প্রেমের তাজমহল পর্ব-৪১+৪২

0
107

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব৪১
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

চারদিকে নিকষ কালো আঁধারে ঢাকা। অর্ণবদের বাড়ি সেজে আছে উৎসবের সাজে। চারপাশ হরেক রকমের আলোয় আলোকিত। দুপুরে আকদ শেষে সবাই রয়ে গেছে। ছোটো খাটো অনুষ্ঠান হচ্ছে। পুরুষরা সবাই একসাথে বাগানে আড্ডা দিচ্ছে। তাঁদের মাঝে রয়েছে অর্ণবও। রাজনীতিতে কি হচ্ছে এসব কিছুই তাঁদের আলোচনার বিষয়। মহিলারা রান্নাবান্না করছে আর গল্প করছে। ছোটরা আড্ডার আসর বসিয়েছে ড্রয়িং রুমে। মিহি,আনায়া,অর্ষা, নীলিমা, জিয়া, জারিফ, জিহাদ, মেহের আরো অনেকে। আনায়া প্রথম মেহেরকে দেখে চমকে গিয়েছিলো। শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলো বান্ধবীকে। কতো দিন পড়ে দেখা দুজনার। স্কুল জীবন শেষে অর্ষা আর আনায়া একই কলেজে ভর্তি হলেও মেহের ভর্তি হয়েছিল অন্য কলেজে। আনায়া মেহেরকে ছেড়ে দিয়ে বলল,
“কিরে কেমন আছিস? অনেক দিন পর দেখা হলো। তবে তুই সেই আগের মতোই চিকনি আসছিস। এখনো কি আগের মতো দুস্টুই আছিস নাকি ভালো হয়ে গিয়েছিস? এখানে কার সাথে এলি? আমার শশুর বাড়িতে তুই? কিভাবে? কোনো আত্মীয় হোস নাকি?”

“তুই আগে দম নে দোস্ত। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আগের মতোই আছি তবে একটু বদল হয়েছে আগে পাজি ছিলাম এখন মহা পাজি হয়েছি। আম্মুর সাথে এসেছি। আমি অর্ণব ভাইয়া একমাত্র খালামনির মেয়ে”

আনায়া অবাক হলো মেহের অর্ণবের কাজিন। ও আগে জানতো না তো। বিয়েতেও তো ওকে দেখেনি।
“তুই ওনার কাজিন? তাহলে তোকে বিয়েতে দেখলাম না যে?”

“তোদের বিয়ের সময় আমার অনেক জরুরি কিছু কাজ ছিলো তাই আসতে পারিনি। তা তোমার চিঠির প্রেমিককে পেয়ে কেমন কাটছে জীবন?”

“আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো”

আনায়া একটু থামলো। হটাৎ মাথায় একটা কথা এলো। অর্ণবই যে ওর চিঠির প্রেমিক এটা অর্ষা ছাড়া তো আর কেউ জানে না। তাহলে মেহের জানলো কিভাবে?
“এক মিনিট, আমার চিঠির প্রেমিকের বিষয়ে তুই জানলি কিভাবে? তোকে অর্ষা বলেছে?”

মেহেরের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি। হাসি বজায় রেখে বলল,
“আমি জানবো না তো কে জানবে শুনি? তোদের চিঠির পিওন তো আমিই ছিলাম”

“কি বলছিস? তুই? কিভাবে?”

“জি ম্যাডাম আমিই। আমি তোর বইয়ের ভাজে চিঠি রেখে দিতাম। আবার প্রতিদিন তোর বই খুঁজে চিঠি এনে ভাইয়াকে দিতাম। তার বিনিময়ে ভাইয়া আমাকে চকলেট দিতো”

আনায়া ধাম করে মেহেরের পিঠে কিল বসিয়ে দিলো। মেহের ওর পিঠে হাত বুলাচ্ছে।
“হা*রমী আমার সমানে বসে এতকিছু করে ফেললি আমি বুঝতেই পারলাম না”

“বুঝতে হবে কে করেছে? মেহের কখনো কাঁচা কাজ করে না”

দুজনই হেসে দিলো। সবাইকে মিলে আড্ডা দিচ্ছে। নীলিমা, অর্ষা আর আনায়া মিলে অহনাকে লজ্জা দিতে চাইছে। কিন্তু ওদের প্ল্যান ফ্লপ করে অহনা লজ্জা তো পাচ্ছে না উল্টো হাসছে। সবার সাথে মজা করছে। ওর যে একটু আগে আকদ হয়েছে কে বলবে? কোথায় নতুন বউদের মতো লজ্জা পাবে তা না মেয়ে খিলখিল করে হাসছে।

আনায়া সকল কাজ শেষ করে রুমে ঢুকছে। রুম অন্ধকার দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। অর্ণব কোথায়? ওর তো ঘরে থাকার কথা। আনায়া আন্দাজে লাইটের দিকে যাচ্ছে হটাৎ কেউ ওর হাত ধরে হেঁচকা টান দিলো। আনায়া সোজা গিয়ে পড়লো কারো প্রসস্থ বুকে। লোকটা ওর কোমর শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। আনায়া ভয় পেল। অন্ধকারে কে ওকে এভাবে ধরে আছে। কিছুটা আতঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“কে?”

পুরুষালি কণ্ঠে উত্তর ভেসে এলো,
“এখনো আমার ছোঁয়া চিন্তে পারোনি?”

আনায়া অর্ণবের কণ্ঠ শুনে সস্থির নিশ্বাস ফেলল। বেচারি অনেকটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। অর্ণবের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“হটাৎ এভাবেই টান দিয়েছেন তাই ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। আপনাকে চিনবো না আমি তা কখনো হয়। আপনার ছোঁয়া তো আমার সর্বাঙ্গে মিশে আছে। এই পুরো আপনিটাই তো আমার অস্তিত্বে মিশে আছেন”

অর্ণব ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। আনায়াকে নিজের আরো কিছু কাছে টেনে নিল। মুহূর্তের ব্যবধানে আনায়ার অধরে অধর মিলিয়ে দিলো। আনায়া আবেশে চোখ বুজে নিল। কিছুক্ষন পর অর্ণব আনায়ার ওষ্ঠ ছেড়ে কপালে কপাল ঠেকালো। দুজনেই জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আনায়া ছুটোছুটি করছে ছাড়া পাওয়ার জন্য। অর্ণব শক্ত করে ওকে নিজের সাথে জড়িয়ে রেখেছে। আনায়া মিনিমিন কণ্ঠে বলল,
“ছাড়ুন”

“এখন নো ছাড়াছাড়ি জান। তখন কি বলেছিলাম মনে নেই? এখন সময় সুধে আসলে উসুল করার। আর অর্ণব সিকদার নিজের হক কখনো ছাড়ে না”

অর্ণব এক ঝটকায় আনায়াকে কোলে তুলে নিল। আনায়া অর্ণবের গলা জড়িয়ে ধরল। অর্ণব আনায়াকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ের দিলো। আনায়া লজ্জায় চোখ বুজে আছে। অর্ণব নেশালো কণ্ঠে বলল,
“কি হলো জান? চোখ বুজে আছো কোনো? চোখ খুলো”

‘উহু, চোখ খুললেই আমি আপনার নেশালো চোখে হারিয়ে যাবো। নিজেকে হারিয়ে ফেলবো অতল গভীরে যার কোনো কুল কিনারা নেই। তাই চোখ খুলা যাবে না”

আনায়ার কথায় অর্ণব শব্দ করে হেসে দিলো। ভালোবাসার পরশ এঁকে দিলো আনায়ার বন্ধ চোখের পাতায়। আনায়া শিউরে উঠল। আরো একটি রাতে সাক্ষী হলো ওদের ভালোবাসার।

সকালের স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত চারপাশ। নির্মল বাতাস বইছে। আনায়ার ঘুম ভেঙ্গে গেল। নিজেকে আবিষ্কার করলো অর্ণবের উন্মুক্ত বুকে। লজ্জায় মুড়িয়ে গেল। কোনো রকম নিজেকে ঠিকঠাক করে শাওয়ার নিতে চলে গেল। অর্ণব জেগে গেলে আবারো দুস্টুমি শুরু করবে। এটা ওটা বলে ওকে লজ্জা দিবে। আনায়া বেরিয়ে দেখলো সাহেব এখনো ঘুমে বিভোর। আনায়া ওকে না ডেকে সোজা নিচে চলে গেল। সকালের ব্রেকফাস্ট বানিয়ে অর্ণবের জন্য কফি নিয়ে রুমে ঢুকলো। এখনো অর্ণব ঘুমিয়ে আছে। আনায়া হাতের কফিটা পাশের টেবিলে রেখে মৃদু স্বরে অর্ণবকে ডাকছে। তবে সাহেবের ঘুম ভাঙার নাম নেই। আনায়ার মাথায় দুস্টু বুদ্ধি চাপলো। আসতে করে অর্ণবের হাত ডুবিয়ে দিলো গরম কফির ভিতরে। অর্ণব লাফিয়ে উঠলো। অর্ণব হাতে ফুঁ দিচ্ছে আর এদিকে আনায়া খিলখিল করে হাসছে। অর্ণব হাতে ফুঁ দেওয়া বাদ দিয়ে তার মায়াবতীর হাসির দিকে তাকিয়ে আছে। ওর হাতের জ্বালা মুহূর্তের মাঝেই শীতল হয়ে গেল। আনায়া হাসি থামিয়ে অর্ণবের দিকে তাকালো। অর্ণব ওর দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। আনায়া অর্ণবের সামনে চুটকি বাজালো। অর্ণব ঘোর থেকে বেরিয়ে এলো। আনায়া ওর সাথে কি করেছে মনে পড়তেই অর্ণব আনায়াকে ধরার প্রচেষ্টা করছে। আনায়া রুম জুড়ে দৌড়াচ্ছে অর্ণব ওর পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আনায়া হাপিয়ে গেল। ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়লো। অর্ণবও ওর পাশে শুয়ে পড়লো। হাত বাড়িয়ে আনায়াকে টেনে নিয়ে আসলো ওর কাছে। জড়িয়ে ধরলো আনায়াকে। অর্ণব এগিয়ে আসছে আনায়ার দিকে আনায়া অর্ণবকে থামিয়ে দিল।
“আপনার কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে”

“কফি চুলায় যাক। রোমান্সের সময় নো এক্সকিউজ”

অর্ণব ডুব দিলো আনায়ার অধর জোড়ায় মাঝে। আনায়াও কোনো বাঁধা দিলো না। দুজনে আবেশে হারিয়ে গেল একে অপরের মাঝে।

মাঝে কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। আনায়ার অর্ণবের দিনকাল খুব ভালো যাচ্ছে। দুস্টু মিষ্টি ভালোবাসায় ভরপুর ওদের জীবন। আনায়া অর্ণবের বিয়ের ছয়মাস পূর্ণ হলো আজকে। আনায়া কিছুটা এক্সাইটেড। ও ভেবেছে আজকে অর্ণবকে একটা সারপ্রাইজ দিবে আর দুজনে মিলে দিনটা সেলিব্রেট করবে । কিন্তু কি দিবে এটাই ভেবে পাচ্ছে না? বাহিরে যাবে সেটাও ইচ্ছে করছে না। শরীর কেমন দুর্বল লাগছে। ভালো লাগছে না কিছুই। মেহনাজ বেগম রান্না করছেন আনায়া তার পাশে দাঁড়িয়ে এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছে। মেহনাজ বেগম আনায়ার হাতে খাবারের বাটি ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“যা মা এটা টেবিলে রেখে আয়”

আনায়া ওনার কাছে থেকে বাটিটা নিয়ে টেবিলে রাখলো। পিছু ঘুরে আগাবে হটাৎ মনে হলো মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠছে। মাথাটা কেমন বনবন করে ঘুরছে। আনায়া নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো। তবে পারলো না। মুহূর্তের মাঝে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়লো।

#চলবে?

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব৪২
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

মেহনাজ বেগম কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। আনায়াকে এভাবেই ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখে অবাক হলো। দৌড়ে গেলে ওর কাছে। একটু আগেই তো মেয়েটা ঠিক ছিলো। হটাৎ করে কি হলো। মেহনাজ বেগম আনায়ার মাথা কোলে নিয়ে ডাকা শুরু করলেন। আনায়ার কোনো সারা শব্দ নেই।
“অহনা, জিয়া কে কোথায় আছিস তাড়াতাড়ি এদিক আয়”

অহনা ফোনে আবিরের সাথে কথা বলছিলো। মেহনাজ বেগমের হাক শুনে আবিরকে বলে কল কেটে দৌড়ে নিচে এলো। আনায়াকে এভাবে নিচে লুটিয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“মা ভাবির কি হয়েছে?”

“কথা না বলে ওকে উঠাতে আমাকে সাহায্য কর”

দুজনে মিলে আনায়াকে নিয়ে সোফায় শুইয়ে দিলো। বাসায় আর কেউ নেই। সবাইকে যার যার কাজে বাহিরে। অহনার আজকে কোনো ক্লাস ছিলো না তাই ও বাসায় রয়ে গেছে। মেহনাজ বেগম আনায়ার মুখে পানি ছিটিয়ে ওকে ডাকছে। কিন্তু আনায়ার কোনো হেলদোল দেখা যাচ্ছে না।
“অহনা তুই অর্ণব কে ফোন কর। ওকে তাড়াতাড়ি আসতে বল। সুস্থ সবল মেয়েটার হটাৎ মেয়েটার কি হয়ে গেল”

অহনা অর্ণবের নাম্বার ডায়াল করলো। অর্ণব পার্টি অফিসে গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিংয়ে বক্তব্য দিচ্ছে। পাশে রাখা ফোনটা বেজে উঠতেই বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ফেলল। রক্তিম চোখে তাকালো তাপস এর দিকে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো স্ক্রিনে “শাক*চুন্নি” নামটা ভেসে উঠছে। অর্ণব ভ্রু কুঁচকে ফেলল। অহনা এমন সময় কল করছে কোনো। অর্ণব ফোনটা রিসিভ করে কানে নিল। ওপর পাশ থেকে অহনার কথা শুনে হতোবিহল হয়ে গেল।
“ভাইয়া ভাবি অজ্ঞান হয়ে ফ্লোরে পড়ে গিয়েছে। আম্মু পানি ছিটিয়ে ডাকছে তবে ভাবি সারা দিচ্ছে না। ভাইয়া তুমি তাড়াতাড়ি বাসায় এসো”

অর্ণব ফোন কেটে দিল।
“আজকের মিটিং এই পর্যন্ত। বাকি আলোচনা পড়ে হবে। তাপস তাড়াতাড়ি গাড়ি বের করো”

শেষের কথাটা তাপসকে বলল। তাপস চলে গেল। অর্ণব ডায়াল করলো ওদের ফ্যামিলি ডক্টরের নাম্বারে। ডক্টর জানালো সে তার চেম্বারে আছে। অর্ণব তাকে পিকআপ করে নিবে বলে বেরিয়ে গেল।

মেহনাজ বেগম আর অহনা মিলে আনায়ার জ্ঞান ফিরানোর চেষ্টা করছে। তবে ফলাফল শুন্য। কিছুক্ষনের মাঝে অর্ণব এলো। আনায়াকে সোফা থেকে কোলে তুলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠা শুরু করলো। রুমে নিয়ে আনায়াকে সাবধানে শুইয়ে দিলো। ডক্টর আনায়ার চেকআপ করছে। অর্ণব পুরো রুম জুড়ে পায়চারি করছে।একপাশে মেহনাজ বেগম আর অহনা দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখেই চিন্তার ছাপ। কিছুক্ষন পড় ডক্টর হাসি মুখে বলল,
“মিসেস সিকদার মিষ্টি আনুন তারাতাড়ি”

ডক্টরের এমন কথা শুনে সবাই অবাক। কি হলো কিছু বুঝতে পারলো না। অহনা অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“আঙ্কেল মিষ্টি কোনো? ভাবির কি সুগার ফল করেছে?”

“আরে বোকা মেয়ে তুমি ফুপ্পি হতে চলেছো”

ডক্টরের কথা শুনে সবাই প্রথমে অবাক হলেও পড়ে বুঝতে পেরে সবার মুখ থেকে চিন্তার রেশ কেটে খুশির ঝলক দেখা দিল। মেহনাজ বেগম চলে গেলেন মিষ্টি আনতে। অহনা অর্ণবের কাছে যেয়ে বলল,
“কংগ্রাচুলেশন ভাইয়া। এবার অন্তত ভালো হয়ে যাও নাহলে আমার প্রতি যেই অবিচার গুলো করেছো সব কিছুর হিসাব নেওয়াবো পিচ্চিকে দিয়ে”

“তুই ভালো হয়ে যা। নাহলে তোর একটা চুলও আস্তো থাকবে না। পিচ্চি তোর সব চুল তুলে নিবে”

দুজন আবার ঝগড়া শুরু করে দিল। মেহনাজ বেগম এসে দুজনকে ধমক দিলো। অর্ণবকে বলল,
“দুদিন পড় বাচ্চার বাবা হয়ে যাবি এবার অন্তত বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করা ছাড়”

“আর অহনা তোকেও বলি বিয়ে হয়েছে সামনে শশুর বাড়ি যাবি এখনো দুই ভাইবোন এমন ঝগড়া করিস। দুজনেই ভালো হয়ে যা”

দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
“আমরা এজীবনেও ভালো হবো না”

অতঃপর দুই ভাইবোন একসাথে হেসে দিলো। সাথে ডক্টরও হেসে দিলো। অর্ণব হাসি থামিয়ে চিন্তিত স্বরে বলল,
“কিন্তু ডক্টর আনায়ার জ্ঞান ফিরছে না কোনো?”

“ওর শরীর খুবই দুর্বল। এখন থেকে বেশি করে ওর খেয়াল রাখবে। যেন ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করে নাহলে বাচ্চার পুষ্টিহীনতা দেখা দিবে। আমি ওকে স্যালাইন লাগিয়ে দিয়ে যাচ্ছি কিছুক্ষনের মধ্যেই ওর জ্ঞান ফিরবে। চিন্তা করো না”

ডক্টর আনায়াকে স্যালাইন লাগিয়ে দিয়ে চলে গেল। অর্ণবদের বাড়িটা আনন্দ উৎসবে ভরে গেছে। অহনা সাথে সাথে আবিরকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে।

আনায়ার জ্ঞান ফিরছে। পিটপিট করে চোখ খুলে নিজের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করলো। নিজেকে নিজের ঘরে দেখে অবাক হলো। ও কখন ঘরে এলো? হাতে সেলাইন লাগানো কোনো? মনে পড়লো সেই সময়ের কথা। মাথা ঘুরাচ্ছিলো, চেয়েও নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলো না। এর পর কি হয়েছে ওর কিছু মনে নেই। নিজের আশেপাশে সবাইকে দেখে অবাক হলো। ওর বাড়ির লোক কখন এলো? হটাৎ সবাই এখানে? সবাই একে একে আনায়াকে কংগ্রাচুলেশন জানাচ্ছে। আনায়া ভেবে পেল না কংগ্রাচুলেশন জানানোর কারণ। এমন কি হলো যার জন্য সবাই ওকে কংগ্রেচুলেট করছে। আশালতা বেগম আনায়ার পাশে বসলেন। মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে বললেন,
“এখন থেকে সব সময় সাবধানে চলাফেরা করবি, তাড়াহুড়ো করবি না। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করবি”

আশালতা বেগম আরো অনেক কিছু বললেন। আনায়া মনে দিয়ে শুনলো তবে এগুলো বলার কারণ খুঁজে পেল না। সবাই চলে গেল। আনায়া বসে বসে ভাবছে। এমন সময় রুমে অর্ণবের আগমন ঘটলো। অর্ণব গম্ভীর মুখে আনায়ার দিকে এগিয়ে এলো। হাতে ফলের বাটি। অর্ণবের গম্ভীর মুখ দেখে আনায়ার কেমন ভয় ভয় লাগছে।
“এমপি সাহেব কি হয়েছে আপনার? মুখ এমন গম্ভীর কোনো? আর সবাই এগুলো কি বলে গেল? কংগ্রাচুলেশন জানালো কোনো? কিছু কি হয়েছে? আমার হাতে স্যালাইন লাগানো যে?আমার কি কিছু হয়েছে?”

“হ্যাঁ হয়েছে তো অনেক কিছু”

আনায়া কাঁপা কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে?”

“আগে এই বাটিতে থাকা সব খাবার শেষ করো তারপর বলবো”

আনায়া ভদ্র মেয়ের মতো বাটিতে থাকা ফলগুলো শেষ করলো। খাওয়া শেষে বাটিটা পাশে রেখে জিজ্ঞেস করলো,
“এবার বলুন”

অর্ণব আগের চেয়ে বেশি গম্ভীর হলো। আনায়ার ভয় হচ্ছে।
“ডক্টর বলেছে বাড়িতে নতুন অতিথি আসবে”

আনায়ার মাথায় কথাটা ঢুকলো না। ও কথার মানে না বুঝে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো,
“বাড়িতে নতুন অতিথি আসবে ভালো কথা কিন্তু সবাই আমাকে কংগ্রাচুলেশন জানালো কেনো?”

“বোকা মেয়ে বাড়িতে নতুন অতিথি আসবে। যার ছোটো ছোটো হাত,পা থাকবে। সারা ঘরময় জুড়ে তার ছোটো পায়ের বিচরণ হবে। আদো আদো কণ্ঠে তোমাকে মা বলে ডাকবে”

আনায়া এতক্ষনে বুঝলো। অর্ণব ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আনায়ার মনের মাঝে খুশির জোয়ার বইছে। পেটের ওপর হাত রাখলো। অনুভব করার চেষ্টা করলো। নিজের মাঝে অন্যকারো অস্তিত্ব থাকবে ভাবতেই মন খুশি হয়ে গেল। আনায়া ভাবনায় চলে গেল।

আনায়ার ভাবনার মাঝে আগমন ঘটলো অহনার আর নীলিমার। অহনা আর নীলিমা মিলে আনায়াকে এটা ওটা বলে লজ্জা দিচ্ছে। আনায়াও লজ্জায় মুড়িয়ে যাচ্ছে। ও মাঝে মাঝে ভেবে পায়না ওর এতো লজ্জা আসে কোথা থেকে?
“দুই জা মিলে আমাকে লজ্জা দিচ্ছ এটা কিন্তু ঠিক না”

“তুমি লজ্জা পাচ্ছ তাই দিচ্ছি। আমার মতো লজ্জা পেও না তাহলে লজ্জা দিবো না”

“ওরে আমার লজ্জাবতী ননোদিনী। থাক অহনা ওকে আর লজ্জা দিও না। পড়ে নাহয় দেখা যাবে ওর এমপি সাহেব আমাদের জেলে পুড়ে দিবে”

দুজন একসাথে হেসে দিলো। আনায়ার মাথায় চলছে অন্য ভাবনা। অর্ণব সে সময় গম্ভীর মুখে ছিলো। তবে কি অর্ণব খুশি না? আনায়া বুঝতে পারলো না অর্ণবের মনের ভাব। সারাদিন সবার সাথে কেটে গেল। আনায়া বিছানায় বসে আছে। অপেক্ষা করছে অর্ণবের আসার। অর্ণব রুমে ঢুকে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল। অর্ণব ফ্রেশ হয়ে বের হতেই আনায়া প্রশ্ন করলো,
“এমপি সাহেব আপনি কি কোনো কারণে আমার ওপর রেগে আছেন। আপনি কি খুশি না তার আগমনে”

আনায়ার কথায় অর্ণব থেমে গেল। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বসলো আনায়ার সামনে। ওর গালে হাত দিয়ে বলল,
“তোমার এমনটা কোনো মনে হলো?”

“সে সময় আপনার মুখটা কেমন গম্ভীর ছিলো? মুখে হাসি ছিলো না”

“তুমি জানো না আজকে আমি কতটা খুশি। তুমি আমার জীবনের একমাত্র পূর্ণতা । তুমি আমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে সুখকর অনুভূতিটা দিয়েছো। তার আগমনের সুসংবাদে আমি কতটা খুশি তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। ছোটো ছোটো পায়ে সে আমার কাছে এগিয়ে আসবে। আমাকে বাবা বলে ডাকবে এগুলো ভাবতেই আমার চোখে অশ্রু এসে ধরা দেয়। তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আমাকে এই সুখের সাথে পরিচয় করানোর জন্য। ভালোবাসি বউ, অনেক অনেক ভালোবাসি তোমাকে”

অর্ণব কথা বলতে বলতে আনায়াকে জড়িয়ে ধরলো। আনায়াও অর্ণবের পিঠে হাত রাখলো। কিছুক্ষণ পর আনায়া নিজের কাঁধে ভিজা অনুভব করলো। আনায়াও বলল,
“আমিও আপনাকে ভালোবাসি এমপি সাহেব”

#চলবে?