যেখানে_দিগন্ত_হারায় পর্ব-৪৭+৪৮

0
160

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_৪৭
জাওয়াদ জামী জামী

রুম থেকে বেরোতে গেলেই মাশিয়ার সাথে ধাক্কা খায় আরমান। হুট করেই মাশিয়া ওর সামনে এসে পড়েছে। ধাক্কার তাল সামলাতে না পেরে মাশিয়া আরমানের শার্ট খামচি দিয়ে ধরল। প্রায় একই সাথে মাথা রাখল ওর বুকে। মাশিয়ার বুক ধুকপুক করছে। আরেকটু হলে মেঝেতে চিৎপটাং হয়ে পরত।

” আর অভিনয় করার প্রয়োজন নেই। এতটুকু ধাক্কায় কেউ ধরাশায়ী হয়না, সেটা আমার ভালো করেই জানা আছে। বেয়াদব মেয়ে, সব সময় বুকে আসার বাহানা খোঁজে! এমন ভাব করে যেন আমার বুক সরকারি সম্পত্তি। আমার বুকেই মনে হয় সকল সমস্যার সমাধান আছে! ”

আরমানের এহেন কথায় মাশিয়া লজ্জায় বুক লুকায় আরমানেরই বুকে। মিটিমিটি হাসছে মেয়েটা। মনে মনে নিজের সাথেই কথা বলছে।

” এই রে , ধরা খেয়ে গেলাম! কি অসভ্য মানুষরে বাপু! আমি অভিনয় করছি সেটাও ধরে ফেলল! এত বুদ্ধি নিয়ে বদ লোকটা ঘুমায় ক্যাম্নে! ”

শশী রুম থেকে বেরিয়ে ভাই-ভাবীকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। ওর হাসি আরমান, মাশিয়ার কানে পৌঁছে গেছে।

” ভাবী, কি সুন্দর রোমাঞ্চ করছিলে তোমরা। হেব্বি লাগছিল দেখতে। আহ্ জামাইয়ের বুকেই বুঝি বউদের শান্তি? কবে যে একটা জামাই হবে, আর কবে একটা ফ্রি বুক পাব। ” আরমান বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরই শশী আসল মাশিয়ার রুমে। রুমে আসার পর থেকেই ও মাশিয়াকে খোঁচাচ্ছে।

” শখ কত! এই বয়সেই জামাইয়ের বুক চায়! সেই জামাই যদি তোমার ভাইয়ার মত নিরামিষ হয় তখন কি করবে শুনি? বেচারার জন্য আমার এখন থেকেই চিন্তা হচ্ছে। অবশ্য সেই সাথে বিয়ের দুইমাস পরই তোমার জামাইকে টাকলা দেখার ইচ্ছেও জাগছে মনে। ” মাশিয়াও পাল্টা খোঁচা দেয় শশীকে।

” তোমরা জনসম্মুখে রোমাঞ্চ করবে, তাতে কোন দোষ নেই কিন্তু আমি একটা জামাই চাইলেই যত দোষ। কি সুন্দর আমার ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে ছিলে, সেটা দেখেই তো আমার মনকাননে হাজার রংয়ের প্রজাপতি উড়ছিল। কিন্তু তুমি আমার মন ভেঙে দিচ্ছ, আর প্রজাপতিদেরও উড়িয়ে দিচ্ছ ফুঁ দিয়ে। ” শশী মুখ গোমড়া করে বলল।

” এক্সজ্যাক্টলি, আমি তোমার ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। তোমার নিরামিষ ভাইয়া আমাকে মোটেও জড়িয়ে ধরেনি। হাজার উষ্কানিতেও তোমার নিরামিষ ভাইয়া নিজের অবস্থান থেকে একটাবারের জন্যও নড়েনা। আমার মনে হয়, সে কোন সাধু অথবা ঋষির পর্যায়ে চলে গেছে। একটা ইয়াং, এ্যাট্রাকটিভ বউকে দেখেও যার মনের পরিবর্তন হয়না, সে কোন মানবের পর্যায়ে পরেনা। সে অলরেডি মহামানবের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কি সৌভাগ্য তোমার, শশী। কলি যুগে এসেও তোমার মহামানবের দর্শন মিলছে! তুমিও কোন সাধারণ নারী নও। তুমিও মহামানবের বোন মহামানবী। সে হিসেবে তোমার বিয়ে না করলেও চলবে। ” মাশিয়া মিটিমিটি হাসছে।

” মাফ চাই, ভাবি। আমি সন্যাসিনী হতে চাইনা। এগারোটা আন্ডাবাচ্চার মা হতে চাই আমি। একটা ফুটবল টিম তৈরী করার স্বপ্ন দেখি। সেই এগারোজন হবে ফুটবল টিমের প্রান। কিংবদন্তীদের মা হব আমি বুঝলে? এখন থেকেই আমাকে সমীহ করে চল। ইন ফিউচার যখন বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারভিউ দেব, তখন তোমার নাম নিব। তোমাকেও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সুপরিচিত করে তুলব। ” শশী কথা শেষ করতে পারলনা। পিঠে কিল খেয়ে চমকে উঠল। পেছনে তাকিয়ে দেখল সুধা রাগী চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

” ফাজিল মেয়ে, আমার চৌদ্দটা বাজিয়ে তুই ফুটবল টিম গড়ার স্বপ্ন দেখছিস? তুই সেদিন হসপিটালে ঐ ধরনের কথা না বললে ভাইয়া আমার বিয়ের চিন্তা করতোইনা। আগে কখনো এভাবে কাউকে বিয়ের জন্য ঘ্যানঘ্যান করতে শুনিনি। নির্লজ্জ মেয়ে। ” সুধার ঝাড়ি শুনে শশী মুখ কালো করে বসে থাকল।

তিনদিন পর আরমানের বন্ধুরা ফোন দিয়ে ডক্টর জহুরুল হক ও তার পরিবার সম্পর্কে জানায় আরমানকে। সব শুনে আরমান মিরাজ মোর্তাজার সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেয়। যেহেতু ওর বন্ধুরা ডক্টরের পরিবার এবং অনিক সম্পর্কে গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছে, সেহেতু ডক্টরের প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতেই পারে।

সেদিন সন্ধ্যার দিকে হুট করেই মাশিয়ার শরীর খারাপ হয়ে যায়। আরমান দেরি না করে ওকে নিয়ে ডক্টরের কাছে যায়। ডক্টর জানায়, নড়াচড়ার ফলে সমস্যা দেখা দিয়েছে। কয়েকদিনের সম্পূর্ণ বেড রেস্টসহ কিছু ঔষধ লিখে দেয় ডক্টর।

পেট ব্যথায় কুঁকড়ে গেছে মাশিয়া। বাচ্চাদের দিকে তাকানোর মত অবস্থা ওর নেই। সুধা, শশী বাচ্চাদের খেয়াল রাখছে। আরমান মাশিয়ার যত্ন নিচ্ছে। কল্পনা মোর্তাজা মাশিয়াকে এসে দেখে গেছেন। মাশিয়া মা’য়ের সাথে কথা বলতে পারেনি ব্যথার চোটে। রাত এগারোটার পর তিনি বিদায় নিলেন।

আরমান খাবার ট্রে নিয়ে এসে দেখল মাশিয়া বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। সেন্টার টেবিলে ট্রে রেখে মাশিয়ার কাছে এসে ওকে তুলে বসাল।

” মুখের সামনে খাবার কতক্ষণ ধরে রাখব? ঠান্ডা হলে খেতে ভালো লাগবেনা। খাওয়া শেষ হলে ঔষধ খেতে হবে। ” মাশিয়ার সামনে খাবার লোকমা নিয়ে অপেক্ষা করছে আরমান।

মাশিয়ার খেতে ইচ্ছে না করলেও আরমানের কথা চিন্তা করে হা করল। ও আরমানকে আর রাগিয়ে দিতে চায়না।

আরমান গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাশিয়ার দিকে। একদিনেই মেয়েটার চোখের নিচে কালো দাগ পরেছে। মুখটা চুপসে গেছে। ঔষধ খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ঘুমিয়ে গেছে। মেয়েটার কপালে হাত দিয়ে জ্বরের অস্তিত্ব টের পেল আরমান। চিন্তায় ওর কপাল কুঁচকে আসল। বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুম থেকে এক বালতি পানি আনল মাশিয়ার মাথায় ঢালার জন্য। প্রায় তিনঘন্টা মাথায় পানি ঢালার পর জ্বর কমতে শুরু করল। বাচ্চাদের সুধা, শশীর কাছে রেখে আরমান মাশিয়াকে নিয়েই ব্যস্ত আছে। তবে সুধা, শশী কয়েকবার এসে মাশিয়াকে দেখে গেছে। ফজরের নামাজ আদায় করে আরমান বিছানায় পিঠ রাখে। সারারাতের ক্লান্তিতে বিছানায় শোয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পরল।

ঘুম ভাঙ্গলে মাশিয়া দেখল আরমান ওর পাশে শুয়ে আছে। মানুষটা সটান হয়ে শুয়ে আছে। ঘুমন্ত আরমানের মুখের দিকে তাকিয়েই মাশিয়া তার চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ দেখতে পায়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার কোন চেষ্টা না করেই মাশিয়া পরম আবেশে ছুঁয়ে দেয় আরমানের চোখমুখ। এলোমেলো করে দেয় ওর ঝাঁকড়া চুল।

বেশ কিছুক্ষণ ঘুমন্ত আরমানের সাথে দুষ্টুমি করে উঠে বসল মাশিয়া। প্রায় সাথে সাথেই ওর মাথা ঘুরে উঠল। শরীরেও কেমন ম্যাজম্যাজে অনুভূতি হচ্ছে। তবে পেট ব্যথা আপাতত নেই। অতি সাবধানে বিছানা ছাড়ল মাশিয়া। কাল থেকে বাচ্চাদের কোলে নিতে পারেনি, সেই আফসোসে ও পাগলপ্রায়। এই মুহূর্তে বাচ্চাদের না দেখলে ও বাঁচবেনা। ধীরে ধীরে পা বাড়ায় সুধার রুমে।

আরমানের ঘুম ভাঙ্গলে মাশিয়াকে না দেখে চিন্তায় পরে যায়। ওয়াশরুম, বেলকনিতে মাশিয়াকে না পেয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসল। সুধার রুম থেকে কথাবার্তার শব্দ শুনতে পেয়ে সেখানেই যায় দ্রুত পায়ে।

মাশিয়ার পরীক্ষার ডেইট দিয়েছে। এদিকে আরমানেরও ছুটি শেষ। কল্পনা মোর্তাজা একজন মেইড পাঠিয়েছেন মেয়ের বাসায়। আরমান বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য একজনকে রেখেছে। আরমানের অনুপস্থিতিতে ওদের সমস্যা হবার কথা নয়। তবুও ওর চিন্তা যাচ্ছেনা। বাচ্চাদের রেখে দূরে থাকতে হবে ভেবেই ওর বুক ফেটে যাচ্ছে। এদিকে মাশিয়ার শরীরও খুব একটা ভালো নেই। আবার ডক্টর জহুরুল হকও চাচ্ছেন সুধার বিয়েটা দ্রুত হোক। সব মিলিয়ে আরমান চিন্তায় দিশেহারা। ডক্টর জহুরুল হকের সাথে দেখা করে দুইমাস সময় চাইল। আগামী দুইমাসের আগে বিয়ে কিছুতেই সম্ভব নয়।

মেডিকেলে পা রাখতেই অনিকের মুখোমুখি হয় সুধা। ও অনিককে দেখে মাথা নিচু করে একপাশ দিয়ে যেতে চাইলেই, অনিকের ডাকে থমকে দাঁড়াতে হয়।

” সুধাময়ী। ”

অনিকের মুখে ‘ সুধাময়ী ‘ ডাক শুনে সুধার শরীরের রক্ত ছলকে উঠল। ছেলেটার এমন দরদমাখা ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য ওর নেই। ও তৎক্ষনাৎ সেখানেই দাঁড়িয়ে গেল।

সুধাকে দাঁড়াতে দেখে অনিক ওর দিকে এগিয়ে আসল।

” তুমি কি আমার ওপর কোন কারনে রেগে আছ, সুধাময়ী? ”

সুধা না সূচক মাথা নাড়ায়।

” তবে যে গতকাল আমার জন্য অপেক্ষা করলেনা? ”

” ভাবি অসুস্থ। তাই তারাতারি বাসায় গিয়েছিলাম। আপনার সাথে লোকজন থাকায় বলা হয়ে ওঠেনি। ”

” ভাইয়া আব্বুকে বলেছে দুইমাসের আগে বিয়ে সম্ভব নয়। সেটা শুনে আমার মন ভেঙে গেছে। আমি কি ভাইয়ার সাথে এই বিষয়ে কথা বলব, সুধাময়ী? ”

অনিকের কথায় চমকে ওর দিকে তাকায় সুধা।

” কক্ষনো না। ভাইয়া সত্যিই খুব ঝামেলায় আছে। নতুন চাকরি, ভাবি অসুস্থ, বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তা। সবকিছু মিলিয়ে ভাইয়ার ওপর খুব প্রেশার যাচ্ছে। আমি চাইনা আমার জন্য ভাইয়া বাড়তি প্রেশার নিক। সবকিছু একা সামাল দিতে ভাইয়া হিমশিম খাচ্ছে। ”

সুধার কথা অনিক বুঝতে পারল। ও হেসে স্বতঃস্ফূর্ত গলায় বলল,

” ফুলন দেবী কেমন আছে? ”

ওর কথা বুঝতে না পেরে সুধা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় অনিকের দিকে।

” আরে শশীর কথা বলছি। আমার কাছে ওর ট্রিট পাওনা আছে। ও না থাকলে আমাকে খুব কষ্ট করতে হত তোমাকে পেতে। ”

আজ সুধা অনিকের কথা শুনে যারপরনাই অবাক হয়ে যাচ্ছে। যে ছেলেটা কয়দিন আগেও কথা বলার সময় ইতস্তত করত। আজ সে কি নির্দিধায় ওর সাথে কথা বলছে!

” ও ভালো আছে। আর সব সময়ই ভালো থাকে। ”

” ওকে নিয়ে একদিন মেডিকেলে এস। ওর পাওনা ট্রিট আগে মিটিয়ে দেব। ”

” আমরা দুজনেই চলে আসলে ভাবির সমস্যা হবে। ভাবি একা একা বাচ্চাদের সামলাতে পারবেনা। আর ভাইয়াও বাচ্চাদের অন্য কারও তত্বাবধানে রাখতেও পছন্দ করেনা। ”

” ওকে। তাহলে চল তোমাকে এগিয়ে দেই। সেই সাথে ফুলন দেবীর জন্য ওর পছন্দের খাবার কিনে দেই। এতে যদি আমার ওপর সে একটু সদয় হয়। নইলে আজীবন সে আমাকে শুকনো ঢেঁড়স বলেই ডাকবে। ” অনিকের কথা বলার ভঙ্গি দেখে হেসে ফেলল সুধা। দু’জনে পা বাড়ালো মেডিকেলের বাহিরে।

চলবে…

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_৪৮
জাওয়াদ জামী জামী

মাশিয়ার পরীক্ষা শেষ। সুধার বিয়ের দিনক্ষণ দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। আরমান সিদ্ধান্ত নিয়েছে গ্রাম থেকে সুধার বিয়ে দেবে। ডক্টর জহুরুল হককে সে এই কথা জানালে, ভদ্রলোক একবাক্যে রাজি হয়ে গেছেন। মেয়েরাও আগের থেকে বড় হয়েছে। সেজন্যই আরমান ওদের গ্রামে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছে। মাশিয়ারা বিয়ের পনের দিন আগেই গ্রামে যাবে। আরমান মিরাজ মোর্তাজার সাথে কথা বলে তাকে রাজি করিয়েছে কল্পনা মোর্তাজাকে মাশিয়ার সাথে গ্রামে পাঠাতে। ও বিয়ের চারদিন আগে গ্রামে যাবে। শুধু মাশিয়া কিংবা দুই বোনের সাথে মেয়েদের গ্রামে পাঠাতে ওর মন সায় দিচ্ছেনা। মাশিয়া এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি, ও বাচ্চাদের ঠিকমত যত্ন নিতে পারবেনা। সুধা বাড়িতে গিয়েই কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে যাবে। আর রইল শশীর কথা, যেখানে ও নিজেকেই সামলাতে পারেনা, সেখানে একসাথে দুই বাচ্চাকে সামলানো ওর পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়।

এক বছরেরও বেশি সময় পর গ্রামে যাচ্ছে মাশিয়া। খুশিতে ও অনেকক্ষণ শশীকে নিয়ে নাচানাচি করেছে। আবারও ফিরে যাচ্ছে ওর আপন ঠিকানায়। তবে যখনই মনে হচ্ছে সেখানে গিয়ে আম্মাকে দেখতে পাবেনা, তখনই ভিজে উঠছে ওর আঁখিদ্বয়। কেঁদে উঠছে হাউমাউ করে। আম্মার অনুপস্থিতি ওকে আজীবন পোড়াবে। আম্মার অভাব ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে। ওর সন্তানরা এক মমতাময়ীর স্নেহ, ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে চিরতরে, আর তার জন্য হয়তো সে নিজেই দায়ী। এই পাপবোধ থেকে ও কোনদিনও মুক্তি পাবেনা। আরমানের চোখে ও সারাজীবনের জন্য অপরাধী হয়ে গেছে। ও কখনোই আরমানের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবেনা। সেই ক্ষমতা ও হারিয়েছে।

আরমান গ্রামে ওর চাচাতো ভাইকে ফোন করে সুধার বিয়ের ব্যাপারে সব বলেছে। তাকেই নিজের অনুপস্থিতিতে সব কিছুর দ্বায়িত্ব দিয়েছে। আরমানের সেই ভাইও সব দ্বায়িত্ব পালন করতে হাসিমুখে রাজি হয়েছে।

মাশিয়ারা ভোরে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। দুপুরের পরপরই ওরা গ্রামে পৌঁছে যায়। ওদের গাড়ি দেখেই প্রতিবেশিরা সবাই এগিয়ে আসল। আরমানের চাচাতো ভাই, তার স্ত্রী, আরমানের চাচি ওদের দেখে ভিষণ খুশি হয়।

গাড়ি থেকে নেমে মাশিয়া তাকায় অতি পরিচিত সেই বাড়ির দিকে। সেই প্রথমদিনের মত আজ এই বাড়িটাকে অসহ্য লাগছেনা। বিরক্ত লাগছেনা চারপাশের পরিবেশ। চিরপরিচিত সেই বাড়ির বাহিরে ফুল গাছগুলো সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেদের সাজিয়েছে ফুলের মাতাল করা ঘ্রানে। একটুও পাল্টায়নি বাড়ির রূপ। সবকিছু আগের মতই আছে । শুধু নেই এক মমতাময়ী মা। মাশিয়া পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় বাড়ির দিকে। আজ এই বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণাও ওর কাছে আপন মনে হচ্ছে। এই বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে মায়া-মমতা আর ভালোবাসা। আবেগে, কষ্টে, অপরাধবোধে মাশিয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওর মনে পরল, প্রথম দিনের কথা। যেদিন ও এই আঙ্গিনায় প্রথম পা রেখেছিল। সেদিন সেই মমতাময়ী গাড়ি থেকে নেমেই ব্যস্ত হয়ে পরেছিলেন বধূবরণে। তার একমাত্র পূত্রবধূ বরণে। দেড় বছর আগে এই বাড়ি ছাড়ার মুহূর্তে কি মাশিয়া ভাবতে পেরেছিল, আবারও ফিরে আসতে হবে এই ‘ মায়াকুঞ্জে ‘! সেদিনের মত আজ ওকে বরণ করতে কেউ উদগ্রীব হলোনা। ওর সন্তানদের আগলে রাখার জন্য কেউ থাকলনা।

সুধা আর শশী একে-অপরের দিকে তাকায়। ওরা অনুধাবন পারছে মাশিয়ার কান্নার কারন। এর আগেও মাশিয়াকে ওরা কাঁদতে দেখেছে। আগের মাশিয়া আর এখনকার মাশিয়ার মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ। ওরা বোঝে মাশিয়া ওদের আম্মার জন্যই চোখের পানি ফেলে।

ততক্ষণে মাশিয়া পৌঁছে গেছে সদর দরজার কাছে। কাঁপা কাঁপা হাতে স্পর্শ করল দরজা।

উঠানে পা রেখে চারপাশে ঘুরে তাকালো। মুখ উঁচু আর চোখ বন্ধ করে ধীরে শ্বাস নিচ্ছে মেয়েটা। এই বাড়ির বাতাসের ঘ্রান নিচ্ছে। বাতাসে আম্মার শরীরের গন্ধ খুঁজছে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও সেই গন্ধ পায়না। কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা দৌড়ে যায় আম্মার ঘরে। লুটিয়ে পড়ল ওর আম্মার বিছানায়। হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল।

কল্পনা মোর্তাজা অবাক হয়ে মেয়ের কর্মকাণ্ড দেখছেন। তার মেয়ে পাল্টেছে এটা তিনি জানেন, কিন্তু এতটাই যে পাল্টেছে সেটা তার কল্পনায়ও ছিলনা। তিনি আজ বুঝতে পারছেন, তার মেয়ে প্রতিনিয়ত কষ্ট আড়াল করে বেঁচে থাকছে।

সুধার ঘরে ঢুকতেই ওর ফোনের রিংটোন কানে যায় শশীর। ড্রেসিং টেবিলের ওপর ফোন রেখে সুধা বাহিরে কাজ করছে। শশী কোন কিছু না ভেবেই সুধার ফোন রিসিভ করল।

” আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন। ”

” সুধাময়ী আমি অনিক। ”

অনিক নাম শুনেই শশী খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।

” ওহে শুকনা ঢেঁড়স, আমি আপনার সুধাময়ী নই। আমি শশী। আপনার যম। ”

নিজের এমন কাজে আহাম্মক বনে গেল অনিক। সে ভাবল, আগে যাচাই করতে হত কে ফোন রিসিভ করেছে। এখন সেসব চিন্তা করে লাভ নেই। শশীর সাথে কথা চালিয়ে যেতে হবে।

” তো ঝাঁসিকা রানী, কেমন আছে আপনি? ”

” হুরর দিলো মুড খারাপ করে। আমি নাকি ঝাঁসিকা রানী! আমি যদি ঝাঁসিকা রানী হই, তবে আপনি আমাদের গ্রামের কদম চোরা। যে শুধু মানুষের মুরগী চুরি করে বেরায়। খাবার জন্য তার কোনদিন মুরগী কিনতে হয়না। ”

শশীর কথা শুনে অনিকের মুখ চুপসে গেছে। এই মেয়েটার সাথে কথা বলে কখনোই জিততে পারেনা। যেন ওর প্রত্যেক কথার উত্তর মেয়েটার ঠোঁটের আগায় এসে বসে থাকে।

” আমি মোটেও চোর নই। আমি একজন ডক্টর। তুমি আমাকে চোর বলে ইনসাল্ট করতে পারোনা। ” অনিকের গলায় আগের মত জোর নেই।

” আইছে ডক্টর। ডক্টরদের এমন মিনমিনে স্বভাব হলে চলেনা। এই শোনেন আপনার সুধাময়ী কাজ করছে। পরে ফোন দেবেন। রাখছি। ” শশী অনিককে কিছু বলতে না দিয়ে ফোন কেটে দেয়।

বিয়ের চারদিন আগে আরমান গ্রামে এসেছে। গ্রামে এসেই ব্যস্ত হয়ে গেছে। কাজের চাপে দুদণ্ড বসার সুযোগ পাচ্ছেনা। মাঝেমধ্যে মেয়েদের আদর করছে এই যা।

উঠানে বসে সুধার সাথে কাজ করছে মাশিয়া। ওদের সাথে সুধার চাচি, চাচাতো ভাইয়ের বউ আর দুইজন প্রতিবেশি আছে। ওরা বেশ গল্প করতে করতে কাজ করছে। তখনই আরেক পাড়ার একজন মহিলা এসে ওদের সাথে যোগ দেয়। সে মাশিয়াকে দেখে কিছু একটা বলার জন্য উসখুস করছে। অবশেষে সেই সুযোগ তার মিলেই যায়।

” এই যে আরমানের বউ, তুমি আবারও ফিরা আইলা কেন? এমন ভাব নিয়া সেইদিন বাড়ি ছাইড়া গেলা, যেন আর কুনদিন এই বাড়ির সীমানা পা রাখবানা। আহারে আরমানের মা’য়ে কত কাঁনছে। ইমুন ভালো মানুষরে তুমি কাঁন্দাইছ। ভালো মাইয়া হইলে ইমনডা করতে পারতানা। শুন বউ, মাইয়াগোরে এত অহংকার করতে হয়না। শেষে তো আইলাই এই বাড়িতে। তয় সেদিন এত অহংকার করছিলা কেন? বাপের বাড়ির ফুটানি মাইয়াগোরে দেখাইলে চলেনা। ”

মাশিয়া কথাগুলো শুনে মাথা নিচু করে বসে থাকে। ও কাজ করতে ভুলে গেছে। এবার ঢাকা থেকে আসার পর অনেকেই ওকে নিয়ে কানাঘুষা করেছে। সেসবের কিছু কিছু কানে এসেছে ওর। তবে সেসব নিয়ে ও মাথা ঘামায়নি। জানে ওর দোষ ছিল, তাই সবাই ওকে নিয়ে কানাঘুষা করছে। নিজের দোষ মেনে নিয়েই চুপচাপ থেকেছে। তেমনি আজও ও চুপচাপ আছে। ও ভালো করেই জানে, এসব নিয়ে ভবিষ্যতে আরও অনেক কথাই শুনতে হবে।

” চাচি, আপনি ভাবিকে এভাবে বলছেন কেন! ভাবিকে নিয়ে আমাদের যখন কোন সমস্যা হচ্ছেনা, তখন আপনি তাকে অপমান করছেন কেন? আজ যদি আম্মা বেঁচে থাকত, তবে আপনি এই ধরনের কথা বলার সুযোগই পেতেননা। আপনি আমাদের গ্রামের মানুষ, পরিচিত সবই ঠিক আছে। তাই বলে ভাবিকে অপমান করার অধিকার আপনার নেই। ” শান্তশিষ্ট সুধা মাশিয়ার এমন অপমান সইতে পারলনা। ও সেই মহিলার কথার উত্তর দেয়।

সুধার পক্ষ নিয়ে ওর চাচিও প্রতিবাদ করল। সে জানিয়ে দিল, তাদের বাড়ির বউকে যেন ভবিষ্যতে আর কখনোই এমন কথা না বলে।

মাশিয়া চুপচাপ সবকিছু শুনল। প্রতিবাদের ভাষা ওর নেই। নিজের করা অন্যায়ের জন্য প্রতিবাদ ওর কাছে অপ্রয়োজনিয় মনে হয়।

গত কয়েকদিন মাশিয়া বাচ্চাদের নিয়ে আয়েশা খানমের ঘরেই শুয়েছে। ও বাচ্চাদের তাদের দাদির কাছাকাছি রাখতে চেষ্টা করেছে। তাদের দাদিমা নেইতো কি হয়েছে, এই ঘরের প্রতিটি কোনে ওদের দাদিমার ছোঁয়া, স্মৃতি মিশে আছে। ও মন থেকেই চায় ওর বাচ্চারা বড় হয়ে আয়েশা খানমের মত হোক।

শ্বাশুড়ির ঘরের বিছানায় বসে দাঁত দিয়ে নখ কাটছে মাশিয়া। এই ঘর থেকে ওর যেতে মন চাইছেনা। কিন্তু আরমান যেহেতু বাড়িতে এসেছে, আর সে তার মেয়েদের ছাড়া ঘুমাবেনা। তাই মন না চাইলেও মাশিয়াকে ঐ ঘরে যেতে হবে। কিন্তু কোন বাহানায় ঐ ঘরে যাবে ভেবে পাচ্ছেনা। ওর ফুপু শ্বাশুড়িরাসহ কয়েকজন আত্নীয় এসেছে। তাদের সামনে দিয়ে ঐ ঘরে যেতে মাশিয়ার লজ্জা লাগছে। অনেক ভেবেও কোন বুদ্ধিই পাচ্ছেনা মেয়েটা।

” ভাবিইইই, তুমি এখানে রোবটের মত বসে আছ কেন! পুতুলরা ঘুমাবেনা? তুমি ওদের না ঘুমিয়ে দিলে, ওরা অন্যদের কোলেই রাত পার করবে। ” শশী ঘরে ঢুকে মাশিয়াকে চিন্তিত বদনে বসে থাকতে দেখে চেঁচিয়ে উঠল।

” চন্দ্রাবতী, আমি বিপদে পরেছি। এবারের মত উদ্ধার করবে প্লিজ। ”

” মা গো, আরহা, আদিয়াতের বাপের বউ আমার সাহায্য চাইছে বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে! এটা ভাবা যায়! বল কন্যা, তোমাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি? আমি প্রয়োজনে তোমার জন্য পাশের বাড়ির কাবিলার মা’য়ের চুলও কাটতে পারি। আবার কদম চোরার বাড়িতেও চুরি করতে পারি। ”

শশীর নাটুকে ভঙ্গি দেখে মাশিয়া হেসে উঠল। এরপর ও নিজের সমস্যার কথা জানাল শশীকে।
সব শুনে শশী জোরে শ্বাস ফেলল। তারপর বলল,

” এটা কোন ব্যাপারই না। তুমি পুতুলদের কাঁথা – বালিশ গুছিয়ে রাখ। আর পাঁচ মিনিট পরই তুমি তোমার জামাইয়ের ঘরে থাকবে। ”

শশী তৎক্ষণাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে ফুপুদের কাছে বসল।

” ফুপু, তোমরা এসেছ দুইদিন আগেই। কিন্তু তোমাদের কাছে শোয়া হয়নি। অথচ আম্মা বেঁচে থাকতে আম্মার ঘরে সবাই মিলে শুতাম। অর্ধেক রাত পর্যন্ত আমরা গল্প করতাম। এখন আম্মা নেই বলে কি তোমরা আমাদের সাথে ঘুমাবেনা? আমাদের গল্প শোনাবেনা? ” শশীর এমন আবেগপ্রবন কথায় ওর ফুপুদের চোখে পানি আসল। তারা চোখ মুছে শশীকে কাছে টেনে নিয়ে জানায়, যে কয়দিন তারা এই বাড়িতে আছে, সেই কয়দিন ওদের দুই বোনকে কাছে নিয়েই শোবেন।

খুশিতে বাক-বাকুম করতে করতে শশী যায় মাশিয়ার কাছে। মাশিয়া ততক্ষণে বাচ্চাদের বিছানা, কাঁথা, কাপড় গুছিয়ে নিয়েছে।

চলবে…