প্রেমের তাজমহল পর্ব-২৪+২৫+২৬

0
110

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব২৪
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

রাতের কালো আঁধারের মাঝে কৃত্তিম আলোর ছোঁয়া। চারপাশে মেয়েদের ছড়াছড়ি। কেউ মেহেদী পড়ছে , কেউ বা অন্যকে পড়িয়ে দিচ্ছে। সাথে রয়েছে আড্ডা হাসি মজা। আনায়া বসে আছে। ওকে যারা মেহেদী পড়িয়ে দিবে তারা একটু ব্যস্ত আছে। আনায়া বসে আছে তাঁদের অপেক্ষায় । অহনা, মিহি, নীলিমা ওরা বসে আনায়ার সাথে আড্ডা দিচ্ছে। আনায়া হটাৎ লক্ষ্য করলো দূরে দাঁড়িয়ে লাবণ্য ওর দিকে কেমন করে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে ওকে চোখ দিয়েই গিলে খেয়ে ফেলবে। আনায়া সেদিকে মোটেই পাত্তা দিলো না। ওর তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হলে থাকুক। আনায়া নীলিমাকে ডেকে লাবণ্যকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,
“ভাবি আমাকে একটু কাজল লাগিয়ে দাও তো, বলা তো যায় না কখন কার বদ নজর লেগে যায়”

আনায়ার কথা শুনে অহনা হেসে দিল। ও বুঝতে পেরেছে আনায়া লাবণ্য কে মিন করে বলেছে। নীলিমা সত্যিই ওর চোখের কাজল নিয়ে আনায়ার কানের পিছনে লাগিয়ে দিল। লাবণ্য ওদের কাণ্ডে ভেংচি কেটে সেখান থেকে চলে গেল।

আনায়াকে দুজন মেহেদী আর্টিস্ট মেহেদী পড়িয়ে দিবে। একজন অর্ষা কে মেহেদী পড়িয়ে দিচ্ছে তাই একটু পর আসবে। অপর জন আনায়ার এক হাতে মেহেদী পড়াতে শুরু করবে এমন সময় কোথা থেকে অর্ণব এসে আনায়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। মেহেদী আর্টিস্ট এর হাত থেকে মেহেদীটা নিয়ে নিল।
“আমার বউয়ের হাতে আমি আগে মেহেদী পড়িয়ে দিবো। তারপর বাকিটা আর্টিস্ট পড়িয়ে দিবে”

অর্ণব খুব সুন্দর করে আনায়ার হাতে নিজের নামটা লিখে দিল। অর্ণব নিজের লিখার দিকে নিজেই তাকিয়ে রইল। প্রথম বার মেহদি হাতে নিয়েছে। প্রথমবারেই যে লিখতে পারবে সেটা ও ভাবে নি। ভেবেছে লিখাটা হয়তো সুন্দর হবে না। কিন্তু এতটাও খারাপ হয়নি। আনায়া বসে বসে মুগদ্ধ চোখে অর্ণবের পাগলামো দেখছে। মানুষটা একটু আগে ম্যাসেজ করে বলে, এখন নিজেই চলে এলো নিজের হাতে প্রথম মেহেদী পড়াবে বলে। একটা মানুষ কতটা ভালোবাসলে সবার সামনে নির্দ্বিধায় এরকম পাগলামো করতে পারে? এই অল্প দিনের ব্যবধানে এতটা ভালোবাসা সম্ভব? কই আনায়া তো পারেনি অর্ণব কে এভাবে ভালোবাসতে? হয়তো এটা আনায়ার ব্যর্থতা। সত্যিই আনায়া অনেক ভাগ্য করে অর্ণবকে পেয়েছে।

অর্ণব চোখ তুলে তাকাতেই আনায়ার সাথে চোখেচখি হলো। অর্ণব চোখ টিপ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। অর্ণব চলে যাবে এমন সময় মিহি আর অর্ষা এসে ওকে দুপাশ থেকে আটকে দিলো।
“কি হলো তোমরা এভাবে পথ আটকে দাঁড়ালে কেন?”

মিহি বলল,
“কাজ আছে তাই”

“কাজ কি কাজ?”

“বসেন তাহলেই দেখতে পাবেন”

অর্ণবকে দুজনে বসিয়ে দিল। মেহেদী নিয়ে অর্ণবের হাতে দিবে এমন সময় অর্ণব বলে উঠল,
“এই কি করছো? মেহেদী পড়াচ্ছ কোনো? মেহেদী মেয়েদের পড়ার জিনিস ছেলেদের না”

অর্ষা বলল,
“আরে দুলাভাই চুপ করে বসেন তো আপনি আপনার বউয়ের জন্য এটুকু করতে পারবেন না”

অর্ণব আনায়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
“তার জন্য তো জীবনও দিয়ে দিতে পারবো এই সামান্য মেহেদী তো কিছুই না”

অর্ণবের কথা শুনে সবাই হাততালি দিয়ে উঠল। আনায়ার কাজিন প্রিয়া বলে উঠল,
“জামাই হতে হবে অর্ণব ভাইয়ার মতো, নাহলে আমি বিয়েই করবো না”

মিহি বলল,
“তাহলে প্রিয়া তোমাকে সারাজীবন সিঙ্গেলই থাকতে হবে কারণ সবাই তো আর আমার জিজু অর্ণব সিকদার হবে না”

আনায়া মেহেদী পড়ছে। ওর ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি। মিহি আর অর্ষা দুজন মিলে অর্ণবের দুই হাতে কিছু একটা করছে। কাজ শেষ হতেই মিহি বলে উঠল,
“কাজ শেষ”

অর্ণব তাকাল ওর হাতের দিকে। কে জানে দুই বিচ্ছু মিলে ওর হাতে কি করেছে। এক হাতে লাভের মাঝে লিখেছে (অর্ণব+আনায়া)। অন্য হাতে লিখেছে,
“আনায়ার একমাত্র বর আশিয়ান সিকদার অর্ণব”

অর্ণব শা*লীদের কাজে মুচকি হাসল। আনায়ার সামনে দুহাত মেলে দেখাল। আনায়া লজ্জা পেল। ওর চোখ আটকে গেল (অর্ণব+আনায়া) লিখার দিকে। দুজনের নাম একসাথে কতই না সুন্দর লাগছে। অর্ণব মিহি আর অর্ষাকে জিজ্ঞেস করলো,
“এবার দুজনে খুশি হয়েছো?”

দুজন একসাথে বলে উঠল,
“অনেক খুশি”

“এবার আমি যাই আমার অনেক কাজ আছে”

অর্ণব চলে গেল। দীর্ঘ দুই ঘন্টা বসে থাকার পর আনায়ার দুহাতের মেহেদী পড়া শেষ হলো। একাধারে এতক্ষন বসে থাকায় আনায়ার কোমর ধরে গেছে। বেচারি কোনো মতে সেখান থেকে উঠে চলে এলো নিজের রুমে। কিছুক্ষন পর মিহি, নীলিমা, অর্ষা, অহনা সবাই এসে উপস্থিত হলো আনায়ার রুমে। আড্ডা চলল অনেক ক্ষন। আড্ডা শেষে সবাই ঘুমাতে চলে গেল।

সকালের স্নিগ্ধ আলোয় পরিবেশ উজ্জ্বল হয়েছে উঠেছে। আকাশে অল্প মেঘের আনাগোনা। পুরো রিসোর্ট জুড়ে গিজ গিজ করছে মানুষ। এমপি অর্ণব সিকদারের বিয়ে বলে কথা একটু তো হিজিবিজি হবেই। সবাই এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে। ব্যস্ততা সবার মাঝেই আছে। মেয়েরা ব্যস্ত নিজেদের সাজাতে, ছেলেরা ব্যস্ত কাজে। বাচ্চারা আশেপাশে ছুটোছুটি করছে খেলছে। বড়রা একেক জন একেক কাজে ব্যাস্ত।

আনায়াকে ওর ঘরে সাজানো হচ্ছে। সব সময় অল্প মেকআপ করে অভ্যস্ত আনায়ার ভারী মেকআপ ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে মুখের ওপর এক পাল্লা প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। ও কতো করে বলল অল্প করে দিতে কিন্তু কে শোনে কার কথা। বিয়ের দিন নাকি এভাবেই সাজতে হয়। আনায়ার এখন মনে হচ্ছে এর চেয়ে কাজী অফিসের বিয়েটাই ভালো ছিলো। কোনো পেরা ছিলো না। যেয়ে কাজীর সামনে বসেছে, কবুল বলে সাইন করে দিয়েছে বিয়ে শেষ। এখন এই সাজগোজ ওর একটুও ভালো লাগছে না।

আনায়ার সাজ শেষ হতে হতে অনেক সময় লেগে গেল। আনায়াকে বাহিরে ডাকছে। নীলিমা আর অর্ষা মিলে আনায়াকে নিয়ে বসিয়ে দিল। আনায়া চোখ তুলে সামনে তাকাল ওর সামনে বরের আসন এখনো ফাঁকা তার মানে অর্ণব এখনো আসেনি। আনায়ার ভাবনার মাঝে বক্সে গান বেজে উঠল,
“ধাড়কানে বার রাহি হে, ওহ কারিব আ রাহা হে
খুস নাসিবি বানকে মেরা, ওহ নাসিব আ রাহা হে
সাজান সাজান তেরি দুলহান, তুজকো ফুকারে আজা”

অর্ণব এগিয়ে আসছে আনায়ার দিকে। আনায়ার ভয় করছে। বুক ধুপুক ধুপুক করছে। কেমন হাঁসফাঁস লাগছে। হাত পা কাঁপছে। মনের মাঝে শিহরণ বয়ে যাচ্ছে। কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি। আগের বার বিয়ের সময় তো এমনটা হয়নি তাহলে এখন হওয়ার কারণ? আনায়া কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। অর্ণব এসে ওর ঠিক সামনে ফুলের পর্দার ওপর পাশে বসল। আনায়া মাথার ওড়নার ফাঁকা দিয়ে দেখতে পেল। আনায়া মাথা নিচু করে বসে রইল।

অর্ণব চোখ তুলে চাইল ওর একমাত্র বউয়ের দিকে। লাল টুকটুকে লেহেঙ্গা, সাথে দুহাত ভর্তি চুরি, গলায় গয়নার সমাহার। মুখে ভারী সাজ সব মিলিয়ে আনায়াকে বউরূপে অপূর্ব লাগছে। মেয়েটা বরাবরের মতো ওকে মুগদ্ধ করে নিজের রূপে। অর্ণব বার বার বেহায়ার মতো মেয়েটার রূপে মুগদ্ধ হয়ে স্থান কাল ভুলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এইযে এখনো এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। পাশ থেকে অর্ণবের এক বন্ধু ওকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“এখন সবার সামনে এভাবে তাকিয়ে থাকিস না, সারা রাত সময় পাবি দেখার। তোর বউ কেউ নিয়ে যাবে না”

“আমার বউ আমি তাকিয়ে থাকবো তাতে কার কি?”

“কিছু না, তুই তাকিয়ে থাক”

কাজী বিয়ে পড়ানো শুরু করল। আনায়ার হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি হৃদ যন্ত্রটা বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। কেমন ভয় অনুভূত হচ্ছে। আনায়া নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনো যেন পারছে না। কাজী যখন আনায়াকে কবুল বলতে বলল। আনায়ার মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল। কি অদ্ভুত এক অনুভূতি। আনায়ার এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো অয়ন আরেকে পাশে আবির। একটু দূরে ওর বাবা। অয়ন আবির দুই ভাই বোনের মনের অবস্থাটা বুজতে পারলো। দুজন একসাথে বোনকে সাহস দিলো। আনায়া লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে ‘কবুল’ বলে দিল। অর্ণব কে কবুল বলতে বললে ও গড়গড় করে বলে দিল। ওর বলার ধরণের আশেপাশে সবাই হেসে দিল। অর্ণব বেচারা এতে একটু লজ্জা পেল। দুজনে পুনরায় বাঁধা পড়লো বিবাহের শুভ বন্ধনে। আজ থেকে শুরু হতে চলেছে এক নতুন পথ চলা। সবাই মিলে নব দম্পতির জন্য মন ভরে দোয়া করলো।

সকল আনন্দ উল্লাস শেষে চলে এলো বিদায় বেলা। এই মুহুর্তটা একটা মেয়ের জন্য খুবই বেদনার। এতদিনের চেনা পরিচিত কাছের মানুষদের ছেড়ে যেতে হয় এক অচেনা পরিবেশে। নতুন সকল মানুষদের মাঝে। আনায়া সেই কখন থেকে কান্না করেই যাচ্ছে। বাবা-মা, অয়ন-নীলিমা, মিহি, অর্ষা সকলের চোখে পানি। আনায়া সবার থেকে বিদায় নিল। কিন্তু আবির কে কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। ছেলেটা কোথায় গেল এমন সময়? অবশেষে ওকে পাওয়া গেল এক কোণে। আনায়া আবিরের কাছে যেয়ে জাপ্টে জড়িয়ে ধরল। আবিরের চোখে পানি। বোনের বিদায় চোখের সামনে দেখতে পারবে না তাই একপাশে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলছিলো।
আনায়া কান্নারত অবস্থায় বলল,
“আমি চলে যাচ্ছি ভাইয়া। এখন আর কেউ তোর সাথে ঝগড়া করবে না, মারামারি করবে না। রিমোট নিয়ে তোর কারো সাথে ঝগড়া করতে হবে না। কেউ বলবে না ভাইয়া এটা এনে দে, সেটা এনে দে। ভাইয়া এই কাজটা করে দে। এখন থেকে আর কেউ তোকে জ্বালাবে না। তোর অগোছালো জিনিস গুলো কেউ গুছিয়ে রাখবে না। তোকে কারো জন্য আম্মুর কাছে থেকে বকা খেতে হবেনা”

আনায়া ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছে। আবির বোনের মাথায় হাত রেখে সান্তনা দিয়ে বলল,
“আমার সাথে ঝগড়া করার জন্য হলেও থেকে যা বনু। তুই না থাকলে আমি মারামারি করবো কার সাথে? কার চুল ধরে যখন তখন টান দিবো। কার জিনিস এলোমেলো করবো। যাস না বনু, যাস না”

নীলিমা এসে দুজনেক ছাড়িয়ে নিল। এভাবে কান্নাকাটি করতে থাকলে দেরি হয়ে যাবে। এমনি অনেক বেলা হয়ে গেছে।
“এভাবে বললে হয় না আবির। আনায়ার এখন বিয়ে হয়ে গেছে ওকে যেতে হবে। তুমি এমন অবুঝ বাচ্চাদের মতো করলে চলবে?”

আবিরের চোখের পানি তবুও থামছে না । ছেলে মানুষ নাকি সহজে কাঁদে না একটা ভাই তার আদরের বোনকে কতটা ভালোবাসলে বোনের জন্য এভাবে কান্না করা করে? অর্ণব এসে আবিরকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিয়ে বলল,
“শা*লা তুই যেভাবে মেয়েদের মতো নাকের পানি চোখের পানি এক করছিস মনে হচ্ছে আমি তোর বোন চুরি করে নিয়ে যাচ্ছি। যখন ইচ্ছে হবে তখনই বোনকে দেখতে চলে আসবি আর তোর বোনেরও যখন ইচ্ছে হবে তোদের সাথে দেখা করতে চলে যাবে”

আবির নিজেকে সামলালো। অহনা দূরে দাঁড়িয়ে আবিরকে দেখছিলো। আবিরের জন্য ওর মনে মায়া হচ্ছে। এই প্রথম এই মানুষটার জন্য ওর মনে অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে। যেই অনুভূতি সম্পর্কে অহনা অনভিজ্ঞ।

আনায়া অর্ণব সকলের কাছ থেকে বিদায় নিল। আবির নিজে এসে আনায়াকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে গেছে। আনায়ার সেকি কান্না। অর্ণব আনায়ার মাথাটা বুকে চেপে ধরে আছে। আনায়াকে এটা ওটা বলে সান্তনা দিচ্ছে। কিন্তু আনায়ার কান্না থামার নামই নেই। হটাৎ অর্ণবের মাথায় দুস্টু বুদ্ধি ভর করলো। অর্ণব আনায়ার কানে ফিসফিস করে বলল,
“এখন এতো কেঁদো না বউ, কিছু কান্না রাতের জন্য জমিয়ে রাখো”

#চলবে?

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব২৫
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

আঁধারে নিমজ্জিত রজনী। চারপাশ অন্ধকারে ছেয়ে আছে। রাস্তা কৃত্তিম আলোয় আলোকিত। ফুলে ভরা বিছানার মাঝে নব বধূ বসে আছে। চারপাশে মৃদু এলো জ্বলছে। আনায়া অর্ণবদের বাড়িতে এসেছে অনেকক্ষন হয়েছে। আনায়াকে এনে ড্রয়িং রুমে বসানো হয়েছিল। আশেপাশে অনেক মানুষের আনাগোনা। কেউ কেউ এসে নতুন বউ দেখে যাচ্ছে। আনায়ার পাশে অহনা আর মিহি বসে আছে। মিহি আর অর্ষা অহনাদের সাথে এসেছে। এতো এতো মানুষের মাঝে আনায়ার অস্বস্তি হচ্ছে সাথে বিরক্তও লাগছে। অনেকক্ষণ সেখানে থাকার পর মেহনাজ বেগম অহনা আর জিয়াকে দিয়ে আনায়াকে অর্ণবের রুমে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আনায়া এতক্ষনে সস্থি পেল। অহনা আনায়াকে বসিয়ে দিয়ে চলে গেল। আনায়া চারপাশে তাকিয়ে ঘরটা দেখছে। অর্ণবের ঘর খুবই সাজানো গোছানো। ছেলেদের ঘর সাধারত এতটা গোছানো হয় না। দরজার বরাবর একটা মাস্টার বেড, তার থেকে একটু দূরে সোফা। খাটের পাশে টি-টেবিল, একটা বড় সাইজের আলমারি, ড্রেসিং টেবিল আর কাবার্ড । এক পাশে একটা পড়ার টেবিল, পড়ার টেবিলের পাশে ছোট একটা বুক সেল্ফ। বুক সেল্ফ এ অনেক ধরণের বই আছে। আনায়া বইগুলোতে চোখ বুলালো। একদম পরিপাটি ঘর। আনায়ার ঘরটা অনেক পছন্দ হয়েছে।

আনায়ার ভাবনার মাঝে খট করে দরজা খুলে গেল। আনায়া কিছুটা ভয় পেল। আনায়া মাথায় ঘোমটা দিল। ঘোমটার ফাঁকা দিয়ে দেখল লাল আর গোল্ডেন রঙের শেরওয়ানি পরিহিত অর্ণব ওর দিকে এগিয়ে আসছে। অর্ণব যত এগিয়ে আসছে আনায়ার মনে ততই ভয় জেঁকে ধরছে। আনায়া ভয় পেয়ে নিজের লেহেঙ্গা চেপে ধরল। শ্বাস বেড়ে যাচ্ছে। অর্ণব এসে আনায়ার সামনাসামনি বসল। আলতো হাতে ঘোমটা সরালো। তাকিয়ে রইল নব বধূ রূপে প্রিয়সীর পানে। এই তাকিয়ে থাকার মাঝে নেই কোনো কামুকতা। আছে শুধুই মুগদ্ধতা, এক রাশ ভালোবাসা। এক সমুদ্র পরিমান তাকে দেখার তৃষ্ণা। অর্ণব ঘোরের মাঝে পড়ে যায় প্রিয়সীর প্ৰিয় মুখ খানা দেখতে দেখতে। এ দেখার শেষ নেই। জন্ম জন্মাতরের এই তৃষ্ণা। আনায়া ভেবে পায় না লোকটা এভাবে কি দেখে। অর্ণব কতক্ষন এভাবে তাকিয়ে ছিলো তার ঠিক নেই। ওর ঘোর কাটলো আনায়ার কথায়।
“এমন করে কি দেখছেন?”

“তোমাকে”

“কি দেখলেন?”

“মায়া ভরা মুখশ্রী, কাজল রাঙা হরিণী আঁখি যাতে দেখা যাচ্ছে আমার সর্বনাশ। ওই ঝিল চোখে দেখি আমি আমার ধ্বংসলীলা। আফিম মেশানো ওষ্ঠ তাতে লাল রঙা প্রলেপ যা আমায় টানছে খুব নিবিড় ভাবে। আহব্বান জানাচ্ছে ধ্বংসলীলার”

অর্ণবের কথায় আনায়া লজ্জায় মরি মরি অবস্থা। অর্ণব আনায়ার অবস্থা বুঝে দুস্টু হাসি দিল। ধীরে ধীরে এগোতে লাগলো আনায়ার দিকে। আনায়া কি করবে কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। অর্ণব ওর খুব কাছে একে ওপরের নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছে। আনায়া চোখ বুজে নিল। কিছুক্ষন পর ললাটে অধরের ছোঁয়া পেল। অর্ণব প্রিয়সীর ললাটে চুম্বন এঁকে দিল। মুচকি হেসে বলল,
“যেটা ভেবেছো সেটা পড়ে হবে, এখন যাও ফ্রেশ হয়ে এসো। দুজনে একসাথে নফল নামাজ পড়বো”

আনায়া ভীষণ লজ্জা পেল। ওর গাল গুলো রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। অর্ণব সরে গেল। আনায়া তাকিয়ে দেখল ওর থেকে কিছুটা দূরে অর্ণব দাঁড়িয়ে। আনায়া তড়িঘড়ি করে ওর লাগেজ থেকে কাপড় বের করতে নিল।
“আলমারিতে এক পাশে দেখো তোমার কাপড় রাখা আছে, সেখান থেকে নাও”

আনায়া এগিয়ে গিয়ে আলমারি খুলল। এক পাশে শাড়ির সমাহার। আনায়া বেছে তার মাঝে থেকে মিষ্টি কালারের শাড়ি নিয়ে ফ্রেশ হতে গেল। আনায়া ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে দেখল অর্ণব দাঁড়িয়ে আছে। অর্ণব নিজেও চেঞ্জ করে নিয়েছে। অর্ণব ফ্রেশ হয়ে ওযু করে এলো। দুজনে একসাথে নামাজ পড়ে শেষ করল। আনায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আচড়াচ্ছে। ওর কোমর সমান চুল এদিক ওদিক ছাড়ানো। অর্ণব একটু দূরে আলমারির সাথে হেলান দিয়ে দারিয়ে আনায়াকে দেখছে। অর্ণব ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে অর্ণবের দিকে। আনায়া একটু একটু করে পিছাচ্ছে। পিছাতে পিছাতে আনায়া বিছানায় যেয়ে পড়ল। অর্ণব হাতের ওপর ভর দিয়ে আনায়ার দিকে ঝুঁকল। আনায়া ভীতু চোখে তাকিয়ে আছে অর্ণবের দিকে। ওর বুঁকের ভিতর ডিপ ডিপ শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ হাতুড়ি পেটা করছে। অর্ণব নিজের মুখটা এগিয়ে আনছে আনায়ার দিকে আনায়া ভয়ে চোখ বুজে নিল। কিছুক্ষন হয়ে গেল কোনো সারা শব্দ নেই। অর্ণব ওর পাশে বিছানায় শুয়ে হাতের ওপর ভর দিয়ে হেলান দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। আনায়া লজ্জায় হাত দিকে মুখ ঢেকে নিল। আনায়ার কাজে অর্ণব শব্দ করে হেসে দিল। আনায়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,
“আমি চাইলেই এখন তোমাকে কাছে টেনে নিতে পারি, তুমি বাধা দিতে পারবে না। কারণ আমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। কিন্তু আমি চাই তুমি আমায় ভালোবেসে আমার কাছে এসো, জোর করে নয়। তুমি যেদিন নিজ ইচ্ছায় ধরা দিবে আমার মন মহলে সেদিন আমি সম্পূর্ণ রূপে তোমায় আমার করে নিব”

অর্ণব থামল। আনায়া তাকিয়ে আছে অর্ণবের দিকে। কি বলবে বা বলা উচিত কিছুই বুঝতে পারলো না। সত্যিই তো ও এখনো অর্ণবকে ভালোবেসে উঠতে পারেনি। মানুষটাকে ভালো লাগে, তার প্রতি এক ধরণের অদ্ভুত অনুভূতি হয়। আনায়া শিওর না সেটা ভালোবাসা কি না? আনায়ার ভাবনার মাঝে অর্ণব পুনরায় বলল,
“এখন ঘুমাও অনেক রাত হয়েছে। সারাদিনে অনেক ধকল গেছে, রেস্ট প্রয়োজন”

আনায়া তাকিয়ে দেখল বিছানায় একটা মাত্র বালিশ। দুজন মানুষ একটা বালিশে ঘুমাবে কিভাবে? আনায়া ভাবনায় বিভোর অর্ণব ডেকে উঠল,
“কি হলো ঘুমাবে না? ঘুমাতে এসো?”

আনায়া কি বলবে ভেবে পেল না। অস্বস্থি নিয়েই বলল,
“বিছানায় বালিশ তো একটা। আমরা দুজন মানুষ, কিভাবে?”

আনায়ার এমন কথা বলার ধরণের অর্ণব না হেসে পারলো না। একটা সামান্য বিষয়ে কথা বলতেও মেয়েটার এতো অস্বস্থি। হেসে বলল,
“আমার খুব ইচ্ছে আমি বালিশে ঘুমাবো আর আমার বউ আমার বুকে ঘুমাবে। আমার প্রশস্ত একটা বুক থাকতে আমার বউ কিনা বালিশে ঘুমাবে সেটা আমি মেনে নিতে পারবো না”

আনায়া অসহায় চোখে অর্ণবের দিকে তাকাললো। অর্ণব সেই দৃষ্টি পাত্তাই দিলো না।
“ওভাবে তাকিয়ে লাভ নেই সব কিছু ছাড় দিলেও এক্ষেত্রে ছাড় হবে না। তোমাকে আমার বুকেই ঘুমাতে হবে, এটাই ফাইনাল। তাই কথা না বাড়িয়ে ঘুমাতে এসো”

আনায়া কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলো। একটা ছেলের বুকে ঘুমাবে ভাবতেই শিউরে উঠল। কেটে গেল কিছু সময়। ঘুম পাচ্ছে খুব, ঘুমে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। l’অন্য কোনো ছেলে তো আর না ওর নিজের বিয়ে করা জামাই’ এই বুঝ দিয়ে নিজেকে বোঝালো। আসতে করে যেয়ে অর্ণবের বুকে মাথা রাখল। আনায়ার কাজে অর্ণব মুচকি হাসলো কিন্তু ওকে বুঝতে দিলো না। আনায়ার অস্বস্থি হচ্ছে। ক্লান্ত থাকায় একসময় আনায়া ঘুমিয়ে পড়ল। আনায়া ঘুমিয়ে পড়তেই অর্ণব ওকে আষ্ঠেপিষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। আনায়ার কপালে ওষ্ঠ ডুবিয়ে দিল। দু গালেও এঁকে দিল ভালোবাসার পরশ। আনায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি আমার বউ, আশিয়ান সিকদার অর্ণবের বউ। তুমি শুধু আমার, শুধু এবং শুধুই আমার। তোমাকে আমার থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, কেউ না”

#চলবে?

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব২৬
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

রাতের আঁধার কাটিয়ে সূর্য উদিত হচ্ছে পূর্ব দিকে। ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ধরণী। ঘুমে বিভোর নব দম্পত্তি। একে অপরকে আলিঙ্গন করে রয়েছে নিবিড় ভাবে। হটাৎ আনায়ার ঘুম ভেঙ্গে গেল। পিটপিট করে চোখ খুলে নিজেকে কারো শক্ত আলিঙ্গনে আবিষ্কার করলো। ভালো করে লক্ষ্য করে নিজেকে অর্ণবে প্রশস্ত বুকের মাঝে পেল। অর্ণব খুব শক্ত করে ধরে রেখেছে। মনে হচ্ছে ওর বউ অন্য কেউ নিয়ে যাবে সেই ভয়ে বেচারা বউকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। আনায়ার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। নিজেকে কোনো মতে ছাড়িয়ে নিল। ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিল অর্ণবের ললাটে। অর্ণব গভীর ঘুমে আছন্ন। ও টেরই পেল না ওর প্রিয়সী নিজ থেকে ওকে ভালোবাসার পরশ দিয়েছে। আনায়া শাওয়ার নেওয়ার জন্য শাড়ি বের করতে নিল। আলমারি খুলতেই নজরে এলো শাড়ির মেলা। রাতে শাড়িগুলো খেয়াল করা হয়নি। আনায়া খেয়াল করে দেখল শাড়িগুলো সেদিনের কেনা শাড়ি না। তাহলে অর্ণব এগুলো কখন কিনলো? আনায়া একটা একটা করে শাড়িগুলো দেখল। প্রতিটা শাড়িই অনেক সুন্দর। অর্ণবের চয়েস আছে বলতে হবে। আনায়া সেখানে থেকে লাল রঙের জামদানি শাড়ি নিল। নতুন বউ বলে কথা, তাই লাল টাই নিল। আনায়া শাওয়ার নিতে চলে গেল। আনায়া বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি ঠিক করছে।

অর্ণব ঘুমিয়ে আছে। হটাৎ গাঁয়ে পানির অস্তিত্ব অনুভব করতেই ঘুমটা হালকা হয়ে এলো। ঘুম ঘুম চোখে চোখ মেলল। তবে সকাল সকাল বউয়ের আগুন ধরা রূপ দেখে মুহূর্তের মাঝেই ঘুম হাওয়া হয়ে এলো। লাল টুকটুকে শাড়িতে আনায়াকে আগুন সুন্দরী লাগছে। শাড়ির ফাঁকা দিয়ে ফর্সা মেদহীন পেট ও কোমর কিছুটা দৃশ্য মান। অর্ণব তাকিয়ে আছে আনায়ার দিকে। ওর নেশা ধরে যাচ্ছে। বউয়ের এই রূপ দেখে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। অর্ণব চাচ্ছে নজর সরিয়ে নিতে কিন্ত পারছে না। যত হোক বিয়ে করা বউ তার। অর্ণব মন্ত্রমুগদ্ধ মতো ধীরে ধীরে আনায়ার দিকে অগ্রসর হলো। আনায়া শাড়ির কুচি ঠিক করায় মশগুল। অর্ণব কখন ওর এতটা কাছে এসে দাঁড়িয়েছে ও খেয়াল করেনি। হটাৎ আয়নায় নজর যেতেই অর্ণবকে নিজের এতটা কাছে দেখে পিছিয়ে গেল। পিছনে ড্রেসিং টেবিল থাকায় বেশি পিছাতে পারলো না। অর্ণব এগিয়ে আনায়ার আরো কাছে এলো। অর্ণবকে নিজের খুব কাছে অনুভব করতেই ওর হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। অস্বাভাবিক মাত্রায় শ্বাস উঠা নামা করছে। অর্ণব আনায়ার মুখের ওপর পড়ে থাকা ভেজা চুল কানের পিছনে গুঁজে দিল। দুজনের চোখে চোখ। অর্ণব তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। আনায়া চোখ নামিয়ে নিল। অর্ণব আনায়ার অধরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অধরে অধর ছুঁয়ে দিবে এমন সময় দরজায় কেউ নক করলো। অর্ণব সেখানেই থেমে গেল। সরে আসলো আনায়ার কাছ থেকে। আনায়া লজ্জায় ব্যালকনিতে চলে গেল। অর্ণব দরজা খুলতেই অহনা বলল,
“শুভ সকাল ভাইয়া”

এক গাল হাসি নিয়ে অহনা দাঁড়িয়ে আছে। অর্ণব বিরবির করে বলল,
“সকাল সকাল রোমান্সরে বারোটা বাজিয়ে এখন শুভ সকাল বলতে এসেছে”

অহনা অর্ণবের কোনো নরচর না দেখে বলল,
“খাম্বার মতো সামনে দাঁড়িয়ে না থেকে সরো তো আমি আমার ভাবির কাছে যাবো। ভাবি তুমি কোথায়?”

অর্ণব ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“ভাবিটা কই পেলি শুনি”

“তোমাকে বলার প্রয়োজন বোধ করছি না। তুমি এখন সামনে থেকে সরো”

অর্ণব সরে গেল। এর মাঝেই আনায়া রুমে এলো। অহনা আর আনায়া কথা বলছে। অর্ণব ফ্রেশ হতে চলে গেল। অর্ণব ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে দেখে রুমে কেউ নেই। অর্ণব একেবারে তৈরি হয়ে নিচে নামল। নিচে নেমে দেখল আনায়াকে ঘিরে সবাই বসে আছে। অর্ণব টেবিলে বসতেই মেহনাজ বেগম অহনাকে ডেকে আনায়াকে নিয়ে আসতে বলল। আনায়া আসতেই ওকে অর্ণবের পাশে বসিয়ে দিল। মেহনাজ বেগম দুজনকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। আনায়া চাইলে তিনি বললেন,
“তুমি খাও আমি বেড়ে দিচ্ছি। কাজ করার সময় চলে যাচ্ছে না। আমি তোমাকে আমার বাড়ির বউ না বরং মেয়ে বানিয়ে এনেছি। এতদিন তো শুধু ওরা মায়ের আদর পেয়েছে এখন থেকে তুমিও পাবে। অহনার মত তুমিও আমার আরেকটা মেয়ে”

আনায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সকল মেয়েই এমন একজন শাশুড়ি চায়। যে তাকে মায়ের আদর দিয়ে কাছে টেনে নিবে। তার ভুল গুলো ধরে কথা শুনিয়ে দূরে না ঠেলে দিয়ে। আনায়া খেয়ে উঠে ওদের সাথে বসল।

মেহনাজ বেগম টেবিল গুছাচ্ছেন হটাৎ এক প্রতিবেশী তাকে বলে উঠল,
“বউকে বেশি লাই দিবেন না পড়ে দেখা যাবে মাথায় উঠে নাচবে”

মেহনাজ বেগম শক্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
“বউটা যেহেতু আমার ছেলের, তাহলে সে মাথায় উঠে নাচুক বা আকাশে উড়ে বেড়াক তাকে আপনার কি?”

মহিলার থোতা মুখ ভোঁতা হয়ে গেল। পুনরায় বলে উঠল,
“আপনার ভালোর জন্যই বলছিলাম”

“আমার ভালো নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনি নিজেকে নিয়ে ভাবেন তাহলেই হবে”

মহিলাটা চলে গেল। আনায়া তাঁদের কথোপকথন শুনলো। প্রথমে মহিলাটার কথায় মন খারাপ হলেও ওর শাশুড়ির জবাবে ওর মনটা খুশিতে ভরে গেল। ভাগ্য করে ও এমন শাশুড়ি পেয়েছে। আনায়া সত্যি অনেক ভাগ্যবতী। মনের মতো একজন জীবনসঙ্গী, মায়ের মতো শাশুড়ি, বোনের মত ননদ, বাবার মতো শশুর কয়জন মেয়ের ভাগ্যে জোটে। আনায়া আবার ওদের আড্ডায় সামিল হলো।

অর্ণব নিজের ঘরে বসে বিরক্ত হচ্ছে। নতুন বিয়ে করছে কোথায় বউয়ের সাথে রোমান্স করবে তা না তার বউ সবার সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছে। কতো কাঠখোর পুড়িয়ে বিয়ে করলো তাতে লাভ কি হলো? বউয়ের সাথে সময় কাটাবে বলে সকল মিটিং বাদ দিয়ে দিল আর এদিকে ওর বউ লাপাত্তা। বেচারা মনের দুঃখে বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। আনায়া আড্ডা শেষ করে রুমে আসলো। অর্ণবকে গড়াগড়ি খেতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হলো আপনি গড়াগড়ি খাচ্ছেন যে?”

“গড়াগড়ি খেতে মজা লাগছে। তুমিও এসো একসাথে গড়াগড়ি খাই”

“এটা কেমন কথা?”

“যার বউ লাপাত্তা হয়ে যায় তার কাছ থেকে এছাড়া আর কি আশা করা যায়?”

আনায়া একটু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“তা মশাই আপনার বউ কোথায় হারিয়ে গেছে? মানুষের ভিড়ে নাকি অন্য ছেলের সাথে ভেগে গেছে?”

আনায়ার ঠোঁটের কোণে দুস্টু হাসি। অর্ণব এগিয়ে আনায়ার কাছাকাছি এলো। হটাৎ করে আনায়াকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“তাকে আমি এভাবে শক্ত করে ধরে রাখবো। বন্ধি করে রাখবো আমার মনের কুঠুরিতে। অন্য কারো সাথে ভেগে যাওয়ার চান্সই নেই”

“তাই?”

“হ্যাঁ। এতক্ষনে তোমার আমার কথা মনে পড়ল? তোমার যে বর আছে, বেচারা তোমার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে সে খেয়াল তোমার আছে?”

“আর বলবেন না ওরা আমাকে ছাড়ছিলই না। আমি আসবো কিভাবে আপনিই বলেন?”

“ওদের বলবে তোমার একমাত্র বর তোমার অপেক্ষা করছে। তোমাকে তার কাছে যেতে হবে”

“আমাকে কি আপনার মতো বেশরম মনে হয়?”

“আমি বেশরম?”

“হ্যাঁ”

“তাহলে হয়ে যাক কিছু বেশরম কর্ম কান্ড, কি বলো?”

অর্ণব দুস্টু হেসে চোখ টিপ দিলো। আনায়া নিজেকে অর্ণবের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“সরুন। দূরে যান আপনার সব উল্টাপাল্টা মতলব নিয়ে। আমাকে তৈরি হতে হবে। কিছুক্ষন পর বাসায় মেহমান আসা শুরু হয়ে যাবে”

“বাহানা ভালোই দিতে পারো”

অহনা মেকআপ আর্টিস্টকে নিয়ে এলো। আনায়া সাজতে বসেছে। অর্ণব চলে গেল নিচে। বৌভাতের আয়োজন ওদের বাগানে ওরা হচ্ছে। সেখানে কাজ কতদূর চলছে তা দেখতে চলে গেল অর্ণব। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। আনায়া সেজেগুঁজে স্টেজে বসে আছে। অর্ণব সবার সাথে কথা বলছে। কিছু রাজনৈতিক নেতা এসেছে তাঁদের ওয়েলকাম জানাচ্ছে। বেচারা খুবই ব্যস্ত। এর মাঝেও একটু পর পর আনায়ার খবর নিতে ভুলছে না। অহনাকে আনায়ার পাশে বসিয়ে দিয়ে গেছে। যেন কিছু লাগলে ওকে হেল্প করতে পারে। একেকজন এসে আনায়ার সাথে কথা বলছে। আনায়া তাঁদের চিনে না তবুও তাঁদের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। আনায়া অধির আগ্রহে বসে আছে কখন ওর বাড়ির লোক আসবে তাই। বার বার গেটের দিকে তাকাচ্ছে। আনায়ার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ওর বাড়ির লোক এলো। আনায়া সবার আগে আবিরকে জড়িয়ে ধরল। দুই ভাই-বোন কুশল বিনিময় করল। আনায়া একে একে সবার সাথে কথা বলল। নীলিমা আনায়ার পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,
“বাসর কেমন হলো ননোদিনী?”

আনায়া লজ্জা রাঙা মুখে বলল,
“ভাবি তুমিও না, মুখে কিছু আটকায় না তোমার?”

আনায়ার লজ্জা পাওয়ার ধরণে নীলিমা হেসে দিল। সুষ্ঠ ভাবে বউভাত শেষ হওয়ার পর আনায়া আর অর্ণব এলো আনায়াদের বাড়িতে। সাথে অহনা আর জিয়াও এসেছে। অহনার কথা সে তার ভাবিকে ছেড়ে থাকতে পারবে না। সেও তার ভাবির সাথে আসবে। আবিরের অহনার এই বাচ্চামো গুলো খুব ভালো লাগে। ওর কাছে মেয়েটাকে অনেক আদুরে লাগে। ইচ্ছে করে যখন তখন আদর করে দিতে। আনায়া নিজের রুমে এসে ধপাস করে বিছানায় শুয়ে বলল,
“আমার ঘর”

অর্ণব বলে উঠল,
“এভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরেও তো বলতে পারো,’আমার বর'”

“ইসস আসছে, শখ কতো”

#চলবে?