যেখানে দিগন্ত হারায় পর্ব-৩৫+৩৬

0
141

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_৩৫
জাওয়াদ জামী জামী

খাবার টেবিলে বসে সবাই খাচ্ছে। মিরাজ মোর্তাজা মেয়ের প্লেটে ওর পছন্দের খাবার তুলে দিচ্ছেন। মাশিয়া খেতে না চাইলেও মিরাজ মোর্তাজা ওকে ধমকে খাওয়াচ্ছেন। দোলন আঁড়চোখে সব পর্যবেক্ষন করছে। ও মাশিয়াকে কিছু বলার জন্য ছটফট করছে। তবে শ্বশুর-শ্বাশুড়ি থাকায় একটু ইতস্তত করছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে অবশেষে বলেই ফেলল,

” মাশিয়া, তুমি এ বাড়িতে এসেছ অনেকদিন হলো ।ঐ বাড়ির লোকজনের সঙ্গে তোমার কথা হয়? তোমার শ্বশুর বাড়ি থেকে তোমার কোন খোঁজ নিয়েছে? নাকি একবারে চলে এসেছ বলে তারা হাঁফ ছেড়েছে? আর তোমাকেও বলি, এত রাগ দেখানোর কি হয়েছে! মন চাইল আর সেখান থেকে চলে আসলে? একবারও ভাবলেনা, এতে এই পরিবারের ওপর কি প্রভাব পরবে? তাদের কত জায়গায় হেয় হতে হবে? ”

দোলনের কথা শুনে মিরাজ মোর্তাজা ও কল্পনা মোর্তাজা স্তব্ধ হয়ে গেছেন। দোলনের এই রূপ তাদের কাছে অচেনা। তারা দোলনকে থামানোর চেষ্টা করলেন।

” দোলন, এসব কি বলছ তুমি! চুপচাপ খেয়ে নাও। এত কথা কিসের? মেয়েটা খাচ্ছে সেটা তোমার চোখে পরছেনা? খাওয়ার সময় এসব কথা না বললেনই নয়? আর মাশিয়া কোনটা করবে কোনটা করবেনা সেটা আমরা বুঝব। তোমাকে এসব নিয়ে না ভাবলেও চলবে। ”

কল্পনা মোর্তাজা আজ প্রথমবার দোলনের ওপর রেগে উঠলেন। কিন্তু এতে দোলনের কোনও হেলদোল নেই। মাহিনেরও তাই। ও আপনমনে খেয়েই চলেছে। যেন কোন কিছুতেই ওর যায় আসেনা। মিরাজ মোর্তাজা ছেলের এরূপ নির্বিকার দেখে হাসলেন।

” আম্মু, ভাবতে আমাকে হবে। যেটা ভাবার কথা আপনাদের সেটা যদি আপনারা না ভাবেন তবে সেই দ্বায়িত্ব কাউকে না কাউকে নিতে হবেই। তাছাড়া আজ প্রথমবার এই বাসায় মাশিয়া খাচ্ছেনা। এর আগেও খেয়েছে, আর এখন ওকে যেমন দেখছি মনে হচ্ছে ভবিষ্যতেও খাবে। তাই ওর খাওয়া নিয়ে না ভেবে, ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবুন। ”

” স্টপ ইট, প্লিজ। ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন, আমি আমার পাপার বাড়িতে আছি এবং তারটাই খাচ্ছি। আমি কি করব না করব সেটা আমিই বুঝব। আমার ভাবনা তোমাকে ভাবতে কে বলেছে? একান্তই যদি কেউ আমার বিষয়ে ভাবে, তবে সেটা আমার পাপা-মম করবে। ” মাশিয়া রেগে খাবার টেবিল থেকে উঠে গেল।

কল্পনা মোর্তাজা গমনরত মাশিয়ার দিকে তাকিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠলেন। মিরাজ মোর্তাজা প্লেটে আঁকিবুঁকি করছেন। তিনি দোলনকে কিভাবে বলবেন , তিনি আর কল্পনা মোর্তাজা আরমান আর আয়েশা খানমের সাথে কথা বলেছেন। মাশিয়া এখানে আসার পরই তিনি আরমানকে ফোন দিয়েছিলেন। আরমান একটা কথা বলেই ফোন রেখেছিল সেদিন। কথাটা ছিল, ” মাফ করবেন, আমার জীবনে মাশিয়া নামক কোন নারীর অস্তিত্ব নেই। আজই তার অস্তিত্ব মুছে ফেলেছি চিরতরে। ”

বাধ্য হয়ে তিনি আয়েশা খানমকে ফোন করেছিলেন। আয়েশা খানমও জানিয়েছিলেন, তিনি ছেলের সিদ্ধান্তের বাহিরে কিছুই করতে পারবেননা, যতই তিনি মাশিয়াকে ভালবাসুন না কেন।
মিরাজ মোর্তাজা মাশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। এই বাসায় মাশিয়ার আগামী দিনগুলো যে খুব ভালো কাটবেনা সেটা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।

কল্পনা মোর্তাজা রুমে এসে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। আরমান মাশিয়াকে ত্যাগ করেছে, এই কথা তিনি সবাইকে কিভাবে বলবেন! তিনি ছুটে গিয়েছিলেন সুধার কাছে। সুধাও তাকে ওর ফ্ল্যাটে যেতে নিষেধ করেছে। সাুধা জানিয়েছে, আরমান চায়না মাশিয়ার বাড়ির কারও সাথে সুধা কিংবা ওর পরিবারের কোনও সম্পর্ক থাকুক। সুধার কাছে থাকা মেইডকেও সুধা ফেরত পাঠিয়েছে এই বাসায়। মোটকথা, আরমান নিজের জীবন থেকে মাশিয়াকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। এবং ওর সংসারে যাওয়ার সকল পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে।

রুমে এসে মাশিয়া কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকল। আশ্চর্যজনক হলেও ওর দোলনের ওপর এখন মোটেও রাগ হচ্ছেনা। রাগ হচ্ছে নিজের ওপর। কেন যেন ওর ভিষণ কান্না পাচ্ছে। মনের কোনে মেঘ জমেছে। তারা ঝরে পরতে প্রস্তুত। মাশিয়ার দুচোখ ভাসিয়ে তারা অনর্গল ঝরতে শুরু করল।

সেদিন সারাদিন মাশিয়া রুম থেকে বের হলোনা। নিজেকে বদ্ধ ঘরে আটকে রেখে শাস্তি দিয়ে শান্তি খুঁজছে।

পরদিন সকালে মাশিয়া ভার্সিটির উদ্দেশ্য বের হল। কল্পনা মোর্তাজা মাশিয়াকে ভার্সিটিতে যেতে দেখে চিন্তায় পরে গেলেন। তার চিন্তার একমাত্র কারণ হলো রিশাদ।

মাশিয়াকে দেখে তৃষা, মিতুল, জয় হৈ হৈ করে উঠল। চারপাশ থেকে মাশিয়াকে জড়িয়ে ধরল।

” দোস্ত, কি সারপ্রাইজ দিলি! হঠাৎ করে তুই আসবি আমরা ভাবতেও পারিনি। স্যার কোথায়? তাকে দেখছিনা যে? ” তৃষা এদিক ওদিক তাকিয়ে আরমানকে খোঁজার চেষ্টা করল।

তৃষার মুখে ‘ স্যার ‘ ডাক শুনে মাশিয়ার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। কিন্তু সকল অনুভূতিকে মাটি চাপা দিয়ে খেঁকিয়ে উঠল,

” কেন আমি কি একা আসতে পারবনা? আমার কি একা আসা বারণ? সব সময়ই কেন আমার পাশে ঐ অসভ্য মাস্টারকে থাকতে হবে? তাকে ছাড়াও আমি পথ চলতে পারি, এটা তোরা জানিসনা? এখন থেকে আমি একাই ভার্সিটিতে আসব। তোরা আর কখনোই ঐ অসভ্য মাস্টারের নাম মুখে আনবিনা। ”

মাশিয়াকে রাগতে দেখে ওরা কেউ কিছু বললনা। তবে ওরা বুঝল মাশিয়া আর আরমানের মধ্যে কিছু একটা ঘটেছে।

মাশিয়া নিয়মিত ক্লাস করছে। ভার্সিটি থেকে বাসায় এসে মন দিয়ে পড়াশোনা করছে। পারতপক্ষে ও দোলনের সামনে যাচ্ছেনা। তবে দোলন সুযোগ পেলেই ওকে দু-চার কথা শুনিয়ে দেয়। মাশিয়া সেসব মুখ বন্ধ করে সহ্যও করে। কল্পনা মোর্তাজা প্রতিবাদ করতে গেলেই দোলন তাকেও অপমান করতে ছাড়েনা। মোর্তাজা ভিলা এখন মাশিয়ার কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ধীরে ধীরে মানুষ চিনতে শিখছে ও।

ক্লাস থেকে বেরোতেই রিশাদের মুখোমুখি হয় মাশিয়া। রিশাদ ওকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে আসল।

” হেই বেইবি, হোয়াট আ সারপ্রাইজ! তুমি ভার্সিটিতে এসেছ! কিন্তু তুমি ঢাকায় কবে এসেছ? আমাকে জানাওনি কেন? তুমি ঢাকায় এসেছ কিন্তু আমাকে জানাওনি! খুব কষ্ট পেলাম, বেইবি। ”

আজ প্রথমবার রিশাদের এহেন কথায় বিরক্ত হয় মাশিয়া। ও রিশাদকে এড়িয়ে যেতে চাইলে রিশাদ ওর হাত ধরল।

” হাত ছাড়, রিশাদ। এটা কোন ধরনের অসভ্যতা? ” এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নেয় মাশিয়া।

” বেইবি, আগেও তোমার হাত আমি বহুবার ধরেছি। তখনতো এমন রিয়্যাকশন দাওনি? তবে আজ কেন? আচ্ছা বাদ দাও, চল আমরা দূরে কোথাও আউটিংএ যাই। সেখানে শুধু তুমি আর আমি থাকব। খুব মাস্তি করব দু’জন। ”

রিশাদের কথায় অন্য কিছুর ইঙ্গিত। যেটা মাশিয়াও ধরতে পেরেছে। কিন্তু মাশিয়া এটা নিয়ে কোন উচ্যবাচ্য করলনা। সময় হঠাৎ করেই ওকে যেন বদলে দিয়েছে। ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে।

” সরি রিশাদ, আমি কোথাও যেতে পারবনা। ফোর্থ সেমিস্টার শুরু হতে দেরি নেই। আমাকে পড়তে হবে। ” মাশিয়া মনেপ্রাণে চাইছে এখন এখানে কেউ আসুক। রিশাদের থেকে নিস্তার পেতে চাইছে ও।

” ফোর্থ সেমিস্টার শুরু হবে আরও দুইমাস পর। তুমি পড়ার অনেক সময় পাবে। আর একদিন বাহিরে গেলে তোমার পড়াশোনার তেমন কোন ক্ষতি হবেনা। প্লিজ সুইটি, চলোনা। দূরে কোথাও যাই। ” রিশাদ নাছোরবান্দার ন্যায় মাশিয়াকে বিরক্ত করতে থাকে।

” ও জাস্ট শাট আপ, রিশাদ। আমি কি বলেছি সেটা তুমি শুনতে পাওনা? নাকি বুঝতে পারছনা? ভুলে যেওনা আমি ম্যারিড। তোমার সাথে যেখানে সেখানে বেড়াতে যেতে পারিনা আমি। ” কথাটা বলেই মাশিয়া ঠোঁট কামড়ে নিচে তাকালো। উত্তেজনার বশে কি বলে ফেলল ও! যে সম্পর্ক থেকে নিজেই বেরিয়ে এসেছে, আজ সেই সম্পর্কের দোহাই দিয়েই রিশাদকে আটকাচ্ছে! কেন এমন করল? অনেক চেষ্টা করেও উত্তর পায়না মাশিয়া।

” এমন ভাব করছ যেন সতীসাবিত্রী তুমি! মনে হচ্ছে আমার সাথে আগে কোথাও যাওনি? আমার বন্ধুবান্ধবদের সাথে মিলে পার্টিও করেছ, সেখানে ড্রিংকও করেছ। কিন্তু সেই তুমিই আবার বিয়ের দোহাই দিচ্ছ! তা-ও যদি তোমার হাসবেন্ডের সংসার করতে। শুনেছি তাকে ছেড়ে চলে এসেছ। তবে এত এ্যাটিটিউড দেখাও কেন? এক কথায়, তুমি এখন সেকেন্ডহ্যান্ড জিনিস। তুমি চাইলে যেখানে খুশি সেখানে যেতে পার বাঁধা দেয়ার কেউ নেই। আমিও তোমার সাথে যা খুশি তাই করতে পারি, তুমিও বাঁধা দিতে পারবেনা। শুনে রাখ, অন্যের ছুঁড়ে ফেলা জিনিসদের এত এ্যাটিচিউড থাকতে নেই। ”

রিশাদ কথা শেষ করতেই পারলনা মাশিয়া ওর গালে সজোরে থাপ্পড় মারল। রাগে ফুঁসছে মাশিয়া। সব ভেঙে গুড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। পরপর কয়েকটা থাপ্পড় মেরে ক্ষান্ত দেয়।

” ইউ বাস্টার্ড, তোমার সাহস বেড়ে গেছে দেখছি। কান খুলে শুনে রাখ, মাশিয়া যেই পরিস্থিতিতেই থাকুক না কেন সে সব সময়ই মাথা উঁচু করে বাঁচতে জানে। তোমার মত থার্ড ক্লাস ছেলের সাথে বন্ধুত্ব করেছিলাম এটাই তোমার সাত পুরুষের কপাল। তোমার সাথে যেভাবে বন্ধুত্ব করেছিলাম সেভাবেই তোমাকে ছুঁড়ে ফেলতে পারি এটা মাথায় ঢুকিয়ে নাও। তোমাকে পায়ের নিচে পিষে মারতে আমার দুই মিনিট লাগবে মাত্র। ভবিষ্যতে নিজের লিমিট ক্রস করবেনা আশা করছি। আর যদি ভুল করেও সেটা কর, তবে তোমার পরিনতি খুবই জঘন্য হবে। ”

কাঁপতে কাঁপতে মাশিয়া গাড়ির কাছে আসে। কিছুতেই ওর রাগ কমছেনা। গাড়িতে বসতেই ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিল। হাতের ব্যাগ ছুঁড়ে মারল গাড়ির মেঝেয়। সিটে শরীর এলিয়ে দিল। কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকল। আজকের আগে আরমান ওকে থাপ্পড় মেরেছে, ঝাড়ি দিয়েছে। কিন্তু এমন নিচু কথা কখনোই বলেনি ওকে। না চাইতেও কষ্টের নোনাজল ঝরতে থাকল ওর আঁখিকোন বেয়ে।

চলবে…

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_৩৬
জাওয়াদ জামী জামী

” ভাইয়া, তুমি কি অফিসে যাচ্ছ? ”
মাহিন বাসা থেকে বের হতে গেলে মাশিয়া পেছন থেকে বলল।

” হুম। কিছু বলবি? ”

” আমাকে একটু ভার্সিটিতে নামিয়ে দেবে, ভাইয়া? তুমি তো ঐ পথেই অফিসে যাবে। আমার গাড়ি সার্ভিসিংয়ে আছে৷ ”

” তুমি একাই যাও। তোমার ভাইয়ার অন্য কাজ আছে। ও সেসব কাজ সেড়েই তবে অফিসে যাবে। তোমার তো গাড়ি আছেই। নিজের গাড়ি সার্ভিসিংয়ে আছে তো কি হয়েছে ! বাসায় আরও দুইটা গাড়ি আছে। সেগুলোর একটাতে যাও। অযথা মাহিনের সাথে যেতে চাও কেন? বাজে অভ্যাস ছাড়। ” মাহিন কিছু বলার আগেই দোলন বলে উঠল।

” দোলন, ওদের ভাইবোনের মধ্যে তুমি কেন কথা বলছ? মাশিয়া মাহিনের সাথে যেতেই পারে। এখানে তোমার কথা বলার কোন কারণ তো আমি দেখছিনা। মাহিন, তুমি মাশিয়াকে ভার্সিটিতে নামিয়ে দাও। ” আজ আর কল্পনা মোর্তাজা চুপ থাকলেননা।

” কথা বলার অধিকার আছে জন্যই বললাম, আম্মু। মাহিন আমার স্বামী। তাই স্ত্রী হিসেবে মাহিনের যে কোন বিষয়ে কথা বলার অধিকার আমি রাখি। ” দোলনও দমে যাবার পাত্রী নয়।

” তুমি যেমন মাহিনের স্ত্রী, মাশিয়াও তেমনি মাহিনের বোন। তোমার সাথে মাহিনের সম্পর্ক এক বছরের কিছু বেশি, কিন্তু মাশিয়ার সাথে ওর সম্পর্ক বাইশ বছরের। তাই সব জায়গায় সম্পর্কের সমীকরণ দেখাতে এসোনা। আর মাহিন, আজ আমার মনে হচ্ছে আমি ছেলে মেয়ে কাউকেই মানুষ করতে পারিনি। তোমার সামনে তোমারই বোনকে অপমানজনক কথা বলছে তোমার স্ত্রী। কিন্তু তুমি ওর কাজে কোন প্রতিবাদ না করে চুপ থাকছ। যেটা সে আগেও করেছে। এটা তোমার কাছে আশা করিনি মোটেও। মাশিয়া এই বাসায় ওর অধিকারে থাকছে। তোমার যেমন এখানে অধিকার আছে, মাশিয়ারও তেমনি আছে। কিন্তু এরপরও ওকে তোমার স্ত্রী নানানভাবে হেনস্তা করছে। আমি প্রতিবাদ করতে গেলে আমাকেও সে অপমান করছে। তোমার কাছে কি মনে হয়, এসব সে ঠিক করছে? ” আজ কল্পনা মোর্তাজা চুপ করে থাকলেননা। মাহিন চুপচাপ মা’য়ের কথা শুনছে। ইচ্ছে করছে মা’য়ের কথার প্রত্যুত্তর করতে, কিন্তু কোন এক অজানা কারনে চুপ থাকল।

” আম্মু, আপনি আমাকে এভাবে বলতে পারেনননা। নিজের মেয়ে ঘর সংসার ছেড়ে এসেছে। আপনি তাকে না শাসন করে আমাকে কথা শোনাচ্ছেন? আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইছেন? কেমন মা আপনি? পারলে নিজের মেয়েকে শাসন করুন, অন্যের মেয়েকে কথা না শুনিয়ে। এভাবে চলতে থাকলে আমাকে এই বাসা ছাড়তে হবে। ” দোলন আজ মনের ভেতরের চাপা রাগ উগড়ে দিচ্ছে।

” বউমা! আমি কি তোমাকে নিজের মেয়ের মত দেখিনা? মানছি মাশিয়া সংসার ছেড়ে চলে এসে অন্যায় করেছে। কষ্ট পেলেও আমরা গোপনেই সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু তুমি সেটা না করে পদে পদে আমার মেয়েকে অপমান করেই চলেছ। তুমি কি বাড়ির বউয়ের দ্বায়িত্ব, কিংবা বড় ভাবীর দ্বায়িত্ব একবারের জন্যও পালন করেছ? আমার মেয়েটা তো কখনোই তোমাকে অসম্মান করেনি। আজ এতকিছুর পরও ও চুপচাপ আছে। তোমার এই মনমানসিকতা যদি আজীবন থাকে তবে ভবিষ্যতে তুমি ছেলে বউ হয়েই থাকবে। মেয়ের মর্যাদা পাবেনা। তুমি শান্তি পেয়েছ, মাহিন? তোমার স্ত্রী কি সুন্দর তোমার মা-বোনকে অপমান করছে! অথচ এতদিন তাকে আমি বুকে করে রেখেছিলাম। ওর মা’য়ের অভাব বুঝতে দেইনি। আজ তার প্রতিদান পেলাম। ”

” মম, প্লিজ আমার জন্য তুমি ভাবীকে কষ্ট দিওনা। আমি জানি, আমি তোমার ভালো মেয়ে নই। ভালো নই জন্যই সব ছেড়ে এসেছি। কিন্তু ভাইয়া তোমার আদর্শ সন্তান। ভাইয়াকে এভাবে বলোনা। ভাইয়ার কষ্ট আমি সহ্য করতে পারবোনা। আর ভাইয়া যদি এই বাসা থেকে বেরিয়ে যায়, তবে আমি নিজেকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবনা। আমি এরপর থেকে ভাইয়াকে আর বিরক্ত করবনা, মম। সরি, ভাইয়া। আমার জন্য তোমার দেরি হয়ে গেল। তুমি অফিসে যাও। ভাবি, আমি সরি। আমার জন্য তোমার অসুবিধা হয়। এরপর থেকে তোমার অসুবিধা হয় এমন কোন কাজ করবনা। ” মাশিয়া চোখ মুছে বাসা থেকে বেরিয়ে আসল। ওর এসব আর ভালো লাগছেনা।

মাহিন কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর মুখ খুলল৷

” আম্মু, তোমরা মাশিয়াকে বেশি আদর দিয়ে ওর ভবিষ্যৎটাই খারাপ করে দিয়েছ। ও যখন বাসায় ফিরে আসল, তখনতো এটলিস্ট তোমরা ওকে শাসন করতে পারতে। ওকে আরমানের কাছে ফিরে যেতে ফোর্স করতে পারতে। কিন্তু সেটা না করে তোমরা ওকে প্রশ্রয় দিচ্ছ। অলরেডি সোসাইটিতে কানাঘুষা শুরু হয়েছে। একেক জন একেক কথা বলছে। কতজনের মুখ আমরা বন্ধ করব? তুমি সেসব না ভেবেই দোলনকে দোষী করছ। দোলনতো ভুল কিছু বলেনি। আমার স্ত্রী হিসেবে ওর ও বলার অধিকার আছে। তোমরা ওকে দোষী সাব্যস্ত করলে, নিজেকে প্রটেক্ট করার অধিকার ওর আছে। ”

মাহিনের কথা শুনে কল্পনা মোর্তাজা কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। তার শান্তশিষ্ট , ভদ্র ছেলে এসব কি বলছে! যে ছেলে বোন অন্তপ্রান ছিল, আজ সেই ছেলে বোনের দিকেই আঙুল তুলছে! কয়েক ফোঁটা অশ্রুকনা ঝরে পরল কল্পনা মোর্তাজার চোখ বেয়ে। তিনি সযতনে অশ্রুকনা মুছলেন। তার চোখের পানিকে তিনি মূল্যহীন করতে চাননা। যারা চোখের পানির মূল্য দিতে জানেনা, তাদের সামনে কাঁদার কোন মানেই হয়না। তিনি আঁচলে চোখমুখ মুছলেন। এরপর তাকালেন মাহিনের দিকে। এবার সময় এসেছে সংসারের রাশ টেনে ধরার। তিনি বুঝতে পারছেন সংসারের রাশ দোলনের হাতে থাকলে এই বাড়িতে তাদের স্থান হবেনা।

” ভালো বলেছ, বেটা। তোমার আব্বুও যদি অতীতে এমন ভাবত। তবে আমাকে যৌথ পরিবারে বাস করতে হতোনা। শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সেবা করতে হতোনা। বিয়ের ত্রিশ বছর পরও দেবর-ননদের নিয়ে মিলেমিশে থাকতে হতোনা। সব দোষ তোমার আব্বুর। সে-ও যদি তোমার মত চিন্তা করত, তবে আজ আমি তোমাদের নিয়ে একক সংসার সাজাতাম। একার সংসারে তোমাদের নিজের সাফল্যের গল্প শোনাতাম। তবে এসবের জন্য তোমার আব্বুর নিকট কৃতজ্ঞ আমি। তার আত্নকেন্দ্রীক চিন্তার জন্যই আমি একটা সুন্দর সংসার পেয়েছি। শ্বশুর-শ্বাশুড়ির ভালোবাসা পেয়েছি। দেবর-ননদদের শ্রদ্ধা পেয়েছি। যেটা তোমাদের ভাগ্যে নেই। আসলে সবার ভাগ্যে এমন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জোটেনা। তুমি অফিসে যাও। এরপর বেশি দেরি হয়ে গেলে তোমার স্ত্রী আবার বাসা ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দেবে। ” কল্পনা মোর্তাজা সোজা নিজের রুমে চলে গেলেন। এতক্ষণ মিরাজ মোর্তাজা নিজের রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে সবটা শুনছিলেন।

বাসার সব মেইডরাও এতক্ষণ মাহিন আর দোলনের কথা শুনছিল। এমন একটা আদর্শ পরিবারে অশান্তির অনল দেখে তারাও স্তব্ধ হয়ে গেছে।

আরমান চিটাগং বাসা নিয়েছে। শশীর ট্রান্সফারের কথা চলছে। ট্রান্সফারে অনেক ঝামেলা হচ্ছে। সম্ভবত খুব তারাতারি ট্রান্সফার করানো যাবেনা। তাই আরমান শশীর কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছে। ট্রান্সফার না হওয়া পর্যন্ত শশী চিটাগংই থাকবে। সেখানেই কোচিং করবে। পরীক্ষার সময় কলেজে গিয়ে পরীক্ষা দেবে। আয়েশা খানমকে বলে আরমান ওদের সব জমিজমা বর্গা চাষ করতে দিয়েছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই আরমান গ্রামে এসে মা-বোনকে নিয়ে চিটাগং যাবে।

মাশিয়া আজকাল কেমন শান্ত হয়ে গেছে। প্রয়োজন ছাড়া তেমন একটা কথা বলেনা। রুম ছেড়ে প্রয়োজন ছাড়া বের হয়না। চোখের নিচে কালি পড়েছে। শুকিয়েছে বেশ খানিকটা।
আজ ভার্সিটি থেকে এসে নিজের রুম থেকে বের হয়নি। দুপুরের খাবারও খায়নি। কল্পনা মোর্তাজা ওকে ডাকতে এসে দেখলেন, সবগুলো জানালা হাট করে খোলা, বেলকনির দরজাও খোলা। মাশিয়া মেঝেতে সটান হয়ে শুয়ে আছে। ওর চোখ বন্ধ। মনে হয় ঘুমাচ্ছে। মেয়েকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে কল্পনা মোর্তাজার কপালে ভাঁজ পড়ল। এই গরমে এসিও বন্ধ রেখেছে মেয়েটা। কল্পনা মোর্তাজা এসি অণ করে জানালাগুলো বন্ধ করলেন। এরপর গিয়ে বসলেন মাশিয়ার মাথার কাছে। ওর মাথায় ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। বেশ কিছুক্ষণ পর চোখ মেলে তাকাল মাশিয়া। ওর বিষন্ন চোখদুটো অনেক কিছুই বলছে।

” এভাবে নিচে শুয়ে আছ কেন, সোনা? সেই কখন ভার্সিটি থেকে এসেছ। খাবে কখন? ওঠ ফ্রেশ হয়ে খেতে চল। ”

” আমি খুব খারাপ একটা মেয়ে তাইনা, মম? ” কল্পনা মোর্তাজার কোলে মাথা রাখল মাশিয়া।

” মোটেও না। তুমি একটু জেদি। এর বেশি কিছু নও। ” নরম গলায় বললেন কল্পনা মোর্তাজা।

” সব মা’য়ের কাছেই তাদের সন্তানরা ভালো হয়। তাদের কোন দোষ থাকেনা। তুমিও তার ব্যাতিক্রম নও। আমার এত অন্যায়ের পরও তুমি বলছ আমি তেমন খারাপ নই। এটা অন্য কাউকে বলতে যেওনা। ”

” মাশিয়া। ”

” হুম, মম। ”

” আরমানের সাথে কথা বল। ওকে সরি বল। ওর কাছে ফিরে যাও। তুমি রিকুয়েষ্ট করলে ও ফেলতে পারবেনা। ” ইতস্তত করে অবশেষে বলেই ফেললেন কল্পনা মোর্তাজা।

” তুমিও আমার ওপর বিরক্ত হয়ে গেছ, মম! আর দেড়টা বছর আমাকে সহ্য কর। পড়াশোনা শেষ করে একটা চাকরি জুটিয়ে নেব। তারপর একটা বাসা দেখে তোমাদের মুক্তি দিয়ে সেখানেই চলে যাব। আমি প্রমিজ করছি মম, এই দেড় বছর তোমাদের একটুও জ্বালাবোনা। আমার নামে কোন অভিযোগ শুনতে হবেনা তোমাদের। ”

” বিবাহিতা মেয়েদের কাছে তার স্বামীই সবকিছু। তার সংসারই তার কাছে জান্নাত। একটা মেয়ে যদি ভালো পরিবার পায়, সৎ স্বামী, মাতৃসমা শ্বাশুড়ি, বোনের মত পায় তবে সত্যিই সেই সংসার তার কাছে জান্নাতের স্বরূপ। যেটা তুমি পেয়েছিলে। আর রাগ করে থেকোনা, সোনা। ভুল যখন তুমিই করেছ, তবে সেটা তোমাকেই শোধরাতে হবে। এখনও সময় আছে ফিরে যাও। এই যে আমি তোমাকে সেখানে যেতে বলছি তারমানে এই নয় যে তুমি আমাদের বোঝা। আমরা চিন্তা করি তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে। একটা মেয়ের জীবনে স্বামী যে কতবড় অবলম্বন সেটা বোঝা যায় তখনই, যখন সমাজে সে একা হয়ে যায়। স্বামীই নারীদের পরম বন্ধু, উত্তম সঙ্গী, শেষ বয়সের আশ্রয়স্থল। তোমার যখন সেই আশ্রয়স্থল না থাকবে, তুমি তখনই বুঝবে এই সমাজে বেঁচে থাকা কত কঠিন। হাজারো লোলুপ দৃষ্টি থেকে বেঁচে চলতে হবে তোমাকে। হাজারো অপমান সইতে হবে। পদে পদে অসম্মান হতে হবে। এটাই বাস্তবতা। তাই আবারও বলছি ক্ষমা চাও আরমানের কাছে। ”

কল্পনা মোর্তাজার কথাগুলো শুনে ডুকরে কেঁদে উঠল মাশিয়া। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেছে। কল্পনা মোর্তাজা মেয়েকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। অনেকক্ষণ পর মাশিয়ার কান্না থামল।
ও চোখ মুছে উঠে বসল। তবে এখনও ওর হেঁচকি উঠছে।

” আমি কোথাও যাবনা, আম্মা। ঐ অসভ্য মাস্টারের কাছেতো নয়ই। ঐ অসভ্য মাস্টার আমাকে অনেক অপমান করেছে। ”

মেয়ের কথা শুনে কল্পনা মোর্তাজা হাসলেন। মাশিয়া বুঝতেও পারেনি কথার মধ্যেই ও নিজের মা’কে আম্মা ডেকেছে। তিনি বুঝতে পারছেন তার মেয়ের মন-মস্তিস্কে মিশে গেছে ঐ পরিবারের মানুষগুলো।

চলবে…