশালতা বেগম একটু হেসে বললেন,
“ও বাসায় রয়ে গেছে। জানেনই তো মেয়েদের বিয়ের আগে শশুরবাড়ি আসতে নেই”

মেহনাজ বেগম বললেন,
“এসব আগেকার ধারণা আপা। এখন এই যুগে এসে এগুলো কেউ মানে নাকি? আর আমার বাসায় এতো আনন্দ হবে আর আমার বউমা থাকবে না সেটা হয়। আমি অর্ণবকে বলে দিবো আসার সময় ওকে নিয়ে আসতে”

“অর্ণব বাবাকে তো আসার পর দেখলাম না”

“সে কি ঘরে থাকার ছেলে। এমপি বলে কথা একটা জরুরি মিটিং ছিলো বলে সকালে বেরিয়ে গেল”

মেহনাজ বেগম অর্ণবকে ফোন করে বলে দিলেন আসার সময় আনায়াকে নিয়ে আসতে। অর্ণব ভদ্র ছেলের মতো রাজি হয়ে গেল।

আনায়া খুব মনোযোগ দিয়ে কার্টুন দেখছে হটাৎ ওর পাশে রাখা ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠল। আনায়া ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল অর্ণবের নাম্বার থেকে কল এসেছে। আনায়া বিরবির করে বলল,
“এই অ*সভ্য এমপি কেন এসময় ফোন দিচ্ছে?”

ফোন রিসিভ করে সালাম দিল আনায়া। ওপর পাশ থেকে অর্ণব সালামের জবাব নিয়ে বলল,
“আমি আর কিছুক্ষন পর তোমাকে নিতে আসবো রেডি হয়ে থাকবে”

আনায়া অবাক হলো অর্ণব তাকে নিয়ে কোথায় যাবে? কোনোই বা রেডি হয়ে থাকতে বলছে? আনায়া অর্ণবকে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি আমাকে নিতে আসবেন কোনো? কোথায় যাবো আমরা?”

অর্ণব দুস্টু হেসে বলল,
“হানিমুনে”

আনায়া হতোচকিয়ে গিয়ে বলল,
“মানে?”

“হানিমুন মানে মধুচন্দ্রিমা। বিয়ের পরে মানুষ হানিমুনে যায়, আমিও তোমাকে নিয়ে সেখানেই যাবো। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে থাকো আমি আসছি। আর হ্যাঁ সুন্দর করে শাড়ি পরবে। আমি যেন তোমাকে অন্য কোনো ড্রেসে না দেখি, আর যদি শাড়ি না পরে অন্য কিছু পড়ও তাহলে..”

আনায়া ঢোক গিলে বলল,
“তাহলে”

“বাকিটা সামনাসামনি করে দেখাবো, ফোনে বলা যাবে না”

আনায়া একটু ভাবতেই যখন অর্ণবের কথার মানে বুঝতে পারলো তখন লজ্জায় লাল হয়ে গেল। ওর গাল গুলো ব্লাশ করছে। আনায়া অর্ণবকে কিছু বলতে না দিয়ে কল কেটে দিল। শব্দ করে উচ্চারণ করলো,
“অ*সভ্য পুরুষ”

আনায়া টিভি বন্ধ করে নিজের রুমে এলো। আলমারি খুঁজে বেগুনি রঙের কাতান শাড়ি বের করলো। এক সময় শাড়িটা ওর অনেক পছন্দের ছিলো। কিন্তু খুব একটা পড়া হয়নি। আনায়া ওয়াশরুমে চলে গেল শাড়ি পড়তে। আনায়া কোনোমতে শাড়িটা পরে বের হলো। ও খুব ভালো করে শাড়ি পড়তে না পারলেও চলার মতো হয়। আনায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির কুচি গুলো ঠিক করে নিল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ব্লাউজের ফিতা লাগাতে পারছে না। আনায়া আয়নায় দেখে অনেক বার চেষ্টা করলো কিন্তু কিছুতেই পারছে না। আনায়া হতাশ হয়ে বিছানায় বসে পড়ল। কিছুক্ষন পরে নিচে কলিং বেল বাজতেই আনায়া ধীরে ধীরে নেমে দরজা খুলতে গেল। অর্ণব দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাহিরে। আনায়া অর্ণবকে ড্রয়িং রুমে বসতে বলে নিজের রুমে এলো। হাল্কা সেজে নিল। শাড়ির সাথে ম্যাচিং চুরি সাথে ম্যাচিং কানের দুল পড়লো। সব কিছু পড়া শেষে আনায়া খেয়াল করলো গলাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে তাই গলায় সিম্পল একটা লকেট পড়ল। ব্যাস এতেই ওর সাজ কমপ্লিট। আনায়া পুনরায় চেষ্টা করছে ব্লাউজের ফিতা লাগানোর।

অর্ণব অনেকক্ষন হলো বসে আছে। আনায়ার আসার নাম নেই। তাই ও নিজেই উপরে এলো আনায়াকে নেওয়ার জন্য। আনায়ার ঘরের সামনে আসতেই ওর চোখ আটকে গেল আনায়ার ফর্সা পিঠে যা অনেক টাই দৃশ্যমান। অর্ণব এগিয়ে গেল আনায়ার কাছে। আনায়া হটাৎ করে আয়নায় অর্ণবকে দেখতেই পিছনে ঘুরে গেল।
“আপনি এখানে? নক করে আসবেন তো”

“তোমার আসতে দেরি হচ্ছিলো তাই ডাকতে এলাম। আমার বউয়ের ঘরে আমি আসবো এতে নক করার কি আছে?”

আনায়া অর্ণবের কথার পৃষ্ঠে বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না। আনায়াকে একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অর্ণব জিজ্ঞেস করলো,
“চলো দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের”

আনায়া তবুও নড়লো না। অর্ণব ওকে নড়তে না দেখে বলল,
“কি হলো? কোনো সমস্যা? আমাকে বলো, দেখি আমি কিছু করতে পারি কি না”

আনায়ার অস্বস্থি হচ্ছে। ও কিভাবে অর্ণব কে বলবে ওর সমস্যা।
“আসলে”

“আসলে নকলে বাদ দিয়ে কি সমস্যা সেটা বলো”

আনায়া চোখ বুজে এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল,
“ব্লাউজের ফিতা লাগাতে পারছি না”

আনায়া চোখ খুলল। অর্ণব ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। অর্ণবের দৃষ্টি শান্ত। অর্ণব আনায়াকে বলল,
“ওদিকে ঘোরো। আমি লাগিয়ে দিচ্ছি”

আনায়া উল্টো হয়ে দাঁড়ালো। আনায়ার পিঠ জুড়ে ওর কেশগুচ্ছ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অর্ণব সুন্দর করে আনায়ার চুল গুলো সরিয়ে একপাশের কাঁধে রাখলো। অর্ণবের হাত কাঁপছে। হৃদস্পন্দন মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে। অস্বাভাবিক ভাবে ওর হার্ট লাফাচ্ছে। অর্ণব কাঁপা কাঁপা হাতে ব্লাউজের ফিতা লাগিয়ে দিচ্ছে। ফিতা লাগানোর সময় আনায়ার পিঠে অর্ণবের হাতের স্পর্শ লাগতেই আনায়া শিউরে উঠল। অর্ণব তাড়াতাড়ি করে ফিতা লাগিয়ে দিয়ে সরে আসল। আরো কিছুক্ষন আনায়ার এতটা কাছে থাকলে অর্ণব উল্টো পাল্টা কিছু করে বসতো। অর্ণব যতই সুপুরুষ হোক না কেন বিয়ে করা বউয়ের সামনে নিজেকে কন্ট্রোল করাটা খুবই কষ্টকর।
“আমি নিচে গাড়িতে অপেক্ষা করছি, তোমার সাজগোজ হলে তুমি এসো”

অর্ণব সময় ব্যায় না করে নেমে গেল। আনায়া এতক্ষন দম আটকে ছিলো। অর্ণব ওর এতটা কাছে ছিলো ভাবতেই ওর হাঁসফাঁস লাগছে। আনায়া নিজেকে ঠিকঠাক করে বের হলো। অর্ণব গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আনায়া গাড়ির কাছে যেতেই ওকে উঠতে সাহায্য করলো। অতঃপর নিজে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল। অর্ণব নিজের মতো গাড়ি চালাচ্ছে। আনায়া ভাবছে সত্যই কি অর্ণব ওকে নিয়ে হানিমুনে যাচ্ছে? আনায়ার মনে সংশয় হচ্ছে। তাই ও অর্ণবকে জিজ্ঞেস করেই বসল,
“সত্যি করে বলুন তো আমরা কোথায় যাচ্ছি”

অর্ণব আনায়ার দিকে তাকালো। বেচারি ভয়ে ঘামছে। অর্ণব ওকে আরেকটু ভয় পাওয়াতে বলল,
“হানিমুন যাচ্ছি, এখন কি হানিমুন মানেও বলতেই হবে?”

আনায়া বেচারির অবস্থা নাজেহাল। ও পারে না এখনই কান্না করে দেয় । অর্ণব আনায়ার অবস্থা দেখে শব্দ করে হেসে দিল।
“পাগলী বউ আমার, আমাদের বাসায় যাচ্ছি। তোমার শাশুড়ি মায়ের আবদার তার বউমাকে নিয়ে যেতে হবে। আমি হলাম মায়ের বাধ্য ছেলে তাই তার আবদার রাখতে চলে এলাম তোমাকে নিতে”

আনায়া এতক্ষনে হাফ ছেড়ে বাঁচলো। এতক্ষন ও কি ভয়টাই না পাচ্ছিলো। অর্ণব আনায়ার কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বললো,
“ভেবো না বেঁচে যাচ্ছ। হানিমুনে তো আমি তোমাকে নিয়ে যাবোই তবে সেটা ধুমধাম করে বিয়ের করার পর”

অর্ণব আনায়ার কাছ থেকে সরে আসলো। আনায়া মনে মনে অর্ণবের গুষ্টি উদ্ধার করছে। কিছুক্ষনের মাঝে ওরা অর্ণবদের বাড়িতে চলে এলো। অর্ণব নেমে আনায়ার পাশের দরজা খুলে দিল। হাত বাড়িয়ে দিল আনায়ার দিকে। আনায়া অর্ণবের হাত হাত রেখে নামল। অর্ণব আনায়াকে ভালো করে দেখে থুতনিতে হাত রেখে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“সবই ঠিক আছে কিন্তু কি যেন একটা মিসিং মিসিং লাগছে”

আনায়া নিজের দিকে তাকালো সবই তো ঠিক আছে। অর্ণব আনায়ার বাম কাঁধে ঝুলে থাকা আঁচলটা নিয়ে সুন্দর করে মাথায় দিয়ে দিল।
“এবার ঠিক আছে। এখন মনে হচ্ছে আশিয়ান সিকদার অর্ণবের বউ”

#চলবে?

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব২০
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

অর্ণব আনায়ার হাতের ভাঁজে হাত রাখল। আনায়া চোখ তুলে অর্ণবের দিকে তাকাল। অর্ণব আগে থেকেই ওর দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে চোখি হতেই দুজনেই হেসে দিল। দুজনে হাতে হাত রেখে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো। অর্ণবদের ড্রয়িং রুমে বসে সবাই গল্প করছিলো। কথা বলতে বলতে জিয়ার নজর পড়লো ওদের ওপর। জিয়া খানিকটা চিল্লিয়ে বলল,
“ওই তো ভাইয়া ভাবি এসে গেছে”

আড্ডায় থাকা সকলের দৃষ্টি পড়লো ওদের ওপর। সবাই ওদের হাতের দিকে দৃষ্টিপাত করলো। আনায়া সবার এভাবে তাকানোতে লজ্জা পেল। ও অর্ণবের হাতের মাঝ থেকে নিজের হাত ছুটানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ওকে ব্যর্থ হতে হলো। অর্ণব খুব শক্ত করে ধরে রয়েছে। আনায়া করুণ চোখে অর্ণবের দিকে তাকালো। অর্ণব সেই দৃষ্টি পাত্তাই দিলো না। ও দিব্বি নিজের মতো দাঁড়িয়ে আছে। জারিফ টিটকিরি মেরে বলল,
“আহা কি ভালোবাসা! দুজনের হাতে হাত, চোখে চোখ রেখে ভালোবাসা বিনিময়। কেয়া রোমান্টিক সিন্ হে”

অর্ণব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“আমার বউয়ের হাত আমি ধরেছি, এতে রোমান্টিকের কি হলো আর আনরোমান্টিকেরই বা কি হলো”

অহনা উঠে এসে বলল,
“সেটা তোমার জানতে হবে না। আমাদের ভাবিকে আমাদের কাছে দিয়ে তুমি এখান থেকে যাও”

আনায়াকে নিয়ে অহনা চলে গেল। আনায়াকে সবার মাঝে বসিয়ে দিল। অর্ণব কোমরে হাত রেখে বলে উঠল,
“তবে রে বিচ্ছুর দল, ভাবি টা পেলি কোথায় শুনি?”

“এই তুমি এতো কথা বলছো কোনো শুনি? যাওতো নিজের কাজে যাও”

অর্ণব বিস্মিত, চরম বিস্মিত যাকে বলে। তার ভাই বোনেরা তাকে এভাবে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে এটা মানা যায়? এতো কষ্ট করে কাঠ খড় পুড়িয়ে বিয়ে করে বউ আনলো সে আর ভাবি পেয়ে তারা ভাইকেই পাত্তা দিচ্ছে না এর চেয়ে দুঃখের আর কিই বা আছে? অর্ণব মনের দুঃখে নিজের রুমে চলে গেল। অর্ণবের ভাই-বোনেরা আনায়াকে নিয়ে মেতে উঠলো। মাঝে মেহনাজ বেগম এসে তার আদরের মিষ্টি বউমার সাথে কথা বলে গেছে।

খাওয়ার জন্য ডাকা হলে সবাই খেতে চলে গেল। আনায়া বসে বসে অহনার সাথে গল্প করছিলো। মেয়েটা ভীষন মিষ্টি একটা মেয়ে। এতটুকু সময়ের আনায়ার সাথে অনেকটা মিশে গেছে। আনায়ার অহনাকে অনেক পছন্দ হয়েছে। খাবার জন্য আবার ডাকা হলে অহনা আনায়াকে নিয়ে গেল। অর্ণবের পাশের খালি চেয়ারে আনায়াকে বসিয়ে দিলো। আনায়ার লজ্জা লাগছে অর্ণবের পাশে বসে খেতে। আনায়া উঠতে নিলে পাশে বসা অর্ণব ওর দিকে রক্তিম চোখে তাকাতেই আনায়া বসে পড়লো। আনায়া মাথা নিচু করে খাচ্ছে। হটাৎ ওর কোলের ওপর রাখা বাম হাতে সুড়সুড়ি অনুভব করলো। আনায়া তাকিয়ে দেখে অর্ণব ওর হাতে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আনায়া কিছু বললো না খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। কিন্তু অর্ণব ওকে শান্তি দিল তো? অর্ণব আনায়র হাতে সুড়সুড়ি দিচ্ছে, চিমটি কাটছে, আঙ্গুল নিয়ে নাড়া চারা করছে। আনায়ার অবস্থা এখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ টাইপ। বেচারি না পারছে কিছু বলতে না পারছে সহ্য করতে। আনায়া রাগী দৃষ্টি নিঃক্ষেপ করলো অর্ণবের দিকে কিন্ত অর্ণব সে তো নিজের মতো আছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে ওর চেয়ে ভদ্র ছেলে আর কেউ হতেই পারবে না। আনায়া কোনো মতে খেয়ে উঠে এলো।

আনায়া আর অহনা মিলে অহনার ঘরে গল্প করছে। অহনার আনায়াকে খুব পছন্দ হয়েছে। মনেই হচ্ছে না আজকে ওদের প্রথম বার দেখা হয়েছে। দুজনে মিলে কথা বলার এক পর্যায়ে আনায়া বলল,
“জামাই যেমন তেমন ননদ একে বারে মনের মতন”

সেই সময় আগমন ঘটলো অর্ণবের। বেচারা বউয়ের খোঁজে এসেছিলো। তবে বউয়ের মুখে এমন কথা শুনে ওর ভ্রু জোরে কুঁচকে গেল। আনায়া আর অহনার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“জামাই যেমন তেমন মানে কি? হোয়াট ডু ইউ মিন বাই যেমন তেমন”

অহনা বলে উঠলো,
“তুমি এখানে কি করছো? আমাদের ভাবি-ননদের মাঝে তুমি কি করছো শুনি?”

“আমার বউয়ের কাছে আমি এসেছি এতে কার কি হয়েছে?”

“কানের কাছে বউ বউ করে ঘ্যান ঘ্যান না করে নিজের কাজে যাওতো”

“আমার বউ আছে আমি বউ বউ করবো। তোর লজ্জা লাগে না বিয়ে করে শশুরবাড়ি যাওয়ার বয়সে বাবার বাড়িতে বসে ভাইয়ের থেকে তার বউ কেরে নিচ্ছিস”

“লজ্জা? সেটা আবার কি? খায় নাকি মাথায় দেয়?”

আনায়া বসে বসে দুই ভাই-বোনের ঝগড়া দেখছে। কেউ কারো চেয়ে কোনো অংশে কম যায় না। আনায়া ভাবনায় পরে গেল এই যে তার সামনে দাঁড়িয়ে যেই মানুষটা বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করছে সেই নাকি সভায় বসে এতো এতো মানুষের সামনে ভাষণ দেয়। বড় বড় এমপি মন্ত্রীদের সাথে তার উঠা বসা। অর্ণবকে এই মুহূর্তে দেখলে কেউ সেটা বুঝতেই পারবে না। আনায়ার বিষয়টা ভালো লাগলো। ওর গম্ভীর, কম কথা বলা লোক খুব একটা পছন্দ না। অর্ণবের মতো হাস্যজ্বল ছেলে ওর খুব পছন্দ। দুই ভাই-বোন ঝগড়া করছে আর আনায়া বসে বসে সেটা দেখছে। ওদের ঝগড়া দেখতে দেখতে ওর মনে পড়ে গেল ওর আর আবিরের ঝগড়া মারামারির কথা। ও আর আবির যখন তুমুল ঝগড়া করতো তখন আয়ান এসে দুজনকে থামাতো। কতই না ঝগড়া করেছে দুজন মিলে। যখন আনায়া বিদেশে পড়তে যাবে বলেছে তখন আবির ওর ঘরে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে সেকি কান্না। আবিরের কথা হচ্ছে ও ওর বোনকে কোথাও যেতে দিবে না। আবিরের কান্না দেখে সবাই সেদিন হেসে দিয়েছিলো। এতো বড় ছেলে বোন বাহিরে পড়তে যাবে বলে কান্না করছে বিষয়টা সত্যিই অবিশ্বাস যোগ্য। তবে সেদিন সবাই অবাক হয়েছিল আবিরের কান্নায়। আনায়ার সাথে সারাদিন লেগে থাকতো আবির আর সেই কিনা আনায়ার জন্য কাঁদছে, ভাবা যায়? আনায়ার ভাবনায় এলো কিছু দিন পর ও অর্ণবদের বাড়িতে চলে এলে ও কার সাথে ঝগড়া করবে? কার কাছেই বা সব আবদার করবে? ভাইয়া এটা এনে দে, এই কাজটা করে দে। সেসব কথা ভাবতেই আনায়ার চোখে পানি চলে এলো। অর্ণব কথা কাটাকাটির মাঝে আনায়ার দিকে তাকাতেই দেখতে পেল আনায়ার চোখে পানি। অর্ণব সাথে সাথে ব্যস্ত হয়ে গেল আনায়াকে নিয়ে।
“আনায়া কি হয়েছে তোমার? কাঁদছো কেন? এই মেয়ে কি হয়েছে বলো আমাকে?”

অহনাও ব্যস্ত হয়ে গেল তার ভাবির কান্নার কারণ জানতে,
“ভাবি কি হয়েছে, কাঁদছো কেন?”

আনায়ার মন মুহূর্তের মাঝে ভালো হয়ে গেল। এইযে দুই ভাই বোন ঝগড়া থামিয়ে ওর কান্নার কারণ জানতে চাইছে এটা ওর অনেক ভালো লাগলো। একটা মেয়ে নিজের পরিবার ছেড়ে যাদের কাছে আসে তাঁদের এতটা ভালোবাসা পেলে কারই বা খারাপ লাগতে পারে। ওর মন খারাপেরা মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। আনায়ার নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে হচ্ছে। আনায়া চোখের পানি মুছে মিষ্টি হেসে বলল,
“আরে বলো না চোখে কি যেন পড়েছে। তাইতো হটাৎ করে পানি চলে এলো। তোমরা এতটা চিন্তিত হয়ো না”

অর্ণব শান্ত হলো এতক্ষনে তার এতো সাধনার বউ। সেই বউয়ের চোখে পানি সেটা কি আদোও সহ্য করা যায়? অর্ণব পুনরায় জিজ্ঞেস করলো,
“সত্যিই তো?”

“হ্যাঁ”

অহনা আর আনায়া পুনরায় গল্প জুড়ে দিল। অর্ণব সোফায় বসে এক দৃষ্টিতে তার সদ্য বিয়ে করা বউয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। এই মেয়েটাকে ও যতই দেখুক তবুও মন চায় আরেকটু দেখতে। ওর এই তৃষ্ণা যেন এই জনমে মিটবার নয়। অর্ণবের মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে সকল কাজ বাদ দিয়ে চোখের সামনে ওর প্রিয়সীকে বসিয়ে রেখে সারাদিন তাকে দেখতে। যদিও সেটা সম্ভব নয়। তবুও মাঝে মাঝে অবাস্তব চিন্তা করতে ভালো লাগে। তাকে দেখতে ভালো লাগে, তার কথা মন্ত্র মুগদ্ধ মতো শুনতে ভালো লাগে, তাকে নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে। এই ভালো লাগার যেন শেষ নেই। অর্ণব ওর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই রমণীটিকেই ভালোবেসে যেতে চায়।

নিচ থেকে ওদের ডাকছে। আনায়াদের যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। অহনা যাওয়ার সময় আনায়াকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“তোমাকে খুব মিস করবো ভাবি। তাড়াতাড়ি আমাদের বাড়িতে চলে এসো দুজনে মিলে অনেক অনেক গল্প করবো, আড্ডা দিবো। ভাইয়াকে নিবো না”

পাশ থেকে অর্ণব বলে উঠলো,
“আমার বউয়ের সাথে গল্প করবে আর আমাকেই নিবে নাহ, বাহ্ কি সুন্দর কথা। এই না হলে আমার শা*কচু*ন্নি বোন”

অহনা অর্ণবকে ভেংচি কাটলো। অহনার এমন বাচ্চামো কথায় আনায়া শব্দ করে হেসে দিল। অহনার গাল টেনে আদর করে বলল,
“আমিও তোমাকে অনেক মিস করবো আমার মিষ্টি ননোদিনী। আর হ্যাঁ আমরা তোমার ভাইয়াকে মোটেও আমাদের আড্ডায় নিবো না”

বলে দুজনে হেসে উঠলো। অর্ণব মুগদ্ধ চোখ তাকিয়ে প্রিয়সীর হাসি দেখছে। বুকে হাত দিয়ে বিরবির করে বলে উঠল,
“হায় ম্যায় মারজাভা”

#চলবে?