শান্তিসুধা পর্ব-১৮

0
113

#শান্তিসুধা
১৮.
বাংলোটা বেশ পুরোনো ধরনের। বাগানে ফুল গাছের পাশাপাশি ঘাস, লতাপাতার অভাব নেই। গ্রামে স্যাঁতস্যাঁতে ভেজা মাটিতে বৃষ্টিপাত হলে কেঁচো, জোঁকের আনাগোনা বাড়ে। হয় যদি এমন পুরোনো বাংলো বাড়ির অবহেলায় পড়ে থাকা বাগান। তাহলে তো কথাই নেই। অবুঝ শান্তি রাত মাথায় বৃষ্টিবিলাস করে, সরল মনে ঘাস আর ফুলগাছে আলিঙ্গন করতে গিয়েই ফেঁসে গেল। এর আগে কখনো গ্রামে আসেনি সে। তার জন্ম, বেড়ে উঠা শহরে। নানুভাই, মামাদেরও গ্রামে তেমন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় নেই। প্রথমবার গ্রামে এসে সহজ মনে নিজেকে প্রকৃতির কাছে বিলিয়ে দিয়ে ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতা পেল সে।

রাত দশটা। নুবাইদ তার পরিচিত একজন ছোটো ভাই। রতনকে দিয়ে গ্রামের সবচেয়ে ভালো ফার্মেসি থেকে শান্তির জন্য ওষুধ নিয়ে এলো। কংফু লিকুইড যে এখানে পাওয়া যাবে ভাবতে পারেনি৷ পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করল। রাতের খাবার অবহেলায় পড়ে আছে। নুবাইদ ওষুধটা ক্ষতস্থানে লাগাতে বলল শান্তিকে। বেচারি নিঃশব্দে, চোখ বুঁজে শুয়ে আছে। ভয় পেয়েছে। সেই সঙ্গে তীব্র ব্যথাও। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নুবাইদ। কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বলল,

” এটা লাগিয়ে নাও শান্তি। কথা শোনো। ”

এবারে উঠে বসল শান্তি। হাত বাড়িয়ে ওষুধ নিয়ে দ্বিধা ভরে তাকাল। নুবাইদ এক মুহুর্ত বিব্রত মুখে তাকিয়ে উঠে চলে গেল বাইরে। দীর্ঘক্ষণ পর ভেতরে এসে জিজ্ঞেস করল,

” ডান? ”

উপর, নিচ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝাল শান্তি। ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল নুবাইদ। বলল,

” এসো খেয়ে নেবে। ”

চুপচাপ নেমে এলো শান্তি। ওর পরনে সেলোয়ার-কামিজ কিন্তু ওড়না পরেনি। বেচারি ভয়ে, ব্যথায় হয়তো এদিকে হুঁশই রাখেনি৷ যদিও বউ তবুও নুবাইদ আর ওর দিকে সরাসরি তাকাল না। মুখোমুখি বসে চুপচাপ খেয়ে নিল। খাওয়ার পর একটুও অপেক্ষা করল না শান্তি। বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল৷ মিনিট পাঁচেক পর তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে। নুবাইদ খাওয়া শেষ করে সব গুছিয়ে রেখে কিছুক্ষণ মোবাইল ঘাঁটল। এরপর যখন ঘুম ধরে গেল কাউচেই গা এলিয়ে দিল।

ভোরবেলা শান্তির গোঙানিতে ঘুম ভেঙে গেল। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল নুবাইদ। কী হয়েছে বুঝতে সময় লাগল কয়েক মিনিট। নিজেকে ধাতস্থ করে উঠে গেল বিছানায়। ডাকল মৃদুস্বরে,

” শান্তি, শান্তি, শান্তি? ”

সাড়া দিল না শান্তি। গোঙাতে গোঙাতে উলোটপালোট করতে লাগল খুব৷ হকচকিয়ে গেল নুবাইদ। কাছে ঘেঁষে কপালে হাত দিতেই আঁতকে উঠল। ভয়াবহ তাপ! এই জ্বর কিসের ফল? বৃষ্টি না ভয়? কোনটার কবলে পড়ে জ্বর বাঁধাল শান্তি? হতবুদ্ধি শূন্য হয়ে পড়ল নুবাইদ। কী পরিকল্পনা করে মেয়েটাকে নিয়ে এলো। আর হচ্ছে কী? বিচলিত হলো সে। পরমুহূর্তেই আবার সামলে নিল নিজেকে। যত যাইহোক নিজ উদ্দেশ্যে সফল হয়েই ছাড়বে। এই ঠুনকো জ্বর তার জীবনে, সংসারে, সম্পর্কে বাঁধা হতে পারে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলল নুবাইদ। শান্তির মাথায় হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলল,

” কিচ্ছু হবে না জান, সামান্য জ্বর সেরে যাবে শিঘ্রই। ”

এরপর চটজলদি জলপট্টি ব্যবস্থা করল। ছোটো ভাই রতনকে ফোন করে কিছু মেডিসিনের নাম বলে দিল। ব্রেকফাস্টের সাথে ওষুধও চলে এলো। নিজহাতে অল্প একটু খাইয়ে ওষুধ গুলো খাইয়ে দিল শান্তিকে। মেয়েটার হুঁশ নেই। খুবই আবোলতাবোল বকছে। খাবার খেলো চোখ বন্ধ করে। এরপর ওয়াশরুম যাওয়ার প্রয়োজন পড়লে ভাঙা গলায় বলল,

” মামি, ওয়াশরুম যাব। ”

হতভম্ব হয়ে গেল নুবাইদ। মামি মানে? স্বামীর যত্নকে শান্তির মামি মামি যত্ন লাগল? জ্বর এলে নিশ্চয়ই মামিরা এভাবে যত্ন করে খাইয়ে দেয়। তাই এই সময় ওর মন, মস্তিষ্ক জুড়ে শুধু মামিরাই বাস করছে। কী আর করার। মামি হয়েই কোলে তুলে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল। ভেতরে দাঁড় করিয়ে ফিরে আসবে এমন সময় শুনতে পেল শান্তির কাঁপা কাঁপা গলার স্বর,

” খুলে দাও একটুও শক্তি নেই। ”

চকিতে তাকাল নুবাইদ৷ দেখতে পেল শান্তির চোখ বন্ধ। দুহাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে৷ অর্থাৎ পাজামা খুলে দিতে হবে! থমকে গেল নুবাইদ। বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল কিয়ৎক্ষণ। ঠোঁটজোড়া আপনাআপনি ফাঁক হয়ে আছে। এই মুহুর্তে শান্তির সবচেয়ে বড়ো শুভাকাঙ্ক্ষী, আপনজন সে। মেয়েটা হুঁশে নেই তাই এভাবে আবদার করছে। দোষ তো কিছু নেই। তারা স্বামী-স্ত্রী। এই তীব্র সত্যিটা কখনো মিথ্যা হবে না। মিথ্যা হতে দেবে না সে। কঠিন মুহুর্ত। জটিল পরিস্থিতি। নুবাইদ এগিয়ে এলো। বিয়ের পর প্রেম, ভালোবাসা হলো না৷ হলো শুধু ঝগড়া, মানঅভিমান। মারামারিও তো হয়েছে। একটু কাছাকাছি আসাও হয়নি৷ স্বামী-স্ত্রী সুলভ কিনচ্ছি সম্পর্কও তৈরি হয়নি৷ অথচ দেখো পরিস্থিতির চাপে পড়ে বারবার বউয়ের কাপড় খুলতে হচ্ছে। কী আশ্চর্য জীবন তার৷ ভেবেই চাপা নিঃশ্বাস ছাড়ল নুবাইদ। চোখ দুটো বন্ধ করে, নিঃশ্বাস আঁটকে শান্তির আদেশ, আবদার যাইহোক না কেন। সম্পূর্ণ করে কমোডে বসিয়ে দিয়ে ত্বরিত বেরিয়ে গেল।

প্রচণ্ড দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেল নুবাইদ। ওষুধ তো খাইয়ে দিল। কখন কমবে জ্বর? ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে নুবাইদকে একবার দেখল শান্তি। তারপর চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ল। নুবাইদ চমকে তাকাল। কাছে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

” অনেক বেশি খারাপ লাগছে? ”

মাথা নেড়ে না করল শান্তি। নুবাইদ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। মিনিট দুয়েক গেলে গভীর নিঃশ্বাস ছাড়ল শান্তি। অর্থাৎ ঘুমিয়ে পড়েছে। আজ আর বাইরে যাওয়া হবে না। শান্তির জ্বর না কমা পর্যন্ত কোনো কাজই ঠিকঠাক এগুবে না৷ একবার বাড়িতে ফোন করল। মাকে জানাল, শান্তির শরীর খারাপের কথা। মা পরামর্শ দিল ঘনঘন জলপট্টি দিতে। ওষুধ তো খাচ্ছেই ঠিক হয়ে যাবে। কথা শেষে ফোন রাখতেই শুনতে পেল শান্তির কণ্ঠস্বর। ঘুমের ঘোরে কী যেন বলছে? কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গেল সে৷ একদম কাছে গিয়ে কান পাতল। ভাঙা, ভাঙা কণ্ঠ তবুও বুঝল। শান্তি আসলে ওর বড়ো মামির সঙ্গে কথা বলছে।

” আমি ডিভোর্স চাই না বড়ো মামি। তুমি তো বললে নাফের আমাকে বুঝবে। তাহলে কেন বুঝছে না? ”

একটুক্ষণ থামল শান্তি। নুবাইদ ওর আরো কাছে চলে গেল। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল বেশ৷ শান্তি ফের বলল,

” নানুভাই কেন বুড়ো বরের কাছে বিয়ে দিল আমায়? যদি নাফের বুড়ো না হতো ঠিক এই শান্তির মন বুঝত৷ তুমি তো শিখিয়ে দিলে নাফেরকে আপন করে নিতে। পুরুষ মানুষ নাকি নারীর মিষ্টি আলিঙ্গনে হার মানে? নাফের তো আমায় সুযোগ দিচ্ছে না মামি। ”

বেহুঁশে কথাগুলো বলতে বলতে শান্তির চোখ বেয়ে জল গড়াল। নুবাইদ চটজলদি তর্জনী দিয়ে ছুঁয়ে দিল সে নোনাজল। নড়েচড়ে ডানকাত হয়ে শুলো শান্তি। ভাঙা আওায়াজে ফের বলল,

” আমি এত পজেসিভ বউ কেন হলাম মামি? কেন নাফেরের পাশে কোনো মেয়ে সহ্য করতে পারি না? কখনো তো বুঝিনি ওকে ভালোবাসি। কখনো মন বলেনি৷ তবুও কেন ওকে হারানোর ভয় পাই? কেন মন বলে ও শুধুই আমার। বুড়োটা কেন বুঝল না মামি কেন? মুখের কথা কেন সব হয়ে গেল? ”

নুবাইদের চোখে, মুখে উপচে পড়ল সুখ। চটজলদি দূরে সরে গেল সে। ঘরের এক কোণে একটা ভাঙা চেয়ার পড়ে ছিল। সেটা এনে বিছানার পাশে, শান্তির পাশে বসল। এত আস্তে বলছে যে স্পষ্ট বুঝতে হলে কান পেতে গভীর মন দিয়ে শুনতে হবে।

” তুমি তো বুদ্ধি দিলে ওকে কাছে টানতে। একবার ভালোবাসা হয়ে গেলে, একবার স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হয়ে গেলে নাফের আর আমাকে ছাড়তে পারবে না। কিন্তু সুযোগ কীভাবে নিব? বুড়োটা কেমন গোমড়া হয়ে আছে জানো? ”

কিয়ৎক্ষণ পর,

” আমি অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছি মামি। আমার এখন কান্না পায়৷ বুকে কষ্ট হয়। স্মৃতির পটে না থাকা মাকে মনে পড়ে। বুড়ো বরটা আমার সব উলোটপালোট করে দিল মামি সব৷ আমি চাইনি এই দুর্বলতা। আমি চাইনি এই বুড়ো বরকে। তবুও কেন আজ চাইছি? যদি সত্যি সত্যি ডিভোর্স হয়ে যায়। আমি কি সহ্য করতে পারব? ফিরে যেতে পারব আগের জীবনে? আমার এত মায়া কেন হচ্ছে? যে গভীর মায়া আমার হচ্ছে তা কেন নাফেরের হচ্ছে না? ওর যদি হতো তবেই না শিক্ষা পেত। টের পেত এই শান্তির দুঃখ। আমি জানি না মামি কিছু জানি না। কী হবে বলো তো? বিয়ে যখন হয়েছেই কেন ডিভোর্স হতে হবে? অবুঝ, রাগি শান্তি একটু রাগ করে না হয় বলেছেই। তাই কেন মেনে নিতে হবে নাফেরকে? বউয়ের প্রতি কি একটুও জোর নেই? কেন একবার বলল না, আমার থেকে মুক্তি পাবে না শান্তি। ”

দুচোখের পাতা ভিজে চুপেচুপে হয়ে গেল। নুবাইদ আচমকা হাত বাড়িয়ে ভেজা চোখ ছুঁয়ে দিল। এরপর মুখ এগিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

” নাফের সব কথা মুখে বলে না শান্তি। সুকৌশলে তীক্ষ্ণ ভাবে করে দেখায়। ”

কথাটা বলেই চট করে শান্তির কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। গভীর সে স্পর্শ পেয়ে নড়ে উঠল শান্তি। নুবাইদ সরে গেল আচমকা। অদ্ভুত এক প্রশান্তি ওর সর্বস্ব জুড়ে এঁটে রইল।

শান্তির জ্বর কমতে কমতে বিকেল গড়াল। নুবাইদ বাগানে বসে চা খাচ্ছিল। শান্তি কোনো রকমে উঠে চোখে, মুখে পানি দিয়ে বেরিয়ে এলো। নুবাইদ কোনো প্রকার ভণিতা ছাড়াই বলল,

” চা খাবে? ”

মাথা নেড়ে না বুঝাল শান্তি। নুবাইদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পাশে বসতে বলল। শান্তি বসলে হঠাৎ সে তাকাল। খুবই মনোযোগী দৃষ্টি। শান্তি অবাক হলো। গুরুগম্ভীর ভাব কাটিয়ে এ আবার কোন ভাব? তক্ষুনি নুবাইদ বলল,

” এই গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা ছোট্ট নদী আছে। সেই নদী পেরিয়ে ঘন জঙ্গল আর পাহাড়। ওটাকে গরিবের পিকনিক স্পটও বলা যায়। বড়োলোকি কারবার করার অনেক সময় আছে৷ বাচ্চা মানুষ, তারওপর স্টুডেন্ট লাইফ চলমান। কলেজের গন্ডি পেরোওনি। আলাদা হওয়ার আগে কাশ্মীর, সুইজারল্যান্ড তো নিয়ে যাওয়ার তো সৌভাগ্য হলো না। আপাতত ছোটোখাটো পাহাড়ি এলাকা থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি চলো। ”

বুক ধক করে উঠল শান্তির। স্তম্ভিত হয়ে তাকাল নুবাইদের পানে। কপট গম্ভীরতা দেখিয়ে নুবাইদ বলল,

” যাবে? ইয়েস অর নো তে উত্তর চাই। ”

বুকের গভীরে সুক্ষ্ম এক যন্ত্রণা অনুভব করল শান্তি। চোখ দুটো ঝাপসা হতে গিয়েও হলো না। নিজেকে সামলে নিয়ে মাথা ঝাঁকাল। ‘ ইয়েস ‘ ফিচেল হাসল নুবাইদ।

” আগামীকাল যাচ্ছি। দুদিন থাকব সেখানে। ”

~চলমান~

®জান্নাতুল নাঈমা
রিচেক করিনি।