শ্রাবণধারা পর্ব-১৯+২০+২১

0
60

“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ১৯
(নূর নাফিসা)
.
.
“ফুটন্ত শাপলা আর আমি সবই আছে পাশে। তবে আজ কেমন লাগছে এসে?”
হাতের গড়া শাপলার মালা ইফতেখারের গলায় দিয়ে শ্রাবণ মিষ্টি হেসে প্রত্যুত্তর করে,
“অপূর্ব।”
গলার মালায় হাত রেখে ইফতেখার বললো,
“মালা পরে মেয়েরা। আমার গলায় কেন?”
“বিয়েতে মালা বদল হয়নি, তাই।”
“আচ্ছা?”
খিলখিলিয়ে হাসে শ্রাবণ। নিজের গলা থেকে মালা খুলে শ্রাবণের গলায় বদল করে নেয় ইফতেখার। পরক্ষণে কোমল স্পর্শ স্থির করে কপালে। শ্রাবণ বাড়ি নিয়ে আসার জন্য এক আঁটি পরিমাণ শাপলা তুলে নিয়েছে। আঁটি বেঁধে দিয়েছে ইফতেখার নিজেই। মেঘেরা গুড়ুম গুড়ুম ডাকছে। যখন তখন শ্রাবণধারা বইতে পারে। তাই বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে শাপলা বিল ত্যাগ করে এই যূগল। সময়টা অনন্য ছিলো দুজনের জন্যই। বাড়ি ফিরেই দেখে রক্তাক্ত মাথায় এসে দুয়ারে দাঁড়িয়েছে গ্রামের এক মধ্যবয়সী লোক। জীর্ণশীর্ণ দেহ আর পরনে মলিন লুঙ্গি। এক হাতে মাথা চেপে রেখে দাঁড়িয়েছে চেয়ারম্যানের মুখোমুখি। সঙ্গে আছেন এমনই জীর্ণশীর্ণ দেহের অধিকারী এক মহিলা৷ মাথায় ঘোমটা থাকলেও গলার স্বর যথেষ্ট উঁচু। অশ্রুসিক্ত উভয়ের নয়ন। হামলাকারীর নামে বিচার দিচ্ছে চেয়ারম্যান সমীপে। দূর থেকে দেখেই ইফতেখার ও শ্রাবণের ভ্রু মাঝে কুচকানো ভাব চলে আসে। ইফতেখার এগিয়ে যায় দ্রুত পায়ে। শ্রাবণও চিন্তিত ভঙ্গিতে গলার মালা আর কানের ফুল হাতে নামিয়ে নেয়। দ্রুত কদম ফেলে এগিয়ে যায় ইফতেখারের পিছু পিছু। ইফতেখার লোকটির পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
“খাঁয়ের কাকা, কি হয়েছে?”
লোকটি হামলাকারীর নামের আগে গালি দিয়ে জানায় তার ভাতিজা তাকে মেরেছে। মহিলার কর্কশ কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, ঝগড়া শুরু হয়েছে তাদের দুই জায়ের মধ্যে। কথা কাটাকাটি চলার এক পর্যায়ে হুট করে ছেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে এই মহিলাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়েছে। তার স্বামী অর্থাৎ খাঁয়ের লোকটি তখন এগিয়ে ধমকে কৈফিয়ত চাইতে গেলে তার উপরই খুঁটি হাতে হামলা করে বসেছে। মাথা থেকে রক্ত ঝরিয়েছে। তারা শিগগির এর বিচার চায়। এক্ষুণি চায়। আফজাল হোসেন বারান্দার প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে থেকে বলছেন যে,
“আচ্ছা, আমি দেখমু নে। তুই গিয়া চিকিৎসা নে।”
“না, আগে বিছার করেন। এক্ষণ হের বিছার চাই। কয়দিন পরে পরেই হেয় দৌড়ায় মারতে আইবো ক্যা? হের আগেও মেম্বার বিছার কইরা দিছে, কোনো মান্যতা হেয় করে না। আপনে কিছু করবেন নাকি, কন।”
“বললাম তো, আমিই দেখমু। তুই যা।”
ইফতেখার তার কাঁধ স্পর্শ করে বলে,
“কাকা, আপনে ডাক্তারের কাছে যান। আব্বা বলছে তো দেখবে। চিন্তা করবেন না। অপরাধ যখন করেছে, বিচার হবে। কাকী, আপনি নিয়ে যান তো। রক্ত ঝরা বন্ধ করুন আগে।”
তারা বাড়ির বাইরে গেলেই আফজাল হোসেন ইফতেখারকে বলেন,
“ঘুরে দেখে আয় তো, কি হইছে বিষয়াশয়।”
ইফতেখার মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে চলে যায় সাথে সাথেই। শ্রাবণ পিছু বলে দেয়,
“আপনি আবার উল্টাপাল্টা করতে যেয়েন না যেন। মাথা গরম হতে সময় নেয় না তো আবার।”
ইফতেখার এক পলকের জন্য পিছু ফিরে তার দিকে তাকায়। আফজাল হোসেনও শ্রাবণের কথার সুর ধরে বলে,
“হু, তুই কিছু করিস না। জেনে আয় শুধু।”
ইফতেখার চলে যেতেই শ্রাবণ শাপলার আঁটি হাতে বারান্দায় আসে। তার বড্ড খারাপ লাগছে তাদের দেখে। রাগ হচ্ছে ছেলেটার উপর। একটা ছেলে কিভাবে একটা মাতুল্য নারীর গায়ে লাথি মারতে পারে। বাবাতুল্য চাচার মাথা ফাটিয়ে রক্তাক্ত করতে পারে! পারভীনের সাথে দাঁড়িয়ে অর্পা আর পরীও দেখছিলো এতোক্ষণ তাদের। শ্রাবণ পরীর হাতে শাপলার আঁটি ধরিয়ে দিতেই পরী জানতে চায়,
“আপনেরা নৌকা দিয়া ঘুইরা আইলেন?”
শ্রাবণ চিন্তিত মুখে মাথা নেড়ে পরীর জবাব দিয়ে আবার পিছু এগিয়ে দাঁড়ায় আফজাল হোসেনের সামনে।
“উনাদের একটা জিডি করলে ভালো হতো না, আব্বা?”
“বিচার যখন আমিই বসামু, জিডির কি দরকার?”
“আইনও তো বসে থাকার জন্য সৃষ্টি হয়নি। আপনি পুলিশ ডেকে দিলেই হয়তো বেশি ভালো হতো। যেহেতু ক’দিন পরপরই ছেলেটা তেড়ে মারতে যায় বললো। ভয়ের জন্য হলেও আইনী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।”
“আমি যা বুঝি, তুমি তা বুঝো না।”
“তা হয়তো বুঝি না। কিন্তু স্পর্ধাটুকু পরিমাপ করতে পারি। কতটা জঘন্য স্পর্ধা নিয়ে সে কোনো মাকে লাথিতে ফেলে দেয়! তার শাস্তিটাও তো সেইরকমই হওয়া দরকার।”
“এক বাড়ির এক মানুষ। আজ ঝগড়া লাগলে, কালকেই আবার একত্রে চলবো। এইসব ব্যাপার আইনী ঝামেলায় না টানাই ভালো।”
দুঃখের সাথে ঠোঁটের কোণে সামান্য তাচ্ছিল্যকর একটা হাসি স্পষ্ট করে শ্রাবণ বলে,
“আজ মাথা থেকে কয়েক ফোটা রক্ত ঝরিয়েছে, কাল যে প্রাণটাকেই দেহ থেকে ঝরিয়ে দিবে না তারও নিশ্চয়তা নেই।”
কথাটা বলেই হাতমুখ ধুয়ে নিতে চলে যায় সে। আফজাল হোসেন তাকিয়ে থাকেন তার যাওয়ার পানে৷ বড়দের কথার উপর ছোটদের দখল দেওয়াটা তিনি ঠিক পছন্দ করেন না। কিন্তু যুক্তি ও স্পষ্টবাদিতায় আকৃষ্ট হোন বটে। এই মেয়েটা ভাষ্যের দিক থেকে ভীষণ সুস্পষ্টবাদী। কিন্তু কথাগুলো বলে বিদ্ধ ভাবার্থে। সরল বাক্যে জটিলতার ভাব স্পষ্ট না করলেই যেন চলে না তার। উপস্থিত পারভীনের কাছেও ভালো লাগলো না শ্রাবণের আচরণ। শ্রাবণ যখন রান্নাঘরে আসে, পারভীন তখন আফজাল হোসেনের নাশতা গুছায় প্লেটে। শ্রাবণকে দেখতেই গম্ভীরমুখে বলে,
“পাঁচ-ছয় বছর যাবত চেয়ারম্যান তিনি, এমনে এমনেই দায়িত্ব পালন করতাছে না। ছোট মানুষ, ছোটর মতো থাকবা। মুরব্বিগো কথাকাজের উপর পাকনামি করা ছাড়ো। এইসব তোমারে সাজে না। বউ না খালি, আমার একটা মাইয়াও আছে ঘরে। তোমারেও ভিন্ন চোখে দেখি না। হয়তো শ্বাশুড়ির কথা গায়ে লাগবো বেশি। কিন্তু এইসব বেয়াদবি। উচ্চ ডিগ্রি পাইছো, কিন্তু আদবকায়দা তেমন পাও নাই দেখতাছি।”
শ্রাবণ কোনো কথা রাখে না তার বিপরীতে। পারভীন প্লেট নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে যায়,
“ঢাকনার নিচে রুটি আছে। হাড়িতে ভাতও আছে। যেইটা ভাল্লাগে, খাও।”
শ্রাবণ প্লেট নিয়ে দুই মুঠো ভাতই তুলে নিলো। রান্নাঘরের জানালার পাশে মোড়া পেতে বসে এখানেই খেতে লাগলো। এক লোকমা মুখে তুলে বাইরে তাকিয়ে থাকে ভাবুক ভঙ্গিতে। পরবর্তী লোকমায় এভাবে পড়ে যায় অস্বাভাবিক বিরতি। পরী অর্পার জন্য খাবার নিতে এসে তাকে এভাবে বাইরে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলে,
“ভাতে মাছি পরবো তো, ভাবি৷ কি এতো ভাবতাছেন?”
মুখে মৃদু হাসি এনে ডানেবামে মাথা নেড়ে খাওয়ায় মনযোগ দেয় পুনরায়। বাইরে এসে ইফতেখারের দেখা পায়। বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে ফোটা ফোটা। ইফতেখার উঠুন ভেদ করে দৌড়ে আশ্রিত হয় বারান্দায়। মাথার চুল ঝারতে ঝারতে যায় বাবার ঘরে। শ্রাবণ বারান্দায় দাঁড়িয়েই শোনে তাদের কিছু কথপোকথন। শফিক ছেলেটাকে বাড়ি গিয়ে পায়নি সে। তার মায়ের কাছে শুনে এলো কিছু। তিনি জানালেন উল্টো তারাই স্বামী-স্ত্রী মিলে আগে হামলা করেছে তাদের মা, ছেলে আর বাবার উপর। তাই তারাও পাল্টা দিয়েছে। বাবামাকে অক্ষত অবস্থায় দেখা গেছে। ছেলেকেও যে খুব মেরেছে, বিশ্বাসযোগ্য নয়। ইফতেখার তাদের তিনজনকেই বিকেলে আসতে বলে এসেছে চেয়ারম্যান বাড়িতে।
মলিন মুখে কলেজের জন্য তৈরি হয়েছে কান্তা। এরই মধ্যে নামতে শুরু করেছে টুপটাপ ফোটা ফোটা বৃষ্টি। ছাতাটা কোথায় রেখেছে, খুঁজে পাচ্ছে না। ছাতা বিহীন বের হলেই না মাঝ রাস্তা ছুঁতে ছুঁতে ভিজে যাবে পোশাকাদি! কিছুক্ষণ খুঁজে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে মায়ের অপেক্ষায়। পুকুরে হাড়িপাতিল মাজতে গিয়েছিলো শিরিন। বৃষ্টি পড়তে দেখেই ঝটপট কাজ সেরে বাড়ি ছুটে এসেছে। বারান্দায় বোরকা পরে মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই তার কপাল কুচকে আসে। হাড়িগুলো চটের বস্তায় উপুর করে রেখে কর্কশ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“কই যাছ তুই?”
“কলেজে।”
“কোনো কলেজ ফলেজ লাগতো না। ঘরে যা। বোরকা খোল গিয়া কইতাছি।”
“পরীক্ষা। আমার যাইতে হইবো।”
“কোনো পরীক্ষাও লাগতো না আমার। বহুত করছত পড়াশোনা।”
“আম্মা, এমন কইরো না তো। সময় চলে যাইতাছে। ছাতা কই রাখছো?”
“ছাতা পাতার খবর জানি না। তোরে ঘরে যাইতে কইছি।”
“লাগবো না তোমার ছাতা।”
ঠমক দিয়ে উঠুনে নেমে যায় কান্তা। শিরিন পিছু হতে গলা উঁচিয়ে বলে,
“এই যে, যাইতাছোস। যা। আর আয়িছ না।”
বিপরীতমুখী দুয়ার হতে মজিদা বলে,
“যাক না। এমন করছ ক্যা? পরীক্ষা যহন, কলেজ যাইতো না?”
“আরে, ভালা না তো। ভালা না। ভালা হইলে ঠিকই পড়ালেখা করাইতাম।”
“ক্যা, কি করছে?”
“করে নাই, করতে কতক্ষণ? বন্ধুবান্ধব লইয়া চলার হইলে লাগতো না এমন পড়ালেখা। বিয়া দিমু, জামাইর বাড়ি গিয়া সংসার করবো। পড়াশোনা দিয়া কি হইবো?”
ঠমকে ঠমকে ঘরে চলে যায় শিরিন। বলতে গিয়েও যেন বলতে পারে না কারণ। কানাঘুঁষায় জানাজানি হবে। গরীব এমনিতেই মূল্যহীন। কোনো অসম্মানজনক কথা জুড়লে কন্যা প্রদানের জন্য একটা ভালো ঘরও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনিতেই তো পাত্র মিলে না। পাত্রীর দুর্নাম রটলে এই মেয়ের কি করবে? বুক ভরা কষ্ট একা একাই পুষে যায় বুকের মাঝে। মনযোগ দেয় আসবাব গুছানোর কাজে৷ হাড়ির ঢাকনা খুলে দেখে ভাতও খেয়ে যায়নি মেয়ে। না খেয়ে, না খেয়ে মুখটা শুকিয়ে যাচ্ছে একদম। মায়ের কষ্ট লাগে না বুঝি এই চেহারা দেখে? কিন্তু রাগও তো কমানো যায় না। কত স্পর্ধা নিয়ে বলে দিলো, বিয়ে দিতে হলে ওই ছেলের সাথেই দিতে। দুয়ের যে কোনোদিক হতেই মিলবে না, এটা কি একবার ভেবেছে?
বাজারে ছাত্রলীগের ক্লাবে বসে ছিলো বিপু। চোখের পলকে একবার মনে হলো রিকশায় কান্তাকে দেখলো। কিন্তু কান্তা তো হেঁটে যাওয়া আসা করে। মনের সন্দেহ বলে ছেড়েও যেন ছাড়তে পারলো না। দুপুরে মন টেনে আনলো তাকে কলেজের দিকে। কলেজ ছুটির সময় এসে দাঁড়িয়ে রইলো কলেজের পাশেই। যদি এসে থাকে, অবশ্যই দেখা হবে। হলোও তা-ই। কান্তা বের হওয়ার সময়ই তাকে দেখেছে রাস্তার বিপরীতে। এড়িয়ে যেতে দুই পা এগিয়েও থেমে গেলো। পুনরায় তাকিয়ে রাস্তা পেরিয়ে বিপুর কাছেই গেলো।
“এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
বিপু জবাব না দিয়ে সামনে হাঁটতে থাকে ভীড় কাটিয়ে উঠার নিমিত্তে। সাথে কান্তাও হাঁটে সমতালে। ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি অংশ কাটিয়ে এলেই পায়ের গতি ধীর করে হাঁটতে থাকে দুজনেই। কান্তাকে জিজ্ঞেস করে,
“তোকে দেখা যায় না কেন আজকাল?”
“কি দরকার?”
“দেখাটাই দরকার।”
দৃষ্টি ফিরিয়ে বিপুর চোখে তাকায় সে একবার। বিপু তার বাম পাশ থেকে ডান পাশে এসে হাঁটে। তা লক্ষ্য করে কান্তা বলে,
“ঘরে থাকতেই তো আমার ভয় করে। রাস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কি হবে? একটা গাড়ি এসে মেরে দিয়ে গেলেও ভালোই হবে।”
“একটা চড় দিবো কষিয়ে।”
“এক চড়ে যদি মেরে ফেলতে পারেন, তো দেন।”

“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ২০
(নূর নাফিসা)
.
.
“এক চড়ে যদি মেরে ফেলতে পারেন, তো দেন।”
“তোকে মেরে আমি জেল খাটতে পারবো না।”
“আর আমাকে অন্যের ঘরে খুব দেখতে পারবেন?”
“আবার বিয়ে ঠিক হয়েছে?”
বিপু কৌতুহলী চোখে তাকায় কান্তার দিকে। কান্তা মলিন মুখে পথ চলতে চলতে জবাব দেয়,
“হতে কতক্ষণ। আম্মাকে বলে দিছি আপনার কথা।”
“তারপর?”
“তারপর মাইর খেয়ে এই ক’দিন যাবত আমি ঘরে বন্দী।”
একটু মেজাজেই জবাব দেয় কান্তা। বিপু চুপ করে থাকে। যা নিয়েই ভাবতে যায়, এলোমেলো লাগে শুধু। কিনারা পাচ্ছে না যে ঠিক কি যে সে করবে। হুট করেই হাতটা ধরে ফেলতে পারে না চতুর্দিকে ঘিরে থাকা সমস্যার কারণে। একটা পথ তো অন্তত খোলা থাকতো। ভাইয়ের সাথে একটু কথা বলে ক্লিয়ার হতে চাইছিলো ব্যাপারটা। একে তো বড় ভাই, সেভাবে সবটা বলা যায় না খুলে। দ্বিতীয়, এই আলাপ করতে যাবে দেখলেই কেমন খাপছাড়া জবাব দিয়ে বসে ভাই। “এখনই এতো প্যারা নেওয়ার কি আছে? বয়স খুব হয়ে যায়নি। সময় বহু বাকি। কান্তা পড়ছে, পড়তে থাকুক। বাড়িঘর ঠিকঠাক হোক। এক বউ এসেই তো ঘর পায়নি এখনো।”
বিপু ভাবনা নিয়ে চুপ থাকলেও কান্তা আরও বলে,
“শুধু আম্মা ই না। আব্বাও টের পায় কিছু কিছু। আপনে বাড়ির সামনে গেছেন?”
কান্তার চোখে একবার তাকিয়ে মিনমিনে গলায় বলে,
“গিয়েছিলাম। তোর আব্বার সাথে ভুলেভালে দেখা হয়েছিলো।”
“ভুলে ভালে দেখা? দিলেন তো আমার বাইরে বের হওয়া বন্ধ করে। আজকে পরীক্ষা দিতেও বের হতে দিচ্ছিলো না আম্মা। অবাধ্য হয়ে আসছি। এইযে, এখনো সাথে সাথে ঘুরতাছেন। বাজারে যদি আব্বা থাকে, কেমন হইবো?”
“থাকলে থাকুক। দেখলেই তো ভালা। রাগারাগি যা করার, করে তাড়াতাড়ি মেনে নিবো।”
“স্বপ্ন! দুঃস্বপ্ন!”
“স্বপ্ন? তুই কেন আইছিলি প্রেম করতে?”
“আপনি কেন ডাকছেন আমারে?”
“আমি ডাকলেই তোর আসা লাগবে?”
“তো চলে যান।”
“তুই না কাঁদলে ঠিকই যাইতাম।”
“বয়েই গেছে আপনার জন্য কাঁদতে।”
“তো কার জন্য মাইর খাইলি?”
জবাব দেয় না কান্তা। ব্যথিত নয়নে একবার ওই মুখে দেখে আবার সামনে তাকিয়ে হাঁটতে থাকে। বিপু ঠোঁট প্রাঙ্গণে মৃদু হাসির ঠাঁই দেয়। বাজার ছুঁয়ে নিয়েছে, তবুও বিপু সরে না পাশ থেকে। সাথেই চলছে। কান্তা বিব্রত হয়ে বলে,
“দূরে যান। এলাকার মানুষজন দেখলেই সমস্যা বাঁধবো।”
“দেখলে দেখুক।”
“দেখুক মানে কি?”
“এত্তো বেশি না বললেই কি তোর হয় না?”
চুপ হয়ে যায় কান্তা। হাঁটতে থাকে নিজের মতো করে। আগের তুলনায় পায়ের গতিও বেড়ে এসেছে। বিপু সেই গতিতেই তাল মেলায়। প্রস্তাব করে,
“আয়, বালুর মাঠে যাই।”
“না।”
“কেন?”
“কোনো মাঠেঘাটে যাওয়ার শখ আমার মনে ধরে নাই। যেতে হলে আপনার বাড়ি নিয়া যান।”
“যাবি? তো আয়, বাড়িই যাই।”
বিপুর ঠোঁটে হাসি থাকলেও ভ্রুর কোণ সংকুচিত হয়ে থাকে কান্তার। এর বিরক্তি দেখতেও ভালো লাগে বিপুর। এতেও মায়া জন্মে মনের কোণে। দোকানপাট ছেড়ে যাচ্ছে সব। জিজ্ঞেস করে,
“কি খাবি?”
“কিছু না।”
“বাদাম? ছোলা? ঝালমুড়ি?”
“কিছু না, কইলাম না? এই ছোলা মুড়ি না সেধে সাধতে হইলে আপনার ঘরের ভাত খাওয়ার অধিকার সাইধেন।”
“সকালে ভাত খাইছোস?”
নিরুত্তর কান্তা হাঁটে শুধু। বিপুর বুঝতে বাকি থাকে না। এইযে, বিনা অধিকারে পিছু ঘুরছে তা-ও ভালো লাগে না। পাকাপোক্ত একটা অধিকার তার চাই৷ সময় সুযোগ যেন হাতছানি দিতে চায় না। কান্তা বাড়ি পর্যন্ত আসতেই বিপু হাত ধরে ফেলে। কান্তা নিজেও একটু চমকে যায় তার আকস্মিক হাত ধরে নেওয়ার প্রেক্ষিতে। বিপু টানে তাকে সামনের দিকে।
“এদিকে যাস কেন? আমার বাড়ি না যাবি?”
“পাগল নাকি! হাত ছাড়েন!”
“বলছোস যাবি, তো যাবিই। ঘরের ভাত খেতেও সাধছি এইবার। চল, ভাতও খাবি।”
“এইভাবে গেলেই তো খালি হয় না। অধিকারে নিয়া যাইতে হয়।”
“অধিকার আপনা আপনি আসবে না। জোরপূর্বক চাইতে হবে। আয়, আজই চাই।”
“আপনি গিয়ে চান।”
“তোর জন্য চাইবো। তুই যাবি।”
“আরেহ! ছাড়েন। সবসময় মজা ভালো না।”
মজার হাসি স্পষ্ট হয় বিপুর মুখে৷ হাতের বাঁধনও নরম হয়ে আসে। নরম গলায় বলে,
“আয়, ভাবির সাথে দেখা করে আসিস।”
“উহুম।”
হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সন্তুষ্ট মনে বাড়িতে প্রবেশ করে কান্তা। বিপু চলে যায় সামনে, নিজ বাড়ির দিকে। ভাবছে খালিদ ভাইকে নিয়ে। চায়ের দোকানে বসে থাকতে দেখে এলো। তাকেও দেখেছে নিশ্চয়ই। আবার কিছু বলবে কি না, তা-ই ভাবছে। বাড়ি এসে দেখতে পায় খালিদের বউ, সালমাকে। পারভীন বারান্দায় বসে পাঞ্জাবীর ছুটে যাওয়া বোতাম সেলাই করছে। পাশে বসে আছে সালমা, মামী শ্বাশুড়ির সাথে একটু গল্প করছে। মিনিট খানেক হয় মাত্র, সে যে এসেছে। বসেই এক গ্লাস পানি চেয়েছিলো পরীর কাছে। পরী তা-ই এগিয়ে দিতে দিতে বিপুকে দেখে বলে,
“ভাইজান, আইছেন? এক্কেবারে ঠিক সময়ে হাজির হইছেন।”
“কেন?”
“আম্মায় সেলাই করতে বইছে। তাত্তাড়ি দেন, ছিঁড়াখোঁড়া ততদিনে কি জমাইছেন। আপনের তো আবার স্বভাব ভালা৷ কাপড় ধুইতে দেখলে এক গাট্টি বাইর কইরা দেন। সেলাই করতে দেখলে লুঙ্গি কুর্তা সব বাইর করেন!”
যদিও বিদ্রুপ করে বললো পরী, তবুও বিপুর মুখে হাসি। ঘরে প্রবেশ করতে করতে বললো,
“মনের কথা বলছোস রে তুই, পরী। আমার শার্টেরও দুইটা বোতাম নাই কয়দিন যাবত। এক্ষুনি দিচ্ছি।”
ঘরে চলে যায় বিপু। তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ভেঙচি কাটে পরী। বারান্দায় হাজির হতে দেখে শ্রাবণকে। তার উদ্দেশ্যে বলে,
“বড় ভাইজান কিন্তু একদম ভালা এইদিক থেইকা। পোশাকাশাক ফাটে কম। সেলাই ঝামেলা আম্মার দিকে দেয় না তেমন। আর এইযে একখান মানুষ। এর ঘরে বউ আইলে চোখের সামনেই দেখবেন কত যে জ্বলে। আর আপনে কিন্তু খুব আয়েশেই থাকবেন বড় ভাইজানের কাছে। এই পরী গ্যারান্টি দিয়া কথা কয়।”
মুচকি হেসে শ্রাবণ বলে,
“এতো গ্যারান্টি দিতে নেই। আল্লাহ নারাজ হবেন। আমরা তো আল্লাহর সামান্য সৃষ্টি মাত্র। এতো বড়াই করলে চলে?”
“হো, তা ঠিক অবশ্য।”
সালমা খালি গ্লাসটা এগিয়ে দেয় পরীর দিকে।
“ধন্যবাদ তোরে। গলা শুকায় গেছিলো একদম।”
“থাক, ধন্যবাদ দেওয়া লাগতো না। দিলে কয়ডা জাম দিয়েন। আপনে তো আবার জামাইডার মতোই কিপ্টা মানুষ। চাইতে আমারই শরম করে।”
সালমা মুখাবয়বে বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে পারভীনকে বলে,
“দেখেন তো মামী, কি কয় ছেড়ি! আমি কি কোনো সিজনে আপনেগো তেতুল না দিয়া যাই? হারামীডা খাইয়া খাইয়াও স্বীকার করে না।”
“হো, দেন তো। নামে মাত্র।”
প্রত্যুত্তর করে ঠোঁট ভেঙায় পরী। পারভীন দাতে সুতা কেটে বলে,
“এই যা তো, গোসল সার গিয়া।”
“যামুনে।”
বিপু এসে তার শার্ট ধরিয়ে দেয় মায়ের হাতে। পরী দেখতেই বলে,
“আল্লাহ! এক শার্টেরই দুই বোতাম নাই! নিশ্চয়ই মারামারি কইরা ছিঁড়ছেন, ভাইজান।”
বিপু আলতো করে এবার মাথায় ঠুকে দেয় তার। ওদিকে সালমা হাসিমুখে বলে,
“জানেন মামী, আজকা কি হইছে?”
“কি?”
“ওইদিন একটা লটারি ধরছিলাম। ওইযে, গরু গুতা দিলো না আপনাগো ভাইগ্নারে? ওইদিনই ধরছিলাম। একটা কোম্পানির বেডা আইছিলো। ছয়শো টাকা দিয়া তিনটা বালতি কিনলে একটা লটারি দিবো। আর লটারি যে জিতবো…”
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে পরী বলে,
“তিন বালতি দিয়া আপনে কি করবেন, ভাবি?”
“এই চুপ কর। কতা শেষ করতে দে। আর লটারি যে জিতবো, তার এক হাজার টাকা পুরস্কার। আজকা সকালে উনার মোবাইলে দেখলাম মেসেজ আইছে, আমি লটারি জিতছি। শিগগির তারে মোবাইলসহ পাঠায় দিলাম। টাকাও দিয়া দিলো। আমার জায়েই তো আবার পায় নাই। কপাল ভালা হইলে যা হয় আরকি। বুজছেন না ব্যাপারটা?”
খুশিতে গদগদে হয়ে উঠে সালমার মুখখানা। পারভীন সেলাইয়ে ব্যস্ত থেকে ছোট জবাব দেয়, “হুম।”
বিপু কিছু বলতে যাচ্ছিলো। কিন্তু পরী সুযোগ কেড়ে নিয়েছে চমকিত গলায়! কথায় টান দিয়ে বলে,
“এক হাজার টাকার লটারি পাইছেন, ভাবি!”
“হু।”
পরী সাথে সাথেই দুইহাত আকাশমুখী তুলে দিয়ে বলে,
“আল্লাহ, এইবার তুমি বকুল কাকারে দিয়া আরেকটা ভুল করাইয়া দিয়ো। খালিদ ভাই এই বাড়ি আইলে বকুল কাকার বেখেয়ালে যেন এইবার বড় ষাঁড়টা গোয়াল হইতে পালায়। আরেকবার যেন খালিদ ভাই গুঁতা খায়। আরেকবার যেন ভাবি লটারি জিততে পারে। এইবার বড় ষাঁড়ের উছিলায় যেন দশ হাজার টাকা পায়।”
“হেই, চুপ কর!”
সালমা ক্ষেপে উঠে দেয় ধমক। পরীর কথায় বিপু শব্দযোগে হেসে সারা! শ্রাবণও মুখ চেপে হেসে উঠেছে শব্দহীন। শার্টের বোতাম লাগাতে ব্যস্ত পারভীনের মুখেও সামান্য হাসির রেশ দেখা যায়। পরী তার ধমকে দোয়ার বাক্যে থামলেও দুই হাত মুখে বুলিয়ে “আমিন” বলে নেয়। পরক্ষণে খালিদের বউকে জবাব দেয়,
“দোয়া কইরা দিতাছি, ভাল্লাগে না?”
“থু থু পড়ুক তোর দোয়ায়।”
“দেইখেন কিন্তু, আর একবারও যদি লটারি ধরছেন!”
“তোর কাছে জিগায় ধরমু?”
“তাইলে দোয়ায় আবার চুলকানি ক্যা?”
“এই যা তো, যা। তোরে ডাক দিছি এনে?”
“আমারে ডাক দেওয়া লাগে না। পরী উড়তে উড়তে সব জায়গায়ই বিনা ডাকে হাজির থাকে।”

“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ২১
(নূর নাফিসা)
.
.
বিকেলে বাবা মা এলেও শফিক ছেলেটা আসেনি চেয়ারম্যানের ডাকে। ক্রুদ্ধ হোন আফজাল হোসেন। ছেলে নাকি বাড়ি নেই তাই সাথে আনতে পারেনি। তবে আগামীকাল এই অযুহাত তিনি মানতে নারাজ। ছেলেকে সাথে নিয়ে যেন আগামীকাল বিকেলে চেয়ারম্যান বাড়ি বিচার কার্যে হাজির হয়, তা পরিষ্কার জানিয়ে দেন আফজাল হোসেন। বিচারের নীতি লঙ্ঘন করলে আইনী ঝামেলায় পড়বে, তাতেও সাবধান করে দেন। এলাকার মেম্বার ও মাতবরদের সাথে নিয়ে তিনি এই বিচার সম্পন্ন করবেন। অবশ্যই তাদের সবাইকে এখানে উপস্থিত থাকতে হবে। কথায় সায় দিয়ে চলে যায় শফিকের বাবা মা।
দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমিয়েছে ইফতেখার। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, এখনো উঠার নাম নেই। শ্রাবণ নিজেই গিয়ে ডেকে তোলে। পরপর বাইরে এসে উঠুনে কবুতরের খাবার ছিটায় বারান্দায় থেকেই। হাতমুখ ধুয়ে ইফতেখারকে তৈরি অবস্থায় বের হতে দেখে জিজ্ঞেস করে,
“বাজারের দিকে যাবেন?”
“কেন?”
“একটা কাজ ছিলো। সময় হবে করে দেওয়ার?”
“কি কাজ?”
“সময় হলেই বলবো। নয়তো না।”
ঠোঁটে হাসি চেপে উত্তর দেয় শ্রাবণ। ইফতেখারও ঠোঁটের ধারে হাসি স্পষ্ট করে নরম গলায় বলে,
“বলো।”
“আসুন।”
তাকে ডেকে অর্পার ঘরে যায় শ্রাবণ। পিছু পিছু এসে দাঁড়িয়েছে ইফতেখার। ব্যাগ থেকে একজোড়া নুপুর এনে ইফতেখারের সামনে হাত মেলে বলে,
“এইগুলো একটু ওয়াশ করিয়ে আনতে পারবেন? একটা হুকও ভেঙে গেছে। ঝালাই করে দিবে।”
রূপার নুপুর জোড়া হাতে নেয় ইফতেখার। যথেষ্ট ভারি ওজন। নিখুঁত নকশা। অনেকদিন যাবত হয়তো পরে না, তাই কালচে হয়ে গেছে আবরণ। কোন হুকটা ভাঙা, তা-ও ভালো করে দেখে নেয় সে। তারপর পকেটে রেখে বলে যায়,
“ঠিক আছে।”
দরজার কাছে এসে আবার পিছু ফিরে জিজ্ঞেস করে,
“বাইরে থেকে কিছু খাবে? এনে দিয়ে যাবো?”
মুচকি হেসে দুদিকে মাথা নাড়ে শ্রাবণ। তারপর আবার বলে,
“আরেকদিন ফুসকা খাওয়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল পরী, অর্পাসহ।”
“আচ্ছা, মাগরিবের পরে এসে নিয়ে যাবো সবাইকে।”
“আজ না। আমার ভালো লাগছে না বের হতে। আগামীকাল যাই নাহয়।”
“আচ্ছা।”
বাইরে থেকে কাপড়চোপড় এনে ঘরে রাখে শ্রাবণ। অর্পার শিক্ষক মাত্রই ছুটি দিয়ে বের হলো ঘর থেকে। আগে অর্পার ঘরে তিনি পড়ালেও শ্রাবণ আসার পর থেকে প্রায় প্রতিদিন আফজাল হোসেনের ঘরেই পড়াচ্ছে পারভীনের নির্দেশে। এতে করে এই সময়টায় একটু বিশ্রাম নিতেও অস্বস্তিতে পড়তে হয় না শ্রাবণকে। মাগরিবের আজান পড়ছে, অর্পা নিজ বিছানায় ধপাস করে পড়েছে বালিশে মুখ গুজে। শ্রাবণ কাপড় রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করে,
“নামাজ পড়বে না?”
“ঘুম পাচ্ছে, ভাবি। সারাদিন কি পরিশ্রমটাই না যায়, জানো না! কোচিং, ক্লাস, প্রাইভেট! একটার পর একটা চলতেই থাকে। ভাল্লাগে না আর।”
মৃদু হেসে শ্রাবণ বলে,
“এখনই ভাল্লাগে না বললে চলবে? আরও তো কত বাকি! একটু ভালো লাগা মিশিয়ে পড়লেই ভালো লাগবে। উঠো, নামাজ পড়ে একটু রেস্ট নাও। বেশি ঘুম পেলে বাইরে থেকে ঘুরে এসো।”
নামাজের পর বারান্দায় এসে দেখে পরী টর্চ হাতে মুরগির খোয়াড়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। শ্রাবণ বেরিয়ে আসতে আসতে বলে,
“কি ব্যাপার পরী? এভাবে কি খুঁজো? মুরগি চোর ভেবে না এখন পিটুনিই দেওয়া শুরু করতাম!”
পরী হেসে তার প্রত্যুত্তর করে,
“মুরগি না। তয় ডিম চোর ভাইব্বা পেটাইতে পারেন। খোয়াড়ের ডিম বাইর করতে মনে নাই আজ। পাড়ায় পাড়ায় না আবার ভাইঙ্গা ফালায়, মনে হইতেই দৌড়ায় আইলাম।”
“পেয়েছো?”
“হো, দুইটা।”
ডিম হাতে নিয়ে খোয়াড়ের দরজা আটকে দিয়েছে পরী। উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“বিপু ভাইজান একবার কড়া দৌড়ানি খাইছিলো বড় ভাইজানের হাতে। কন কারবার, নিজের খোয়াড়ে দলবল লইয়া নিজেই চুরি করতে আইছে। অন্যের খোয়াড়ে গেলেও তো কইতাম চোরের চুরি করতে মন চাইছে। নিজের ঘরে কেউ চুরি করে?”
শ্রাবণ হেসে বলে,
“ভালোই তো করেছে। অন্যায় থেকে রেহাই নিয়ে চোর সেজেছে। তা নিতে পেরেছিল?”
“আরে না। সারাদিন খেলাধুলা কইরা সন্ধ্যা বেলা নাকি বন্ধুবান্ধব লইয়া মুরগি পুইড়া খাইবো। তাই আইছিল। ক্যামনে ক্যামনে জানি বড় ভাইজান দেখছে। হেরপর এমন দৌড়ানি দিছে, আর বাড়িই আয়ে নাই হেইদিন। মামার বাড়ি গিয়া থাকছে।”
“ভালো দুষ্টু তো বিপু ভাই!”
“এক্কেরে, হুদ্দা শয়তানের হাড্ডি!”
“চলো দেখি, একটু বেলি গাছটা দেখে আসি৷ মিস্ত্রি বালি ফেলেছিল এদিকে। উপরে পড়েছে বেশ কিছু। তারা এদিকে থাকায় যেতে পারিনি সাথে সাথে। গাছটার না আবার ক্ষতি হয়ে যায়।”
“খাড়ান। ডিম রাইখ্যা আইতাছি।”
“টর্চ দিয়ে যাও আমার হাতে।”
টর্চ নিয়ে বেলি গাছের দিকে এগোয় শ্রাবণ। পথের মাঝামাঝি আসতেই গেইটের বাইরে কথা শুনতে পায় কারো। কণ্ঠস্বর নিচু রেখে গুছিয়ে গুছিয়ে অনুনয়ের গলায় কথা বলছে কেউ। কণ্ঠ অপরিচিত। শ্রাবণ হাতের টর্চ নিভিয়ে গেইটের দিকেই আরেকটু এগোয়। দুজন যুবককে দেখতে পায় নতুন আঁধারের বাঁকে। একজন যে বিপু, বুঝতে সময় লাগেনি। কথায় মনযোগ দিয়ে সে বুঝতে পারলো ছেলেটা সকালের ঘটনার বর্ননাই পেশ করেছে এতোক্ষণ গুছিয়ে গুছিয়ে। ঘটনার পুনরাবৃত্তির পর বিপুকে বলছে,
“দোস্ত, তুই একটু দেখিস। কাকারে একটু বুঝাইয়া কইছ ব্যাপারটা। কালকাই নাকি বিচার।”
বিপু সবটা শুনে বন্ধুকে আশ্বাস দেয়,
“মারামারি করতে গেলি কেন অযথা।”
“মাথা ঠিক থাকে না তো, বুঝোস না? একটু কইছ কাকারে।”
“তুই আসিস কালকে। আব্বা দেখবো নে।”
“আসমু ঠিক আছে। কিন্তু তুই একটু বুঝাইয়া কইছ, বিচারটা যেন কড়াকড়ি না হয়। আব্বা আম্মায় অনেক টেনশন করতাছে।”
“আচ্ছা, আমি দেখমুনে। বাড়ি যা।”
এতোক্ষণে শ্রাবণের বুঝা হয়ে গেছে এই ছেলেটাই হামলাকারী শফিক। বিপু বন্ধু বিধায় তার সহায়তা নিয়ে বিচার হালকা করতে চাইছে। শ্রাবণের বড্ড অপ্রিয় লাগলো বিপুর এই আশ্বাসবাণী। গেইটের সম্মুখে দাঁড়িয়ে সে বলে,
“আপনি কি দেখবেন, বিপু ভাই?”
বিপুও বাড়ি প্রবেশ করতে যাচ্ছিলো, শফিক ছেলেটাও চলে যেতে মাত্র পা বাড়িয়েছিল। বিদায় নেওয়ার আগেই দুজন থেমে যায়। গেইটে তাকায় শ্রাবণের দিকে। বিপু এক কদম এগিয়ে বলে,
“ভাবি, এটা আমাদেরই প্রতিবেশি চাচাতো ভাই। একসাথে পড়াশোনাও করছি। ওই একটু আসছিলো একটা ব্যাপারে কথা বলতে। সকালে একটা ঝামেলা বাঁধায় ফেলছিলো ঝগড়াঝাটির। আব্বা নাকি আগামীকাল বিচারে বসবো। সেজন্য… ”
“সেজন্য আপনার সুপারিশ চাইছে, আর আপনিও সুপারিশ করতে রাজি হয়ে গেলেন। এ-ই তো? আমি ভুল না করলে এই ছেলেটাই সেই শফিক। ঠিক কি?”
“হ্যাঁ, তার নাম শফিক।”
শফিকের মুখে টর্চ মেরে চেহারাটা একবার স্পষ্ট দেখে নিলো শ্রাবণ। পুনরায় টর্চ নিভিয়ে বিপুকে বললো,
“বন্ধুর মুখে তাকিয়ে এইযে আপনি সুপারিশ করতে রাজি হয়ে গেলেন, একবার কি ওই বৃদ্ধ দম্পতিকে দেখতে গিয়েছিলেন বা দেখেছিলেন তাদের অবস্থা? শরীর থেকে যেটুকু রক্ত ঝরেছে, তার এক ফোঁটার দাম কি সে দিতে পারবে? পিতা তুল্য চাচার গায়ে যে হাত তুলে রক্ত ঝরিয়ে দিতে পারে, মা তুল্য চাচীর গায়ে যে লাথির আঘাত করতে পারে আপনি কিভাবে তার হয়ে সুপারিশ করতে চাইছেন? বন্ধু বলেই আপনি এই অন্যায়ের প্রশ্রয় দিয়ে যাবেন?”
“ভাবি, আমি তো এসব দেখিনি। আর যা শুনলাম, অপরাধ দুজনেরই আছে।”
“অপরাধ দুজনের আছে যখন, বিচারটাও দুজনের মধ্যে সমান দৃষ্টি রেখে হতে দিন। আপনি তার পক্ষ নিয়ে কেন বিচারের এক পক্ষকে ঢাল করে দিতে চাইছেন?”
জবাব দেয় না বিপু। শ্রাবণ শফিকের উদ্দেশ্যে বলে,
“আর এইযে আপনি, বিচার যখন ডাকা হয়েছে ভালোয় ভালোয় সময়মত চলে আসবেন। এই বন্ধু ধরে, কিংবা চাচা-মামা ধরে পিছলে যাওয়ার চেষ্টা না করলেই আপনার জন্য ভালো। পিছলে যেতে গিয়ে না আবার পায়ে বেড়ি পরে ঘুরতে হয়। সাবধান!”
বিব্রত অবস্থায় শফিক চলে যায় বাড়ির দিকে। শ্রাবণ কথার পরপরই গেইট থেকে সরে দাঁড়ালে বাড়িতে প্রবেশ করে বিপু। বেলি গাছের দিকে এগিয়ে যেতে গিয়েও আবার পিছু ফিরে বিপুকে বলে,
“আব্বার কাছে সুপারিশ করে অন্যায়ের ভারটা নিজের উপর নিবেন না যেন। বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়স্বজনের টানে সাধারণ মানুষের উপর নিপীড়ন করা কোনো নৈতিক মানুষের কাজ হতে পারে না। বাঁচলে এমন মানুষ হয়ে বাঁচুন, যেন উপকারে না হোক। অন্তত কারো অপকারের পিছনে আপনার নাম, কর্ম জড়িত না থাকে।”
ভেবেছিল মায়ের কান পর্যন্ত কান্তার ব্যাপারটা শ্রাবণকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করবে আজ। উল্টো ভাবি গেল তার উপরই ক্ষেপে! কি দরকার ছিল এই শফিকটার এই মুহূর্তে সব এলোমেলো করে দিতে! আর কেই-বা জানতো, এখানে এসে তাকে ধরে বসবে সুপারিশের জন্য। চুপচাপ ঘরে চলে আসে বিপু। শ্রাবণ এগিয়ে যায় বেলি গাছের কাছে। বালির স্তুপে যেন অর্ধেকটা তলিয়ে গেছে। এক হাতে টর্চ রেখে অন্য হাতে বালি সরিয়ে দেয় শ্রাবণ। কে বলেছিলো লোকটাকে, এখনই গাছ এনে লাগিয়ে দিতে? ঘরের কাজটা শেষ হলেই কি পারতো না? এইযে, কত অত্যাচারের শিকার হয়ে যাচ্ছে তার শুভ্র বেলি। দুইটা ফুলও ঝরে গেছে আঘাতে। একটার অবশ্য এমনিতেই ঝরে পড়ার সময় হয়ে এসেছিল। শ্রাবণ কাজ শেষ করে হাতে তুলে নেয় বেলি জোড়া। বিপুর উপর ক্ষেপে চেহারায় যেই সংকুচিত ভাবটা এসেছিল, তা এই বেলি জোড়া দূর করে দিতে সক্ষম হয়েছে। নাকের কাছে নিয়ে এদের ঘ্রাণ নেয় শ্রাবণ। তার হাত এবং বেলি জোড়া বালিতে মাখামাখি। বাইরের বাথরুমে সে হাত ও ফুল ধুয়ে ঘরে আসে। পরী যে তখন ডিম নিয়ে এসেছে আর বের হওয়ার সুযোগ পায়নি। পারভীন তাকে মশলা বাটতে বসিয়ে দিয়েছে। রাতের জন্য খিচুড়ি রান্না করছে পারভীন। যার ঘ্রাণ বাইরে থেকেও পাচ্ছিলো শ্রাবণ। রান্নাঘরে এসে দাঁড়িয়ে বললো,
“আম্মা, কিছু করতে হবে?”
“না। তোমার আব্বা আইলে চা দেও নিয়া।”
“আসেনি।”
“অর্পা পড়তে বইছে?”
“না। ওর খারাপ লাগছিল নাকি। নামাজের পর ঘুমাতে শুয়ে পড়েছে।”
“এই পোলাপান নিয়া যে কি করমু! পোলা দুইটারেও ধাক্কাইতে ধাক্কাইতে পড়াশোনা করাইলাম। মাইয়ারও একই অবস্থা। সবদিকে দেখলাম, পোলারা ফটকা হইলেও মাইয়ারা ঢের মনযোগ রাখে পড়ালেখায়। আমার ঘরে কোনোটারই উন্নতি নাই। পোলারা তেমন না পইড়াও তো ফেল যায় নাই। কিন্তু হের তো এই গুণটাও নাই! এইযে স্যারে বিচার দিয়া যায়, লজ্জায়ও ধরে না।”
শ্রাবণ তার স্বগতোক্তি শুনতে শুনতে নিজের জন্য আধকাপ চা নেয়। পারভীন থামতেই পরী দক্ষ হাতে মশলা পিষতে পিষতে বলে,
“এক্কেরে ঠিক কইছেন, আম্মা। আপার একদম লজ্জাশরমের গুষ্টিটা নাই। হের আগেও যে একবার ফেইল করলো, হেই শরমের বাতাসটা পর্যন্ত গায়ে লাগে নাই না হের। এইবারও দেখবেন মেট্টিক ফেইল মাইরা বইছে!”
“এই চুপ কর তুই! খালি যত্ত আছে অশুভ কথাবার্তা নিয়া। একটা ভালা কথা মুখে শুনি না।”
“হো, খালি চুপই করতে কইবেন। আল্লাহ যে কেল্লাই আমারে জবান দিছিল, হেইডাই বুঝলাম না জীবনে। যের সামনেই কথা কই, খালি কয় চুপ কর!”
চায়ে চুমুক দিয়ে শ্রাবণ মুচকি হাসে। তার কথার প্রেক্ষিতে বলে,
“আল্লাহ জবান দিয়েছে ভালো ও যৌক্তিক কথা বলার জন্য। অতিরিক্ত কথা বলাটা বর্জন করতে পারলেই দেখবে কেউ আর বলবে না চুপ থাকতে। তুমি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বলে ফেলো সবসময়।”
“হুনেন, ভাবিজান। খালি এই কথার জন্যে হইলেও এই পরীরে মনে রাখবেন৷ এই কইয়া রাখলাম।”
“তা যথার্থ বলেছো। বেশি কথার অপর নামই আমাদের পরী।”

চলবে।