প্রেমের তাজমহল পর্ব-৪৩+৪৪

0
86

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব৪৩
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

সূর্য অস্ত গিয়েছে অনেক পূর্বে। ধরণীতে ছেয়ে আছে আঁধার। আনায়া রুমে পায়চারি করছে। কিছুই ভালো লাগছে না। ইদানিং মুহূর্তে মুহূর্তে মুড চেঞ্জ হয়। এই মন ভালো থাকে আবার একটু পড়েই মন খারাপ হয়ে যায়। একা একা লাগে লাগে। মাঝে মাঝে অহনার সাথে গল্প করতে করতে হুটহাট রেগে যায়।। জোরে ধমক দিয়ে বসে। তবে অহনা মেয়েটা তাতে একটুও রাগে না। উল্টো গলা জড়িয়ে ধরে বলে,
“তুমি যতই রাগ দেখাও,ধমক দেও আমি তবুও তোমার পিছু ছাড়বো না”

পড়ে দুজনই একসাথে হেসে দেয়। আনায়া নিজের এমন পরিবর্তনের কারণ খুঁজে পাচ্ছে না। এটা কি প্রেগনেন্সির কারণে হচ্ছে নাকি অন্য কিছু? আনায়ার জানা নেই। এইতো আজকে সকালেই তো অর্ণবের সাথে ঝগড়া করার ইচ্ছে হচ্ছিলো। কি করবে,কিভাবে ঝগড়া শুরু করবে খুঁজে পেল না? কিন্তু ওর খুবই ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে। গম্ভীর কণ্ঠে ডাক দিলো,
“এমপি সাহেব”

অর্ণব আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছিলো। আনায়ার গম্ভীর কণ্ঠের ডাক শুনে পিছু ফিরে তাকালো।
“হুম বলো”

“আপনি সেদিন ওই মেয়েটার দিকে তাকালেন কোনো?”

অর্ণব ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
“কোন মেয়েটা?”

“আপনি কতো গুলো মেয়ের দিকে তাকিয়েছেন শুনি? তারমানে আপনি রাজনীতির নামে সারাদিন মেয়ে দেখে বেড়ান। এই আপনার আমার প্রতি ভালোবাসা? আপনি আর আমাকে ভালোবাসেন না”

আনায়া কান্না করছে। অর্ণব কি হলো কিছুই বুঝতে পারলো না। আনায়ার কাছে এসে গালে হাত রেখে বলল,
“কি বলছো এসব? মাথা ঠিক আছে? তোমার কি মনে হয় আমি আমার মায়াবতীকে ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকাতে পারি? আমার চোখে তো সারাদিন মায়াবতী ভাসে। আমি বার বার শুধু আমার মায়াবতীকেই আমার চোখের সামনে দেখতে চাই। যদি সুযোগ পেতাম তাহলে আমি সারাদিন আমার মায়াবতীকে আমার সামনে বসিয়ে রাখতাম। নয়ন জুড়িয়ে শুধু তাকেই দেখতাম। আর এই জীবনে যতদিন বাঁচবো ততদিন আমি আমার মায়াবতীকেই ভালোবাসবো”

অর্ণব আনায়ার কপালে চুমু এঁকে দিলো। আনায়া আবেশে চোখ বুজে নিল। আনায়া অর্ণবকে জড়িয়ে ধরলো। অর্ণব নিজেও আনায়াকে জড়িয়ে ধরলো। কিছুক্ষন পর অর্ণব আনায়াকে ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“এবার বলো তো ঘটনা কি? হটাৎ আবোল তাবোল বকছিলে কোনো?”

আনায়া মিটিমিটি হাসছে। হাসি থামিয়ে বলল,
“আসলে আমার খুব ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছিলো কার সাথে করবো বুঝতে পারছিলাম না। তাই আপনার সাথে শুরু করে দিলাম। কিন্ত আপনি ঝগড়া করার বদলে ঝগড়া শুরুর আগে শেষ করে দিলেন”

আনায়া শেষের কথা গুলো মন খারাপ করে বলল। অর্ণবের মায়া হলো। কাছে টেনে নিয়ে বলল,
“মন খারাপ করো না। রাতে এসে পায়ে পা দিয়ে তোমার সাথে ঝগড়া। তাও এখন মন খারাপ করে না জান। তোমার মুখে মেঘেদের আনাগোনা যে আমার ভালো লাগে না। তোমার ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি আমার বুকে প্রশান্তি দেয়”

আনায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল। অর্ণব আনায়ার কপালে চুমু দিয়ে বেরিয়ে গেল। আনায়া অর্ণবের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। ওর ঠোঁটের কোণে এখনো হাসি লেগে আছে। জীবনে সঠিক মানুষ জীবন সঙ্গী হয়ে এলে জীবনটা সত্যিই খুব সুখের হয়। আনায়া ফোন হাতে নিয়ে নীলিমার নাম্বার ডায়াল করলো। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই দুজন কুশল বিনিময় করলো। কুশল বিনিময় শেষে আনায়া জিজ্ঞেস করলো,
“ভাবি জানো ইদানিং আমার মাঝে কেমন পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি”

“কেমন?”

“এইযে হুটহাট মন খারাপ হয়, হুটহাট রাগ উঠে। যাকে তাকে ইচ্ছে মতো বকে দেই। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে কারো সাথে তুমুল ঝগড়া করতে। এগুলো হওয়ার কারণ কি বলতো? আমি তো কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না”

আনায়ার কথা শুনে ওপর পাশে নীলিমা হাসছে। আনায়া কিছুটা রাগী স্বরে বলল,
“আমি চিন্তায় আছি আমার সমস্যা নিয়ে আর তুমি হাসছো?”

“আরে বোকা মেয়ে এগুলো প্রেগনেন্সির কারণে হচ্ছে। প্রেগনেন্সিতে এমন মুড সুয়িং হয়। এটা স্বাভাবিক। এটা নিয়ে টেনশন করার কিছুই নেই”

“তোমার তো হয়নি। নাদিরা যখন তোমার পেটে ছিলো তখন তো তোমার মাঝে এমন কিছুই দেখিনি। তুমি স্বাভাবিক ভাবে সবার সাথে কথা বলতে”

“সবার কি সব লক্ষণ দেখা দেয়। আমার মাঝেও পরিবর্তন এসেছিলো। আমার মেজাজ খারাপ হলে তোমার ভাইয়াকে বকাবকি করতাম। ওর সাথে রাগ দেখতাম। তোমাদের সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতাম তাই তোমার এমন মনে হচ্ছে”

আনায়া এতক্ষনে বুঝতে পারলো নিজের এমন পরিবর্তনের কারণ। আরো কিছুক্ষন কথা বলে আনায়া কল কেটে দিলো। মুহূর্তেই আবার মনটা খারাপ হয়ে গেল। ব্যালকনিতে চলে গেল মন ভালো করতে। ব্যালকনিতে ফুরফুরে বাতাস বইছে। বাতাসে আনায়ার শাড়ির আঁচল উড়ে যাচ্ছে। আনায়া চোখ বুঝে আবহাওয়া উপভোগ করছে।

আনায়া রুমে বসে আছে। খাবে না বলে মুখ ফুলিয়ে রেখেছে । খাবার খেতে ওর একটু ভালো লাগে না। খেলেই একটু পর গলগল করে বমি করে সব ফেলে দেয়। অর্ণব প্লেটে করে খাবার নিয়ে এলো। আনায়া খাবার দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিল। অর্ণব আনায়ার সামনে এসে বসল। খাবার মুখের সামনে ধরে বলল,
“হা করো”

“উহু, আমি খাবো না খেলেই বমি হবে”

“তাই বলে না খেলে চলবে? তুমি না খেলে আমাদের জুনিয়র খাবার পাবে কিভাবে বলো? তুমি কি চাও সে না খেয়ে থাকুক, অপুষ্টিতে ভুগুক”

আনায়া নাক সিটকে বলল,
“খাবার গন্ধ লাগে। মুখের কাছে নিলেই বমি আসে”

“একটু কষ্ট করে খাও জান। শুধু আমাদের জুনিয়রের জন্য একটু কষ্ট করো”

আনায়া চোখ মুখ কুঁচকে খাবারটা মুখে নিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোনো রকম চিবিয়ে গিলে ফেলল। কয়েক বার খেয়ে আনায়া মুখ চেপে ধরলো। অনেক চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হলো না। গলগল করে বমি করে বিছানা মাখিয়ে ফেলল। অর্ণব খাবার রেখে আনায়াকে ধরলো। ওর বমি করা শেষ হলে ওকে ধরে উঠিয়ে বেসিনে নিয়ে মুখ ধুইয়ে দিলো। ধরে নিয়ে বসালো সোফায়। আনায়া মুখ কাচুমাচু করে বলল,
“বিছানা তো নোংরা হয়ে গেল। আপনি বসুন আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি”

অর্ণব ধমক দিয়ে বলল,
“তুমি চুপচাপ বসো। তোমাকে এতো ভাবতে হবে না”

অর্ণব যেয়ে বিছানা থেকে চাদর তুলে নতুন বিছানার চাদর বিছিয়ে দিলো। আনায়াকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি এখানে বসো আমি আসছি”

অর্ণব রুম থেকে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষনের ব্যবধানে হাতে একটা ট্রে নিয়ে ফিরে এলো। টেবিলের ট্রে রেখে বাটি আনায়ার হাতে দিয়ে বলল,
“সব তো বমি করে ফেলেই দিয়েছো। এখন ফলগুলো খেয়ে, জুস টা খাও তাহলে পেট ভরবে”

আনায়া অসহায় কণ্ঠে বলল,
“আবার?”

“কোনো কথা না তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করো”

আনায়া বাধ্য মেয়ের মতো একটু একটু করে খাবার খাওয়া শুরু করলো। অর্ণব কিছুতেই ওকে না খেয়ে থাকতে দিবে না। ওর বেপারে অর্ণব খুবই সিরিয়াস। এইযে সারাদিন খাটাখাটনি করে এসে ওর পিছনে সময় দিচ্ছে। নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছে। আনায়ার মনে ভালো লাগা কাজ করছে। আনায়া একটু একটু করে সব গুলো খাবার শেষ করলো। অর্ণব মুখ মুছিয়ে দিয়ে বলল,
“গুড গার্ল”

আনায়া শুয়ে আছে। অর্ণব ব্যালকনিতে গেছে কথা বলতে। ইম্পরট্যান্ট কল এসেছে। অর্ণব কথা শেষ করে রুমে এসে লাইট নিভিয়ে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে দিলো। আনায়ার পাশে শুয়ে হাত বাড়িয়ে আনায়াকে টেনে নিয়ে এলো কাছে। আনায়ার কপালে চুমু দিয়ে মাথাটা বুকে চেপে ধরলো। কোমর জড়িয়ে ধরল আনায়ার। আনায়াও জড়িয়ে ধরল। দুজন দুজনকে আলিঙ্গন করে পাড়ি দিলো ঘুমের দেশে।

#চলবে?

#প্রেমের_তাজমহল
#পর্ব৪৪
#আফিয়া_আফরোজ_আহি

মাঝে কেটে গেছে অনেক গুলো দিন। পূর্বের আনায়ার সাথে এখনকার আনায়ার অনেক পার্থক্য। আনায়া আগের চেয়ে অনেকটা মুটিয়ে গেছে। এখন ওকে দেখতে গুলুমুলু লাগে। গালগুলো একদম টসটসা টমেটোর মতো ফুলে উঠেছে। আনায়া মাঝে মাঝে আয়নায় নিজেকে দেখে অবাক হয়। নতুন নিজেকে ওর কাছে খুবই ভালো লাগে। নতুন নতুন অনুভূতি জাগে নিজের মাঝে। মা হওয়ার অনুভূতি বোধ হয় সব কিছুর চাইতে আলাদা। আনায়া নিজ মনে কল্পনা করে ছোটো ছোটো হাত, পা, ছোটো শরীরে আধো আধো কণ্ঠে কেউ ওকে মা বলে ডাকবে। ভাবতেই আনায়ার মনে খুশি ধরা দেয়। ওর আর অর্ণবের ভালোবাসার অস্তিত্ব ওর মাঝে একটু একটু করে বেড়ে উঠছে। আনায়া পেটে হাত রেখে অনুভব করার চেষ্টা করে। অর্ণব তো প্রায় সময়ই ওর পেটে কান লাগিয়ে জুনিয়রের সাথে কথা বলে। চুপচাপ তাকে অনুভব করার চেষ্টা করে। আনায়ার তখন খুবই সুখ সুখ লাগে।

আনায়া ড্রয়িং রুমে পায়চারি করছে। শরীর অনেকটা মুটিয়ে যাওয়ার উপর নিচে উঠা উঠি করতে খুবই সমস্যা হয়। তাই এই কয়েক দিনের জন্য ওরা নিচের রুমে শিফট হয়েছে। অহনা ওপরেই ছিলো। আনায়ারা নিচে শিফট হওয়ার পর ও নিজেও নিচে শিফট হয়ে গেছে। ওর একা একা ওপরে ভালো লাগে না। অহনা যতটুকু সময় বাসায় থাকে বেশির ভাগ সময় আনায়ার সাথেই কাটায়। ওর সাথে বসে গল্প করে। আনায়ারও এতে ভালো লাগে। একাকিত্ব দূর হয়। দুজন মিলে জমিয়ে আড্ডা দেয়।

আনায়া রান্না ঘরের উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। মেহনাজ বেগম রান্নার মাঝে খেয়াল করলেন বিষয়টা। আনায়াকে কাছে ডাকলেন।
“এদিকে আয় তো মা”

আনায়া এগিয়ে মেহনাজ বেগমের কাছে কাছে গেল।
“হ্যাঁ মা বলো”

“খিদে পেয়েছে? কিছু খাবি? বানিয়ে দিবো কিছু”

আনায়া মুখটা কাচুমাচু করলো। সত্যি বলতে ওর খিদে পেয়েছে। প্রথম দিকে খাবারের গন্ধের জন্য খেতে না পারলেও এখন অনেক খিদে পায়। একটু পর পর খিদে লাগে। অর্ণব তাই ঘরের অনেক ধরণের স্ন্যাক্স, ফল নিয়ে রাখে। আনায়ার যখন যা ইচ্ছে হয় নিয়ে খেয়ে নেয়। আনায়া মাথা নেড়ে সায় জানালো। মেহনাজ বেগম হেসে দিলো আনায়ার কাজে।
“কিছু খেতে ইচ্ছে হলে সরাসরি এসে আমাকে বলবি। আমি বানিয়ে দিবো। এতো ইতস্তত হওয়ার কি আছে। মায়ের কাছেই তো মেয়ে আবদার করবে”

আনায়া মিনিমিন করে বলল,
“আসলে তুমি এখন একা সব রান্না করো আমাকে একটু হেল্পও করতে দাও না। এতো কাজের মাঝে আমি আবার কিভাবে আবদার করি বলো?”

“বোকা মেয়ে এমনি সময় তুই কাজ করিস আমি তখন বাঁধা দেই? এখন কয়েকমাস তুই ছুটি কাঁটা। আমার নাতি-নাতনি এলে আমি তাকে নিয়ে সারাদিন খেলবো তুই তখন সব কাজ করবি। আর এই সময় অনেক কিছুই খেতে ইচ্ছে করে। আমারও করতো কিন্তু আমি তোর দাদি শাশুড়িকে সব বলতে পারতাম না। লজ্জা করতো সাথে ভয়ও পেতাম। কিন্তু আমাকে তুই নির্দ্বিধায় বলবি। আমি চাইনা আমার মেয়ের কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ থাক”

আনায়ার চোখে পানি চলে এলো। কোনো শাশুড়ি যে এতটা ভালো হতে পারে ওর জানা নেই। সত্যি ও অনেক ভাগ্য করে এমন একটা শশুর বাড়ি পেয়েছে। আনায়া মেহনাজ বেগমকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“তুমি আমার দেখা বেস্ট শাশুড়ি মা”

মেহনাজ বেগম আনায়ার কান টেনে বলল,
“শাশুড়ি কিরে আমি তোর মা আর তুই আমার মেয়ে। অহনা যেমন আমার মেয়ে তেমন তুইও আমার আরেকটা মেয়ে”

মাঝে থেকে অহনা এসে মাথায় হাত দিয়ে বলল,
“হায় হায় আমার কি হলো গো। আমার মায়ের আদর ভাগ হয়ে গেল। আমার সব ভালোবাসা আম্মু ভাবিকে দিয়ে দিলো। এখন আমার কি হবে? এখন আর আমাকে কেউ ভালোবাসে না। আমার কি হবে?”

মেহনাজ বেগম বলল,
“তুই দুইদিন পর শশুর বাড়ি চলে যাবি। তোকে ভালোবেসে কি হবে? তাই এখন থেকে তোর সব ভালোবাসা আনায়ার”

অহনা মুখ ফুলিয়ে বলল,
“আম্মু”

মেহনাজ বেগম হেসে আরেক হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“তুইও আয়”

অহনাও যেয়ে মেহনাজ বেগমকে জড়িয়ে ধরলো। তিনজন এক সাথে হেসে দিলো। অর্ণব এখানে থাকলে নিশ্চই মুগদ্ধ চোখে এই দৃশ্য দেখতো। তবে আফসোস অর্ণব বাড়িতে নেই।

আনায়া বিছানায় আধসোয়া হয়ে বসে বই পড়ছে। কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না তাই বই নিয়ে বসেছে। এমন সময় রুমে প্রবেশ করলো অর্ণব। অর্ণবকে দেখেও আনায়া কিছু বলল না। ও বই পড়ায় মশগুল। অর্ণব হাত ঘড়ি খুলে টেবিলে রাখতে রাখতে বলল,
“শরীর কেমন আছে? সারাদিনে কোনো সমস্যা হয়েছে?”

আনায়া বই থেকে মুখ তুলে চাইলো। ঘর্মাক্ত মুখশ্রী, ঘামে ভিজা পাঞ্জাবী। সকালে গুছিয়ে রাখা চুলগুলো এলোমেলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক খাটুনি গিয়েছে। আনায়া মিষ্টি হেসে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। সারাদিনে কোনো সমস্যা হয়নি”

অর্ণব পাঞ্জাবীর বোতাম গুলো খুলে আয়েস করে সোফায় বসল। শরীরে ম্যাচম্যাচ করছে, ক্লান্ত লাগছে। আনায়া বই রেখে উঠে দাঁড়ালো। রুম থেকে বের হতে নিলে অর্ণব জিজ্ঞেস করলো,
“কোথায় যাচ্ছ?”

“শরবত বানাতে। আপনাকে দেখে ক্লান্ত লাগছে। ঠান্ডা এক গ্লাস শরবত খেয়ে ভালো লাগবে”

“তোমাকে এতো বেশি বুঝতে হবে না। শাওয়ার নিলেই ভালো লাগবে। তুমি অসুস্থ শরীরে রেস্ট নাও”

আনায়া মুখ ভেংচি কেটে বলল,
“আমি এতটাও অসুস্থ না যে সামান্য শরবত বানাতে পারবো না। আপনি বসুন আমি যাবো আর আসবো”

আনায়া চলে গেল। কয়েক মিনিটের মাঝে ফিরে এলো হাতে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত নিয়ে। শরবতের গ্লাস অর্ণবের হাতে দিয়ে পাশে বসল। ওড়না দিয়ে অর্ণবের কপালের ঘাম মুছে দিলো। অর্ণব শরবত শেষ করে গ্লাসটা আনায়ার হাতে দিল। প্রিয়সীর কপালে অধর ছুঁইয়ে দিলো।
“তুমি বসো আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি”

আনায়া গ্লাসটা রেখে এসে রুমে হাটাহাটি করছে। অনেকক্ষণ বসে ছিল। এখন একটু হাটাহাটি করা দরকার। আনায়া পায়চারি করছে এমন সময় অর্ণব বেরিয়ে এলো। টাওয়াল রাখার জন্য ব্যালকনিতে গেল। হটাৎ আনায়া আর্তনাদ করে উঠল। অর্ণব এক প্রকার দৌড়ে রুমে এলো। আনায়া পেটে হাত দিয়ে আর্তনাদ করছে। অর্ণব আনায়াকে ধরে বিছানায় বসালো।
“কি হলো আর্তনাদ করলে কোনো? কোনো সমস্যা? পেটে ব্যাথা করছে?”

আনায়া উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
“এমপি সাহেব বেবি কিক মেরেছে । বেবির মুভ করছে”

অর্ণব মুহূর্তে ব্যায় না করে কান পাতলো।
“এমপি সাহেব আপনি অনুভূভ করতে পারছেন? জুনিয়ের মুভমেন্ট?”

অর্ণব কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ মায়াবতী। আমি জুনিয়রের মুভমেন্ট বুঝতে পারছি তাকে অনুভব করতে পারছি”

অর্ণব আনায়াকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ মায়াবতী আমাকে আমার জীবনের সেরা অনুভূতির সাথে পরিচয় করানোর জন্য। তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি মায়াবতী। আমার জীবনের পূর্ণতা তুমি, আমার জীবনের ভালোবাসা”

আনায়াও অর্ণবকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। ওর চোখে আনন্দের অশ্রু। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“আমিও আপনাকে অনেক অনেক ভালোবাসি এমপি সাহেব”

সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। দেখতে দেখতে কেটে গেছে অনেক গুলো দিন। আনায়ার মাঝে আগের থেকেও পরিবর্তন এসেছে। আগের চেয়েও শরীরে বেশি ভারী হয়ে গেছে। উঠতে বসতে কষ্ট হয়। নড়াচড়া করতে কষ্ট হয়। অর্ণব এখন বেশির ভাগ সময় আনায়ার কাছেই থাকার চেষ্টা করে। গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়া বাহিরে যায়না বললেই চলে। অর্ণব কোথাও গেলে সে সময় অহনা বা মেহনাজ বেগম কেউ একজন আনায়ার সাথে থাকে। আনায়াকে এক মুহূর্তের জন্যও কেউ একা ছাড়ে না।

গভীর রাত্র। সবাই ঘুমে বিভোর। আনায়া কোনো রকমে অনেক কষ্টের পর ঘুমিয়েছে। ইদানিং ঠিক মতো ঘুমাতেও পারে না। আনায়ার জন্য অর্ণবও জেগে থাকে। আনায়া ঘুমানোর পর ও ঘুমায়। আনায়ার যদি কোনো কিছু প্রয়োজন হয় তাই ও নিজেও আনায়ার সাথে জেগে থাকে। ঘুমের মাঝে আনায়া পেটে ব্যাথা অনুভব করলো। ঘুম ভেঙ্গে গেল আনায়ার। কমে যাবে ভেবে আনায়া অর্ণবকে ডাক দিলো না। ধীরে ধীরে কমার বদলে ব্যাথা বাড়ছে। এ ব্যথা সহণশীল নয়। অসহনীয় ব্যাথা। আনায়া ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল।

#চলবে?