শ্রাবণধারা পর্ব-৪০+৪১+৪২

0
64

“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ৪০
(নূর নাফিসা)
.
.
“কেমন আছো?”
জবাব দেওয়া হয় না ফাতিহার। দৃষ্টি নত রেখে কান্নার বেগে যেন কাঁপতে থাকে। এই মানুষটার শেষ দেখা এবং আজ দেখার মধ্যবর্তী সময়ের ফেলে আসা জীবন কীভাবে কাটিয়ে এলো তা যেন হুড়হুড় করে চোখের সামনে দৃশ্যমান হচ্ছে। একেকটা দৃশ্য হৃদয়কে কু*পিয়ে বিক্ষত করে যাচ্ছে। ব্যথা সয় না। পুনরায় দেখা হওয়ার সুখও সয় না। কান্না চাপানোর আপ্রাণ চেষ্টা, বৃথা চেষ্টা!
দেয়ালের পাশে টুল দেখতে পেয়ে টেনে নেয় আফজাল হোসেন। কিছুক্ষণ বসে থাকে চুপচাপ। দেখতে থাকেন, ফাতিহার কান্নাকাটি কোন পর্যায়ে গিয়ে থামে। দেখতে থাকেন আশপাশও। ফাতিহা সময় নিয়ে কান্না থামায়। শ্বাস প্রশ্বাসের গতি অস্বাভাবিক। কান্না চাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা সুস্পষ্ট নিশ্বাসে নিশ্বাসে। দৃষ্টি উঠে না আর উপরে। ভেজা গলায় জিজ্ঞেস করে,
“আপনে কেমন আছেন?”
“ভালোই আছি। আবার নাই-ও। সেদিনও থাকতে দাও নাই। আজও পারতাছি না।”
বুকের ভেতর তিরতির করে উঠে ব্যথায়। নিশ্বাস আটকে আসতে চায় আবারও দোষ অর্পণ ও সেই দেওয়া অপবাদের ভারে। আবারও কান্নার জোয়ার উঠার পালা ফাতিহার। আফজাল হোসেন সেই সুযোগ তাকে দেয় না। গম্ভীরমুখেই বলে,
“ছাড়বাই যখন ফেরার কি দরকার ছিলো? ফিরবাই যখন, ছাড়ার কি দরকার ছিলো?”
“আমি তো আপনারে ছাড়ি নাই।”
“হো, দোষ আমার ঘাড়েই চাপছে। ভালো কইরাই চাপছে।”
“আমি সেদিনও আপনারে বিশ্বাস করাইতে পারি নাই। আজও পেরে উঠার শক্তি নাই।”
“এতোকাল এমনি এমনি পাড় করছো? তবে ফিরো নাই ক্যা? এতো বছরেও পথ চিনতে পারো নাই?”
“পথ চেনার কি দরকার? আপনে তো খোঁজেন নাই। কার কাছে ফিরতাম আমি?”
মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কান্না চাপার চেষ্টা করে ফাতিহা। আফজাল হোসেন গম্ভীর হয়ে নিশ্চুপ বসে থাকেন মিনিটখানেক। তারপর আবার কণ্ঠে বাক্য তুলেন,
“খুঁজছিলাম, বছর খানেক পরে। পাই নাই। ভাবছি, বিয়ে করে নিছো। সহজ একটা সংসার পাইছো, ভালোই আছো।”
“ছি! ছি! আপনারে ছাড়া জীবনে কাউরে নিয়া ভাবতেই পারলাম না। সারাজীবন আপনার দেওয়া অপবাদ ঘাড়ে চাপায় রাখলাম, তবুও পারলাম না।”
“তো আজ শ্রাবণরে কীজন্য পাঠাইলা?”
ঠোঁটের সাথে কণ্ঠও কাঁপে ফাতিহার। একটু সময় নিয়ে জবাব দেয় আফজাল হোসেনের জিজ্ঞাসার।
“আমি তো শ্রাবণরে পাঠাই নাই। সে স্বেচ্ছায় গেছে। আমি তারে আপন ভেবে জানাইছিলাম মাত্র। আমার জীবন পড়তে চাইছে সে। জীবনের শেষেই তো কাত হইয়া রইছি। তাই কাউরে পড়ার সুযোগ দিছি। আপন মানুষ তো পাশে পাইলাম না। এই মাইয়াটা আমার আপন হইয়া রইছিলো যতদিন ধরে আমি এই ছাদের নিচে আছি, ততদিন।”
হু হু শব্দে আবারও কাঁদেন ফাতিহা। আফজাল হোসেনের মাথায় ধরা দেয়, এখানেই তবে কাজ করতো শ্রাবণ। এনজিও তে ছিলো, বলেছিলো যে। তিনি ফাতিহার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
“শ্রাবণ তোমার কোনো আত্মীয় না?”
“আমার আত্মার আত্মীয়। মানবতার মণি। অকর্মক, দুর্বল, দুশ্চরিত্রা ফাতিহা হারাইছেন। আপনে সুখী হইছেন। কিন্তু এই শ্রাবণ হারাইতে দিয়েন না কখনো। মুক্তার চাইতেও উজ্জ্বল মাইয়া। ফুলের চাইতেও সুন্দর সুগন্ধা। এই শ্রাবণ হারাইয়েন না ভুলেও। আপনার সংসার আজীবন সুন্দর থাকবো। আপনার ছেলে সর্বোচ্চ সুখী হইবো। এই সুখের পাখি আর পাইবেন না। শ্রাবণ হারাইতে দিয়েন না।”
‘দুশ্চরিত্রা’ শব্দটা হৃদয়ে কড়াঘাত করলো আফজাল হোসেনের। সেই দিন এখনও ভুলেনি সে-ও। কিন্তু ভাবনা মিথ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন এতো বছর পর ফাতিহাকে এই অবস্থায় দেখে। তবুও যেন বিশ্বাস হতে চায় না। বিশ্বাস হতে চায় না, সে জীবনটা একাকী এই গণ্ডিতে কাটিয়েছে। আবার অবিশ্বাসের নিশ্চয়তাও মনে হানতে চায় না, তবে সে এখানেই কেন? তারও তো কোনো সংসার খুঁজে নেওয়ার কথা। আবারও কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকেন এই দোটানার মধ্যে। তারপরও যখন নিরবতা ভাঙলেন, বিড়বিড়ানো কথা বললেন শ্রাবণ নিয়ে।
“দেখতাছিই তো সুখের দৌড় কদ্দুর।”
ফাতিহা কোনো কথা বলে না। বুঝেও উঠে না ঠিক, কী অসুখ বাঁধিয়ে রেখেছে শ্রাবণ। সে চোখ বন্ধ রেখে বিশ্বাসের পোক্ত কণ্ঠে বলতে পারে, শ্রাবণ সুখের কারণ হতে পারে। অসুখের কারণ না। কেননা, অসুখের কারণের শ্রাবণকে সে চিনে না। আফজাল হোসেন গম্ভীর অবস্থাতেই বসে থাকেন। বুঝে উঠতে পারেন না যেন, কী করবেন আর কী বলবেনই। তিনি জন্মে ছিলেন এক জীবনে। যখন ফাতিহার সাথে প্রেমময় সম্পর্ক ছিলো, তখন সেই জীবন ছেড়ে ফাতিহাকে নিয়েও এক জীবনই পাড় করেন। কোনো অতিরিক্ত টানাটানি কিংবা ভাবাভাবি নেই। ফাতিহাকে ছেড়ে গেলেন, তখনও তিনি পারভীনকে নিয়ে এক জীবনেই গেঁথে রইলেন। অথচ আজ প্রথমবারের মতো যেন একাধিক জীবনের টানাকাড়া উপলব্ধি করতে পারছেন। দুইদিকে দুই জীবন রেখে তিনি দ্বিধান্বিত হয়ে বসে আছেন মাঝখানে৷ কী করবেন, বিশাল চিন্তাভাবনার ব্যাপার হয়ে রয়েছে তার কাছে। তিনি জানেন, দুইটা জীবনের একটাও আর স্বচ্ছ সুখের লাঙল টানতে পারবে না। যা-ই করুক না কেন! তবে করণীয়টা কী? খোঁজ পাওয়ার পরেও ফাতিহাকে বৃদ্ধাশ্রমেই ফেলে যাবে? নাকি বাড়ি নিয়ে গিয়ে পারভীনের সংসারটায় নিজ হাতে আগুন ধরাবে? পাড়ার লোক তো আছেই পড়ে গুনগানের জন্য। সে আর বলতে কী!
ফাতিহা তার সামনে বসে শব্দ করে কান্নাও করতে পারছে না। চাপা দেওয়ার চেষ্টায় শুধু ফোঁপানোর শব্দ ভাসছে। অস্বস্তির তীব্রতাও বাড়ছে ধীরে ধীরে। আফজাল হোসেন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“বাড়ি যাইবা?”
এই প্রশ্ন যেন আরও নিদারুণ আঘাত হানে ফাতিহার বুকে। বাড়ি? কোন বাড়ি? যেই বাড়িতে তার ছায়া পড়া নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো সেই কত বছর আগে, সেই বাড়ি? যে বাড়িতে কখনো তার পরিচয়ই উঠলো না, সেই বাড়ি? মুখে আঁচল চাপা দিয়ে সে মাথা নাড়ে দু’দিকে। এতোটা কাল যখন একা কাটিয়ে দিলো, বাকি কালটা আর এই লোকের ঘাড়ে চাপার একদম ইচ্ছা নেই। কী সুন্দর কথা তার, বাড়ি যাবে? এমন যাওয়ার হলে তো কবেই যাওয়া যেতো! কেন যাবে সে, আরেকটা সংসারের শান্তি নষ্ট করতে? কেন যাবে এই মানুষটারই বিরক্তি ও বোঝার কারণ হতে? তার মাথা নাড়ানো দেখে যেন চোখের রুক্ষতা আরও গাঢ় হয় আফজাল হোসেনের। যাবেই না যখন, সন্ধান তার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছালো কেন? আর এখন সাধলো যখন, নিষেধই করলো কেন? এমন দুইয়ের দোষ দুই চোখেই উপস্থিত। দোষাদোষীর কারণেই সেদিন মাঝখানে বেঁকে গিয়েছিলো তাদের সম্পর্ক, এখনো বেঁকে যাচ্ছে মতামত! আফজাল হোসেন উঠতে উঠতে আদেশ স্বরূপ বলেন,
“বড় পোলায় আইবো নিতে। চুপচাপ যাইয়ো সাথে। দেখা হইছে তোমার?”
কান্নারত অবস্থায় দৃষ্টি নত রেখেই মাথা কাত করে ফাতিহা বলে,
“হইছে।”
“আমি কথা বলে যামু এখন। দেখি তারা কী বলে। পোলায়ও শীঘ্রই আসবো। তৈরি থেকো।”
“আমি কী কারণে যামু আরেকটা সংসার নষ্ট করতে?”
“বেশি কথা বইলো না। বেশি বলে, বেশি বুঝে বুঝেই জীবনটারে শেষ করছো। আর যত মন্দ দোষ চাপাইছো আমার ঘাড়ে। তুমিও ভুল বুঝলা, বাড়ির লোকজনও ভুল বুঝতাছে। কাল, পরশু এলাকার লোকজনও বুঝবো। যার যা বুঝার বুঝতে থাকো। তবুও ভালো থাকো। পোলায় সাদরে আইবো, নিষেধ কইরো না একবারও।”
আফজাল হোসেন বেরিয়ে যায় কেবিন ছেড়ে। ফাতিহা এবার হু হু কান্নায় মজে থাকার সুযোগ পায়। ঘাড় প্রায় অর্ধেকটা নুইয়ে দেয় কান্নায় ভাঙতে ভাঙতে। আফজাল হোসেন এসে ম্যানেজারের সাথে কথা বলেন। তিনি কোনো রকম নিশ্চয়তা তাকে দিতে পারলেন না ছাড়ার ব্যাপারে। ফাতিহার কোনো পরিবার আছে বলে জানেন না তিনি। তাই তার হয়ে এপ্লিকেশনও করতে পারবে না কর্তৃপক্ষের কাছে। আফজাল হোসেন নিজেকে পরিচিত করে তোলার লক্ষ্যে চেষ্টা চালিয়ে গেলে তিনি বলে দিলেন সরাসরি যেন কর্তৃপক্ষের সাথেই কথা বলে। এরপর মিনিট দশেক অপেক্ষা করে কর্তৃপক্ষের একজনের সাথে দেখা করেন। নিজেকে ফাতিহার পরিবার হিসেবে তুলে ধরেন। নিয়ে যাওয়ার আবেদন করেন। ফাতিহা এমনিতেই নানান রোগে আক্রান্ত। তাই চাইলেই তারা অনুমতি দিয়ে দিতে পারেন না। তবুও যখন পরিবার বলেই দাবি করছেন, তারা সংস্থা থেকে লোক পাঠিয়ে খোঁজ নিবে তাদের গ্রামে। কথা বলবে তার সাথেও। বিস্তারিত ঠিকানা ও ফোন নং লিখিয়ে নিলো আফজাল হোসেনের হাতেই। একটা প্রত্যাশার আবেদন জমা করে কৃতজ্ঞতা জানিয়েই তিনি বিদায় নেন এখান থেকে। আরেকবার যেতে চাইছিলো ফাতিহার কাছে, যেন তাকে জিজ্ঞেস করা হলে কর্তৃপক্ষের নিকট সম্মতি প্রদান করে দেয় সহজেই। কিন্তু দরজা পর্যন্ত গিয়েই তিনি ফিরে এলেন। কেননা, ফাতিহা কাঁদছে। কান্নার বেগ আর বাড়াতে চাইছেন না। সান্ত্বনা দেওয়ার ইচ্ছাটুকু জাগালেন না মনের কোণে ক্ষোভ জমে থাকায়!

“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ৪১
(নূর নাফিসা)
.
.
মনের ক্ষোভে হনহনিয়ে পা চালাতে থাকেন আফজাল হোসেন। মুখটা গম্ভীর হয়ে আছে৷ দৃষ্টি গোচরে কত লোকজন থাকলেও খেয়াল স্থির হয় না তার সেদিকে। অথচ প্রবেশের সময় ডানে, বামে, সামনে মনোযোগে দেখে যাচ্ছিলো একেকটা জীবনের দশাকে। এখন মাথায় চাপা শুধু ফাতিহার অবস্থা। দৃষ্টিতে ফুটে আছে শুধু সেই রুগ্ন মুখটা। সেদিন তো এমন ছিলো না। এমন মুখের গঠন তো তাকে প্রেমের বশে ফেলেনি। ভুলটা কে করেছিলো? সে নিজে? কেন গেলো অবিশ্বাসের জাল বুনতে? ফাতিহাই কেন শুনলো না সেদিন তাকে? দিনে একটা রুটিও কী দেয়নি তার মুখে তুলে? এক বেলা পুষিয়ে, বাকি দুই বেলার আহার কী সে জোগাড় করার তীব্র চেষ্টা করে যাচ্ছিলো না?
সেসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে রাস্তা পর্যন্ত চলে আসে আশ্রমের সীমানা ছেড়ে। হাঁটতে শুরু করে রিকশার জন্য সামনের দিকে। এমনি এক লাশ বাহী বাহন ছুটে যায় এই পথ ধরে। কোনো হসপিটাল থেকে ছুটে যাচ্ছে হয়তো যাত্রীর বাড়ির উদ্দেশ্যে। ভেতরে কী হাউমাউ কান্না কানে বাজলো, যতক্ষণ না তার নিকটস্থ পথটুকু ছেড়ে গেলো! কোনো পরকালগামীর পরিজনের কান্না! আফজাল হোসেনের পা দুটোও থেমে গেছে হঠাৎ সাথে সাথেই। কেমন কানে বেজে রইলো আর্তনাদ! বুকের ভেতরটাও মোচড় দিয়ে উঠলো অনুশোচনায়। দোষ তার। সে দোষী। ফাতিহার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দোষী। এভাবে যাওয়া তার ঠিক হবে না। ফাতিহা কাঁদছে। এতো বছর কেঁদে কেঁদে রুগ্ন হয়ে উঠেছে। আজও কাঁদছে! কেন আজও এই কান্নার কারণ সে হয়ে আছে? কেন ফাতিহা কান্নার কারণটুকু শুধুমাত্র তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখে দিলো! খুঁজলো না কেন একটা সুন্দর সংসার? বাঁধলো না কেন নতুন স্বপ্ন!
পিছু পথে আবারও হেঁটে আসে আফজাল হোসেন। পুনরায় ছুঁয়ে নেয় স্বপ্ন নিকেতনের সীমা। বুকের ভেতর যে সেই বাহনটি একটা ধুকপুক তুলে গেলো, তা আর নামলোই না! তার চলাও থামেনি একদম ফাতিহা পর্যন্ত না গিয়ে। ফাতিহা এখনো কাঁদছে। তার জন্যই কাঁদছে আঁচলে মুখ চেপে। আফজাল হোসেন নিকটে এসে দাঁড়ালেই ফাতিহার নজর পড়ে এদিকে। এখনো তিনি যাননি? সেই কখন না চলে গেলেন! আফজাল হোসেন এবার টুল সরিয়ে বিছানার কিনারাতেই বসে যায়। ফাতিহার রুগ্ন হাত জোড়া ধরে নেন নিজের দুহাতের মধ্যে চেপে। অনুতপ্ত দৃষ্টি জোড়া স্থির ফাতিহার নত চোখের পাতায়। থমথমে মুখ, কিন্তু কিঞ্চিৎ কম্পনের সুর! থেমে থেমে উচ্চারণ করে যান কিছু বাক্য।
“মাফ কইরা দিয়ো আমারে। আমি তোমারে সেদিন সাথে নিয়া গেলেও পারতাম। আমার বাড়ি না পারি, তোমার বাড়ি পর্যন্তই পৌছায় দিতাম। মাফ কইরা দিয়ো। দোষ যা চাপছে, সব ভার আমার উপরই থাকুক। তুমি একবার মাফ কইরা দেও।”
ফাতিহা আবেগের তপ্ততায় যেন আরও গলে যায়। এ কেমন দিন এলো যে, তার এই মানুষটা তার কাছে হাত জোর করে ক্ষমা চাইতে শুরু করলো! সে তো এমনটা কখনোই প্রত্যাশা করেনি। যত অন্যায় অবিচারই হয়ে থাকুক তার সাথে, তবুও চায়নি সে কখনো নিচু হতে আসুক তার কাছে। মনের ব্যথায় মুঠোচাপা হাতের মধ্যে কপাল ঠেকিয়ে দেয় ফাতিহা। কান্না করে আর বলে,
“এইসব কী বলেন আপনে! থামেন, থামেন। এইসব একদম বইলেন না।”
একই বিরতিপূর্ণ ধারায় আফজাল হোসেন বলে যায়,
“আমি তোমারে ঠকাইতে চাই নাই, ফাতিহা। অধিকার হারাও করতে চাই নাই। যৌবনের জেদ বড় তীক্ষ্ণ জেদ ছিলো আমার। তোমার অবাধ্যতা সেই জেদের বশে ধ্বংস! ক্ষমা কইরা দিয়ো। একটা সুযোগও দিয়ো অধিকার কিছুটা রক্ষার।”
“আপনে থামেন। এইসব বইলেন না।”
চোয়াল শক্ত রেখে চুপ করে মিনিট দুয়েক বসে থাকে আফজাল হোসেন। বাইরে উঠা সেই ধুকপুক এখনো থামেনি। বরং ব্যথার প্রখরতা বাড়ছে। মেয়েলোকের হয়তো ততক্ষণে চোখ ভিজে আসতো। তার সেটুকুও আসে না। ফাতিহা হাত থেকে মাথা তুললেই সে মুঠোবন্দি হাত মুক্ত করে দেয়। আর থাকতে পারছে না এখানে। কথাও বলতে পারবে না সে স্বাভাবিকতার সাথে। তার যাওয়া প্রয়োজন। তাই উঠে যায়। যেতে যেতে ফাতিহাকে বলে যায়,
“আমি আসি। মাফ কইরা দিয়ো। যাওয়ার জন্যও তৈরি থাইকো।”
ফাতিহা এই কণ্ঠের কম্পন উপলব্ধি করতে পারে। দুহাতে নিজের মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে, যে হাতদুটোকে শক্ত মুঠোয় ধরেছিলো আফজাল হোসেন। নিজের চেয়েও বেশি কষ্ট অনুভব করে ফাতিহা এই মানুষটার জন্য; যাকে সে এতোকিছুর পরেও ভালোবেসে গেছে নীরবে, নিঃসঙ্গতায়। যার কাছ থেকে অপবাদ পেয়েও ভালোবাসতে পিছু হটেনি।
আজ মামাতো বোনের বিয়েতে যাওয়ার কথা সবার। অথচ কদিন যাবত মন ভালো নেই কারোই। সবটা গুমোট হয়ে আছে এক প্রকার নিস্তব্ধতায়। আফজাল হোসেন আরও বেশি গম্ভীর হয়ে আছেন ফাতিহার সাথে দেখা করে আসার পর হতে। সকাল হতে পরী জনে জনে মনে করিয়ে দিতে ও জিজ্ঞেস করতে শুরু করলো। প্রথমে গেলো অর্পার কাছে।
“আপা, আপনের কিন্তু সারাজীবনই ঘন্টা দুয়ের কম লাগে না মেকাপে। আগে ভাগেই বইসা যাইয়েন কইলাম। আম্মায় কইছে বারোটার মধ্যে রেডি হইয়া থাকতে। কম হইলেও দশটায় মেকাপ শুরু করতে হইবো আপনারে।”
“ওফ্ফ! যাও তো! সব সময় বেশি বেশি! নিজের চিন্তা করো গিয়ে। আমার এতো সময় লাগে না।”
পরী ভেংচি কেটে ভেঙিয়ে যায়।
“উ…হ! ঢংগী নাইকার সময় লাগে না! দেখমুনে। এক্কেবারে ঘড়ির টাইম ধইরা খাড়ামু পরীর কথা ভুল কি না দেখতে!”
অর্পা মটমটে চোখে তাকায় তার দিকে। পরক্ষণে মনোযোগ দেয় গাছের ডাল কাটতে। গোলাপ গাছ দুটো ছাটাই করে দিচ্ছে সে। টানা বৃষ্টি পেয়ে পেয়ে আগাছা বেড়েছে বেশ কিছু।
পরক্ষণে অর্পার ঘরে উঁকি দিয়ে শ্রাবণকে না পেয়ে যায় বিপুর ঘরে। ছুটির দিন বিধায় ভোরে একবার উঠেও আবার ঘুমাচ্ছিলো বেলা করে। পরী ঘরে এসে চেঁচায়,
“বিপু ভাই! ওই বিপু ভাই! কান্তাবানু আইছে।”
মশারির ভেতর থেকেই চোখ কুঁচকে তাকায় বিপু। পরীর দিকে দেখেও আবার দরজার দিকে দেখে একবার। যদিও সে বিশ্বাস করেনি পরীর কথা। পুনরায় আবার পরীর দিকে তাকালেই পরী বলে,
“আসে নাই। ওইডা ভোরের স্বপ্ন দেখাইলাম। যেইটা পূরণ হয় না। উঠেন জলদি কইরা। আম্মায় কইছে বারোটার মধ্যে রেডি হইয়া থাকতে সবাইরে। মামার বাড়ি যাইবেন না?”
“এখন কয়টা বাজে?”
“যতটাই বাজুক। উঠেন। বারোটার প্রস্তুতি নেন। প্রত্যেক দিন জমিদারি করলে চলে না।”
“একটা থাপ্পড় দিয়ে নাক কপাল সমান করে ফেলবো। যা এখান থেকে!”
“মাস্টার হইছেন, এট্টু ভদ্র হইয়েন। নইলে এই পরী যেমন আপনারে মানে না। আপনার আন্ডাবাচ্চারাও মানতো না। আতাহার বিপুরে স্যার না ডাইক্কা ভাবির মতো আতা গাছে তোতা পাখিই ডাকবো। এই কইলাম শেষ কথা।”
বলতে বলতে চলে যায় সে। ইফতেখারকে পায়নি। বলাও হয়নি। শ্রাবণ গিয়েছিলো বাথরুমে। এখন ফিরেছে ঘরে। পরী আবার আসে অর্পার ঘরে।
“ভাবি, নতুন বউ আপনে। সাজগোজ যা করার আগে ভাগেই কইরা নিয়েন। বারোটার মধ্যে।”
“কেন? বারোটায় কী?”
“ও মাগো মা! জানেই তো না! মামা শ্বশুরের বাড়ি যাইবেন। মামি আইসা দাওয়াত কইরা গেলো না সেদিন? আপনের ননদের বিয়া।”
“ওহ্। মনে ছিলো না আমার।”
“হুম, মনে করায় দেওয়ার জন্যই আমি পরী। টকটকে লাল শাড়িটায় আপনারে যা লাগছিলো। আজও তেমন কিছুই পইরেন।”
“আচ্ছা?”
“হো। দারুণ লাগে আপনারে একটু সাজুগুজু করলে।”
“ঠিক আছে। আম্মাকে বলো তবে, উনার গহনাগাঁটি দিতে। পরে সেজেগুজে যাবো। নতুন বউ যখন, বউ সেজেই যাবো।”
“আম্মার গয়না!”
পরী যেন একটু স্তব্ধ হয় ভাবতেই। এক চেইন নিয়ে যা কাহিনী হয়ে গেলো, সেই আম্মা তাকে ভারি গহনাগাঁটি দিবে! শ্রাবণ তার মুখে তাকিয়েই যেন ভাব ভঙ্গি বুঝতে পেরেছে। তবুও স্বাভাবিকভাবে সে বলে,
“জি। আমার তো গহনা নেই। তাছাড়া মামী শাশুড়ির চোখ আমার মুখ দেখার আগে কান গলায় গহনাগাঁটি খুঁজতে লেগে পড়ে। তো যেতে হলে তো সেভাবেই যেতে হবে। নয়তো আমি যাবো না।”
“আচ্ছা, দেখি আপনের কপালে যাওয়া আছে কি না!”
আধ হতাশা নিয়ে চলে যায় পরী। সে বলতে গেলে না একটা ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেয়, শঙ্কায় আছে। শ্রাবণকেও বলতে পারলো না যে, সে নিজে গিয়ে চাইতে। কেননা শাশুড়ি বউয়ের মধ্যে নীরব দ্বন্দ্ব দেখতে পায় সে। কেউ কথা বলতে এগিয়ে যায় না একে অপরের সাথে। তাই শঙ্কা নিয়েই গেলো শ্রাবণ মুখের বার্তা পারভীনের কান পর্যন্ত পৌঁছে দিতে।
“আম্মা, ভাবি কইছে গহনাগাঁটি দিয়া সাজায় নিলে দাওয়াতে যাইবো।”
গম্ভীরমুখের অধিকারী পারভীন তার দিকে ফিরে তাকাতেই পরী দ্রুত বলে,
“আপনের ভাবির চোখমুখ তো ভালা না। দেখলেন না, ওইদিন আইসা কী কইয়া গেলো! নতুন বউয়ের কান গলা খালি ক্যা!”
পারভীন কিছুই বললো না। আবারও চুলোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে। শাকটা ভাজি করা হয়ে গেলেই তার রান্না শেষ। ওদিকে পরী কোনোরকম জবাব না পাওয়া পর্যন্ত শান্তি নেই। সে আবার বলে,
“আমিও ওইটাই কই, চেয়ারম্যানের পুত্রবধূ গহনাগাঁটি ছাড়া যাইবোই ক্যা? চেয়ারম্যানের অর্থসম্পদ কী না আছে? তারা যে কী মনে করে আপনাগো রে! যাকগে, মানসম্মান ক্ষয় করার দরকার নাই। ভাবির যাওয়া জরুরী হইলে তেমন ভাবেই যাওয়া উচিত।”
“বেশি কথা বলিস না তো। যা। গয়না দেওয়া লাগলে দিমু। গোসল সাইরা তৈরি হইতে বল গিয়ে।”
“হো, যাইতাছি। যার কাছে যাই, হেয়-ই খালি কয় যা; যা! আল্লাহ! কই যে যামু, একটা গন্তব্য কইরা দেও আমারে। তারা ‘যা’ কইলেই যাতে টুপ কইরা চলে যাইতে পারি।”

“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ৪২
(নূর নাফিসা)
.
.
একটা গর্জিয়াছ থ্রিপিস ও শাশুড়ির সোনার গহনাগাঁটিতে তৈরি হয়ে গেছে শ্রাবণ। ইফতেখার বিপুর ফোনকল পেয়ে বাড়ি এসে দেখে সবাই তৈরি। শ্রাবণকে দেখে যেন একটু বিস্মিতই হয়ে গেলো সে। সে আরও ভাবছিলো, শ্রাবণ যাবে না। কেননা, অপুকে সে মন্দ ছেলে বলে জানে। আর অপু শ্রাবণের পিছু ঘুরেছে জানার পর থেকে তার মধ্যেও তাকে নিয়ে মন্দ লাগা শুরু হয়েছে। তাই ভেবেছিলো, শ্রাবণ না গেলে তাকে একদমই জোর করবে না। অথচ এদিকে এসে দেখে সে-ই আরও পরিপাটি সাজে প্রস্তুত! পরীর কানে ঝুমকো লাগিয়ে দিচ্ছিলো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। ইফতেখারকে দেখেছে সে-ও। ইফতেখার কিছুই বলেনি। বারান্দায় প্রবেশ করে দেখতে দেখতেই চলে গেলো নিজের ঘরে। আরও একটা ব্যাপার মাথায় নাড়া দিলো। শ্রাবণ এ বাড়িতে এসেছে আজ কতদিন। অথচ কেনাকাটার জন্য সাধেনি সে এখনও! এইযে জামাটা পরেছে, ভালোই দেখাচ্ছে। অথচ এই জামা সে কিনে দেয়নি। তার খেয়াল এতো এলোমেলো কেন? শ্রাবণ তো তবে কোনোমতেই ভুল বলেনি সেদিন যে, সে দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করছে না! আসলেই করছে না। ভেবে ভেবে নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হয় ইফতেখার। একটার পর একটা ঝামেলাই যেন তাকে আরও দায়িত্বহীন করে তুলছে! খেয়ালকে বেখেয়ালিতে পরিণত করছে! এই বিরক্তি নিয়েই গোসল সেরে আসে। প্রস্তুত হয়ে যায় মামাবাড়ি যেতে। বের হওয়ার সময় শ্রাবণ জিজ্ঞেস করলো,
“মোটরসাইকেল নিবেন না? তবেই তো কিছু ভাড়াও বেঁচে যেতো।”
“নদী পেরিয়ে যেতে হবে।”
“তাই!”
শ্রাবণ একটু বিস্মিত হয়েই রওনা হয় সবার সাথে। বিপু আরও আগেই তৈরি হয়ে বাজারে চলে গিয়েছিলো রিকশা নিতে। এখন এসে ডাকলো সবাইকে। পিতামাতাকে উঠিয়ে দিলো এক রিকশায়। মন ভালো না থাকায় আফজাল হোসেন যাবেন না, সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সকালে। যদিও প্রকাশ করেননি একবারও। ভেবেছিলেন সময় হলে সবাইকে পাঠিয়ে দিবেন। পারভীনের মনঃক্ষুণ্ন হবে ভেবে কিছুক্ষণ আগেই সিদ্ধান্ত বদলে তৈরি হয়ে গেলেন। এমনিতেই মনোমালিন্যতা চলছে। আরও মনঃক্ষুণ্ন করা একদমই সাজে না। পরী, বিপু আর অর্পা উঠে গেছে এক রিকশায়। দুই কিশোরীকে আরামে বসতে দিয়ে সে উঠে বসেছে উপরে। শ্রাবণ আর ইফতেখারের জন্য বরাদ্দ রইলো এক রিকশা। ইফতেখারের মুখে সামান্যতম হাসি ফুটে না আজ ক’দিন যাবতই। রিকশায় পাশে বসে থেকে শ্রাবণ তার মুখের দিকে তাকায় একবার। ভাবুক বেশে যেন পথের সম্মুখে তাকিয়ে আছে ইফতেখার। শ্রাবণ জিজ্ঞেস করে,
“কতক্ষণ লাগে যেতে?”
ভাবনায় বিরতি নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকায় ইফতেখার।
“খুব বেশি না। পনেরো-বিশ মিনিটের মতো লাগবে।”
“সামনের নৌকা ঘাটে পাড় হবেন?”
“হুম।”
“আবার ওপাশে গিয়ে গাড়ি নিতে হবে?”
“হ্যাঁ, পাঁচ মিনিটের মতো রিকশায় যেতে হবে।”
“এখান থেকে ঘাটের এইটুকু তো হেঁটেই যেতে পারতেন। কতটুকু আর রাস্তা।”
ইফতেখার পুনরায় তার মুখে তাকিয়ে বলে,
“তোমাকে হাঁটিয়েই নেওয়া দরকার ছিলো।”
“সমস্যা ছিলো না। আমি এরচেয়েও বেশি হেঁটে অভ্যস্ত।”
“বাকিরা অভ্যস্ত না। একত্রে যাচ্ছি যখন, তোমার আমার অভ্যস্ত হলে তো চলবে না। আব্বাও যেতে দিবে না।”
মৃদু হাসি ঠোঁটের ধারে স্পষ্ট করে শ্রাবণ সম্মুখে তাকিয়ে বলে,
“বুঝতে পেরেছি।”
কিন্তু ইফতেখারের বুঝা হয়ে উঠে না ঠিক, এই রূপের সৌন্দর্যতা! কেন এই রূলের জোয়ারে তার এতো আকর্ষণ? আগে তো কখনোই কোনো মেয়ের মুখে সে এভাবে দেখেনি, আকর্ষিতও হয়নি। কর্ম ব্যস্ততায় তো এসব প্রেম বিয়ে নিয়ে ভাবার সময় পায়নি৷ নিজেকে সুযোগ দেয়ও নি। এই মুখের আদল আর দৃষ্টির হাসি কীভাবে টেনে নিলো তাকে! একপাশ থেকেই মুগ্ধচোখে এখনো দেখে নেয় তার আষাঢ় মাসের শ্রাবণকে, ছোট্ট একটা মুহুর্ত জুড়ে। তবুও মুখটা মলিন। রূপবতীর সুখে সুখী হয়ে থাকাটাই তো শুধু জীবন নয়। এইযে, পরিবারে একটা অশান্তি লেগে আছে। তা-ই দিচ্ছে না কোনো সুখ পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে। কেবলই ফ্যাকাসে অনুভূতির ছড়াছড়ি!
পরী হনহন পায়ে ঘাটে কাঠের ছোট্ট পুলে হেঁটে নৌকায় উঠে গেলেও বাকি মেয়েগুলোকে সাবধানে উঠায় ইফতেখার নিজেই। পারভীন পারে না বয়স ও দেহের ভারে তত চাঞ্চল্যকরভাবে ছুটতে। অর্পা তো স্বভাবগতই কিছুটা ভীতু এবং আহ্লাদী। শ্রাবণ এসব তক্তা বা বাঁশের পুলে চড়ে অভ্যস্ত নয় খুব একটা। তাই সাবধানেই চলতে হয়েছে তাকেও। এক নৌকায় উঠেছে পুরো এক পরিবার। মাঝি খুশি হয়ে লম্বা করে সালাম দেয় আফজাল হোসেনকে। বিড়বিড়িয়ে সালামের জবাব দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন আফজাল হোসেন। ইফতেখারও দাঁড়িয়ে আছে। নৌকাটা যথেষ্ট প্রশস্ত। মাঝখানেও বসার জন্য লম্বাটে কাঠের বেঞ্চ ফেলা হয়েছে। মা মেয়ে সেখানে বসলেও শ্রাবণ বসেছে কিনারায়। যদিও বিপু বলেছিলো ভাবিকে, মাঝখানে বসতে। কিন্তু তার নৌকার কিনারা পাশই ভালো লাগে। আরও অন্যতম কারণ, সে নদীর টলমলে জল ছুঁয়ে যাবে নৌকা ভ্রমণ করতে করতে। পরীও তার পাশেই গিয়ে বসেছে অতি আগ্রহে। বিপু বসেছে বিপরীত প্রান্তের কিনারায়। আফজাল হোসেন বিপুর পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন। পারভীন হঠাৎ মুখোমুখি বসা শ্রাবণের গলায় চোখ রাখেন। শ্রাবণ তখন পাশ ফিরে বসে ভেসে যাওয়া কচুরিপানা ছুঁয়ে নিতে ব্যস্ত পরীর সাথে। পারভীন তাকিয়েই থাকেন তার রূপে। মুগ্ধ করার মতোই এই মেয়ের রূপ। সোনার হারটাও গলায় মানিয়েছে খুব। এই মানানসই সৌন্দর্যই তার দৃষ্টিকে আকর্ষিত করে নিয়েছে ওদিকে। মনের কোণে আবারও পুত্রবধূদের ও মেয়েকে নিয়ে বেঁধে রাখা প্রত্যাশা ফুটিয়ে তোললেন নিমেষেই। ভেবে নিলেন, এই হারটা তিনি শ্রাবণকেই দিবেন। ভালো মানিয়েছে যখন তার গলাতেই। আরেকটা হার যে তুলে রাখা আছে, তা অর্পাকে দিবেন। ওটা মেয়ের গলায় ভালো মানাবে আশাবাদী। আর বিপুর যখন বিয়ে হবে, বিপুর বউয়ের জন্যও এমনই একটা বানিয়ে নিবেন। যেন কোনো বউ বলতে না পারে, তার চেয়ে অন্যজনকে বেশি দিয়ে ফেলেছে। কিংবা তার টার চেয়ে জায়েরটা বেশি সুন্দর!
পরক্ষণে শ্রাবণের হাতের দিকেও মনোযোগ দেন। ফরসা হাতে মানতাসাটাও ফুটে আছে একদম। তবে মানতাসা দেওয়ার তাৎক্ষণিক ভাবনা তিনি ভাবলেন না। এটা মেয়েকে দিবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন। আর নিজের হাতে যেই মোটা বালা আছে, এমন দিবেন ছেলের বউদের। হয় নিজেরটা দিবেন, নাহয় বানিয়ে দিবেন। কানের দুল গুলোও ফুটে আছে শ্রাবণের কানে। কোনটা বেমানান লাগছে, তা খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। শুধু আচরণের দিক থেকেই শাশুড়িকে সন্তুষ্ট করতে পারলো না এই মেয়েটি। ভাবতেই একটা ভারি নিঃশ্বাসের পতন হয় পারভীনের৷ নদীপথ সম্পূর্ণটা পাড়ি দিতে দিতেই খেলে গেলো শ্রাবণ। পানিতে হাতের নাড়াচাড়ায় ঢেউ তুলতে তুলতেই কিছুটা সময় দূরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ফেলে আসা পাড়ে। আবার না কখন যাওয়া হবে ওপারের সেই নীড়ে ফিরে!
মামাবাড়ি এসেই মোটামুটি জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন দেখতে পায়। বিয়ে পরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠান ছোট করে রাখলেও ততটা ছোট না। নিকটাত্মীয় সবাই-ই উপস্থিত আছে। পারভীনের মাধ্যমে পরিচিত হচ্ছে শ্রাবণ সকলের সাথেই। চেয়ারম্যান পরিবার হওয়ায় তাদের মূল্যায়নটা সব আত্মীয়ের নিকটই তুলনামূলক বেশি। তাই শ্রাবণকে দেখতেও এক প্রকার আগ্রহ নিয়েই বসেছিলো। দেখার পর মুখে মুখে সৌন্দর্যের প্রশংসায়ও পারভীনের মন তুষ্ট। নামাজের সময় হওয়ায় পুরুষগণ সব চলে গেছে জুমার নামাজে। পারভীনও বোরকা খুলে নামাজটা আদায় করতে গেলো বড় মামার ঘরে। ডানে বামে তাকিয়ে শ্রাবণ ঘুরেফিরে দেখছিলো বাড়ি। পরী কখনো এসে সঙ্গ দেয়, আবার ডাকে ডাকে চলে যায় এদিক ওদিক। নিজের এলাকা বলে কথা। কমবেশি সবাই-ই পরিচিত। অর্পা মজেছে সমবয়সী কাজিনের সাথে। ঘরে গিয়ে বিয়ের কনেকে দেখে হাসিমুখে ভাবি, মামীদের সাথে কথা বলে বাইরে বেরিয়ে আসে শ্রাবণ। আম্মার নামাজ হয়েছে কি না দেখবে। তবে পায়নি পারভীনের দেখা। পার্স থেকে ফোনটা বের করে আয়োজন সম্ভারের এক প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ায় শ্রাবণ। কল করে শিখার কাছে। নৌকায় থাকতেই ফোনটা শব্দহীন কাঁপছিলো ব্যাগের ভেতর। অনুমান করতে পারলেও রিসিভ করা হয়নি। বন্ধই হয়ে গিয়েছিলো পরক্ষণে। এখন চালু করে ডায়াল করলো শিখার নম্বরে। ফাতিহার অবস্থা নাকি হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়েছে। তা-ই জানাতে কল করেছিলো শ্রাবণকে। শ্রাবণের মুখটা মলিন হয়ে উঠে মুহুর্তেই। অবস্থা খারাপ শুনলেই তার কেমন ভয় করে। প্রত্যাশাটুকুও বুঝি আর পূরণ হবে না, এমন ভয় চেপে যায় মনের কোণে। সে কথা বলে ফোন রাখতেই হালকা কাশি ভেসে আসে পাশ থেকে। ছায়াটা যেন রাস্তার এপাশ থেকে আসতে উপলব্ধি করতে পেরেছিলো ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত থেকেই। তবে তার দিকেই আসছে, তা খেয়ালে রাখেনি। বিয়েবাড়ি, কত মানুষজনই আসাযাওয়া করবে স্বাভাবিক। কিন্তু কাশিতে মনোযোগ কেড়ে নেওয়াটা অস্বাভাবিক। থমথমে চোখে তাকায় সে অপুর দিকে। নামাজ পড়ে এসেছে। টুপিটা মাথা থেকে নামিয়ে ভাজ করে নিতে নিতেই মুচকি হেসে বলে,
“সম্পর্কে কী হোন তবে? ভাবি?”
কোনো কথা বলে না শ্রাবণ। খিটখিটে দৃষ্টিতে কেবল তার মুখাবয়বের ভঙ্গি দেখে যায়। দুষ্টু হাসিতে স্থির থেকেই অপু বলে,
“শহর ছেড়ে চেয়ারম্যান বাড়ি লুকিয়ে ছিলেন তবে! তা-ও আমার ভাবি হয়ে! কিন্তু, আপনাকে ভাবি ডাকবো ভাবতেই তো আমার কেমন কেমন লাগে! দিপু ভাই নিয়ে এসেছিলো, নাকি আপনিই ঝুলে পড়েছেন চেয়ারম্যান বাড়ির বউ হওয়ার সাধে?”
পিছু ফিরে নিজেদের ঘর ইঙ্গিত করে বলে,
“চেয়ারম্যান বাড়ির আগেই পাকা ঘর তুলছিলাম। আমার বাপের এই ঘরখানা পছন্দ হয় না?”
শ্রাবণ একবার দেখে তার ইঙ্গিত করা ঘরের দিকে। পরক্ষণে তার দিকে দৃষ্টি এনে ঠোঁট কার্ণিশে তাচ্ছিল্যের হাসি স্পষ্ট করে বলে,
“রাস্তায় ঘুরাফেরা করা কুকুরের আবার ঘরও থাকে! জানতাম না তো।”
দুষ্টু লোকের দুষ্টু হাসি সরে না মুখ থেকে। বরং তা বাড়ে শ্রাবণের তীক্ষ্ণ অপমানে।
“বিশ্বাস করবেন কি না, জানি না। আপনাকে পাওয়ার ইচ্ছা আমার এখনো সরেনি। কিন্তু কী আর করার! আপন ফুপাতো ভাইয়ের হাক! কীভাবে কেড়ে নেই? আপনি চাইলেও একটু সাহসের সাথে দুয়েকটা সম্পর্ক কর্তন করতে পারি। এমন ফুপাতো ভাইকেও ভুলে যেতে পারি।”
দাঁতচাপা কণ্ঠে শ্রাবণ বলে,
“অমানুষ যে কতটা নীচু হতে পারে, তোকে দেখলেই যথেষ্ট বুঝা যায়। এই অমানুষী সবার সাথে করা যায় না, তা-ও আশাকরি আরও আগেই বুঝে গিয়েছিলি। সুতরাং, শ্রাবণের সাবধান করাটাই শেষ সুযোগ মনে করে নে। শ্রাবণকে পাওয়াটা না।”
নামাজ শেষ হয়েছে যখন, বাকিরাও বাড়ি ফিরবে। তাই কারো চোখে পড়ার আগে কথাটা বলে এই নোংরা লোকের সামনে থেকেও চলে যেতে পা বাড়িয়েছে শ্রাবণ। একা পেয়েই এমন কূট মন্তব্য করার স্পর্ধা দেখাতে আসতে পেরেছে সে। আর সুযোগ দিতে চাইছে না। কিন্তু তার যাওয়ার উদ্দেশ্য সাধনে থেমে নেই অপু। পিছু বলে,
“আপনার বোনটাও আপনার মতোই সুন্দর। দেখতে পেলাম, মাস খানেক আগে।”

চলবে।