রিটেক পর্ব-০১

0
106

#রিটেক
#বিনতে_ফিরোজ

সূচনা পর্ব:

এক হাতে ছাতা আরেক হাতে টোট ব্যাগের ফিতা জোড়া শক্ত করে ধরে হেঁটে চলেছে রূপা। মাঝে মাঝে ব্যাগ থেকে ডান হাত সরিয়ে সেটাকে পাজামায় স্থান দিতে হচ্ছে। ইতোমধ্যেই কাদার নকশা তার ধবধবে সাদা পাজামায় বল প্রিন্টের কাজ সেরেছে। তবুও বিশ মিনিটের বৃষ্টিতে সদ্য জন্মানো অস্থায়ী পুকুর থেকে বেঁচে থাকা চাই। সুন্দর উপায় হিসেবে হঠাৎই একটা রিকশা পেলো রূপা। যেনো অমাবস্যায় চাঁদ। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হওয়ার অনুভূতিকে কোনো রকমে চাপা দিয়ে হাঁক ছাড়লো সে,

– মামা যাবেন?

রিকশাওয়ালা ঘুরে তাকালো। ফাঁকা রাস্তায় মুহূর্তের মাঝে রিকশা ঘুরিয়ে আনলো। রূপার দিকে দৃষ্টি তাক করে জিজ্ঞেস করলো,

– কই যাইবেন?

– মেডিকেল কলেজ।

– একশো ট্যাহা।

রিকশা ওয়ালার ভাবলেশহীন কথায় ধপ করে রূপার চেহারার সুখী ভাবটা মুছে গেল। ছোটো বাচ্চার মুঠো করে রাখা হাত থেকে খেলনা কেড়ে নিলে তার অভিব্যক্তি যেমন হয় রূপাকে সেসময় ঠিক তেমন দেখালো। মন চাইলো ব্যাগে থাকা প্যাটেলা দিয়ে ব্যাটার মাথায় বারি দিতে। সেটা করতে না পেরে অক্ষম আক্রোশে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

– থাক মামা। কোনোদিন বিল গেটস হইলে আপনার রিকশায় উঠবো। আজকে যাই।

ঘুরে দাঁড়িয়ে সামনে তাকালো রূপা। দূরদৃষ্টি দিয়ে যেনো কলেজটা দেখতে চাইলো। সে ধারণা করতে পারছে আর দশ মিনিট হাঁটলেই কলেজে পৌঁছুতে পারবে। রিকশায় উঠলে সময়টা গুটিয়ে হয়তো বড়জোর পাঁচ মিনিট লাগতো। পনেরো টাকা, খুব বেশি বিশ টাকার ভাড়া কি না চায় একশো টাকা! রূপা বুঝতে পারলো বৃষ্টির দিনের একমাত্র ডন রিকশাওয়ালা মামা।

তাচ্ছিল্য ভরে চলে যাওয়া রিকশাটা দেখতে দেখতে রূপা খেয়ালই করেনি কখন তার পাশে একটা বাইক এসে দাঁড়িয়েছে। ধ্যান ভাঙলো নিজের জামায় কাদা দেখে। নিজেকে আরও একবার কষে ধমক দিলো বৃষ্টির দিনে সাদা রং পড়ে বের হওয়ার জন্য। চোখে চাপা রাগ নিয়ে পাশে তাকাতেই সেটা আরো এক ডিগ্রী বৃদ্ধি পেলো।

– আরে রূপা! তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? কলেজ যাবে তো? এসো উঠে এসো। আহহা! জামাকাপড়ের কি হাল হয়েছে! তাড়াতাড়ি উঠে পড় তো!

– ধন্যবাদ আকাশ ভাই! এতোটা পথে চলে এসেছি বাকিটুকুও চলে যেতে পারবো। আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না।

– এতোটা পথ তো আমি ছিলাম না। এখন আছি। এখন তুমি একা যেতে পারবে না। আর তোমাকে বাইকে নিলে আমার মোটেও কষ্ট হবে না। তুমি তো বাইকের কোলে উঠবে, আমার কোলে না।

আকাশের হাসি দেখে রূপার হাত এবার সত্যি সত্যিই প্যাটেলার কাছে চলে গেলো। নিজেকে আবারও থামালো রূপা। মনকে বোঝালো, “এটা সিনিয়র, এর সাথে কোনো ঝামেলা করা যাবে না। আর দুইদিন পর ইন্টার্নি করতে চলে যাবে। ততদিন এই টিকটিকিকে টিকটিক করতে দে রূপা! ধৈর্য্য ধর! ধৈর্য্য ধর!”

– আকাশ ভাই! আমি আসলে একটু হেঁটেই যাবো। বৃষ্টির দিনে হাঁটার মজাই আলাদা। জানেন তো!

– বারবার ভাই ডেকে আমার মুড ব্লক করে দিও না প্লিজ! আর তুমি হেঁটে যাবে তো রিকশা ডেকেছিলে কেনো?

“আহা! ভাই ডাকবো না তো কি ডাকবো রে আকাশ বাতাস! শখ কতো!” বরাবরের মতো মনের কথা মনেই গিলে নিলো রূপা। মুখে কৃত্রিম হাসি ফুঁটিয়ে বললো,

– বৃষ্টি সাথে রিকশা কম্বিনেশনটাই অন্যরকম। তাই রিকশা নিতে চাচ্ছিলাম। এছাড়া আর কিছু না।

– কম্বিনেশন যেমনই হোক আজকের আইটেম মিস না করতে চাইলে তোমাকে এক মিনিটের মধ্যে আমার বাইকে উঠতে হবে। পরীক্ষা শুরুর আর পাঁচ মিনিট বাকি। তোমার কাছে আর কোনো অপশন নেই।

কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখলো রূপা। ঘটনা সত্যি। কখন যে সেকেন্ডের কাঁটা দৌড়ে দৌড়ে এতো মিনিট পার করেছে সে বুঝতেই পারেনি। অন্য কোনো উপায় না পেয়ে আকাশের বাইকের পেছনেই উঠে বসলো সে।

– কাঁধ শক্ত করে ধরো রূপা। নাহলে আজ তোমার সাদা জামায় কাদা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।

– আমি এপাশে ধরে রেখেছি আকাশ ভাই। আপনি চলুন।

বাইক স্টার্ট দিলো আকাশ। বাতাসের শব্দে বললো,

– তোমাকে আজকে বৃষ্টির মাঝে এতো সুন্দর লাগছিলো রূপা! ঠিক যেনো বৃষ্টিকন্যা!

রাস্তার পাশের কদম গাছটার দিকে তাকিয়ে রইলো রূপা। ওটায় ফুল আসবে কবে?

••••••••••

“দূর অন্তরীক্ষে তোমার অস্তিত্বের প্রতিচ্ছবি আমি দেখতে পেতাম। অনুভব করতে পারতাম তুমি আছো। একই আকাশের নিচে আমাদের বাস। কোনো একদিন তো ঠিকই দেখা হবে! সেই আশাকে মনের দোলনায় দুলিয়ে যখন সুখের কথা ভাবতাম তখন মোটেও চিন্তা করিনি দিনগুলো এমন হবে। তোমাকে পেয়েও আমি পাবো না। নিজের বুকের সাথে মিশিয়েও মনে হবে “কি যেনো নেই! কি যেনো নেই!” আচ্ছা! এমন কেনো হলো?”

দীপ্তির আগমনের শব্দ পেয়ে লেখা বন্ধ করে দিলো ফাহাদ। সন্তর্পনে ডায়েরীটা টেবিলের তাকে রেখে দিলো। আগে যদিও এটার জায়গা নিয়ে খুব চিন্তিত থাকতো সে তবে এখন সেই চিন্তার সিকিভাগও নেই। চিন্তা থাকতো কেউ হয়তো ব্যক্তিগত এই ডায়েরীটা পড়ে ফেলবে। তখন নিশ্চয়ই তাকে লজ্জায় পড়তে হবে! কিন্তু ব্যক্তিগত মানুষটারই যখন তার প্রতি আগ্রহ নেই তখন অযথা ডায়েরী লুকিয়ে লাভ কি! আজকাল বরঞ্চ মনে হয় দীপ্তি ডায়েরীটা পড়ুক। তাকে একটু জানুক। ক্ষতি তো নেই!

– এই তুমি আজকে অফিসে যাবে না?

– আমার আজ অফ ডে দীপ্তি।

– ওহ! ভুলেই গেছিলাম। তাহলে সারাদিন বাড়ি বসে কি করবে? বাইরে থেকে ঘুরে এসো।

– কেনো? তোমার সাথে সময় কাটাবো!

– ঢং! আমাদের কি নতুন বিয়ে হয়েছে নাকি যে তুমি এসব বলছো!

– ছয় মাস কিন্তু খুব বেশি সময় না দীপ্তি। এখনও আমাদের সবাই নিউলি ম্যারেড কাপলই বলে।

– মানুষের কথা বাদ দাও। তুমি যাবে নাকি বলো।

– আমি গেলে বোধহয় তোমার খুব সুবিধা হয়?

– আরে না। তুমি থাকলে আমি আসলে স্বস্তিতে থাকতে পারি না। মনে হয় কখন তোমার কি লাগে..

দীপ্তির অস্বস্তি মাখা হাসির বিপরীতে হতাশ শ্বাস ছাড়লো ফাহাদ।

– আমি কি তোমাকে খুব বিরক্ত করি দীপ্তি?

– এমন করে বলছো কেনো? আচ্ছা আজ তোমার পছন্দের মোরগ পোলাও করি। কেমন?

– মোরগ পোলাও আমার পছন্দ না দীপ্তি। ইন ফ্যাক্ট মোরগই আমার পছন্দ না। এটা এই নিয়ে তোমাকে ষোলো বার বলা হলো।

বাড়ির বাইরে পা রাখলো ফাহাদ। পকেট থেকে কালো সানগ্লাসটা বের করে চোখে দিলো। এই এক সুবিধা। কেউ চোখ দেখতে পারে না, সেই চোখের ভাষা পড়তে পারে না, বুঝতে পারে না। কেমন লুকোচুরি খেলা!

অনির্দিষ্ট গন্তব্যের পথে হাঁটতে হাঁটতেই নিজের প্রতি হাসলো ফাহাদ। তার চোখের ভাষা বোঝার মানুষটা কি কোনদিন তার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখেছে? এ কেমন নিদারুণ প্রহসন!

চলমান।