শান্তিসুধা পর্ব-০৮

0
133

#শান্তিসুধা
৮.
গতকাল থেকে খুব অস্বস্তিতে ভুগছে শান্তি। বুকের ভেতর একটা চিনচিনে ব্যথা সর্বক্ষণ জ্বালিয়ে মা’রছে। ওই মুহুর্তটা মাথা থেকে সরছে না। হঠাৎ করে কী হয়েছিল তার? কেন চোখে মায়া মিশিয়ে নাফেরের দিকে তাকাল। আচমকা কেনই বা কলার চেপে ধরে, কাতর স্বরে প্রশ্ন করল, ‘ আমাকে আপনার পছন্দ নয় নুবাইদ! আপনিও কি পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়বেন? ‘

ভাবতে ভাবতে পাগল প্রায় হয়ে গেল মেয়েটা। রাগ বাড়ল, জেদ বাড়ল। তবুও উত্তর মিলল না। সবে বিয়ে হয়েছে। জানাশোনারও মাত্র শুরু। এরই মধ্যে অমন করে ওই প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি৷ সে নাফেরকে ভালোবাসে না। এই বিয়েতেও তার মত ছিল না। তাহলে কেন ওই সময়ে এক চিলতে ভয় পেয়েছিল? নিজের মায়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বীভৎস ঘটনা গুলো শোনার পর পরকীয়া শব্দটা মস্তিষ্কে এঁটে আছে বহু বছর। তাই বলে নিজের বিয়ের পর পরই সামান্য একটা ইস্যু ধরে সে এমন কাণ্ড করে বসবে? ছিঃ ছিঃ। আচ্ছা নাফেরের চোখে তো সে সুন্দরী নয়। তবে কি নাফেরও পরকীয়া করবে? ধুরর, আবার সেই একই প্রশ্ন! করলে করুক না৷ তার তো আর ভালোবাসার বিয়ে না। যে স্বামী পরকীয়া করলেই জীবন বৃথা হয়ে যাবে। ভাবতে ভাবতেই আবার মিইয়ে গেল। সে তো বেশ সুন্দরী, অল্পবয়সী। তার মতো বউ ঘরে থাকতে পরকীয়ার কী দরকার? দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল শান্তি। মাথার ভেতর কীসব দুঃশ্চিন্তা কিলবিল করছে। তার কি বিয়ে হলো? নাকি কোনো এক অশান্তির সাগরে ডুবে গেল সে? এত কেন অসহ্য লাগছে? সে সুন্দরী নয়। নাফেরের এই একটা কথাই কি তার সবকিছু অসহ্য করে তুলল?

নুবাইদের মনের বাগানে নতুন করে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। একটা প্রশ্ন, শান্তির থেকে পাওয়া একটিমাত্র প্রশ্ন। তার সমস্ত সত্তায় ফের নতুনত্ব এনে দিয়েছে। খুঁজে পেয়েছে সে, ওই নীল চোখের গোলাপি সুন্দর মেয়েটির মনের গভীরের তল। এবার সেই তলে নিজের অস্তিত্ব গেঁড়ে দেওয়ার অপেক্ষা।

অফিস থেকে ফেরার পথে শান্তির নানাবাড়িতে এলো নুবাইদ। বিয়ের পর এই প্রথম নানা শশুর বাড়িতে আসা। শান্তি এসেছে গতকাল। বড়ো মামা গিয়ে নিয়ে এসেছে ওকে। আজ নুবাইদ অফিস শেষে ফেরার পথে ওকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা। লিভিং রুমে নানুভাই আর বড়ো মামার সাথে গল্প করছে নুবাইদ৷ বড়ো মামি এসে হালকা নাস্তা দিয়ে গেল। বাড়ির সবার সঙ্গেই সাক্ষাৎ হয়েছে। হয়নি কেবল নিজের নতুন বউয়ের সঙ্গে। আড়চোখে এদিকসেদিক তাকিয়েও শান্তির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেল না। সময় গড়াল। ডিনারে করা হলো এলাহি আয়োজন। তালাল শেখের নাতজামাই এসেছে বলে কথা!

ডাইনিং রুমে ডাক পড়ল নুবাইদের। সে হাত উল্টে কব্জিতে ঝিলিক দেওয়া সিলভার কালার ঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে উঠে দাঁড়াল। ভেতর ঘর থেকে শান্তি এলো। বাঁকা চোখে একবার তাকাল নুবাইদের দিকে। এরপর গটগট পায়ে চলে গেল ডাইনিং রুমে। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে তার। বড়ো মামি খেতে দেয়নি এতক্ষণ। যতবার খাবার চেয়েছে ততবার শুনতে হয়েছে,

‘ হালকা কিছু খাবার খেয়ে নাও শান্তি। জামাই এলে একসঙ্গে পোলাও, মাংস খাবে। ‘

মেজাজটা চটেছে সেই তখন থেকেই। তার নানা বাড়ি। তার মামিরা মজার মজার খাবার রান্না করেছে। কোথায় সে কব্জি ডুবিয়ে খাবে। তা না দুদিনকার বিয়ে করা স্বামীর জন্য নাকি খিদে চেপে অপেক্ষা করতে হবে হুহ। এক ঝলক শান্তিকে দেখেই বুকটা হালকা হলো নুবাইদের। চোখ দুটো শান্তি পেল। মন হলো সন্তুষ্ট। আহারে কাল সকাল থেকে বউটাকে দেখে না। একটু একটু মন পুড়ছিল। স্বল্প তৃষ্ণার্ত হয়েছিল চোখ, বুক আর সমস্ত সত্তা। এবার সমস্ত সত্তায় আরাম পাচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য নুবাইদ অনুভব করল, বউ হলো চোখের আরাম আর মনের তৃপ্তি।

পাশাপাশি খেতে বসেছে নুবাইদ, শান্তি। খুব যত্ন নিয়ে ভাগ্নি জামাইকে খাওয়াচ্ছে মামিরা। শান্তি আয়েশ করে খাচ্ছে আর জ্বলছে। বুঝতে পারছে না কিছুতেই, পাশের মানুষটা আসলে কে? তার জামাই নাকি অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট। এত আদর, আহ্লাদ, সমাদরের কী আছে? ঢং যত্তসব। ভেবেই ভেঙচি কাটতে গিয়ে গলায় খাবার আঁটকে গেল। আচমকা শান্তি কেশে উঠতেই চমকে উঠল নুবাইদ। ধাতস্থ হয়ে একহাতে গ্লাস এগিয়ে ধরে অন্যহাতে মাথায়, পিঠে মৃদু চাপড় দিল। বিচলিত হলো মামা, মামিরা আর নানুভাই। পানি খেয়ে স্বাভাবিক হলো শান্তি। চোখ, মুখ লাল হয়ে গেছে। নুবাইদ শান্ত গলায় বলল,

‘ আস্তেধীরে, আরাম করে খাও। ‘

শান্তির পাশের টেবিলে ছোট্ট বোন প্রান্তি এ দৃশ্য দেখে ঠোঁট টিপে হাসল। পাপন বসেছিল বাবার পাশে। তাই কিছু বলতে না পারলেও মনে মনে ঠিক বিড়বিড় করল,

‘ হাউ রোমান্টিক, হাউ কেয়ারিং ইউ নাফেভাই!’

ডিনার শেষে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল নুবাইদ। কিন্তু শান্তি আজ ফিরতে নারাজ। সে নানুভাই, ননুমনির কাছে গিয়ে ঘ্যানঘ্যান শুরু করল, আজ যাবে না। তালাল শেখ নাতনির প্রতি স্নেহপূর্ণ হয়ে একবার ভাবল, নুবাইদকে আজ থেকে যেতে বলবে। পরোক্ষণেই আবার মত পাল্টাল। বোঝাই যাচ্ছে নাতনির সঙ্গে নাতজামাই এর ভাব, ভালোবাসা হয়নি। তাই দুটোকে যতটা পারা যায় একসাথে রাখতে হবে। কারণে, অকারণে, ছলেবলে কৌশলে, সবসময় দুজনকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখলেই না ভাব হবে। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা জন্মাবে। তারপর মাখোমাখো প্রেম হয়ে গেলেই ষোলকলা পূর্ণ।

শান্তির কথা শুনল না কেউ। সবাই তাকে স্বামীর বাধ্য হয়ে শশুর বাড়ি চলে যেতে তাড়া দিল। সবার এমন নিষ্ঠুর আচরণ দেখে শান্তির এত মন খারাপ হলো! সে অভিমান করে এ বাড়িতে তার যত পছন্দনীয় জিনিসপত্র আছে। সব গুছিয়ে, ব্যাগপত্র ভর্তি করে নুবাইদের সাথে শশুর বাড়িতে ফিরে গেল। যাওয়ার সময় কারো সঙ্গে কথা বলল না। একমাত্র নানু মনি ছাড়া৷ কারণ মানুষটা ভীষণ অসুস্থ। মায়ের ভালোবাসা কী জানে না শান্তি। কিন্তু মায়ের মা কী হয়? তার ভালোবাসা কত গভীর, মায়ের মা একটা মেয়ের জীবনে কতটুকু আস্থাশীল অনুভব করতে পারে। জন্ম তাকে মা দিলেও মায়ের ভালোবাসা দিয়েছে এই নানুমনি। তাই তার সঙ্গেই দেখা করল। নানুমনি শান্তির গম্ভীর মুখ আর লাল চোখ দেখে মাথায় হাত বুলিয়ে শুধু একটি কথাই বলে দিল,

‘ সুধা বু? বিয়ের পর মেয়েদের আপন আলয় হলো স্বামীর ঘর। আর সবচেয়ে আপন মানুষ, মনের মানুষ হলো স্বামী। ‘

বাড়ি ফিরে ঘরে এসে হাত-পা না ধুয়েই শুয়ে পড়ল শান্তি। নুবাইদ পোশাক পাল্টে লম্বা শাওয়ার নিল। এরপর যখন বিছানায় এলো ঘুমন্ত শান্তির গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল। লাইট অফ করে ড্রিম লাইট অন করে শুতেই কমলা বর্ণের আবছা আলোয় শান্তির স্নিগ্ধ মুখটা ভেসে উঠল। কী সরল, কী স্নিগ্ধ এই মুখ! পলকহীন নুবাইদ কতটা সময় ব্যয় করে দিল ওই মুখে চেয়ে খেয়াল নেই। তবে তার সংবিৎ ফিরল শান্তির ঘুমো ঘুমো অস্পষ্ট কণ্ঠে। কী যেন বলছে মেয়েটা। স্পষ্ট বুঝতে না পেরে কিছুটা এগিয়ে কান সজাগ করতেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন শান্তি নড়েচড়ে নুবাইদের বুকের কাছটায় এসে মুখ ডুবাল। নিমেষে এক মুঠো উত্তপ্ত বাতাস এসে প্রথমে পুরুষালি বুক এরপর পুরো দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যেতে লাগল। না সম্ভব না। এই মেয়েটার সাথে এক বিছানায় ঘুমানো মানেই তার দম বন্ধ হয়ে মরে যাওয়ার অবস্থা। এত কেন টানে মেয়েটা? কী আছে এই গরম নিঃশ্বাসে? যা গায়ে লাগলেই তার ভেতরটা এভাবে ছটফটায়? নাকি বউদের ধর্মই এটা। মধ্যরাতে গা ছুঁয়ে, এক মুঠো উষ্ণ নিঃশ্বাস ছুঁড়ে স্বামীদের পৌরুষ জাগিয়ে তোলা!

নুবাইদ পারল না। পারবে না শান্তির সঙ্গে একই বিছানায় পাশাপাশি ঘুমাতে। নিজের ওপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলছে সে। ভয়ংকর কিছু ঘটিয়ে ফেলার আগেই সরে পড়া ভালো। পাশে সুন্দরী বউ। গোটা রাতে অন্তত একবার তাকে গভীর করে না ছুঁয়ে কোন পুরুষ ঘুমাতে পারে? বিয়ের আগে নারী সঙ্গ এড়িয়ে চলা নুবাইদ বহুবার বন্ধুদের মনে সন্দেহের বীজ বুনেছে। ‘ নুবাইদ নপুংসক নয় তো? ‘ আজ সেই বন্ধুদের ডেকে ডেকে চিৎকার করে ওর বলতে ইচ্ছে করল, ” নুবাইদ একজন শুদ্ধ পুরুষ। যার বিয়ের আগে কোনো মেয়ের প্রতি এক বিন্দু আগ্রহ না জাগলেও বিয়ের পর এমন কোনো রাত যায়নি যে বউয়ের প্রতি আগ্রহের তীব্রতায় নিঃশ্বাস আঁটকে যায়নি। ”

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নুবাইদ৷ শান্তির কাছ থেকে সরে যেতে উদ্যত হলো৷ কিন্তু আচমকা ঘুমের ঘোরে শান্তি ওকে জড়িয়ে ধরল। নির্ঘাত কোলবালিশ ভেবে জাপ্টে ধরেছে! রুদ্ধশ্বাস ফেলল নুবাইদ। আস্তেধীরে অনেক কৌশল খাঁটিয়েও শান্তির থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারল না। পারবে কী করে? অবচেতন মন যে চুম্বকের ন্যায় শান্তিতে আটকাতে চাইছে। মধ্যরাতে বন্ধ চারদেয়ালে নরম বিছানায় শুয়ে তুলতুলে নরম শরীরটা দুর্বল করে ফেলল নুবাইদকে। সেই দুর্বলতা এতটাই যে এই মুহুর্তে শান্তি যদি ঘুম থেকে উঠে বলে,

‘ মিস্টার নুবাইদ এই মুহুর্তে তোমার প্রাণ ভোমরা আমার হাতে তুলে দাও। ‘

সে বিনা দ্বিধায় নিজের প্রাণ ভোমরা শান্তির হাতে তুলে দেবে। মস্তিষ্ক লন্ড-ভন্ড লাগছে। মনের ভেতর ভয়ংকর এক উত্তেজনা। সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল নুবাইদের৷ এরই মধ্যে শান্তি আবারো নড়েচড়ে যখন তাকে জড়িয়ে, উষ্ণ নিঃশ্বাসে ভরিয়ে তুলল। কী জানি কী হয়ে গেল তখন। ওই নরম শরীরটাকে গভীর করে জড়িয়ে ধরে পুরুষালি, উত্তপ্ত ঠোঁটজোড়া ছুঁইয়ে দিল উষ্ণ, নরম ঠোঁটে। ফলশ্রুতিতে ঘুমন্ত মেয়েটা আচমকা জেগে উঠল। সম্পূর্ণ শরীর কিছুতে বাঁধা পড়েছে, ঠোঁট জোড়াও আর নিজের আয়ত্তে নেই বুঝতেই দু’হাতে বাঁধা প্রয়োগের চেষ্টা করল। নুবাইদ নিজের মধ্যে নেই। সে বেঁহুশে চুমু খেল শান্তির ঠোঁটে। নেশা ধরে গেল মুহুর্তেই। ঠোঁটজোড়া ছেড়ে মুখটা আপনাআপনিই নেমে গেল শান্তির ঘাড়ে, কানে অতঃপর গলায়। জাগ্রত শান্তি ছটফটিয়ে উঠল। কী হচ্ছে বুঝতে সময় নিল। বোঝার পর পুরো দেহ অবশ হয়ে কণ্ঠরোধ হয়ে রইল। স্বাভাবিক ভাবেই রাগ হওয়ার কথা তার। চিৎকার, চ্যাঁচামেচি করে জান কুরবান করে দেওয়ার কথা নুবাইদের৷ কিন্তু সেসবের কিছুই করল না শান্তি। বরং অদ্ভুত, অচেনা এক আবেশে বিছানার চাদর খামচে ধরল। চুমু ছোঁয়ায় বেসামাল হয়ে আচমকা হাত বাড়িয়ে নুবাইদের চুলে খামচে ধরতেই থেমে গেল নুবাইদ। বড়ো বড়ো করে নিঃশ্বাস ফেলছে শান্তি। চোখ দুটো বন্ধ। এ কেমন স্পর্শ? এমন পাগল পাগল লাগছে কেন? শরীর জুড়ে শিরশির করা অনুভূতি। ভালো লেগেছে। এই স্পর্শের ঘোরটা সম্পূর্ণ নতুন তার কাছে। ইশ, এত ভালো কেন লাগছে? উফফ, নাফের! এটাই কি স্বামী, স্বামী ছোঁয়া? ঢোক গিলল শান্তি। বুকের নরম দুটো আকর্ষণীয় অংশ নিঃশ্বাসের বেগে উঠানামা করছে। নুবাইদের একটা হাত শান্তির সেই নরম অংশ ছুঁয়ে ছিল। শান্তি ধীরেধীরে চোখ খুলতেই ছিঁটকে দূরে সরে গেল নুবাইদ। শ্বাস-প্রশ্বাস এলোমেলো তার। মস্তিষ্ক পুরোপুরি শূন্য। শরীরী উত্তেজনা তখনো থামেনি। মেটেনি তৃষ্ণা। জ্বলছে বুক। তবুও নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে নামতে উদ্যত হলো। শান্তি টেনে ধরল ওর হাত। চমকে গিয়ে ফিরে তাকাল নুবাইদ। থমথমে কণ্ঠে বলল,

‘ আম সরি শান্তি। ‘

শান্তি ওর অনুতপ্ততাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে, একটু বিস্ময় আর সীমাহীন ঘোরলাগা কণ্ঠে বলল,

‘ আই ওয়াজ এনজয়িং নাফের। কী ছিল এটা! ‘

চলবে…
®জান্নাতুল নাঈমা