যেখানে দিগন্ত হারায় পর্ব-০৯

0
150

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_৯
জাওয়াদ জামী জামী

” মাশিয়া, তোমাকে আগেও বলেছি, এখনও বলছি গাজীপুর গিয়ে কোনওরকম বেয়াদবি করবেনা। রিশাদওতো যাচ্ছে। ওর সাথে কোথাও যাবেনা। মাহিনের কাছেই তুমি থাকবে। আমি চাইনি তুমি রিশাদকে ডাক। কিন্তু যখন ডেকেই ফেলেছ, তখন তোমার কোনরকম বেয়াদবি আমি মেনে নিবনা। ” কল্পনা মোর্তাজার কথা শুনে মাশিয়া তার দিকে ঘুরে তাকায়। বরযাত্রার জন্য রেডি হচ্ছিল মাশিয়া। ও পার্লারে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু কল্পনা মোর্তাজা বাসায়ই বিউটিশিয়ান ডেকেছেন। তিনি চেষ্টা করছেন মাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার।

” মম, আজকের দিনেও তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলবে! তুমি কি সত্যিই আমাকে পর করে দিলে! রিশাদ আমার ফ্রেন্ড। আর আমার ফ্রেন্ডদের ভাইয়ার বিয়েতে ইনভাইট করবনা এটা কেমন করে হয়! ”

” মিতুল, তৃষা, জয়ও তোমার ফ্রেন্ড। কিন্তু ওদের ইনভাইট করতে, গাজীপুর নিয়ে যেতে আমি তোমাকে মানা করিনি। আমার শুধু রিশাদে আপত্তি। বুঝতে পেরেছ? তাই বলছি, গাজীপুর গিয়ে একদম ভদ্র মেয়ে হয়ে থাকবে। তোমার কারনে তোমার বাবার অসম্মান হলে, তোমার কি হবে সেটা ভেবে দেখবে। ” কল্পনা মোর্তাজা মাশিয়ার রুম থেকে বেরিয়ে আসলেন। মাশিয়ার সাথে এভাবে কথা বলতে তার মোটেও ভালো লাগছেনা। আর মাশিয়াও তার এরূপ আচরণে কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু তিনি নিরুপায়। মাশিয়াকে ঠিক করতে হলে এতটুকু তাকে করতেই হবে।

কল্পনা মোর্তাজা বেরিয়ে যেতেই মাশিয়া ডুকরে কেঁদে উঠল। মা’য়ের এরূপ পরিবর্তন ও মানতে পারছেনা। যে মা ছোটবেলা থেকে কখনো ওকে ফুলের টোকা দেয়নি, সেই মা কয়দিন থেকেই ওর সাথে রাগ ঝাড়ছে। আরও একবার সবকিছুর জন্য মাশিয়া আরমানকে দায়ী করল।

ছেলের রিসিপশনে আরমানকে আশা করেছিলেন মিরাজ মোর্তাজা। কিন্তু আরমান সেখানে আসেনি। আয়েশা খানম হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায় তাকে নিয়ে ডক্টরের কাছে গিয়েছিল আরমান। তাই সে রিসিপশনে যেতে পারেনি। কিন্তু মিরাজ মোর্তাজা সেই খবর জানলেননা। আরমানের অনুপস্থিতি তাকে কষ্ট দেয়।

বেশ কিছুদিন পর মাশিয়া ভার্সিটি এসেছে। ও বেরোনোর আগে কল্পনা মোর্তাজা বারবার বলে দিয়েছেন মন দিয়ে ক্লাস করতে, নিজেকে সংযত রাখতে। মাশিয়াও মা’য়ের কথায় সায় দিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে আসে।

” ডুড, চল আজকে সিনেপ্লেক্সে যাই। অনেকদিন ধরে মাস্তি করা হয়না। ” মাশিয়া আর ওর গ্যাং ক্লাসেই বসে বসে বিভিন্ন প্ল্যান করছে। তখনই মাশিয়া বলল।

” বেইবি, আর পনের মিনিট পর আমার আরু বেইবির ক্লাস আছে। তার ক্লাস মিস দিয়ে আমি কোথাও যাবনা। ” মিতুল ন্যাকা স্বরে বলল।

” থাক তুই তোর বেইবিকে নিয়ে। কালকে পারলে তোর বেইবির জন্য ফিডিং বোতল নিয়ে আসিস। আর সাথে সেরেলাকও আনিস। তোর বেইবির ক্ষুধা লাগলে খাওয়াস। পারলে কয়েকটা স্যালাইনও আনিস। সারাদিন লেকচার দিয়ে তার এ্যানার্জি কমে যায়। এতে করে সে শরীরে শক্তি পাবে। যত্তসব ফাউল পোলাপান। এই তৃষা, তুই আর জয় আমার সাথে চল। এই মিতুলের বাচ্চা থাকুক তার বুইড়া বেইবির কাছে। ” মাশিয়ার রা’গ তরতরিয়ে বাড়ছে।

” মিতুলের বলার মধ্যে হয়তো ভুল আছে, কিন্তু ওর কথার মর্মার্থ ঠিকই আছে। স্যারের ক্লাস করলে আর অন্য কোনও স্যারের কাছে পড়তে যাওয়ার দরকার পরেনা। সে নিজের সাবজেক্ট ছাড়াও, অন্য সাবজেক্ট বুঝিয়ে দেয়। কোথাও সমস্যা হলে ঠিক করে দেয়। এখন কোথাও যাবনা, দোস্ত। ইনফ্যাক্ট পুরো ক্লাস করেই তবে বাহিরে যাব। একজন শিক্ষক হিসেবে সত্যিই তার তুলনা নেই। ” তৃষার কথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে মাশিয়া।

” তুই এই কথা বলছিস! যে মানুষ আমাকে ভার্সিটি ভর্তি স্টুডেন্টদের সামনে চরম অপমান করেছে, তারই পক্ষ নিয়ে কথা বলছিস তুই? আমার অপমানে তোর কিছুই যায় আসেনা তাইনা, তৃষা? তুই আজ নিজের বন্ধুত্বের প্রমান দিয়েই দিলি। চাইনা আমার তোদের মত বন্ধু। ”

” প্লিজ মাশিয়া, বোঝার চেষ্টা কর। এখানে তোর ভবিষ্যৎও জড়িয়ে আছে। এবার একটু মনযোগ দিয়ে পড়াশোনা কর। সেকেন্ড সেমিস্টারে ভালো রেজাল্ট কর এটাই আমরা চাই। সবাই আমাদের ওপরে ওপরে ভয় পায় যেমন , ঘৃণাও কিন্তু করে ততোধিক। এভাবে আর কতদিন? এবার একটু নিজের দিকে নজর দে। আংকেল, আন্টি তোকে নিয়ে সব সময়ই চিন্তায় থাকে। মাহিন ভাইয়ার বিয়েতে গিয়ে আন্টির কান্না দেখে নিজের কাছেই ছোট হয়ে গেছি। একটা মা কতটা আঘাতে ঐভাবে কাঁদে সেটা আমি সেদিনই বুঝতে পেরেছি। তুই…. ।” জয় কথা শেষ করতে পারলনা। আরমানকে দেখে থেমে যায়।

” ক্লাসের অলরেডি দশ মিনিট লেইট হয়েছে। এবং এটা আমার কারনেই হয়েছে। এজন্য আমি সরি বলছি। তো পড়া শুরু করা যাক। ”

আরমান পড়াতে শুরু করল। কিন্তু মাশিয়ার সেদিকে নজরই নেই। ও আপনমনে খাতায় আঁকিবুঁকি করছে। ইগনোর করছে আরমানকে। কিন্তু ওর দিকে আরমানের নজর ঠিকই পৌঁছেছে।

” ক্লাসে মনযোগ দিতে না পারলে বাহিরে গিয়ে দাঁড়ান। এক্সকিউজ মি, আপনাকেই বলছি মাশিয়াত বিনতে মোর্তাজা। বাহিরে গেটের পাশে গিয়ে ক্লাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকুন। ”

” ইম্পসিবল। আমি এখানেই থাকব। কোথাও গিয়ে দাঁড়াবনা। ” মাশিয়া গোঁ ধরে বলল।

” তাহলেতো আপনাকে ক্লাসে মনোযোগী হতে হবে। শুধু শারীরিকভাবেই ক্লাসে উপস্থিত থাকলেই হবেনা, মানসিকভাবেও থাকতে হবে। গেইট আউট, হারি আপ। অযথা আমার সময় নষ্ট করবেননা। ”

” আমি বললামতো এখানেই থাকব। পড়ান আপনি। ”

আরমান পড়াতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর পড়ানোর মাঝেই মাশিয়াকে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল। কিন্তু মাশিয়া কোন উত্তর দিতে পারেনা।

” আমি আপনাকে মনযোগী হতে বলেছিলাম। এরপর থেকে ক্লাসে মন দিতে না পারলে ক্যাম্পাসে বসে থাকবেন। আমার সময় নষ্ট করবেননা। এখানে এসে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকুন। ” আরমান নিজের বাম পাশের ফাঁকা জায়গা দেখিয়ে বলল।

” হাউ ডেয়ার ইউ! আমার কান ধরতে বলার সাহস কি করে হয় আপনার? নিজেকে বড় কিছু মনে করছেন? আপনার মত কয়েকজন শিক্ষককে পকেটে রাখে আমার পাপা। আপনি নিজের লেবেল ভুলে যাবেননা। ”

” এক্সকিউজ মি, আমার নিজের লেবেল সম্পর্কে পুরো ধারনাই আছে। আপনার পাপা যাকে খুশি তাকে পকেটে রাখুক। সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। আমি শুধু দেখব আমার ক্লাসে স্টুডেন্টরা ঠিকমত পড়াশোনা করছে কি-না, আর আপনার মত অমনোযোগী, বেয়াদব স্টুডেন্ট পড়াশোনা করছে কি-না। এবার বেশি কথা না বলে এখানে এসে কান ধরে দাঁড়ান। নতুবা আপনাকে থাপ্পড় দিতে আমি দুইবার ভাববনা। আর তার যথেষ্ট কারনও আমার কাছে আছে। চাইলে আপনার পাপাকে জানাতে পারেন। আই ডোন্ট কেয়ার। চলে আসুন। ” আরমানের পুরুষালী গলায় গমগম করে উঠল পুরো রুম। রাগে ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। ওষ্ঠদ্বয় ঈষৎ কাঁপছে। কপালের শিরা টানটান হয়ে আছে। আরমানের রাগী গলা শুনেই মাশিয়ার বুক দুরুদুরু করতে থাকে। ও নিজের অজান্তেই আরমানের দিকে তাকায়। সামনে দাঁড়ানো রাগী মানুষটাকে দেখে হঠাৎই ওর ভয় হচ্ছে। ও নিজের সিট থেকে দাঁড়িয়ে গুটিগুটি পায়ে আরমানের দিকে এগিয়ে যায়। পুরো ক্লাস স্তব্ধ হয়ে দেখছে মাশিয়াকে। যে মেয়ে কখনোই কারও কাছে নত হয়নি, সবাইকে নিজের দাম্ভিকতার আঁচড়ে ক্ষত-বিক্ষত করেছে, সেই মেয়েকেই আজ আরমানের কাছে পরাস্ত হতে দেখে সবাই হতবাক। কেউ কেউ অবশ্য মনে মনে ভিষণ খুশি হয়।

মাশিয়া আরমানের দেখানো জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কান ধরলনা।

” আপনাকে কান ধরতে বলেছি। কান ধরুন। ইয়োর টাইম ইজ স্টার্ট নাউ। ”

” কান ধরতেই হবে? ” মাশিয়া গোমড়ামুখে বলল।

” অফকোর্স। এটা আপনার বেয়াদবির শাস্তি। নেক্সটেও যদি এমন করেন, আমার কথার অবাধ হন, তবে একই শাস্তিই আপনাকে পেতে হবে। ” আরমানের মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলার সাহস করে উঠতে পারলনা মাশিয়া। কাঁপা কাঁপা হাতে দুই কান ধরল। অপমানে, লজ্জায় ঠোঁট কামড়ে, চোখ বন্ধ করে থাকে। আর মনে মনে আরমানের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করতে ব্যস্ত হয়ে যায়।

আরমান আবারও পড়ানো শুরু করেছে। আরেকবার আরমানের ধমক খেয়ে মাশিয়া এবার চোখ খুলল। ক্লাসে মনযোগ দিতে চেষ্টা করল।

” এবার কান ছাড়ি? অনেকক্ষন তো এভাবে থাকলাম। ” মাশিয়া মৃদু গলায় বলল।

” নো। পুরো ক্লাস এভাবে থাকবেন। ”

” আপনি কি জানেন, আপনি হিটলারের মত আচরণ করছেন? আমার মত নির্দোষ, নিস্পাপ মেয়েকে আপনি টর্চার করছেন? আপনার পূর্ব পুরুষরা কি জার্মান থেকে এসেছিল? ” মাশিয়া ফিসফিস করে বলল।

” নাহ্। আমার পূর্বপুরুষরা এদেশেরই। আমার বংশ নিয়ে চিন্তা না করে কি পড়াচ্ছি সেটা মন দিয়ে শুনুন। ”

” খা’টা’স মাস্টার। ”

আরমান মাশিয়ার কথায় নজর না দিয়ে পড়াতে থাকে। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে যায়। আরমাস আজ পরপর দুইটা ক্লাস নিবে। ওদের একজন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায়, তার ক্লাসও আরমান নিবে। এদিকে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মাশিয়ার পা ব্যথা করছে।

” বলছি, এই যে শুনুন? ও স্যার, ও হিটলারের বংশধর? এই যে মিতুলের আরু বেইবি? শুনছেন? ” মাশিয়ার এরূপ সম্ভাষণে পড়া বাদ দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকল আরমান।

” ক্লাস রুমে এভাবে দাঁড়িয়ে মন ভরছেনা? মাঠে গিয়ে দাঁড়াতে চান? তবে মোষ্ট ওয়েলকাম। চলুন মাঠে। দাঁড়ানোর জায়গা দেখিয়ে দিচ্ছি। ”

” বলছি যে আমার পা ব্যথা করছে। একটুখানি বসি? প্লিজ, মাস্টারমশাই। ”

” নো। যেভাবে আছেন সেভাবেই থাকুন। ”

পুরো ক্লাস কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকে মাশিয়া। আরমান পরবর্তী ক্লাস নিতে শুরু করেছে। তবুও সে মাশিয়াকে বসতে বলেনি। তবে একসময় মাশিয়া ক্লাসে মন দেয়। এবং কখন যে সময় চলে যায় বুঝতেই পারেনা।

” এবার কান ছেড়ে নিজের জায়গায় গিয়ে বসুন। ” ক্লাস শেষ করে বলল আরমান।

” হুহ, অসভ্য মাস্টার। আপনার বিয়ে হবেনা দেখে নিবেন। কোন মেয়েই আপনার মত হিটলারের বংশধরকে বিয়ে করতে চাইবেনা। ” মাশিয়া রাগে গজগজ করতে করতে নিজের সিটে গিয়ে বসল। আরমান ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে বেরিয়ে যায়।

চলবে….