শ্রাবণধারা পর্ব-৪+৫+৬

0
113

“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ০৪
(নূর নাফিসা)
.
.
বাজারের পাশে ফাঁকা বালুর মাঠে কোনো পার্টি এনে বসাতে হবে। রাস্তার কাজটা সম্পূর্ণ হলেই যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়ে আসবে। একটা ভালো পার্টিকে ধরতে পারলে মাসে মাসে প্রচুর ভাড়া পাওয়া যাবে। যেহেতু নদীর পাড়, সেহেতু নৌপথেও যোগাযোগ সুস্থির রাখা সহজ হবে। ক্ষমতা আছে এখন, সুযোগ হাত ছাড়া করা যাবে না। এখনই দখলের সময়। বালির নিচে যাদের জমিজমা আছে, তাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে উপযুক্ত দাম দিয়ে তা কিনে নিতে হবে শীঘ্রই। রাস্তা আর বাড়ির কাজটা সম্পন্ন হলেই যেন এই ব্যাপারে মামাকে জোর দেয় ইফতেখার, সেই ব্যাপারে আলোচনা করতে করতেই খালিদ আর ইফতেখার বাজারের দিক হতে চেয়ারম্যান বাড়ি আসছিলো। রোদে দাঁড়িয়ে থাকায় দুজনের কপালেই ঘাম জমে গেছে। মুখাবয়ব তেল চুকচুকে। কপালের ভাজেও চাপা খানিক বিরক্তি। ইফতেখার নিশ্চুপ শুনতে শুনতেই পা বাড়াচ্ছিলো। ব্যাপার মন্দ বলেনি ভাই। ভালো পার্টি যোগাতে পারলে অনেক লাভবান হওয়া যাবে। খালিদের চোখ হঠাৎ বিপুর উপর পড়ে গেলো পথ ফুরানোর আগে। সাত্তারের বাড়ি হতে বেরিয়েছে বিপু। হনহন পায়ে চলছে সে-ও চেয়ারম্যান বাড়ির রাস্তাতেই। খালিদের মুখখানা যেন আরও থমথমে হয়ে উঠলো মুহুর্তে। ইফতেখারকে বললো,
“দেখছোস, দেখছোস? বিপু সাত্তারের বাড়িত্তে বের হইছে। এই পোলাটায় বেলাইনে যাইতাছে একদম। মেয়েগো পিছে পিছে ঘুরতে লাগছে। কোনো দায় দায়িত্ব নাই। কলেজেও যাইতো কেমন ফুটাঙ্কি করতে করতে। এর হাবভাব আমি ছোডত্তেই ভালা দেখিনা। কয়দিন ধইরা একটা সুন্দর মেয়েলোক দেহি আয়ে যায় সাত্তারের বাড়ি। ওইডার পিছেই বুঝি পড়ছে! কিছু কইছ কইলাম। ঘটনা গাঢ় হওয়ার আগেই সাবধানে টানিস। মামীরে কইছ বুঝাইতো। নইলে মামা কেমন, জানোস ই তো।”
প্রত্যুত্তরে কিছু বলে না ইফতেখার। কুচকানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বিপুর ধেইধেই চলার দিকে। মামার কাছেই বলা দরকার ভেবে ফুসতে থাকে খালিদ। চেয়ারম্যান বাড়ি পা দিতেই খালিদের সাত বছর বয়সী মেয়ে ছুটে আসে বাড়ির ভেতর হতে।
“বাবা, তোমারে খুঁজছি আমি! তুমি টাকা দিয়ে আসোনি ক্যা? আমি স্কুলে যাবো না?”
“হো, মনে নাই। যা, স্কুলে যা।”
পকেট থেকে টাকা বের করে দিলেই মেয়ে চলে যায়। স্কুলে পৌঁছে দিতে অর্পাকে পিছু নিয়ে মোটরসাইকেলে বসেছে বিপু। খালিদ কেবল মটকানো চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। বিপুর এদিকে ধ্যান নেই। সে খালিদের মেয়ে তুলিকে ডাকে মোটরসাইকেলে চড়ে বসতে। তাকেও নামিয়ে দিয়ে যাবে। খুশিতে চলে আসে তুলি। তাকে তুলে নিয়েই মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা হয় বিপু। আফজাল হোসেন নাশতা করে দাত খিলাচ্ছেন বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে। ইফতেখার এসে বললো,
“আব্বা, আলকাতরার টাকা দিয়েন। ইটের গাঁথনি শেষ পর্যায় এসে গেছে।”
“কখন লাগবো?”
“বিকেলেই যাবো।”
“নিয়া যাইছ।”
পারভীন ছেলের গলা শুনে নাশতা করতে ডাকছে ঘরের ভেতর হতে। পরী এসে বারান্দায় উঁকি দিয়েও ডাকে।
“ভাইজান, নাশতা করতেন হাতমুখ ধুইয়া।”
“শুনছি।”
পরী খালিদের দিকে তাকিয়ে বলে,
“এই, খালিদ ভাই। ভাবি রানছে তো বাড়িত? নাশতা কইরা বাইর হইছেন তো? নইলে আপনেও আইতেন।”
খালিদ জবাব দেয় না তার। মামার সাথে কথা বলা দরকার বালির মাঠের ব্যাপারে। পরী ঠোঁট উল্টে পারভীনের কাছে যেতেই পারভীন শাসানো চোখে তাকিয়ে বলে,
“তোরে কি আমি বলছিলাম, খালিদের বউ বাড়িত রানছে নাকি তার খবর নিয়ে আইতি? বলছি, খালিদ আইলে তারেও সাধিছ নাশতা করতে। কথাবার্তা ঠিক করিছ। নইলে কপাল মন্দা।”
“জন্মাইছিই মন্দা নিয়া। এহন আর কপালের ভালা তো স্বপ্নেও দেখি না।”
“এতো বেশি কথা আমার একদম পছন্দ না কিন্তু, পরী।”
“আমি মানুষটাই সকলের অপছন্দের। হুহ্!”
জবাব দিয়ে সাথে সাথেই পারভীনের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায় সে। কথার পিঠে কোনো কথা না রাখলে যেন তার বাকশক্তির জীবদ্দশা বৃথা যায় বরাবরই। পেছনের দিকের দরজা খুলে দেখে গোয়ালা যাচ্ছে ভারি ওজনের বালতি বহন করে। সে গলা ছাড়ে,
“ও গোয়ালা ভাই, গোয়াল হতে নেন তো খাঁটিডাই। বাজার পর্যন্ত যাইতে যাইতে দুধে পানি মেশান, না পানিতে দুধ মেশান?”
“তুই কোনডা কিনবি, কো দেখি।”
“আমি কিনতাম না। কাকায় কিন্তু চেয়ারম্যান। বুইজ্জা রাইখেন। যদি নালিশ পায়, কোমড়ে দঁড়ি দিবো কিন্তু পুলিশ ডাইক্কা।”
“ধুর বেডি। সক্কালবেলা তোর অলক্ষুণে মুখ না দেখলেই বাঁচি।”
“আমি অলক্ষুণে? তাইলে আপনের কপাল খারাপ। আমি প্রত্যকদিন এনে আইয়া খাঁড়ায় থাকমু আপনে যাওনের সময়। বুইজ্জা রাইক্ষেন।”
গোয়ালা কদম আলী আর পিছু বলে না কিছু। ঘর হতে ইফতেখারের গলা আসে,
“পরী, নাশতা দিবি নাকি!”
“আইতাছি ভাইজান।”
পরবর্তী দিন দুপুরের দিকে পুনরায় সাত্তারের বাড়ি আসে বিপু। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে বাড়ি হতে বের হওয়ার পর। ছাতাটাও নিয়ে এলো না, ঝপাঝপ নামলেই দৌড়াতে হবে। যে কাজে এসেছে তা না করে গেলেই নয়। বড্ড সংশয় পুষে দাঁড়িয়ে আছে এই বেলা। গতকাল উঁকিঝুঁকি দিতে গিয়ে সাত্তার কাকার সামনে পড়ে গিয়েছিলো সকাল বেলা। দুপুরে তো তিনি কর্মস্থলে থাকেন, তাই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে আসা এই সময়ে। কিন্তু কাঙ্খিত মানুষকে পাওয়া যাচ্ছে না দৃষ্টির সীমায়। বাড়ির ভেতরে পা রাখতেও ভয় ভয় হয়। এমনি কান্তার দেখা পায় বারান্দায় কাপড় মেলে দিতে এসেছে। গলা খাঁকারি দিয়ে বাড়ির প্রবেশদ্বার হতে ফিসফিসিয়ে ডাকে বিপু।
“কান্তা…”
কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই ওদিকে দৃষ্টি গাঁথে কান্তা। বিপুকে দেখেই বিরক্তিকরভাবে ভ্রু কুচকে যায় তার। বিপু হাতে ইশারা করে ডাকে এগিয়ে যেতে। কান্তা মেজাজী গলায় বলে,
“না।”
“আয় না একটু। কথা আছে।”
“পারতাম না আইতে। আমার পায়ে ব্যাথা।”
চেহারায় বিরক্তি ও হতাশা বাঁধে বিপু। পরক্ষণে বলে,
“শ্রাবণ যে, উনি বাড়িতে আছেন?”
“ক্যা?”
“একটু কথা আছে। ডেকে দে।”
“পারতাম না।”
ঠমক যোগে উত্তর করে ঘরে চলে যায় কান্তা। তার ঠমকানোর কারণে বিপুর রাগ হয়। ইচ্ছে করে এক্ষুণি একটা ঠুসি মেরে আসতে মাথায়। বেয়াদব মেয়ে একটা! কিভাবে যে শ্রাবণের কাছে পৌঁছাবে! চাচিরা কেউ দেখলে কি না কি জিজ্ঞাসা করতে থাকে, কি না কি মনে করে আবার গালমন্দ শুরু করে। যতই হোক, উদ্দেশ্যটা তো উনাদের ধারণায় গালমন্দ করার মতোই। তাই যেন আরও সাহস পাচ্ছে না। চলেই যাবে নাকি? মিনিটখানেক পরেই হনহন পায়ে ঘর থেকে বেরিয়েছে কান্তা। সোজা চলে গেছে তার জেঠির ঘরে। পুনরায় বেরিয়ে আবার হনহন পায়ে গেছে নিজেদের ঘরে। যাওয়ার আগে ক্রুদ্ধ চোখে একবার বিপুকেও দেখে গেছে। বিপু যেন আশার আলো খুঁজে পেলো। ফিরে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। যার অবসান কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হয়েছে। পেট ভরে মাত্রই ভাত খেয়ে সেরেছে শ্রাবণ। মাথায় ওড়না তুলে ঢেকুর তুলতে তুলতে এগিয়ে আসে রাস্তার কাছাকাছি। আকাশে তাকিয়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির অবস্থাও বুঝে নেয় চলতে চলতে।
“ও, আপনি। ডেকেছেন নাকি?”
“হ্যাঁ। কেমন আছেন?”
“এইতো, আলহামদুলিল্লাহ।”
“আচ্ছা, মজিদা কাকি আপনার কি হয়?”
“খালাম্মা।”
“কেমন খালাম্মা?”
“খালাম্মা আবার কেমন হয়?”
“না, মানে আপন? নাকি অন্য কোনো আত্মীয়?”
“খালাম্মার বোন খালাম্মা।”
“হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি। দূর সম্পর্কের।”
“কিভাবে বুঝলেন?”
“আপন হলে বলতেন মায়ের বোন।”
অধরের বাঁকে মৃদু হাসিয়ে এলিয়ে দেয় শ্রাবণ।
“জ্বি। এজন্যই ডেকেছেন?”
“উহুম। আপনার জন্য প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।”
“তাই? কিসের প্রস্তাব?”
“প্রেমের প্রস্তাব।”
“বাব্বাহ! কিন্তু আমি তো প্রেমের প্রত্যাশা করছিলাম না।”
“প্রেম অপ্রত্যাশিতভাবেই আসে।”
“হুম, হয়তোবা।”
“প্রেম করবেন কি না, সেটা বলুন।”
“আগে থেকে তো ভাবিনি। তবে…”
“কি?”
“ভাবলে, বলা যায়।”
“ইচ্ছে আছে মনে হচ্ছে।”
“ইচ্ছে রাখাই যায়।”
ঠাট্টা জুড়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠে শ্রাবণ। পরক্ষণেই বলে,
“তবে, আমি ভেবেছিলাম আপনি কোনো কাজের অফার নিয়ে এসেছেন আমার জন্য। প্রেমের চেয়ে এখন একটা চাকরির বেশি প্রয়োজন ছিলো আমার।”
“কি চাকরি লাগবে আপনার?”
“বললেই পাবো?”
“পাবেন কি না জানি না। চেষ্টা করে দেখতে পারি।”
“আমার ইচ্ছে ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু আমি মেডিকেলে পড়তে পারিনি। আমাকে কি ডাক্তার বানানো যাবে কোনো হসপিটালের?”
“ডাক্তারি পড়ার ডিগ্রি নেই, আবার ডাক্তার! ফালতু কথা রাখেন। আসল কিছু বলেন।”
“আপনি আমায় ফালতু বলতে পারলেন?”
“সম্পর্ক স্থির হলে ক্ষমা চেয়ে অন্যকিছু বলবো। আপাতত আমাকে এটা জানান যে, আপনি তো এমনিতেই বেশ রূপবতী। আবারও শিক্ষিত একটা মেয়ে। কোনো বয়ফ্রেন্ড আছে কি?”
“থাকলে?”
“দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার যাত্রী নিতে দ্বিধা। এক নৌকার জন্য সৎ যাত্রী চাই।”
কপালে আঙুল চেপে হেসে উঠে শ্রাবণ।
“আপনি কথা বেশ ভালো বলতে পারেন। আপনার কথার কারণেই প্রেমে পড়ে যাবে মানুষ।”
“তা-ও, একটা গুণ নিজের আছে বলে গর্ববোধ করছি। এখন আপনার মনের খবরটা বললেই বড় ধন্য হই।”
“দুই নৌকায় পা রেখে চলার যাত্রীও আমি নই। ওকে?”
“আর প্রস্তাবের ব্যাপারটা?”
“বলেছি না, ভাবতে হবে?”
“প্রস্তাব পত্র।”
ভাজ করা একটা কাগজ সামনে এগিয়ে দেয় বিপু। মুখে চাপা হাসি নিয়ে একবার বিপুর দিকে তাকায় শ্রাবণ। আবার কাগজটার দিকেও তাকায় পরপর দুইবার।
“সত্যি সত্যিই প্রস্তাব!”
“মিথ্যে কেন বলতে যাবো?”
“তা-ও তো কথা। নিতেই হবে?”
“নেওয়ার জন্যই তো দিলাম।”
একটু ভেবেই যেন পত্রটা গ্রহণ করলো শ্রাবণ। সন্তুষ্টচিত্তে বিপু প্রস্থান করতে চায় এবার,
“শীঘ্রই জানাবেন কিন্তু।”
হাতের মুঠোয় কাগজ চেপে চলে যায় শ্রাবণও। কাগজটা নিয়ে ঠিক করলো না ভুল করলো, দ্বিধা কাজ করছে মনে। তবুও পড়ে দেখতে ইচ্ছুক। ঘরে পা রাখতেই মজিদা খালাম্মা জিজ্ঞেস করেন,
“কেডা ডাকছিলো রে, শ্রাবণ?”
“চেয়ারম্যানের ছেলে, বিপু।”
“ক্যা, গো? ক্যা?”
“ওইযে, চাকরি খুঁজছিলাম৷ হয়তো উনি কোনো ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন।”
“দিবো কইছে? দেইখ্যা হুইন্না যাইছ।”
ফিসফিস করে মজিদা। স্মিত হেসে সম্মতিতে পলক ফেলে শ্রাবণ। পাশের রুমে গিয়ে কাগজ মেলে পড়ে। কিছু সরল বাক্যে প্রেমে পড়ার আহ্বান। শ্রাবণকে প্রথমবার দেখতেই তার চোখে লেগে গেছে। মন যে কখন ছুঁয়ে নিলো চোখের লাগাটুকু, তা বুঝতেই পারেনি। প্রেমটেম জীবনে হয়ে উঠেনি। এবার নাকি মন বলছে ‘প্রেম কর’। খোলা ও বন্ধ চোখের পর্দায় লেগে থাকা ছবিটার সাথেই প্রেম কর। মানুষ ছবির মতো কিভাবে হতে পারে?
শ্রাবণের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠে। কিন্তু মনে ভর করে এক ফালি সংশয়। পত্র যে নিলো, এবার কি দিবে তার উত্তর?
বিকেল থেকে আবারও নেমেছে আষাঢ়ে ঢল! আগামীকাল হতেই পিচ ঢালাইয়ের কাজ ধরা হতো রাস্তায়। এরই মধ্যে আবার কাজের স্থগিতের ঘোষণা আকাশ কর্তৃক। ওদিকে চেয়ারম্যানের ঘরের কাজও সাময়িক স্থগিত। প্রথম তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজটা এই সুবিধার দিনে সেরে উঠা গেছে। এরপর ভেতরের কাজ বৃষ্টিতে করতেও সমস্যা হবে না। ইটের গাঁথুনি চলবে ছাদের কারণে একটু বিরতি নিয়ে। ঝড় হলেই সমস্যা। বাতাসের বেগে যদি কাঁচা গাঁথুনিতে পানি এসে যায়, এইটুকু সংশয় মাত্র। অন্যথায় সমস্যার কিছু দেখা দিবে না বলে আশাবাদী। বারান্দায় হেঁটে হেঁটে খাড়া ঢল দেখছেন আফজাল হোসেন। বালির মাঠের ব্যাপারটা নিয়ে শীঘ্রই আলোচনা সভায় বসতে হবে। খোলা মাঠেই খোলা সভা করবে অত্র জমিজমার মালিকদের সাথে। কারোই তেমন বেশি অংশ নেই। অল্পস্বল্প জমির সমন্বয়ে বড় চড় ছিলো। নদী ভাঙনের কারণে অনেকের জমি হারানোর পথে ছিলো। নির্বাচনের পরপরই তিনি পাড় তৈরি করে দিলেন। জনগণ খুশি হলো। এরপর আরও দুর্দশার শিকার হলো। বৃষ্টির পানি জমে এটা এক বিলের মতো তৈরি হলো। এখন কি ফসল করা বাদ দিয়ে মাছ চাষ করবে তবে? এই বিল যখন ভরে গিয়ে পানি চারদিকে নামতে থাকবে, তখন মাছ কোত্থেকে পাবে? একদিকে রাস্তায় পানি উঠে তা ঘরবাড়ির দিকে নামতে শুরু করবে। অন্যদিকে মাছসহ নদীতে গড়িয়ে যাবে। তারউপর এতো গভীরতায় গ্রামের বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়েও সমস্যা। পানি দেখলেই ঝাপিয়ে পড়ার বদভ্যাস আছে। নাগালহীন বিলে পড়ে তখন প্রাণ হারানোর দশাও বড্ড ভয়ংকর রূপ হবে। তাই সকল সমস্যা নিরসনে সুযোগের বড় সদ্ব্যবহার করে ফেললো চেয়ারম্যান। বালিতে ভরাট করে দিলো জমি। এবার বাচ্চারা খেলে, বাজারের পরিধিও কিঞ্চিৎ বাড়ানো যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভালো কিছু করার চিন্তাও করা যায়। এই ভালো কিছু নিয়ে তিনি আগে থেকেই ভাবছেন। খালিদ মাঝে মাঝে মাথাচাড়া দেয়। আজ সকালে ব্যাপারটা বলতেই তিনি সভা নিয়ে ভাবছেন৷ এমনি ভাবনার ছেদ ঘটে মেয়ের দিকে তাকিয়ে। হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি ছুঁয়ে যাচ্ছে অর্পা। তিনি শান্ত গলায় বলেন,
“পানি ধইরো না, আম্মা। সর্দি লাগবো।”
“আমি তো মাথা ভেজাচ্ছি না, আব্বু।”
“তবুও লাগবো। তোমার এলার্জি আছে পানিতে।”
“এলার্জির ওষুধও আছে আমার আব্বুর হাতে।”
ঠোঁটের কোণে হাসি স্পষ্ট করেন আফজাল হোসেন। মেয়ে তার বড়ই আদুরে। এমনসব কথাবার্তা দিয়েই যেন আদর কেড়ে নেয় সর্বদা। এই অসময়ে ভিজে বাড়ি আসে বিপু। বৃষ্টির শুরু হয়েছে, বেশিক্ষণ হয়নি। কিন্তু ছেলে ভেটকিমাছের মতো সাদা হয়ে এসেছে। চামড়াও কুচকে যাচ্ছে যেন। অনেক্ক্ষণ যাবত ভিজেছে, বুঝাই যাচ্ছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাকে ডাকে বিপু। গামছা আর পোশাক দিয়ে যাওয়ার জন্য। অর্পাকে শুরুতে বলেছিলো যেতে। অলস মেয়ে পরীকে ডাকতে শুরু করেছে এখানেই দাঁড়িয়ে থেকে। পরী কখন আকাশ থেকে নেমে আসবে আর কখন তার পোশাক পৌঁছাবে, তাই মাকেই ডাকে বিপু। আফজাল হোসেন থমথমে চোখে দেখেন ছেলেকে। বাবার এমন নিরব তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করা ক্রমশই অস্বস্তি তুলে মনে। তবুও দাঁড়িয়ে মৃদুবেগে কাঁপতে থাকে। পারভীন চোখ গরম করে এসে প্যান্ট আর গামছা ছুঁড়ে দেয়।
“কোত্থেকে আইছোস?”
মুখে হাসি জাগিয়ে সে উত্তর করে,
“নদীতে নামছিলাম একটু।”
“একটু না বেশি নামছোস, চেহারাই জানায় সব। নিজের কাপড়চোপড় নিজে ধুইয়া দিবি। এক্ষুনি দিবি। বুঝছোস?”
“পরী আছে, মা। তোমার চিন্তা করতে হবে না।”
“পরী তোগো চৌদ্দ পোশাক ধোয়ার জন্য নাই। তারে এক পোশাক ধোয়ার জন্য রাখা হইছে। ধামরা হয়েও যখন বারবার পোশাক পাল্টাছ, নিজের কাজ নিজে কর।”
ভেতরে চলে যায় পারভীন। বিপু চুপচাপ শরীর মুছে নিতে মনযোগ দেয়। বারান্দার এক কোণে চেপে থাকে বাবার আড়াল হতে। পোশাক পাল্টানোর পর আফজাল হোসেন ডেকেই বসেন ছেলেকে। পিছু হাত রেখে লম্বা বারান্দার মাঝামাঝিতে অবস্থান করে বলে,
“খেলাধুলা তো আছেই। ঘুরাফেরাডাও বড্ড বেশি করতাছোস। খালিদ কি কয় এগুলা?”
“কি, আব্বা?”
“আজকাল মেয়েগো পিছন ঘুরতে দেখা যায় তোরে।”
বিপু একদমই অপ্রস্তুত ছিলো বাবার কাছে এখন এমন কিছু শোনার। কি বলবে, ঠিক বুঝতে পারছে না। ব্যাপার জানাজানির দরকারও, আবার জানতে দেওয়াও যেন ভয়। তাই চুপই আছে বিপু। আফজাল হোসেন গম্ভীরমুখে বলেন,
“সাত্তারগো বাড়ি উঁকিঝুঁকি মারার নালিশ আয়ে আমার কাছে। আর যেনে না হুনি।”
চুপচাপ ঘরে চলে যায় বিপু। এই খালিদ ভাইটা মহা ঝামেলার একটা মানুষ। এই বয়সটা কি সে পাড় করে আসেনি কখনো? যদি সময়টাকে দেখতে পারতো, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করতো জীবনে কখনো মেয়েদের পিছু লেগেছিলো কি না। নাকি ছ্যাকা খেয়েছে বলেই অন্যের ব্যাপার স্যাপার সহ্য হচ্ছে না? বাবার কান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে ঝামেলাময় লোকটা। সাত্তার বাড়ি যাওয়া সে আটকাবে, না? আরও বেশি বেশি যাবে৷ একশোবার যাবে। খালিদ ভাই পারলে আটকে ধরুক, কতক্ষণ ধরে রাখতে পারে! ঘরের ভেতর থেকে পারভীনের গলা শুনেছিলো পরী। সে-ই মাথায় চড়ে বসেছে একদম। বিপু এসে বলার পরও সে কাপড়চোপড় ধুয়ে দিলো না। “নিজের কাজ নিজে করেন” বলেই ছুটিতে গেলো। তার ভাব দেখলে শরীর কিড়মিড় করে উঠে বিপুরও। এই মায়ের আস্কারাতেই বুঝি এমন হয়ে উঠছে দিনদিন! মায়ের পিতৃদেশের মানুষ তো! দূর সম্পর্কের ভাইঝি বলে কথা!

“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ০৫
(নূর নাফিসা)
.
.
সকালে ব্যাগ ভর্তি বড় একটা রুই মাছ আর টাটকা সবজি নিয়ে এলে মজিদার প্রাণ উল্লাসিত হয়ে উঠে যেন! যেখানে সে এক কেজি, দুই কেজি করে চাল সংগ্রহ করে দোকান থেকে। মেয়েটা সেখানে গত পরশু এক বস্তা চাল নিয়ে এলো ঘরে। সে এখানে থাকছে, খাবারটা ক্রমশই বেশি লাগে। কাজেই এতোদিন দুই এক কেজির পরিবর্তে পাঁচ কেজি চালের পলি টানতো। বহুদিন পর ঘরে বস্তা উঠতেই আবেগে আপ্লূত হয়ে পড়েছে মজিদা। মেয়েটা বড্ড ভালো। নিত্যকার আহার ব্যবস্থা চার গুণে ভালো কাটছে তার প্রতিদিন। আজ বাজারের ব্যাগটা হাতে দিতেই আবেগ জড়ানো গলায় বলে,
“এমনেই কাজকাম পাস না, কত্ত পয়সা খরচ করতাছোস?”
“রিজিকের মালিক আল্লাহ। যতদিন সামর্থ্যে কুলাবে, প্রয়োজনে ব্যয় করতে একদম কার্পণ্য করবো না। এইযে আপনি একটু ভালো খেতে পেরে দিনরাত হাসছেন, আমার ভালো লাগছে তো।”
“এক কালে ভাবলে মনডা কয় তুই আমারই না হওয়া মাইয়া। কিন্তু আফসোস, এই রূপ আমার নাই। তাই মাইয়া কইয়া দাবি রাখতে পারি না।”
ঈষৎ হাসি জন্মে শ্রাবণের ঠোঁটে। মজিদা মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
“আল্লাহ তোরে বহু ট্যাকাপয়সা দেক। ভালা একটা কাজের ব্যবস্থা শীঘ্রই কইরা দেক। খালা, তুই আমারে ঘর ভাড়া দেইছ না।”
“কেন? টাকা লাগবে না আপনার?”
“না। ট্যাকা দিয়া আমি কি করমু? এইযে খাইয়া বাঁচতাছি, জীবনকালে এইডাই একমাত্র প্রয়োজন। এইটুক ছাড়া আর ট্যাকার কোনো প্রয়োজন নাই।”
“আচ্ছা, সেটা পরে দেখা যাবে। যান যান, চুলায় আগুন দিন এবার। একটু রান্নাবান্না করে গিন্নি বেশ ধারণ করি।”
“আয়, আয়।”
ছাতা গুটিয়ে পরবর্তী প্রহরটা চুলোর পাশেই কাটিয়ে দেয় শ্রাবণ। বাইরে যখন তখন ধারার গতি বেড়ে উঠে। মজিদার ঘরের কোণে আলগা চুলায় রান্নাবান্না চলে প্রাত্যহিক। একটু সুবিধা পেলেই শুকনো ডাল, পাতা কুড়িয়ে বস্তা জমা করতে ব্যস্ত হয়ে যায় মজিদা। আগুন না পেলে খাবে কি? প্রায়ই সকাল সন্ধ্যা দুই বয়সের রমনীর মধ্যে কতরকম কেচ্ছা কাহিনীর আসর জমে যায়। শ্রাবণ বেশি আগ্রহী হয় মজিদার কিশোরী কালের গল্প শুনতে। তখনকার দিনগুলো কেমন ছিলো, রীতি রেওয়াজ কেমন চলতো, কি ছিলো যা এখন নেই। এসব গল্পই তাকে টানে বেশি। নাশতা সেরেই শ্রাবণ দুয়ারে দাঁড়ায় আকাশপানে তাকিয়ে। আকাশের কি এমন দুঃখ যে দিনরাতই কাঁদতে থাকে? তা ভেবেই হাসি এলিয়ে দেয় ঠোঁটের কোণে। মনের কোণে জন্মায় আফসোস। এইযে, জমিনের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর আয় বন্ধ হয়ে আছে মেঘের অভিমানের কারণে। তার পোষণ ভরন করবে কে? তা নিয়ে একটু ভাবনায় মত্ত থেকে বৃষ্টির গতিতে মনযোগ দেয়। এইতো, ছমছম বৃষ্টির শুরু! খালাম্মাদের উঠুনের মাটি সব পুকুরে গিয়ে জমাট বাঁধতে দেখছে প্রতিনিয়ত চোখের সামনে। ওদিকে ফসলের মাঠও ডুবে যাচ্ছে কিছু কিছু। নিচু জমি গুলো নাকি তলিয়েই যায় বর্ষায়। উঁচুতে কিছু শিরদাঁড়া হয়ে থাকে চাষীদের নিঃস্ব না করে। শ্রাবণ আষাঢ়ের সাথে খেলতে নেমে যায় বিনা পরিকল্পনায়। ওড়নাটায় মাথাসহ ঢেকে মজিদা খালার দুয়ার ছেড়ে ট্যাপা পায়ে ছুটে যায় কান্তাদের বারান্দা ধরার নিমিত্তে। বারান্দায় আশ্রিত হতেই মাথায় হাত দিয়ে দেখে আষাঢ়ে গল্প কতটুকু সিক্ত করে তুলতে পেরেছে শ্রাবণের গল্পকে। অতঃপর ঘরে উঁকি দিয়ে মৃদুস্বরে বলে,
“চাচী, কান্তা কোথায়?”
“হের ঘরেই আছে।”
শ্রাবণ ভেতরে প্রবেশ করে কান্তার রুমে যায়। উদাসিনী কান্তা জানালার কাছে হাঁটু জড়িয়ে বসে বৃষ্টি দেখছে বাইরে। মনটা বড্ড খারাপ। মনের ভারে হাসতেও জানে না শ্রাবণকে দেখে। নির্লিপ্ত চোখ জোড়া কেবল ঘুরে তাকায়।
“মেঘবালিকার মনে এতো মেঘ জমা কেন? মেঘলা দিনে ভুমিতেও মেঘের ঘনঘটা করলে বৃষ্টির অভিমান হবে না বুঝি? সে তো এসেছেই শুষ্কতায় সিক্ততা আনতে।”
“ভিজছো?”
“পুরোপুরি না। ভাবলাম তোমাকে ডেকে যাই। একা ভিজতে মজা নেই।”
“আমার ইচ্ছে করছে না ভিজতে।”
“গোসল করবে না পণ করেছো?”
“ছি! ছি! গোসল ছাড়া আমি থাকতে পারি না। কাজের যত দেরিই হোক। দুই মগ পানি হলেও মাথায় ঢেলে নেই।”
“চলো তবে। দারুণ বৃষ্টি নেমেছে বাইরে। মন ভালো হয়ে যাবে, কথা দিচ্ছি।”
মলিন মুখে হাসি ধরার বৃথা চেষ্টা করে কান্তা।
“হবে না।”
শ্রাবণ হাত টেনে বলে,
“অবশ্যই হবে। মনের মালিন্যতা সব ধুয়ে যাবে। চলো তো।”
শ্রাবণের টানকে আর উপেক্ষা করতে পারে না। তার পছন্দের একজন মানুষ শ্রাবণ। অল্পতেই মিশুক ও হাসিখুশি স্বভাবের। শ্রাবণকে অনুসরণ করে কান্তাও মাথায় ওড়না তুলে নেমে গেছে উঠুনে। রাস্তা থেকে সরাসরি উঠুন দেখা যায় না। নয়তো বোরকা ছাড়া বাড়ির বাইরে পা রাখাও মায়ের কড়া বারণ। পরিপূর্ণ পর্দা হয়তো করতে পারে না, তবে চেষ্টায় রাখে শিরিন। শ্রাবণ তাকে টেনে নিয়ে গেলেও তাই কিছু বলেনি শিরিন। বাড়িতেই তো আছে। তারা নেমে আসতেই ঝপাঝপ বৃষ্টি সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দিতে একদম দেরি করেনি। কান্তা যেন চিন্তামগ্ন হয়ে শ্রাবণের সাথে হাঁটছে। শ্রাবণ তা লক্ষ্য করে বলে,
“এই দেখো কি কান্ড! তুমি বৃষ্টিতে ভিজে তাকেই উপেক্ষা করে মেঘ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছো। এমন মীরজাফরি করলে চলে?”
মলিন মুখে হাসি টানে কান্তা। শ্রাবণ আরও বলে,
“এইতো মীরজাফরের মুখে হাসি। একটা কথা বলো তো আমায়।”
“কি?”
“ভাগ্যের লেখক কে?”
“আল্লাহ।”
“তবে এতো ভাবো কেন ভাগ্য নিয়ে? বিয়ে ঠিক হয়েছে বলেই তো সম্পন্ন হয়ে যায়নি। আল্লাহ চাইলে তুমি ঠেকাবারও কেউ না। আল্লাহ না চাইলে তুমি জোড়া দেওয়ারও কেউ না। ঠিক বলেছি কি?”
“হুম।”
“তবে কেন এই মন খারাপের পাত্তা দেওয়া? আরে মেয়ে, হাসতে শেখো। যা পাওয়ার, তা পেয়েও হাসার চেষ্টা করো। যা হারানোর, তা হারিয়েও হাসো। হারানোকে তোমার জন্য মঙ্গলজনক নই বলে ছেড়ে দিয়েই হাসো। দেখবে, ভালো আছো। শতভাগ ভালো।”
“তুমি এতো হাসিখুশি থাকো কিভাবে?”
“জীবন নিয়ে আফসোস করি না বলে।”
“আমারও ইচ্ছে করছে এভাবে হাসিখুশি থাকতে।”
“আগে আফসোস ছাড়ো। এবার বৃষ্টিকে ধরো। দেখি কতটুকু পারো।”
দুয়ের ফিসফিস আলাপ এখানেই শেষ হয়। এবার তাদের বৃষ্টিকে উপভোগের সময়। দুই হাতের তালু দুইদিকে আকাশমুখী করে দেয় কান্তা। তালুতে পানি জমা হলেই মন খারাপ ঠেলে দিয়ে অজান্তে হঠাৎ এক ঘুরপাক খায় উঠুনে। হঠাৎ দরজার সামনে মাকে দেখে লজ্জায় জ্বিভ কেটে ফেলে। বৃষ্টিতে নেমে নাচানাচি! শ্রাবণও খিলখিলিয়ে হেসে উঠে তার লজ্জা পাওয়া দেখে। কান্তা যে আনন্দে নাচতেও জানে, জানতো না সে। সে তো নাচতে ডেকে আনেনি। ছমছম পায়ে থৈথৈ স্রোতের বাঁধা হয়ে ভিজতে এসেছে। মেয়ে লজ্জা পাওয়ায় শিরিনও ঠোঁট কার্ণিশে হাসি এলিয়ে ভেতরে চলে যায় লজ্জা হতে মুক্তি দিতে। ঝপাঝপ বৃষ্টির শব্দে তাদের কথপোকথন তো শুনেনি কিছু, তবে মেয়ের মনটা খারাপ যাচ্ছে তা চোখে পড়েছিলো। এখন হাসতে দেখে মায়েরও মন জুড়িয়েছে যেন। চলে গেছে সংকোচহীন বৃষ্টি বিলাসের সুযোগ দিয়ে। কিন্তু কান্তা আর দ্বিতীয়বার ঘুরেনি। ক্ষণে ক্ষণেই হাসি পাচ্ছে তারও। কি করলো সে? হঠাৎ বাড়ির প্রবেশদ্বারে ছাতা নজরে পড়তেই আবার হাসির বেগ কমে এলো। বাড়িতে বাইরের মানুষ এসে গেছে, ভেজার সময় শেষ তার। দৌড়ে চলে যায় ঘরে। শ্রাবণও দেখতে পেয়েছে ছাতা মাথায় বিপুকে। তবে দৌড়ে যায়নি। দুই কদম এগিয়েছে বরং। এর বেশি যায়নি, বিপুই এগিয়েছে বলে। বিপু আজ বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেছে। উঠুনের দুই ঘরের মাঝামাঝি অব্দি আসেনি যদিও। তবুও ঘন বৃষ্টিতে তাকে মুচকি হেসে এগোতে দেখে একটু বিস্ময় খেলেছে শ্রাবণের চোখেমুখে। মনে পড়ে গতকালের প্রস্তাব পত্রের কথা। বিপুর হাতে পলিথিন মোড়ানো কিছু আছে। সে এগিয়ে মৃদু গলায় শ্রাবণের উদ্দেশ্যে বলে,
“আপনাকে এই বৃষ্টির মধ্যে পেয়ে যাবো, ভাবিনি। খুব মজা করছিলেন বুঝি?”
“অবশ্যই। কিন্তু আপনি পাগল হলেন কেন এতো বৃষ্টিতে বের হওয়ার?”
“নতুন নতুন প্রেমে পড়লে মানুষ অকারণেই পাগল হয়ে যায়।”
“তাই?”
“হ্যাঁ। এটা রাখুন।”
হাতের মোড়ানো পলিটা এগিয়ে দেয় বিপু।
“কি এটা।”
“আপনার জন্য সামান্য কিছু।”
“সামান্য কিছু কেন? আমি মানুষটা কি এতোই সামান্য?”
“আহ! ধরুন তো। শুরুতে সামান্যই হয় সব। আর আপনি মানুষটা অসামান্যই। ধরুন। বৃষ্টি আমায় ভিজিয়ে দিচ্ছে পুরো।”
শ্রাবণ হাতে নিতেই বিপু অতিরিক্ত কিছু না বলে চলে যেতে ধরে। প্যাকেটটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে শ্রাবণ বাড়ির প্রবেশদ্বারে তাকায়। মুখ টিপে হেসে বিপুকে পিছু ডাকে,
“আতা গাছের তোতা পাখি, এদিকে আসেন।”
বিপু ফিরে আবার এগোয় তার দিকে।
“আপনি এটা কি বললেন?”
“আপনার নাম।”
“এটা আমার নাম না।”
“কিন্তু আমার এটাই ডাকতে ভালো লাগলো। যাইহোক। আপনার চকলেট, ফুল, আর কোক আপনার কাছেই রাখুন। আর আমাকে এর সমমূল্যের অর্থ প্রদান করুন।”
প্যাকেটটা পুনরায় বিপুর হাতে ধরিয়ে দেয় শ্রাবণ। বিপু নিজের হাতে তাকিয়ে থেকে বিস্মিত হয়।
“মানে?”
“মানে হচ্ছে, এইগুলোর পেছনে যা খরচ করেছেন তত টাকা আপনি আমাকে দিয়ে যেতে পারেন।”
“আশ্চর্য! টাকা কেন দিবো? আপনি কি টাকার জন্য প্রেম করবেন?”
“আপনি তবে আমাকে ফুল, চকলেট এগুলো দিচ্ছেন কেন? আমি কি চকলেটের জন্য প্রেম করবো?”
“ফুল চকলেটের সাথে টাকার তুলনা কি? এগুলো তো শখ করে দেওয়া হয়েছে। কিছু উপহার, মন ভালো করার ওষুধ।”
“এই ওষুধে আমার কাজ নেই তো। চকলেট খেলে দাত নষ্ট। ফুল নিলে কালকেই ফেলে দিতে হবে। এই কোকেও আমার মন পড়ে নেই। সবই অহেতুক মনে হচ্ছে৷ তাই টাকা দিলে দেন। টাকাই আমার মন ভালো করার ওষুধ।”
“মহা মুশকিল তো! আমি টাকা আনিনি কোনো।”
“টাকা ছাড়াই প্রেম করতে এসেছেন? প্রেমিকা এখন এই বৃষ্টি বাদলায় বাদাম খাওয়ার আবদার করলে আপনি কোথায় যাবেন? যান, এগুলো যেখানে থেকে কিনেছেন৷ সেখানে ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে আসুন। আমি আপনার জন্য আরেকটু দাড়াচ্ছি এখানে।”
“ধুর! আপনার প্রেম করতে হবে না। লোভী মেয়ে একটা।”
“আমি যদি লোভী হয়ে থাকি, তবে আপনি ছ্যাচড়া। প্রেম কেন করতে আসেন?”
তার আচরণের ক্রমশই বিরক্ত একটা ভাব ফুটাতে চেয়েছে বিপু। তবুও যেন হাসি এসে যেতে চায়। আর কোনো কথা না বাড়িয়ে কপালে সামান্য বিরক্তির ভাব ধরে রাখতে চেষ্টা করে চলে যায় সে। শ্রাবণ মুখে ট্যাপা হাসি বিদ্যমান রেখে দাঁড়িয়েই থাকে। বৃষ্টিতে ভিজে। চোখ বুজে আকাশমুখী হয়ে থাকে। কপালে শিলার মতো আছড়ে পড়ে বৃষ্টির ফোঁটা। অবিরত গড়িয়ে ভিজিয়ে দেয় সর্বাঙ্গ। বৃষ্টি তার বড়ই উপভোগ্য। কাগজের নৌকা হয়ে বৃষ্টিস্রোতে ভেসে যাওয়ার মতোই উপভোগ্য। দূর হতে এক জোড়া চোখে প্রেমের বর্ষন চলে এই বর্ষাকালে। শ্রাবণ আসার আগেই শ্রাবণ ধারা চলছে তার হৃদয়পুরে। মোহিত হয়ে উঠতে উঠতে ছাতার গন্ডি হতে বেরিয়ে এসেছে এবার সে-ও৷ একই প্রহরের বাদলা, তাকেও ভিজিয়ে তুলেছে নিমেষে। বিপু আবার এগিয়ে আসে ভিজতে ভিজতে। ঠোঁটের কার্ণিশে হাসি। মুখে চাপা এক টুকরো চকলেট। সামনে কারো উপস্থিতি আন্দাজ করতেই উপভোগের মুহুর্ত হতে বেরিয়ে আসে শ্রাবণ। চোখ খুলে এবার ভেজা বিপুকে সামনে পায়। মাথার উপর কিংবা হাতে ছাতার উপস্থিতি নেই। ভিজে একাকার।
“এ কি! ছাতা কোথায় গেলো? আপনি দেখি ভেজা কাক হয়ে গেছেন।”
“আপনিও তা-ই হয়েছেন।”
“না তো। আমি ভিজতে নেমেছি। আর আপনি ভিজে গেছেন। তাই আপনি ভেজা কাক।”
“আমিও ভেজার জন্যই ছাতা ফেলে দিয়েছি। ধরুন।”
মুঠোয় চাপা টাকা হস্তান্তর করে শ্রাবণের ভেজা হাতে।
“চলবে?”
“কত দিয়েছেন, আমি কিন্তু দেখিনি। তবুও বলছি, চলবে।”
টাকা মুঠোয় চাপা রেখে মুখ চেপে হাসে শ্রাবণ। বিপুও হাসে। জিজ্ঞেস করে,
“টাকা দিয়ে কি করবেন আপনি?”
“সংসার করবো।”
“সংসার কর্তাই তো তখন সংসারের টাকা দিবে।”
“মেয়েদের হাতে গোপনে কিছু সঞ্চয় রাখতে হয় না? তাই আগেভাগেই জমা করছি।”
“বেশ ভালো। এগুলোও রাখুন। আপনি না খেলে আপনার বোনকে দিবেন। সে আর দাত নষ্ট হওয়ার ভয় করবে না। মাঝে মাঝে উপকারে এগিয়ে আসবে কিছু দিলে।”
“ঠিক আছে। ধন্যবাদ। আবার আসবেন।”
“এলেই কি? বসতেও তো বলেন না।”
“যেদিন এই বাড়ির মেহমান হবেন, সেদিন বসতে বলবো। প্রেম বসে থেকে হয় না। প্রেম হয় লুকোচুরিতে। দৌড়ের উপর থেকে। প্রেমে ভয় করতে হয়। কেউ দেখে ফেলার ভয়। আমারও এখন ভয় করছে। চললাম আমি।”
ফিসফিসিয়ে কথা বলে ঘরের দিকে ছুটে যায় শ্রাবণ। ঠিক শুনতে না পেলেও, কাদায় খালি পায়ে বৃষ্টি স্রোতে তার ছুটে যাওয়ার শব্দ যেন চোখের আলোয় দূর হতেই শোনা যায়। হৃদয়ে কলতান জমা হয়। যেন মনে করতে চাইলেই প্রাণভরে শোনা যাবে। বিপুও ভেজা শরীর হতে শার্ট খুলতে খুলতে রাস্তা ধরে মাঠে যাওয়ার নিমিত্তে। বৃষ্টিতে ভিজেছে যখন, ফুটবল না খেললেই নয়। আজ অন্যরকম খুশি সে। অন্যর মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভীষণ রকম খুশি। এই খুশির সূত্র ধরেই সর্বোচ্চ খুশি হওয়া পর্যন্ত যেন ছুটে যাওয়া হয়, এই প্রত্যাশা বিপুর মনে। প্রেম হোক তবে, গোপনে গোপনে।
দুই হাতে দুই ছাতা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে ইফতেখার দিপু। পারভীন ছেলের দিকে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছে উঠুন পার হওয়া অব্দি। বারান্দায় পা রাখতেই শুধায়,
“দুই হাতে দুই ছাতা নিয়া ভিজে আসার মানে কি?”
“হঠাৎ ভিজতে ইচ্ছে হলো, এ-ই হলো ভেজার রহস্য। আর আসার সময় এই ছাতাটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিপু মাঠে চলে গেলো। এটা দুই ছাতার রহস্য।”
“ভালোই তো। ঘরে ফিরে ফিরে একেকজন আদা চা খাবি। বাইরে গিয়ে ধেইধেই নাচবি আর রহস্য নিয়ে হাজির হবি। জ্বর হইলে মাথায় পানি ঢালতে আমারে ডাকবি না, বলে দিলাম।”
“ঠিক আছে। পরের বার পরীকেই ডেকে নিবো।”
“পরীকে ডাকাও বারন।”
“পানিভর্তি বালতি নিয়ে দিলেই হবে। নিজের মাথায় নিজেই ঢালতে পারবো।”

“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ০৬
(নূর নাফিসা)
.
.
বিকেলে বৃষ্টি কমলে বারান্দায় আসে অর্পা। মাত্রই শিক্ষক পড়ার ছুটি দিয়ে বেরিয়েছে। ঘুম ঘুম পাচ্ছিলো তাই সেও একটু হাওয়া লাগাতে এসেছে চোখেমুখে। এই ঘরের সামনের দিকের দুই প্রান্তে দুইটা মাঝারি আকৃতির গোলাপ গাছ। বেশ কিছু কলি থাকলেও গতকাল একটা ফুল ফুটতে দেখেছিলো। সকালেও দেখে গেছে আরেকটু বড় হয়েছে। এখন বিকেলে এসে পরিপূর্ণ দেখার ইচ্ছেটাই সে করছিলো৷ কিন্তু পরিশূন্য যে দেখতে হবে, তা ভাবেনি। আকস্মিক একটা চিৎকার করে উঠে, “আম্মু…”
পারভীন ছুটে আসে মেয়ে বুঝি পিছলে পড়েছে! পরীও খেতে বসেছিলো। চিৎকারে দৌড়ে এঁটো হাতে ছুটে আসে, চেয়ারম্যান কাকার দুলালী বুঝি কাদামাক্ত হয়েছে! কিন্তু তাকে ফেনা তুলে পরিচ্ছন্ন বেশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দুয়ের উদ্দেশ্যই বৃথা। ইফতেখার ঘুমিয়েছিলো। চিৎকারে তার ঘুমটাও ভেঙেছে। মা মেয়ের চেচামেচি শুনে বেরিয়ে এসে দাঁড়ায় সেও।
“আমার ফুল কই?”
“কিসের ফুল?”
“আমি কালকেও দেখছি গাছে ফুল ফুটেছে। আজকে সকালেও দেখছি। আর এখন নেই।”
“নাই, তা আমি ক্যামনে বলি? আমি কি তোর ফুল খাই? বেদ্দপের বাচ্চা! অযথা চিল্লায়।”
“হু, অযথাই চিল্লাই। তুমি বুঝবা কি? গাছ তো তুমি লাগাওনি। আমার একটা মাত্র ফুল!”
কান্নাভঙ্গি ঠাঁই পায় অর্পার মুখে।
“গাছ লাগাইছোস যখন, কোলে নিয়ে বইসা থাক। ফুল ধরবো না কেউ। আমার সামনে এই ঢং করিস না। তোর বাপের সামনেই করিস।”
“আব্বু তো নেই এখন।”
“আইলেই করিস। ফাজিল কোথাকার!”
হনহনিয়ে ভেতরে চলে যায় পারভীন। শরীরে ঝাঝ কমে না অর্পার। বিরক্ত হয় মায়ের প্রতি। ক্রুদ্ধ চোখে তাকায় পরীর দিকে। পরী তাকে এভাবে তাকাতে দেখে বলে,
“আমার দিকে তাকান ক্যা এম্নে? আমি কি করছি?”
“তুই ছাড়া এই বাড়িতে আর কেউ ফুল ছেঁড়ার লোক নেই। নির্ঘাত তুই চুরি করছিস!”
“আল্লাহ! কি কয়গো! আমি ফুল ছিঁড়তে যামু ক্যা? আমি কি ফুল খাই নাকি?”
“তুই ফুল খাস না। খোপায় দেস। বিনুনিতে গাঁথস। কানের কাছে একটা ফুল দেওয়ার জন্য সারাদিন আমার কাছে, আম্মুর কাছে অনুমতি চাইতে থাকস।”
“তাইলে আপনেই কন, অনুমতি ছাড়া আমি ক্যামনে ফুল ছিঁড়মু? তা-ও আবার আপনের একমাত্র ফুল!”
“অনুমতি পাবি না বলেই চুপিচুপি ছিঁড়ে সারছিস।”
“আল্লাহ! এমন অপবাদ দিলে গজব পড়বো কইলাম। গজব। আমি ফুল তো দূর, একটা পাতা পর্যন্ত ছুইয়্যা দেহি না আজ কত্তদিন! আইছে অপবাদ দিতে!”
ঠমক নেড়ে পরীও চলে যায় ঘরে। তার ঠমকানো গলায় অর্পার সন্দেহ হয় তবে পরী ছিঁড়েনি। তবে কার এমন বদ নজর পড়লো তার গাছটার উপর! এই বাড়িতে ফুল নিয়ে খেলার লোক তো আর নেই। কোনো বাচ্চাও আসেনি। তবে আরেকটু গভীরে সন্দেহ ফেলতে গেলে আরেকজনের উপর কিছুটা অনিশ্চিত সন্দেহ আনতে পারে। অর্পা ফুসতে থাকা গলায় স্বগতোক্তি করে,
“বিপু ভাই ছিঁড়ছে তবে। আসুক না আজ বাড়ি!”
ইফতেখার ক্রমশই বোনের উপর বিরক্ত হয় একটা ফুলের জন্য হাউকাউ শুরু করায়। ফুল তো নয়, যেন কলিজা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে কেউ। যার কলিজা ছিঁড়ে বদলা নেওয়া পর্যন্ত শান্তি হবে না তার। সে পুনরায় এসে বিছানায় পড়ে উপুড় হয়ে। মায়ের হাড়ি পাতিলের ঠকঠক শব্দও ঘুম কেড়ে নিচ্ছে এবার। উঠেই যেতে হবে তবে। তবুও অলসতার ভারে একটু শুয়ে থাকা।
সন্ধ্যায় বিপু বাড়ি ফিরতেই পরীর সাথে বারান্দায় দেখা। কাপড়চোপড় গুটিয়ে নিচ্ছে সে।
“ভাইজান, আইছেন?”
“কেন?”
“খাইয়া দাইয়া তাত্তাড়ি ঘুমায় থাকেন কাকায় ফেরার আগে আগে। নইলে কপালে শনি আছে।”
“শনি মানে?”
“আপনে আপার গাছের ফুল ছিঁড়ছেন না? ফুইল্লা রইছে বেডি। কাকায় আইলেই তো বিচার দিয়ে সারবো। বাপের সামনে যেই কান্দা কান্দে আমাগো কলি আপায়।”
“হোপ! আমি ফুল ছিঁড়তে যাবো কেন অযথা!”
“আল্লাহ! কয় কি! তাইলে কি ভুত আইছে বাড়িত!”
ভ্রু কুচকে ধমক দিয়ে চলে যায় বিপু। পরীর স্বগতোক্তিতে কান দেয় না। সে ভুলেই গিয়েছিলো ফুলের কথা। তবে ঘরে যেতে যেতে মনে পড়ে গেছে। আরে, ফুল তো সে-ই ছিঁড়ে নিয়েছিলো! ঘুরাফেরায় মেতে আর খেয়ালই ছিলো না। তাই আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে যায় অর্পার মুখোমুখি হওয়ার। এবং নিজেই এগিয়ে যায় অর্পার ঘরে,
“হয়েছে কি অর্পা, আমি…”
কথা শেষ করতে দেয় না বিপুকে। অর্পা আবার গলা উঁচু করেছে তাকে দেখতেই।
“আমার গাছের ফুল ছিঁড়ছো কেন?”
“আরে কথা শুন আগে। ফুলের গল্প বলে যেতে ভুলে গেছি তোকে।”
“আমি কোনো গল্প শুনবো না। আমার ফুল চাই। গাছে ফোটা ফুল।”
পাশের রুম হতে তার উঁচু গলা শুনে ইফতেখার ধমক দেয়,
“অর্পা, সামান্য বিষয়ে বাড়াবাড়ি করছো কিন্তু!”
এদিকে বিপু ব্যস্ত গল্প বলতে থাকে,
“ওই ফুলটায় ইয়া বড় এক বিছু ছিলো, জানিস? আমি তো জানি অর্পা গিয়ে ফুল ছুঁয়ে দেখে বারবার। যদি হঠাৎ বিছুতে হাত দিয়ে দিস! বিছু একটা কামড়ও দিয়ে ফেললো! কি ভয়ংকর ব্যাপার! বিছুটা বংশ বিস্তার করলেও তো তোর প্রত্যেক ফুলেই বাসা বাঁধবে। তাই ছিঁড়ে ফেলে দিছি।”
“কিহ! গাছে বিছু এলো কোত্থেকে!”
“তবে কি আকাশে থাকার কথা? বিছু তো গাছেই থাকে বলদি। লাল লাল, কালো কালো ডোরাকাটা শিং ওয়ালা বিছু।”
শুনতেই কেমন গায়ের লোম দাঁড়িয়ে উঠে অর্পার। গা শিরশির অনুভূতিতে দুহাত নেড়ে থামতে বলে বিপুকে। আর শুনবে না সে।
“ওফ্ফ! চুপ করো। চুপ করো।”
“ফুলের জন্য মন খারাপ করিস না। অনেকগুলো কলি দেখছি আমি। কাল নাহয় পরশুই ফুটে যাবে আবার।”
“যেই গাছে বিছু থাকে। ওই গাছই রাখবো না আমি। কালকেই উঠিয়ে ফেলতে বলবো বকুল কাকাকে।”
“আরে না। বিছু তো একটাই দেখেছি। কোথাও হতে এসেছিলো হয়তো। আরও দেখলে, পরে কাটিস।”
পরবর্তী দিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতেই দুপুরে বেরিয়েছিলো শ্রাবণ। কাদায় বারবার হাটাহাটি করে পায়ের জুতোটা ছিঁড়ে গেছে। কান্তার কাছ থেকে এক জোড়া পরে এসেছে নিজের জন্য জুতো কিনে নিয়ে যেতে। টানা বর্ষনে রাস্তার বালি সরে গেছে ইটের তলা হতে। কোথাও কোথাও ইটও নেমে গেছে আষাঢ়ে ঢলে। পুনরায় ঠিক করা হচ্ছে। শ্রাবণ বাজার ছুঁতেই হঠাৎ চেচামেচি শুনতে পায় রাস্তার বিপরীত পাশে বাজারের মাঝামাঝি। সেদিকে তাকিয়ে বিপুকে দেখতে পায় সে। কেমন চোখ বড় করে ক্রুদ্ধ গলায় শাসিয়ে ফরমায়েশ করছে তারই সমপ্রায় বয়সের এক ছেলেকে। ছেলেটা বলছে, সে করবে না। কি উল্টানোর উল্টাক! তাতেই যেন এমন রগরগে হয়ে যাওয়া পরিবেশ। বিপু বিঘ্ন মেজাজে যাচ্ছে তাকে প্রহার করতে। অন্যান্য দুচারজন থামানোর চেষ্টায় মত্ত। এই বিপুকে একদম ভালো লাগলো না শ্রাবণের কাছে। তার সম্মুখে আগেরবার উপস্থিত থাকা ছেলেটা ভালো ছিলো। আর এটা, খালাম্মার মুখে শোনা হাঙ্গামা তৈরির লোক। কি দরকার অল্পতে এমন উত্তেজিত হয়ে পড়া? যে কাজটা সেই লোক করছে না, সেটা অন্যকে দিয়ে করিয়ে নেক। যদিও অপরিচিত লোকটার প্রতিও সে বিরক্ত। কেমন খেমটা মেজাজে ঘাউড়ামি করে যাচ্ছে। এই যে, চেয়ারম্যানের ছেলেপুলেরা যদি তাকে একত্রে ধরে। সে কি ছুটতে পারবে? উভয় পক্ষের অবস্থাই ভেজালযুক্ত। পাশের লোকেরা তাকে তাড়িয়ে দিতেই বিপু শান্ত হতে থাকে। কত বড় স্পর্ধা, তা-ই মাপে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে। বাজারের পরিস্থিতি রগরগে হতেও সময় নেয় না, আবার ঘটনা যা ঘটার হুটহাট ঘটে কিছুক্ষণের মধ্যেই শান্ত হয়ে উঠে। বিপুর ব্যাপারটা অপছন্দনীয় হওয়ায় শ্রাবণ ভ্রু মাঝে সুক্ষ্ম ভাজ ফেলে পুনরায় হাঁটতে থাকে গন্তব্যের পথে। দামে কম, মানে ভালো জুতা খোঁজে দোকানে চোখ বুলিয়ে। ঘরে বাইরে সবসময় ব্যবহার করার মতো জুতা কিনতে হবে তার। যা বৃষ্টি! পানির ব্যাপারটাও মাথায় রাখতে হবে। অতিরিক্ত খরচাও যেন না যায়। দুই দোকান ঘুরে পছন্দসই এক জোড়া জুতা কিনে পায়ে দেয় শ্রাবণ। কান্তার জুতাটা তুলে রাখে নতুন জুতার ব্যাগে। পরক্ষণেই হাঁটতে থাকে একাকী পথে। ইচ্ছে হয় বালির চড়ে হেঁটে আসতে। কেমন হয়, ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে নিজেকে বিলিয়ে দিলে? বালির মাঠে পা দিতেই মাথা হতে ছাতাটা সরিয়ে নেয় শ্রাবণ। গুটিয়ে রাখে হাতের মুঠোয়। বাতাসের ধাক্কায় মুখে এসে বিন্দু বিন্দু জমা হচ্ছে। বড্ড ভালো লাগছে শ্রাবণের। মন শীতল করা অনুভূতি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটায় মাথা ভিজবে না ঠিক, তবে মাথার উপর ওড়নাটা ভিজে যাবে নিশ্চিত। শ্রাবণ আজও এসে কাশবনের ধারে দাঁড়িয়েছে। যদিও নিচের কাশবন এসে তাকে ছুঁতে পারেনি। তবুও তাদের হেলেদুলে উঠা পরশ তার মন ছুঁয়ে নিয়েছে। মাথায় তাদের শুভ্র মেঘের অপেক্ষা। অপেক্ষা এক শুভ্র শরৎতের। বেশি ভিজে যাচ্ছে মনে হতেই পুনরায় মাথায় ছাতা তোলে শ্রাবণ। ফেরার পথে হঠাৎ সামনে উদয় হয় বিপু।
“নদী দেখছিলেন?”
“জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখছিলাম।”
“নদীর মতো আপনার জীবন?”
“শুধু আমার কেন? আপনার নয় কি?”
“কি জানি! হয়তো বা হ্যাঁ। নয়তোবা না।”
“পড়াশোনা করেন না আপনি? নাকি শেষ?”
“শেষ হওয়ার আগেই শেষ।”
“কতটুকু?”
“ডিগ্রি পাশ করছি কোনোমত ঠেলে ধাক্কিয়ে।”
“কম আর কি? যথেষ্ট হয়েছে।”
“এইটুকুও করতাম না। মা বলতো, পড়লে পড়। আজকাল পড়াশোনা না করলে নাকি বউ পাওয়া যায় না। সবদিকে শিক্ষিতের ছড়াছড়ি।”
ঈষৎ হাসে শ্রাবণ।
“মন্দ বলেননি তিনি। আসলেই তাই। হয়তোবা গ্রামে একটু কম৷ শহরে প্রচুর ছড়াছড়ি।”
“আপনি কোথায় পড়েছেন?”
“শহরে।”
“পড়া শেষ?”
“যতটুকু হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।”
“আপনাদের বাসা কোথায়?”
“আমার কোনো বাসাবাড়ি নেই।”
“বড় হয়েছেন কোথায়?”
“নানা বাড়িতে। শহরেই নানা ভাড়া থাকতো।”
“আপনার বাবা মা কবে থেকে নেই?”
“ওসব নিয়ে ভাবতে গেলে আমার মন বড্ড খারাপ হয়ে যায়। অতীত জীবন অপছন্দের। আমার বর্তমান পরিচয় আমিই। এরবেশি আর না বলি। মন খারাপ রাখা আমার একদম ভালো লাগে না।”
“স্যরি।”
“আপনি এই যে আমার সাথে কথা বলছেন, কি নম্র ভদ্র শান্ত প্রশান্ত একটা ছেলে মনে হচ্ছে। অথচ একটু আগে বাজারে দেখলাম, কি নিয়ে একটু ঘাড়ামো করছিলো একজন। ক্ষেপে যাচ্ছিলেন তাকে মারতে। কি বিশ্রী লাগছিলো তখন আপনাকে, জানেন? ওই রূপটা তো ভালো দেখায় না।”
“মেজাজ সবারই কম বেশি গরম হয়। আর তা কারণবশতই হয়। আপনার হয় না?”
“হলেও কিছু মানুষ হাসিতে মেজাজকে হার মানাতে জানে। কেউবা নিরবে ঠান্ডা হতে জানে। অতি তীক্ষ্ণতাও সবর করতে জানে কেউ। আর তারাই মহান হয়।”
“হয়তো বা।”
“আপনার ধৈর্য্য শক্তি একদম কম। এমন হলে জীবনে সৌন্দর্যের চেয়ে বিপদজনক পরিবেশই বেশি দেখবেন। উত্তেজিত হয়ে পড়া মানুষের কাছে সুখ কম আসে। অভ্যাস বাদ দেন।”
“সবসময় হয় না সবকিছু। তবুও চেষ্টা করবো। এখন শীঘ্রই আমায় জবাব দেন।”
“কিসের জবাব?”
“ভুলে গেছেন? প্রস্তাবিত পত্রের জবাব। একদম এড়ানোর চেষ্টা করবেন না। তাড়াতাড়ি দিন।”
“এইযে, দেখেন৷ আপনার মধ্যে বদভ্যাস বাদ দেওয়ার চেষ্টাটুকুও নেই৷ জবাব পাওয়ার ধৈর্য্যও হারিয়ে বসেছেন। দেখেছেন?”
“আপনি অনেক প্যাচি একটা মানুষ।”
“প্যাচি আবার কি?”
“এই যে, কথা প্যাচাতে থাকেন।”
“ও, আচ্ছা। কথার প্যাচওয়ালী।”
“হ্যাঁ, তাই। আমায় কি জবাবহীন তাড়িয়ে দিবেন?”
“একদম না।”
একটু থামে শ্রাবণ। পরক্ষণে বলতে থাকে,
“আসলে আমি খুব ভেবে দেখলাম, এসব প্রেম টেম কিছুই না।”
“শুরুতেই যদি কিছুই না ভেবে ছুড়ে ফেলেন, তবে কিছুটা হবে কিভাবে?”
“না, না। ঠিক তা না। প্রেম অবশ্যই অতি সম্মানের একটা বিষয় যা সম্মানিত কোনো ব্যক্তির পাওয়া উচিত, সম্মানিত কোনো সম্পর্কেই হওয়া উচিত। দু চার দিন প্রেমে জড়িয়ে থাকলাম, এরপর ভালো লাগছে না তাই ব্রেকাপ করে শেষ করে দিলাম। ভালো লাগলো তো আরেকটু মায়া বাড়ালাম। ভালো লাগছে না তাই পুনরায় ব্রেকাপ টেনে আনলাম। ভেবে দেখলাম, এই জীবনটা না আসলে সম্পূর্ণই অহেতুক। অহেতুক সময় নষ্ট, অহেতুক মায়া জড়ানো, অহেতুক গুরুত্ব দেওয়া। যার কোনো ভিত্তিই নেই।”
“তার মানে আপনি চাইছেন না প্রেম করতে।”
“অবশ্যই করবো। তবে ভিত্তিমূলক সম্পর্কে। বিয়ের পর বরের সাথে। যেখানে কোনো সংশয় আর অনিশ্চয়তার উপস্থিতি থাকবে না। এই অহেতুকি প্রেম আমায় দিয়ে হবে না।”
“ধুর! বিয়ের পর তো সংসারের মজা। প্রেমের মজা যত বিয়ের আগেই।”
“সেটাও অহেতুকি।”
“একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে না জেনে বিয়েই করবে কেন? প্রেমে জড়িয়ে থাকলেই না একে অপরকে জানবে, বুঝবে, তারপর সিদ্ধান্ত নিবে একটা মজবুত বন্ধনের।”
“আরে, এইখানেই তো আসল মজা। দুজন অপরিচিত মানুষের মধ্যে আকস্মিক একটা বন্ধন। অদ্ভুত একটা পরিচয়। একটা পবিত্রতা। ধীরে ধীরে একে অপরকে জানা। নিজেদের জন্যই জানা। নিজেদের মতো সংসার গুছিয়ে নেওয়া। দুষ্ট মিষ্টি গল্প তৈরি করা৷ তৃতীয় ব্যক্তির চোখে পড়ার ভয় নেই, কটুক্তির কারণ নেই। পছন্দটা শুরু থেকেই মজবুতভাবে গড়ে তোলা। চাইলেই ছুঁতে পারা, কাছ থেকে একে অপরকে চোখে চোখে রাখা। এরচেয়ে সুন্দর কিছু হয়? ওই দূর হতে মাথার উপর বালিশ চেপে ফোনে হাই, হ্যালো করা। দীর্ঘদিন অন্তর দেখা করা। তা-ও লোকভয় নিয়ে! ওফ্ফ! না না। আমার দ্বারা তা হবে না। জীবন আমার বড় হিসেব করে চলে। আমার প্রেমটুকু আমি একান্তই আমার মানুষটার জন্য তুলে রাখবো। অহেতুক সময় নষ্ট করতে ক্ষণস্থায়ী মায়ায় নিজেকে একদম জড়াবো না।”
গলায় হতাশা চেপে বিপু বললো,
“মিথ্যে আশা দিলেন?”
“আমি তো সম্মতিই দেইনি। মিথ্যে আশা কিভাবে দিলাম?”
“না, মানে আমার আশাটা মিথ্যে হয়ে গেলো আরকি।”
“আপনার জন্য সমবেদনা। কিন্তু আমার ডিসিশন ফাইনাল।”
“আরে ভাই, প্রেম দু চারদিনের জন্য কেন করবেন? প্রেম তো বিয়ের জন্যই করবেন।”
“এরপর বিয়েটা কোনো কারণে না হলে? মানসিকভাবে আমি তীব্র আঘাত পেলে? আমার হয়ে তখন গলায় ফাঁস দিবে কে? আপনি?”
ভাবুক ভঙ্গিতে মাথা চুলকায় বিপু। যেখানে নিজের খুঁটিই পোক্ত নয়, সেখানে তাকে আশ্বাস দিবে কি করে? হতাশাগ্রস্ত হয়ে পায়ের গতি ধীর করে ফেলে। শ্রাবণ স্বাভাবিক গতি বজায় রেখেই নিজের পথ ধরে।