মিলি পর্ব-০৩

0
73

#মিলি (৩)

সেদিন সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। মিলি এর ভেতর বাচ্চাদের স্কুল দিয়ে এলো। কাপড় মেলা শেষে মিলি রান্না করতে ঢোকে। অনিন্দ্য আজকাল খানিক বেছে খায়। মাছের ঝোল খাবে না। ওতে ফ্যাট জমে। মাংস খেলে চর্বি আলাদা করো। তাতে আবার ঝোল টানিয়ে মাখামাখা করে নামাও। সপ্তাহের সাত দিন তের রকমের মেনু করতে গিয়ে মিলি প্রায়শই হাঁপিয়ে ওঠে। তবু, অনিন্দ্যর স্বাস্থ্যের জন্য, আপন মানুষের হাসি ভরা মুখের জন্য এটুকু কষ্ট স্বীকার করাই যায়। মিলি ও হাসি এঁকে কাজ সারে। আজকে টুনু মাছ ভাজা খেতে চেয়েছে। মিলি রুই মাছের বড় পেটির সাথে গাদার টুকরো মেশায়। কিছুটা লবন, হলুদ আর লেবুর রস মাখাতে হবে। তারপর রেখে দেবে পনর মিনিট। এরপর, এদের ধুয়ে পানি ঝরিয়ে আবার সামান্য হলুদ,মরিচ লবন মেখে গরম তেলে ছেড়ে চুলোর আঁচ পরিমান মত কমিয়ে রাখতে হবে নির্দিষ্ট সময় ধরে। আস্তে আস্তে মাছের এক পিঠ ভাজা মচমচে হলে উল্টে দিতে হবে আরেক পিঠ। অন্য পাশ ভাজা হলে চুলো বাড়িয়ে আবার গরম তেলে দু’পাশ নেড়ে নামানো। এই মাছে পানি লাগানো যাবে না। রাখতে হবে চুলোর পাশে গরম জায়গায়। খাবার আগে পাতে তুলে দিলে সেই মাছের স্বাদ হবে চমৎকার। মিলি মাছ মাখাতে মাখাতে এসব ভাবছিলো। রাঁধতে রাঁধতে এখন ব্যঞ্জনের চেহারা দেখে বলে দেয়া যায় এতে কতটা কি পরেছে৷ মিলি মনের ভুলে চুল উপরে তুলে টের পায় মাছের হাত দিয়ে মাথা ধরেছে। হাত ধুয়ে আবার চুল বেঁধে নেয় মিলি।

ম্যাসেঞ্জারে টুংটাং শব্দ ভেসে এলে মিলি দেখে বন্ধু রুমা রাগের ইমো পাঠিয়েছে৷ গতকাল রুমার সাথে স্টার সিনেপ্লেক্সে ‘জওয়ান’ দেখতে যাবার কথা ছিল। মিলি কথা দিয়ে কথা রাখতে পারেনি। টুনুর গা গরম হয়ে উঠল হঠাৎ। শেষ মুহূর্তে এসে প্ল্যান ক্যান্সেল। মিলি খুব করে সরি বলেও রেহাই পায়নি। আজ রুমার ম্যাসেজ দেখে হাসল। ‘রাগ করে থাকতেও মান ভাঙতে সময় লাগেনা৷ এরই নাম বন্ধুত্ব’।

‘অফিসের পরিবেশটা অসহ্য লাগছে রে’।

মিলি রুমার কথা মন দিয়ে শোনে। রুমার স্বামী ব্যবসায়ী। পিংক সিটিতে বিশাল এক জুয়েলারী শপ। চায়না থেকে কমদামে জুয়েলারি এনে নামী দামী ইনফ্লুয়েন্সর দিয়ে লাইভ করিয়ে দাম ঠিক করে। মিলি একবার হিসেব কষে দেখেছে। ওদের দোকান থেকে কেনা একটা দুলের দামের সমান একশটা ইমপোর্ট করা দুল। ব্যবসা ভালো বোঝে আশরাফ। ওরা ব্যাচমেট। রুমার বিয়েটা প্রেমের হলেও সংসারটা অ্যারেঞ্জ।

‘অসহ্য লাগলে ছেড়ে দে।‘
‘তুই জানিস না আমি কেন চাকরী করি?’
মিলি কথা বলে না। রুমার প্রশ্নের উত্তর নিয়ে তারা অসংখ্যবার আলোচনা করেছে। সব সমাধান এসে ঠেকে আশরাফের ঔদাসিন্য ও খামখেয়ালী আচরণে। রুমা প্রতিবার কাঁদবে। বিয়ে কেন করলো বলে আক্ষেপ করবে।

‘জানি, ওটা না করলে তুই ঘরবন্দী হয়ে যাবি।‘
‘তুই হোসনি? এই যে তুই সকাল সন্ধ্যা দম আটকে কাজ করিস কেমন লাগে? খুব ভালো?’
‘প্রথম প্রথম লাগত। এখন কেমন গা সয়ে গেছে।‘
‘তোর সুপারভাইজারের খবর কি?’
‘যাইনি। মিথ্যে বললাম। যেতে পারিনি। ‘
‘বাহ! চমৎকার। তা কেন যেত পারিসনি শুনি।‘
‘ঐ তো। অনি ছুটি নেয়নি৷ বাচ্চাদের রাখার জায়গা নেই।ব্লা ব্লা ব্লা।‘
‘তাহলে কাদের জন্য খাটলি?’
‘জানি না। আমার হিসেবী হতে ইচ্ছে করে। পারি না। পারলে অনেক কিছু পেয়ে যেতাম। পেলাম না। ‘
‘না পাওয়ার দুঃখ নিয়ে মরে যাবি?’
‘না। মরার আগে একবার আবার চেষ্টা করব।‘
‘তোর মুখেই সব। টাইম আসলে দেখি তো। ঐ পোলাপান আর স্বামী সংসার নিয়ে ডুবে মরিস।‘
‘তোর জন্য একটা জুতা অর্ডার করব।‘
‘থাক। নতুন জুতার বাড়ি খেতে চাই না। এই শোন, নিউ কলিগ তো চায়ের দাওয়াত দিচ্ছে। ‘
‘নিয়ে নে। পারলে আমাকেও নিয়ে যা। তোদের সাথে চা খেয়ে আসি।‘
‘উম, কাবাব মে হাড্ডি হবা দোস্ত’!
‘কে কাবাব? তুই না ঐ লোক।‘
‘তুমি। তুমি আসলে কি আর আমাকে দেখবে?’
‘তোকে দেখতেই ডাকলো। দেখবে না কেন?’
‘তুই আসবি বাসা থেকে পরিপাটি হয়ে। আমি সারাদিন কামলা দিয়ে ভুত হয়ে আছি।‘
‘আমিও যাস্ট লাইক কামের বেটি লুকে আছি। ‘
‘হাহাহা, আসবি? তাহলে গাড়ি ঘুরিয়ে তোর বাসা থেকে তোকে পিকাপ করে নেব।‘
‘অনিন্দ্যকে বলি।‘
‘আবার ভাইয়াকে বলতে হবে কেন শালা।‘
‘বাচ্চারা…’
‘বাচ্চা সহ চল। ভাইয়াকেও যেখানে বসব ওটার লোকেশন দিয়ে দিস।‘

রুমার সাথে ফোন রেখে গোসল করলো মিলি। বাচ্চাদের নিয়ে এসেছে। এই ছন্দপতন প্লানটা ভালো লাগছে। বাহিরের আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামছে আবার। মিলি রান্নাঘরের জানালা খুলে দেয়। ঠান্ডা বাতাস এসে জুড়িয়ে দেয় মিলির শরীর ও মন। তার ইচ্ছে করছে এখনি শাড়ি বদলে রাস্তায় নেমে পরতে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মহাদেব সাহার একটা ভয়ংকর ভালোবাসা মাখা কবিতা পড়বে মিলি।

‘বর্ষা, ও আমার বালক বেলার সই
মনে রাখিস, আমি তোর একটা কিছু হই।
একটা কিছু, একটা কিছু একটা কিছু কি?
সেই যে বৃষ্টি ভেজা আধার বনে, খুইয়ে এসেছি। ‘ (মহাদেব সাহা)

ভেজা হলো না মিলির। তনু এসে ওর শরীর ধরে বসে রইল। টিভিতে ছোট্ট মেয়েরা শাড়ি পরে নাচছে। তাই, ওকে একটা শাড়ি কিনে দিতে হবে। টুনু বাইরে যেতে রাজী হলো না। সে গায়ে চাদর টেনে ঘুম যাবে। মিলি চট করে তৈরী হয়ে নেয়। সাদা নীল পাড় সুতি শাড়ি, কপালে নীল টিপ। স্ট্রাইপ্ড কন্ট্রাস্ট ব্লাউজের সাথে দু’একটা কাঁচ চুড়ি। ওর ছোট বোন এসেছে বাচ্চাদের নিয়ে। তনু-টুনু যেতে চাইলো না আর৷ মিলিও খুশী মনে বের হয়ে পরলো। অনিন্দ্যকে একটা মেসেজ দিয়ে রাখল,

‘রুমার সাথে চা খেতে যাচ্ছি। তুমি আসবে?’
ফিরতি ম্যাসেজ এলো সাথে সাথে, ‘ বাচ্চারা কোথায় থাকবে।‘

মিলি একটু খানি হাসল। তার মন খারাপ হয়েছে। অনিন্দ্য প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জানতে চাইলো,বাচ্চাদের কথা। মা হিসেবে ওর দায়িত্ব আছে। অনিন্দ্যর এই সাধারণ প্রশ্নটাও অনেক সময় ঠিক নেয়া যায় না। অন্য সময় হলে মিলি রিপ্লাই দিত। আজ দিল না।

এখনকার রেস্তোরাঁ গুলো অন্যরকম। যেন জোর কটে এক টুকরো বন বানিয়ে বসিয়ে দেয়া শহরের বুকে। সেখানে নৌকো থাকে, জল ফোয়ারা থাকে। থাকে দোলনা ও কৃত্রিম ফুলবাগান। এই রেস্তোরাঁটা রেট্রো থিমে করা। যেন ইচ্ছে করে শহরমুখী করা হয়েছে। নস্টালজিয়ায় আগত ক্রেতা নিজ থেকে ডুবে যাবে। লেট নাইটিজের নায়ক গায়কদের কোলাজ ছবি দেয়াল জুড়ে আঁটা। টিফিন বাক্সের থেকে উঁকি দিয়ে আছে আলাদিন। চাচা চৌধুরী সাবুর কান ধরে একপাশের প্লাকার্ডে টাঙানো। তিন গোয়েন্দার একটা কর্ণার বানানো রয়েছে।

তিনটা সিট পাশাপাশি,’কিশোর-মুসা-রবিন’।
ঐ জায়গাটার নাম রাখা হয়েছে রকি বিচ।
অন্য দিকে আসাদ ও সুবর্ণার পোস্টার। দেয়াল জুড়ে লেখা টুকরো টুকরো গানকলি।

বসার জায়গাগুলো বাস সিটের মত। টেবিলগুলো প্লাস্টিক মার্বেল শিট দিয়ে ঢাকা। তার উপরে মাটির গ্লাসের ভেতর কাঁচের কাপে ভেরিগেটেড ব্রাজিলিয়ান পাথোস ও কাঁচা ফুলের স্টিক রাখা। মিলি বেশ চমৎকৃত হলো। কাঁচা ফুল প্রতিদিনই বদলে দেবার হ্যাপা। রেস্তোরাঁর মালিকের রুচির প্রশংসা করতেই হয়। একটা ছোট গ্রামোফোন দেখা গেলো। খুবই লিমিটেড ভার্সনে এগুলো বাজারে এসেছিল। ভেতরে গান স্টোর করে শোনা যায়। মিলি বসলো জানালার পাশ ঘেঁষে। এখান থেকে নিচটা দেখা যায়। সারিসারি জনস্রোত দেখতে ভালো লাগে। সবার ভেতর একটা অবিরত অস্থিরতা রয়েছে। মিলি লম্বা শ্বাস নেয়। এই হুট করে বেড়িয়ে আসায় মন ভালো লাগছে।

‘আপনার ওয়েলকাম ড্রিংক্স।‘
‘ধন্যবাদ। কিসের তৈরি? ‘
‘তেতুলের শরবত।‘

মিলি হাতের ফোনে দেখে নেয় রুমা কতদূর। এদিকে বসায় বিকেলের কোমল রোদ ওর মুখ ছুঁয়ে নেমে যায় বুক বরাবর। মিলি আঁচল টানে শুধুশুধু। বেয়ারা এখনো অপেক্ষমাণ।

মিলি চোখ না তুলেই বললো,
‘ একটু পর অর্ডার করি? আমার একজন বন্ধু আসবে।‘
‘ওকে ম্যাম। আপনার অপেক্ষায় আমরা কি একটু অংশীদার হতে পারি?’

মিলি এবার তাকাল। লোকটার পরনে বেয়ারার এপ্রোণ। তবু, একহারা গড়নের মাথা ভর্তি এক রাশ ঘণ চুলের সাথে চশমার পেছনে বুদ্ধিদীপ্ত একজোড়া চোখের মালিককে তার ঠিক বেয়ারা বলে মন সায় দিল না।

‘ঠিক বুঝতে পারছি না।‘
‘এখানে একটি ছোট হেডফোন আছে। আপনি পছন্দসই গান শুনতে পারেন।‘
‘ওহ! ঠিকাছে। উম, আপনাদের এখানে কফি হবে?’
‘এ্যামেরিকানো অর কাপপুচিনঅ’।

উচ্চারণ ভঙিমায় আরেকবার মুগ্ধ হলো মিলি। ‘ক্যাপুচিনো’ গড় পড়তা বাঙালী হয়েই বলেছে মিলি। বেয়ারা হেসে চলে গেলো। রুমা লিখেছে, ‘কানের নিচে কানাই নিয়ে আসছি। বিলের চিন্তা বাদ দিয়ে হেভী খাওয়া দেব। তুই একদম ভদ্র সাজবি না।‘

মিলি বসে ভাবতে লাগলো, রুমা কাকে নিয়ে আসছে।

চলবে।