যেখানে_দিগন্ত_হারায় পর্ব-১৭+১৮

0
141

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_১৭
জাওয়াদ জামী জামী

সারাদিন আরমানের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ালেও রাতে ঘরে আসতে হয় মাশিয়াকে।। আরমান বইয়ের মাঝে ডুবে রয়েছে। ঘরে ঢুকে কোনও উচ্চবাচ্য না করে বিছানায় শুয়ে পরল।

” রাত দশটা বাজে। এখনই ঘুমাবে! এই তুমিই নাকি বাবার বাড়িতে অনেক অব্দি জেগে থাকতে? ”

” শুরু হয়ে গেল মাস্টারি। আমি কখন ঘুমাই কিংবা ঘুমাবো সেই কৈফিয়ত কি এখন আপনাকে দিতে হবে! ”

” আমি শুধু বলতে চাইছি ঘুম না আসলে বই নিয়ে বস। ”

” বই নিয়ে আসিনি। ”

” আমি এনেছি। তুমি ভুলে যেতেই পার, তাই বলে আমার ভুললে চলবে কিভাবে। বিয়ের খুশিতে তুমি দুনিয়াদারি ভুলে থাকতে পার, আমি পারিনা। তোমার সাথে তোতোমার বইগুলোও এই বাড়িতে এসেছে। সুধার কাছ তোমার বই আছে। নিয়ে এস। ”

আরমানের কথা শুনে মাশিয়া ওর দিকে তব্দা খেয়ে তাকিয়ে থাকল। কিছু বলার জন্য ওর কথারা আজ কণ্ঠা থেকে নির্গত হলোনা। ও শুধু ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে রইল আরমানের দিকে।

” এভাবে তাকিয়ে আছ কেন! চোখ নামাও। তোমার দৃষ্টির আ’গু’নে ভস্ম হতে আমার দেরি লাগবেনা। ” মাশিয়াকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরমান আবারও কথা বলল।

” আপনি কি সত্যিই মানুষ! নাকি বদ জ্বীন? বিয়ের দিন অন্য চিন্তা বাদ দিয়ে আপনার মাথায় বইয়ের চিন্তা এসেছে! ”

” তোমার মত ত্যাড়া, বেয়াদব মেয়েকে বিয়ে করতে গেলে নানান চিন্তা করতে হয়, আর সেই সাথে সাহসীও হতে হয়। বদ জ্বীনও যেখানে তোমাকে দেখলে দশ হাত দূরে থাকে, সেখানে আমাকেই তোমার পড়াশোনার ব্যাপারে ভাবতে হবে তাইনা? ”

” আমি পড়বনা। পড়তে ভালো লাগেনা। ”

” সেটা আমি বুঝব। বই নিয়ে এস যাও৷ ”

” না মানে না। আমি পড়বনা। ”

” তাহলে কাল থেকে সংসারের সব কাজ করবে। ভোরে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করে বাড়ি-ঘর ঝাড়ু দিয়ে রান্নাঘরে যাবে। এরপর একটা সংসারের যা যা কাজ সব করবে। তাহলে পড়তে হবেনা। ”

” আমি কাজ করতে জানিনা। আর জানলেও করবনা। ”

” না জানলে আম্মা শিখিয়ে দেবে। আগামী দশদিন তুমি তার কাছ থেকে সবকিছু শিখে নিবে। এখন ঘুমিয়ে পর। সকাল সকাল উঠতে হবে। কাল থেকে সংসার সামলানোর দ্বায়িত্ব তোমার। ”

আরমানের কথা শেষ হতেই এক ঝটকায় উঠে বসল মাশিয়া। এরপর বিছানা থেকে নেমে দুপদাপ পা ফেলে ঠাস করে দরজা খুলে বাহিরে গেল। ওর সব রাগ দরজার ওর ঝেড়েছে যেটা আরমান বুঝতে পারছে।

” সুধা, জেগে আছ? দরজাটা একটু খুলবে? ”

কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে সুধা মাশিয়ার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।

” তোমার ঐ হিটলার ভাই সত্যিই কি তোমার নিজের ভাই? আম্মা’র নিজের ছেলে? ”

” এই কথা জানার জন্য তুমি এসেছ, ভাবি! কাল সকালে জিজ্ঞেস করলেই পারতে? কিংবা ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করতে। সে উত্তর দিত। ” সুধা বুঝল দু’জনের মধ্যে কিছু একটা হয়েছে। মাশিয়াকে দেখে ওর হাসি পাচ্ছে।

” তোমাকে কি সাধে জিজ্ঞেস করলাম! তাকে জিজ্ঞেস করলে সে সঠিক উত্তর দিত বলে তোমার মনে হয়? তাকে কিছু জিজ্ঞেস করা মানে নিজের পায়ে কুড়াল মা’রা’র সমান। আমার বিশ্বাস হিটলারও তাকে দেখলে লজ্জা পেত। আমার সন্দেহ আছে ঐ হিটলার সত্যিই এই বাড়ির ছেলে কিনা। ” মাশিয়া রাগে গজগজ করছে।

” ভাবি, বিশ্বাস কর ভাইয়া আমার নিজের ভাই। আম্মার নিজের ছেলে। তুমি টেনশন ফ্রি থাকতে পার। ”

” যেদিন থেকে ঐ হিটলারের সাথে দেখা হয়েছে, সেদিন থেকে টেনশন আমার ঘাড়ে জেঁকে বসেছে। আমি ছাড়াতে চাইলে কি হবে টেনশন আমাকে ছাড়তে চায়না। টেনশনের সাথে এখন আমার গভীর মিতালী। আর এসব কিছুর কারিগর তোমার হিটলার ভাই। নিশ্চিন্ত একজন মানুষকে টেনশনের সাগরে হাবুডুবু খাওয়াতে তোমার হিটলার ভাইয়ের জুড়ি নেই। ”

” আমার ভাইয়াকে তুমি যেমনটা ভাবছ, সে কিন্তু তেমনটা মোটেও নয়। আমার ভাইয়ার মত মানুষই হয়না। ”

” হুম, তোমার ভাইয়া ওয়ান পিস। তারমত এক পিস সারাদেশ ঘুরলেও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। এক মিনিট, আমি এখানে আসা অব্দিই ঐ হিটলারকে নিয়ে কথা বলছি কেন? ঐ হিটলারকে চ্যাপ্টার এখন বাদ। তুমি আমার বইগুলো দাও। ”

” পড়তে বসবে নাকি? বাহ্ আমার ভাবি দেখছি খুব এ্যাক্টিভ! বিয়ের তিনদিন যেতে না যেতেই পড়তে চায়! তুমি এতগুলো বই একা নিতে পারবেনা। চল আমি দিয়ে আসি। ”

” পড়তে কি আর চাই সাধে। সংসারে এত কাজের থেকে আমার জন্য পড়া অনেক সহজ। ” বিরবির করে বলল মাশিয়া৷

সেদিন রাত বারোটা পর্যন্ত মাশিয়াকে পড়ালো আরমান। যদিও মাশিয়া ফাঁকি দেয়ার যথেষ্ট চেষ্টা করেছে, কিন্তু আরমানের সাথে শেষমেশ পেরে ওঠেনি। বাধ্য হয়ে ওকে পড়তে হয়েছে।

পরদিন ভোরে মাশিয়াকে ঘুম থেকে উঠতে হয়। ও উঠতে না চাইলেও আরমানের ধমকে বাধ্য হয়ে বিছানা ছাড়ে। ফজরের নামাজ আদায় করে সুধা, শশীর সাথে ওকে ও পড়তে বসায় আরমান। কাজের মেয়ে ঠিক করায় আয়েশা খানমের বেশ সুবিধা হয়। তার কাজ শুধু ছেলেমেয়েদের চা-নাস্তা দেয়া। বাকি কাজগুলো কাজের মেয়েই করবে।

সুধা কলেজে গেছে। আরমান কোন একটা কাজে বাহিরে গেছে। বাসায় শুধু আয়েশা খানম, শশী আর মাশিয়া। কাজের মেয়ে থাকায় আয়েশা খানমে কোন কাজই করতে হচ্ছেনা। আরমান ওর মা’কে কাজ করতে নিষেধ করে দিয়েছে। আয়েশা খানম প্রথমে আঁইগুই করলেও ছেলের জেদের কাছে তাকে হার মানতে হয়।

বাহিরে যাওয়ার আগে আরমান মাশিয়াকে ফোন সুইচড অন করতে বলেছে। কিন্তু মাশিয়া ওর কথা না শুনে ফোন লুকিয়ে রেখেছে। এমনভাবে লুকিয়েছে যেন আরমান খুঁজে না পায়। ও পণ করেছে বাবা-মা’র সাথে আর কখনো কথা বলবেনা।

” ভাবি, কি করছ? ” মাশিয়া সুধার কাছ থেকে একটা উপন্যাস এনে পড়ছিল। শশী কোথাও গিয়েছিল তাই একা একা বোর হচ্ছিল। আর সেজন্যই বইটা এনেছে সুধার ঘর থেকে । শশীকে ভেতরে আসতে বলে বই বন্ধ করল ও।

” তুমিও কি ভাইয়ার মত বইপোকা? ”

” কেন হিটলারও বুঝি বই পড়ে? সে বই পড়লে সবার মাথায় ছড়ি ঘোরায় কখন! ”

মাশিয়ার কথা শুনে শশী খিলখিল করে হেসে উঠল।

” আপুর ঘরে যত বই দেখেছ, সবই ভাইয়ার বই। ভাইয়ার প্রায় তিন হাজারের বেশি বই আছে। তুমি আমাদের পশ্চিমের ঘরে যাওনি? সেখানে একটা লাইব্রেরি করে রেখেছে ভাইয়া। চল তোমাকে দেখিয়ে নিয়ে আসি। ”

” বল কি হিটলারের এত বই আছে! এতো দেখছি জ্ঞানী হিটলার! ”

” আমার ভাইয়া মোটেও হিটলার নয়। তার মত ভাই সারা দেশ ঘুরলেও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। আমার ভাইয়া বেস্ট বুঝলে? ”

” বুঝেছি। সে শুধু হিটলার নয়, অসভ্য হিটলার। ”

” ভাইয়ার সামনে একবার কথাটা বলতো। দেখব তোমার সাহস কত। ”

” তার সাথে কথা বলতে সাহস লাগবে নাকি? বাহিরে থেকে আসুক তখন বলব। ” মাশিয়া একগুঁয়ে গলায় বলল।

” থাক বলতে হবেনা। তুমি মেয়ে জন্য ছাড় পাবে। ছেলে হলে দাঁত ফেলে দেবে নির্ঘাত। ” শশী হাসছে।

” এত সাহস ঐ হিটলারের! ” মাশিয়া ব্যাঙ্গ করে বলল।

” তুমি জানোনা ভাইয়ার সাহস কত। আমাদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের ছেলে আপাকে বিরক্ত করত। সেটা ভাইয়া জানার পর, তাকে সাবধান করে দেয়। কিন্তু ছেলেটা শোনেনি। আপাকে লাগাতার বিরক্ত করেই যাচ্ছিল। ভাইয়া দুইমাস পর গ্রামে এসে যখন শুনেছে, ছেলেটা এখনও আপাকে বিরক্ত করে, তখন ভাইয়া চেয়ারম্যানের বাড়িতে গিয়ে চেয়ারম্যান, আর উনার স্ত্রী’কে জানায়। তিনদিন পর ভাইয়া ঢাকা চলে যায়। কিন্তু এতেও কাজ হয়না। পরেরবার ভাইয়া ঢাকা থেকে এসে সেই ছেলেকে বাজারের মধ্যে ক্যালানি দিয়েছিল। ক্যালানির চোটে ছেলেটার দুইটা দাঁত ভেঙে গেছিল। এবার বুঝলে ভাইয়া কি? ”

” বলো কি! চেয়ারম্যানের ছেলের দাঁত ফেলে দিয়েছিল! চেয়ারম্যান কিছু বলেনি? হিটলারের কিছুই হয়নি? ” মাশিয়া অবাক হয়ে জানতে চাইল।

” কি হবে! আমার বড় মামা এখানকার এমপি। ছোট চাচা এসপি। খালাতো ভাই এসপি। ভাইয়াকে কিছু বলার সাহস কারও আছে! আর তাছাড়া এলাকায় ভাইয়ার একটা প্রভাব আছে। ”

” সেজন্যই তোমার হিটলার ভাই এমন ভাব দেখায়। চল লাইব্রেরি দেখে আসি। ”

” একটু অপেক্ষা কর, আম্মার কাছ থেকে ঐ ঘরের চাবি নিয়ে আসি। ঐ ঘরে বাহিরের কাউকে ঢুকতে দেয়া নিষেধ আছে। ”

” কে নিষেধ করেছে? ”

” ভাইয়া। বেশ কিছু বই চুরি হওয়ার পর ভাইয়া ঐ ঘরটায় তালা দিয়েছে। ”

মাশিয়া আলমারি ভর্তি বই দেখে হা হয়ে গেছে। কয়েকটা আলমারি ভর্তি গাদা গাদা বই। ওদের ভার্সিটির লাইব্রেরীর থেকে কম বই এখানে নেই।
মাশিয়া আরও অবাক হয়, যখন শুনে গ্রামের প্রাইমারি এবং হাইস্কুলের লাইব্রেরী আরমানের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। এবং লাইব্রেরীতে অধিকাংশ বই আরমান দিয়েছে।

লাইব্রেরী থেকে ওরা বাগানে আসল। বাড়ির পেছনে পুকুর আর পুকুরের পাড় ঘেঁষে থাকা বাগানে হরেকরকমের গাছ। মাশিয়া ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে বাগানের আনাচকানাচে। গাছ ভর্তি সফেদা দেখে সেদিকে এগিয়ে যায়।

” শশী, এগুলো নিব কিভাবে? ”

” তুমি একটু দাঁড়াও, আমি পাশের বাড়ি থেকে একজনকে ডেকে নিয়ে আসছি। ওকে দিয়েই সফেদাগুলো পেড়ে নেই। ”

চোখের সামনে এতগুলো সফেদা দেখে মাশিয়া ভিষণ খুশি। ছোটবেলা থেকেই সফেদা ওর পছন্দের ফল। সেজন্য প্রতি সিজনেই কল্পনা মোর্তাজা সফেদা কিনতেন। বাসায় সফেদা দেখে যেমন খুশি হত মাশিয়া, আজ তার থেকেও বেশি খুশি হয়েছে। আজকের মত অভিজ্ঞতা অতীতে কখনোই হয়নি ওর।

আয়েশা খানম ছেলের বউয়ের বাচ্চামো দেখে হাসছেন। আরমান বাড়িতে এসে মাশিয়াকে সফেদা খেতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। মাশিয়াও ওকে দেখে বরাবরের মত মুখ বাঁকালো।

” আম্মা, এই হিটলারকে আমার দিকে তাকাতে নিষেধ করে দিন। এমনভাবে তাকালে আমার পেটে অসুখ করবে। আর আমার পেট খারাপ হলে সবচেয়ে বেশি খুশি হবে এই হিটলার। তাই আগেভাগেই তাকে সাবধান করে দিন। ”

মাশিয়ার কথা শুনে আয়েশা খানম মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকলেন। তিনি বেশ বুঝতে পারছেন মেয়েটাকে সামলানো কঠিন হবে। আর তাছাড়া তার ছেলেও মনে হয় ছেড়ে কথা বলবেনা।

এদিকে আরমান ওর মা’য়ের দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে।

চলবে…

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_১৮
জাওয়াদ জামী জামী

কেটে গেছে পনেরদিন। এই পনেরদিনে আরমান, মাশিয়ার সম্পর্কে কোন উন্নতিই হয়নি। বরং অবনতিই হয়েছে বলা যায়। এই কয়দিন আরমান নিয়মকরে মাশিয়াকে পড়িয়েছে। মাশিয়া ফাঁকিবাজি করতে গেলেই ধমকে ওকে দাবিয়ে রেখেছে আরমান। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে না চাইলেও মাশিয়ার কপালে ধমক জুটেছে। মোটকথা একটা সম্পর্কের অবনতি হতে যা যা লাগে, তার সবই এ কয়দিনে ঘটেছে।

মাশিয়াও এই পনের দিনে ওর বাবা-মা’ র সাথে একবারও কথা বলেনি। মিরাজ মোর্তাজা, কল্পনা মোর্তাজা, মাহিন প্রতিদিনই আরমানের কাছে ফোন দিয়ে মাশিয়ার সাথে কথা বলতে চায়। আরমান নিজের ফোন মাশিয়াকে দিলেও মাশিয়া কারও সাথে কথা বলেনা। আরমান মাশিয়াকে বারবার ফোন অন করতে বলেছে, কিন্তু মাশিয়াকে এই কথা শোনাতে পারেনি। আরমান অনেক চেষ্টা করেও মাশিয়ার ফোন খুঁজে পায়নি।

মিরাজ মোর্তাজা ফোন করে জানিয়েছেন, আগামীকাল তিনি স্ত্রী’কে নিয়ে আরমানদের বাড়িতে আসবেন। আরমান সেকথা আয়েশা খানমকে জানালে, আয়েশা খানম অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। কথাটা মাশিয়ার কানে গেলেও সে নিরুত্তাপ ভাব দেখায়।

পরদিন খুব ভোরে মিরাজ মোর্তাজার গাড়ি আরমানের উঠানে এসে দাঁড়ায়। তারা রাত এগারোটার দিকে রওনা দিয়েছিলেন। গাড়ির হর্নের আওয়াজ পেয়ে আরমান বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। ওর পিছুপিছু আয়েশা খানমও গেলেন।

মাশিয়াকে দেখে কল্পনা মোর্তাজা দৌড়ে আসলেন। জড়িয়ে ধরলেন বুকের ভেতর। কিন্তু মাশিয়া কোনরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়না।

” মাশিয়া, এখানে কেমন লাগছে তোমার? বেয়াইন অনেক ভালো মানুষ। সে তোমাকে অনেক আদর করে দেখছি। ” মিরাজ মোর্তাজা মাশিয়াকে নিজের কাছে টেনে নিলেন। তারা নাস্তা করে মাশিয়ার ঘরে এসে বসেছেন।

” যখন দেখতেই পাচ্ছ ভালো আছি। তখন আলাদাভাবে জিজ্ঞেস করার দরকার কি। ” মাশিয়া অন্য দিকে তাকিয়ে থাকল।

মিরাজ মোর্তাজা বুঝতে পারছেন তার মেয়ের রাগ এখনও কমেনি। তিনি মেয়েকে বোঝাতে চাইলেন।

” এভাবে বলতে নেই, মা। এটা এখন তোমার নিজের বাড়ি। তুমি একটু মানিয়ে চল, দেখবে এরা তোমাকে মাথায় তুলে রাখবে। প্রথম প্রথম হয়তো একটু খারাপ লাগবে। কিন্তু একসময় দেখবে এদেরকে ছাড়া তুমি থাকতেই পারবেনা। ” মিরাজ মোর্তাজা মেয়ের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছেন।

” পরাজিত কারও সামনে বসে এমন উপদেশ দেয়াই যায়, পাপা। যখন সেই পরাজিত মেয়েটা তার বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে একটা সাধারণ বাড়িতে এসে নিজের সাথে যুদ্ধ করছে। একবার নিজেকে আমার জায়গায় বসিয়ে দেখ, যতটা সহজে কথাগুলো বলতে পারছ, কাজের বেলায় ঠিক ততটাই কঠিন। যে মেয়ে কখনো এসি রুম ছাড়া রাত কাটায়নি, যার বেডরুম ফাইভ স্টার হোটেলের রুমের মত আরামদায়ক ছিল, তাকে এখন একটা মাটির ঘরে দিনরাত কাটিয়ে দিতে হচ্ছে। ঝকঝকে তকতকে ওয়াশরুমের বদলে তাকে গ্রামের একটা সাধারণ গোসলঘরে শাওয়ার নিতে হচ্ছে। সারাদিন যার প্রঢোজন মেটাতে আশেপাশে কয়েকজন কাজের মানুষ ঘুরঘুর করত, আজ তাকেই কপর্দকশূন্য অবস্থায় অজপাড়াগাঁয়ের এক অতিসাধারণ বাড়িতে দিন কাটাতে হচ্ছে। একমাত্র ছেলেকে তো ঠিকই লাখপতির ঘরে বিয়ে দিয়েছ, কিন্তু নিজের মেয়ের বেলায় কেন এত তাড়াহুড়ো বলতে পারো? বোঝা হয়েছিলাম তোমাদের? তাই বোঝা ঘাড় থেকে নামাতে বাছ-বিচার না করেই একটা সাধারণ বাড়িতে পাঠিয়ে দিলে? ” মাশিয়া ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

ঘরের পেছনে স্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরমান। ও একজনকে দিয়ে গাছ থেকে ডাব নামিয়ে বাড়ির ভেতর আসছিল। ঠিক তখনই মাশিয়ার কথাগুলো ওর কানে যায়। স্বম্বিৎ ফিরতেই তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে পা বাড়ায় বাড়ির ভেতরে।

” মাশিয়া, তুমি পাগল হয়েছ! তুমি বোঝা হতে যাবে কেন? তুমি আমাদের সন্তান। আমাদের আদরের সন্তান। তোমাকে আরমানের সাথে বিয়ে দিয়েছি তারমানে এই নয় যে, ও অযোগ্য কেউ। তোমাকে আমরা যোগ্য ছেলের হাতে তুলে দিয়েছি। এক হিসেবে দেখতে গেলে মাহিনের শ্বশুর বাড়ির থেকেও তোমার শ্বশুরের পরিবার সম্ভ্রান্ত। যেটা তুমি আজ বুঝতে পারছনা, কিন্তু একদিন ঠিকই বুঝতে পারবে। ” কল্পনা মোর্তাজা মাশিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন।

” প্লিজ মম, এসব শুনতে আমার ভালো লাগছেনা। তোমরা হঠাৎ এখানে কেন আসলে? দেখতে এসেছ, তোমাদের বেয়াদব মেয়ে কেমন ভুগছে? আমিতো তোমাদের কাছে বিচার দেইনি। তবে কেন এসেছ? ”

” মাশিয়া, দশদিন হয়েছে তোমার বিয়ের। তোমাকে দেখতে মন চায়না আমাদের! তুমি এই কয়দিন আমাদের সাথে কথা বলোনি, কত কষ্ট হয়েছে আমাদের, সেই ধারনা তোমার আছে? তুমি কেন বুঝতে পারছনা, আমরা তোমার ভালো চাই। ” কল্পনা মোর্তাজা হাল ছাড়লেননা।

” আমি কি একবারও বলেছি, আমি খারাপ আছি? আমি যখন ভালোই আছি, তখন আমাকে দেখতে আসার দরকার কি! আর কখনো আমাকে দেখতেও আসবেনা, আর ফোনও করবেনা। ” মাশিয়া এই কয়দিনের রাগ বাবা-মা’কে উগড়ে দিচ্ছে।

মিরাজ মোর্তাজা ও কল্পনা মোর্তাজা স্তব্ধ হয়ে দু’জন দু’জনের মুখপানে তাকিয়ে থাকলেন।

সেদিন রাতের খাবার পর মিরাজ মোর্তাজা স্ত্রী’কে নিয়ে বিদায় নিলেন। বিদায় বেলায় কল্পনা মোর্তাজা কান্নার দমকে ঠিকমত কথা বলতে পারলেননা। মিরাজ মোর্তাজাও কাঁদলেন। একমাত্র মাশিয়া পাথরের মত মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকল। কোন কথাই বললনা।

আরও সাতদিন পেরিয়ে গেছে। এই সাতদিনে আরমান সেদিনের কথপোকথনের বিষয়ে মাশিয়ার সাথে কোন কথাই বলেনি। সে সম্পূর্ণরূপে মাশিয়াকে এড়িয়ে চলেছে। তবে ওর পড়াশোনার ব্যাপারে নজর ঠিকই রেখেছে। নিয়মকরে শশী আর সুধার সাথে পড়তে বসিয়েছে। মাশিয়াও কোন ঝামেলা করেনি। মন দিয়ে পড়াশোনা করছে। আর কয়েকদিন পর শশীর এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। শশী কোমড় বেঁধে পড়াশোনা করছে।

” শশীবালা, আর কত পড়বে? এবার একটু ওঠ। চল বাগানে যাই। গাছে অনেকগুলো বরই পেকে আছে দেখলাম। আমি একা গেলে ঐ হিটলার যদি ধমক দেয়। তুমিও চলোনা। সুধা বাড়িতে থাকলে তোমাকে ডাকতামনা। ” শশীর পড়ার ব্যাঘাত ঘটিয়ে বলল মাশিয়া। মাশিয়ার অনুনয়ে শশী হেসে বই বন্ধ করল।

” চল যাই। তবে তোমার হিটলার যদি আমাকে ধমক দেয়, তবে সেই দায় কিন্তু তোমার। ”

” শোন, হিটলার যদি ধমক দেয় তবে তুমি বলবে, পড়তে পড়তে মাথায় জ্যাম লেগেছে। তাই জ্যাম ছাড়াতে বাগানে এসেছ। সিম্পল, হিটলাও রাগলোনা। আমাদের বরই খাওয়াও হলো। ”

” তোমার যা বুদ্ধি, ভাবি। এজন্যই মনে হয় ভাইয়া তোমার সাথে পেরে ওঠেনা। চল যাই। ”

ওরা বাগানে এসে মনের সুখে বরই খাচ্ছে। তবে খাচ্ছে কম, খিলখিল করছে বেশি। এক ঘন্টার বেশি হয়েছে বাগানে এসেছে। এরইমধ্যে আরমান বাড়িতে এসেছে। ও আসার পর শশী আর মাশিয়াকে না দেখে আয়েশা খানমকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, ওরা বাগানে গেছে।

একঘন্টা পরও যখন ওরা বাড়িতে আসলনা তখন আরমান বাগানে যায়।

” একঘন্টায় শুধু পুরো গাছের বরই নয়, পুরো গাছটাই খাওয়া যাবে। বরইয়ের সাথে সাথে গাছও খেতে চাস নাকি ? ব্যবস্থা করব? ”

মাশিয়া আর শশী মনের সুখে বরই খাচ্ছিল, তখনই আরমানের গলা শুনে চমকে উঠল। শশী ভয়ে ভয়ে মাশিয়ার দিকে তাকায়। মাশিয়া ঢোক গিলে আরমানের দিকে তাকায়।

” ও সেই সকাল থেকে পড়ছে। পড়ার চাপে শ্বাস আটকে আসছিল, তাই আমি ওকে ফ্রেশ বাতাস সেবন করাতে বাগানে নিয়ে এসেছি। তাইনা শশী? এখন তোমার শ্বাস ঠিক আছেনা? মাথার জ্যামও তো ছুটেছে তাইনা? ” হঠাৎই আরমানের গলা শুনে মাশিয়াও চমকে গেছে। তাই শশীর দিকে তাকিয়ে আরমানকে সাফাই দেয়ার চেষ্টা করছে। আর সেই সাথে শশীকে চোখ টিপে নিজের কথায় সায় দিতে বলছে।

” ভাবি ঠিক বলেছে, ভাইয়া। পড়তে পড়তে মাথায় জ্যাম ধরেছিল। তবে এখন ঠিক আছি। ভাবি, চল বাড়িতে যাই। ”

আরমানকে পাশ কাটিয়ে ওরা বাড়িতে ঢুকতেই আরমানের কথা শুনে থমকায়।

” মনে রাখিস, রেজাল্ট খারাপ হলে শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দেব। আর আমি যে ফাঁকা আওয়াজ দেইনা এটা তুই ভালো করেই জানিস। ”

” আমি মন দিয়েই পড়ছি, ভাইয়া। রেজাল্টও ভালো হবে দেখে নিও। শুধু শুধু ভয় দেখিওনা। ”

” বাদ দাওতো, শশীবালা। এই হিটলারকে ভয় পাওয়ার কি আছে? তোমার রেজাল্ট খারাপ হলে না-হয় বিয়ে দেবে। তা দিক। কিন্তু সে কি করেছে! সে তো চাকরি ছেড়ে তবে বিয়ে করেছে। সে চাকরি ছেড়ে যদি আমার মত একটা সুশীলা, সুন্দরী, ট্যালেন্ট মেয়ে পায়, তবে তুমিও রেজাল্ট খারাপ করে হ্যান্ডু একটা জামাই পাবে। মিলিয়ে নিও আমার কথা। ”

আরমান রাগে গজগজ করে তাকায় মাশিয়ার দিকে। কিন্তু মাশিয়া ওর রাগ দেখলেতো। ও আরমানকে ভেংচি কেটে বাড়ির ভেতর ঢুকে যায়।

বাড়ির উঠান ভর্তি পেঁয়াজ দেখে মাশিয়ার চোখ কপালে উঠল। এত পেঁয়াজ একসাথে ও আগে কখনোই দেখেনি। বাহিরের উঠানে তখনও কয়েক ভ্যান ভর্তি পেঁয়াজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন মজদুর।

” আম্মা, এত পেঁয়াজ কোথায় থেকে আসল! এত পেঁয়াজ দিয়ে কি করবেন? কতদিনে খাবেন? ” মাশিয়ার কথা শুনে আয়েশা খানম জোরে হেসে উঠলেন।

” পা’গ’লী মেয়ে, এইগুলা বিক্রি করবার জন্য। আম্গোর জমির পেঁয়াজ এডি। এত পেঁয়াজ খাওন যায়? তুমি এই বাড়িতে আওনের পর প্রথম ফসল এডি। মাগো, তুমি খুবই সুলক্ষণা। এত বছর ধইরা পেঁয়াজের চাষ করি, এত পেঁয়াজ কোন বারই হয়নাই। এইবার আল্লাহ রহমত দিছে। ”

আয়েশা খানমের কথার জবাবে মাশিয়া কিছু না বলে অবাক চোখে উঠান ভর্তি পেঁয়াজের দিকে তাকিয়ে থাকল।

” এই যে অসভ্য মাস্টার, পেঁয়াজের কাছ থেকে দূরে থাকুন। এমনিতেই আপনার যত ঝাঁঝ। এই ঝাঁঝের সাথে পেঁয়াজের ঝাঁঝ মিশলে নির্ঘাত নিউক্লিয়ার বো’মে’র ন্যায় তেজ হবে আপনার মেজাজের। যা পরিবার এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। সেই সাথে আমার জন্যও। ”

আরমান দেখল ওর চাচাতো ভাইয়ের বউ মাশিয়ার কথা শুনে ঠোঁট টিপে হাসছে। আয়েশা খানমও হাসতে হাসতে রান্নাঘরের দিকে গেলেন। শশীতো হো হো করে হেসে উঠল।

চলবে…