যেখানে_দিগন্ত_হারায় পর্ব-২৭+২৮

0
154

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_২৭
জাওয়াদ জামী জামী

” আম্মা, তুমি খাবে কখন? এভাবে কতদিন অন্যের মাছের কাঁ’টা বেছে দেবে? যার কাজ তাকেই করতে দাও। তার যদি মাছ খাওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে সে নিজেই মাছের কাঁ’টা বাছবে। ” আয়েশা খানমকে মাশিয়ার জন্য মাছের কাঁ’টা বাছতে দেখে রেগে যায় আরমান।

” বাপ, তুমিতো জানোই বউমা কাঁ’টা’র জন্য মাছ খাইতে পারেনা। তা-ও এইভাবে কথা কও কেন? তোমরা খাইয়া নেও। আমি তোমগোরে খাওয়া হইলেই খামুনে। ”

” আম্মা, প্লিজ এভাবে সাফাই গাইবেনা বলে দিচ্ছি। আরও কতদিন তুমি এভাবে আরেকজনের মাছের কাঁ’টা বেছে দিবে? যার কাজ তাকে করতে দাও। কাজ না পারলে তাকে সেটা শিখতে হবে। এভাবে তুমি তার সব কাজ করে দেয়ায় কোন সমাধান হবেনা। তুমি ছোটবেলা থেকেই আমাদের শিখিয়েছ, নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয়। পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে অন্যের কাছে নিজের ব্যক্তিত্ব থাকেনা। নিজের কাজ নিজেই করার মধ্যে লজ্জা থাকতে নেই। তবে আজ কেন তুমি আরেকজনের হয়ে সাফাই গাইছো? সে যতদিন মাছের কাঁ’টা বাছতে না পারবে ততদিন প্রয়োজনে সে মাছ খাবেনা। বুঝেছ আমার কথা? ”

মাশিয়া চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে। আরমানের দিকে চোখ তুলে তাকানোর মত সাহস ওর নেই। চুপচাপ ভাতের প্লেটে আঁকিবুঁকি করছে। ওর ডাগর আঁখিতে উপচে পড়ছে নোনাজল। যেকোন মুহূর্তে ওরা ঝরে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে আরমানের রাগের কারন ও ঠিকই বুঝতে পেরেছে।

সুধা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ওর গম্ভীর ভাইয়ার দিকে। যে কখনোই কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলেনি। ছোট-বড় নির্বিশেষে সবাইকে সম্মান করেছে। যে কারনে সব সময়ই ও ভাইকে নিজের আর্দশ মানে। কিন্তু আজ তার ভাইয়া এসব কি বলছে!

শশীও খাওয়া বন্ধ করে তাকিয়ে আছে ওর ভাইয়ার দিকে। এ কোন ভাইয়াকে দেখছে ও!

” আরমান! তুমি কি ভুইলা গেছ কারে কি কইতাছো? হেয় তোমার বউ। হেয় সব ছাইড়া তোমার ভরসায় এই সংসারে আইছে। কিন্তু সেই তুমিই যদি তারে আঘাত কর, তবে হেয় সইবো কেম্নে? আমি বউমারে মাছের কাঁ’টা বাইছা দিতাছি, এতে আমার কুন কষ্ট হয়না। কিন্তু তুমি এত কথা কইতাছো কেন? ” আয়েশা খানম আজ প্রথমবার ছেলের ওপর রেগে উঠলেন। যিনি তার ছেলের সাথে আজ পর্যন্ত উঁচু গলায় কথা বলেননি, আজ তিনি ছেলেকে ধমকালেন।

এদিকে আরমানও কম যায়না। ও যেন আম্মার কথার প্রত্যুত্তর দেওয়ার জন্য তৈরীই ছিল।

” আমাকে ধমক দিলেই কি সত্যিটা বদলে যাবে, আম্মা? আমাকে তুমি দেখাতে পারবে কোন শ্বাশুড়ি তার ছেলের বউকে পাঁচ-ছয় মাস লাগাতার মাছের কাঁ’টা বেছে দেয় কিংবা মুখে তুলে খাইয়ে দেয়, তার সব কাপড় ধুয়ে দেয় ? হ্যাঁ, তবে প্রয়োজনবোধে দিতে পারে কিছুদিন। দিনের পর দিন কেউই এমনটা করবেনা। এতকিছুর পরও যদি অপরদিক থেকে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করত, নিজের কাজ নিজে করার চেষ্টা করত তবে তোমাকে বাঁধা দেয়ার কোন কারনই আমার ছিলনা। কিন্তু সে আজ পর্যন্ত তোমার প্রতি সামান্য কৃতজ্ঞতাটুকুও দেখায়নি,সম্মানতো দূরের কথা। আর এখানেই আমার আপত্তি। ”

আয়েশা খানম ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন তার ছেলে প্রচন্ড রেগে আছে। আর তিনি তার ছেলের রাগ সম্পর্কে ভালো করেই জানেন। তাই তিনি ছেলেকে আরও রাগিয়ে দিতে চাইলেননা। তবে মাশিয়ার অপমানও তিনি সইতে পারছেননা।

” বাপ, বউমা আমাকে যথেষ্ট সম্মান করে। দুনিয়ার সগ্গলেরই কি সম্মান প্রকাশের ধরন এক হয়, বাপ? মানুষ হিসাবে আমগোর কি কুন পার্থক্য নাই? সগ্গলেই কি আমরা সমান? বউমাও তাই। তার হয়তো প্রকাশ করার ধরন অন্যরকম। তুমি এসব নিয়া মাথা ঘামাইওনা। তুমি খাইয়া নেও। ” আয়েশা খানম নরম গলায় বললেন। তিনি চাইছেননা আরমান আরও রেগে যাক।

” তুমি কি চাও আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই? এবং সেটা চিরদিনের জন্য? ”

আরমানের কথা শুনে আয়েশা খানমের হাত থেমে গেছে। তার চোখে জমা হয়েছে বেদনার অশ্রুজল।

” বাপ! তুমি কি কইলা! তুমি ভালো কইরাই জানো, তুমি আমার কি। তোমার মুখের দিকে তাকায়াই আমি আইজও বাঁইচা আছি। তুমি এমন কথা কইবার পারলে, বাপ? ”

” কাঁদবেনা, আম্মা। তুমি ভালো করেই জানো, তোমার এক ফোঁটা চোখের পানির মূল্য আমি সারাজীবনেও দিতে পারবনা। তাই বলছি, আমাকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করবেনা। তুমি যদি আমাকে চোখের সামনে দেখতে চাও, তবে আমার কথা তোমাকে মানতে হবে। আজ থেকে ও নিজের সব কাজ নিজেই করবে। এমনকি ওর কাপড়চোপড়ও ও নিজেই ধুবে। শিল্পী আপা ওর কোন কাজ করে দেবেনা। এবং যতদিন না সে নিজেকে পরিবর্তন করছে, ততদিনই ওকে নিজের কাজ নিজেরই করতে হবে। সেটা আমি বাড়িতে থাকলেও করবে, না থাকলেও করবে। তুমি আমার কাছে ওর পক্ষে কোন সাফাই দেবেনা, এমনকি ওর কাজের ব্যাপারে একটা মিথ্যাও বলবেনা। ও কোন কাজ করবেনা কিন্তু তুমি বলবে সব কাজই ও করেছে এটা হবেনা। ”

আরমানের শর্ত শুনে আয়েশা খানম হতাশ হলেন। মাশিয়াও চমকে উঠল। কিভাবে করবে সে নিজের কাজ! যেখানে সামান্য বিছানা গোছাতে গেলেই ওর কালঘাম ছুটে যায়। তবে এই মুহূর্তে ও আরমানের সাথে কথা বলতে চাওয়ার মত বোকামি করতে চায়না। এখন সা’পে’র লেজে পা দেয়া, আর আরমানের সাথে কথা বলতে চাওয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কারন ওর কাছে এখন আরমানকে বি’ষ’ধ’র সা’পে’র থেকে কম কিছু মনে হচ্ছেনা।

সেই রাতেও আরমান তার লাইব্রেরীতে ঘুমাল। মাশিয়ার রাত কাটল ভয়ে ভয়ে। বাহিরে কোনও শব্দ হলেই ও ভয়ে কাঁপছে।

” বউমা, এই ধরো টাকা। সুধার সাথে গিয়া নিজের জন্য সালোয়ার কামিজ কিন্না আনো। ” পরদিন সকালে আয়েশা খানম মাশিয়াকে ছয় হাজার টাকা দিলেন।

” আমারতো অনেকগুলি সালোয়ার কামিজ আছে, আম্মা। ” মাশিয়া বেশি কিছু বললনা। গত রাতের ঘটনার পর থেকেই ওর মন খারাপ। মাথায় নানান চিন্তা ঘুরঘুর করছে।

” অনেকগুলা আছে তো কি হইছে! আবার কিনবা। এইডা ধান বিক্রির টাকা। তোমাগোর তিনজনকে ধান বিক্রির টাকা থাইকাই দিতাছি। আগে রসুন হইল, সরিষা হইল সেইগুলা বিক্রির টাকা খরচ করিনাই। ঐ টাকাগুলান জমি কিনবার জন্য রাইখা দিছি। কয়দিন পর আবারও গম বিক্রির টাকা দিমুনে। ”

মাশিয়া তৈরী হয়ে আয়েশা খানমের ঘরে এসে দেখল মা ছেলে কথা বলছে।

” আম্মা, আমার আবার যেতে হবে কেন বলতো? সুধা, শশী ওরা কি মার্কেট চেনেনা! ওরা প্রতিদিনই কলেজে যায়। সবকিছু ওদের পরিচিত। তুমি শুধু শুধুই এর ভেতর আমাকে টানছ। ”

” হেরা প্রতিদিন কলেজে যায়। কেনাকাটা করবার যায়না। আর তাছাড়া কোন কিছু কিনার দরকার থাকলে হেরা মিতু বউমার সাথে যায়। আমি তোমার দুই বোনকে একা কেনাকাটা করবার পাঠাইনা। আর এখন যখন তুমি বাড়িতেই আছো, তখন মিতু বউমাকে কষ্ট দেয়ার দরকার নাই। ”

” আচ্ছা, কি আর করা। তুমি ওদেরকে তারাতারি রেডি হতে বল। আমি অটোরিক্সা ডাকছি। ” আরমান একটিবারের জন্যও মাশিয়ার দিকে তাকায়না সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আয়েশা খানম গমনরত ছেলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তিনি মাশিয়ার কাছে আসলেন। পরম স্নেহে হাত রাখলেন মাশিয়ার মাথায়।

” মাগো, সংসার একটা বিচিত্র জায়গা। এইখানে যেমন অফুরান ভালবাসা, মায়া রইছে, তেমনি রাগ, হিংসা, ঘৃণাও রইছে। তুমি যদি চাও তয় রাগ, হিংসা, ঘৃণা বাদ দিয়া শুধু ভালবাসা আর মায়া বাইছা নিবার পারবা। দেখবা তোমার জীবনে তখন সীমাহীন সুখেরা রাজত্ব করব। পুরুষ মানুষ হইল মোমের মতন। তাদের উপরেরটা শক্ত দেখা গেলেও, ভালোবাসা নামক আ’গু’নে’র কাছে গইলা পানি হইয়া যায়। ভালোবাসা দিয়াই তাগোরে বশ করন লাগে। তাগোরে যতই দূরে ঠেইলা দিবা, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে যাইব। ভালোবাসাই হইল তাগোরে বাইন্ধা রাখনের হাতিয়ার। তাই কইতাছি, তুমি আমার ছেলেরে দূরে যাইতে দিওনা। ওরে ভালোবাসা দিয়া বাইন্ধা নেও। তুমি আইজ না বুঝলেও একদিন ঠিকই বুঝবা যে, আমার আরমানের মত ছেলে সচরাচর দেখা যায়না। একদিন তুমি আফসোস করবা আরমানের মত পরশপাথরকে দূরে ঠেইলা দিছিলা জন্য। এতদিন যা হওয়ার হইছে। তুমি ওর সাথে কথা কও, ওরে রাগবার দিওনা। ওর রাগ যেমন কঠিন তেমনই ওর ঘৃণা আরও বেশি কঠিন। আমার কথা বুঝবার পারছ তুমি? ”

মাশিয়া কিছু না বলে মাথা নাড়ায়। ওর ভেতরে চিন্তার ঝড় বইছে।

শপিংমলের সামনে এসে অটোরিকশা দাঁড়ালে ওরা নেমে আসে। মাশিয়া ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে আছে শপিংমলের দিকে। ও আগে কখনোই এত ছোট মলে শপিং করেনি। মনে মনে ভাবছে, এখানে কি পছন্দমত সালোয়ার কামিজ পাওয়া যাবে?

” হেই আরমান, হোয়াট আ সারপ্রাইজ! কতদিন পর তোমার সাথে দেখা হল! আজকাল ঘাপটি মে’রে থাকতেও শিখে গেছ! ”

বেশ সুশ্রী একটা মেয়ে কোথায় থেকে এসে আরমানের বাহু জড়িয়ে ধরল। সুধা আর শশী একে-অপরকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। সুধা আঁড়চোখে মাশিয়ার দিকে তাকালে মাশিয়ার থমথমে মুখ দেখে ঢোক গিলল।

” স্নিগ্ধা! তুমি এখানে? কেমন আছো? ”

” আমি সব সময়ই ভালো থাকি, হ্যান্ডসাম। তুমি আগের থেকে বেশি এ্যাট্রাকটিভ হয়ে গেছ দেখছি! ঘটনা কি? আমিতো জানতাম বিয়ের পর মেয়েদের পরিবর্তন হয়, কিন্তু তোমাকে দেখে সেই ধারনা পাল্টে গেল। ”

স্নিগ্ধা নামক মেয়েটির কথায় আরমান হাসল।

” তুমি আগের মতই ফাজিল আছো। একাই এসেছ নাকি সাথে কেউ আছে? ”

” উহু একাই এসেছি। কিন্তু তুমিতো একা নও দেখছি। এরা কারা? ”

আরমান শশী আর সুধাকে স্নিগ্ধার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

” দুইজনের পরিচয় তো জানলাম। তৃতীয়জনটি কে? তার সাথেও পরিচয় করাও। ”

আরমান ইতস্তত করে বলল,

” এ মাশিয়া। আমার আম্মার ছেলের বউ। ”

আরমানের কথা শুনে স্নিগ্ধা হাসিতে ফেটে পরল। অনেক চেষ্টায় হাসি থামিয়ে বলল,

” তোমার আম্মার ছেলেটি কে? তোমার কি কোন বড় ভাই আছে? বড় ভাইয়ের বউ হলে, মাশিয়া তোমার ভাবি হয়। আর যদি ছোট ভাইয়ের বউ হয়, তবে সে তোমার ছোট বোনের মত। তাকে যেকোন একটা সম্ভাষণ করা তোমার জন্য ফরজ কাজ। ”

” মাফ কর। আমি আমার আম্মার একমাত্র ছেলে। সে হিসেবে এ আমার বউ। হয়েছে? ”

স্নিগ্ধা ওদের সাথে কথা বলল। ওরা এতক্ষণ ধরে শপিংমলের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। স্নিগ্ধার সাথে কথা বলে আরমান জানতে পারল, সে-ও কেনাকাটা করবে। এদিকে আরমানের এসব মোটেও ভালো লাগেনা।

” সুধা, তোরা গিয়ে কেনাকাটা কর। আমি এখানেই আছি। আমি এই কফিশপে বসছি। তোরা শপিং করে এখানে আসিস। ” আরমান শপিংমলে লাগোয়া কপিশপ দেখিয়ে বলল।

সুধা আর কিছু না বলে ওদের নিয়ে ভেতরে গেল।

শপিং শেষে ওরা কফিশপে যায়। সেখানে আরমান ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল। কফিশপে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে ওরা বেরিয়ে পরল। এখন সোজা বাড়ির দিকে যাবে।

স্নিগ্ধা আরমানের পাশে হাঁটছিল।

” এখনই চলে যাবে? কতদিন পর দেখা হলো। কিন্তু মন খুলে গল্পই করতে পারলামনা। ভার্সিটি লাইফ শেষ হওয়ার পর বন্ধুদের সাথে হয়না বললেই চলে। সবাই মিলে জম্পেশ আড্ডা দিতাম। অবশ্য তুমি ব্যাতিক্রম ছিলে। পড়া ছাড়া কিছুই বুঝতেনা। আমরা তোমাকে দেখে হিংসা করতাম। কিন্তু এখন আমার স্টুডেন্টদের তোমার গল্প শোনাই। তোমার মত একজন আদর্শ মানুষের গল্প শুনে ওরা অভিভূত হয়ে যায়। ”

স্নিগ্ধা যেন সেই ভার্সিটি লাইফে ফিরে গেছে। আরমানের চোখেও ভেসে ওঠে সেইসব দিনগুলি। সেইসব স্মৃতি ভোলার নয়।

” সুধা, তোরা বাড়িতে যা। আমি পরে আসছি। ”

আরমান ওদেরকে অটোরিকশায় তুলে দেয়। মাশিয়া এতক্ষণ ওদের কথপোকথন শুনছে আর ফুঁসছে।

স্নিগ্ধাও ওদের থেকে বিদায় নেয়। ওদের অটো ছেড়ে দিলে আরমান স্নিগ্ধাকে নিয়ে রিক্সায় উঠল।

মাশিয়া অটোরিকশার পেছনে তাকিয়ে দেখল আরমান আর স্নিগ্ধা রিক্সায় উঠেছে।

চলবে…

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_২৮
জাওয়াদ জামী জামী

মাশিয়ার থমথমে মুখ দেখে আয়েশা খানম ঘাবড়ে গেলেন। তিনি সুধাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে মাশিয়ার কি হয়েছে জানতে চাইলে সুধা যতটুকু বুঝতে পেরেছে ততটুকুই বলল। সব শুনে আয়েশা খানম হাসলেন। তিনি মাশিয়াকে কিছুই জিজ্ঞেস করলেননা।

বিকেলে আরমান বাড়িতে আসল। ওর হাতে কয়েকটা প্যাকেট। বাড়িতে ঢুকেই ও সুধার হাতে প্যাকেটগুলো ধরিয়ে দেয়।

” এখানে ফুচকা, চটপটি আর বার্গার আছে। চটপটি আর ফুচকার প্যাকেট দুইটা করে আছে। দুইটাতে তোর আর শশীর জন্য ঝাল বেশি দেয়া আছে। আর বাকি দুইটায় মাশিয়ার জন্য আছে। ওর গুলোয় ঝাল কম দিয়ে এনেছি। ”

আরমান প্যাকেটগুলো সুধার কাছে দিয়ে ঘরের দিকে যায়।

মাশিয়া চুপচাপ শুয়ে আছে। ওর কিছুই ভালো লাগছেনা। মাঝে মাঝে সবকিছু ফাঁকা লাগে। দুনিয়ার সবকিছুই বিস্বাদ মনে হয়। কিন্তু কেন এমন হয় সেটা মাশিয়া বুঝতে পারেনা। বুঝতে অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু লাভ হয়নি। কোন এক গোলকধাঁধায় ঘুরে ফিরে বারবার একই জায়গায় এসে দাঁড়াচ্ছে ওর চিন্তাভাবনাগুলো। কেন ওর সবকিছু ফাঁকা লাগে? কোন এক অনিশ্চয়তার দোলাচালে হিয়া সর্বদাই উচাটন থাকে? এমনও নয় যে ও আরমানকে ভালোবাসে, তবু কেন আরমানের সামান্য অবহেলায়ও ওর অন্তর দ্বিখণ্ডিত হয় হরহামেশাই? কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনের কোনে উঁকি দেয়, আরমান কিংবা ও, ওরা কেউ কাউকেই এক বিন্দুও ভালোবাসেনা। যেখানে ভালোবাসা থাকেনা সেখানে অবহেলার সামান্য স্থানটুকুও থাকেনা। তবে কেন আরমানের তরে ওর হিয়া বারেবার ভ’স্মী’ভূ’ত হয়? কেন বিরহের অনলে অঙ্গার হয় ওর অন্তর-বাহিরের সর্বসত্তা? নানান চিন্তার মাঝে যে আরমান ঘরে এসেছে সেটা লক্ষ্যই করলনা। আরমানও একবার মাশিয়ার দিকে তাকায়। কিন্তু ওকে অন্যমনস্ক দেখে কিছু না বলে গামছা৷, ট্রাউজার আর টি শার্ট নিয়ে বাহিরে চলে যায়।

কলপাড়ের সামনে যেতেই আয়েশা খানমের মুখোমুখি হয় আরমান।

” এতক্ষন কই আছিলা, বাপ? বউমা, সুধা ওরা আরও তিনঘণ্টা আগে বাড়িতে আইছে। তোমার এত দেরি হইল কেন? ” আজ আয়েশা খানম তার ছেলের ওপর ভিষণ বিরক্ত।

” আমার এক বন্ধুর সাথে ওর বাসায় গিয়েছিলাম, আম্মা। অনেকদির পর ওর সাথে দেখা হলো। সুধা কিছু বলেনি তোমাকে? ” আরমান একটু অবাকই হয়েছে।

” বউমা তোমার সাথে আছিল, তারপরও তুমি কেন তোমার বন্ধুর সাথে গেলে? বউমা কষ্ট পাইতে পারে এইডা তোমার একবারও মনে হয়নি? ” আয়েশা খানম একটু ধমকের স্বরেই বললেন। তিনি আজ আরমানকে কিছু কড়া কথা শোনাতে চাইছেন।

” মাশিয়া কষ্ট পাবে কেন! আমিতো ওর কষ্ট পাওয়ার মত কিছুই করিনি, আম্মা। অনেকদিন পর স্নিগ্ধার সাথে দেখা হলো, একটা সময় ক্যাম্পাসে আমরা অধিকাংশ সময় কাটিয়েছি। অনেক স্মৃতি আছে বন্ধুমহল ঘিরে। ও চাইছিল আরও কিছুক্ষণ আমরা একসাথে কাটাই। ” আরমান বুঝতে পারল আম্মা ওর ওপর রেগে গেছেন। তাই একটু সাফাই দিতে চাইল।

” তোমার কি বউমাকে সাথে নেয়ার কথা মাথায় আছিলনা? ” এবার আয়েশা খানম সত্যিই রেগে গেলেন। তিনি একটু জোড়েই কথাটা বললেন।

” ও কি আমার সাথে কোথাও যেত বলে তোমার মনে হয়, আম্মা? আমাদের সম্পর্ক যদি আর পাঁচটা সম্পর্কের মত স্বাভাবিক হত, তবে ওকে রেখে কোথাও যাওয়ার কথা আমি কখনোই স্বপ্নেও ভাবতামনা। ” আম্মাকে রাগতে দেখে আরমান নিচু গলায় বলল। ও কখনোই আম্মাকে এভাবে রাগতে দেখেনি। ওর ওপর তো নয়ই।

” এতদিন হইছে, তবুও কেন তোমরা স্বাভাবিক সম্পর্কে জাড়াইতে পারোনাই? তোমার দিক থাইকা তুমি কুন চেষ্টা করছিলা? ” আয়েশা খানম নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন।

” আমি এখনও সুস্থ আছি, আম্মা। তাই ঐ আগ্নেয়গিরির আশেপাশে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারিনা। তুমি কি ভেবেছ, আমি সবকিছু স্বাভাবিক করতে চাইলেও মাশিয়া সেটা হতে দেবে? যে মেয়ে আমার সাথে নরম গলায় দুইটা কথা বলতে পারেনা, সেই মেয়ে আমার সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কে জড়াতে পারে এটা ভাবলেই আমি চোখে অন্ধকার দেখি। আমিতো ওকে সময় দিচ্ছি। সব সময় চাই সময়ের সাথে সাথে ও একটু একটু করে বদলে যাক। স্বাভাবিকভাবে নিক আমাদের সম্পর্ক। ” আম্মাকে স্বাভাবিক হতে দেখে আরমান হাঁফ ছাড়ল।

” মানুষ এম্নেই বদলায়? তুমি যদি অপরপক্ষকে বদলাইতে সাহায্য না কর, তবে বদল হইবো কেমনে? ” আয়েশা খানমের মুখের পেশি টানটান হয়ে গেছে।

” সাহায্য করছিনা, আম্মা! এই যে তুমি ওকে মেয়ের মত দেখ, সুধা আর শশী ওকে আপন বোনের মতই ভালোবাসে, ওর প্রয়োজনমত সবকিছু পাচ্ছে, সর্বোপরি এই বাড়িতে ও মেয়ের মতই ট্রিট পাচ্ছে এটা কি সাহায্য করা নয় বলতে চাইছ? ” আরমান মিনমিন করে বলল।

” আর স্বামীর ভালোবাসা? তুমি যেগুলা কইলা সেইগুলা কি কারন বদলের কারন হইতে পারে বইলা তোমার মনে হয়? আমার কিন্তু সেইডা মনে হয়না। ” আয়েশা খানম নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার কোন চেষ্টাই করলেননা। তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন।

” একটা মানুষকে বদলে দিতে শুধু ভালোবাসাই যথেষ্ট। আর সেই ভালোবাসা মাশিয়ার কমতি নেই। একজন মানুষ যখন কোন সংসারে তার প্রয়োজন মত সবকিছু পেয়ে যায় কিন্তু ভালোবাসা পায়না। সে কিভাবে বদলাবে বলতে পার? ভালোবাসাহীনতার মত কঠিন অসুখ দুনিয়ায় আর দ্বিতীয়টি নেই, আম্মা। কিন্তু শত অনটনের মাঝেও যদি একটা সংসারে পরিপূর্ণ ভালোবাসা থাকে, ভালোবাসাই সেখানের সবকিছু বদলে দেয় । মাশিয়া এখানে আসা অব্দি ভালোবাসার ভালোবাসার ঘাটতি ছিলনা ওর জন্য। আর রইল স্বামীর ভালোবাসা। একটা মেয়ের জীবনে যেটা সবথেকে বেশি প্রয়োজন। কিন্তু মাশিয়া আর আমার মধ্যে ভালোবাসা হওয়াটা কি খুব সহজ ব্যাপার? যেখানে আমিই ওর কাছে ঘৃণার পাত্র। দুনিয়ায় ও যদি কাউকে ঘৃণা করে সেটা আমি। সেই আমাকে ভালোবাসতে ওর সময় লাগবে, আম্মা। আর সেই সময়ই ওকে আমি দিচ্ছি। ” আরমান সত্যি কথাগুলোই বলল।

” সবই বুঝলাম। তুমি আমগোর আর বউমার ভালোবাসার কতা কইলা, নিজের কতা একবারও কইলানা যে? ” আয়েশা খানম চোখের তারায় প্রশ্নেরা ছুটোছুটি করছে।

আয়েশা খানমের কথা শুনে আরমান তার দিকে মলিন হয়ে তাকায়।

” মাশিয়া আমাকে চরম ঘৃণা করলেও, ওর জন্য আমার মনে কোনও ঘৃণা নেই। আমি ওকে প্রথমদিনই একটা বেয়াদব মেয়ে হিসেবে অবলোকন করেছি। একটা মানুষের বেয়াদব হতে যা যা গুণ থাকতে হয়, তার সবই মাশিয়ার মধ্যে ছিল। হয়তো এখন সে একটু একটু করে নিজেকে পরিবর্তন করছে। এই পরিবর্তনই একটা সময় ওকে অন্য মানুষে পরিণত করবে। এখন তুমি যদি বলো আমি ওকে ভালোবাসি কিনা? তবে তার উত্তর হবে, আমি চেষ্টা করছি। ”

” আচ্ছা, তুমি গোসল কইরা আসো। আমি খবার দিতাছি। ” আয়েশা খানম হেসে বললেন। তিনি তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছেন।

” আমি খেয়ে এসেছি, আম্মা। স্নিগ্ধার হাজবেন্ড না খেয়ে আসতেই দিলনা। ” আরমান আঁড়চোখে আয়েশা খানমের দিকে তাকিয়ে বলল।

” বউমা মন খারাপ কইরা শুইয়া আছে। তার মন ভালো করার দ্বায়িত্ব কেডা নিব? ” আয়েশা খানম কপাল কুঁচকে জানতে চাইলেন।

” আর কে! আমাকেই নিতে হবে। ” আরমান আর কিছু না বলে কলপাড়ে যায়।

সুধা প্যাকেট থেকে খাবারগুলো বের করেছে। ও মাশিয়ার খাবারগুলো আলাদা বাটিতে রেখেছে। আয়েশা খানম সেগুলো নিয়ে মাশিয়ার কাছে গেলেন।

” বউমা, এইগুলান খাইয়া নেও তো। তোমার জন্য আমার পোলায় নিয়া আসছে। ” মাশিয়াকে শুয়ে থাকতে দেখে তার দিকে এগিয়ে গেলেন আয়েশা খানম। খাবারের ট্রে এখনও তার হাতে।

” খাবারগুলো আপনার ছেলেকেই গিলতে বলেন, আম্মা। সে বেশি করে গিলুক তার আনা খাবার। ” মাশিয়া খেঁকিয়ে উঠল।

” হেয় তোমার জন্য ঝাল কম দিয়া চটপটি, ফুচকা আনছে। সুধা আর শশী দুই’জনেই ঝাল বেশি খায়, তাই তোমার জন্য আলাদা প্যাকেটে নিয়া আসছে। ” আয়েশা খানম মাশিয়াকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন।

” এগুলো ঐ অসভ্য মাস্টারকেই খেতে বলেন। তার তো এমনিতেই মাশাআল্লাহ অনেক ঝাল। ঝাল ছাড়া চটপটি, ফুচকা খেয়ে যদি সে এবার নির্ঝাল হয়। ” মাশিয়া ভুল করেও আয়েশা খানমের দিকে তাকায়না।

” মা গো, আমার পোলায় তোমার জন্য ভালোবাইসা খাবারগুলান নিয়া আসছে। তুমি না খাইলে ওর মন খারাপ হইব। উইঠ্যা খাইয়া নেও, মা। ”

” আমি এসব না খেলেও চলবে, আম্মা। আপনার ছেলের অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী, বান্ধবীমহল আছে তার কেনা খাবার খাওয়ার জন্য। যেসব বান্ধবী ছাড়া সে অচল। ” মাশিয়া রাগে গজগজ করতে করতে বলল।

এতক্ষণ আরমান দরজায় দাঁড়িয়ে সবটা শুনছিল। এবার ও ভেতরে আসল।

” আম্মা, চারপাশে পো’ড়া গন্ধ ভাসছে খেয়াল করেছ? কি পু’ড়’ছে বলতো? কিছু একটা পু’ড়’ছে কিন্তু দুই-একজন ছাড়া সেটা কেউ বুঝতেও পারছেনা! ” আরমান মিটিমিটি হাসছে।

” আম্মাআআ, এই অসভ্য মাস্টারকে থামতে বলুন। নয়তো ওর মাথা ফাটিয়ে ওকে জাহান্নামে পাঠাবো বলে দিলাম। ”

” ওর কতায় কান দিওনা, মা। তুমি এইগুলা খাইয়া নেও। ”

” আপনি এগুলো বারান্দায় নিয়ে যান, আমি আসছি। ”

আয়েশা খানম সবকিছু নিয়ে আবারও বাহিরে চলে গেলেন।

আরমান ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে। মাশিয়া ওর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে। ও আরমানের চেহারায় কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে।

” জানোনা সুদর্শন পুরুষদের এভাবে দেখতে নেই? শেষে কখন প্রেমে পরে যাবে বুঝতেও পারবেনা। আর একবার প্রেমে পরলে আজীবন ভালোবাসার অথৈজলে হাবুডুবু খাবে। এর থেকে নিস্তার নেই কভু। ” মাশিয়াকে তাকাতে দেখে আরমান খোঁচা দেয়ার লোভ সামলাতে পারলনা।

” এ্যাহ্ আসছে আমার সুদর্শন পুরুষ! আবার নাকি তার প্রেমেও পরব! আমিতো অভিসারের পর চেহারায় কোন চিহ্ন থেকে গেছে নাকি সেটাই খুঁজছিলাম। তার প্রেমে পরব আমি! তার প্রেমে পড়ার থেকে দশ তলা বিল্ডিং থেকে ঝাঁপিয়ে পড়াও সহজ। সে নিজেকে টম ক্রুজ মনে করলেও, আসলে সে যে জায়েদ খান এটা যদি জানত। ” মাশিয়া মুখ কালো করে বলল।

মাশিয়ার কথাগুলো বুঝতে আরমানের একটু সময় লাগলো। আর যখনই ও বুঝতে পারল, তখনই রাগে ওর মাথায় র’ক্ত উঠে গেলো৷

” কি বললে ! আমি অভিসারে গিয়েছিলাম! কি চিহ্ন খুঁজছো তুমি? আমার শরীর তো ঢেকে রেখেছি। শরীর ঢেকে রাখলে তুমি চিহ্নগুলো খুঁজে পাবে কিভাবে? টি-শার্ট, ট্রাউজার খুলে দাঁড়াই, তুমি ভালো করে খুঁজে দেখ? নাকি আমার উদোম শরীর দেখার বাহানা খুঁজছ তুমি? আমাকে বললেই নাঙ্গা শরীরের তোমার সামনে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতাম। তাহলে অন্তত মিথ্যা সন্দেহ তোমার মনে বাসা বাঁধতনা। ফাজিল মেয়ে একটা। ” রাগে আরমানের চোখমুখ লাল হয়ে গেছে।

” তার উদোম শরীর দেখার ঠ্যাকা পরেছে যেন আমার। কাপড় পরা অবস্থায় তাকে যেমন বিশ্রী দেখায়, উদোম শরীরে না আরও কত বিশ্রী দেখাবে! ছ্যাহ্ ছ্যাহ্। তাকে ফ্রেশ অবস্থায় দেখলেও আমার মাথা ঘুরায়। তাকে নাঙ্গা অবস্থায় দেখলে আমি মনে হয় অজ্ঞানই হয়ে যাব। কি লজ্জা, কি লজ্জা। লজ্জাহীন পুরুষের লজ্জা নেই বলে আমারও কি লজ্জা নেই! ” মাশিয়া হাসি আটকে রাখতে পারছেনা অনেক চেষ্টা করেও। অবশেষে ও হো হো করে হেসেই ফেলল।

মাশিয়ার এরূপ সরল স্বীকারোক্তিতে আরমান বেশ অপ্রভিত হয়। ও ফ্যালফেলিয়ে মাশিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল। ও এখন বুঝতে পারছে, রাগে একটু আগেই কি বিশ্রী কথা বলে ফেলেছে। এবার রাগের বদলে লজ্জায় ওর শরীর অবসন্ন হয়ে আসছে।

চলবে…