শান্তিসুধা পর্ব-০২

0
154

#শান্তিসুধা
২.
বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান নুবাইদ তালুকদার নাফের। পড়াশোনা শেষ করে স্বপ্ন পূরণে উন্মুখ হয়েছিল। নিজেকে দেখতে চেয়েছিল বাংলাদেশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেটর ডিপার্টমেন্টের একজন সদস্য হিসেবে। একনিষ্ঠা আর যোগ্যতা বলে সিআইডির উচ্চতর পদে নিযুক্ত হয় সে। তার চাকরির বয়স তখন এক বছর। আকস্মিক অজানা ঘাতক দ্বারা বুলেটাঘাতে মারা যায় বাবা নিহাল তালুকদার। বাবার হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে না পেরে কঠিন এক আত্মাভিমান হয়। চাকরিতে রিজাইন করে পরের বছরই। এরপর বিধবা মায়ের পাশে দাঁড়ায়। বৃদ্ধা দাদা আর ছোটো কাকার আদেশ, অনুরোধে দায়িত্ব নেয় পারিবারিক বিজনেসের। পাশাপাশি সম্পূর্ণ নিজ যোগ্যতায় নিজের আলাদা একটি বিজনেস শুরু করে। স্বপ্ন দেখে নতুন করে। শুধু শিল্পপতির নাতি, পুত্রের পরিচয়ে বাঁচতে চায় না। উত্তরাধিকারী সূত্রে পাওয়া পরিচয়ের বাইরেও আলাদা এক পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করে। সে চেষ্টার আজ এক বছর হতে চলল। ইতিমধ্যে নাফে ফ্যাশন লিমিটেড আলোচনায় এসেছে। তরুণ এই শিল্পপতিকে নিয়েও শহরজুড়ে আলোচনা, সমালোচনার ঢল। এমতাবস্থায় বিধবা মায়ের আদেশ এসেছে, বিয়ে করে বাড়িতে বউ নিয়ে আসতে হবে।আটাশ বছরের এই জীবনে প্রেমিকা নামক শব্দটির সঙ্গে জড়ায়নি নুবাইদ তালুকদার। শুধু প্রেমিকা নয় মেয়ে বান্ধবীও জুটায়নি ভুলক্রমে। অদৃশ্য, শক্ত এক গণ্ডির ভেতর নিজেকে বন্দি রাখার পেছনে ঠিক কী মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে আজো খুঁজে পায়নি নুবাইদের সহচররা। কলেজ, ভার্সিটি লাইফে বন্ধুরা চেষ্টা করেছে নারী সঙ্গী জুটিয়ে দেয়ার। অনেক তরুণী প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে, কেউ কেউ স্রেফ বন্ধুত্বই করতে এসেছে। নুবাইদ অত্যন্ত কৌশলে, মার্জিত আচরণে এড়িয়ে গেছে তাদের। এই নিয়ে অনেক তরুণী আবার টিপ্পনীও কেটেছে ‘ তাও ভালো গায়ের রঙটা ময়লা। উজ্জ্বল হলে এই ছেলে তো অহংকারে পুরুষ সঙ্গও ত্যাগ করতো!’ শ্যামাঙ্গ নুবাইদ তালুকদারের এই যে নারী বিমুখতা। এর পেছনের রহস্য কী? সে নপুংসক, নারী ভীরু? প্রশ্ন জনতার। কিন্তু উত্তর পাবে শুধু সেই মহীয়সী নারী। যে হবে এই শক্ত গণ্ডিতে আবদ্ধ পুরুষটির অর্ধাঙ্গিনী।

পাত্রী দেখা হচ্ছিল। এরই মধ্যে দাদাভাই আর তার বন্ধু শান্তির ব্যাপারে জানালো। বয়স এবং আচরণ বিবেচনায় সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দেয় নুবাইদ। কিন্তু পরবর্তীতে দাদাভাই, তার বন্ধু দাদু আর মায়ের অনুরোধ, পরামর্শ। সবকিছু বিবেচনা করে রাজি হয়। সম্মতি দেয় বিয়েতে। সেই সম্মতিতে সংশয় দানা বাঁধে। হঠাৎ করে শান্তির ফোনকল আর কথাবার্তায় চিন্তিত হয়ে পড়ে ভীষণ। আর যাইহোক পাত্রীর অমতে তার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব না৷ তার মতো বিচক্ষণ ছেলে যদি এতবড়ো অন্যায় করে বাকি সবাই কী করবে? তাছাড়া স্বামী-স্ত্রীর মতো সুন্দর, মধুর, পবিত্র একটি সম্পর্কে জোরজুলুম করে ঢুকে পড়ার রুচি তার নেই। যদি শান্তি চায় তবেই এই বিয়ে হবে। নতুবা এই বিয়ে সম্ভব না। সারারাত আপনমনে চিন্তা-ভাবনা করে বিয়ের দিন ভোরবেলা কাউকে কিছু না জানিয়ে তালাল শেখের বাড়িতে রওনা হয় নুবাইদ। উদ্দেশ্য তালাল শেখের অনুমতি নিয়ে শান্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ।

বিয়ের দিন ভোরবেলা হবু বরের উপস্থিতি! বিস্ময়, হৈ-হুল্লোড়ে ছুটোছুটি শুরু হয় বাড়ির সদস্যদের। মাথায় হাত পড়ে বড়ো মামির। কারণ শান্তি এখন গভীর ঘুমে। সকলে বাড়ির হবু জামাইকে তোষামোদ করতে ব্যস্ত। বড়ো মামি ধাতস্থ হয়ে নাস্তা পাঠালো। পাপন এসে খবর দিলো, দ্রুত শান্তিকে ঘুম থেকে উঠাতে হবে৷ নাফেভাই প্রাইভেট কথা বলবে শান্তির সাথে। বিয়ের আগে শান্তির সাথে ব্যক্তিগত কথা? এই রে! আদতেও আজ বিয়েটা হবে তো? ওই দস্যি মেয়ের সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বললেই তো বাবাজীবন ছুটে পালাবে। শান্তির মেজো মামি বলল,

‘ ভালোই হলো, বিয়েটা আর হচ্ছে না। অমন ভদ্রলোকের ঘাড়ে বাবা যে কেন এই অশান্তিকে চাপাতে চাচ্ছে! ‘

পাপন ফিক করে হেসে ফেলল মায়ের কথা শুনে। এরপর ভিডিয়ো কল করল ছোটো চাচিকে। চলে গেল ড্রয়িংরুমে। শান্তির ছোটো মামার পরিবার অ্যামেরিকায় থাকে। তাদের সঙ্গে এ বাড়ির বড়ো মেয়ে তিতলিও রয়েছে। তাই পাপন ছোটো কাকি সহ সবাইকে শান্তির না হওয়া বর নাফেভাইকে দেখাতে লাগল। আর বড়ো মামি ছুটে গেল শান্তির ঘুম ছুটাতে।

পাঁচ মিনিট ডাকাডাকির পরও ঘুম ভাঙলো না শান্তির।
অগত্যা বড়ো মামি তার ঠান্ডা বরফের মতো হাতটা শান্তির নরম উষ্ণ গাল ছুঁয়ে দিলো। নিমেষে ঘুম ভেঙে ছ্যাঁত করে উঠে বসলো শান্তি। ফর্সা ফোলা ফোলা গাল দুটোয় লালচে আভা স্পষ্ট। অতিরিক্ত শীতের প্রকোপে গাল, নাক লাল হয়ে যায় মেয়েটার। পৌষের শেষ সপ্তাহে শীতের আধিক্য বেশি। রাতে বিয়ে ভাঙার চিন্তায় রুম হিটার অন না করেই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। তাই কম্বলের নিতে শীত থেকে শরীর রক্ষা পেলেও মুখটুকু রক্ষা পায়নি। হাই তুলতে তুলতে বিরক্ত গলায় শান্তি বলল,

‘ ভোরবেলা কেন ডাকছো বড়ো মামি? কী সমস্যা তোমার? এখনো তো কলেজে এডমিশন নিইনি যে ক্লাস করতে ছুটতে হবে। ‘

যত বড়ো মুখ নয় তত বড়ো কথা বলার স্বভাব মেয়েটার। একদম মায়ের মতো হয়েছে। বড়ো মামি মনে মনে রাগ প্রকাশ করলেও প্রকাশ্যে মিছে আদর দেখিয়ে বলল,

‘ আজ তোমার বিয়ে শান্তি। হবু বর এসেছে বাড়িতে। দেখা করতে চায় তোমার সঙ্গে। ‘

চমকে উঠল শান্তি। বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে পলক ফেলল বারকয়েক। বিস্মিত কণ্ঠে বলল,

‘ মানে! কে এসেছে? ‘

বড়ো মামি ঝটপট গিয়ে ওয়ারড্রব থেকে একটা সুন্দর সেলোয়ার-কামিজ বের করল। শান্তিকে প্রায় টেনে বিছানা থেকে নামিয়ে বলল,

‘ ফ্রেশ হয়ে পোশাক চেঞ্জ করো। হবু জামাই আসবে। একদম শান্ত থাকবে। যা প্রশ্ন করবে সুন্দর করে উত্তর দিবে। কোনো প্রকার বেয়াদবি যেন না হয়। মনে রেখো তোমার নানুভাই আর মামাদের সম্মানের ব্যাপার এটা।’

পুরো বিষয়টা বুঝতে সময় নিলো শান্তি। কিন্তু ঠিক কোন উদ্দেশ্যে ওই নাফে না কাফে এসেছে এটাই বুঝতে পারলো না। তবে মাথায় বুদ্ধি খেললো দারুণ। এমন সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। তাই মিষ্টি হেসে বলল,

‘ ওকে মামি, তুমি গিয়ে উনাকে পাঠিয়ে দাও। আমি দশমিনিটে তৈরি হচ্ছি। ‘

হকচকিয়ে গেল মামি। শান্তি চোখে, মুখে হাসিক ঝলক তুলে ওয়াশরুমের পথে পা বাড়ালো। ইশ, সাংঘাতিক আনন্দ লাগছে তার! হবু বর না মোরগের ডিম। এমন নাকানিচুবানি খাওয়াবে যে শান্তি শুধু আজ কেন ভবিষ্যতে শান্তির নানার যে কোনো বংশধর দেখেই ছুটে পালাবে।

পঁচিশ মিনিট পর। শান্তির ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো নুবাইদ। পাশে পাপন৷ বলল,

‘ ভাইয়া এটাই শান্তির রুম। আমি ডেকে দিচ্ছি। ‘

মাথা দুলালো নুবাইদ। সঙ্গে সঙ্গে দরজায় ঠকঠক শব্দ তুললো পাপন। পর মুহুর্তেই ভেতর থেকে চিকন কণ্ঠে তেজ মেশানো বাক্য শোনা গেল,

‘ দরজা খোলাই আছে। জাস্ট ঢুকে পড়ুন। ‘

খুকখুক করে কেশে উঠলো পাপন। তাকালো নুবাইদের পানে। নুবাইদ হাসলো মৃদু। পাপন দরজায় মৃদু ধাক্কা দিয়ে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিলো। ভেতরো প্রবেশ করল নুবাইদ। কিন্তু সামনে তাকাতেই দৃষ্টি সংকুচিত হয়ে গেল! তীব্র লজ্জা আর অস্বস্তি ঘিরে ধরলো মানুষটাকে। এ কী অসভ্যতামো!

বড়ো মামির বের করে দেওয়া সেলোয়ার-কামিজ পরেনি শান্তি। মুখ ধুয়ে এসে পরিপাটি হয়নি একটুও। টিস্যু পেপার দিয়ে শুধু মুখ মুছেছে মাত্র। পরনে লেডিস ট্রাউজার আর হুডি। মাথার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তাই অবস্থা। বুকে ওড়না নেই। যদিও অল্পবয়সী, কিশোরী মেয়ে। ভেবেছিল বাচ্চা, বাচ্চাই হবে। ষোল আর কি আহামরি বয়স। ওই বয়সে সে মায়ের হাতেই খাবার খেতো। কিন্তু বয়স কম হলেও সুগঠিত দেহের গড়ন, উচ্চতা দেখে আঠারো বছরের কম কেউ ধারণা করবে না। সদ্য যৌবনে পা দেওয়া এক সুদর্শনীয় নারী অবয়ব যেন শান্তি। একজন অপরিচিত, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মানুষ, হবু বরের সঙ্গে কোনো মেয়ে এভাবে দেখা করতে পারে? কল্পনাতীত ছিল নুবাইদের। দেখতে বড়ো হলেও বয়স অনুযায়ী বুদ্ধি যে হাঁটুর তলায় স্পষ্ট বোঝা গেল। আধুনিকতার স্পর্শে বেড়ে উঠে লজ্জা নামক শব্দটিও এই মেয়ের অজানা। বিব্রতবোধে কান গরম হয়ে গেল তার। সিদ্ধান্ত নিলো এক্ষুনি বেরিয়ে যাবে।

নাফে না ক্যাফে? লোকটাকে আচ্ছামত ধোলাই দেওয়ার শখ ছিল শান্তির। কিন্তু প্রথম দর্শনে তার মাথা এতবেশি বিগড়ে গেলো যে রাগে না পারে গলা টিপে ধরে নাফে, ক্যাফের। ভেবেছিল বয়স বেশি হলেও দেখতে শুনতে স্মার্ট , সুন্দর হবে নাফের। কিন্তু তার শ্যামলাটে গায়ের রঙ শান্তির মনে বিতৃষ্ণা ধরিয়ে দিলো। ময়লা গায়ের রঙ পছন্দ না ওর। অথচ নানুভাই এই কালো বুড়োকে তার জন্য ঠিক করেছে? সবার কাছে নুবাইদের শ্যামলা বর্ণ পছন্দের হলেও শান্তির কাছে বিদঘুটে লাগলো। এক পলকে নুবাইদের শান্ত, শীতল ভাসা ভাসা চোখ দুটো দেখতে পেয়েছিল। যা সবার কাছে স্বচ্ছ আর পরিষ্কার হৃদয়ের প্রতীক হলেও শান্তির মন হাহাকার করে উঠলো, ‘এই কাইলা ভূত, মার্বেলের মতো চোখওয়ালাকে আমি বিয়ে করব?’

শান্তির উচ্চতা পাঁচ ফুট চার। স্বাভাবিক ভাবেই সবার চোখে তার জন্য নুবাইদের ছয় ফুট দুই উচ্চতা আর বলিষ্ঠ, জিম করা বডি বিল্ডারই পারফেক্ট। কিন্তু শান্তির মনে হলো এই বিদঘুটে হাতি সাহেব তার জন্য সবচেয়ে ডিফেক্টিভ। নুবাইদ সাদা পাঞ্জাবির সঙ্গে কটি ব্লেজার পরা ছিল। এটা খেয়াল করে শান্তির মাথা গরম বাড়লো বৈ কমলো না। আর যখন নুবাইদের রাজকীয় মোচ আর খোঁচা, খোঁচা দাঁড়ি নজরে পড়লো তখন প্রায় চিৎকার করে উঠলো,

‘ কোন সাহসে আপনি আমাকে বিয়ে করতে চাইছেন? আমাকে বিয়ে করার কী যোগ্যতা আছে আপনার? ওহ মাই গড, এ কার সঙ্গে নানুভাই বিয়ে ঠিক করলো আমার! ‘

বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো নুবাইদ। আচমকা শান্তির এমন উদ্ভট প্রশ্ন শুনে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। যোগ্যতার প্রশ্ন? কী সাংঘাতিক! সদ্য ক্লাস টেন পাশ করা মেয়ে তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করছে? হাউ ফানি! প্রচণ্ড হাসি পেলেও নিজেকে সামলে নিলো। ভেবেছিল বেরিয়ে যাবে। ভাবনাটা স্থগিত রেখে, দৃষ্টি নত অবস্থাতেই পাল্টা প্রশ্ন করলো,

‘ নাইস কুয়েশ্চন! আপনার হাজব্যান্ডের ঠিক কি কি যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন ম্যাডাম শান্তিসুধা? ‘

প্রশ্নটি করেই পকেট হাতড়ে একটি কার্ড বের করলো। এরপর সে কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

‘ ডিরেক্টর অফ নাফে ফ্যাশন লিমিটেড। কার্ডটা নিন।’

একবার কার্ডটা দেখে নিলো শান্তি। কিন্তু হাতে নিলো না। মুখ ভেঙিয়ে, ঘাড় ঘুরিয়ে দু-হাত বুকে বেঁধে দাঁড়িয়ে রইল। নুবাইদ ওর হাবভাব টের পেয়ে ভাবলো, দাঁড়িয়েছে যখন প্রয়োজনীয় কথা সারা যাক। অন্তত দাদুদের আর মায়ের কথা চিন্তা করে সরাসরি কথা বলা উচিত। তাই ভেবেচিন্তে বলল,

‘ শান্তি, আমি খুব জরুরি কথা বলতে এসেছি। সব শোনার পর আপনি যদি এই বিয়ে করতে না চান করবেন না। আমি নিজ দায়িত্বে বিয়েটা ভেঙে দিব। ‘

চকিতে তাকালো শান্তি। খুশিতে বিগলিত হয়ে প্রায় লাফিয়ে সামনে চলে এলো। হতভম্ব নুবাইদ পিছু হাঁটলো কয়েক পা। কী আশ্চর্য! এই মেয়ের মাঝে কি একটুও জড়তা নেই? বিয়ে ঠিক হলেও বিয়েটা তো আর হয়ে যায়নি। একঘরে একা এভাবে নিজের চেয়ে ঢের বেশি সিনিয়র একজন পুরুষের সঙ্গে থেকে ভয় পাচ্ছে না। আর লজ্জা সে তো এই মেয়ের কাছে অপরিচিত অনুভূতি বোধহয়। ঢোক গিললো মানুষটা। বিব্রত ভঙ্গিতে বলল,

‘ লাফালাফি করবেন না। শান্তভাবে আমার কথা শুনুন।’

‘ ধুরর মশাই! শুনুন শুনুন না করে কী কথা সেটা বলুন। আর এদিকে তাকাচ্ছেন না কেন? আমি কি সামার সানশাইন নাকি যে সানগ্লাস ছাড়া তাকাতে অসুবিধা হচ্ছে? ‘

তব্দা খেলো নুবাইদ। ওড়না ছাড়া নির্লজ্জের মতো সামনে এসেছে এই নিয়ে বিরক্তি ছিলোই। এখন কাছে আসাতে রাগ হলো কিঞ্চিৎ। আবার কী পাকা, পাকা কথা! নিজের ভুল চোখে পড়েনি। অথচ সে কেন তাকাচ্ছে না এই দোষ ধরে খোঁচা দিয়ে প্রশ্ন করছে। ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললো নুবাইদ। অতো চিন্তা বাদ দিয়ে আসল কথা বলল,

‘ আপনি আমাকে বিয়ে করতে রাজি নন রাইট? ‘

ভ্রু কুঁচকে শান্তি উত্তর দিলো,

‘ না রাজি নই। ‘

কানে তালা লাগার মতো কণ্ঠ! সহসা একবার চোখ বুঝে পুনরায় চোখ খুললো নুবাইদ। দৃষ্টি এদিকসেদিক করে বলল,

‘ আপনার কণ্ঠ বেশ মিষ্টি। সাউন্ড কম রেখে কথা বললে মিষ্টত্ব আরো স্পষ্ট বোঝা যেতো। ‘

তেতে উঠলো শান্তি। হুডির হাতা গোটাতে গোটাতে বলল,

‘ বুড়ো বয়সে ভীমরতি আমি ছাড়াতে পারি। ‘

আচমকা সরাসরি দৃষ্টিতে শান্তির মুখপানে তাকালো নুবাইদ। দৃষ্টিজোড়া এত স্বচ্ছ, শীতল ছিলো। শান্তির টমবয় আচরণে চোট লাগলো একটু। পরোক্ষণেই চোখে আগুন ধরিয়ে তাকিয়ে বলল,

‘ মেইন পয়েন্টে আসুন। নয়তো হাত, পা বেঁধে এমন ক্যালাবো…। ‘

না চাইতেও আপাদমস্তক শান্তিকে দেখে নিলো নুবাইদ। মনে মনে বলল,
‘ গায়ে শক্তি থাকুক না থাকুক মনে দম আর চাপায় জোর আছে। ‘

এরপর অগ্নি চোখ দুটো থেকে নিজের চোখ সরিয়ে বলল,

‘ আপনার বয়ফ্রেন্ড আছে। এজন্যই বিয়েতে রাজি না তাই তো? ‘

শান্তি ভাবলো এটাই উপযুক্ত যুক্তি। তাই মাথা নাড়লো,
‘ হ্যাঁ। ‘

‘ আপনার বয়ফ্রেন্ড কি এই মুহুর্তে আপনাকে বিয়ে করতে পারবে? ‘

তেজস্বী শান্তি মিইয়ে গেল নিমেষে। ভাবুক স্বরে বলল,

‘ এটা তো জানি না।’

অগোচরে রহস্যময় হাসলো নুবাইদ। সে জানে এটা কখনো সম্ভব না। ইতুন সম্পর্কে বেশ ধারণা আছে তার। বাচ্চা ছেলে! তাই বলল,

‘ দেখুন শান্তি, আপনি যদি আমাকে বিয়ে না করেন তাহলে অন্য যে কারো সাথে আপনার নানুভাই জোর করে আপনাকে বিয়ে দিয়ে দিবে। বিয়ের মতো সম্পর্কে জোর জুলুম করে জড়িয়ে দেওয়া যেমন অন্যায় তেমনি মনের বিরুদ্ধে কাউকে বিয়ে করাটাও ভুল। তাই বলছিলাম, আপনার বয়ফ্রেন্ড যদি এই মুহুর্তে আপনাকে বিয়ে করতে পারে আপনার হয়ে আমি তালাল দাদুকে রিকোয়েস্ট করব। ‘

‘ আপনি কেন আমার হয়ে রিকোয়েস্ট করবেন? কী লাভ হবে আপনার এতে?’

ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসলো নুবাইদ। বলল,

‘ লাভ ছাড়া কাউকে বুঝি উপকার করা যায় না? ‘

উত্তর দিলো না শান্তি। আমতা আমতা করে বলল,

‘ যদি ইতুন আমাকে এখন বিয়ে করতে না পারে?’

‘ তাহলে আপনার নানুভাইয়ের পছন্দে বিয়ে করতে হবে। আপনার অমতে আমি আপনাকে বিয়ে করব না। তাই আমি ব্যতীত যে কাউকেই হোক বর হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ‘

বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হলো শান্তির। বলল,

‘ আমি ইতুনকে কাল থেকে ট্রাই করছি। ফোনে পাচ্ছি না। ওর বড়ো আপুকে কল করব। আপনি কি আমার হয়ে কথা বলে দেবেন? রিকোয়েস্ট করবেন ইতুনের আপুকে। ‘

সো ইনোসেন্ট! তেজস্বিনীর এই লুকটা দেখেও গোপনে হাসলো নুবাইদ। দৃষ্টি অন্যদিকে থাকলেও প্রশ্ন করল তীক্ষ্ণ স্বরে,

‘ আমার লাভ? ‘

ফের তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল একটু সময় শান্ত হওয়া শান্তি। বলল,

‘আপনিই তো বললেন লাভ ছাড়া উপকার করা যায়। ‘

নুবাইদ ফিসফিস করে বলল,

‘সেটা আপনার নানুভাইকে রিকোয়েস্ট করার বেলায়। অপরিচিত মানুষকে কেন আমি রিকোয়েস্ট করতে যাব? ‘

‘ ওকে ফাইন, যদি উনাকে রিকোয়েস্ট করেন আর ইতুনের সাথে আমার বিয়ে হয় আপনাকে আমি পনেরো হাজার টাকা দিব। আর যদি ইতুন বা ওর পরিবার রাজি না হয় ওদের ওপর রাগ করে, আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশে আপনাকে আজ এক্ষুনি বিয়ে করে ফেলবো। দুদিকেই লাভ। এবার বলুন রিকোয়েস্ট করবেন তো?’

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল নুবাইদ। শেষ পর্যন্ত সে হবু বউয়ের কাছে দালাল হয়ে গেল! তাও কিনা মাত্র পনেরো হাজার টাকার দালাল!

|চলবে|
®জান্নাতুল নাঈমা.।