রিটেক পর্ব-১৮+১৯

0
66

#রিটেক
#বিনতে_ফিরোজ
পর্ব:১৮

অশান্ত ভঙ্গিতে আসমা বসে আছে। বলা ভালো তাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। নিজের উপর করা এই জবরদস্তির বিপরীতে আসমা কিছু করতে পারছে না। তার সকল প্রচেষ্টা বিফলে গেছে। পর্যুদস্ত সৈনিকের মত মেয়েকে বসে থাকতে দেখে ধাক্কা দিলেন আলিমা বেগম। আসমা তাকালে বললেন,
– মুখ চোখ এমন করে রেখেছিস কেনো? তোকে কি ফাঁসিতে ঝোলানো ঝোলানো হবে নাকি? আশ্চর্য! উঠে একটু সুন্দর জামা-টামা পড়।
– আমার ভালো লাগছে না মা। বিরক্ত লাগছে।
– তুই কি এমনই করতে থাকবি? ওদের সামনে যেয়ে এমন করলে তোর বাবার মুখ থাকবে?
এই পর্যায়ে গর্জে উঠতে চাইলো আসমা। কিন্তু সামনে দাঁড়ানো ব্যাক্তিটি মা, এই কথা মনে পড়তেই নিজেকে সামলে নিলো। তবে কণ্ঠের রূঢ়তা প্রকাশ পেয়েই গেলো।
– আমার জন্যে পাত্র ডেকে আনলে আর আমাকে একবার জানানোর প্রয়োজন করলে না! আমার কি কোনো প্রস্তুতির দরকার নেই?
আলিমা বেগমের মুখ চুপসে গেলো। আসমার বাবা বারবার বলেছিলেন “আগে মেয়েকে জিজ্ঞেস করো”। শেষে বিরক্ত হয়ে তিনি বলেছিলেন মেয়ে মত দিয়েছে। আসমাকে একবার বললে বোধ হয় ভালো হতো। মেয়েটা এত ক্ষেপে যেতো না।
– দেখতেই তো এসেছে। বিয়ে তো আর হয়ে যাচ্ছে না। তুই ওঠ মা! গুছিয়ে নে।
মেয়ের মাথায় হাত রেখে নরম সুরে বললেন আলিমা বেগম। আসমা ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল,
– রূপার কথা তোমাকে বলেছি মা। ওর এমন সময়ে আমি কিভাবে বিয়ে করে নিতে পারি বলো তো?
– বিয়ে কি বললেই হয়ে যায় নাকি? শুধু তোকে দেখতে এসেছে। বিয়ের কথা উঠলেও সেসব করার জন্য কত সময় দরকার জানিস? তুই ওঠ। শুধু ওদের সামনে যেয়ে একটু বসলেই হচ্ছে।
– ওদের সামনে মানে? আমি শুধু ছেলের সামনে যাবো কিন্তু।
ভ্রূ কুচকে বললো আসমা। আলিমা বেগম একটু আগেই বলে গেছেন ছেলে নাকি এক বন্ধু সাথে নিয়ে এসেছে। এটা শুনে আসমার মেজাজ আরও বিগড়ে গেছে। “কেনো রে ভাই? বিয়ে কি বন্ধুর সাথে শেয়ারে করবি যে মেয়ে দেখতে নিয়ে এসেছিস? যত্তোসব ফালতু কাজ!” নিজের মনেই বিড়বিড় করলো আসমা। অসহ্য হয়ে উঠে গেলো জামা নিয়ে। সাথে আলিমা বেগমকে বলে যেতে ভুললো না,
– আমি অন্য কোনো ছেলের সামনে যাবো না। শুধু পাত্র আর মহিলা কেউ থাকলে তাদের সামনে। অতিরিক্ত কেউ থাকলে আমার আশা বাদ দাও।
আলিমা বেগম মেয়ের এই বিষয়ে আগেই জানিয়ে রেখেছেন। ছেলেটা সম্মতি দিয়েছে। ছেলে আর তার মাকে আসমার কাছে নিয়ে এলেই হলো।

স্নায়বিক উত্তেজনা চাপা দিয়ে বসে আছে আসমা। বিশাল এক ওড়নায় তার মাথা সহ ঊর্ধ্বাঙ্গ ঢাকা পড়েছে। দৃশ্যমান চেহারায় যেনো নার্ভাসনেসের কোনো ছাপ না পড়ে তাই দৃঢ় ভাবটা বজায় রাখার চেষ্টা করছে সে। পাত্রের মা যখন তার ঘরে এসেছিলেন তখন অতোটা নার্ভাস লাগেনি। মহিলা বেশ মিশুক। তার হাসিমুখের কথায় আসমা ভুলতে বসেছিলো এটা তার হতে পারে শাশুড়ি, নিত্য দেখা রোগী নয়। সেই কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দিতেই পাত্র যখন ঘরে ঢুকলো তখন বুকের ভেতর লুকিয়ে বাজতে শুরু করা রণঢাকের আওয়াজ পেলো সে। ভয়ও পেলো। সামনের মানুষটা না জানি শুনে ফেলে। নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করলো এই মানুষটা তার জীবনের রোগ নিয়ে হাজির হয়েছে। যথাযথ ঔষধ দিতে পারলে সিনিয়র ডাক্তারের নরম দৃষ্টির আওতায় আসা যাবে। বড়ো করে দম ছাড়লো আসমা।
– আসসালামু আলাইকুম।
চেয়ারে বসতে বসতে সালাম দিল নীরব। এক পলক মেয়েটার দিকে তাকিয়েই মনে হলো ঐ চোখগুলো চেনা। তবে মনে করতে পারল না নয়নযুগল কোথায় দেখেছে।
থতমত খেলো আসমা। কাজটা তার আগে করা উচিত ছিল। সে সবসময় চেষ্টা করে আগে সালাম দিতে। নিজের ভাঙতে ছাইয়া সাহসকে গুছিয়ে নিয়ে বলল,
– ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কেমন আছেন?
এবারের প্রশ্নটা এলো আসমার তরফ থেকে। তার গলার শক্ত আওয়াজে নীরব বেশ চমকে গেলো। ভেবেছিলো মেয়েটা হয়তো নার্ভাসনেসে ভুগবে। সে জায়গায় তার আত্মবিশ্বাসে ভরপুর আওয়াজে নীরবের মন জিজ্ঞাসু হলো।
– আলহামদুলিল্লাহ। ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
নীরবের স্মিত হাসি, সাথে সুন্দর উত্তর। আসমাকে প্রভাবিত করলো। সেও মুচকি হাসলো। জানালো ভালো আছে। পরবর্তীতে খেই হারালো দুজনেই। এবার কি বলা যায়? আসমা ইতস্তত করলো না। নীরবকে চুপ থাকতে দেখে বলল,
– আমার জীবন ধরণ সম্পর্কে আশা করি আপনার জানা আছে?
– সেভাবে নেই। আপনি নিজেই বলুন।
চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকালো নীরব। আসমা বলল,
– বরের বন্ধুকে আমি কখনও নিজের বন্ধু মনে করবো না। নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যতীত আমি কোনো পুরুষকেই আমার সংরক্ষিত এলাকায় ঢুকতে দিতে রাজি নই। জীবন চলার ক্ষেত্রে আমি একটা মাপকাঠি অবলম্বন করার চেষ্টা করি। কুরআনকে আমি সেই মাপকাঠি হিসেবে নিয়েছি। অনেক ক্ষেত্রে ভুল হয়। আবার ঠিক করার চেষ্টা করি। এক্ষেত্রে আমি চাইবো আমার জীবনসঙ্গী আমাকে সেই মাপকাঠির হিসেবে আর এক ধাপ উপরে ওঠানোর চেষ্টা করবে। তার হাতটা যেনো আমি বিশ্বাসের সঙ্গে ধরতে পারি। সেখানে যেনো আমাকে কিছু নিয়ে সংশয়ে পড়তে না হয়। এবং আমি নিজেও চেষ্টা করবো যেনো আমি তার বিশ্বাসের জায়গাটা অর্জন করতে পারি।
প্রকৃতই চমৎকৃত হলো নীরব। মেয়েটা কথা শুরু করেছে তার বন্ধুকে দিয়ে। ফাহাদকে নিয়ে আসাটা সে পছন্দ করেনি। স্পষ্ট প্রকাশ। নীরবের ভালো লাগলো। মন চাইলো মেয়েটার কথা আরেকটু শুনুক। নিজের দিক থেকে সাফাই দিতে বলল,
– আমার বন্ধুকে নিয়ে আসাতে আপনি হয়তো মনঃক্ষুন্ন হয়েছেন। আমি দুঃখিত। আপনার জীবনের ধরণ সম্পর্কে আসলেই আমার কোনো জানা শোনা ছিলো না। আর আমার বন্ধু বলতে কাছের এই একজনই। কিছুদিন আগে তার স্ত্রী মা-রা গেছে। তাই আমি ওকে একা ছাড়তে চাইছিলাম না। এছাড়া নিজের জীবনসঙ্গী বাছাই করার জন্য তাকে সবার সামনে উন্মুক্ত করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।
আসমার চোখে কষ্ট দেখা দিলো। চেহারার রেখা পাল্টালো। তখনই চট করে নীরব ধরতে পারল চোখ দুটো সে কোথায় দেখেছে। সেই হাসপাতালে, যেখানে দীপ্তি মা-রা গেছে। এটা সেই মেয়েটাই! মনে মনে যথেষ্ট চমকে গেলো সে। আসমা আর কিছু বলল না। বলল না নীরবও। বিদায়ের সময় শুধু বলে গেলো,
– ভালো থাকবেন। আশা করি আমাদের আবার দেখা হবে।
ছেলেটার কথার সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ধরতে আসমার সময় লাগলো না। চমকে তাকালে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া নীরবের হাসি নজরে এলো। অদ্ভুত অনুভূতিতে আসমার মনন ছেয়ে গেল। এর প্রতি উত্তরে কি বলা যেতে পারে?

•• •• •• ••

লক্ষ্যহীন হয়ে হাঁটছে রূপা। উদ্দেশ্য অজানা। গন্তব্য অনিশ্চিত। ঝাপসা চোখের পাতায় ভেসে উঠছে হিমেলের হাসিমাখা মুখটা। কেমন হঠাৎ করে পাল্টে গেলো সে। আচ্ছা হিমেল কি পাল্টে গেছে নাকি রূপা তাকে চিনতে ভুল করেছে? এক মুহূর্তের জন্য আসমার কথা মনে হলো। “তুই গা ভাসিয়ে দিলে এই স্রোত তোকে কোথায় নিয়ে যাবে তুই নিজেও বুঝবি না।” আসমার কথাগুলো ঘণ্টার মতো রূপার কানে বাজতে লাগলো। চিৎকার করে সে বলতে চাইলো, “দেখ আসমা! এই স্রোত আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছে! আমার অস্তিত্ব নিঃশেষ করে দিয়েছে।” ফোনের রিংটোন বাজতেই সেটা হাতে নিলো রূপা। কামরুন্নাহার ফোন দিয়েছেন। রূপা বুঝলো না কিভাবে তার মায়ের সামনে দাঁড়াবে। কিভাবে এই মুখটা তার ভাইকে দেখাবে। বুঝলো না রূপা। সহজ জীবনকে জটিল বানিয়ে যখন তার সমীকরণ মেলাতে অপারগ হলো তখন নিজেকে নিয়ে তার আফসোসের শেষ রইলো না তার। দিনের পর দিন আইটেম, কার্ড বাদ দিয়ে, বইয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করে যার সাথে সম্পর্ক মজবুত করতে চাইলো সে তাকে এক নিমেষে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। রূপা নিজ উদ্যোগে নিজেকে এখানে এনেছে। উল্টে পড়লে পেছনে ধরার জন্য কোনো হাত নেই। চারপাশে ছড়ানো গভীর খাদের মাঝে নিজেকে খুঁজে পেলো রূপা। সাহায্য পাওয়ার আশায় যখন উপরের দিকে তাকালো তখনই মনে হলো কেউ না থাকলেও তার জন্য একজন আছেন। সবসময়। তাঁর কাছে সাহায্য চাইলে কি তিনি রূপাকে ফিরিয়ে দেবেন? আর সবার মত তাঁর কাছেও কি রূপা নিগৃহীত হবে?

চলমান।

#রিটেক
#বিনতে_ফিরোজ
পর্ব:১৯

আসমা উশখুশ করছে। অর্পি ফোন দিয়ে বলেছে রূপা নাকি আজ কলেজে গিয়েছিলো। তারপর হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেছে। না কোনো ক্লাস করেছে, না কাউকে বলে এসেছে। আসমার চিন্তা হচ্ছে। আজ সে ক্লাসে যায়নি। কিন্তু মনে হচ্ছে রূপার সাথে একবার দেখা না হলে স্বস্তি পাবে না। মনকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে রূপার বাড়ির উদ্দেশ্যে পথ ধরলো। পেছন থেকে আলিমা বেগম ডাকলে তাকে কোনরকমে উত্তর দিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে। রূপার বাড়ি পৌঁছুলে কমরুন্নাহারের গোমরা মুখের সম্মুখীন হলো আসমা। মনটা বেজায় খারাপ হয়ে গেলো। কামরুন্নাহার হাসিখুশি মানুষ। শত দুঃখের মাঝেও তাকে হাসিখুশি থাকতে দেখা যায়। জীবন নিয়ে এই মানুষটার কোনো অভিযোগ নেই। সেই তাকেই এমন মুখ করে থাকতে দেখে আসমা বুঝে নিল বাড়ির পরিবেশ ভালো না। তমার সাথে এর আগে সাক্ষাৎ হয়েছে আসমার। তার সাথে ভালোমন্দ কথা বলে রূপার ঘরের দিক যেতেই কামরুন্নাহার তাকে পেছন থেকে আটকালেন।
– আসমা।
– জি আন্টি?
– আমার রূপা খুব কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে মা। আশপাশের মানুষ খুব খোঁচা দিচ্ছে। আজকে তো কলেজে গিয়েছিলো। ওখানেও কেউ কিছু বলেছে নাকি জানি না। মেয়েটা এত তাড়াতাড়ি চলে এলো। কাউকে কিছু না বলেই আবার ঘরের দরজা আটকে দিয়েছে। চোখমুখ ফোলা ছিল জানো! মনে হয় রাস্তায় খুব কান্নাকাটি করেছে। আমি কি করবো বলো তো মা? ওকে একটু বোঝাও না তুমি!
কামরুন্নাহারের চোখ ছলছল করছে। আসমার দুইহাত তার করপুটে। আসমা আশ্বস্ত করতে বলল,
– আমি চেষ্টা করবো আন্টি। আপনি দোয়া করুন।
– সে তো করিই মা। আমার মেয়েটার জন্য আমি রাতদিন দোয়া করি। চলো ওর ঘরে চলো।
দরজায় আঘাত করলেন কামরুন্নাহার। কণ্ঠে স্নেহ নিয়ে বললেন,
– ও রূপা? দরজা খোল মা। দেখ আসমা এসেছে। রূপা?
রূপার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না। কিছুক্ষণ পর আসমা ডাকতে গেলে তার ফোন মেসেজ আসলো। রূপা ছোট্ট একটা বার্তা পাঠিয়েছে,
– মা কে পাঠিয়ে দে।
ফোন বন্ধ করে কামরুন্নাহারের কাঁধে হাত রাখলো আসমা।
– আপনি যান আন্টি। আমি ডাকছি ওকে।
কামরুন্নাহার কিছু বললেন না। আজকাল তিনি আর নতুন কিছু ভাবতে পারছেন না। মেয়েটার অবস্থা দেখলে তার বুক ফেঁটে কান্না আসে। চলে গেলেন ধীর পায়ে। কামরুন্নাহার চোখের আড়াল হতেই আসমা রূপাকে ডাকলো,
– রূপা?
হালকা আওয়াজে দরজা খুলে গেলো। নিজ উদ্যোগে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো আসমা। ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে। সেই অন্ধকারের ওজন পরিমাপ করছে ঘুলঘুলি দিয়ে আসা এক ফালি আলো। আসমা বলল,
– ঘর এরকম অন্ধকার করে রেখেছিস কেনো? সুইচবোর্ড কোথায়?
দেয়ালে হাতড়িয়ে সুইচবোর্ড খুঁজলো আসমা। তবে তাকে থামিয়ে দিলো রূপার ভগ্ন কণ্ঠস্বর।
– ঘরে আলো জ্বে-লে কি করবি? আমার জীবনই তো এমন অন্ধকার হয়ে গেছে।
সেই ক্ষণে আলো জ্বা-লা-তে সক্ষম হলো আসমা। চোখ বন্ধ করে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকা রূপার দিকে চোখ গেলো। উষ্কখুষ্ক চুল, ফোলা ফোলা চোখ। চোখের চারপাশে কতো রাত ঘুম না হওয়ার চিহ্ন! রূপার কাঁধে হাত রাখলো আসমা। জমে থাকা মেঘ থেকে ভেঙে আসা বৃষ্টির মতো আসমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল রূপা। বিশাল এক চৈত্র বুকে ধারণ করার পর তার চোখে বর্ষার ঢল নামলো। তার ভগ্ন কণ্ঠস্বর আসমার কাছে ঠিক বজ্রপাতের মতোই শোনালো।
– হিমেল বিয়ে করে নিয়েছে আসমা! হিমেল বিয়ে করে নিয়েছে। ও.. ও আমাকে ঠকিয়েছে। আমার কি হবে আসমা?
স্নেহের একটা কণ্ঠ, ভরসা মাখা একটা হাত খুঁজছিল রূপার ভগ্ন মন। সেই বিশ্বাসের মরুভূমিতে আসমাকে তার এক পশলা বৃষ্টির মতোই মনে হলো। তবে আসমা স্থির হয়ে গেলো পাথরের মত। বলতে পারলো না একটা বাক্যও।
– আমি মা কে কি বলব আসমা? আমার তো সব শেষ হয়ে গেলো! আমি কিভাবে বাঁচবো?
আর কিছু বলল না রূপা। আসমার বুকে পড়ে কাদতে লাগলো ইচ্ছে মত। আসমা রূপার মাথাটা শক্ত করে বুকে চেপে ধরে রাখলো। রূপার নীরব চিৎকার, অব্যক্ত কষ্টগুলো বুক পেতে নিলো। বলল না, “আমি বারবার তোকে নিষেধ করেছিলাম। এখন হলো তো?” এটাও বললো না যে, “মায়ের সাথে যেমন বিশ্বাসঘাতকতা করেছিস তোর সাথেও তাই হয়েছে।” কিছুই বলল না আসমা। কারণ তার বুকে আছড়ে পরে কাঁদতে থাকা মেয়েটা জানে জীবনে কি ভুল সে করেছে। কি হারিয়েছে সেটাও সে সবচেয়ে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছে। চুপ থাকলো রূপা, ঠিক একটা স্তম্ভের মত।
আধা ঘন্টা পরও যখন রূপা থামলো না তখন আসমা বলল,
– থাম রূপা! মাথা ব্যাথা করবে এবার।
রূপার স্বর আরও ভেঙেছে। তার মাথা উঠিয়ে চুলগুলো গুছিয়ে দিলো আসমা। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
– কি অবস্থা করেছিস নিজের? নিজেকে দেখেছিস একবার আয়নায়?
– কি করবো আর দেখে? কার জন্য নিজেকে গুছিয়ে রাখবো?
– তোর নিজের জন্য।
– আমার নিজের বলতে এখন একটা নষ্ট জীবন আছে আসমা। আর কিচ্ছু নেই। কিচ্ছু না।
রূপা একটু থামলে পুরো ঘটনা শুনলো আসমা।
– কি করতে চাইছিস এখন? ওর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করবি?
তাচ্ছিল্য ভরে হাসলো রূপা।
– মা এসব শুনলে ম-রেই যাবে। আর কার জন্য এসব করবো? একটা প্রতারকের জন্য?
– তাহলে কি করবি?
– আমি জানিনা আসমা। একটা ভুল আমার জীবনকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছে।

রূপা চুপ করে বসে রইলো। আসমা গভীর চোখে তাকে পর্যবেক্ষণ করে বলল,
– ভুলগুলো আমাদের জীবনে নতুন আকৃতি দিতে আসে রূপা। তুই যদি সেই ভুলকে চিনতে পারিস, নিজেকে শুধরে নিতে পারিস তাহলে ভুলটা হবে কষ্টিপাথর যার মাধ্যমে তুই নিজেকে সোনায় পরিণত করতে পারবি। তুই নিজের জায়গা থেকে দুনিয়ার যেই রূপটা দেখছিস সেটা আমি দেখছি না। চোখ মেলে তাকালেই তুই এখন নিজের অবস্থান দেখতে পারবি।
– আমি পারছি। এতো নিকৃষ্ট অবস্থানে নিজেকে দেখে আমার মরে যেতে ই-চ্ছে করছে।
– হ্যাঁ! এটাই তো বাদ আছে! দুনিয়া জাহান্নাম বানিয়ে এখন পরকালটাও শেষ কর।
– বেঁচে থেকেও লাভ কি। আমার পরকাল এমনিতেও গেছে।
– কে বলেছে গেছে?
– কি আছে আর আমার?
– তোর মনে অনুশোচনা আছে, চোখে পানি আছে।
রূপার চোখ মুছে দিয়ে বলল আসমা। রূপা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।
– এগুলো দিয়ে কি হবে?
– আল্লাহ তো এটাই চান। অনুশোচনায় ভরা মন নিয়ে তুই তাঁর সামনে হাজির হবি। অশ্রু ঝরিয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইবি।
– আমাকে কি আল্লাহ ক্ষমা করবে?
রূপার চোখে অবিশ্বাস।
– তুই একবার চেয়েই দেখ।
রূপা দেরি করলো না। তৎক্ষণাৎ ওযু করে এসে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলো। আহ! কতকাল পরে সে এখানে দাঁড়ালো। যার মন রাখার আশায় দিনরাত এক করেছে শেষমেষ সে-ই তার মনকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু মনটা যাঁর জন্য ছটফট করত তাঁর দিকে একবার ঘুরেও তাকানো হয়নি। সিজদায় পড়ে কাঁদলো রূপা। তাকে রেখে বাইরে এলো আসমা। মুখে তার প্রশান্তির হাসি। ভাঙ্গা মন জোড়া দেওয়ার দায়িত্ব সে মনের স্রষ্টাকে দিয়ে এসেছে। আর চিন্তা কিসের? কামরুন্নাহারকে আশ্বস্ত করল সে। মহিলা যেনো হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন।
সালাম ফেরাতেই আসমার ফোন বাজলো। আলিমা বেগমের ফোন দেখে রূপা রিসিভ করলো। সালাম বিনিময়ের পর তিনি জানালেন,জ
– এই আসমা তোমাকে কিছু বলেনি না? ওকে আজকে দেখতে এসেছিল। ওদের নাকি আসমাকে খুব পছন্দ হয়েছে। তাড়াতাড়ি বিয়ে পড়িয়ে ফেলতে চাচ্ছে। এইমাত্র ফোন দিয়ে বলল।
হড়বড় করে বললেন আলিমা বেগম। আসমা আস্তে করে ফোন রেখে দিল। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আলিমা বেগম কম থেকে ফোন নামিয়ে দেখলেন কল কেঁটে গেছে। ভাবলেন ফোনের ব্যালেন্স শেষ। স্বামীর ফোন নিতে ছুটলেন। আগে পাশের বাড়ির ভাবীকে খবর দিতে হবে। মহিলা আসমার বিয়ে নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলেন।
আসমা আসতেই রূপা শান্ত স্বরে বলল,
– অভিনন্দন।
– কিসের জন্য?
আসমার কপালে ভাঁজ পড়ল। চায়ের কাপ রেখে সে রূপার সামনে বসলো,
– পাত্র পক্ষ দেখতে এলো, বিয়েও ঠিক হয়ে গেলো আর আমাকে জানালিও না। অপয়া ভাবছিস নাকি?
– ছিহ! কীসব কথাবার্তা? অপয়া আবার কি? জীবনে শুনেছিস নবীজী কাউকে অপয়া বলেছেন? নাকি শুনেছিস ইসলামে অপয়া বলে কিছু আছে?
– মানুষ তো বলে।
– মানুষের কথা বাদ দে। অপয়া, অলক্ষ্মী এসব সব ফালতু কথা। যেসব জিনিসে মানুষের হাত নেই সেসব নিয়ে তাকে কটু কথা শোনানো হারাম। আর যেসব জিনিস মানুষের হাতের কামাই সেসব থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। অপয়া বলে নিজের পাপের বোঝা বাড়ানো উচিত না।
আসমা জানালা খুলে দিয়েছে। সেদিকেই তাকিয়ে আছে রূপা। তার হাত ধরে আসমা বলল,
– আমাকে যে দেখতে আসবে আমি নিজেই জানতাম না। মা যে কি করে! আমাকে একটু আগে বলবে না? আজকে সকালে হুট করে বলছে। তখন আর কি করবো? বলে ফেলেছে। আসলো, কথাবার্তা বললাম। আর কিছু না। বিয়ে ঠিক হয়েছে তোকে কে বলল?
– আন্টি ফোন দিয়েছিল। বলল ছেলেরা তোকে খুব পছন্দ করেছে।
একটা বিট মিস করলো আসমা। থমকে যাওয়া চাহনি দ্রুত পরিবর্তন করে বলল,
– করলে করেছে। সেসব বাদ দে।
– তুই খুব সুখী হ আসমা!
হঠাৎ করে বলল রূপা। তার চেহারার গভীর মর্মবেদনার ছাপ স্পষ্ট দেখতে পেলো আসমা। বলতে চাইলো,”দেখিস তুইও খুব সুখী হবি।” কিন্তু বলতে পারল না। রূপার চোখের অশ্রু নদী তার গলা রোধ করে দিলো।

চলমান।