শান্তিসুধা পর্ব-০৩

0
136

#শান্তিসুধা
৩.
বিয়ে সম্পন্ন হলো শান্তির। সকলে তাজ্জব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নবদম্পতির অভিমুখে। নুবাইদ ভীষণ শান্ত। একদম নিশ্চিন্ত মনে বউয়ের পাশে বসে আছে। আর শান্তি বসে আছে রাগত মুখে। এই তো কিছুক্ষণ পূর্বে কাবিননামায় স্বাক্ষর করেছে সে। তার সামনে যখন কাবিননামা রাখা হলো। ভীষণ ছটফটে গলায় বলে উঠল,

‘ তাড়াতাড়ি পেন দাও। ‘

যেন বিয়ে করতে কত উতলা সে! বহু তিতিক্ষার বিয়ে না হলে কেউ বুঝি এত তাড়াহুড়ো করে? বড়ো মামি কলম এগিয়ে দিচ্ছিল। ওর কথা শুনে ভড়কে গিয়ে হাত কেঁপে উঠে নিমেষে। আশপাশে সচেতন ভাবে তাকিয়ে ত্বরিত কলম দেয়। এরপর শান্তি এক শ্বাসে স্বাক্ষর করে। রীতিনীতি মেনে কবুল বলতেও সময় নেয় না৷ বাড়ির সবাই এতে লজ্জিত হয় ভীষণ। তাদের বাড়ির মেয়েকে বরের বাড়ির সদস্যরা নির্লজ্জ ভাবছে কিনা সেই চিন্তায় হাসফাস করে। অথচ শান্তি বিনা লজ্জায়, জড়তাহীন ভাবে নুবাইদকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে নেয়।

পরিবারের সকলের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিল নুবাইদ। তার পরিবার থেকে সদস্য এসেছে মোট তিনজন। দাদা, ছোটো চাচা আর চাচাত বোন হুমায়রা। এবার অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী সে। হঠাৎ সর্বসম্মুখে উঠে দাঁড়াল শান্তি। চোখ বড়ো বড়ো করে একবার তাকাল নুবাইদের দিকে। এরপর পা বাড়াতে উদ্যত হতেই শুনতে পেল নুবাইদের শান্ত, শীতল মার্জিত কণ্ঠস্বর,

‘ কোথায় যাচ্ছ? ‘

ঘাড় ফেরাল শান্তি। তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল নুবাইদের দিকে। মনে মনে বলল,

‘ ওবাব্বাহ, এই তো কিছুক্ষণ আগেও আপনি আপনি করছিল। বিয়ে হতে না হতেই তুমি? আবার কৈফিয়তও চাচ্ছে। এরপর নিশ্চয়ই ছুঁয়ে দিতেও দুবার ভাববে না। এটাই স্বাভাবিক। আমার মতো স্মার্ট, সুন্দরী, অল্পবয়সী বউ পেলে কারই বা মাথার ঠিক থাকবে? ‘

মুখে বলল,

‘ শাড়ি পরে গা জ্বলে যাচ্ছে। এই অসভ্য পোশাকটা দেখলেই আমার শরীর জ্বলে যায়। মাথা গরম হয়।
বিয়ে ডান রাইট? এবার বেহায়া পোশাকটা চেঞ্জ করলেই বাঁচি। ‘

আর এক মুহুর্ত দাঁড়াল না শান্তি। ঝড়ের গতিতে বসার ঘর থেকে প্রস্থান করল। নুবাইদ অবাক হলো তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর স্পষ্টবাদিতায়। কিশোরী বধূর নির্ভীক রূপে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল হৃদয়কুঠুরি।

উপস্থিত সদস্যরা শান্তির উগ্র আচরণ ঢাকা দিতে চাইল। মেজ মামি এসে বলল,

‘ আসলে অভ্যেস নেই তো তাই এমন করে বলল। ‘

বড়ো মামা বললেন,

‘ ও ভীষণ ছেলেমানুষ নাফের। মন খুব পরিষ্কার। মনে যা আসে তাই বলে ফেলে। রাখঢাক স্বভাব ওর নেই। তুমি কিছু মনে করো না। ‘

স্মিত হাসল নুবাইদ। বাড়ির সবাই যে শান্তিকে সেভ করার চেষ্টা করছে স্পষ্ট বুঝল। মেয়েটাকে বাগে আনতে প্রচুর কসরত হবে। সূচনা আজ থেকেই হলো। বিয়ে করব না বলে জেদ ধরে বসে থাকা অশান্তিতে ঠিক শান্তি এনে বিয়ে করে নিয়েছে। এবার এই বৈবাহিক যাত্রায় শান্তি এনে, দাম্পত্য জীবনকে সুখময় করে তুলতে হবে। এরজন্য চাই প্রচুর ধৈর্য, প্রগাঢ় প্রেম আর প্রখর আত্মবিশ্বাস। অদ্ভুত এক আচ্ছন্নতা ঘিরে ধরেছে নুবাইদকে। তার এত বছরের সংযমের কারণ বুঝি এটাই ছিল? স্নায়ুতে, স্নায়ুতে অচেনা শিহরণ বয়ে যেতে লাগল। হৃদয় জুড়ে কী এক আবেশ! পবিত্র সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে মনকুঠুরিতে সুপ্ত থাকা অনুভূতিরা চনমনে হয়ে উঠেছে। সকলের মাঝে বসে থেকেও মন পড়ে রইল, বিরক্ত আর রাগত মুখে চলে যাওয়া বধূরূপে কিশোরীর কাছে। এই কি তবে প্রেমের সূচনা? নুবাইদ তালুকদার নাফেরও অবশেষে প্রেমে পড়ল!

গা থেকে টেনেটুনে শাড়ি খুলে ছুঁড়ে ফেলল শান্তি। বিছানার একপাশে বসে রইল শক্ত মুখে। রাগে মাথা দপদপ করছে তার। নিঃশ্বাস ছাড়ছে ঘনঘন। কত্ত বড়ো সাহস ইতুনের বোনের! তাকে অপমান করে? মা, বাবা নেই বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে যা ইচ্ছে তাই বলল। ওই নাফেরের সামনে তার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে বিলীন করে দিলো।

নুবাইদ শান্তির কথামতো কল করেছিল ইতুনের বড়ো আপুকে। জানিয়েছিল, বাসা থেকে বিয়ে ঠিক করেছে শান্তির৷ তার ছোটো ভাই ইতুনের সাথে সম্পর্ক আছে ওর। সবটা শুনে ফুঁসে উঠেছে ইতুনের বড়ো আপু। জানিয়েছে, তার ভাই বাচ্চা একটা ছেলে। বিয়ের বয়স হয়নি। অল্পবয়সী ছেলেমেয়ের প্রেমকে এত গুরুত্ব দিতে নেই। বিয়ে তো দূরের কথা। আর শান্তিকে তারা তাদের বাড়ির বউ করবে না। সে যতই বড়োলোক নানার নাতনি হোক না কেন। শান্তি ইতুনের যোগ্য পাত্রী নয়। মা মরা মেয়ে। বাবা থেকেও নেই। নানাবাড়িতে মানুষ হচ্ছে। তাদের পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নেবে না। সে হোক আজ বা দশ বছর পর। শুধু শান্তিকে অপমান করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি ভদ্রমহিলা। নুবাইদের বিবেকবোধ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে! সে কোন বিবেকে বাচ্চা ছেলে, মেয়ের প্রেম নিয়ে সুপারিশ করতে এসেছে? হ্যানত্যান আরো কত কীই না বলল। লাউড স্পিকার বাড়ানো ছিল। ফলশ্রুতিতে সব শুনে মাথা গরম হয়ে গেছে শান্তির। এরপর তীব্র জেদের বশীভূত হয়ে, কথা রাখতে বউ সেজে বিয়ে করে নিয়েছে নুবাইদকে। এবার জবাব দেওয়ার পালা। আর দেরি করল না শান্তি। ইতুনের বড়ো আপুর নাম্বারে কল করল। ভদ্রমহিলা ফোন রিসিভ করতেই শুনতে পেল শান্তির রাগ মিশ্রিত কণ্ঠের অসহনীয় কিছু বাক্য,

‘ এই বেডি, আমার কোয়ালিফিকেশন নিয়ে তুই প্রশ্ন তুলেছিলি না? শোন আমি সবে টেন পাশ করা একটা মেয়ে হয়েও কাকে বিয়ে করেছি জানিস? নাফে ফ্যাশন লিমিটেডের ডিরেক্টরকে। আর তুই? বত্রিশ বছরের বুড়ি হয়েও কপালে একটা বর জুটাতে পারিসনি। তোর কপালে যে আসে সেই ভেগে যায়। সেই তুই কিনা আমার কোয়ালিফিকেশন নিয়ে প্রশ্ন তুলিস! তোর পরিবার আমাকে মেনে নিবে না তাই না? তোদের মতো ফোর্থক্লাশ পরিবারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমিই কেটে পড়লাম। শয়তান মহিলা! চৌত্রিশ দিন ডগিদের মতো পেছনে ঘুরে ঘুরে তোর ভাই আমাকে পটিয়েছিল। আর তুই বলস আমি তোর ভাই আর পরিবারের যোগ্য না। ‘

একদমে কথাগুলো শেষ করে হাঁপাতে লাগল শান্তি। ফোনের ওপাশে থাকা মানুষটা ঘেমে-নেয়ে একাকার! বাচ্চা একটা মেয়ে এমন ধারালো কথা বলছে তাকে? বিশ্বাসই করতে পারল না। চার বোনের মাঝে সবচেয়ে বড়ো সে। বোনদের পর ইতুনের জন্ম হয়েছে। আদরের ছোটো ভাইয়ের জন্য হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ের কাছে এভাবে ছোটো হতে হচ্ছে? ভদ্রমহিলার নাম ইরিন তাবাসসুম। সে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

‘ এক থাপ্পড়ে দাঁত ফেলে দিব বেয়াদব মেয়ে। মুখ সামলে কথা বল। ‘

‘ আমার দাঁত ফেলবি? তুই কোন আদবরে। যে আমার মা, বাবা নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করিস। মা মরা মেয়েদের যে আদর করে, ভালোবেসে কথা বলতে হয়, এটা তোর পরিবার তোকে শেখায়নি? তুই আমাকে অপমান করে মৃত মা তুলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবি আর তোকে আমি খুশি হয়ে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ব? মুরগি পেয়েছিস আমাকে?’

‘ অসভ্য, অভদ্র, নোংরা মেয়ে! তুই তুকারি করে কথা বলছিস। এইটুকুন বয়স গায়ে এত কীসের জ্বালা রে?’

‘ কীসের জ্বালা বুঝিস না? অপমানের জ্বালা। তোর মতো পরের সুখ আমাকে জ্বালা ধরায় না৷ তোর ভাইই তো বলেছে। তুই অন্যের সুখ দেখতে পারিস না। তাই বিবাহিত ছেলে দেখে দেখে পটিয়ে বিয়ে করে অন্যের সংসারে আগুন ধরিয়ে মজা নেস। ‘

‘ কী! ইতুন এসব বলেছে তোকে? ‘

এবার শান্তির রাগ কমতে শুরু করল। মনের ভেতর খুশিতে টাগডুম বাগডুম শুরু হলো। উচিত কথা শোনাতে পেরে। সে মিথ্যা কথা বলতে পারে না৷ হতে পারে তার রাগ, জেদ বেশি। উগ্র আচরণ করে, উড়নচণ্ডী স্বভাব৷ কিন্তু মিথ্যা কথা বলবে না৷ ইতুনের সঙ্গে অল্পকিছু মাসের সম্পর্ক। এই অল্প সময়েই ইতুন তার পরিবারের অনেক গল্প করেছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশি গল্প শুনেছে ইরিন আপুকে নিয়ে। কারণ ইতুন ইরিন আপুকে পছন্দ করে না। তাই তার সম্পর্কে নেতিবাচক কথা শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গেছে শান্তির। তাই সেই অস্ত্র নিক্ষেপ করল সে। এতে দুই, ভাইবোনের মধ্যে লাগবে বেশ। পাশাপাশি অপমানের জবাব দেওয়া হবে৷ প্রতিশোধ নেওয়া হবে ইতুনের ওপর। কয়েকমাসের সম্পর্কে রাত জেগে অডিয়ো, ভিডিয়ো কলে কথা বলা, উড়ন্ত চুমু খাওয়া আর আই লাভ ইউ বলা৷ এসবে কি তার পরিশ্রম হয়নি? ঘুম সেক্রিফাইস করেছে। ভালোবাসার মতো মূল্যবান একটা বাক্য অপাত্রে ঢেলেছে। এর বিনিময়ে সে যে অপমানিত হয়েছে তারজন্য অবশ্যই প্রতিশোধ নেওয়া উচিত। তাই কণ্ঠস্বর কিঞ্চিৎ শান্ত করে একাধারে বলতে লাগল, ইতুন বড়ো আপুর ব্যাপারে কী কী নেতিবাচক মন্তব্য করেছে। সবটা বলে আলগোছে ফোন কেটে নাম্বার ব্ল্যাকলিস্ট করে দিলো শান্তি। মনের ভেতর কী যে আরাম লাগছে এখন! সুখে ঢেউয়ে শরীর দুলে উঠল যেন। পা দুলাতে দুলাতে গুনগুনিয়ে গান ধরল,

‘ আহা, লেগেছে লেগেছে আগুন! আহা, লেগেছে লেগেছে আগুন! ‘

মেয়ে বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এলো। বেদনার্ত হয়ে উঠল সকলের মন। নানু ভাই নুবাইদের একটি হাত চেপে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠলেন। নুবাইদ সান্ত্বনা দিলো তাকে। নানু ভাই বললেন,

‘ এতগুলো বছর মা, বাবার ছায়া ছাড়া বড়ো হয়েছে মেয়েটা। আমাদের ব্যর্থতা। সঠিকভাবে মানুষ করতে পারছি না। চেষ্টা করেছি খুব। হয়তো পরিবেশ, পরিস্থিতিটাই আমাদের হাতের বাইরে বা আমরা অনেক বেশিই দুর্বল ওর প্রতি। যার দরুন শাসনটা ঠিক করে উঠতে পারিনি৷ কী করব, ও যে আমার শাম্মার একমাত্র স্মৃতি। ‘

‘ চিন্তা করবেন না নানু ভাই। আমার ওপর ভরসা রাখুন। শান্তি আমার স্ত্রী। আমি ওকে আমার মতো করে গড়ে নিব। ভয় পাবেন না। ও এখন কাঁদা মাটি। যেভাবে গড়ব সেভাবেই তৈরি হবে৷ এদিকসেদিক বেঁকে যেতে চাইবে৷ ধৈর্য্য সহকারে নিপুণ হাতে সোজা করে শক্তপোক্ত করতে হবে। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি এই ভেজা নরম, বাঁকাত্যাঁড়া শান্তিকে শক্ত, মজবুত শান্তিতে পরিণত করেই তবেই ক্ষ্যান্ত হব আমি। ‘

দুপুরের খাবার খেয়ে বের হবে নুবাইদরা। শান্তি অনেকক্ষণ ঘরে গেছে। আর বেরোয়নি। নিজের চারপাশটা ফাঁকা দেখে স্ত্রীর খোঁজ করল নুবাইদ। বৈঠকখানা ছেড়ে উপস্থিত হলো শান্তির ঘরের সামনে। দরজা খোলা। তবুও টোকা দিয়ে বলল,

‘ মিসেস নাফের ভেতরে আসব? ‘

‘ ওহ প্লিইজ! এই অদ্ভুত নামে আমাকে ডাকবেন না। নানু ভাইয়ের দেওয়া নামে ডাকুন। মিসেস শান্তিসুধা। ‘

নিঃশব্দে অমায়িক এক হাসি দিলো নুবাইদ। মৃদুস্বরে বলল,

‘ আসব? ‘

‘ আসুন, আসুন আপনি তো এখন হাজব্যান্ড আমার৷ ঘরে আসবেন, বসবেন বিরাট বিছানায় শুবেন, ঘুমাবেন, মাঝরাতে নাক ডেকে বিরক্ত করবেন। আমাকে এসব দাঁতে দাঁত পিষে সহ্য করতে হবে। কিচ্ছু করার নেই। বয়স্ক লোক বিয়ে করেছি। সো, ঢং দেখিয়ে আর ফর্মালিটি করতে হবে না। ‘

থতমত খেলো নুবাইদ। সবই ঠিক বলল শান্তি। কিন্তু সে নাক ডাকবে? উহুম! তার বয়স এতটা অধঃপতনে যায়নি৷ মৃদু হেসে ভাবুক মুখে ঘরে ঢুকতেই পা দুটো অবশ হয়ে দৃষ্টি থমকে গেল তার। এ কী রূপ শান্তিসুধার? রাগে বশে ঘরে এসে শুধু শাড়িটাই খুলেছে শান্তি। পুরো পোশাক আর পরিবর্তন করেনি। বলা যায় খেয়ালই নেই তার। শুধু ব্লাউজ আর পেটিকোট পরা অবস্থাতেই বসে বসে ইরিন আপুর ওপর রাগ ঝাড়ল। এখন মনের আনন্দে ফোন টিপছে। নুবাইদ তাকে এ অবস্থায় দেখে থতমত খেলো। হৃৎপিণ্ডে আচমকা কিছু একটা আঘাত হানলো তার। যে আঘাত ধীরেধীরে সর্বাঙ্গ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। মস্তিষ্কে রক্ত ছলকে উঠার মতো একটা অনুভূতি অসহন করে তুলল। নিজেকে সামলে নিতে বেগ পেতে হলো। চোখ দুটো বহু কষ্টে ফিরিয়ে আনল ফ্লোরে। একদিকে ভালো লাগার শিহরণ। বউ বলে কথা! অপরদিকে বিব্রত বোধ। যতই বউ হোক আজই তো প্রথম দেখা, পরিচয়। নড়বড়ে অবস্থায় ভুগতে থাকল ক্রমশ। অথচ শান্তি স্বাভাবিক। না লজ্জা না বিব্রত অনুভূতি কোনোটাই স্পর্শ করতে পারল না ওকে। সে সুন্দর করে উঠে এসে সামনে দাঁড়াল নুবাইদের। পেট পর্যন্ত ঢাকা ব্লাউজ আর পেটিকোট যা তার কাছে খুবই স্বাভাবিক পোশাক লাগছে। এভাবে সামনে দাঁড়ানো নিয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জা করছে না। তাই অনায়াসেই সামনে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল নুবাইদের দিকে। দুহাত কোমরে রেখে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
‘ কী ব্যাপার? ‘

চোখ তুলে তাকাল নুবাইদ। বয়স অল্প হলেও শান্তির দেহের গড়নে যুবতীর ছাপ স্পষ্ট। উচ্চতা, সুস্বাস্থ্যই এর কারণ। বুকের ভেতর কী একটা যন্ত্রণা যে শুরু হলো। নিঃশ্বাস আঁটকে রেখে সে বহু কষ্টে প্রতিত্তোর করল,

‘ আমিও তো তাই বলি, কী ব্যাপার মিসেস শান্তি? আমাদের ফার্স্ট নাইট তো এ বাড়িতে হবে না। তুমি তো দেখছি প্রিপারেশন নিয়ে আছ! তাছাড়া এই ভরদুপুরে, শশুর বাড়িতে আমার পক্ষে বাসর করা সম্ভব না। প্রেস্টিজ বলে একটা ব্যাপার আছে। ‘

পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে শেষ বাক্যটি বলল নুবাইদ। শান্তির এমন মেজাজ খারাপ করল। কত বড়ো সাহস লোকটার! মনে কত জোশ! আর কী ফালতু ধারণা তাকে নিয়ে। সে নাকি বাসর করার জন্য প্রিপারেশন নিয়ে আছে। আবার প্রেস্টিজও দেখাচ্ছে। তোর প্রেস্টিজ আমি পণ্ড করছি দাঁড়া। ভেবেই সাপের মতো ফুঁসে উঠে পাঞ্জাবির কলার চেপে ধরল। এরপর চিৎকার করে বলল,

‘ আপনার মতো বুড়োকে বিয়ে করেছি মানেই ওইসব রংতামাশা করার জন্য ছটফটাচ্ছি এমনটা কী করে ভাবলেন? ‘

আচমকা আক্রমণে ভড়কে গেল নুবাইদ। ত্বরিত হাত উঠিয়ে পুরুষালি পোক্ত তর্জনীটা চেপে ধরল শান্তির নরম ঠোঁটে। এরপর মুখ নিচু করে ওর চার আঙুলে মসৃণ কপালটায় গাঢ় করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

‘ ওটাকে রংতামাশা বলে না শান্তি। ওটাকে বলে রোমান্স। ‘

সহসা দু দুটো গভীর স্পর্শে হতভম্ব হয়ে গেল শান্তি। তার অশান্ত মন, রাগত অনুভূতিরা কেমন করে যেন মিইয়ে গেল। আলগোছে ঠোঁট থেকে তর্জনী সরিয়ে কয়েক পা দূরে পিছু হাঁটল নুবাইদ। শান্তি বিস্ময় ভরে তাকিয়ে নিজেকে সামলে নিলো। পরমুহূর্তেই আবার আগের রূপ ধারণ করল। আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে তর্জনী উঁচু করে ধরে বলল,

‘ কী ভেবেছেন আমার মতো সুন্দরী একটা মেয়েকে বিয়ে করতে পেরেছেন বলে যেভাবে খুশি সেভাবে ব্যবহার করবেন! ‘

চোখ দুটো খিঁচে ফেলল নুবাইদ। প্রচণ্ড বিশ্রী শোনালো ব্যবহার শব্দটা। নিমেষে চোখ খুলে তাকাল আবার। দৃঢ় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিচের ঠোঁট উল্টে প্রচণ্ড তুচ্ছতা ভরে বলল,

‘ সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করেছি! কে সুন্দরী? ‘

‘ মানে আপনি আমাকে অসুন্দর বলছেন? ‘

ভাবুক মুখে নুবাইদ বলল,

‘ পাগল কখনো স্বীকার করে না সে পাগল। ঠিক তেমনি প্রকৃত সুন্দরী মেয়েরাও স্বীকার করে না সে সুন্দরী। যে স্বীকার করল এই দাঁড়াল যে মেয়েটা ভাবে সে খুব সুন্দরী কিন্তু আসলে সে সুন্দরী নয়।’

প্রচণ্ড আহত হলো শান্তি। সামনের আটাশ বছর বয়েসী, শ্যামাঙ্গ এই মানবটার কাছে সে সুন্দরী নয়? ষোল বছর ধরে সবাই যে তাকে সুন্দরী সুন্দরী বলল সেসব মিথ্যে!

শান্তির চুপসে যাওয়া মুখ দেখে ঠোঁট টিপে হাসল নুবাইদ। মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

‘নিজের জামাকাপড়, প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নাও। আমরা খেয়েদেয়েই বেরুবো।’

বিদায়বেলা সবাই কান্না করল শান্তিকে ধরে। অথচ শান্তির চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু ঝড়া তো দূরে থাকুক চোখ দুটো ঝাপসাও হলো না। মেজ মামি এসে শান্তির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

‘ শান্তি কান্না না এলেও মন খারাপ করে থাকো। শশুর বাড়ি যাবার সময় কাঁদতে হয়। নয়তো সবাই নির্লজ্জ বলে।’

শান্তি সর্বসম্মুখে গলা উঁচু করেই প্রতিত্তোর করল,

‘ কান্না না পেলে কেন কাঁদব? অতো ভঙ আমি ধরতে পারব না। শশুর বাড়িই তো যাচ্ছি, এতিমখানা বা বৃদ্ধাশ্রম তো যাচ্ছি না। বিয়ে যখন করেছি যেতেই হবে। আমার কান্না পাচ্ছে না। সো, কাঁদব না। জোর করে কাঁদলেই লজ্জাবতী হয়ে যাব না। ‘

বড়ো মামি, মেজ মামি লজ্জায় মরিমরি হয়ে না পারে শান্তির মুখ চেপে ধরে। সকলে তাজ্জব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওর কথা শুনে। শান্তি নানুমনি আর নানুভাইকে বিদায় দিয়ে ছোটো বোন প্রান্তির গাল টিপে দিয়ে বলল,

‘ ভিডিয়ো কল দিব রাতে। নেটে থাকিস। ‘

এরপর নুবাইদের পিছু পিছু গাড়িতে উঠে বসল। নুবাইদের দাদাভাই আর চাচা অন্য গাড়িতে যাচ্ছে। শান্তি আর নুবাইদ আলাদা গাড়ি। শান্তি ড্রাইভারকে তাড়া দিলো,

‘ মামা গাড়ি স্টার্ট দিন৷ এদের ন্যাকামি কান্না দেখতে বিরক্ত লাগছে। এতই যদি দরদরে তাহলে বিয়ে দিলি কেন? বিয়ে যখন দিয়েছিস জামাইয়ের সাথে শশুর বাড়ি আমি যাবই। দেখ কেমন লাগে! ‘

ড্রাইভার তব্দা খেয়ে একবার তাকাল পেছনে। গাড়ি স্ট্রার্ট করে বড়ো বড়ো চোখে বিড়বিড়ি করে বলল,

‘ এ কেমন বউরে বাবা! ‘

|চলবে|
® জান্নাতুল নাঈমা