মিলি পর্ব-০৪

0
83

#মিলি (৪)

ওরা বসলো লম্বা সময়। রুমার অফিস কলিগ লোকটি সুবিধাজনক নয়। ‘লুল’ টাইপ মানুষ। যে কোন মহিলা দেখলে সুযোগ নিতে চায়। রুমাই পরিচয় করিয়ে দিল ‘কাদের ভাই, অফিসে আমার সিনিয়র। আবার আমরা একই পাড়ায় থাকতাম’

কাদের হো হো করে হাসলো। রুমার সাথে ঘুরতে এসে আরেকজন ফ্রি মহিলার দেখ পাওয়ায় তার মন বেজায় ভালো। রুমা মেনু বুক টেনে অর্ডার করলো।

‘সিফুড প্লাটার। এরপর কিন্তু আমি কাচ্চী খাবো কাদের ভাই।‘

কাদেরের একটা কিউট পেট আছে। কথা বলার সময় নেচে ওঠে। এসব রুমা ও মিলির আবিষ্কার। কাদেরের সামনে ওরা মেসেজ চালাচালি করে নিজেদের ভেতর হেসে নেয় একচোট।

‘আরে খান। স্যালারি হইলো না আজকে। চিন্তা কি। এই আপা কি খাবে।‘
‘ও কি খাবে আমি জানি?’
‘আপা মনে হয় রাগ করেছে। আমার সাথে কথাই বলেন না।‘

মিলি ভদ্রভাবে মাথা ঝাঁকায়। কাদেরকে দেখে হাসি আসছে। যাকে দেখে হাসি আসে তার ওপর রাগ করা যায় না। লোকটার ভুড়ির ওপরের তিন নং বোতমটা প্রায় খুলে যাবে যাবে এমন। কাদের সেন্সে থাকলে পেট চেপে বসে। আবার মহিলা দেখতে দেখতে পেটা ফুলিয়ে দেয়।

‘আমি দেখছি। আপনি ব্যস্ত হবেন না।‘
‘সেবা করার সুযোগ দেন, আপা। রুমা বললো, আপনি নাকি উচ্চারণ শেখান। আমার একটা ক্লাস নেন না। আমার যে আঞ্চলিক টান, আপা।‘

‘জি’। মিলি বেজার মুখে বসে থাকে। রুমা খাবার খেতে খেতে মিলির পায়ে টেবিলের নিচ দিয়ে খোঁচা মারে।

‘পরোটা মাংস খা। এদের ঝুরি মাংসের টেস্ট অসাম।‘
‘খাব না। কফি খেয়ে পেট ভরে গেছে।‘
‘এখান থেকে কই যাবি।‘
‘বাসায়। আম, আড়ং এ যাওয়া যায়।‘

রুমা পাশ থেকে মাথা নেড়ে ক্রমাগত না বলে চলেছে। মিলি মুখ ফসকে বলে ফেলে বুঝলো, বিপদে পরেছে।

‘আমার আড়ং অনেক পয়েন্ট জমা। রুমা, চলেন। আপনারে সিনএনজিতে তুলে দেই।‘
‘দিয়ে? আপনি ঐ আপাকে নিয়ে আড়ং যাবেন?’
‘না মানে আপা হয়ত কিনাকাটা করে দেরী হয়ে গেলে। মানে রাত হলে মহিলা মানুষ। বাসায় থাকে, রাস্তাঘাট ভালো না।‘
‘ঢাকা শহরে বড় হয়েছি। হারাব না ভাই। বাসায় থাকার সাথে রাস্তা চেনার সম্পর্ক নেই।‘

মিলির সামনে ততক্ষণে একটা গরম কাবাব প্লাটার চলে এসেছে। মিলি অবাক হলো। সে কিছুই অর্ডার করেনি। এটা ভুল করে অন্য কারো অর্ডার দিয়ে গেছে। রেস্তোরাঁ ভরে উঠেছে এখন। লোকে জমজমাট। সবাই নিজেদের কথা ও ছবি তোলায় মশগুল। রুমা ফোন উঁচিয়ে সেলফি নিলো। উপর থেকে ছবি তুললে চিকন লাগে। কাদের সব ছবিতে মাথা গলিয়ে দিয়েছে। রুমা সাইড কেটে গলায় আঙুল চালিয়ে দেখাল, ‘ ব্যাটাকে ক্রপ করে আপ্লোড দেবে।‘

ওরা কোথায় অনি জানতে চাইলে গুগল লোকেশন পাঠিয়ে দেয় মিলি। কাদের নিজের প্লেট থেকে রুমাকে সি ফুড খেতে অনুরোধ করছে। রুমা বিরস বদনে কাদেরের প্লেট নিজের প্লেটের ওপর উপুড় করে ঢেলে দিল। কাদের এতটা রগড় আশা করেনি। সে রুমার প্লেটে দু’আঙুল বাড়িয়ে একটা স্কুইড ভাজা খেতে চাইলে বেশ জোরে একটা বাড়ি খেলো নিজের হাতে। মিলি ওদের ইগনোর করলো পুরোপুরি। রুমার এই মাখামাখি অভ্যেস ও নিতে পারে না। তবু বন্ধুকে সে প্রচন্ড ভালোবাসে। কাদের একটু উপযাচক হলো। মিলির অমনোযোগী মনোভাব টের পেয়ে হয়ত।

‘আপনি কাবাব খাবেন জানলে আমিও ওটা অর্ডার দিতাম।‘
‘এটা আমার অর্ডার নয়। ‘
‘দুঃখিত। আমাদের উচিত ছিল আপনাকে বিষয়টি জানানো। ‘

সেই বেয়ারা ফিরে এসেছে। মিলির থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে এবারো চমৎকার ভাবে কথা বলছে। এবারে তার পরনে এপ্রোন নেই। হালকা আকাশী স্ট্রাইপ্ড শার্টের সাথে ডেনিম প্যান্ট, পায়ে কোলাপুরি। এবারে দেখতে বেশ কেতাদুরস্ত লাগছে, মোটেও বেয়ারা মনে হয় না। মিলি চশমা ঠিক করে নেয়। লোকটা কে? এভাবে ভোল পাল্টে আসার মানে কি।

‘আপনার মনে অনেক প্রশ্ন। আসাটাও স্বাভাবিক। সব কিছু ক্লিয়ার করতে এখানে বসার অনুমতি চাইছি। যদি আপনারা কিছু মনে না করেন।‘

একটানা কথা বলে ভদ্রলোক একটু হাঁপিয়ে গেল। মিলি তাকে জল খেতে বলে বসতে দেখালো। মিলির পাশে ভদ্রলোক বসলেন না। হাত উঁচিয়ে অন্য একজন বেয়ারকে ইশারা করলেন।

একটা নরম গদিওয়ালা কালো কেদারা এনে টেবিলের পাশে রাখা হলে, ভদ্রলোক খুব নরম স্বরে বললেন,
‘দেখো, যেমন করে রাখলে এতে অন্যদের চলাচলে অসুবিধে হবে। তুমি কি আরেকটু সরিয়ে রাখবে? আমার পিঠে ব্যাথা তাই আমি ভারী কিছু ধরি না। চেয়ারটা ঠিক করে দিতে বলায়, আশাকরি তুমি রাগ করোনি।‘

আগত বেয়ারা অপ্রস্তুত হয়ে হাসিমুখে কাজটা করলো। অন্য যে কেউ বেয়ারাকে হুকুম দিয়ে চেয়ার সরাতে বলতো। অথচ, এই মানুষটি তার শব্দদের সুন্দরতম ভঙ্গিমায় গুছিয়ে প্রকাশ করেছে।

মিলির মুগ্ধ হবার আরো কিছু বাকি ছিল। ভদ্রলোক নিজের পরিচ দিলেন। দেশের বাইরে থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে ওখানে চাকরি করতেন। এক বিদেশিনীর সাথে হৃদয়-গভীরে মন দেয়া নেয়া হলেও শারিরীক সম্পর্কে বিশ্বাসী ছিলেন না। বিদেশিনী বাড়ির পার্টিতে তার হাইস্কুল এক্সের সাথে ওয়ান নাইট স্টান্ড করে অনুতাপের সাথে স্বীকার করে নেয়ায় ভালোবাসার ওখানেই ইতি। দেশে ফিরে এই অচল রেস্তোরা বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখে খানিক ঝোঁকের বশে কেনা। এখন নিজের মন মত ঢেলে সাজিয়েছেন। পুরনো কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে বোনাস চালু করে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে কাজ শিখিয়ে চলেছেন।

‘তার মানে আপনি বিদেশ থেকে পড়ে দেশে এসে হলেন বাবুর্চি? ‘

কাদেরের আগত ভদ্রলোকের ক্যারিশমাটিক ব্যক্তিত্ব সহ্য হচ্ছে না। মিলি মাথা নামিয়ে কথা শুনলেও রুমা চটপট করে ভদ্রলোককে মনোযোগ দিয়ে চলেছে। কাদেরের সি ফুডের প্লেট সাবাড় করে কাবাবে হাত বাড়াতেই ভদ্রলোক আবার বললো,

‘ওটা মিস মিলির জন্যে। আমি যতটুকু জানি, আপনি কাবাব পছন্দ করেন।‘
‘আপনি আমার কথার উত্তর দিলেন না, ভাই।‘
‘আপনি উত্তর দেয়ার মত কোন প্রশ্ন করেননি, ভাই। আমি একজন ফ্রিল্যান্সার। জায়গায় বসে শুধু মাথাী কাজ করে মিনিটে লাখ টাকা রোজগার করে থাকি। রেস্তোরাঁ আমার শখের জায়গা। নিঃশ্বাস নেবার স্থান।‘
‘হুম, সবার একটা আপন মানুষ লাগে। আপনি মানুষ না নিয়ে জায়গা বেছে নিলেন?’
‘মানুষের বদলে মানুষ লাগে। মানছি আপনি সঠিক। তবে, মনের মত মানুষ না পেলে তার পরিপূরক খুঁজে নিতে হয়। আমার জন্য রেস্তোরাঁটা তেমন ‘
‘আমি রুমা।‘ রুমা হাত বাড়িয়ে দিলে ভদ্রলোক মৃদু হেসে নিজের নাম বললো।
‘সায়েম সরকার। বিদেশে থাকলেও মনে প্রাণে আমি এদেশী। হাতে হাত মেলাতে ওনার সাথে বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। আপনি আবার ফেমিনিস্ট হলে আমার বিপদ হয়ে যাবে।‘

মিলি হেসে ফেললো। ভদ্রলোকের রসবোধ প্রবল। তবে ‘কাবাব প্লাটার’র ঘটনা পরিষ্কার হলো না। সায়েমকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে তার বাঁধছে। সায়েম নিজেই মিলিকে জানালো।

‘আপনাকে আমি প্রথম শুনি দেশের বাইরের একটি ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে। ‘পয়লা আষাঢ়’ উপলক্ষে আপনারা সহ ওদেশীয় কয়েকজন আবৃত্তিশিল্পী একত্রে কবিতা পড়ার আয়োজনে। আমার খুব প্রিয় কবিতা পড়ছিলেন। ‘
মিলির চট করে মনে পরেছে। খুব জমজমাট একটা প্রোগ্রাম করেছিলো ওরা। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে জনা পঞ্চাশেক মানুষ। সবাই মনের আনন্দে কবিতা পড়ছে, গান গাইছে। ভীষণ ভীষণ আনন্দের সময় কেটেছিল সেদিন। অনিন্দ্য বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে যাওয়ায় মিলিও মানসিকভাবে চাপমুক্ত ছিলো।

‘আপনি দেখেছেন?’
‘জি, দেখেছি বলেই আপনাকে চিনতে পারলাম। তখন থেকে ইন্সটাগ্রামে আপনাকে ফলো দিয়প রাখা। ইউটিউব চ্যানেলে একদিন লাইভ হলেন। আমি তখন ল্যাবে, সহকর্মীকে বলে শুধু আপনাকে শুনতে ল্যাব ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।‘
‘ওখানে প্রিয় খাবার বলেছিলাম। ‘
‘আমি মনে রেখেছি। তবে, আজকের প্লাটারটা খানিক কাকতালীয়। আমার রেস্তরাঁয় একটি অদ্ভুত নিয়ম রয়েছে। প্রতি একশজন কাস্টমার এই প্লাটারটি ফ্রি পান। আপনি সেই একশতম কাস্টমার আজ। ‘
‘আমরা সবাই! আপনি ওকে চেনেন বলে ওকে ফেভার করবেন, দ্যাটস নট ফেয়ার।‘
‘উনি একা এসেছেন। আপনারা তার পর। আরেকদিন আসুন। ভাগ্যে থাকলে,আপনিও যে কোন একদিন হয়ে যাবেন।‘

রুমা সায়েমের কথা মানলো না। মিলির প্লাটার থেকে জোর করেই খানিকটা পার্সিয়ান কাবাব মুখে পুরে দিলো। কাদেরও তার পিছু পিছু। সায়েম কিছু বললো না। আরেকজন বেয়ারার দিকে চাইলো কেবল। মিলি এবার হাফপ্লেটে কাবাব তুলে খেতে চাইলে সায়েম প্লাটারটা রুমাদের দিকে ঠেলে দিলো।

‘আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি যার জিনিষ শুধু তাকেই দিতে পছন্দ করি। ওনারা যখন এটা খেয়েছেন, এটা ওনাদের।‘
‘আমার সমস্যা নেই। আপনি অস্থির হবেন না। ‘
‘একটু সময় চাইছি, মাত্র। এক্সকিউজ মি’।

সায়েম চলে গেলে রুমা মুখ ঘুরিয়ে বাতাসে ফু দেয়। কাদের ও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ব্যক্তিত্ববান পুরুষের উপস্থিতি তাকে ক্রমশ গর্তে ঢুকিয়ে দিয়েছে৷ এসব পুরুষ পুরুষ না। এরা দেবতা টাইপ এটিটিউড করে থাকে। কাদের এদের দুই চোখে দেখতে পারে না। তার কবি হবার সাধ জেগেছে। রুমার হাত ধরে একটা স্বরচিত কবিতা বলে কাদের।
‘তোমার হাসির মায়া
আমার মনের ছায়া
কথা হবে মায়ায় ছায়ায়
অনেক রাতের বেলায়’।
‘হাট্টিমাটিম টিম, তারা মাঠে পাড়ে ডিম’ টাইপো ছড়া বলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।‘

মিলির জন্যে এবার পার্সেল নিয়ে আসা হলো। সায়েমের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সফেদ রুমাল দিয়ে মুছে নিলো সে। কেদারায় বসে বললো,
‘ঐ একশত নং কাস্টমারের প্লাটারটা আমি বানাই। তাই আপনার জন্যে আবার উঠতে হলো।‘
‘আমরা মাঝ দিয়ে স্পেশালিষ্টের খাবার টেস্ট করে ফেলেলাম, ভাই।‘
‘তা করলেন। জোর করে যা কিছুই করা হোক তা অসুন্দর। আপনারা খেয়েছেন, আমি যথেষ্ট খুশি হয়েছি। শুধু মিস মিলিকে আগে সুযোগ দিলে আরেকটু আনন্দিত হতাম’।

মিলি সায়েমকে ধন্যবাদ জানায়। আবার বৃষ্টি হবে। জানালার কাঁচে টুপটাপ মিঠে জলকণাদের আনাগোনা বাড়ে। মিলির মন নরম হয়ে যায়। বৃষ্টি আজ তাকে টেনে এনেছে বাহিরে। এখানে, এমন একজন ভক্তের দেখা পাওয়া সৌভাগ্য। আবহাওয়ার বদলি ঝাপটা হুড়হুড় করে বয়ে আনে ঠান্ডা হাওয়া। ঝড়ো হাওয়ায় আকাশে ঘণায় আঁধার। বুকের ভেতর অকারণ মন খারাপ ঠেলে ওঠে মিলির। বাড়ি ফেরার তাড়া জমে যায় কেবল। ঘরে সন্তান ও দায়িত্বেরা অপেক্ষায়। বৃষ্টি জোরে নেমে আসলে বিপদ। অনিন্দ্য কতদূর জানতে চায় মিলি। অনিন্দ্য সাড়া দেয় না। রেস্তোরায় গান বদলে দেয়া হলো। সায়েমের সাথে টুকটাক গল্প করতে মন্দ লাগে না। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো এবারে। মিলি বারবার ঘড়ি দখে। অনিন্দ্যর জন্য দুশ্চিন্তা হয়।

‘কারো একটা আপন মানুষ থাকে, যার জন্য ভাবতে ভালো লাগে। মেঘ ঘণালে ভাবে, রৌদ্র ভাসালে ভাবে। ভালো কোন রান্না করলে ভাবে।‘
‘সংসারে ভাবতে হয়। আপনি বিয়ে করেননি?’
‘না। বিয়ে করলে খুব সংসারী হয়ে যাবো। বাড়িতে বসে বউকে সাহায্য করব। আমার কাজটাই তো বসে বসে করার।’
‘সারাদিন বর বাড়ি থাকলে অসহ্য ঠেকে।‘
‘এক কাপ চায়ের আবদার মাছ ভাজার ভেতর না করলে অসহ্য ঠেকবে না। উল্টো, যদি তীব্র গরমে দু’কাপ কোল্ড কফি নিয়ে কিচেন কাউন্টারে বসে একসাথে উপভোগ করতে করতে মাছ ভাজা যায়, সময়টা মন্দ কাটবে বলে মনে হয় না।‘
‘সব ভালো এক সাথে জোটে? ‘
‘সেই, জোটের ভাগে ওলট পালট বিধাতা জুড়ে দেন।‘

সায়েম ও মিলির কথোপকথনে কাদের কোন চান্স নিতে পারছে না। রুমাও বাচ্চার সাহায্যকারীর সাথে ভিডিও কলে কথা বলে নিতে ব্যস্ত। উসখুস করে বেয়ারাকে বিল আনতে বলে কাদের।
‘আপনাদের আজকের খাওয়া মিস মিলির সম্মানে ফ্রি। আমার পক্ষ থেকে একটা সামান্য সম্মাননা। ‘
‘ছি ছি, তা কেন। আপনি তো একবার এত সব বাড়ির জন্য দিয়ে দিলেন।‘
‘সামান্য কিছু করতে পারলাম। এমন অনেক দিন গেছে আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছি, হেমন্তে পাতা ঝরার শব্দ শুনব বলে..’
‘নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছি কোন বনভূমিতে, কোনো বন্ধুর জন্য, প্রতীক্ষা, রফিক আযাদ।‘
‘হয়তো কেউ বলে ছিলো, অপেক্ষা করো, একসঙ্গে বেরুবো। ঠিক তাই। অনেক দিনের প্রতীক্ষা আজ ফুরলো। আপনার সাথে দেখা হয়ে গেলো। এতটুকু করা যায়।‘

মিলি ঠিক কি বলবে বুঝতে পারে না। সায়েম প্রচন্ড রকমের ভদ্রলোক। মিলির পাশে একবারও বসতে চায়নি। রুমার হাত ফিরিয়ে দিয়েছে। প্রিয় গায়ক খাইরুল আনাম শাকিলের সাথে আড়ং’এ একবার দেখা হয়ে ছিল মিলির। মিলিও ঠিক এভাবে দৌড়ে গিয়ে একটা ফতুয়া কিনে দিলো ওনাকে। সায়েম পুরুষ বলেই তাকে নিয়ে অন্য কিছু ভাবা অনুচিত।
প্রতীক্ষা খুব ক্যাজুয়াল কোন শব্দ নয়। প্রিয় মানুষের জন্য প্রতীক্ষায় থাকা যায়। মিলি তাই চুপ করে মেনে নেয় সায়েমের কথা। বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দ ভাসিয়ে নিয়েছে পৃথিবীর বুক। জল উপচে পরছে রাস্তার কোনায় কোনায়। মানুষেরা ছাতা ধরে রেখেছে প্রিয়জনের ওপর। নিজেরা ভিজে যায় অবিরাম। মিলির হঠাৎ চোখে জল জমে যায়। আঁচল ঘুরিয়ে মুছে নেয় একবার। পাশ ফিরে দেখে সায়েম রুমাল এগিয়ে রেখেছে।

‘মাঝেসাঝে মনের জমানো ব্যাথাদের বেরিয়ে আসতে দেয়া দরকার। এতে হৃদয়ের মেঘ কেটে ঝলমলে রোদ ওঠে।‘
‘মেঘ নেই। বৃষ্টি এলে কেন আমাদের মন খারাপ হয় আমরা জানি না’।
‘বৃষ্টি মানে পৃথিবীর ক্রন্দন। ক্রন্দসী ধরার অনুভব মানবের মন করে তোলে নরম কাঁদামাটি।‘

মিলি রুমাল নিয়ে এবার একটু হেসে চোখ মোছে। সায়েমের কথা ফেরানো দুস্কর। রুমা হেসে বললো,
‘আমার বান্ধবীর সাথে শেষমেশ বন্ধুত্ব করেই ফেলেছেন।‘
‘আপনার সাথেও হয়ে যাবে। আমার রেস্তোরাঁ রইল।‘
‘অলটাইম ফ্রি খেতে চলে আসব।‘
‘আসতে পারেন, মিস মিলি সহ ।‘
‘কাদের ভাই, আপনাকে নিয়ে আসা যাবে না। উনি নিষেধ করে দিল। ‘

কাদের বসে প্যান্ট টেনে ঠিক করে। এমনিতেও সে রুমার সাথে এ জীবনে বের হবে না। রুমা তার সব খাবার খেয়ে নিয়েছে। আজকে বিল দেয়া থেকে বেঁচে গেলেও রুমার সাথে একটু ফ্লার্ট করা হলো না।

আঁধার ফিকে হয়ে এসে আকাশ পরিষ্কার হয়েছে। জলের ওপর ছবি ভাসছে এলোমেলো পথচারীদের। মিলি দরজায় তাকায়। কাকভেজা হয়ে অনিন্দ্য এসে থেমেছে ওখানে। মিলি চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বিদায় নেয়। সায়েমের দিকে একবারও ফিরে তাকায় না। এমনকি রুমাকেও বলে না কিছু। সফেদ রঙের রুমাল ব্যাগে পুরে ও এগোয় অনিন্দ্যর দিকে। মনের ভেতর খুব করে মহাদেব সাহার কবিতা বইছে স্রোতধীরে,
‘বর্ষা, আমার বালক বেলার সই
মনে রাখিস, আমি তোর একটা কিছু হই।
একটা কিছু, একটা কিছু, একটা কিছু কি?
সেই যে বৃষ্টি ভেজা আঁধার বনে… খুইয়ে এসেছি। ‘

চলবে।