মেয়েবেলা পর্ব-০২

0
187

#মেয়েবেলা
#২য়_পর্ব
#লেখনীতে_সুপ্রিয়া_চক্রবর্তী

মালিহা স্বামীর বাড়ি ত্যাগ করে নিজের বাবার বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়েছে। বাড়ির সামনে এসে কলিং বেল বাজানোর মিনিট দশেক পরই তার ভাবি সুলতানা এসে দরজা খুলে দিল। মালিহার মা-বাবা দুজনেই মারা গেছে। আপন বলতে তার শুধু ভাই আর ভাবি।

মালিহার ভাবি যে একটুও খুশি হয়নি তার আগমনে সেটা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মালিহা তার ভাবি সুলতানার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি দিয়ে বলে, “কেমন আছ ভাবি?”

“এই চলে যাচ্ছে কোনরকম। তোমার কি খবর? এভাবে কাউকে না জানিয়ে চলে এলে যে।”

“কেন আমার বাবার বাড়িতে আসার জন্য কি আমাকে অনুমতি নিতে হবে?”

“বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িটাই তো মেয়েদের নিজের বাড়ি। যাক গে সেসব কথা। এসেই যখন পড়েছ ভেতরে আসো। তা কতদিন থাকবে?”

মালিহা জানে তার ভাবি কেমন। তাই এখন সব কথা বলা যাবে না। আগে ভাইয়ের সাথে এসব নিয়ে কথা বলবে। তারপর ভাবা যাবে কি করবে। তাই মালিহা বলল, “এসেছি যখন দুই-তিন দিন থেকে তারপর নাহয় যাবো।”

সুলতানা আর কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। কিছুক্ষণ বাদেই একটি ছোট বাচ্চা এসে মালিহার কোল দখল করে নিল। সে আর কেউ নয় মালিহার ভাইয়ের ছেলে টুবাই। মালিহা টুবাইকে কোলে নিয়ে অনেক আদর করছিল। নিজের বাচ্চা না হওয়ায় বাচ্চার প্র‍তি গভীর টান অনুভব করে সে।

❤️
সুবর্ণা বাধ্য হয়ে নিজের বাবার বাড়িতেই আসল। সিতারা বেগম সুবর্ণাকে দেখে অনেক খুশি হলেন৷ তাকে দেখেই আহ্লাদে আটখানা হয়ে বললেন, “তুই আসবি বলে আসবি না। আমি তোর জন্য তোর পছন্দের খাবার রান্না করতাম। আয় মা আমার পাশে এসে বস।”

সুবর্ণা এসেই নিজের মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। সিতারা বেগম নিজের মেয়ের এই অবস্থা দেখে বলে, “কাঁদছিস কেন তুই? কোন ঝামেলা হয়েছে? তোর শ্বশুর বাড়িতে কেউ তোকে কিছু বলেছে তাহলে আমাকে বল। আমি গিয়ে সবাইকে সিদে করে দিয়ে আসব। আমাকে তো চেনে না।”

“আম্মু মোর্শেদ আমাকে ঠকিয়েছে। অন্য একটা মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে সেই মেয়েটাকে বিয়ে করতে চাইছে। আমি যে নিরুপায় আম্মু। এখন কি হবে আমার?”

সিতারা বেগম তাজ্জব বনে গেলেন। নিজের মেয়েকে শান্তনা দিয়ে বললেন, “তুই কোন চিন্তা করিস না। আমি তোর মা, আমি তোর পাশে আছি। দেখি কিভাবে তোর বর আরেকটা বিয়ে করে। দেশে কি আইন কানুন নেই নাকি। তুই একটু বস আমি তোর জন্য তোর পছন্দের খাবার নিয়ে আসছি।”

“তুমি কেন রান্না করবে আম্মু? ভাবি কোথায়? এই বয়সে এসে তুমি রান্না করছ সেটা কেমন কথা।”

“ঐ মেয়ের কথা বাদ দে। ওকে আমি বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। ঐ বন্ধ্যা মেয়েকে ঘরে রাখলে এই জন্মে আর নাতি-নাতনির মুখ দেখার সুযোগ পেতাম না। এত চেষ্টার পর অবশেষে সফল হলাম ওকে বের করতে। ভাবছি তোর ভাইয়ের আবার একটা বিয়ে দেবো।”

সুবর্ণা নিজের মায়ের মুখে এমন কথা শুনে হতবাক হয়ে যায়। নিজের মাকে তিরস্কারের সাথে বলে, “তোমার মেয়ে’র সাথে হওয়া অন্যায়ের জন্য তুমি আইনের কাছে যাবে বলছ, অথচ অন্য একটা মেয়ের সাথে ঠিক একই অন্যায় করছ।”

সিতারা বেগম নিজের স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, “তোদের দুজনকে এক পাল্লায় মাপার তো সুযোগ নেই। তুই তো আর ঐ মেয়ের মতো বন্ধ্যা না। মাত্র এক বছর হলো বিয়ে হওয়ার, আর কিছুদিন পর ঠিকই মা হতে পারবি। কিন্তু ঐ মেয়ে তো তিন বছরের একটা বাচ্চার জন্ম দিতে পারলো না। তোকে তো তোর স্বামী পরকী*য়া করে ছেড়ে দিতে চাইছে।”

সুবর্ণা হতাশ হয়ে বললো, “তুমি হয়তো বুঝতে পারছ না ভাবির কষ্টটা। আমি যেহেতু একই পরিস্থিতিতে আছি তাই বুঝতে পারছি। আচ্ছা আম্মু আমি যদি ভাবির মতো সন্তান জন্ম দিতে না পারতাম এবং এই কারণে আমার স্বামী আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিত, ডিভোর্স দিতে চাইত তাহলে কি তুমি সেটা মেনে নিতে?”

সিতারা বেগম যুক্তিতে হেরে গিয়ে এবার নিজের মেয়েকেই দোষারোপ করে বললেন, “একদম মুখে মুখে তর্ক করবি না। নিজের স্বামীকে বেধে রাখতে পারিস না আবার বড় বড় কথা।”

“তুমিও আমাকে দোষ দিচ্ছ আম্মু? সমাজে কি সবকিছুর দায়ভার সবসময় মেয়েদেরই নিতে হবে? তুমি যখন মা হয়ে নিজের মেয়েকেই দোষ দিচ্ছ তখন অন্যদের আর কি দোষ দেব। মেয়েরাই মেয়েদের কথা শোনাতে পারলে বেঁচে যায়। এই কারণে সমাজে যুগ যুগ ধরে অবহেলিত হয়ে আসছি আমরা নারী জাতিরা।”

সোহেল ইতিমধ্যে বাড়িতে ফিরেছে। বাড়িতে এসে সুবর্ণাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, “তুই হঠাৎ এলি যে। সবকিছু ঠিক আছে তো?”

“কিচ্ছু ঠিক নেই ভাইয়া। তুমি যেমন নিজের স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছ, তেমনি আমার বরও আমাকে বের হয়ে আসতে বাধ্য করেছে।”

সিতারা বেগম সোহেলকে সব ঘটনা খুলে বলেন৷ সব শুনে সোহেল রেগে গিয়ে বলে, “এত বড় সাহস মোর্শেদের যে আমার বোনের সাথে এমন ব্যবহার করেছে। আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব।”

কথাটা বলেই উত্তেজিত হয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে নেয় সোহেল। সুবর্ণা তখন তার হাত আটকে ধরে বলে, “দাঁড়াও ভাইয়া। তুমি কোন মুখ নিয়ে মোর্শেদের সামনে যাবে? তোমার আর ওর মাঝে কি কোন পার্থক্য আছে? নিজে অন্যায় করে তুমি আরেকজনের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে তো সে উলটো তোমাকে প্রশ্ন করবে যে, আপনি নিজে কি করেছেন সেটা আগে দেখুন। তাই আমি বলছি আমার হয়ে পরে প্রতিবাদ করতে যেও। আগে ভাবিকে সসম্মানে বাড়িতে ফিরিয়ে আনো।”

সুবর্ণার কথায় দমে যায় সোহেল। এই প্রথম সে একটু অনুশোচনা বোধ করে। তার মনে হতে থাকে, নিজের বোনের প্রতি হওয়া অন্যায়ের জন্য সে এতো রেগে যাচ্ছে। ইচ্ছা করছে মোর্শেদকে মাটিতে পু*তে ফেলতে। অথচ সে নিজেও কারো বোন, কারো মেয়ের সাথে একই ধরনের অন্যায় করেছে। তাদেরও তো একইরকম অনুভূতি হতে পারে।

সিতারা বেগম তেতে উঠে বললেন, “তুই কথায় কথায় ঐ বন্ধ্যা মেয়ের প্রসঙ্গ টানছিস কেন? আগে নিজের চিন্তা কর নিজের আখের গোছা।”

“আমি স্বার্থপর হতে পারব না আম্মু। আমার তো এখন মনে হচ্ছে আমার সাথে যা হয়েছে তা তোমাদের করা অন্যায়ের ফল। তাই আমি চাই আগে ভাবিকে ভাইয়া এই বাড়িতে ফিরিয়ে আনবে তারপর আমার সমস্যার প্রতিকার করবে।”

সিতারা বেগম কড়া ভাবে বলেন, “ঐ মেয়েকে আমি আর কিছুতেই এই বাড়িতে ফিরতে দেবো না। এটাই আমার শেষ কথা।”

“কেন একজন মেয়ে হয়ে আরেকজন মেয়ের সংসার নষ্ট করছ আম্মু? আমি তো তোমার আর ঐ রুহি নামের মেয়েটার মধ্যে কোন পার্থক্য খুঁজে পাচ্ছি না। রুহি যেমন আমার সংসার নষ্ট করেছে, তুমিও তেমন ভাইয়া-ভাবির সংসার নষ্ট করছ। মেয়েরা কেন এভাবে মেয়েদের শত্রু হয় বলো তো আম্মু। আজ যদি রুহি আমাদের মাঝে না আসত কিংবা তুমি ভাইয়াকে এভাবে না বলতে তাহলে তো আমাদের সংসার নষ্ট হতো না। তাহলে বলো তো একটা মেয়ের সর্বনাশের পেছনে কার হাত আছে?”

সুবর্ণার এমন যুক্তির সাথে আর পেরে ওঠেন না সিতারা বেগম। তাই নিজের কক্ষের দিকে পা বাড়ান। সোহেল বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল। সুবর্ণা জিজ্ঞাসা করে, “কোথায় যাচ্ছ তুমি ভাইয়া?”

“আমি নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছি বোন। তাই এখন আমি যাচ্ছি মালিহাকে ফেরত আনতে।”

#চলবে