শান্তিসুধা পর্ব-০৯

0
154

#শান্তিসুধা
৯.
আকস্মিক শান্তির বলা বাক্যটি নুবাইদের সমস্ত অনুভূতি শুষে নিল। হতভম্ব মুখে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহুর্ত। যা প্রত্যাশিত নয় তাই হয়ে গেলে একটু তো অস্বাভাবিক লাগেই। এরপর চটজলদি গিয়ে লাইট অন করল। ফিরে তাকাল বিছানায়, শান্তির দিকে। এলোমেলো, বিহ্বল শান্তি ধীরেসুস্থে উঠে বসল। নীলচে চোখদুটো কিঞ্চিৎ লাল হয়ে আছে। নাকের ডগা, আকর্ষণীয় ঠোঁট, সুন্দর গলাও লালচে। চোখে তীক্ষ্ণ হয়ে বিঁধা, লেডিস টিশার্টের নরম কাপড়ে আবৃত বক্ষোজ ঘনঘন উঠানামা করছে। যে দৃশ্য তার মতো শক্ত ধাঁচের পুরুষ মানুষের মনকে দুর্বল করে ফেলল।
ঢোক গিলল নুবাইদ। তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠা গলা একটুখানি ভিজল। তারপর খামখেয়ালি ভাবে এগিয়ে এসে বসল বিছানায়। শান্তির মুখোমুখি। শান্তি তাকিয়ে আছে তার দিকে। ওর চোখে রাগ নেই, ঝাঁজ নেই। আর না আছে বিরক্তি, অসন্তুষ্টি। নুবাইদ অনুভব করল সব। দেখতে পেল একরাশ কৌতুহল নিয়ে মেয়েটা তাকিয়ে। নিখুঁতভাবে পরোখ করে টের পেল, শান্তির শরীরটা মৃদু মৃদু কাঁপছে। হৃৎস্পন্দনে একটা অস্থির অনুভূতি এখনো বিরাজমান। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নুবাইদ। এই অনুভূতি খুবই প্রাচীন। স্বাভাবিক এই আকর্ষণ। পুরুষের নারী শরীরের তৃষ্ণা পাবে। মধ্যরাতে নারী পুরুষের উত্তাপে শিহরিত হবে। এই চাওয়া, এই আকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ বাস্তবিক। যা এই মুহুর্তে তাদের মধ্যে
পরিপূর্ণ হলে দেহ তৃপ্ত হবে ঠিকই কিন্তু মন রয়ে যাবে অতৃপ্ত। ঘোরের বশে নিজের করা ভুলে এভাবে শান্তি বশীভূত হবে কল্পনাও করেনি নুবাইদ। সে সেইসব তথাকথিত পুরুষ, স্বামী নয়। যে ক্ষণিকের আকর্ষণে স্ত্রীকে বশ করে তার সর্বস্ব গ্রাস করে নেবে। বেহুঁশে সম্ভব হলেও হুঁশে তা কখনো সম্ভব নয়। শান্তির বয়স কম। কিশোরী দেহ প্রথম পুরুষালি স্পর্শে নতুনত্ব খুঁজে পেয়েছে। তাই ভালোলাগার আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে শান্তি। ওর ঘোর কাটানো উচিত। নয়তো আশকারা পেয়ে দুর্বল হয়ে পড়বে। করে ফেলবে কিছুক্ষণ পূর্বে ঘটানো কিঞ্চিৎ ভুলটার চূড়ান্ত। দম বন্ধ হয়ে এলেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনল নুবাইদ। স্মিত হেসে হাত বাড়াল। শান্তির উষ্ণ নরম গাল ছুঁয়ে বলল,

‘ অনেক রাত হয়েছে ঘুমাও। ‘

ধীরেধীরে চোখ দুটো কুঁচকে ফেলল শান্তি। আচমকা নুবাইদের হাতটা ঝাড়া মেরে সরিয়ে নরম স্বরে রাগ মিশিয়ে বলল,

‘ আমি কি না ঘুমিয়ে আপনার বুকের ওপর উঠে নৃত্য করছিলাম? ‘

স্তব্ধ হয়ে গেল নুবাইদ। শান্তি থামল না। বলতেই থাকল,

‘ আমি ঘুমাচ্ছিলাম আর আপনি সুযোগ বুঝে ঘুমিয়ে থাকা আমার বুকের ওপর উঠে চুমু খাচ্ছিলেন। এমন বস্তার মতো শরীরের ভারে ঘুম ভাঙতেই তো রাগ উঠে যাচ্ছিল। কিন্তু পরে আপনার মুখের গরম নিঃশ্বাস আমার মুখে পড়ল, ঠোঁটের ঠান্ডা ঘষায় আমার ঠোঁট ভিজল, কানে যে কামড় দিলেন আমার পুরো শরীরে কারেন্টের ধাক্কা লাগল এমন অনুভূতি হচ্ছিল। কামড় কখনো এত নরম হয় জানতাম না। কী যে ভালো লাগছিল! শুধুমাত্র ওই ভালো লাগা ছিল বলে আমি রাগ না করে চুপ ছিলাম। কিছুই বলিনি। আর এখন আপনি জ্ঞান দিচ্ছেন? অনেক রাত হয়েছে, ঘুমাও। ‘

নরম স্বর এবার তীর্যক হলো। নুবাইদ স্তম্ভিত মুখে, ব্যথিত হৃদয়ে তাকিয়ে। শান্তি একটুক্ষণ থেমে ফের বলল,

‘ আপনার ওই শক্তপোক্ত হাত, খড়খড়ে পাঁচ আঙুল যে আমার বুকে চা…’

এ পর্যন্ত বলতেই চমকে উঠল নুবাইদ। আর শুনতে পারল না। আচমকা হাত বাড়িয়ে মুখ চেপে ধরল শান্তির। এরপর বিস্ময় চোখে তাকিয়ে রইল শান্তির চোখজোড়ায়। কী লজ্জা, কী লজ্জা! অল্প বয়স হতেই পারে। স্বভাবে হতে পারে মুখ পাতলা। নাই বা হলো ভীরু মেয়ে মানুষ। তাই বলে মাঝরাতে স্বামীর থেকে পাওয়া প্রথম স্পর্শ, প্রথম আদর এভাবে অকপটে বিবৃতি করবে? তাও আবার স্বামীর কাছেই? কী অবলীলায় চোখে চোখ রেখে রাগ মিশিয়ে বলছে সব। বিব্রতবোধে কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বেরোলো নুবাইদের। ইচ্ছে করল, একটু না অনেকখানি জব্দ করতে। লজ্জাহীন ওই চোখে, মুখে সীমাহীন লজ্জা গেড়ে দিতে। কিন্তু আঁটকে গেল গভীর এক চাওয়ার কাছে। সেই চাওয়ার নাম, ভালোবাসা, সুখ, শান্তি। শান্তির ভালোবাসা পেতে মন ব্যাকুল হলো। এই মেয়েটা তাকে ভালোবাসুক। ভীষণরকম ভালোবেসে উন্মাদ হোক। তারপর না হয় সে ভালোবেসে কাছে টানবে। যে অল্পখানি ভালোলাগা এভাবে বর্ননা করছে একদিন সেই ভালোলাগা প্রগাঢ় হোক। আবেশে পাগলপ্রায় হয়ে থাকুক মেয়েটা। তারপর সেই অনুভূতি স্পষ্ট গলায় বলা তো দূরে থাকুক। মনে আনলেই লজ্জায় নাস্তানাবুদ হয়ে যাক।

‘ ঘুমিয়ে পড়ো। ‘

একটু ছোঁয়া, শীতল দৃষ্টি, শান্ত কণ্ঠে নিশ্চুপ হলো শান্তি। নুবাইদ আর এক মুহুর্ত শান্তির কাছাকাছি থাকল না। উঠে চলে গেল বেলকনিতে। শান্তি আশ্চর্য মুখে কিছুক্ষণ বসে দেখে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। কম্বল টেনে গায়ে জড়িয়ে, নুবাইদের বালিশটাকে কোলবালিশ বানিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল বিরক্তমুখে।
.
গুটিগুটি পায়ে দিন এগুতে এগুতে বিয়ের একমাস কেটে গেল। নুবাইদ, শান্তির সম্পর্কটা অদ্ভুত ভাবে এগুচ্ছে। সেই রাতের পর পরিবর্তন ঘটেছে বেশকিছু। নুবাইদ শান্তিকে আগলে রাখে। যত্ন নেয় ভীষণ। কিন্তু নির্দিষ্ট একটা দূরত্ব মেপে। বেশির ভাগ রাতই ঘুমহীন কাটে বেচারার। কারণ শান্তির সঙ্গে এক বিছানায় গোটা রাত কাটাতে পারে না সে। ফলশ্রুতিতে কাউচে বা বেলকনিতে বসে বই পড়ে, আধো ঘুমিয়ে কাটাতে হয় অনেক রাত। মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে থাকা শান্তির সুশ্রী মুখের দিকে অপলকে তাকিয়েও রাত পার করে দেয়। কোনো এক নারীর পানে পলকহীন তাকিয়েও যে রাতের পর রাত কাটিয়ে দেওয়া যায় জানতো না নুবাইদ। ওসব পড়েছে গল্প, উপন্যাসে। দেখেছে নাটক, সিনেমাতে। বাস্তবেও যে এসব ঘটতে পারে বা ঘটে তা বিস্ময়কর। আর এই বিস্ময়কর ঘটনাটি তাকে দিয়েই ঘটল!

শান্তির মাঝে পরিবর্তন গুলো হলো, সে শশুর ঘরে বেশ আনন্দেই দিন কাটাচ্ছে। রাগ, বিরক্তি, অসন্তোষ বিলুপ্ত প্রায়। নুবাইদের আম্মুকে এখন আর আন্টি বলতে ভালো লাগে না। এত আদর যত্ন করে মানুষটা তাকে! সকালে ঘুম থেকে দেরিতে উঠলে বকে না। সে যা খেতে চায় তাই রান্না করে খাওয়ায়। ভুল করলে মিষ্টি হেসে শুধরে দেয়৷ গ্লাস ভাঙলে বকা না দিয়ে কাঁচ ফুঁটে যাবে হাত, পায়ে সেই নিয়ে ভয় পায়, সাবধান করে। একদিন রাতে খুব জ্বর এলো। নুবাইদের সাথে সাথে অস্থির হয়ে পড়ল ওর আম্মুও। ভদ্রমহিলা ছুটে এসে মাথায় পানি ঢাললেন। শরীর মুছে দিয়ে বুকে আগলে ঘুম পাড়ালেন পুত্রবধূকে। নিজ হাতে খাইয়ে দিলেন। উষ্কখুষ্ক চুলে তেল দিয়ে বিনুনি গেঁথেও দিলেন। আহা কী আদর, কী আরাম। শাশুড়ির উষ্ণ বুকের সুঘ্রাণে মাতাল হয়ে শান্তি আহ্লাদী স্বরে সেদিন ডেকে ফেলল, আম্মু। বলল,

‘ তুমি এত ভালো শাশুড়ি কেন আম্মু? খালামুনি কি তোমার সৎ মায়ের মেয়ে? ‘

জ্বরের ঘোরে বলা শান্তির কথা শুনে বিচলিত নুবাইদ ঠোঁট কামড়াল। তাসলিমা বেগম ঠোঁট টিপে হাসলেন। বললেন,

‘ ওমা ও কী কথা! সৎ বোন হবে কেন? আমার নিজের বোন তানজিনা। রাগ বেশি একটু ছেলেমানুষ কিন্তু মন ভালো। বাচ্চাকাচ্চাদের শাসনে রাখে বেশি। ওর কথায় তুমি কিছু মনে করো না। ‘

সেই জ্বরের ঘোর কাটিয়ে উঠতেই শান্তি শাশুড়ির ন্যাওটা হলো। এই বাড়িতে ওর সবচেয়ে পছন্দের মানুষ তাসলিমা বেগম। আর তাসলিমা বেগমের সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষ নুবাইদ। উনি বুঝেন ছেলের সঙ্গে ছেলে বউয়ের সম্পর্ক আর পাঁচটা দম্পতির মতো স্বাভাবিক নয়। তাই চেষ্টা করেন বাচ্চা মেয়েটার মনে নিজের ছেলেকে গভীর ভাবে লেপ্টে দেওয়ার। নুবাইদ শান্তিকে ভালোবেসে বিয়ে করেনি ঠিক। কিন্তু বিয়ের পর থেকে শান্তি ছাড়া যে কিছু ভাবতে পারে না এটাও বেঠিক নয়। সে মা তাই বুঝে। যে ছেলে বিয়ের আগে কোনো মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব পর্যন্ত করেনি। সে ছেলে আজ বিয়ের পর বউকে চোখে হারায়। সামান্য কিছু হলেই দিশেহারা হয়। হবে নাই বা কেন? এত বছর নিজেকে শক্ত দেয়ালে বন্দি করে রেখেছে এ কারণেই তো। সম্পূর্ণ হালাল একটা মানুষকে হালালভাবে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসার জন্য। ছেলের মন বুঝে শান্তিকে আপন করে নিয়েছেন তিনি। মাতৃহারা শান্তিও মা পেয়ে নতুন জগতে বিচরণ করছে। সময়টা তার ভালোই যাচ্ছে। কিন্তু মাঝে মাঝে বুকের গহীনে তীক্ষ্ণ এক অনুভূতি জেগে উঠে। সেই রাতে আচমকা ঘুম ভেঙে যাওয়া। শরীরের ওপর ওই লোকটার পোক্ত শরীর আর মুখ, গলা ভরে দেওয়া অজস্র স্পর্শ। ভুলতে পারে না৷ কতগুলো দিন পেরোলো। কতবার বডি ওয়াশ দিয়ে গোসল করল। তবুও যেন ওই ছোঁয়া গুলো লেগে আছে গায়ে, মনে, সর্বস্ব জুড়ে।

আজ নুবাইদের অফিস যাওয়ার তাড়া বেশি। একঘন্টা আগেই তৈরি হয়ে নিল। ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়েছে শান্তি। তৈরি হওয়ার সময় নুবাইদের ঠুকাঠুকি শব্দ শুনে ঘুম হালকা হলো। এরপর আচমকা ফোনের রিংটোনের শব্দ কানে লাগতেই ঘুম ভেঙে গেল। চট করে উঠে বসতেই দেখল, শ্যামাঙ্গ মানবটি ফরমাল পোশাকে সো হ্যান্ডসাম, সো এলিগেন্ট লুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। একহাত প্যান্টের পকেটে। আরেক হাত কানে আইফোন চেপে ধরা। দৃষ্টি আয়নাতে। ঠোঁটে স্মিত হাসি। একটুখানি ক্রাশ খাওয়া যাবে কি? উহু, যাবে না৷ পরোক্ষণেই ভাবল, কেন যাবে না? জামাইটা তো তারই। হোক গায়ের রঙ চাপা, বয়স্ক। এই দুটো স্পট ছাড়া বাকি সব তো ওকে। তাহলে ক্রাশ খেতে সমস্যাটা কোথায়? ভাবতে ভাবতেই মিনি ক্রাশ খেয়ে ফেলল। এরপর হাই তুলতে তুলতে উঠে এসে দাঁড়াল নুবাইদের পেছনে। কোনোকিছু না ভেবেই পেছন থেকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বলল,

‘ ওহহো নাফের জান, আমি তো ছোটোখাটো ক্রাশ খেয়ে ফেললাম আপনাকে দেখে। ‘

পার্সনাল এসিস্ট্যান্টের সাথে কথা বলছিল নাফের। এরই মধ্যে অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি ঘটিয়ে ফেলায় প্রথমে চমকাল, ভড়কাল। এরপর বিব্রতবোধে চটজলদি ফোন কেটে দিয়ে পেছন ঘুরে দাঁড়াল। ভ্রুজোড়া কুঁচকে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,

‘ শান্তি! আমার পিএর সঙ্গে কথা বলছিলাম। ‘

নিমেষে শান্তির অনুভূতির দফারফা হয়ে গেল। মগজ গরম হয়ে গেল তক্ষুনি। চোখ কটমট করে তাকিয়ে তিরিক্ষি মেজাজে বলল,

‘ পিএর সাথে কথা বলুন বা তার বউ তা শুনে আমার কী কাজ? নিজেকে কী মনে করেন আপনি? বাংলাদেশের সুপারস্টার! ‘

‘ রেগে যাচ্ছো কেন? ফোনে কথা বলার সময় এভাবে এসে জড়িয়ে ধরে জান সম্বোধন করছো। আমার প্রেস্টিজ বলেও একটা কথা আছে। আমার মতো একজন সম্মানীয় ব্যক্তির জন্য ওদের সামনে এটা বিব্রতকর। ‘

‘ এতই যখন বিব্রতকর বিয়ে করেছেন কেন? রাস্তাঘাটের কোনো মেয়ে এসে তো আর জানপ্রাণ বলেনি। ঘরের বউই তো বলেছে। ঘরের বউ জান আপনাকে জান বলবে না তো কী বলবে? পাশের বাসার চাচা বলবে? ‘

রেগে বোম হয়ে চিৎকার করে এ কথা বলতেই নুবাইদ চমকে উঠল। শান্তির মুখে হাত চেপে বলল,

‘ ছিঃ ছিঃ! এসব বললে লোকে পাগল বলবে। ‘

‘ রাখ তোর লোক। তুই একটা বুড়ো। এজন্যই বউয়ের জান ডাক ভাল্লাগে না তোর। ‘

বলেই ফুঁসে উঠে ঘর ছাড়তে উদ্যত হলো। নুবাইদ তড়াক করে ওর হাত টেনে ধরে বলল,

‘ শান্তি সকাল সকাল অশান্তি করো না। আমার তাড়া আছে আজ। গায়ে পড়ে ঝগড়া কেন করছ? আর কথায় কথায় তুই তুকারি বন্ধ করো। ‘

‘ হাত ছাড়। ‘

ফের তুই ডাকে মেজাজ খারাপ করল নুবাইদের। ধরে রাখা শান্তির হাতে বল প্রয়োগ করে কাছে টেনে আনল। শান্তি ছুটতে ছটফট করছে। কিন্তু নুবাইদের শক্তির কাছে কুলিয়ে উঠতে পারল না। নুবাইদ ওকে টেনে এনে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বলল,

‘ আসল সমস্যাটা কোথায় বলো তো? এই অল্প কদিনেই ভালোটালো বেসে ফেলেছো নাকি? গায়ে পড়ে রাগটা কি তবে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ‘

সাপের মতো ফুঁসে উঠল শান্তি। এই রে চোখ দিয়ে গিলে খাবে যেন। নুবাইদ ওর ধারাল নীলচে চোখ দুটোয় শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। মুচকি হেসে মুখ বাড়িয়ে কানে কানে বলল,

‘ নুবাইদ তালুকদার নাফের কিন্তু মন পড়তে জানে। সবার না শুধুমাত্র বউয়ের। ‘

এরপরই দূরে সরে হাত ছেড়ে দিল। শান্তির কী যে হলো। সমস্ত রাগ ঝড়ে পড়ল এক নিমেষে। নুবাইদ দু মিনিট অপেক্ষা করল ওর থেকে কিছু শোনার৷ কিন্তু ও বলল না। হতাশ নুবাইদ তাই সব গুছিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো। তক্ষুনি শান্তি ত্বরিত কণ্ঠে বলল,

‘ আমি বাড়িতে বসে থাকতে থাকতে বোরিং হয়ে গেছি। আজ বন্ধু, বান্ধব নিয়ে বেরুতে চাই। ‘

কপাল কুঁচকে পা দিটো থামিয়ে ফেলল নুবাইদ। ঘুরে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

‘ আমি বন্ধু, বান্ধব বুঝি না শান্তি। সময় বের করে আমি বাইরে নিয়ে যাব। তাছাড়া নেক্সট উইকে তোমার কলেজে এডমিশন। ভুলে যাওনি নিশ্চয়ই? আপাতত বাসায় বসে বসে যে বইগুলো এনেছি ওগুলো পড়ে সময় কাটাও। ‘

চ্যাঁচিয়ে উঠল শান্তি।

‘ কী বলতে চাচ্ছেন নাফের? আমার কোনো বন্ধু থাকতে পারবে না? ‘

‘ এক্সাক্টলি তাই শান্তি। বিয়ের পূর্বে আমার কোনো মেয়ে বান্ধবী ছিল না। স্বাভাবিকভাবে বউয়ের কাছে তাই আমার প্রত্যাশা অনেক বেশি। যদিও বিয়ের পূর্বে তোমার সম্পর্ক, জীবন নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু বিয়ের পরবর্তী জীবনে তোমার সবটা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা আছে। চুলের গোড়ায় খুসকি আছে কিনা, হাতের নখে ময়লা জমল কিনা, পিরিয়ডে ব্লিডিং স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক যাচ্ছে? পেইন হলে সেটা কতটা যন্ত্রণার। এ টু জেট! সবটাতে এই নুবাইদ তালুকদারের মাথা ব্যথা, আর মনের যন্ত্রণা অনেক বেশি। ‘

আর এক মুহুর্ত দাঁড়াল না নুবাইদ। চোখের পলকে রুম ত্যাগ করল। শান্তি তাজ্জব! তার হা হয়ে যাওয়া মুখে
ডানহাতের তালু চেপে ধরল সহসা। এরপর ঘনঘন চোখের পলক ফেলতে ফেলতে গিয়ে বসল বিছানায়। শরীরটা আর ধরে রাখতে পারছে না সে। মাথা ঘুরছে। এই নাফের এসব কী বলে গেল কী? তার এমন অস্থির লাগছে কেন? সে কী মরেটরে যাচ্ছে? প্রাণটা কী বেরিয়ে পড়বে এক্ষণ? আলগোছে শুয়ে পড়ল শান্তি। তারপর কাঁপা কাঁপা ডানহাতটা বুকের বাঁপাশে চেপে ধরে বিড়বিড় করে বলল,

‘ নাফের আপনি মোটেও সুবিধার পাত্র নন। নানুভাই ভুল চিনেছে আপনাকে। শাশুড়ি আম্মু জানেই না তার ছেলেটা কী হাই লেভেলের, গ্রেট লু চু!’

চলবে…
® জান্নাতুল নাঈমা
রিচেক করিনি। ভুলত্রুটির জন্য দুঃখীত।