প্রেমের তাজমহল পর্ব-২১+২২+২৩

0
99

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব২১
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

সকালের স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত আনায়ার ঘর। বেচারি ঘুমে বিভোর। নীলিমা আনায়াকে ডেকে ওর এতো সাধের ঘুমটা ভেঙ্গে দিল। আনায়ার বিরক্তির শেষ নেই। বিয়ের শপিং করতে যাবে ভালো কথা তাই বলে এতো তাড়াতাড়ি ওর এতো সুন্দর ঘুমটা ভাঙিয়ে দিবে? নীলিমা বলে উঠল,
“ঘড়িতে তাকিয়ে দেখো কয়টা বাজে?”

আনায়া তাকিয়ে দেখলো দশটা বেজে ছয় মিনিট। ও আর কোনো কথা বলল না। উঠে ফ্রেশ হতে চলে গেল।

আনায়াদের পরিবার আর অর্ণবদের পরিবারের সকল মেয়েরা মিলে শপিংয়ে এসেছে। যার যেটা পছন্দ সে সেটাই কিনছে। আনায়া এখনো তেমন কিছুই কিনেনি। ওর কিছুই পছন্দ হচ্ছে না। অহনা কিছুক্ষন পর পর এটা ওটা দেখিয়ে বলছে,
“ভাবি দেখো সুন্দর না?”

আনায়া কি নিবে কিছুই বুঝতে পারছে না। নীলিমা বলেছিলো,
“আনায়া চলো তোমার বিয়ের শপিংয়ের জন্য শাড়ি বা লেহেঙ্গা দেখি”

সাথে সাথে অহনা এক প্রকার চিল্লিয়ে বলে উঠল,
“না, ভাবির শপিং করা যাবে না। মানা আছে”

নীলিমা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“কোনো?”

“ভাইয়া বলেছে ও নিজের পছন্দে ভাবির জন্য সব কিছু কিনবে। ভাইয়া মিটিং শেষ হলেই চলে আসবে। সে এসে তার বউয়ের জন্য নিজে দেখে কিনবে”

মিহি পাশ থেকে বলে উঠল,
“ও হো, কি কেয়ারিং এন্ড রোমান্টিক আমার জিজু”

নীলিমা আফসোসের সুরে বলল,
“সে আর বলতে। ননোদিনী আমার খুব কপাল করে অর্ণবকে পেয়েছে। আমার জনকে দেখো বউ শপিংয়ে এসেছে তার সাথে আসবে, পছন্দ করে এটা ওটা কিনে দিবে তা না সে অফিসে মিটিংয়ে ব্যস্ত”

আনায়া বিরবির করে বলল,
“কপাল না ছাই”

কিছুক্ষনের মাঝে অর্ণব উপস্থিত হলো। এসেই আনায়ার হাত ধরে ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অর্ণব শাড়ির দোকানে নিয়ে এসে আনায়াকে বসিয়ে দিয়েছে। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দোকানদার কে একের পর এক শাড়ি নামাতে বলছে। আনায়া বসে বসে অর্ণবের পাগলামো দেখছে। কিছু বলছে না। ও দেখতে চায় লোকটা কতোটা পাগলামো করতে পারে। অর্ণব থামাথামির নাম নিচ্ছে না। ওর মনভাব দেখে মনে হচ্ছে ও আজকে পুরো দোকান কিনে নিয়ে যাবে। অহনা, মিহি, নীলিমা আর জিয়া মিলে দেখতে এসেছে ওরা কি করছে। এসে অর্ণবের এমন কান্ড দেখে সবাই হতবাক। ওদের সবার মনে এক প্রশ্ন ‘এতো গুলো শাড়ি দিয়ে কি করবে?”। নীলিমা তো মুখ ফস্কে বলেই ফেলল,
“ভাই অর্ণব এতো গুলো শাড়ি দিয়ে কি করবে? শাড়ির দোকান দিবে?”

“সেটা কোনো হবে ভাবি”

“তাহলে এতগুলো শাড়ি দিয়ে কি করবে ভাই?”

“কোনো, আমার বউ পড়বে। একেক দিন একেক শাড়ি পড়ে আমার সামনে দিয়ে ঘুরঘুর করবে আর আমি নয়ন ভরে তাকে দেখবো”

আনায়া পাশ থেকে বলে উঠল,
“আপনি এসব পাগলামো বন্ধ করবেন নাকি আমি চলে যাবো?”

অর্ণব বলল,
“কোথায় যাবে? এখনো তো বিয়ের কোনো কেনা কাটাই হলো না। কতো কিছু কিনা বাকি আছে। মেয়েদের কতো কিছু কিনতে হয় শাড়ি, অর্নামেন্টস, মেকআপ আরো কতোকিছু। এখনই চলে যাবো বললে হবে?”

“এতো গুলো শাড়ি একসাথে কোন পা*গলে কিনে ভাবি তুমি সেটা আমাকে বলো?”

নীলিমা, মিহি, অহনা, জিয়া চারজন মিলে অর্ণবকে বোঝালো। কিন্তু ফলাফল শুন্য। ও ওর কথার নড়চড় করবে না। ও সব গুলো শাড়ীই নিবে। ওর বউ প্রতিদিন শাড়ি পড়ে সারা বাড়ীময় ঘুর ঘুর করবে ও সেটা মুগদ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখবে। ওর সাথে কথায় পেরে উঠতে পারলো না কেউ। ওরা চারজন হতাশ হয়ে বসে পড়ল। একে বোঝানো ওদের কর্ম নয়। ওরা সবাই নিজেদের জন্য পছন্দ মতো শাড়ি নিল। কেনা কাটা করতে করতে দুপুর হয়ে গেল। সবাই রেস্টুরেন্টে যেয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিল। এখনো অনেক কিছু কেনা বাকি। খাওয়া শেষে সবাই পুনরায় লেগে পড়ল শপিং করতে। মেয়ে মানুষের শপিং বলে কথা শুরু হলে শেষ হওয়ার নামই যেন নেয় না। অর্ণব দেখে দেখে নিজের পছন্দে তার বউয়ের জন্য প্রতিটা জিনিস নিচ্ছে। ওকে কেউ কোনো রকম বাধা দিচ্ছে না। আনায়া পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অ*সভ্য লোকটার পাগলামো দেখছে। অর্ণব এতো বেছে বেছে নিচ্ছে মেয়েরাও হয়তো এতো বাছে না। ওর কথা ওর বউয়ের জন্য বেস্টটা চাই। আনায়ার নিজেকে অনেক ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে। সত্যিই খুব ভাগ্য করে এমন একজনকে পেয়েছে ও। ওদের কেনা কাটা শেষ হতে হতে রাত হয়ে গেল। সবাই রাতের খাবার রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে বাসায় ফিরলো। অর্ণব নিজে এসে আনায়াদের বাসায় নামিয়ে দিয়ে গেছে। এখনো অনেক কিছু কেনা বাকি আছে। সেগুলো অন্য একদিন কিনে নিবে। আজকে সবাই খুবই ক্লান্ত।

আনায়া এসে কাপড় নিয়ে সোজা ওয়াশরুম চলে গেল। এখন শাওয়ার না নিলেই নয়। শাওয়ার শেষে রিফ্রেশিং মুডে বের হলো। টাওয়ালটা ব্যালকনিতে শুকাতে দিয়ে এসে বিছানায় বসলো। পা আর চলছে না। ফোনটা হাতে নিল। হটাৎ মনে পড়ল অর্ণবের কথা। ছেলেটা ওদের নামিয়ে দিয়ে বাসায় গেল। সাবধানে পৌঁছে গেছে কিনা কে জানে? আনায়া অর্ণবের নাম্বার ডায়াল করলো। সাথে সাথে রিসিভ হলো। আনায়া সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি বাসায় ঠিক মতো পৌঁছেছেন?”

অর্ণব বাসায় এসেছে মিনিট পাঁচেক হবে। প্রিয়সীর ফোন পেয়ে ওর ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। এইযে প্রিয়সী ওর খেয়াল রাখছে, ও বাসায় ঠিক মতো পৌঁছেছে কিনা এটা জানতে চাচ্ছে বিষয়টা ভাবতেই ওর ভালো লাগছে। প্ৰিয় মানুষের কেয়ার পেতে কার না ভালো লাগে।
“হ্যাঁ”

“কখন পৌঁছলেন বাসায়?”

“এইতো পাঁচ মিনিট হবে”

“ও আচ্ছা”

অর্ণব সন্দীহান কণ্ঠে বলল,
“কি বেপার বলো তো আজকে এতো খোঁজ নিচ্ছ যে?”

আনায়া হতমত খেয়ে গেল। ও তো এমনি খোঁজ নিচ্ছিল। মানুষটার জন্য চিন্তা হচ্ছিলো তাই আরকি। এছাড়া আর কি হবে? অর্ণবের কথার মানে আনায়া বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো,
“মানে?”

“এইযে আমি বাসায় পৌঁছেছি কিনা, কখন পৌঁছলাম এগুলো যে জিজ্ঞেস করছো, এইযে আমার খেয়াল রাখছো, প্রেমে ট্রেমে পড়ে গেলে নাকি মেয়ে? পড়লে বলে দাও আমি মাইন্ড করবো না। আমার মন আবার খুব বড়। আর তুমি আমার একমাত্র বউ, তুমি প্রেমে পড়লে সমস্যা নাই”

“যদি বলি প্রেমে পড়েছি”

“যদির কোনো ভিত্তি নাই”

“আমি আপনার প্রেমে পড়তেই পারি। আফটার ওল আমার জামাই এতো সুদর্শন বলে কথা প্রেমে না পড়ল হয়”

আনায়ার এমন উত্তরে অর্ণব হেসে দিলো। বউ তার চালাক হয়ে গেছে। কি সুন্দর ঘুরিয়ে উত্তর দিলো। বুঝতে হবে অর্ণব সিকদারের বউ বলে কথা চালাক নাহলে হয়। আনায়া কথা বাড়ালো না। ওর খুব ঘুম পাচ্ছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুমে ঢুলছে আনায়া। অর্ণবকে বলে কল কেটে দিল। ফোনটা পাশে রেখে ঘুমিয়ে গেল। কিছুক্ষনের মাঝেই গভীর ঘুমে মগ্ন হয়ে গেল।

সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। দিন গুনতে গুনতে আনায়েদের বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসছে। আর মাত্র হাতে গোনা কয়েক টা দিন। আনায়াদের বাড়িতে এখনই অনেক আত্মীয় এসে পড়েছে। ওর খালা মনিরা চলে এসেছে। আনায়া বিকেলে বসে তাঁদের সাথেই আড্ডা দিচ্ছিলো। হটাৎ করে ওর ফোনে কল এলো। আনায়া তাকিয়ে দেখলো অহনার ভিডিও কল দিয়েছে। আনায়া এক পাশে চলে এলো। অহনার সাথে এতো দিনে ওর অনেক ভালো বন্ডিং হয়ে গেছে। এখন প্রায় মাঝে মাঝেই আনায়া অহনার সাথে ভিডিও কলে কথা বলে। মাঝে মাঝে অহনা বোকা বোকা কথা বলে আনায়া তখন খিল খিল করে হাসে। আনায়ার হাসি দেখে অহনা গাল ফুলায়। আনায়া কিউট করে সরি বলে অহনা তাতে গলে যায়। অহনার বোকা বোকা কথা, ননস্টপ বক বক আনায়া খুব মন দিয়ে শোনে। দুজনেক দেখে মনে হবে বান্ধবী। এদের যে কয়েক দিন আগে পরিচয় হয়েছে বোঝায় যায় না।

আনায়া অহনার সাথে কথা বলছে। অহনা বক বক করে চলেছে আনায়া সেটা মন দিয়ে শুনছে। অহনা আনায়ার সাথে কথা বলতে বলতে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এলো। আনায়া অহনাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইছে কিন্তু পারছে না। অবশেষে জিজ্ঞেস করেই বসলো,
“তোমার ভাইয়া কি বাসায় আছে?”

অহনা আনায়ার জিজ্ঞেস করার ধরণের হেসে দিল।
বেচারি নিজের বরের কথা জিজ্ঞেস করতেও লজ্জা পাচ্ছে ভাবা যায়।
“না ভাইয়া বাসায় নেই। সেই সকালে বেরিয়েছে বলে গেছে পার্টি অফিসে কিছু কাজ আছে”

আনায়া মন খারাপ করে বলল,
“ও আচ্ছা”

অহনা আনায়ার মন ভালো করতে খুব উত্তেজনা নিয়ে বলল,
“জানো ভাবি আজকে সকালে আমাদের বাসায় আমার ফুপ্পিরা এসেছে। দাড়াও তোমাকে দেখাচ্ছি”

অহনা সিঁড়ি দিয়ে নামছে আর কথা বলছে। অহনাদের সিঁড়ির বরাবর ওদের দরজা। আনায়া লক্ষ্য করলো দরজা দিয়ে অর্ণব প্রবেশ করছে। বেচারার অবস্থা নাজেহাল। ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। গায়ের সাথে পাঞ্জাবি ঠিক ঠাক নেই। কেমন এলোমেলো ভাব। হটাৎ আনায়া থমকে গেল। অর্ণবকে দৌড়ে এসে কোনো রমণী জড়িয়ে ধরল।

#চলবে?

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব২২
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

অর্ণবকে জড়িয়ে ধরে আছে এক রমণী। আনায়া নিস্পলক চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। ওর কোনো রিয়েকশন নেই।

অর্ণব বিস্মিত, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কোথা থেকে কি হলো কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। অর্ণব পার্টি অফিসের কাজ শেষ করে সবে মাত্র বাসায় ঢুকেছে। আজকে অনেক খাটাখাটনি গেছে ওর ওপর দিয়ে। ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। অর্ণব মনে মনে ভাবতে ভাবতে আসছিলো ঘরে ঢুকে সোজা শাওয়ারে ঢুকবে। এই ঘামে ভিজা শরীরে আর থাকা যাচ্ছে না। তাই বাড়িতে ঢুকে কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে হাটছিলো। হটাৎ করে কেউ এসে জড়িয়ে ধরবে এটা ওর ভাবনায়ই ছিলো না। যখন বিষয়টা বুঝতে পারলো সাথে সাথে মেয়েটিকে ছিটকে নিজের থেকে সরিয়ে দিল। অর্ণব জোরে ধমক দিয়ে বলে উঠল,
“লাবণ্য এগুলো কোনো ধরণের অ*সভ্যতা? বড় ভাই হই আমি তোর। বড় ভাইয়ের সাথে এগুলো কি রকম আচরণ? জানিস এগুলো আমার একদম পছন্দ না। গাঁয়ে পড়তে হলে অন্য কারো গাঁয়ে পর আমার না। এরপর আর কখনো এমন করলে মুখে বলবো না হাত চালাবো মনে থাকে যেন”

অর্ণব সোজা সিঁড়ি দিয়ে উঠা শুরু করল। অহনাকে দেখতেই থেমে ওকে বলল,
“লাবণ্যকে বলে দিবি ও যেন আমার আশেপাশে না আসে। ওকে আমার আশেপাশে দেখলে কিন্ত খবর আছে”

অহনা মাথা নেড়ে সায় জানালো। অর্ণব গট গট পায়ে নিয়ে ঘরে চলে গেল। অহনা অর্ণবের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এ আর নতুন কি? লাবণ্য অহনার ফুফুর একমাত্র মেয়ে। যখনই বাসায় আসবে অর্ণবের আশেপাশে ঘুর ঘুর করবে। অর্ণব ওকে এতো কিছু বলে, এতো অপমান কটু কথা শুনায় তবুও মেয়েটার লাজ লজ্জা হয় না। সেই অর্ণবের পিছু পিছুই ঘুরবে। অহনার এমন ধরণের মেয়ে একটুও পছন্দ না। তাইতো লাবণ্যর সাথে ওর একটুও বনিবনা হয় না। অহনার এতক্ষনে ভিডিও কলে থাকা আনায়ার কথা মনে পড়ল। সাথে সাথে ফোনের দিকে নজর দিতেই দেখল আনায়া কল কেটে দিয়েছে অনেক আগেই। অহনা মনে মনে ভাবল ‘ভাবি কি ভাইয়াকে লাবণ্য আপু জড়িয়ে ধরেছে এটা দেখে কল কেটে দিল? ভাবি কি রাগ করেছে? স্বাভাবিক নিজের বরকে অন্য কেউ জড়িয়ে ধরলে রাগ করারই কথা’। অহনা পুনরায় আনায়াকে কল দিল।

আনায়া ‘থ’ মেরে বসে আছে । অর্ণবকে একটা মেয়ে জড়িয়ে ধরেছে বিষয়টা ও মেনে নিতে পারছে না। ওর চোখের সামনে বারবার একই দৃশ্য ভেসে উঠছে। আনায়া কল ডিসকানেক্ট করা পর থেকে এভাবেই একই ভঙ্গিতে বসে আছে। ওর হাতে থাকা ফোন পুনরায় বেজে উঠল। আনায়া তাকিয়ে দেখল অহনা ফোন দিচ্ছে। আনায়া বড় করে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিল। মুখে মিথ্যা হাসি ফুটিয়ে তুলল। ফোন রিসিভ করতেই ওপর পাশ থেকে অহনা হুড়মুড় করে বলা শুরু করল,
“ভাবি তুমি কি রাগ করেছো? কল কেটে দিলে যে? কি হলো কিছু বলছো না কোনো?”

অহনার এই পাগলামো গুলো আনায়ার খুব পছন্দ। এইযে ও একটু রাগ করলে মেয়েটা ওকে নিয়ে চিন্তিত হয় এটা দেখলে ওর খুব ভালো লাগে। এখন ওর মনে যে কি চলছে সেটা ও অহনাকে জানাতে চায় না। তাই হাসি মুখে বলল,
“না, রাগ করিনি রাগ করবো কোনো বলো? একটু কাজ ছিলো তাই কল কেটে দিয়েছি। আমি এখন একটু বিজি আছি আমি তোমার সাথে পড়ে কথা বলবো, ওকে”

অহনা সমতি দিতেই আনায়া কল কেটে দিল। এতক্ষন দূর থেকে নীলিমা আনায়াকে লক্ষ্য করছিলো। আনায়া সেখানে থেকে উঠে যেতে নিল। নীলিমা ওকে যেতে দেখে প্রশ্ন করলো,
“একি আনায়া কোথায় যাচ্ছ? আড্ডা দিবে না?”

“ভাবি আমার না মাথাটা ধরেছে, ভালো লাগছে না। আমি আমার ঘরে গেলাম তোমরা গল্প করো”

মাঝে মিহি বলে উঠল,
“মাথা ব্যথা নাকি জিজুর সাথে প্রেম আলাপ করবে সেটা আমরা জানি তাই শাক দিয়ে মাছ ঢেকে লাভ নেই”

আনায়া মিহির দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। পাশ থেকে আনায়ার কাজিন প্রিয়া বলে উঠল,
“আপু বসো না আমাদের সাথে অনেক দিন হলো আড্ডা দেই না আজকে একটু আড্ডা দিবো”

“অন্য সময় দিবোরে বনু। এখন সত্যিই মাথা ব্যথা করছে”

নীলিমা চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আনায়া চা খাবে? চা করে দিবো? চা খেলে মাথা ব্যথা কমবে”

“না ভাবি, এখন চা খাবো না। এখন আমি একটু ঘুমাবো কেউ যেনো আমাকে না ডাকে”

আনায়া নিজের রুমে চলে গেল। ওর কিছুই ভালো লাগছে না। বারবার করে চোখের সামনে সেই দৃশ্যই ভেসে উঠছে। একটা মেয়ে ওর জামাইকে জড়িয়ে ধরেছে ও সেটা কিছুতেই মাথা থেকে সরাতে পারছে না। আনায়া ফ্রেশ হতে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে এসে ঘুম দিবে। এখন ঘুম হচ্ছে ওর কাছে সব সমস্যার সমাধান। আনায়া ফ্রেশ হয়ে এসে দেখল ওর ফোন বাজছে। হাতে নিয়ে দেখল অর্ণব ফোন দিচ্ছে।

অর্ণব শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এল। বিছানার ওপরে ফোনটা হাতে নিল। সারাদিনে কাজের ব্যস্ততায় বেচারা নিজের একটা মাত্র বউয়ের খবর নিতে পারেনি। আনায়ার নাম্বার নাম্বার ডায়াল করল।

আনায়া রিসিভ না করে কেটে দিল। অর্ণব থেমে থাকার ছেলে না একের পর এক ফোন দিয়েই যাচ্ছে। আনায়া বিরবির করে বলে উঠল,
“একটু আগে একটা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে রেখে এখন আমাকে ফোন দেওয়া হচ্ছে অ*সভ্য এমপি কোথাকার। আমি আপনার ফোন কিছুতেই রিসিভ করবো না”

অর্ণব একের পর এক ফোন দিয়েই যাচ্ছে। আনায়া অবশেষে টিকতে না পারে অর্ণবের নাম্বার ব্লক লিস্টে ফেলে দিল। ফোনটা সুইচ অফ করে পাশে রেখে ঘুমিয়ে গেল।

অর্ণব বেকুব বনে গেল। কি এমন হলো আনায়া ওর ফোন রিসিভ না করে কেটে দিচ্ছে? বউ কি ওর ওপর রাগ করেছে? রাগ করার তো কোনো কথা না। সারাদিন কল দেয়নি বলে রাগ করেছে নাকি অন্য কিছু? অর্ণব বুঝে উঠতে পারল না। কি এমন হলো যে বউ তার এরকম করছে কই এর আগে তো কখনো এমন করেনি? অর্ণব ওর অন্য একটা নাম্বার দিয়ে আনায়াকে কল দিল। ফোন সুইচ অফ বলছে। অর্ণবের চিন্তা হচ্ছে। কি এমন হলো? কিছু কি হয়েছে? কিছুই ভেবে পেল না অর্ণব।

অর্ণব নিচে নেমে এলো। দুপুরে কাজের ব্যাস্ততার দুপুরের খাওয়া হয়নি। ওর মাকে খাবার দিতে বলে টেবিলে যেয়ে বসল। অর্ণব খাওয়া শেষ করে উঠে যাবে এমন সময় অহনা এসে বলল,
“ভাইয়া ভাবির সাথে কথা হয়েছে?”

অর্ণব ভ্রু কুঁচকে ফেলল। হটাৎ অহনা আনায়ার কথা জিজ্ঞেস করছে যে।
“কোনো?”

“আসলে”

“ঢং না করে কি হয়েছে সেটা বল”

অহনা সে সময়ের ঘটনা অর্ণবকে খুলে বলল। অর্ণব সব শুনলো। এতক্ষনে বুঝতে পারলো বউয়ের রাগের কারণ। তার বউ যে তাকে নিয়ে জেলাস সেটা ভেবে মুচকি হাসল। কিন্তু অহনাকে সেটা বুঝতে দিলো না। ওকে বকা ঝকা করে পাঠিয়ে দিল। ভাবতে বসল,’কিভাবে বউয়ের রাগ ভাঙ্গানো যায়?’

আনায়া ঘুম থেকে উঠল রাত আটটা বাজে। ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো। আনায়াকে নিচে নামতে দেখে সবাই ওর দিকে তাকাল। আনায়া নিচে নেমে ড্রয়িং রুম ক্রস করবে তাকিয়ে দেখল সবাই ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। আনায়া কারণটা বুঝতে পারলো না। আনায়া কফি বানাতে রান্না ঘরের দিকে যেতে নিলে আবির ডেকে বলল,
“বনু যা তো ছাদ থেকে আমার লেপটপ টা নিয়ে আয়। আমি বিকেলে ভুলে রেখে এসেছি”

আনায়া মুখ ভেংচি দিয়ে বলল,
“নিজের টা নিজে এনে নাও আমি পারবো না”

আবির চোখ রাঙিয়ে বলল,
“যাবি কি না?”

“যাচ্ছি”

আনায়া সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। ছাদের দরজা খুলতেই দেখলে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আজকে হয়তো আলো জ্বালাতে ভুলে গেছে। আনায়া আন্দাজ মতে হেঁটে সুইচের দিকে যেতে নিলেই কেউ একজন ওর হাত টান দিয়ে ওকে দেয়ালে সাথে মিশিয়ে দিল। সাথে সাথে লাইট জ্বলে উঠল। আনায়া তাকিয়ে দেখলো ওর সামনে অর্ণব দাঁড়িয়ে আছে। অর্ণব এই সময় এখানে? আনায়া অর্ণবের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অর্ণব ওর দিকে ঝুঁকে এলো।
“বউ নাকি আমায় মিস করছে কথাটাকি সত্যিই?

আনায়া কিছু বলল না। অর্ণবকে দেখে ওর বিকেলের ঘটনা মনে পড়ে গেল। রাগ পুনরায় জাগ্রত হলো। রাগে নাকের পাটা ফুলে উঠেছে। অর্ণব আনায়াকে রাগতে দেখে মনে মনে হাসলো। আরেকটু ঝুঁকে আনায়ার কানের পাশে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“ইসস, রাগলে তোমায় এতো সুন্দর লাগে তা যদি জানতাম তাহলে আরো আগেই তোমাকে রাগিয়ে দিতাম”

থেমে গিয়ে নেশাতুর কণ্ঠে বলে উঠল,
“বউয়ের রাগ দেখে আমার মনে প্রেম জেগে উঠছে। বউ রাগ করলে আমারই ভালো। বউয়ের রাগ ভাঙানোর নামে একটু আকটু রোমান্সও করা যাবে কি বলো বউ?”

আনায়া তাও কিছু বলল না। অর্ণব এতো কাছে আসার ওর বুক ধুপক ধুপুক করছে কিন্তু ও সেটা প্রকাশ হতে দিচ্ছে না। অর্ণব আফসোসের সুরে বলল,
“এতো রাগ আমার ওপর? ঠিক আছে তুমি যেহেতু আমার সাথে কথা বলবেই না তাহলে আমি চলে যাই”

অর্ণব যেতে নিলেই আনায়া ওকে জড়িয়ে ধরল। অর্ণব মুচকি হেসে নিজেও জড়িয়ে ধরল। আনায়ার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। অর্ণব শার্ট ভেজা অনুভব করতেই আনায়াকে নিজের থেকে সরিয়ে দাড় করালো। আনায়ার চোখে পানি। অর্ণব নিজ হাতে মুছে দিয়ে বলল,
“বোকা মেয়ে কাঁদছো কোনো? কি হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?”

আনায়া মাথা নেড়ে না বোঝাল। অর্ণব পুনরায় জিজ্ঞেস করলো,
“তাহলে?”

আনায়া অর্ণবকে ফের জড়িয়ে ধরল। নাক টেনে বলল,
“আপনাকে অন্য মেয়ে কোনো জড়িয়ে ধরবে? আপনি আমার জামাই আপনাকে শুধু মাত্র আমি জড়িয়ে ধরবো, শুধুই আমি”

আনায়ার কথায় অর্ণব হেসে উঠল। অর্ণবকে হাসতে দেখে আনায়া সরে আসতে চাইলো তবে পারলো না। অর্ণব ওকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।
“আচ্ছা সরি। আর হাসবো না। আমি কি ইচ্ছে করে ওকে জড়িয়ে ধরছি নাকি? ও ধরে ছিলো, আমি ওকে সরিয়ে দিয়েছি সাথে ধমকে শাসন ও করেছি। কিন্তু তুমি সেটা দেখনি, সেটা দেখবে কেন? তুমিতো তো তখন আমাকে ভুল বুঝে আমার ওপর রাগ করতে ব্যাস্ত”

আনায়া কিছু বলল না। মিশে রইল অর্ণবের বুকে।
“এখন কি আমি ছেলেদেরও হাগ করতে পারবো না?”

“আমি কি সেটা বলেছি নাকি? শুধু মেয়েরা। কোনো মেয়ে যেন আপনাকে জড়িয়ে না ধরে, স্পর্শ না করে। কথা বললেও দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন”

“যথা আজ্ঞা মহারানী”

দুজনেই নিশ্চুপ কেউ কিছু বলছে না। একে অপরকে জড়িয়ে আছে আবেশে। হটাৎ অর্ণব দুস্টু হেসে বলল,
“তোমার সাহস তো কম না মেয়ে, তুমি অর্ণব সিকদারকে ব্লক দাও। তোমার শাস্তি আছে”

“কি শাস্তি?”

“গিভ মি আ কিস?”

“কিস?”

“নট অনলি কিস, লিপ কিস”

আনায়া চোখ বড় বড় করে অর্ণবের দিকে তাকাল। আনায়ার চাওনি দেখা অর্ণব হেসে দিল।
“এভাবে তাকিয়ে লাভ নেই। তাড়াতাড়ি দাও নাহলে কিন্তু”

“কিন্তু?”

“আমি অন্য কিছু করবো”

আনায়া কোনো উপায় খুঁজে পেল না। অর্ণব ওকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে আছে। এই বাঁধন থেকে ছোটাও সম্ভব না। হটাৎ মাথায় কিছু একটা আসতেই আনায়া খুশি হয়ে গেল। অর্ণব কে বলল,
“চোখ বন্ধ করেন”

অর্ণব চোখ বন্ধ করলো। চোখ বন্ধ করতেই আনায়া অর্ণবের পায়ে একটু জোড়ে আঘাত করলো। অর্ণব ব্যথা পেয়ে হাতের বাঁধন আলগা করতেই আনায়া ছুটে পালালো। অর্ণব আনায়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল,
“আজকে বা বেঁচে গেলে, বাসার রাতে কে তোমাকে বাঁচাবে বউ?রেডি থেকো সুধে আসলে সব উসুল করবো”

#চলবে?

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব২৩
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসছে। আর মাত্র ৫ দিন বাকি বিয়ের। সবাইকে নিমন্ত্রণ দেওয়া হয়ে গেছে। হটাৎ অর্ণব মত পাল্টালো। ও কমিউনিটি সেন্টারে না ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করতে চায়। সবুজে ঘেরা প্রকৃতির মাঝে, খোলা আকাশের নিচে বিয়ের করার ইচ্ছে হচ্ছে অর্ণবের। অর্ণবের এমন ইচ্ছের কথা শুনে সবার মাথায় হাত। আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি এখন বললেই তো সব হয়ে যাবে না। কতো কিছুর এরেঞ্জমেন্ট করতে হবে। অর্ণব সবাইকে আশ্বাস দিল ও বিষয়টা সামলে নিবে। ওর দলের লোকেরা সাথে আবির আর ওর বন্ধুরা মিলে সবটা সামলে নিবে। ১ দিনের মাঝে সকল ব্যবস্থা করার হয়ে গেল। কাছেই একটা রিসোর্ট আছে যেটা খোলা মেলা, সবুজে ঘেরা, গাছ গাছলি আছে। রিসোর্টটা অর্ণবের পছন্দ হয়েছে। এখানেই ও ওর বিয়ের প্রোগ্রাম করতে চায়। অর্ণব তাঁদের মেঞ্জমেন্টের সাথে কথা বলে নিল।

রিসোর্টটা খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। পুরো রিসোর্ট ভরপুর আনায়া অর্ণবদের আত্মীয় স্বজনে। মানুষ গিজগিজ করছে। রিসর্টের একপাশে খোলা জায়গায় হলুদের জন্য সাজানো হচ্ছে। দুই পাশে দুটো স্টেজ। বর কোণে কে পাশাপাশি বসিয়ে হলুদ দেওয়া হবে।

আনায়া ওর জন্য বরাদ্দ করা রুমে বসে তৈরি হচ্ছে। ওর সাথে আছে মিহি আর অর্ষা। বেস্ট ফ্রেন্ড এর বিয়ে বলে কথা অর্ষা আসবে না সেটা হয়? মেকআপ আর্টিস্ট আনায়াকে সাজাচ্ছে। মিহি আর অর্ষার সাজগোজ প্রায় কমপ্লিট। আনায়ার সাজগোজ শেষ হলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছে।

আনায়াকে মিহি অর্ষা নিয়ে বসিয়ে দিলো স্টেজে। আনায়া বসে আছে। বক্সে গান বাজছে। সবাই নাচানাচি করছে। হলুদের অনুষ্ঠান এখনো শুরু হয়নি। অর্ণব সাহেবের মানা আছে তার বউকে তার আগে কেউ হলুদ লাগাতে পারবে না। ওর বউ ও প্রথমে তাকে হলুদ লাগবে তারপর সবাই।

হটাৎ চারপাশের লাইট বন্ধ হয়ে গেল। মুহূর্তের মাঝে আবার জ্বলে উঠল। চারপাশে গান বাজছে তার মাঝে এন্ট্রি নিল অর্ণব। আনায়া অর্ণবের দিকে তাকাল। হলুদ পাঞ্জাবীর ওপর কোটি, সাদা পায়জামা, হাতে ঘড়ি, চুলগুলো গুছিয়ে রাখা। সব কিছু মিলিয়ে অর্ণবকে অনেক সুন্দর লাগছে। আশেপাশের সকল মেয়েরা ড্যাব ড্যাব করো ওর দিকে তাকিয়ে আছে। আনায়ার হিংসে হচ্ছে। ওর বরের দিকে অন্য মেয়েরা কোনো তাকিয়ে থাকবে? ওর ইচ্ছে হচ্ছে সব গুলো মেয়ের চোখে কাপড় বেঁধে দিতে। অন্যের জামাইয়ের দিকে এভাবে বেসরমের মতো কে তাকিয়ে থাকে? এদের কি একটুও লাজ লজ্জা নেই? না নেই হয়তো তাইতো এভাবে তাকিয়ে আছে। আনায়ার অর্ণবের ওপর ও রাগ হচ্ছে। এতো সেজেগুঁজে আসার কি আছে। নিশ্চই এই অ*সভ্য এমপি মেয়েদের ফিদা করার জন্য এভাবে মাঞ্জামেরে সেজে এসেছে। আনায়া রাগে মুখ ঘুরিয়ে নিল। দেখবে না ও আর এই অ*সভ্য এমপিকে।

অর্ণব এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে তার প্রিয়সীর দিকে। ওর নজর যে সরতেই চাচ্ছে না। তাকে এতটা সুন্দর লাগছে। ওর ইচ্ছে করছে তাকে সামনে বসিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা তার দিকে তাকিয়ে থাকতে। ওর চোখের সামনে হলুদ পড়ি বসে আছে। আনায়াকে হলুদ শাড়িতে অনেক সুন্দর লাগছে। যাকে বলে চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য। হলুদ রঙের জামদানি শাড়ি বাঙালি স্টাইলে পড়েছে, সাথে ফুলের গয়না। ভারী মেকআপ সব মিলিয়ে অর্ণবের কাছে আনায়াকে অনন্য সুন্দরী লাগছে।

অর্ণব আনায়ার সামনে এসে থামলো। সবার দৃষ্টি ওদের ওপর। অর্ষা হলুদের বাটি এনে অর্ণবের সামনে ধরতেই অর্ণব ওর হাতে খানিকটা হলুদ নিল। আনায়া তাকিয়ে আছে অর্ণবের দিকে। অর্ণব আনায়ার দুই গালে হলুদ লাগিয়ে দিল। আনায়ার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। অর্ণব আনায়ার চোখে চোখ রেখে কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে বলল,
“আমাকে লাগবে না?”

আনায়ার লজ্জা লাগছে। এতো গুলো মানুষের সামনে ও অর্ণবকে হলুদ লাগিয়ে দিবে ভাবতেই ওর লজ্জা লাগছে। ইদানিং এই লজ্জা যেন ওর বেড়েই চলেছে। আনায়া অসহায় চোখে অর্ণবের দিকে তাকাল। অর্ণব সেটা পাত্তাই দিলো না। ও নাছোড় বান্দা। আনায়া উপায় না পেয়ে হলুদ নিয়ে অর্ণব কে লাগিয়ে দিল। পাশ থেকে অর্ণবের ফ্রেন্ডরা শিস বাজিয়ে উঠল। আনায়া এতে আরো খানিকটা লজ্জায় মুড়িয়ে গেল। অর্ণব আনায়াকে আরেকটু লজ্জা দিতে ওদের বলে উঠল,
“আসতে শিস বাজা আমার বউ লজ্জা পাচ্ছে”

ওরা আরো জোরে শিস বাজিয়ে উঠল। সবাই ওদের কাণ্ডে হাসছে। বেচারি লজ্জায় শেষ। ও অবস্থা লজ্জায় মরি মরি। এতো লজ্জা কোথা থেকে আসছে কে জানে? অর্ণব ওর জন্য বরাদ্দ করা স্টেজে বসে পড়ল। বড়রা সবাই প্রথমে হলুদ লাগলো। এরপর একে একে সবাই এসে দুজনকে হলুদ লাগিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

লাবণ্য এসেছে অর্ণবকে হলুদ লাগাতে। মেয়েটার সাজ দেখে মনে হচ্ছে ও নিজেই বউ। আনায়ার ওকে দেখেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। ইচ্ছে করছে চোখে দিয়ে একে ভস্ম করে দিতে। লাবণ্য হলুদ অর্ণবকে হলুদ লাগিয়ে ওর পাশে বসে ছবি তুলছে। আনায়ার মোটেও লাবণ্যকে সহ্য হচ্ছে না অর্ণবের পাশে। অর্ণব মনে হয় আনায়ার মনের কথা বুজতে পারল। অহনাকে ডেকে লাবণ্যকে সরিয়ে নিয়ে যেতে বলল।

এতক্ষনে বড়দের সিরিয়াল শেষ হলে অহনা এলো আনায়াকে হলুদ লাগাতে। এসেই আনায়াকে হলুদ লাগানো শেষে বলল,
“ভাবি তোমাকে অনেক কিউট লাগছে। একদম হলুদ পরি যাকে বলে”

অর্ণব পাশ থেকে বলে উঠল,
“আমার বউয়ের দিকে একদম নজর দিবি না। তোর শাকচুন্নি মার্কা নজর সরা আমার সুন্দরী বউয়ের ওপর থেকে”

“নজর আমার না তোমারটা লাগবে। সেই কখন থেকে তাকিয়ে আছো আমার ভাবির দিকে। এই তোমার কি লজ্জা লাগে না এতো গুলো মানুষেই সমানে এভাবে তাকিয়ে থাকতে?”

“আমার বউয়ের দিকে আমি তাকিয়েছি এতে কার কি? অন্যের বউয়ের দিকে তো তাকায়নি যে লজ্জা লাগবে”

দুজনের কথা শুনে আনায়া হতাশ। এরা এখানেও ঝগড়া শুরু করে দিয়েছে। আনায়া মনে মনে বলল, “এরা ভাই বোন কারো থেকে কেউ কম না। একটারও মুখে লাগাম নেই। সবার সামনে যা ইচ্ছে তা বলে দেয়”। আনায়া সহ সবাই তাকিয়ে দুই ভাই-বোনের ঝগড়া দেখছে। অবশেষে জিয়া এসে অহনাকে নিয়ে গেল।

হলুদের প্রেগ্রাম শেষ হতে হতে বিকেল হয়ে গেল। সবাই মিলে অনেক হই হুল্লোড় করেছে। আনায়া নিজের ঘরে চলে এলো। হলুদের ওর পুরো শরীর মাখামাখি অবস্থা। অর্ণবকে তো ওর বন্ধুরা হলুদ লাগিয়ে পুরো ভুত বানিয়ে দিয়েছে। আনায়া শাওয়ার নিতে চলে গেল। ওর হাতে, পায়ে, মুখে হলুদের ছড়া ছড়ি। ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে বিছানায় বসল। এর মাঝেই রুমে মিহি, নীলিমা আর অর্ষা এলো।
“কিরে তুই এখনো রেডি হোসনি? মেহেদী পড়বি কখন?”

“মাত্র ফ্রেশ হয়ে বের হলাম। একটুতো রেস্ট নিতে দাও। বিয়ে এতো জ্বালা জানলে, বিয়ে করার নামই নিতাম না। কাজী অফিসে বিয়ে করছিলাম ওটাই ঠিক ছিলো। এখন হলুদ, মেহেদী এই জ্বালা ভালো লাগছে না”

“হয়েছে আর বকবক না করে তাড়াতাড়ি রেডি হও। দেরি হয়ে যাচ্ছে”

আনায়া অল্প সময়ের মাঝে রেডি হয়ে নিল। রিসোর্টের একপাশে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। অনেক মেয়েরা বসে মেহেদী দিচ্ছে। আনায়া ওর জন্য রাখা জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল। আনায়া বসে আছে। হটাৎ, ফোনে ম্যাসেজ টোন বেজে উঠল। আনায়া পাশে রাখা ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল স্ক্রিনে অর্ণবের পাঠানো বার্তা,
“আমার নাম তোমার হাতে লিখতে ভুলবে না যেন বউজান”

#চলবে?