যেখানে দিগন্ত হারায় পর্ব-১০+১১

0
135

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_১০
জাওয়াদ জামী জামী

” মম, আমি আর জীবনেও ভার্সিটি যাবোনা। ওই মাস্টারের কতবড় সাহস আমাকে পুরো ক্লাস কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে! আমার মানসম্মান ধুলোয় মিশে গেল। ঐ মাস্টারকে আমি ছাড়বনা। ওকে আমি ম্যানহোলে না চুবালে আমার নাম মাশিয়া নয়। ” রাগে মাশিয়া কেঁদে ফেলল। ও বাসায় এসেই নিজের ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে নিজের রাগ ঝাড়তে লাগল ড্রয়িংরুমের ফার্নিচারের ওপর।

” শান্ত হও, মাশিয়া। আমাকে বল কি হয়েছে? এভাবে ফার্নিচার নষ্ট করছ কেন? এসব কিনতে টাকা লাগে। কেউ এমনিতে দেয়না। ” কল্পনা মোর্তাজাও রেগে উঠলেন। তিনি আর কিছুতেই মাশিয়ার অন্যায়গুলোকে প্রশ্রয় দিতে চাননা।

” আমার থেকে এই ফার্নিচারগুলো তোমার কাছে বেশি প্রিয়! আমি থাকবনা এখানে। তোমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যাব। ”

” তা কবে যাচ্ছ? এর আগেও বেশ কয়েকবার যেতে চেয়েছিলে, কিন্তু প্রতিবারই সিদ্ধান্ত চেঞ্জ করেছ। এবার আশা করছি সিদ্ধান্ত চেঞ্জ করবেনা? ”

মাশিয়া কল্পনা মোর্তাজার কথার উত্তর না দিয়ে তার দিকে অগ্নি দৃষ্টি হেনে দুপদাপ পা ফেলে নিজের রুমের দিকে যায়।

” নিলু, তুমি টেবিলে খাবার দাও। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাহিনের বাবা এসে যাবে। আমি বউমাকে ডাকছি। আর শিল্পি তুমি মাশিয়াকে জুস দিয়ে এস। আজকে অনেক পরিশ্রম করেছে আমার মেয়েটা। পরিশ্রমের ফলে মাথার টেম্পারেচারও বেড়েছে। এখন ঠান্ডা ঠান্ডা জুসে যদি ওর মাথা একটু ঠান্ডা হয়। ” কল্পনা মোর্তাজা দুইজন মেইডকে ডেকে নির্দেশ দিলেন। তার নির্দেশ পাওয়া মাত্রই দুইজন মেইড তাদের কাজে লেগে যায়।

” আমি মেয়ের বিয়ে দিতে চেয়েছি, শফিক। মেয়েকে কোন কয়েদখানা কিংবা ক্যাসিনোতে পাঠাতে চাইনি। তুমি আজ পর্যন্ত যতগুলো পাত্রের খোঁজ এনেছ তাদের কাউকেই আমি যোগ্য বলে মনে করছিনা। এই যে, এটা দেখ, এই ছেলের সঙ্গে আমি আমার মেয়ের বিয়ে দেব? এি ছেলের বাবা, ভাই এমনকি ছেলেও মদ আর জুয়ায় মেতে থাকে। এরা পরিবারের সবাই মিলে ড্রয়িংরুমে বসেই স্যাম্পেন খায়। আর তুমি কিনা এই ছেলের বায়োডাটা এনেছ! আমি মাশিয়ার বিয়ে দিতে চাই, তারমানে এই নয় যে, আমা আমার মেয়ের হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে দেব। তুমি যদি পার একজন সং পাত্রের সন্ধান এনো। হোক সে মধ্যবিত্ত কিংবা গরীব। আমি শুধু আমার মেয়ের জন্য একজন উত্তম জীবনসঙ্গী চাই। ” মিরাজ মোর্তাজা রাগে হাতে থাকা ছবি এবং বায়োডাটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। যেটা দোতলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখল মাশিয়া। ওর ধারনাই ছিলনা বাবা ওর বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। নিচে নামার বদলে ও দৌড়ে নিজের রুমে চলে যায়।

” পাপা সত্যিই আমার বিয়ে দেবে! আমাকে এই বাড়ি ছেড়ে, পাপা-মম, ভাইয়া-ভাবীকে ছেড়ে যেতে হবে! আমি কিভাবে থাকব ওদের ছাড়া? ” মাশিয়া রুমে এসে নিজের সাথে নিজেই কথা বলতে থাকে। ও আর কিছুই ভাবতে পারছেনা। ও তাড়াহুড়া করে ড্রেস চেঞ্জ করে ভার্সিটির দিকে রওনা দেয়। অধিক উত্তেজনায় ও ভুলেই গেছে গতকাল ভার্সিটি থেকে আসার পর ঘোষণা দিয়েছিল, আর কখনোই ও ভার্সিটিতে যাবেনা।

ভার্সিটিতে এসে মনযোগ দিয়ে সব ক্লাস করল মাশিয়া। আরমানের ক্লাসেও কোন গোলযোগ করলনা। আরমান তার অবাধ্য ছাত্রীটিকে মনোযোগী হতে দেখে হাসল। কিন্তু সে জানতেও পারলনা, তার এই অবাধ্য ছাত্রীটির বিয়ের চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

রাত দশটা বিশ। আরমান একটা কফিশপের বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। আজ ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলে জম্পেশ আড্ডা দিয়েছে। দশটা বাজতেই সবাই যে যার বাসার পথে রওনা দিয়েছে। ওদের প্রত্যেকেরই নিজেদের বাইক, কার আছে। শুধু আরমানই রিক্সায় যাবে। অবশ্য ওকে বন্ধুরা সবাই লিফ্ট দিতে চেয়েছিল।, কিন্তু ওদের বাড়ি আরমানের ফ্ল্যাটের ঠিক উল্টো রাস্তায়। তাই আরমান ওদের ঝামেলা বাড়াতে চায়নি। সবাই বিদায় নিতেই আরমানও রিক্সার জন্য দাঁড়ায় কফিশপের বাহিরে।

” হেই ইয়াং ম্যান, তুমি এখানে? কোন প্রবলেম? ” হঠাৎ একটা গাড়ি আরমানের সামনে এসে দাঁড়ায়। গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলেন মিরাজ মোর্তাজা।

আরমান মিরাজ মোর্তাজাকে দেখে একটু অবাকই হয়।

” আসসালামু আলাইকুম, স্যার। রিক্সা পাচ্ছিনা, তাই দাঁড়িয়ে আছি। ”

” গাড়িতে উঠ। তোমাকে বাসা পর্যন্ত ছেড়ে দেই। শুনেছি তুমি ভার্সিটির আশেপাশেই থাক। আমিও সেদিকেই যাচ্ছি। ” মিরাজ মোর্তাজা আন্তরিকতার সাথেই বললেন। আরমান মিরাজ মোর্তাজার এরূপ প্রস্তাবে বেশ বিব্রত হয়। ভার্সিটির চেয়ারম্যান একজন শিক্ষককে এভাবে লিফ্ট দিতে চাইছে, এখানে আরমান যদি না করে দেয় তবে সেটা খারাপ দেখায়। আবার এভাবে তাদের সাথে যেতে আরমানের ইচ্ছে করছেনা। তাই সে ইতস্তত করে বলল,

” স্যার, আমার জন্য অযথাই ঝামেলা করার কোন প্রয়োজন নেই। আমি রিক্সা নিয়ে চলে যাব। ”

” আরে এখানে এত কথার কিছু নেই। তুমি চল আমাদের সাথে। তোমার ম্যামও আছে গাড়িতে। এই সুযোগে তার সাথে পরিচিত হয়ে নিবে। তারও তোমার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লাগবে। চল, ইয়াং ম্যান। ” মিরাজ মোর্তাজার আন্তরিকতা দেখে আরমান অবাক হয়ে যায়। এত উঁচু সমাজের মানুষ হয়ে এভাবে তার অধিনস্ত কারও সাথে কথা বলতে এই প্রথমবার কাউকে দেখছে আরমান। সেই সাথে মানুষটার প্রতি শ্রদ্ধায় তার মাতা নত হয়ে যায়। সে আর না করতে পারেনা।

” ম্যামও আছে! আপনাদের দেরি হয়ে যাবেনা? ”

” নোহ্। তুমি এসো। ” ততক্ষণে মিরাজ মোর্তাজা গাড়ির দরজা খুলে ফেলেছেন।

” কল্পনা বেরিয়ে এসো। তোমাকে আরমানের কথা বলেছিলাম না? এই যে সেই ইয়াং ম্যান। ” মিরাজ মোর্তাজার কথা শুনে বেরিয়ে আসলেন কল্পনা মোর্তাজা। তাকে দেখে আরমান সালাম দেয়।

কল্পনা মোর্তাজা কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলেন তার সামনে দাঁড়ানো এই সুর্দশন যুবকটির দিকে। ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের যুবকটিকে দেখে তার চোখ জুড়িয়ে যায়। বয়সে আরমান তার ছেলে মাহিনের থেকে ছোটই হবে। তাই তিনি আরমানকে তুমি বলেই সম্ভাষণ করলেন। তিনি সালামের উত্তর নিলেন। এরপর কয়েকটা কথা বলেই আরমানকে গাড়িতে উঠতে বললেন।

” ইয়াং ম্যান, আমার ছেলের রিসিপশনে তোমাকে আশা করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। ” মিরাজ মোর্তাজা পেছন থেকে বললেন। ড্রাইভারের পাশে বসা আরমান মিরাজ মোর্তাজার কথা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়।

” আসলে স্যার, আমার আম্মা সেদিন হঠাৎই অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। আম্মাকে নিয়ে সারাদিন ছুটাছুটি করতে হয়েছে। ” আর কিছু বললনা আরমান।

আরমানের কথায় যা বোঝার বুঝে গেছেন মিরাজ মোর্তাজা। একজন আদর্শ ছেলের দ্বায়িত্ব পালন সম্পর্কে তার কোন ভুল ধারনা হতে পারেনা।

” কি হয়েছিল তোমার আম্মার? তিনি এখন কেমন আছেন? ” মিরাজ মোর্তাজার গলায় খাঁটি উদ্বেগ।

” আম্মার হার্টের প্রবলেম দেখা দিয়েছে। সেকারনেই তাকে ঢাকায় এনেছি। চিকিৎসা করাচ্ছি। গত কয়েকদিন সে একটু সুস্থ ছিল। কিন্তু সেদিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যায়। ”

” সেক্ষেত্রে বলব, তুমি একজন আদর্শ ছেলের দ্বায়িত্ব পালন করেছ। কোন দাওয়াতের চাইতে মা’য়ের চিকিৎসা করা বেশি দরকার। তার পাশে থাকা দরকার। ”

” তোমার বাবা কি করেন? কয় ভাইবোন তোমরা? ” পেছন থেকে জিজ্ঞেস করলেন কল্পনা মোর্তাজা।

” বাবা বেঁচে নেই। আমার ছোট দুইটা বোন আছে। ” ছোট্ট করে বলল আরমান।

আরমানের কথা শুনে কল্পনা মোর্তাজার মন খারাপ হয়ে যায়। বাবা না থাকার যন্ত্রণা তিনি ভালো করেই জানেন। মুহূর্তেই তার মনে পরে যায় বাবার মৃ’ত্যু’র পর তাদের সেই দুর্বিষহ দিনের কথা। ছোট ছোট ভাইবোনকে নিয়ে তার মধ্যবয়সী মায়ের জীবনযুদ্ধে লড়াইয়ের কথা। বাবা হীন যেকোন সন্তানের জীবনই যে কণ্টকাকীর্ণ পথের ন্যায় তা তিনি ভালো করেই জানেন। বাবা নামক বটবৃক্ষ না থাকলে একজন মা’য়ের পক্ষে সন্তানদের মানুষ করা কত কঠিন তা তিনি জানেন। খুব কম সন্তানই বাবা ছাড়া জীবনের কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে সফলতার মুখ দেখতে পায়। গাড়ির সামনে বসা যুবকটিকে দেখে তার বুকের ভেতর ছলকে উঠল। চোখের কোনে জমা হয় বেদনার নোনা জল। তিনি সংগোপন চোখের জল মুছলেন।

গল্পে গল্পে আরমান বুঝতেই পারেনি গাড়ি ওর বিল্ডিংয়ের সামনে এসে গেছে। ড্রাইভার বিল্ডিংয়ের সামনে গাড়ি থামালে আরমান মিরাজ মোর্তাজা ও কল্পনা মোর্তাজার কাছ থেকে বিদায় নেয়। অবশ্য যাওয়ার আগে মিরাজ মোর্তাজা আর কল্পনা মোর্তাজাকে বাসায় নিয়ে যেতে চাইলে তারা জানায় অন্য একদিন তারা বেড়াতে আসবেন।

চলবে…

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_১১
জাওয়াদ জামী জামী

” এরা আমার মেয়েকে কি ভেবেছে? যার তার সাথে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসছে! আমার মেয়ে কি ফেলনা! ” মিরাজ মোর্তাজা তার হাতে থাকা বায়োডাটা ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেললেন। রাগে তার মুখাবয়ব র’ক্ত বর্ণ ধারন করেছে।

” এত হাইপার হচ্ছ কেন? বায়োডাটা দেখলেই যে সেখানে মেয়ের বিয়ে হচ্ছে এমনটাতো নয়। আমাদের যেখানে পছন্দ হবেনা, সেখানে বিয়ে দেবনা, সিম্পল কথা। আর তুমি সবাইকে মাশিয়ার জন্য ছেলে দেখতে নিষেধ করে দাও এক্ষুণি। ” কল্পনা মোর্তাজা স্বামীর ডান হাত নিজের দু হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন।

” ছেলে দেখতে নিষেধ করে দেব মানে? তুমিইতো মাশিয়ার বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছ। আবার সেই তুমিই বলছ বিয়ে দেবেনা! ” মিরাজ মোর্তাজা সবিস্ময়ে বললেন।

” আমি বলেছি পাত্র দেখতে নিষেধ করতে। বিয়ে দেবনা এটাতো বলিনি। আগামী একমাসের মধ্যেই মাশিয়ার বিয়ে আমি দেব। শুধু বলেছি, সবাইকে আর কষ্ট করে আমার মেয়ের জন্য পাত্র দেখতে হবেনা। পাত্র আমি পছন্দ করেছি। ” কল্পনা মোর্তার ঠোঁটের কোনে সন্তুষ্টির হাসি। তার চোখমুখে আজ প্রশান্তির ছোঁয়া দেখতে পেলেন মিরাজ মোর্তাজা।

” পাত্র পছন্দ করেছ মানে! পাত্র কে? আগে বলনি কেন? ”

” আমি কি আগে দেখেছিলাম নাকি। গত পরশুদিনই না দেখলাম পাত্রকে। গত দুইটা রাত আর গতকাল সারাদিন অনেক ভেবে দেখলাম আরমানের মত পাত্র হাজারে একটাও পাওয়া যাবেনা। ” কল্পনা মোর্তাজা স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন।

” আরমান! মানে মাশিয়ার টিচার? তুমি যা বলছ ভেবে বলছতো? ”

” হুম। শুধু ভাবিইনি। খোঁজও নিয়েছি। গতকাল সকালে একজনকে আরমানের গ্রামে পাঠিয়েছিলাম আরমান আর ওর পরিবার সম্পর্কে জানতে। সেখানকার সবাই একবাক্যে আরমান এবং ওর পরিবার সম্পর্কে পজিটিভ কথা বলেছে। তারা আরমানের মত ছেলেই হয়না। আবার ভার্সিটিতে পড়তে ও যেখানে থাকত সেখানে এবং ভার্সিটির ওর ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের কাছেও ওর সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি, সেখানেও সব পজিটিভ পেয়েছি। ”

” কল্পনা, তুমি ভেতরে ভেতরে এতকিছু করেছ! আরমান ভাল ছেলে এটা আমি জানি। আর সে পাত্র হিসেবেও যে পারফেক্ট এটাও মানি। কিন্তু তুমি তো জানোই মাশিয়ার সাথে আরমানের সম্পর্ক কেমন? তুমি কি মনে কর, মাশিয়া এই বিয়েতে রাজি হবে? আবার আরমানও কি মাশিয়াকে বিয়ে করতে চাইবে? আরমানের যে রেজাল্ট ও ভবিষ্যতে ভার্সিটিতে না-ও থাকতে পারে। যেকোন সময় ও ভালো জায়গায় জব পেয়ে যাবে। শুনেছি ও এবার বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর সেই ছেলে মাশিয়াকে বিয়ে করতে চাইবে বলে আমি মনে করিনা। ইনফ্যাক্ট ও নিজে মাশিয়ার সকল অপকর্ম বল আর কাজকর্ম যাই বলোনা কেন সবই দেখেছে। ”

” তুমি আগেই এত হতাশ হচ্ছ কেন! আমরাতো চেষ্টা করতেই পারি। মানলাম মাশিয়া বেয়াড়া, উশৃংখল। ও কিন্তু আমাদের ভুলের জন্যই এমন হয়েছে। আর এই বয়সে এমন একটুআধটু হতেই পারে। সেটা আমাদেরকেই শোধরাতে হবে। আর শোধরাবার কাজ আমাদের থেকে আরমান ভালো করতে পারবে। আমরা ওকে সাপোর্ট দেব মাশিয়াকে ঠিক করতে। শোন, আগেই এতকিছু না ভেবে আমরা আরমানের ফ্ল্যাটে যাই চল। শুনলাম ওর আম্মা অসুস্থ। এই সুযোগে তাকেও দেখে আসব আবার ওদের বিয়ের ব্যাপারেও আলোচনা করব। ”

” কল্পনা, আমার কাছে বিষয়টা ভালো লাগছেনা। নিজের মেয়ে জন্যই ওকে আরমানের সাথে বেঁধে দেয়ার কথা ভাবতে পারছিনা। আরমানের সাথে ওর আকাশপাতাল তফাৎ। তফাৎ যদি কয়েক কিলোমিটারের হয় তবে সেটা চেষ্টা করলেই কমানো যায়। কিন্তু আকাশপাতাল তফাৎ তুমি কেমন করে ঘোচাবে? আর যেখানে আমাদের মেয়েই এর জন্য দায়ী। ”

“আমি বললামনা, একমাত্র আরমানই ওকে ঠিক করতে পারবে৷ যে যতই তফাৎ হোকনা কেন সেটা আরমানই ঘোচাবে। ওকে আমার যেমনতেমন ছেলে বলে মনে হয়নি। তুমি ভুলে গেছ, বিয়ের পর যখন প্রথম এই বাড়িতে আসলাম, আমি কতটা আনাড়ি ছিলাম। তোমাদের সোসাইটির সাথে মিশতে পারতামনা, আরও অনেক কিছুই পারতামনা। কত কিছু জানতামনা। কিন্তু তুমি সব সময়ই আসার পাশে থেকেছ। আমাকে হাতে ধরে শিখিয়েছ। আজ আমি যা হয়েছি তার মূলেই আছ তুমি। তুমি ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। তুমি সেদিন আমার দ্বায়িত্ব নিয়েছিলে বলেই আমি অনেকটা পথ পাড়ি দিতে পেরেছি নিঃসংকোচে। তেমনি আরমানও না হয় মাশিয়ার দ্বায়িত্ব নেবে। ওর চলার পথের সাথী হবে। ” স্ত্রী’র দিকে তাকিয়ে মিরাজ মোর্তাজা আর না করতে পারলেননা। তার সামনে বসা এই মধ্যে বয়সী নারীর জন্য তিনি সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছেন। তার ভালোবাসা আর সহযোগিতায় তিনি হয়ে উঠেছেন একজন আদর্শ স্বামী, আদর্শ বাবা আর সর্বসাকুল্যে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে। বাবা-মা’র পরেই কল্পনা মোর্তাজা তার জীবনে এসেছে ধ্রুবতারা হয়ে।

” ঠিক আছে। মানলাম তোমার কথা। আগামীকালই আমরা যাব। কালকে শুক্রবার আরমানকেও বাসায় পাব আমরা। ওর সামনেই সব কথা হবে। ”

মিরাজ মোর্তাজার আশ্বাস পেতেই শ্বাস ছাড়লেন কল্পনা মোর্তাজা। তিনি কায়মনে প্রাথর্ণা করতে থাকেন নিজের মেয়ের জন্য। মেয়ের একটুখানি সুখের জন্য তিনি সৃষ্টিকর্তার নিকট দু হাত পেতে অঝোরে কাঁদলেন পুরোটা রাত। সে রাতে জায়নামাজই হলো তার কান্নার সাথী।

” চন্দ্র, বই, খাতা নিয়ে আমার কাছে আয়। আজকে তোর ফিজিক্স পরীক্ষা নিব। ” আরমানের ডাক শুনে শশীর মাথায় হাত।

” একটু আগেই না আমরা ঘুড়ে আসলাম। তার রেশ না কাটতেই তুমি আমাকে পরীক্ষা দিতে বলছ, ভাইয়া! আজকে থাক। কাল তুমি যা বলবে তাই শুনব। ” শশী ইনিয়েবিনিয়ে বলল।

” ঘুড়ে আসলি ভালো কথা। এর সাথে পড়ার সম্পর্ক কোথায়? বেশি কথা না বলে যা বলছি তাই কর। কালকে কেমিস্ট্রি পরীক্ষা নিব। এক মিনিট দেরি করলে সময় দশ মিনিট কমিয়ে দিব। আর আজকে ফিজিক্সে হান্ড্রেডে হান্ড্রেড না পেলে কালকের পরীক্ষা থেকে পনের মিনিট সময় কেটে নিব। কালকের পরীক্ষায় হান্ড্রেড না পেলে পরের পরীক্ষায় বিশ মিনিট কাটব। এভাবে শেষ পরীক্ষার রেজাল্টের ওপর নির্ভর করছে তুই আগামী মাসে বাবার বাড়িতে থাকবি না শ্বশুর বাড়িতে থাকবি। ” আরমানের প্রচ্ছন হুমকিতে ভয় পায় শশী। ওর আর কথা বাড়ানোর সাহস হয়না। সুরসুর করে বই খাতা নিয়ে আরমানের কাছে যায়।

সুধা রান্নাঘরে আয়েশা খানমের সাথে পিঠা বানাচ্ছে। আরমান পাটিসাপটা পিঠা পছন্দ করে। তাই গ্রামে যাওয়ার আগে আয়েশা খানমের ছেলেকে আরেকবার পাটিসাপটা বানিয়ে খাওয়ানোর সাধ জেগেছে। তিনি বাড়ি থেকে আসার সময় চালের গুঁড়া, গুড় এনেছিলেন। আজ তিনি আরমানকে দিয়ে দুধ কিনিয়েছেন। সেই দুধের ক্ষীর দিয়েই পাটিসাপটা বানাচ্ছেন।

শশী কিছুক্ষণ আইগুঁই করে পড়ায় মনোযোগ দেয়। আরমানের তৈরী করা কোয়েশ্চেনে পরীক্ষা দিচ্ছে ও। শশীর পরীক্ষা প্রায় শেষের দিকে। এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠল। কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে আরমান ঘড়ির দিকে তাকায়। এখন রাত সাড়ে নয়টা বাজছে। এই সময় কে আসতে পারে ভেবে ওর কপালে ভাঁজ পড়ল।

এদিকে আয়েশা খানমের পিঠা বানানো শেষ। তিনি মেয়েকে নিয়ে ড্রয়িংরুম, রান্নাঘর গোছগাছ করছেন। এই সময় কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে তিনি সুধার দিকে তাকালেন। মৃদুস্বরে সুধাকে বললেন আরমানকে ডাকতে। এদিকে আরমান রুম থেকে বেরিয়ে এসেছে। ও সোজা গিয়ে দরজা খুলে দেয়।

দরজা খুলে সামনে দাঁড়ানো অতিথিদের দেখে সত্যিই অবাক হয় আরমান। ও ভাবতেও পারেনি মিরাজ মোর্তাজা আর তার স্ত্রী ওর ফ্ল্যাটে আসবে। ও মৃদুস্বরে অতিথিদের সালাম দিয়ে ভেতরে আসতে বলল। কল্পনা মোর্তাজা তার স্বামীর পিছুপিছু ভেতরে ঢুকলেন। তাদের পেছনে বেশ কয়েকটা প্যাকেট নিয়ে ঢুকল মিরাজ মোর্তাজার ড্রাইভার।

আয়েশা খানম আর সুধা ড্রয়িংরুমেই ছিলেন। অচেনা তিনজনকে দেখে আয়েশা খানম একটু বিব্রত হন। আরমান এগিয়ে এসে আয়েশা খানমের সাথে মিরাজ মোর্তাজা আর তার স্ত্রী’র পরিচয় করায়।

কল্পনা মোর্তাজা মাঝারি আকারের ফ্র্যাটের চারপাশে তাকালেন। একদম সাদামাটা বলতে যা বোঝায় ফ্ল্যাটটা সেরকমই। ফার্নিচারের তেমন বালাই নেই। একপাশে একটা টি টেবিলকে ঘিরে কয়েকটা চেয়ার পেতে রাখা আছে। মেঝেতে মাদুর বিছানো। মাদুরের ওপর খাবার ঢাকনা দিয়ে রাখা। কল্পনা মোর্তাজার বুঝতে অসুবিধা হয়না আরমান একা থাকে জন্যই এখনও ফ্ল্যাট ফাঁকা আছে।

” স্যার, আপনারা বসুন। ” আরমান নিস্প্রভ গলায় বলল।

” ইয়াং ম্যান আমরা তোমাকে বোধহয় অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিলাম? আসলে একটা পার্টি এ্যাটেন্ড করে আসলাম তাই দেরি হল। ” মিরাজ মোর্তাজা এমনভাবে বললেন যেন আরমান জানত তারা আজ আসবে।

” ইট’স ওকে, স্যার। আমরা জেগেই ছিলাম। আপনারা বসুন। ” আরমান হাতের ইশারায় চেয়ার দেখিয়ে দিল।

কল্পনা মোর্তাজা আয়েশা খানমের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন।

” আপনার শরীর এখন কেমন আছে, আপা? আরমানের কাছে সেদিন শুনেছিলাম আপনি অসুস্থ? ”

” এখন আগের থাইকা ভালো আছি। আমার ছেলে চায়না আমি খারাপ থাকি। ” হাসিমুখে বললেন আয়েশা খানম।

” সোনার টুকরা ছেলে আপনার। কয়জন মা এমন সন্তান গর্ভে ধরে৷ ” কল্পনা মোর্তাজাও হেসে বললেন।

ড্রাইভার তার হাতের প্যাকেটগুলো আয়েশা খানমের হাতে দিয়ে বাহিরে চলে যায়।

” আসেন এইখানে বসেন। আপনাগো বসতে দেয়ার মত ভালো কিছু দিতে পারতেছিনা। আরমান এখনও কিছুই কিনেনি। ওরে জিনিসপত্র কিনতে কইলেই কয়, একা একা থাকি এত কিছু কিনে কি করব। ” আয়েশা খানম অতিথিদের প্লাস্টিকের চেয়ারে বসতে দিতে লজ্জা পাচ্ছেন।

” ও তো ঠিকই বলেছে। একা একা থাকে। এতকিছুর দরকার কি। ” মিরাজ মোর্তাজা একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন।

শশী ড্রয়িংরুমে গলার আওয়াজ পেয়ে দরজা থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে। কল্পনা মোর্তাজা দরজার আড়ালে দাঁড়ানো মেয়েটাকে দেখে ফেললেন।

” এটা তোমার বোন বুঝি? আরেকটা কই? ” সুধাকে দেখিয়ে বললেন কল্পনা মোর্তাজা।

আরমান শশীকে ডাকলে ও এসে সবাইকে সালাম দেয়।

আয়েশা খানম অতিথিদের সাথে কথা বলছেন
আরমান মা’য়ের পাশে বসে তাদের গল্প শুনছে। আর মাঝেমধ্যে দুই একটা কথা বলছে। সুধা আর শশী রান্নাঘরে নাস্তা সাজাচ্ছে। আয়েশা খানম অতিথিদের রাতের খাওয়ার কথা বললে তারা জানায় খেয়ে এসেছে। তাই তিনি মেয়েদের হালকা নাস্তা সাজাতে বললেন।

” আপনার ছেলেমেয়ে কয়ডা, আপা? ”

” আমার এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলেটার বিয়ে দিলাম সাতদিন আগেই। আর মেয়ে আপনার ছেলের ছাত্রী। ” কল্পনা মোর্তাজা আয়েশা খানমে পছন্দ করে ফেলেছেন। সহজ-সরল এই মানুষটিকে যে কেউ পছন্দ করতে বাধ্য। যার কথাবার্তায় গ্রাম্যতা স্পষ্ট। অথচ এ নিয়ে তার কোন লুকাছাপা নেই। নেই কোন লজ্জা। নিজেকে একটা বারের জন্যও অযোগ্য কিংবা ছোট মনে করছেনা। কিংবা তাদের সামনে হীনমন্যতায়ও ভুগছেননা। ছেলের প্রতি তার মনে অগাধ ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছেন। এই মানুষটার দিকে তাকালেই কল্পনা মোর্তাজার চোখে পানি আসছে। বারবার মনে হচ্ছে, একজন মা হিসেবে তিনি আয়েশা খানমের সমকক্ষ কখনোই হতে পারবেননা। কল্পনা মোর্তাজা উসখুস করছেন কিভাবে তিনি মাশিয়ার বিয়ের কথা তুলবেন। সামনে বসা ভদ্রমহিলার ব্যক্তিত্ব্যের সামনে তার নিজেকে কেমন ফিঁকে লাগছে।

” আপনি ছেলের বিয়ে করায় বড় দ্বায়িত্ব পালন করছেন। আমার যে কবে সেই সৌভাগ্য হইব আল্লাহই জানেন। কবে যে ছেলেরে বিয়ে করাইতে পারমু। ”

কল্পনা মোর্তাজার ভাগ্য যেন সুপ্রসন্ন হয়। তিনি এতক্ষণ যে সুযোগের অপেক্ষা করছিলেন সেই সুযোগ তিনি অযাচিতভাবে পেয়েই যান।

” দেরি না করে শুভ কাজটা করিয়েই দেন। আপনার ছেলেতো অযোগ্য নয়। ”

গল্প অন্য প্রসঙ্গ থেকে নিজের বিয়ের প্রসঙ্গে আসায় আরমান লজ্জায় পরে যায়। ও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। এরপর রান্নাঘরে এসে বোনদের কাজে সাহায্য করতে হবে কিনা সেটা জিজ্ঞেস করল।

” এইবার বিয়া দিমু । অনেক কওনের পর আমার ছেলে রাজি হইছে। এখন গ্রামে গিয়া আত্মীয় স্বজনদের কইয়া দিমু আমার বউমা খুঁজনের লাইগ্যা। চাঁন্দের লাহান বউমা আনমু আমার ছেলের জন্য। আপ্নেরাও একটা মেয়ে দেইখেন। যে আমার আরমানের সুখ-দুঃখ বুঝবো, হের বিপদআপদে আগলায় রাখব। এক কথায় আদর্শ বউয়ের হইব যে। এমন একটা মেয়ে খুঁইজা দিয়েন। ” আয়েশা খানম বিনীত অনুরোধ করলেন।

কল্পনা মোর্তাজা স্বামীর দিকে তাকালেন। সময় এসেছে, এবার আসল কথাটা পাড়তে হবে।

” আপা, আপনি যদি কিছু মনে না করেন তবে একটা কথা বলার অনুমতি চাচ্ছি। ” মিরাজ মোর্তাজা ইতস্তত করে বললেন।

” কি কইবেন, ভাই সাহেব? এম্নে অনুমতি নিতে হইবনা। আপনি কইয়া ফালান। ”

” আপনি চাইলে আরমানের জন্য আমার মেয়েকে দেখতে পারেন। আশা করছি আপনার ওকে অপছন্দ হবেনা। হয়তো আপনার চাওয়া মত আদর্শ মেয়ে সে নয়। কিংবা ভদ্র বা শান্তও নয়। তবুও বাবা-মা হিসেবে আমরা তাকে আরমানের মত ছেলের হাতে দিতে চাইব। আপনাদের শাসনে, আদরে ও একজন আর্দশ পুত্রবধূ, স্ত্রী, ভাবী এবং সর্বোপরি একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করবে। ” মিরাজ মোর্তাজা অনেক আশা নিয়ে আয়েশা খানমের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

আরমান রান্নাঘর থেকে সব শুনে নড়তেও ভুলে গেছে। ওর চোখের সামনে ভাসছে উদ্ধত একটা মেয়ের প্রতিচ্ছবি। যে কাউকেই পরোয়া করেনা। সবাইকে নিজের মত করে নাচাতে চায়। যে কাউকে সম্মান করতে জানেনা। এমন একটা মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে কল্পনাই করতে পারছেনা আরমান। ও এখন মা’য়ের উত্তর শোনার অপেক্ষায় আছে।

মিরাজ মোর্তাজার প্রস্তাবে যারপরনাই অবাক হয়েছেন আয়েশা খানম। ইনারা এত ধনী হওয়া স্বত্বেও তাদের মত মধ্যবিত্ত পরিবারে নিজেদের মেয়েকে বিয়ে দিতে চাচ্ছেন! তবে আয়েশা খানম তাদের চোখে নির্ভেজাল অনুরোধই দেখলেন। তাদের চোখে শুধুই মেয়ের জন্য উদ্বেগ খেলা করছে। সেখানে কোনও ছলনা নেই। তিনি কল্পনা মোর্তাজার দিকে তাকালেন। তার মুখ জুড়ে মমতার ছাপ প্রকট হয়ে উঠেছে। শহুরে বেশভূষার প্রলেপে মুছে যায়নি তার শরীর থেকে শেকড়ের গন্ধ। আয়েশা খানমের মত তারও শেকড় অচেনা কোন গ্রামে। সে আভিজাত্যের জমকালো জগতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখলেও কোথাও থেকে গেছে গ্রামের সেই মমতাময়ী নারীর ছায়া। মানুষ হিসেবে ইনারা মোটেও খারাপ নন। ইনাদের ভেতর অহংকারের লেশমাত্রও নেই। ইনারা যে কাউকে সম্মান দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনা মোটেও।

” ঠিক আছে, ভাইসাহেব। আমি আপ্নের মেয়েরে দেখতে যাব। আপ্নেদের মত বাবা-মা’য়ের সন্তান কখনোই খারাপ হইতে পারেনা। হয়তো অর্থ-বিত্তের প্রভাবে তার ওপরে অহংবোধ জমা হইছে। কিন্তু হয়তো হেয় ভেতরে ভেতরে খাঁটি মানুষই রইছে। ”

আয়েশা খানমের কথা শুনে মিরাজ মোর্তাজা, কল্পনা মোর্তাজা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

চলবে….