প্রেয়সী পর্ব-০২

0
318

#প্রেয়সী❤️🥀
#muhtarizah_moumita
#পর্বঃ০২

৩.
পেছন ফিরে তাকাতেই চোখ ধাঁধিয়ে এলো মানুষ টা কে দেখে। ব্লু হোয়াইট সংমিশ্রণের ডোরাকাটা টি-শার্ট টা যেন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে মানুষ টার সাথে। ডান হাতে ব্রান্ডেড ব্রেসলেট আর বাম হাতে পরম যত্নে ঝুলে আছে কালো ঘড়িটা। মুখের আদোল টা কোনো হিরোদের থেকে কম নয়। ফর্সা লম্বাটে মুখের আদোল,নাক টা বেশ উঁচু। মুখের চারপাশে জুড়ে চাপ দাঁড়ির খাঁজ খুব ভালো ভাবেই স্পষ্ট হয়ে আছে। আর চোখ জোড়ার প্রশংসা না করে তো পারছিই না আমি। চোখের কালার টা ব্রাউন সেই সাথে একই কালারের মাথার ঐ সিল্ক চুলগুলোও।

—-” নিউ স্টুডেন্ট হয়েও এতো অহংকার?”

আমার ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে মানুষ টার বলে ওঠা তার দ্বিতীয় বাক্যটি শ্রবণগোচর হতেই দৃঢ় চোখে তাকালাম আমি। স্বাভাবিক সুরেই তাকে জবাব দেওয়ার উদ্দেশ্য মুখ খুলবো ঠিক তখনই পেছন থেকে ঝাঁঝালো কণ্ঠ নিয়ে এগিয়ে এলো একটি ছেলে। চোখে মুখে চরম রা/গ ফুটিয়ে তুলে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

—-” সি ইজ টু মাচ ষ্টুপিড দোস্ত। সিনিয়রদের কোনো রেসপেক্ট করতেই সে জানেনা! এই মেয়েকে তো তার উপযুক্ত শা/স্তি পেতেই হবে!”

ছেলেটার কথা শুনে আমার পায়ের র/ক্ত ছিটকে মাথায় চড়ে গেলো। এই ছেলের কত বড় সাহস দেখো, সে আমায় ইনিয়েবিনিয়ে নয় একদম ডিরেক্ট অপমান করছে! বেটারে তো কাঁচা গিলে খাবো আমি!

আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ টা রুক্ষ স্বরে বলল,

—-” নাম কি?”

আমি অবাক হওয়ার চেষ্টা করে ঘাড় টা হালকা বাঁকিয়ে রাইয়ের দিকে তাকাতে নিলেই সে পূনরায় বাক্য আওড়ালো,

—-” তোমাকেই জিজ্ঞেস করেছি। কি নাম তোমার?”

আমি কিঞ্চিৎ তব্দা খেয়ে উত্তর দিলাম,

—-” নিধি।”

—-” ভার্সিটিতে এডমিশন নেওয়ার আগে সিনিয়রদের ব্যাপারে ডিটেইলস নাওনি?”

শুনেছি মানুষ ভার্সিটি তে আসে তার হাজারটা স্বপ্ন পূরনের ইচ্ছে নিয়ে। তার ভার্সিটি লাইফের স্টাডি দিয়েই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় গুলো ঘুড়ে যায়। তার ফেলে আসা বাকি জীবনে যে ডিসিশন গুলো নিতে সে যখন পুরোটাই অক্ষম তখন ভার্সিটি লাইফে সেটা আপনাআপনিই তার লক্ষ্যে স্থির হয়ে যায়। জীবনের আসল সাফল্যের চাবিকাঠিই তৈরি হয় এই স্টেজ থেকে। কিন্তু এই ছেলের কথা শুনে তো আমার পুরো জীবনই মিথ্যে বলে মনে হচ্ছে। এই মুহুর্তে দাঁড়িয়ে বেটার কথায় কেবল এটাই ঠাহর করতে পারলাম যে,ভার্সিটিতে আসার আগে তার অগোছালো স্বপ্ন গুলোকে ব্যাগ ভরে নিয়ে আসা নয় বরং সিনিয়রদের সো কল্ড র‍্যাগিং সম্পর্কে পিএসচডি করে একদম ঠোঁটের আগায় মুখস্থ করে নিয়ে আসতে হবে।

—-” দেখ দেখ, কিভাবে তাকাচ্ছে দেখ একবার!”

ছেলেটির পাশ থেকেই আরেকটা ছেলে হাজারও আ/ক্রোশ নিয়ে বলে উঠলো কথাটা। এদের বিহেভিয়ারে আমি অবাক না হয়ে পারছিনা। তবে সিনিয়র বলে কথা। তাই নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে বললাম,

—-” বাবা সেরকম কিছু বলেনি!”

কথাটা শুনতেই সবাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে। বুঝলাম আমার বলাটা কথাটা এই সিনিয়র নামের বাঁশ দেওয়া লোকগুলোর মাথায় কিছুই ঢুকলো না।

—-” মানে?”

না বুঝেই তুমুল গতিতে প্রশ্ন ছুড়লো ছেলেটি। আমি মনে মনে খানিক হাসলমা। মুখে স্বাভাবিক ভঙ্গিমা টেনে বললাম,

—-” জ্বী, এখানে এডমিশন হওয়ার আগে এমন টাইপ কোনে কথাই বাবাকে বলতে শুনিনি। ইভেন বাবা তো আমায় এটাও বলেনি, ভার্সিটি এসে কারোর কথায় ওঠবস করতে।”

ছেলেটি ফুঁসে উঠলো। দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলে দুটির দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

—-” র‍্যাগিং করার জন্য এসব ইডিয়ট কোথা থেকে ধরে আনিস বলতো।”

ডান পাশের ছেলেটা কাচুমাচু করে বলল,

—-” রাফিদ… দোস্ত….”

—-” জাস্ট শাট আপ!” (রে/গে গিয়ে)

তাকে ধমকেই হনহন করে জায়গা ছেড়ে প্রস্থান করলো ছেলটি। আর তার সাথে তার দলবলও। তাদের এভাবে চলে যেতে দেখে রাই বড় বড় করে দম ফেলতে লাগলো। আমাকে সেই প্রথম থেকেই এতোটা রিলাক্স মুডে থাকতে দেখে ওর ঠিক হজম হলো না মনে হলো। তাই দম আঁটকে রেখে আমার হাত ধরে চারশ চল্লিশ ভো/ল্টে/জের ঝাঁকুনি মে/রে বলল,

—-” তুই উনাদের সাথে এভাবে কথা বলে আমাদেরই বি/পদ বাড়ালি নিধি। তোর কোনো ধারণা নেই এরা কতদূর যেতে পারে। আজ তুই উনাদের সাথে যেমন বিহেভ করলি না জানি এর রি/ভে/ঞ্জ নিতে উনারা ঠিক কি কি করবেন আমাদের সাথে।”

রাই-এর কথা আমার ঠিক মগজ ছুঁতে পারলো না। আমি তাদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ছেড়ে রাই-এর দিকে ঘুরে তাকালাম। মেয়েটা অল্পপেই ভীষণ ভীতু। ওকে এসব ব্যাপারে আর টেনশনে না রেখে ব্যাপার টা ক্লোজ করাই হয়তো ভালো হবে। তাই ওর দু’গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বললাম,

—-” চিল বেবি। এসব নিয়ে এতো ভাবারও কিছু হয়নি। সিনিয়ররা যদি আমাদের কথায় মাইন্ড করে থাকেন তবে আমরা নিশ্চয়ই তাদের সরি বলবো। কেমন?”

আমার কথাটা রাই-এর বেশ মনে ধরলো বলে মনে হচ্ছে। রাই আমার হাত দুটো ধরে বলল,

—-” সত্যিই?”

আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। ওর হাত ধরে বের যাওয়ার উদ্দেশ্যে বললাম,

—-” ১২ টা বেজে গেছে। আমাদের তো যেতে হবে। হৃদ মনে হয় এতোক্ষনে চলেও এসেছে।”

রাই মুখে হাসির রেখা টেনে বলল,

—-” হ্যাঁ চল।”
.
.
.🌺.

৪.
তার নাম অর্নব আহমাদ হৃদ। সবাই তাকে অর্নব নামে ডাকলেও আমি তাকে হৃদ বলেই ডাকি। একটু আনকমন লাগবে বলে। ভালোবাসার মাঝে সবকিছু কমন হলে মনে হয় একটা সময় গিয়ে বোরিংনেস চলে আসে। তাই তাকে আমি অলওয়েজ আনকমনের মাঝে একটু একটু করে ভালোবাসতে থাকি। আজ আমাদের ওয়ান-ইয়ার রিলেশনশিপ এনিভার্সারি। তার জন্যই আমরা আজ মিট করবো। শেষ বছর ঠিক এই দিনটাতেই সে আমায় প্রপোজ করেছিলো। শুধু এই দিনটাই কেন বলছি? বলা বাহুল্য তার আগেও সে আমায় অসংখ্য বার প্রপোজ করেছিলো কিন্তু আমি রাজি হয়নি। সত্যি বলতে রিলেশনশিপে যাওয়ার তেমন কোনো ইচ্ছে আমার কোনো কালেই ছিলো না। হৃদের মতোই এমন অনেক মানুষের থেকে প্রপোজাল পাওয়ার সেই দূর্ভাগ্য আমার অনেকবারই হয়েছে। তবে সেরকম বলতে ব্যাপার গুলো আমার কাছে চরম হাস্যকর ঠেকতো। পাবলিক প্লেসে বা বিশাল বড় রেস্টুরেন্টে চারপাশে সফ্ট মিউজিকের মাঝে দাঁড়িয়ে ছেলে একহাতে গিটার আর অন্য হাতে রিং নিয়ে প্রপোজ করা আমার কাছে বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই মনে হয়না। তাই এমন এক্সপেরিয়েন্স অনেক হলেও কখনো কেউ মন জয় করতে পারেনি। তাই সবার মতো চোখ বুজে অর্নব কেও নাকচ করেছিলাম। কিন্তু সে তো সেই, আমার একশো একবার না পরার পরও সে হাল ছাড়েনি। রাজি তো আমায় সে করিয়েই ছেড়েছে। সেই দিন গুলো পেরিয়ে আজ ১ টা বছর হয়ে গিয়েছে। ভাবতেই এক অদ্ভুত শিহরণ জাগে মনে।

—-” নিধু।”

ইবনাত গার্ডেনের চারপাশের সাজানো গোছানো দৃশ্যগুলো আমার কাছে বরাবরই নন্দনকাননের থেকে কিছু কম মনে হয়না। আমরা প্রতিবার এই জায়গাতেই মিট করি। চারপাশে একবার চোখ বুলালেই যেন জুড়িয়ে যায় অন্তর আত্না অব্দি। চারপাশের ফ্রেশ এয়ারের মাঝে নিজেকে ডুবিয়েই বসে ছিলাম। এরই মাঝে কানে এলো প্রিয় মানুষটির ভালোবেসে ডাকা নামটি।

পাশ ফিরে তার অস্তিত্ব আবিষ্কার করতেই দেখা মিললো তার ঠোঁটের ভাজে তৃপ্তিময় হাসি। বুঝলাম আমিও একই ভাবে তৃপ্তিময় হাসি হাসছি। হাত বাড়িয়ে তাকে পাশে বসতে ইশারা করে বললাম,

—-” লেট কেন করলে?”

হৃদ ঘড়িতে টাইম দেখে বলল,

—-” ক্লাস ছিলো ম্যাথের। মিস করার ওয়ে ছিলো না তাই একটু লেট করে ফেলেছি জান। সরি।”

আমি মৃদু হাসলাম। তার হাতটা ধরে নিজের কোলের উপর রেখে বললাম,

—-” ইট’স ওকে। বেশি লেট করো নি। মাত্র টেন মিনিট’স।”

হৃদ চমকে গেলো মনে হলো। আমার হাত ছেড়ে চটজলদি দাঁড়িয়ে পড়লো। আমি অবাক চোখে তাকাতেই সে তার কান ধরে ওঠবস শুরু করলো। এক,দুই গুনতে গুনতে বলল,

—-” নেক্সট টাইম আর কখনো এমন হবেনা জান। সরি। তিন,চার,পাঁচ…”

হৃদের কান্ড দেখে মাঝে মাঝে অবাক না হয়ে পারিনা। যেকোনো ব্যাপারেই যে সে খুব ছেলেমানুষ। আর তার এই ছেলেমানুষীতেই মানুষ টার প্রতি ভালোবাসা আরও কয়েকগুন বেড়ে যায়। আমি খিলখিল করে হেসে উঠলাম। তাকে কান ধরে ওঠবস করতে দেখে আমার কিন্তু মন্দ লাগছেনা। আমার হাসি দেখে সেও মুচকি হাসলো। দশ অব্দি কাউন্ট করে পূনরায় আমার পাশে বসলো। আমার হাত নিজের হাতে নিয়ে ঘনঘন নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,

—-” তোমার এই হাসিটাই যে আমার প্রান কাড়িয়া নেয় প্রিয়। সারাজীবন তোমার মুখে ঠিক এই হাসিটাই যেন থাকে প্লিজ।”

আমি হাসলাম আবারও। এই মুহুর্তে মানুষ টার কথার জবাব দেওয়ার থেকে তার বুকে মাথা রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়া বেশি শান্তির মনে হলো।

#চলবে______________

[ ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।]