যেখানে দিগন্ত হারায় পর্ব-২৩+২৪

0
140

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_২৩
জাওয়াদ জামী জামী

ঘুম ভাঙ্গলে আরমানের বাহুবন্ধনে নিজেকে দেখেই ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় ঘুমন্ত আরমানকে।

” এই যে অসভ্য মাস্টার, নিজেকে তো সভ্য প্রমান করতে দিনরাত তৎপর থাকেন, এখন যে বেশ আরাম করে জড়িয়ে ধরে রয়েছেন আমাকে। আর দিব্যি বেঁচেও আছেন। গতরাতে যেন কি বলেছিলেন? আমাকে জড়িয়ে ধরা আর কিং কোবরা কিংবা ব্ল্যাক ম্যাম্বাকে জড়িয়ে ধরার সমান। কোথায় গেল আপনার সেই বড় বড় বাতেলা! ” মাশিয়ার ধাক্কায় জেগে উঠেই এমন আক্রমণাত্নক কথা শুনে আরমান বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।

এদিকে মাশিয়া একমনে বলেই চলেছে,

” নিজেকে সাধু প্রমান করতে মানুষ কতকিছুই বলে, তার জলজ্যান্ত প্রমান আপনি। এটাসেটা, হেন তেন, ব্লা ব্লা বলে নিজেকে ব্রক্ষ্মচারী দেখানোর চেষ্টা করেছে এতদিন। সে নিজে এমন অসভ্য কাজ করবে সেটাতে দোষ নেই, কিন্তু আমি অসভ্য বললেই দোষ! ”

এতক্ষণে আরমানের কাছে সবটা ক্লিয়ার হলো। আর সবটা মাথায় ঢুকতেই রাগে ওর শরীর কাঁপতে থাকে।

” ওহ আচ্ছা, এখন সব দোষ আমার? রাতে যে তুমিই নিষেধ করা স্বত্বেও আমার কলিজার ভেতর ঢুকছিলে সেটা কি কিছুই নয়? আমি কি তোমাকে একবারও বলেছিলাম, তুমি এসো, আমার কলিজায় এসে বসো? তুমি নিজে থেকেই আমার কলিজায় জেঁকে বসলে আবার আমাকেই ব্লেম করছ? তোমাকে বেয়াদব বললেও দুনিয়ার সকল বেয়াদবদের অপমান করা হবে। সরে বস, আমাকে বিছানা থেকে নামতে দাও। এখনই আমাকে কলপাড়ে যেতে হবে, পুরো শরীর সাবান দিয়ে ধুতে হবে। ভাবা যায়, সারারাত কিং কোবরার লেডিস ভার্সনকে জড়িয়ে রেখেছিলাম! তাইতো বলি আমার শরীর এত চুলকাচ্ছে কেন! কপাল ভালো আমার শরীরে এখন পর্যন্ত ফোস্কা পরেনি। ব্যাপারটা এতক্ষণে বুঝলাম। ” আরমান মাশিয়াকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

মাশিয়া বিছানায় বসে রাগে ফুঁসছে। ও যতবারই আরমানকে জব্দ করতে যায়, ততবারই ওর কাছে পরাজিত হয়। যা ওর জন্য চরম অপমানের। কিন্তু মাশিয়া হার মেনে নেয়ার পাত্রী নয়। ও যেকোন মূল্যেই আরমানকে শায়েস্তা করতে বদ্ধ পরিকর।

আয়েশা খানম বুঝতে পারেন তার ছেলে আর ছেলের বউয়ের মধ্যে কিছুই ঠিক নেই। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও যে ওদের মধ্যে নেই সেটাও তিনি আবিস্কার করেছেন। ওরা দু’জন দু’জনকে সহ্য করতে পারেনা এটাও তিনি বোঝেন। আয়েশা খানম সব সময়ই ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় থাকেন। ওদের দু’জনের মধ্যে এমন দা-কুড়াল সম্পর্ক চলতে থাকলে সংসার হবে কিভাবে? প্রশ্নটা আয়েশা খানমকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। তিনি এসব ভাবতে গেলেই চোখে অন্ধকার দেখেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে আরমানের সাথে কয়েকবার কথা বলতে চেয়েছেন, কিন্তু আরমান নানা অযুহাতে এড়িয়ে গেছে। আয়েশা খানম ভেবে পাননা কিভাবে তার ছেলে আর মাশিয়ার সম্পর্কের সমীকরণ বদলাবেন। তিনি তার ছেলেকে সুখী দেখতে চান। ছেলের মুখে হাসি ফোটাতে চান। কিন্তু কিভাবে কি করবেন সেটা ভেবে পাচ্ছেননা।

শশীর পরীক্ষা শেষ হয়েছে সাতদিন হয়। পরীক্ষা শেষ হতেই আয়েশা খানম মাশিয়াকে নিয়ে তার বাবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। গ্রামে আয়েশা খানমের ছোট ভাই থাকেন। তিনি গ্রামের স্কুলের শিক্ষক। তিনি বারবার আয়েশা খানমকে অনুরোধ করেছেন তিনি যেন মাশিয়াকে নিয়ে একবার গ্রাম থেকে বেরিয়ে যান। তাই শশীর পরীক্ষা শেষ হতেই তিনড শশী আর মাশিয়াকে নিয়ে বাবার বাড়িতে গিয়ে চারদিন থেকে এসেছেন।

নতুন ধানে ভরে গেছে বাহিরের উঠান। পনের জন মিলে সেসব ধানের মাড়াইয়ের কাজ করছে। আরমান ঘুরে ঘুরে কাজের তদারকি করছে। মাঝেমধ্যে সে-ও মজদুরদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। ওদের বাড়ির পাশ দিয়েই রাস্তা। সেই রাস্তায় পাশের দুই গ্রামের লোকজন চলাফেরা করে। ভ্যান, অটোরিকশা, বাইক হরদম চলাচল করে সেই রাস্তায়। বাহিরের উঠানে কাজ করার সময় রাস্তা দিয়ে গমনরত লোকজন সবই দেখতে পায়। বাহিরের উঠানে প্রবেশপথ ছাড়া সবটুকুই কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দেয়া।

মাশিয়া শশীর সাথে বাগানে গিয়ে আমড়া গাছে ঢিল ছুঁড়তে ব্যস্ত। বড় আমড়া গাছে থোকায় থোকায় মিষ্টি আমড়া ঝুলছে। শশী আমড়া নামানোর জন্য কাউকেই পায়নি, বিধায় ওরা ঢিল দিয়ে আমড়া নামানোর চেষ্টায় আছে।

মাশিয়া অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করেছে তিনটা মেয়ে রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে ওদের বাহিরের উঠানে উঁকিঝুকি মা’র’ছে। বাড়ির পশ্চিম দিকে বাগান। আরমানের বাড়ি পূর্ব-পশ্চিম লম্বা হওয়ায় বাহিরের উঠান, বাড়ি আর বাগানের পাশ ঘেঁষে যাওয়া রাস্তার পাশে কেউ দাঁড়ালেই বাগান থেকেও দেখা যায়, তেমনি বাহিরের উঠান থেকেও দেখা যায়। মাশিয়া শশীকে ইশারা করে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মেয়ে তিনটা হাসছে আর কথা বলছে। একজন আরেকজনকে ইশারায় কিছু একটা দেখাচ্ছে। আর সেটা দেখে মাঝখানের মেয়েটা লজ্জা পাচ্ছে। মাশিয়ার কেমন খটকা লাগলো। ও শশীকে বাগানে রেখেই দৌড়ে বাড়ির ভেতরে যায়। সেখান থেকে যায় বাহিরের উঠানে। সেখানে আরমান কয়েকজন মজদুরের সাথে কাজ করছে। পনেরোজন মজদুরের মাঝে স্লিভলেস খয়েরি রঙের টিশার্ট, ট্রাউজার পরিহিত আরমানকে দেখেই আলাদাভাবে চেনা যাচ্ছে। অচেনা যে কেউ ওকে দেখলে অতি সাধারণ বলে ভুল করবেনা। রোদ থেকে বাঁচতে মাথায় গামছা পেঁচিয়ে রেখেছে। কপাল কিংবা জুলফি বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পরলে মাথার গামছা খুলে ঘাম মুছে আবারও গামছাখানি মাথায় পেঁচিয়ে নিচ্ছে।

মাশিয়া বাহিরের উঠানে এসে এক পা দু পা করে এগিয়ে যায় রাস্তার দিকে। সেখান থেকে আরমানকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মাশিয়ার বুঝতে বাকি থাকলনা মেয়েগুলো কাকে দেখে এমন করছে। ও আবার ঘুরে বাড়ির ভেতর চলে আসে। কাজের ব্যস্ততায় আরমান এসবের কিছুই লক্ষ্য করলনা।

মাশিয়া বাগানে এসে আবারও কাঁটাতারের বেড়ার কাছে যায়। শশীও সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। মাশিয়া শশীকে কিছু না বলে মেয়েদের উদ্দেশ্যে জোরে শিষ বাজায়। পরপর কয়েকবার শিষ বাজাতেই মেয়েরা সেটা লক্ষ্য করল। মাশিয়া ওদের হাতের ইশারায় নিজের কাছে ডাকল। মাশিয়ার এভাবে ডাকায় মেয়েরা অপ্রস্তুত হয়ে গেছে। ওরা নিজেদের মধ্যে কিছু একটা বলাবলি করে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসল মাশিয়ার দিকে।

” বাচ্চারা, এভাবে কি দেখছিলে? যে বস্তুটিকে তোমরা পর্যবেক্ষন করছিলে, সেই বস্তুটি কিন্তু মোটেও সুবিধার নয়। সে একজন রিটায়ার মাস্টার। একজন অবলা, নিষ্পাপ ছাত্রীকে নির্যাতনের দায়ে তার মাস্টারির খেল খতম হয়েছে। তার থেকে দূরে থাক বুঝলে? নয়তো সেই বস্তুটি যদি তোমাদের এমন উঁকিঝুঁকি মা’র’তে দেখে তবে তিন রাস্তার মোড়ে নিয়ে গিয়ে তার স্পেশাল থেরাপি তোমাদের দিতে দুইবারও ভাববেনা। সে আবার ঐ থেরাপির স্পেশালিষ্ট। ”

মাশিয়ার কথা শুনে শশী খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। গত কয়মাসে মাশিয়ার সাথে ওর খুব ভাব হয়েছে।

এদিকে মাশিয়ার কথা শুনে মেয়ে তিনজনও হকচকিয়ে গেল। ওরা ইতিউতি করল কিছুক্ষণ। এরপর একজন মুখ খুলল,

” উনাকে দেখে মোটেও খারাপ বলে মনে হয়নি। গত দেড়মাস যাবৎ উনাকে আমরা দেখছি। উনি কখনোই আমাদের দিকে ভুল করেও তাকাননি।আপনি অযথাই তার নামে মিথ্যা বলবেননা। যে ছাত্রীকে তিনি নির্যাতন করেছিলেন, হয়তো সেই ছাত্রীই পাজি ছিল। মূল দোষী সেই ছাত্রীই ছিল। আজকাল ভালো মানুষের শত্রুর অভাব নেই। ”

মেয়েটির কথা শুনে মাশিয়া হা হয়ে গেছে। ওর চোখ রসগোল্লার আকার ধারণ করেছে। মেয়েটির কথার প্রত্যুত্তর করার মত কোন কথাই ওর মুখে জোগায়না।

” তুই ঠিকই বলেছিস, লামিয়া। ভাইয়াটা যা হ্যান্ডসাম। আবার তাকে দেখলেও মনে হয় সে খুব ভদ্র। কোন ভদ্র মানুষ কাউকে নির্যাতন করতেই পারেনা। রাকিবের সাথে তার কত পার্থক্য দেখেছিস? রাকিব তোর পেছনে দিনের পর দিন ছ্যাঁচড়ার মত ঘুরেছে, তুই পাত্তা না দিলেও তোকে বিরক্ত করেছে। কিন্তু এই ভাইয়া মোটেও তেমন নয়। তার চাকরি হয়তো সেই শাঁকচুন্নি ছাত্রীর জন্যই গেছে। ” মাশিয়াকে অবাক করে আরেকটা মেয়ে বলল।

মাশিয়া এবার তেড়ে যায় মেয়েগুলোর দিকে। ওদের মাঝে কাঁটাতারের বেড়া না থাকলে মেয়েগুলোর আজ খবর ছিল। মাশিয়াকে তেড়ে আসতে দেখে মেয়েরা হতভম্ব হয়ে গেছে। পরিস্থিতি নাগালের বাইরে যেতে দেখে এগিয়ে আসল শশী।

” শোন আপুরা, এতক্ষণ তোমরা যাকে উঁকিঝুঁকি মে’রে দেখছিলে সেই ব্যাক্তিটি আসলে ইনার সম্মানিত জামাই। যেই ছাত্রীকে কথিত নির্যাতনের দায়ে তার চাকরি গেছিল, সেই ছাত্রীই ইনি। এবার বুঝেছ কাহিনী? ”

শশীর কথা শুনে মেয়েরা সেখানে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায়না। ওরা চলে যেতেই শশী পেট ফাটানো হাসিতে মত্ত হলো। মাশিয়া ওকে টেনে বাড়ির ভেতর নিয়ে আসল।

মাশিয়া বাড়ির মূল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ওর দৃষ্টি আরমানের দিকে। আরমান কাজের ফাঁকে লক্ষ্য করল মাশিয়া ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ও মাশিয়ার দিকে তাকায় কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতে। ঠিক তখনই মাশিয়া ওকে চোখ মারল। আরমানের আর কিছু জিজ্ঞেস করা হয়ে উঠলনা। ও এদিকওদিক তাকিয়ে কাজে মন দেয়।

চলবে…

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_২৪
জাওয়াদ জামী জামী

সুধার পরীক্ষা শেষ হয়েছে কয়েকদিন আগেই। এবার মাশিয়ার পরীক্ষা শুরু হবে। আরমান ওর বন্ধুকে এক রুমের একটা ফ্লাটের ব্যবস্থা করতে বলেছে। কিন্তু মিরাজ মোর্তাজা চাইছেন তার মেয়ে জামাই তার বাড়িতে এসে উঠুক। তবে আরমান সেই কথায় রাজি হয়না। ও মাশিয়াকে নিয়ে আলাদা ফ্ল্যাটেই উঠবে। পরীক্ষা শেষ হওয়া অব্দি সেখানেই থাকবে।

আয়েশা খানম গোছগাছ শুরু করেছেন। তিনি ঘানি ভাঙ্গানো সরিষার তেল, আটা-ময়দা, আতপ চাল, পোলাওর চাল, মসুর ডাল, ধনে কাঁচা আমসহ নিজেদের জমির অনেক কিছুই প্যাক করেছেন। এত কিছু প্যাক করতে দেখে অবাক হয় মাশিয়া।

” আম্মা, এসব কি করছেন? এত কিছু নিয়ে কিভাবে যাব? এ কিছুর দেয়ার কোন প্রয়োজন ছিলনা। ”

” তোমার কোন চিন্তা নাই, মা। আমার বাপ মাইক্রো ভাড়া করছে। তোমরা শুধু জিনিসগুলান দেইখা নিবা। আর ঢাকায় পৌঁছায়ই বেয়াইকে ফোন দিবা। বেয়াই নিয়া যাইব। মেয়ের বাড়ির জিনিস দেইখা তিনি খুশি হইব দেইখা নিও। ”

মাশিয়া বুঝল তার শ্বাশুড়িকে মানানো যাবেনা। তাই ও আর কথা বাড়ায়না।

রাতে ব্যাগ গোছাচ্ছে মাশিয়া। দেখে দেখে কাপড় তুলছে ব্যাগে।

” কাপড় নিতে গিয়ে বই নেয়ার কথা ভুলে যেওনা। বই, নোটস সব দেখেশুনে তুলে নাও। আমাকে তোমার জন্য যেন দৌড়াদৌড়ি করতে না হয়। ”

” নিজের চরকায় তেল দিন। আমার যা যা প্রয়োজন সবই নিব। ”

আরমান কিছু না বলে নিজের ব্যাগ গোছাতে শুরু করল।

পরদিন সকালে ওরা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। বিকেলেই পৌঁছে যায় কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায়। সেখানে আরমানের বন্ধু ওদের অপেক্ষায় ছিল। তার কাছ থেকে চাবি নিয়ে ওরা ফ্ল্যাটে আসে।

প্রায় আধাঘন্টা পর মিরাজ মোর্তাজা স্ত্রী’কে নিয়ে আরমানের ফ্ল্যাটে আসলেন। কল্পনা মোর্তাজা সাথে করে খাবার নিয়ে এসেছেন। মাশিয়া বাবা-মা’কে দেখে উচ্ছ্বসিত হলোনা। বাবা-মা’র প্রশ্নের দায়সারা উত্তর দিয়ে নিশ্চুপ থাকল। কল্পনা মোর্তাজা আরমানকে খাবার কিনতে কিংবা বাসায় রান্না করতে নিষেধ করে দিলেন। আরমানরা যতদিন ঢাকায় আছে, তিনি ততদিনই খাবার পাঠিয়ে দেয়ার কথা বললেন। আরমান তার প্রস্তাবে রাজি হয়না। কিন্তু শ্বশুর-শ্বাশুড়ির জেদের কাছে হার মানতে হয় ওকে। তাদের অনুরোধ আরমান ফেলতে পারলনা।

আরমান বাড়ি থেকে নিয়ে আসা জিনিসপত্র কল্পনা মোর্তাজাকে দিলে তিনি ভিষন খুশি হলেন। রাত দশটার দিকে তারা বিদায় নিলেন।

অনেক দিন পর ভার্সিটিতে পা রেখে আবেগে কেঁদে ফেলল মাশিয়া। যেন কতকাল দূরে ছিল ওর প্রিয় এই অঙ্গন থেকে। এই কয়মাসে ঢাকা শহর অনেকটাই বদলে গেছে। তেমনি বদলেছে ওর প্রিয় এই ক্যাম্পাস। এতদিন পর ওকে দেখে ভয়ে অন্যরা রাস্তা ছেড়ে দাঁড়ালোনা কিংবা কেউ কোন প্রকার সম্ভাষণও করলনা। যেন ওর কোন অস্তিত্বই ভার্সিটিতে নেই।

” দোস্ত তুই এসেছিস! কতদিন পর তোকে দেখছি! কেমন আছিস তুই? ” কোথায় থেকে তৃষা দৌড়ে এসে মাশিয়াকে জড়িয়ে ধরল। ওর চোখ ছলছল করছে।

” বেইব, তুমি এসেছ? তোমাকে কত্ত মিস করেছি জানো? তুমি নাকি আমার ক্রাশকে বিয়ে করে তার সংসার করছ! কিভাবে পারলে, বেইব! তুমিতো জানতে আমি আমার আরু বেইবিকে কত ভালোবাসি? ” তৃষার পেছনে এসে দাঁড়ায় মিতুল। ও হাঁপাচ্ছে। দোতলা থেকে মাশিয়াকে দেখে ওরা দৌড়ে নিচে এসেছে।

আজ মাশিয়ার মিতুলের ওপর মোটেও রাগ হয়না। এতদিন পর বন্ধুদের দেখে ওর মুখে হাসি ফুটেছে।

” বেইব, তুমি চিন্তা করোনা, তোমার আরু বেইবি তোমারই আছে। সে ভার্সিটির বাহিরে আছে প্রয়োজনে তার সাথে গিয়ে কথা বলে সবকিছু ফিটিং করতে পার। এতে তারও সুবিধা আর তুমিও পথে আসতে পারবে। ”

” তুমি একথা বলছ কেন, বেইব? আমি আমার আরু বেইবির সাথে কথা বললে তার কিসের সুবিধা? ” মিতুল বুঝতে না পেরে বলল।

” তুমি যেমন ন্যাকু, সে-ও তেমনি অসভ্য মাস্টার। নিয়মকরে তিনবেলা থাপড়ে সে তোমার ন্যাকামি ছুটিয়ে দেবে। তখন জীবনেও তুমি আর তোমার আরু বেইবির নাম মুখে আনবেনা। আর তাকে অযথাই আরু বেইবি আরু বেইবি বলে ডেকে নিজের এনার্জি লস করোনা। সে রোমান্টিক মেটেরিয়াল নয়। জন্মের পর তার আম্মা তার মুখে মধু না দিয়ে নিম পাতার রস দিয়েছিলেন। তাই তার আপ টু বটম তিতা। বাই দ্য ওয়ে, জয় কোথায়? এই ন্যাকু এখানে আছে, কিন্তু জয় ওর আশেপাশে নেই এটা মানা যাচ্ছেনা। ”

” বেইব, জয়কে একটু ক্যান্টিনে পাঠিয়েছি। ও এক্ষুণি চলে আসবে। চল আমরা রুমে গিয়ে বসি। ”

” দোস্ত, তুইতো ভার্সিটির রাস্তা চিনিস, তবুও স্যার কেন তোর সাথে এসেছে? কেমিস্ট্রি বুঝলামনা। ”

” এই কেমিস্ট্রি বোঝার মত বয়স, বুদ্ধি কোনটাই তোর হয়নি। আর আমিও এই বিষয়ে নাদান। তাই কথা না বাড়িয়ে রুমে চল। ” তিন বান্ধবী মিলে দোতলার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।

আরমান ভার্সিটির সামনের একটা দোকানে বসে আছে। সেখানে পরিচিত কয়েকজনের সাথে দেখা হলে তাদের সাথে গল্প করে বেশ কিছু সময় কাটায়। এরপর মাশিয়া পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে আসলে ওকে নিয়ে ফ্ল্যাটের দিকে রওনা দেয়।

মাশিয়ার পরীক্ষা বেশ ভালোই হচ্ছে। আরমান ওকে নিয়মিত পড়াচ্ছে। যেহেতু রান্নার ঝামেলা নেই তাই আরও পড়ানোর সময় পাচ্ছে। বাসা পরিষ্কার পর্যন্ত মাশিয়াকে করতে দিচ্ছেনা। মাশিয়াকে দিনরাত বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকতে হচ্ছে। অবশ্য এতে ও অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আগেরমত ফাঁকিবাজি করেনা। মন দিয়ে পড়াশোনা করে।

ওরা পনের দিন হয় ঢাকায় এসেছে। কল্পনা মোর্তাজা অনেকবার আরমানকে তাদের বাসায় যেতে বললেও আরমান রাজি হয়নি। ওর একটাই কথা মাশিয়াকে ঠিক না করে ও কিছুতেই সেখানে যাবেনা। এদিকে মাশিয়াও একবারও ঐ বাড়িতে যাওয়ার কথা বলেনি। মাশিয়ার ভাই তার স্ত্রী’কে নিয়ে দুইদিন এসেছিল আরমানের ফ্ল্যাটে।

” বই রেখে খেয়ে নাও। আজ রাত এগারোটার মধ্যে যতটুকু সম্ভব পড়ে নিও। কালকে পরীক্ষা তাই আজকে আর রাত জাগতে হবেনা। কাল ভোরে উঠে যতটুকু বাকি থাকবে পড়ে নিও। ”

আরমান প্লেটে করে খাবার এনে মাশিয়াকে ডাক দেয়। আজকে ও বাহিরে থেকে খাবার এনেছে। বিকেলেই কল্পনা মোর্তাজাকে ফোন দিয়ে খাবার পাঠাতে নিষেধ করেছিল। মাশিয়া কথা না বলে বই বন্ধ করে উঠে পরল।

” হেই সুইটি, হোয়াট আ সারপ্রাইজ! তুমি ঢাকায় আছ, অথচ আমি জানিনা! কেমন আছো ডার্লিং? বড্ড মিস করেছি তোমাকে। আজকে তোমাকে ছাড়ছিনা। তোমাকে নিয়ে আজ লং ড্রাইভে যাব। পার্টি হবে আজ তোমার সৌজন্যে। আজ শুধু চিল করার দিন। চল এখনই বেরিয়ে পরি। ” রিশাদ যেন আরমানকে দেখেও দেখলনা।

ভার্সিটিতে ঢুকতেই রিশাদের সাথে দেখা হয় মাশিয়ার। হঠাৎ রিশাদ সামনে আসায় মাশিয়া চমকে উঠল। আরমান রিশাদকে দেখে চোয়াল শক্ত করে।

” মাশিয়া, তোমার পরীক্ষা শুরু হতে আর দেরি নেই। এখনই পরীক্ষার হলে না গেলে তুমি অনেক বড় ভুল করবে। ”

মাশিয়া আরমানের কথা শুনে রিশাদকে কিছু বলার সাহস করে উঠলনা। ও আরমানের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পেরেছে আরমান ভিষণ রেগে গেছে।

” সরি রিশাদ, আজ আমি কোথাও যেতে পারবনা। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পরীক্ষা শুরু হবে। আজ এমনিতেও বাসা থেকে বের হতে দেরি হয়েছে। তোমার সাথে পরে কথা বলব। এখন আমি যাই। ”

মাশিয়া রিশাদকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দৌড়ে ভার্সিটিতে ঢুকে যায়। আরমান ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। এরপর সামনের দোকানে গিয়ে বসল।

সেদিনের পর থেকে প্রতিটি পরীক্ষার দিনই রিশাদ ভার্সিটির সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রতিবারই সে মাশিয়াকে নিয়ে বাহিরে যেতে চায়। কিন্তু মাশিয়া একবারও রিশাদের প্রস্তাবে রাজি হয়না। আরমান ওদেরকে কিছু না বলে সবটা চুপচাপ দেখে যায়।

” মাশিয়া, তুমি মমের ওপর এত রাগ করেছ? কতদিন ধরে আমাকে মম বলে ডাকোনি তুমি। আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি, সোনা। তুমি আমাদের ওপর আর রাগ করে থেকোনা। একটিবার বাসায় চল। তুমি আরমানকে বললে ও না করতে পারবেনা। ” কল্পনা মোর্তাজা মাশিয়ার দু হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। মা’য়ের চোখে পানি দেখে অপ্রস্তুত হয়ে যায় মাশিয়া।

” মম, প্লিজ কেঁদোনা। কান্নাকাটি আমার মোটেও ভালো লাগেনা। তুমি বাসায় যাও। আমার সব গোছগাছ করতে হবে। কাল সকালেই গাড়ি আসবে। রাতেই সবকিছু গুছিয়ে ফেলতে হবে। এখন কোথাও যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর তাছাড়া ঐটা আমার নিজের বাড়ি নয়। আমি ঐ বাড়িতে কয়েক বছরের অতিথি ছিলাম মাত্র। তাই এখন সেখানে গিয়ে তোমাদের বিরক্ত করতে চাইছিনা। ”

মাশিয়ার এহেন রূঢ় আচরণে কল্পনা মোর্তাজা এবার হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। ভাগ্যিস আরমান বাসায় নেই। নয়তো আজ তাকে আরমানের সামনে লজ্জায় পরতে হত। কল্পনা মোর্তাজা অনেক বুঝিয়েও মাশিয়াকে রাজি করতে পারলেননা। আরমান বাসায় আসলে তিনি বিদায় নিলেন।

পরদিন খুব সকালে মিরাজ মোর্তাজা স্ত্রী’কে নিয়ে আবার আসলেন মেয়ের কাছে। মাহিন আর দোলনও এসেছে তাদের সাথে। ততক্ষণে মাশিয়া সব গুছিয়ে নিয়েছে। তারা তৈরী হয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে।

মিরাজ মোর্তাজা বাসায় ঢুকেই মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি মাশিয়াকে অনেক কথাই বললেন। কিন্তু মাশিয়া বাবার কথায় তেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়না। আরমান দূর থেকে সবকিছুই লক্ষ্য করল। মাশিয়া ওর ভাই-ভাবীর সাথেও তেমন একটা কথা বললনা। আরমান খুব ভালো করেই বুঝল মাশিয়ার রাগ এখনও কমেনি।

চলবে…