যেখানে দিগন্ত হারায় পর্ব-১৯+২০

0
194

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_১৯
জাওয়াদ জামী জামী

ঘুমের মধ্যে আচমকা লা’থি খেয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল আরমান। আশেপাশে তাকিয়ে মাশিয়া ব্যাতীত কাউকে দেখলনা। তবে সে গভীর ঘুমে মগ্ন। আরমানের বুঝে আসলনা, মাশিয়া যদি ঘুমিয়েই থাকে তবে ওকে কে আঘাত করল! এদিকে ওর চোখে প্রচন্ড ঘুম। ঘুমের জন্য আর বসে থাকতে পারলনা। বাম কাত হয়ে শুতেই আবারও জবরদস্ত লা’থি খেয়ে উঠে বসল। এবার ওর পেটে প্রকান্ড লা’থি হেঁকেছে মাশিয়া।লা’থি’র চোটে আরমানের দম বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাভাবিক হতে নিজেকে কিছুক্ষণ সময় দেয়। ব্যথাটা সহনীয় পর্যায়ে আসতেই ও মাশিয়াকে এক হ্যাঁচকায় টেনে তুলে ওর গালে ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। আচম্বিতে থা’প্প’ড় খেয়ে মাশিয়ার মাথা বনবন করতে থাকে। ও ঘুমঘুম চোখে তাকিয়ে থাকে আরমানের দিকে। এরপর ঘুম জড়ানো গলায় বলল,

” এভাবে মা’র’লে’ন কেন? আমার গালকে কি আপনার থা’প্প’ড় প্র্যাকটিসের ময়দান মনে হয়? অসভ্য মাস্টার। অবলা নারীকে নূন্যতম সম্মান দিতে জানেনা। তার বাড়িতে থাকছি জন্য যা খুশি তাই করছে! ” মাশিয়ার গলায় কান্নার আভাস স্পষ্ট।

” বেয়াদব মেয়ে, নিজেই আমাকে দুই দুইবার লাথি মা’র’ল। তারউপর আবার গলাবাজিও করছে। আর একবার যদি আমার শরীরে তোমার পা টাচ করেছে, তবে সাথে সাথে পা দুটো ভেঙ্গে ফেলব। ” আরমান ভিষণ রেগে গেছে।

আরমানের কথা শুনে থমকায় মাশিয়া। ও কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করছে।

” ও মাই আল্লাহ! আপনাকে লা’থি মা’র’লা’ম কখন! আমিতো ঐ মিতুল ন্যাকুকে লা’থি দিয়েছি। সে আমার কানের কাছে আরু বেইবি, আরু বেইবি বলে ঘ্যানঘ্যান করছে। এত ন্যাকামি সহ্য করতে পারিনা। তা-ও আবার আপনার মত অসভ্য মাস্টারকে নিয়ে। বুইড়া বেটাকে আরু বেইবি ডাকছে। জাস্ট ডিজগাস্টিং। ”

মাশিয়ার কথা শুনে আরমান কপাল কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। মাশিয়ার কথার অর্থ বোঝার চেষ্টা করছে। পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও কিছুটা বুঝতে পারে।

” তুমি এখানে মিতুলকে কোথায় পেলে? তুমি ফুলবাড়িয়া মানে আমার গ্রামে আছ। আর তোমার ফ্রেন্ড মিতুল সে আছে ঢাকায়। আমাকে ইচ্ছে করে মে’রে আবার অযুহাত দিচ্ছ, ফাজিল মেয়ে? তুমি যেমন বেয়াদব, তোমার চিন্তাধারা ঠিক তেমনই ফালতু আর তোমার স্বপ্নও তোমার মতই বেয়াদব। এমন ফালতু স্বপ্নতো আমরা দেখিনা। ইচ্ছে করছে কানের নিচে আরও দুই-চারটা লাগিয়ে দেই। ”

আরমান যে রেগে গেছে এটা বেশ বুঝতে পারছে মাশিয়া। সেই সাথে এটাও বুঝে গেছে ও এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল। আর স্বপ্নেই মিতুলকে লাথি মা’র’তে গিয়ে আরমানকে মেরেছে। বিষয়টা বোধগম্য হতেই ও মুখ কাঁচুমাচু করে আরমানের দিকে তাকায়।

” ভুল আমার নয়। ভুল আপনার। আপনি কেন আমার পাশ ঘেঁষে শুয়েছেন? এখন আমি যদি স্বপ্নে মিতুলকে মা’রি কিন্তু আমার বর্ডারের আশেপাশে আপনি এসে যান তবে লাথিটাতো আপনাকেই লাগবে তাইনা? এরপর থেকে একটু দূরে শোবেন। বলাতো যায়না এরপর হয়তো আপনার নাকেই পাঞ্চ করলাম। ঘুমের মধ্যেই নাক ভেঙে র’ক্তা’র’ক্তি কাণ্ড ঘটল। ”

” নিজে অন্যায় করে আমার ঘাড়ে দোষ দিচ্ছ? আজ থেকে সাবধান না হলে পরবর্তীতে মেঝেতে তোমার জায়গা হবে, কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে নাও। ” আরমান আর কিছু না বলে শুয়ে পরল। মেজাজ ভালোই খারাপ হয়েছে।

” রীতিমত নারী নির্যাতন করছেন আপনি। এরপর আবারও আমাকে থা’প্প’ড় দিলে, আমি সোজা থানায় যাব। কেইস করব আপনার নামে। ” আরমানকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে মাশিয়া।

” ওয়েলকাম। যেখানে খুশি সেখানে যেতে পার। তবে যাবার আগে তোমার অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে ভেবে দেখ। তুমি যেমন মেয়ে, তোমাকে মনের সুখ মেটাতে কেউ মা’র’বে’না। মা’র’বে তোমার বেয়াদবির জন্য। তুমি মামলা করবে আর আমি বসে থাকবনা নিশ্চয়ই? তোমার বিপক্ষে সাক্ষী জোগাড় করতে আমার কষ্ট হবেনা মোটেও। ” মাশিয়ার হুমকিকে একটুও পাত্তা দিলনা আরমান।

এদিকে নিজেকে এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য হতে দেখে কান্না পায় মাশিয়ার। আরমানকে ও কোনভাবেই জব্দ করতে পারছেনা। রাগে ওর মাথা দপদপ করছে।

দুপুরে আয়েশা খানম মাশিয়াকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন। আরমান, সুধা, শশী ওরা নিজের মত খাচ্ছে। মাশিয়া মাছের কাঁটা বাছতে পারেনা জন্য, মাছ রান্না হলেই আয়েশা খানম ওকে মুখে তুলে খাইয়ে দেন। যেটা আরমানের মোটেও পছন্দের নয়।

” আম্মা, তুমি ওকে খাওয়াতে গিয়ে নিজের খাওয়ার কথা ভুলে যেওনা। এতবড় মেয়েকে মুখে তুলে খাওয়াতে তোমার বিরক্ত লাগেনা? আমারতো দেখেই রাগ উঠে। ও মাছ বেছে খেতে না পারলে খাবেনা। তাই বলে তোমার ওকে খাইয়ে দিতে হবে কেন? ”

” হিংসা আম্মা, হিংসা। আপনার এই ছেলে আস্ত একটা হিংসার গ্যারাজ। আপনার বুইড়া-দামড়া ছেলেকে আপনি মুখে তুলে খাওয়াননাতো তাই রাগে ফুঁসছে। আবার আমার খাবারেও নজর দিচ্ছে। কাল থেকে আপনার হিটলার ছেলেকে মাছ না দিয়ে আমাকে দেবেন। ছোটবেলা থেকে বেশি বেশি খাইয়েছেন জন্য আমাকে হিংসা করছে। তার ভাগের পিসটা আমার প্লেটে আসছে এটাই তার হিংসার কারণ। আপনার মত ভালো আম্মার ছেলে কিভাবে এত হিংসুক হয় সেটা আমার বুঝে আসছেনা। ” মাশিয়া আরমানকে জ্বা’লা’নো’র সুযোগ হাতছাড়া করলনা।

” এই তুমি চুপ করবে? আজকাল বেশি কথা বলতে শিখেছ। এখন থেকে কথাপ্রতি তোমাকে একটা করে থা’প্প’ড় লাগাবো। দেখব তখন কত কথা বলতে পার। ফাজিল মেয়ে একটা। ” আরমান বেশ রেগে গেছে।

” দেখলেন, আম্মা? কিভাবে নারী নির্যাতন করে! আজকাল ভালো মানুষের মূল্য কেউই দেয়না। আমাকে উঠতে-বসতে কিভাবে নির্যাতন করে দেখেছেন? এই হিটলারের নির্যাতন সইতে সইতে কোনদিন দেখবেন আমি শূন্যে মিলিয়ে গেছি। আরেক টুকরা মাছ নিনতো। রাতে আপনার ছেলেকে মাছ না দিলেও চলবে। মাশাআল্লাহ এমনিতেই তার মাথায় অনেক কুবুদ্ধি। বেশি মাছ খেলে কুবুদ্ধি আরও বাড়বে। ”

” আমার মাথায় যদি কুবুদ্ধি থাকে, তবে তোমার মাথায় কি আছে? অত্যাচারি মহিলা। ওর অত্যাচারে ভার্সিটিসুদ্ধ মানুষ তটস্থ থাকত। সে আবার আরেকজনকে বলে তার মাথায় কুবুদ্ধি। ”

” বাপ, চুপচাপ খাইয়া নেও। আমার মা’কে আমি খাওয়ায় দিতাছি , আমার তো কোন অসুবিধা হয়না। তুমি এম্নে কও ক্যা? যতদিন আমার শরীলে শক্তি আছে আমি ততদিন আমার মা’য়েরে খাওয়ায় দিমু। তুমি এরপর কোনদিন আর কিছু কইবানা। ” মা’য়ের কথা শুনে আরমান আর কিছু বললনা।

মাশিয়া মনের সুখে আয়েশা খানমের হাতে খাচ্ছে। আর মাঝেমধ্যে আরমানকে জব্দ করতে এটাসেটা বলছে।

” উমম আম্মা, সেই মজা। আপনার হাতে ম্যাজিক আছে। আপনি যেই খাবারেই হাত দেন, সেই খাবারই অমৃত হয়ে যায়। এটার স্বাদ অন্য কেউ বুঝবেনা। কোন বুইড়া-দামড়াতো অবশ্যই নয়। আপনার হাতের ছোঁয়ায় করলা ভাজিও মিষ্টি লাগছে। অপূর্ব, অসাধারণ। আহ্ কি শান্তি। ”

মাশিয়ার ভাবভঙ্গি দেখে সুধা, শশী ঠোঁট টিপে হাসছে। ওরা বুঝতে পারছে আরমানকে রাগানোর জন্যই কথাগুলো বলছে মাশিয়া। আয়েশা খানমও মাশিয়ার কথায় হাসছেন। শুধু আরমান চুপচাপ খেতে থাকে। ওর আম্মা ওকে চুপ থাকতে বলেছেন। তাই ইচ্ছে থাকা স্বত্বেও ও কিছু বলতে পারছেনা। তবে রাগী চোখে বারবার তাকাচ্ছে মাশিয়ার দিকে। যেন চোখ দিয়েই ভস্ম করে দেবে ওকে।

” আম্মাআআআআ, দেখেন হিটলার কিভাবে তাকাচ্ছে আমার দিকে। আজ রাতে আমি আপনার কাছে ঘুমাব। নয়তো আপনার হিটলার ছেলে আমাকে একা পেয়ে গলা টিপে মা’র’বে। আপনিতো জানেননা, প্রতি রাতেই সে আমাকে ধমকায়। আমাকে বাড়ির সব কাজ করতে বলেছিল। কিন্তু আমি কাজ করতে পারিনা তাই সে আমাকে প্রচুর হেনস্তা করে। আপনিই বলুন, আমি জীবনে কখনো বাড়ির কোন কাজ করেছি? আমি তাকে কতবারই বলেছি, বিয়ে করে শ্বশুর বাড়িতে এসেছি, সব কাজ আমাকে করতেই হবে। আমাকে কিছুদিন সময় দিন। ধীরে ধীরে সব শিখে নিব। দেখবেন একদিন আমি সবার মনের মত হয়ে উঠব। কিন্তু সে আমার কোন কথাই শোনেনা। ” কান্নার ভঙ্গিতে আবারও বলল মাশিয়া।

মাশিয়ার কথা শুনে আরমান চুড়ান্ত পর্যায়ের অবাক হয়েছে। ও কখনোই যেসব কথা মাশিয়াকে বলেনি, আজ মাশিয়া সেসব কথা বানিয়ে বলছে! ওর নামে বিচার দিচ্ছে ওরই মা’য়ের কাছে!

” বাপ, আমার মা এইসব কি কইল? তুমি ওরে কাজের জন্য ধমকাও! তুমিতো এমন ছিলেনা, বাপ। তুমি আমার সোনার টুকরা ছেলে। তোমার মুখে এইসব কথা মানায়না। আর কখনোই তুমি বউমারে ধমকাইবেনা। কাজের জন্যও কিছু কইবানা। কাজ করার জন্য আমরা আছি। আমার মা’য়ে আমার বাড়িতে প্রজাপতির লাহান উইড়া বেড়াইবো। আমি তারে দেইখা আমার চোখের শান্তি নিমু। ”

” আম্মা, এই মেয়ের কথা তুমি বিশ্বাস করোনা। এই মেয়ে খুবই ধুরন্ধর সেই সাথে মিথ্যাবাদী। সে তোমার কাছে আমাকে খারাপ বানাতে চায়। ” আরমান স্তিমিত গলায় বলল।

” দেখেছেন, আম্মা? আমাকে মিথ্যাবাদী বলল, আবার ধুরন্ধরও। এবার আমার কান্না পাচ্ছে। আম্মা, আমি কাঁদতে শুরু করলাম। ” মাশিয়া সত্যিই কাঁদতে শুরু করল।

” মা’গো কাইন্দনা। আরমান তোমারে আর কিছুই কইবনা। সে এরপর তোমারে কিছু কইলে আমি তার বিচার করমু। তুমি দেইখা নিও। ” আয়েশা খানম মাশিয়াকে শান্তনা দিচ্ছেন।

মাশিয়া কেঁদেই চলেছে। আয়েশা খানম, সুধা, শশী অনেক বোঝানোর পর ও কান্না থামায়। ওড়নায় চোখ মুছে সবার অলক্ষ্যে আরমানকে চোখ টিপে ভেংচি কাটল মাশিয়া।

আরমানের বুঝতে বাকি থাকেনা মেয়েটা এতক্ষণ কান্নার অভিনয় করেছে।

চলবে…

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_২০
জাওয়াদ জামী জামী

শশীর এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ও আপাতত বই থেকে মুখ তুলতে পারছেনা। আর কিছুদিন পর সুধার এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে।
আবার মাশিয়ার সেকেন্ড সেমিস্টার শুরু হতেও দেরি নেই। বাড়িতে পড়াশোনার তোরজোর শুরু হয়েছে। আরমান কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনজনকে পড়াচ্ছে। ও মাশিয়ার জন্য যাবতীয় নোট সংগ্রহ করেছে। অবশ্য মাশিয়াও আর ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করছেনা। ও মন দিয়েই পড়ছে। এছাড়া আরমানও ওকে খুঁটিনাটি সব পড়াচ্ছে। আরমানের পড়ানোর ধরনও মাশিয়ার পছন্দ হয়েছে।

কিছুদিন থেকেই আরমানের ছোটমামা মাশিয়াকে তাদের বাড়িতে নিতে চাচ্ছেন। কিন্তু শশীর পরীক্ষা থাকায় আয়েশা খানম ভাইয়ের বাড়িতে যেতে পারেননি। তবে তিনি ভাইকে কথা দিয়েছেন শশীর পরীক্ষা শেষ হলেই তিনি মাশিয়াকে নিয়ে সেখানে যাবেন। অবশ্য আয়েশা খানম আরমানকে বলেছিলেন, মাশিয়াকে নিয়ে সেখানে যেতে। কিন্তু আরমান রাজি হয়নি। ও কাজের অযুহাত দিয়ে এড়িয়ে গেছে।

উঠান ভর্তি সরিষা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কয়েকজন মেয়ে সেগুলো ঠিকঠাক করছে। আয়েশা খানম সবার কাজ তদারকি করছেন। আরমানের কঠিন নির্দেশ তা আম্মা আর কোন কাজ করবেনা। অগত্যা তাকে বসে বসে সব তদারকি করতে হচ্ছে।

” আম্মা, এগুলো কি? ” আয়েশা খানমের পাশে এসে বসল মাশিয়া।

” সরিষা। তুমি সরিষা চিনোনা? ”

” সরিষার ক্ষেত দেখেছি, ফুল দেখেছি কিন্তু সরিষা দেখিনি। যখন ক্ষেত ফুলে ছেয়ে ছিল তখন ছবি তুলেছিলাম। এত সরিষা দিয়ে কি হবে? ” মাশিয়া গ্রামে এসে অবাকই হয়েছে। এত এত ফসল দেখে ও আয়েশা খানমকে নানান প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে।

” কিছু সরিষা নিজেদের জন্য রাইখা বাকিগুলা বিক্রি করমু। আমরা গেরস্ত মানুষ, গেরস্ত বাড়িতে প্রতি বছরই অনেক ফসল হয়। এই ফসলগুলান নিজেদের জন্য রাইখা বাকি গুলা বেঁইচাই আমরা দিনাতিপাত করি। কয়দিন পর ধান উঠব। সেই ধান সেদ্ধ হইব, শুকানো লাগবো। নিজেদের যতটুকু লাগব, ততটুকু রাইখা বাকিগুলান বেঁচন লাগব। ”

” এগুলোতে তো অনেক কষ্ট, আম্মা! অনেক পরিশ্রম করতে হয়। ”

” কষ্ট না করলে ফল পাইবা ক্যাম্নে? যখন সোনার ফসল ঘরে উঠে তখন মনে কোন কষ্টই থাকেনা।আবার সেই ফসল বেঁইচা যখন টাকা পাওয়া যায়, সেই টাকা যখন সংসারের কাজে লাগে, সঞ্চয় করবার পারি তখন সুখের সীমা থাকেনা। ”

মাশিয়া মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে এই মধ্যবয়সী মমতাময়ীর দিকে। যার হৃদয়ে সন্তানদের জন্য অপার ভালোবাসা। যে শরীর খারাপকে উপেক্ষা করে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে তৎপর।

” বড়মা, কেমন আছেন? ”

কারও গলার আওয়াজ পেয়ে মাশিয়া ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে। উঠানের মাঝে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যার পোশাকআকাশ দেখে তাকে গ্রামের বলে মনে হচ্ছেনা। মেয়েটি দেখতেও মন্দ নয়।

” কুসুম! তুমি কবে আইছ? আসো আমার কাছে আইসা বস। বউমা, তুমি একটা চেয়ার আইনা দিবা? ”

মাশিয়া চেয়ার এনে দিলে কুসুম নামের মেয়েটি বসল।

” এটা বুঝি আরমানের বউ? ছেলেকে বিয়ে করালেন কিন্তু আমাকে জানালেননা। আরমানও একবারও বলেনি ও বিয়ে করেছে। বাড়িতে এসে শুনছি ওর বিয়ের কথা। অথচ আপনার ছেলের সাথে আমার সপ্তাহে দুইদিন কথা হয়। কত সুখ-দুঃখের কথা হয় ওর সাথে। ” কুসুমের গলায় অভিযোগের সুর।

কুসুমের কথা শুনে মাশিয়া ওর দিকে বাঁকা চোখে তাকায়।

” আর কইওনা, মা। হঠাৎই বিয়াডা হইছে। আমার আরমানও এখনই বিয়া করবার চাইছিলনা। হুট কইরা যখন বিয়াডা হইলই তখন বউরে বাড়িতে আইনা একটা অনুষ্ঠান করবার চাইছিলাম। কিন্তু আরমান রাজি হয়না। মাগো, এদিকে আসো, এইডা হইল কুসুম। আরমানের সাথে পড়াশোনা করত। কুসুমের বাড়ি পূর্ব পাড়ায়। হেয় পড়াশোনা শেষ কইরা চাকরি করতাছে। এইযে আমাগো বউমা, আমার মা। ” আয়েশা খানম মাশিয়াকে পরিচয় করালেন।

মাশিয়া কুসুমকে সালাম দিয়ে টুকটাক কথা বলতে থাকে।

” কি রে কুসুম, তুই কবে এসেছিস? গতপরশুই না তোর সাথে কথা হলো! তখন তো একবারও জানালিনা তুই বাড়ি আসছিস? ” আরমান বাড়িতে ঢুকে কুসুমকে দেখে চমকে গেছে।

” তুই ও তো আমাকে জানাসনি বিয়ে করেছিস? অথচ তোর জন্য আমি এতটা বছর অপেক্ষা করে গেলাম। ”

কুসুমের কথা শুনে মাশিয়ার বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। সেই সাথে রাগও হচ্ছে ভিষণ।

” ফাজলামো বাদ দিয়ে বল কবে এসেছিস? ”

” গতকাল দুপুরে। আর বাড়িতে এসেই জানলাম তুই বউ সমেত গ্রামেই আছিস। ”

” তোমরা কথা কও, মা। আমি তোমার জন্য আচার নিয়া আসি। ” আয়েশা খানম চেয়ার ছাড়লেন।

” বড়মা, আমি এখনই যাচ্ছিনা কিন্তু। তাই এত তাড়াহুড়ার কিছুই নেই। আগে আপনার ছেলে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইবে, এরপর ওর বউয়ের সাথে ভালোভাবে আলাপ করাবে, তারপর আমি যাব। ”

” তোমার আইজ যাওনের কাম নাই। তুমি আইজ আমার কাছেই থাইকো। আমি এখন আচার নিয়া আসি, তোমরা আচার খাও আর কথা কও। ” আয়েশা খানম নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।

” এইবার বল, নতুন জীবন কেমন লাগছে? আর তুই যে আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করেছিস এটা কি ঠিক করেছিস? ”

” পরিকল্পনা অনুযায়ী বিয়ে করলে তোকে অবশ্যই জানাতাম। হুট করেই সবটা ঘটে গেছে তাই জানাইনি। ”

” কিন্তু বিয়ের পরও জানাসনি। আরে ভাই, আমাকে না হয় বিয়ে না-ই করলি, তাই বলে নিজের বিয়ের খবর জানাবিনা? ধোঁকা খেলাম দোস্ত। কত স্বপ্ন দেখেছিলাম তোকে নিয়ে। কিন্তু নিমেষেই সব ছাই করে দিলি! সেই ক্লাস টেন থেকে অপেক্ষা করছি তোর জন্য। কিন্তু শেষে তুই কিনা পল্টি মারলি! আফসোস বিগ আফসোস। ”

কুসুমের কথা শুনে মাশিয়া ভেতরে ভেতরে জ্ব’ল’ছে। ও বুঝতে পারছেনা কেন এই মেয়েটা আরমানকে এভাবে বলছে, আর আরমানইবা কেন হাসিমুখে সব শুনছে।

” তোর না ট্রান্সফারের কথা চলছিল? কোথায় হচ্ছে ট্রান্সফার? ”

” রাজশাহীতে আসছি সামনের মাসেই। এবার থেকে প্রতিমাসেই তোর সাথে দেখা হবে, দোস্ত। বাই দ্য ওয়ে, তুই নাকি জব ছেড়েছিস? কিন্তু কেন? অন্য কোথাও ট্রাই করছিস নাকি? ” কুসুম আগ্রহভরে জিজ্ঞেস করল।

” সত্যিই শুনেছিস। তবে আপাতত কোথাও ট্রাই করছিনা। বর্তমানে কাউকে পথে আনার চেষ্টা করেই দিন পার করছি। সে পথে আসলেই কয়েক জায়গায় ট্রাই করব।”

আরমান আর কুসুম নিজেদের আলাপেই ব্যস্ত। ওদের পাশে যে মাশিয়া আছে সেটা ওরা দিব্যি ভুলে বসেছে। এভাবে বসে বসে ওদের আলাপ শুনতে মাশিয়ারও ভালো লাগছেনা। ওর হঠাৎই ভিষণ কান্না পাচ্ছে। কিন্তু কেন কান্না পাচ্ছে তা ও জানেনা। তাই অনেকটা নীরবেই সে বারান্দা থেকে নিজের ঘরে গিয়ে বই হাতে নেয়। আরমান আর কুসুম খেয়ালই করলনা মাশিয়া ওদের পাশে নেই।

বই হাতে নিলেও পড়ায় মন দিতে পারছেনা মাশিয়া। বুকের ভেতর কেমন যেন খচখচ করছে। মনে হচ্ছে বুকটা যেন ফাঁকা হয়ে গেছে। জানালা দিয়ে ও তাকায় আকাশের দিকে। বিকেলের নরম আলোয় ধরনী লজ্জারাঙ্গা বধূর ন্যায় মিইয়ে আছে। ঝিরিঝিরি শীতল বাতাস থেকে থেকে ঝাপটা দিচ্ছে আম্রশাখায়। আশেপাশে কোথাও হয়তো বৃষ্টি হয়েছে। শীতল বাতাসের সাথে বৃষ্টির ঘ্রাণ ভাসছে। উফ্ এখন যদি বৃষ্টি হত। তবে মাশিয়া উচাটন তনু-মন শীতল বৃষ্টির ধারায় শান্ত করত। বই বন্ধ করে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। নিচের কপাট হাট করে খুলে দিয়ে কপাটে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। সন্ধ্যা হতে আর দেরি নেই। আকাশে মেঘের আনাগোনা। সেই সাথে মেঘ জমেছে ওর মনের আকাশে। বাতাসের দাপটে মেঘগুলো খেই হারিয়ে ফেলছে। বাতাস একটু কমতেই আবার তারা একত্রিত হয়ে বৃষ্টি ঝরানোর পরিকল্পনা করছে। আচ্ছা, মেঘেদের কান্নাই কি বৃষ্টি হয়ে ধরনীর বুকে আছড়ে পরে? আর সেই বৃষ্টির পরশেই আমরা তনু-মন শীতল করে উথলিত হই? তবে কি মেঘেদের কান্নার সাথে আমাদের গভীর মিতালী? মাশিয়া অনেক খুঁজেও কোন উত্তর পায়না। ওর কপোল বেয়ে ঝরতে থাকে নোনা জল। কিন্তু কেন? অনেক হাতড়ে তার ও কোন উত্তর পায়না মাশিয়া। কোন কিছুর শীতল স্পর্শে চমকে উঠল মেয়েটা। বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়েছে ওর শরীর। মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে, ও টেরই পায়নি! বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাচ্ছে ওর নয়নের জল। মাশিয়া আজই প্রথমবার উপলব্ধি করল, বৃষ্টির জল আর চোখের জলের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। মেঘের দল কাঁদলে যেমন বৃষ্টি নামে ধরনীর বুকে, আবার নয়ন ঝরলেও বৃষ্টি নামে হৃদপুরে।

মাশিয়াকে আনমনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুধা এগিয়ে আসে ওর দিকে।

” ভাবি, তুমিতো ভিজে গেছ! কাপড় পাল্টে ফেল, নয়তো ঠান্ডা লাগবে। জানালা থেকে সরে দাঁড়াও আমি কপাট লাগিয়ে দেই। তোমার কি ভাইয়ার ধমক শুনতে ইচ্ছে করছে? ভাইয়া তোমাকে এই অবস্থায় দেখলে কি বলবে বুঝতে পারছ? ” মাশিয়াকে সরিয়ে দিয়ে জানালা বন্ধ করল সুধা।

মাশিয়া একমনে সুধাকে দেখছে। মেয়েটা একটু অন্যেরকম। সাদাসিধা এই মেয়েটার মনে কোন হিংসা নেই। মাশিয়ার সকল কথা অকপটে মেনে নেয় কোন প্রশ্ন ছাড়াই। মেয়েটা কাউকে আঘাত দিতে জানেনা। পড়াশোনায় ভিষণ মনোযোগী মেয়েটা ভাইয়ের কঠিন ভক্ত। মাশিয়া বেশ বোঝে এই মেয়েটা একদিন বড় কিছু হবে। ওর মত উচ্ছন্নে যায়নি মেয়েটা। এই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষকে মাশিয়ার ভালো লাগে। এরা কত সহজেই মাশিয়াকে আপন করে নিয়েছে। এরা যে কাউকে নির্দিধায় ভালোবাসা দিতে জানে।

” ভাবি, কি দেখছ এভাবে! তারাতারি কাপড় পাল্টাও। ভাইয়া ভেতরে আসলেই তোমার খবর আছে। ” মাশিয়াকে চুপচাপ থাকতে দেখে আবারও ডাক দেয় সুধা৷

” ভাই আর কি করবে! ভাইয়ের বোনই যেভাবে ধমকাচ্ছে তাতেই আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। ” মাশিয়া মৃদু হেসে বলল।

সুধা আর কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মাশিয়াও আলনার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। একটা থ্রিপিস হাতে নিয়ে কি মনে করে আবার রেখে দিল। এরপর আলমারির কাছে যায়। কিছুদিন আগেই আয়েশা খানম ছেলেকে বলে আলমারি আনিয়েছেন।
আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করে সুধাকে ডাক দেয়।

” আরমান, তোর বউ ঘর থেকে বের হয়না কেন? গল্প করাই হলোনা ওর সাথে। ”

” হয়তো পড়ছে। ওর পরীক্ষার আর দেরি নেই। তুই বরং ভেতরে গিয়ে ওর সাথে কথা বল। আমি ততক্ষণে হাতের কাজ সেরে নিই। ”

অসময়ে বৃষ্টি আসায় উঠানে থাকা সরিষাগুলো স্তুপ করে ঢেকে রাখা হয়েছে। আরমান বেরিয়ে যায় বাহিরের উঠানে। সেখানেও সরিষা স্তুপ করে রাখা আছে। এখন শুধু রোদের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সরিষা না শুকালে কোন কাজেই লাগবেনা।

” এই যে নতুন বউ, এভাবে ঘরের কোনে লুকিয়ে আছ কেন? আমি আসলাম তোমাকে দেখতে আর তুমিই এখানে চুপটি করে বসে আছ। ” কুমুস দরজায় দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে বলল।

” ভেতরে আসুন, আপু। ” নতুন বউ কথাটা কানে আসতেই মাশিয়ার শরীরে শিহরণ বয়ে যায়। সত্যিইতো ও নতুন বউ। তবে সেটা আজ পর্যন্ত ও উপলব্ধি করতে পারেনি। এই বাড়ির কেউ নতুন বউয়ের মত ট্রিট করেনি ওর সাথে। ওকে সব সময় এউ বাড়ির মেয়ের মতই রেখেছে।

” বাব্বাহ্ তুমি দেখছি শাড়ি পরেছ! বেশ লাগছে কিন্তু। এবার বুঝলাম আমার বন্ধুটি আমার এত বছরের ভালোবাসা পাত্তা না দিয়ে কেন তোমাকে বিয়ে করল। ”

” আপনারা একে অপরকে ভালোবাসতেন? ” হুট করেই জিজ্ঞেস করল মাশিয়া।

মাশিয়ার প্রশ্নে হা হা করে হেসে উঠল। হাসির দমকে ওর চোখে পানি এসে গেছে।

” তোমার আনরোমান্টিক জামাই কাউকে ভালোবাসবে! সে কখনো পড়াশোনা ছাড়া কিচ্ছুটি বোঝেনি। শোন মেয়ে, আরমান আমার খুব ভালো বন্ধু। একটা মানুষের জীবনে এমন একটা বন্ধু থাকা দরকার। তবে ওর সাথে সব সময়ই মজা করি বুঝলে? আসলে বন্ধুত্বে এমন একটুআধটু মজা হয়েই থাকে। ”

কুসুমের কথা শুনে হঠাৎ করেই শান্তি লাগলো মাশিয়ার। ও হাসিমুখে গল্প করতে থাকে কুসুম নামের মেয়েটির সাথে।

চলবে…