যেখানে দিগন্ত হারায় পর্ব-০৪

0
144

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_৪
জাওয়াদ জামী জামী

” হেই ইউ, এদিকে এসো। তোমাদেরই বলছি, এদিকে এসো। ”

মাশিয়া বন্ধুদের সাথে ক্যাম্পাসের আড্ডা দিচ্ছিল। একটু পরই ও সেইদিনের মেয়েগুলোকে দেখতে পায়। যাদের জন্য সে আরমানের কাছে থাপ্পড় খেয়েছিল। মাশিয়ার গলা শুনে মেয়েরা
ভয় পায়। ওরা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসল মাশিয়ার দিকে।

” জ, জ্বি আপু। কিছু বলবেন? ” ভয়ে ভয়ে জানতে চায় একজন।

” আমাকে প্রশ্ন করার সাহস কোথায় থেকে পাও! এই তিনদিনেই দেখছি আকাশে উড়তে শুরু করেছ! বাই দ্য ওয়ে, সেদিন যেন আমরা কোথায় ছিলাম? উমমম্ তোমাদের মধ্যে কেউ একজন আমাদের নাচ দেখাচ্ছিলে, রাইট? ” মাশিয়ার কথা শুনে সেই মেয়েরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।

” বেইব, তুই কি করতে চাচ্ছিস? মাই গড, তুই কি আজও এদের নাচ দেখবি! আরু কিন্তু সেদিন র্যাগ দিতে মানা করে দিয়েছিল। এমনটা করিসনা, বেইব। ” মিতুল অনুনয় করল। এই মুহুর্তে ওর আরমানের সামনে নিজেকে নেগেটিভ রূপে প্রকাশ করার ইচ্ছে নেই।

” এই তুই থামবি। যতসব ন্যাকা এসে জুটেছে আমার গ্যাং এ। কে বলেছে, এদের র্যাগ দেব? আমিতো আজ এদের থেকে গান শুনব, আবৃত্তি শুনব। এরা সিনিয়রদের প্রপোজ করবে সেটা দেখব। ” মাশিয়ার কথা শুনে ফাঁকা ঢোক গিলল মেয়েরা।

” আপু, আমাদের ছেড়ে দিন প্লিজ। একটু পর আমাদের ক্লাস শুরু হবে। ক্লাসে যেতে দেরি হলে স্যার রাগ করবেন৷ ”

” কথা না বলে চুপচাপ বস। আর একে একে আমাদের ইংলিশ গান শোনাও। এরপর থার্ড সেমিস্টারের রিয়াদ নামের প্লে গার্ল আসলে তাকে প্রপোজ করবে। সে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এদিক দিয়ে যাবে। ইয়োর টাইম ইজ স্টার্ট নাউ। গার্লস হারি আপ। আমরা ওয়েট করছি। গান শুরু কর। ” মাশিয়া কথার ফাঁকেই মেয়েদেরকে জোর করে বসিয়ে দেয় পাশ থেকে তৃষা, জয়ের নিষেধ শুনলনা।

” প্লিজ আপু, আমাদের ছেড়ে দিন। এক্ষুনি ক্লাসে যেতে হবে। ” একজন মেয়ে কেঁদে ফেলার উপক্রম হলো।

” বুঝতে পেরেছি তোমাদের বোধহয় কানে ধরে ওঠবস করার ইচ্ছে হয়েছে। ওকে তোমাদের চাওয়া আমি পূরন করব। প্রত্যেকেই একশোবার কানে ধরে ওঠবস করবে। আর কোন অযুহাত আমি শুনতে চাইনা। ”

মাশিয়ার কথা শুনে মেয়েরা কেঁদে ফেলল। আজকে আরেকবার ক্যাম্পাস ভর্তি স্টুডেন্টদের সামনে অপমানিত হতে হবে ভেবেই লজ্জায় মাথাকা’টা যাচ্ছে। এদিকে মাশিয়া ওদের তাগাদা দিচ্ছে। কোন উপায় না দেখে তারা মাশিয়ার কথামত ওঠবস করার জন্য প্রস্তুত হয়। তারপরও মনে মনে ওরা চাইছে সেদিনের সেই স্যার এসে ওদের উদ্ধার করুক।

” হেই গাইজ, হোয়াটস আপ? ” পরিচিত গলার আওয়াজ পেয়ে মাশিয়া মেয়েদের থেকে চোখ সরিয়ে নেয়।

” হেই ডুড , কেমন আছো? এখানে এসে দেখ মুভির রিল শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। আই থিংক তুমি উপভোগ করবে পুরো বিষয়টা। ” মাশিয়া আগত ছেলেটিকে বলল।

” বেইবি, রাখো তোমার মুভির রিল। এব রিল দেখে মন ভববেনা। আজকে পার্টি হবে পার্টি। ব্যাপক মাস্তি হবে ইয়ার। তোমার সব ফ্রেন্ডদের ইনভাইট কর। আজকে পুরো রাত আমরা চিল করব। ”

” ওহ ম্যান, তুমি এমনভাবে বলছ যেন এসব কিছুইনা। আগে আগে দেখো হোতাহে কেয়া। মাশিয়াকে কি তোমার কাঁচা খেলোয়াড় মনে হয়, রিশাদ? ”

” নো বেইবি, তুমি এক্কেবারে পারফেক্ট। এই রিশাদ শুধু তোমার ওপর ফিদা। আর রিশাদের পছন্দ নিশ্চয়ই যেনতেন হবেনা? তাই তুমি কাঁচা খেলোয়াড় এটা আমি স্বীকার করতে পারিনা কিছুতেই। তো এবার বল রাতে পার্টিতে যাচ্ছতো? হেই গাইজ, তোমরাও যাবে কিন্তু। জয় তুমি বিকেলেই যাবে। ”

মাশিয়া ইশারায় মেয়েগুলোকে চলে যেতে বললে, মেয়েরা দেরি না করে সেখান থেকে কে’টে পরল। আর মাশিয়া ব্যস্ত হয়ে যায় তার বন্ধুদের নিয়ে।

” এইযে ভায়া, গতকাল নাকি আপনি বেশ নাকানিচুবানি খেয়েছেন? আগেই বলেছিলাম মাশিয়ার থেকে দূরে থাকবেন। ও যা খুশি করুক। মেয়েটা খুব জিদ্দি। ” তুষারের কথায় তার দিকে তাকায় আরমান।

” তাই বলে একজন বেয়াদবি করবে আমি সেটা মুখ বুজে সহ্য করব! মাশিয়াত সেদিন যেটা করেছিল সেটা অন্যায়। তাই আমি প্রতিবাদ করেছি। ”

” এর ফলও আপনাকে নিয়ম করে চুকাতে হবে। ওর গ্যাং সম্পর্কে আপনার ধারনা নেই। ওর গ্যাং বিশাল আর ওরা খুব খারাপ। তার মধ্যে একজন আমাদের ভিসি স্যারের ভাতিজা রিশাদ। এই ছেলেটা সাক্ষাৎ শয়তান। আপনার ভাগ্য ভালো এতদিন ওরা আপনার কাছে কৈফিয়ত চাইতে আসেনি। আর ওদের কৈফিয়ত মানেই জঘন্য ধরনের শাস্তি। তাই বলছি আপনি ওদের কাছ থেকে যতটুকু দূরে থাকা যায় থাকবেন। ”

” আপনি আমাকে সাবধান করছেন না ভয় দেখাচ্ছেন? সাবধান করতে চাইলে আপনাকে মোষ্ট ওয়েলকাম। কিন্তু ভয় দেখাতে চাইলে আমি বলব, ভয় আমি কাউকেই পাইনা। কেউ আমার কাছে কৈফিয়ত চাইতে আসলে তার পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেব। সে যতই ভিসি স্যারের ভাতিজা হোকনা কেন। ”

” আপনার সাহস দেখে আমি রীতিমত অবাক হয়ে যাচ্ছি, আরমান। স্বীকার করতেই হবে আপনার সাহস আছে। তবে তারপরও আমি বলব আপনি সাবধানে থাকবেন। ”

” ধন্যবাদ আমাকে নিয়ে চিন্তা করার জন্য। ” আরমান আর তুষার কথা বলতে বলতে ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে যায়।

” মাশিয়া, বিকেলে তৈরী থেক। আমরা মাহিনের জন্য মেয়ে দেখতে যাব। ” মাশিয়া ভার্সিটি থেকে কেবলই বাসায় ঢুকেছে, তাকে দেখেই কল্পনা মোর্তাজা বললেন।

” সরি মম, আমি কোথাও যেতে পারবনা। আজকে রিশাদ একটা পার্টি এ্যারেঞ্জ করেছে, আমাকে সেখানে থাকতে হবে। ” মাশিয়া রুমের দিকে পা বাড়ায়।

” তোমার একমাত্র ভাইয়ের জন্য পাত্রী দেখতে তুমি যাবেনা! তোমার কাছে পার্টিই বড় হল? বেয়াদবির একটা লিমিট থাকা দরকার, মাশিয়া। তুমি দিনকে দিন লিমিট ক্রস করছ। কোন পার্টিতে তুমি যাচ্ছনা। তুমি আমাদের সাথে গাজীপুর যাচ্ছ। ”

” সরি মম, আমি তোমার কথা রাখতে পারছিনা। পার্টিতে আমাকে যেতেই হবে। আমার ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাই যাচ্ছে সেখানে। আজকে তোমরা গিয়ে দেখে এস, পরে একদিন আমি ভাইয়ার সাথে যাব। ”

” পড়াশোনা করার বেলায় অষ্টরম্ভা, কিন্তু পার্টির নাম শুনলেই নেচে ওঠ। তোমার লজ্জা করেনা দুই বছরেও সেকেন্ড সেমিস্টার পাশ করতে পারছনা? তোমার জন্য আমি আর তোমার বাবা প্রতিনিয়ত লজ্জা পাই। তার নিজের ভার্সিটিতে নিজের একমাত্র মেয়েই পাশ করতে পারেনা, এটা কোন বাবার জন্য কতবড় লজ্জার সেই ধারনা তোমার আছে? জুনিয়রদের সাথে ক্লাস করছ, এটা তোমার একবারও খারাপ লাগেনা? শুধু তোমার বাবার জন্যই এতদিন তোমাকে ভার্সিটি থেকে বের করে দেয়নি। তাই বলছি সময় থাকতেই নিজেকে পরিবর্তন কর। আর রিশাদের মধ্যে কি এমন দেখেছ যে তার পার্টিতে না গেলে তোমার জাত যাবে? ” আজ কল্পনা মোর্তাজা কিছুতেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেননা।

” আমার পড়াশোনা ভালো না লাগলে কি করব, মম! কোন কিছুতেই বাঁধতে ইচ্ছে করেনা নিজেকে। আমি মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় থাকতে ভালোবাসি। তাই একটু আড্ডামাস্তি করি। আর এজন্য নিজের একমাত্র মেয়েকে তুমি বেয়াদব বলতে পারলে! তুমি আমার মম নও। তুমি নিষ্ঠুর একজন নারী। তবে শুনে রাখ নিষ্ঠুর নারী, রিশাদ শুধুই আমার ফ্রেন্ড। ওর ভেতর আলাদাভাবে কিছুই দেখতে পাইনি। ”

” পড়াশোনা করতে না চাইলে বিয়ে দিই। শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে সংসার কর। এতে তোমার পাপাও ভালো থাকে আর আমিও ভালো থাকি। আর তুমিও রিশাদের জাল থেকে মুক্তি পাও। ”

” তোমার কি মনে হয়, আমি রিশাদের জালে জড়িয়েছি! আমি মানছি আমি তোমার ভাষায় উশৃংখল, বেয়াড়া, বেয়াদব। কিন্তু আমি চরিত্রহীনা নই, মম। আমার আড্ডামাস্তি ভালো লাগে তাই ওদের সাথে মিশি। আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোন কাজ কেউ আমাকে দিয়ে করাতে পারেনি আর পারবেওনা। ওদের সাথে আমি নিজের ইচ্ছেয় মিশি, ওদের ইচ্ছেয় নয়। ”

” তার মানে তুমি গাজীপুর যাচ্ছনা? ”

” হুম। ”

” ওকে। এরপর থেকে কখনোই কোন কাজে তোমাকে ডাকবনা। নিজের রুমে যাও। আর বাহিরে থেকে খেয়ে না আসলে ফ্রেশ হয়ে খেতে এস। ” কল্পনা মোর্তাজা আর সেখানে দাঁড়ালেননা। তবে তিনি মনে মনে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন। মাশিয়াকে যত তারাতারি সম্ভব বিয়ে দেবেন। কারও কোন কথা তিনি শুনবেননা।

চলবে…