শ্রাবণধারা পর্ব-৬৪+৬৫+৬৬

0
86

“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ৬৪
(নূর নাফিসা)
.
.
আফজাল হোসেন হাঁড়ি আলাদা করতে সায় দেয়নি। বরং বলে দিলেন, পারভীনের যদি এতোই ইচ্ছে হয় একত্রে রান্না ভাত না খাওয়ার। তবে সে আলাদা হাঁড়িতে আলাদাভাবে রান্না করে খেতে পারে। কিন্তু সংসার ভাগ কোনোমতেই হবে না। তাই হাত পা গুটিয়েই বসে আছে পারভীন। যেখানে ভোর হলেই রান্নাঘরে পাওয়া যায় তাকে, সেখানে আজ সকাল আটটা বাজতে চলেছে, কিন্তু রান্নাঘরে ছায়াও ফেলেনি সে। ঘর থেকে বের হতেই দেখেনি শ্রাবণ। আফজাল হোসেন পরীকে ডেকে কিছুক্ষণ আগে চা চেয়েছেন। পরী চা করে এনে দিয়েই শ্রাবণের দরজায় নক করে। ইফতেখার এখনো ঘুমালেও শ্রাবণের ঘুম ভেঙেছে ভোরেই। একবার উঠুনে, একবার ছাদে গিয়ে হেঁটেও এসেছে শান্ত পরিবেশের সতেজতায়। পরী হয়তো দেখেনি, কিন্তু শ্রাবণ ছাদে থাকাকালে দেখেছে পরীর ঘুম ভেঙেছে। ঢুলতে ঢুলতে পুরাতন ঘরের তালা খুলেছে। ইফতেখারের ঘুমে ব্যাঘাত হবে তাই সে গলা ছেড়ে সাড়া দেয় না দরজার কড়া নাড়ায়। দরজা খুলে বেরিয়ে দেখে পরী।
“কী ব্যাপার পরী? কিছু বলবে?”
ফিসফিস করে পরী,
“হু। আম্মায় তো আজ রান্না করবো না, ভাবিজান। কাকায় কইলো আপনে রান্নাবান্না করতেন। কী কী কাটা লাগবো, কন আমারে। কইরা দেই।”
“কেন রান্না করবে না আম্মা?”
“ওইযে, কারণ তো একটাই। গাল ফুলি মাইরা বইসা রইছে।”
শ্রাবণ একবার চাপিয়ে রাখা দরজায় তাকায়। পরক্ষণে পরীর দিকে তাকিয়ে সুস্পষ্ট গলায় সিদ্ধান্ত বর্তায়, যা আফজাল হোসেনের রুম হতে স্পষ্ট শোনা যাবে।
“আম্মা রান্না না করলে আজ রান্নাই হবে না, পরী। সবাই উপোস করো।”
“এইডা কী কন!”
পরী আবারও ফিসফিস করে। শ্রাবণ একই ধারায় সুস্পষ্ট জবাব দেয়,
“জ্বি, হবে না।”
এমনি আফজাল হোসেন দরজা খুলে মুখোমুখি হয় শ্রাবণের।
“তোমার আম্মার করা লাগবো না। তুমিই যাও।”
“আমি গেলে তো সেই রান্না আম্মা খাবে না। একজন না খেলে আমার রান্নাটা সার্থকও হবে না, বাকিরাও তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারবে না। আম্মা যেহেতু রাগ করেছেই, আমিও রান্না করতে যাবো না। আম্মা গেলেই আমি উনার আগেপিছে কাজ এগিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি। নয়তো চুলায় আগুন ধরানোরই প্রয়োজন নেই। সংসারে এমনি যথেষ্ট আগুন ধরে আছে।”
“না গেলে আর কী করার? না খাইয়াই থাকো সব।”
পরক্ষণে রুমে ফিরতে ফিরতে পারভীনকে বলে,
“শুনলা তো?”
পারভীন বলে না কিছুই। তার কিছু বলার কিংবা করার নেই। সব ছেড়ে দিয়েছে সে। পরী মাঝপথ থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে,
“ধুর! আগে জানলে আজানের আগে উইঠ্যা এক লোকমা গিলা রোজা থাকতাম!”
শ্রাবণ মুচকি হেসে রুমে ফিরে দেখে ইফতেখার সজাগ। তাদের কথা শুনেই ঘুম ভেঙে গেছে তার। তাকিয়ে আছে শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ বলে,
“কাল রাতেও ভাত খেলেন না রাগ করে। আর আজ তো রান্নাই হবে না, খাবেন কী এবার? উঠে বাজারে গিয়ে দেখুন, পরটা পাওয়া যায় কি না। নয়তো সব উপোস।”
ইফতেখার মায়ের রাগের উপর বিরক্ত হয়ে সিলিংয়ে তাকায়। পরী ওদিকে বারান্দা দিয়ে ডাকছে শ্রাবণকে। শ্রাবণ এগিয়ে গেলেই বলে,
“রাইতে ভাতে পানি ঢালছিলাম, ভাবি। পান্তাভাত আমি খাইয়া ফেলি। আপনেগো খবর আপনেরা জানেন। রাগারাগি দিয়া আমার পেট ভরবো না।”
শ্রাবণ মুচকি হেসে বলে,
“যাও। খেয়ে নাও যা আছে।”
“কাকার জন্য দুইটা রুটিই করতেন? ওষুধ খাওয়া লাগবো না নাশতা কইরা? পানিটা তো আমি আন্দাজ করতে পারি না। আপনে গোলাটা কইরা দিয়া যান। আমি বানায় দেই।”
“লাগবে না। তুমি ভাত খেয়ে নাও। আমি কিনে আনাচ্ছি রুটি।”
পরক্ষণে ফিরে এসে আবার ইফতেখারের মনোযোগ টেনে নেয়।
“কী গো? যান না একটু। আব্বার নাশতার সময় হয়ে এসেছে।”
মলিন মুখে উঠে বসে ইফতেখার।
“বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে কেন? তুমি রান্না করলে কী হয়?”
“আম্মার রাগ ভাঙুক আগে।”
“রাগ এমনি ভাঙবে। দুয়েকদিন যাক। আব্বা বলেছে না, তো তুমিই রান্না করো গিয়ে।”
“দুপুরে করবো। এখন নাশতা নিয়ে আসুন আগে।”
সকালের নাশতা হয় পরটা। সবাইকে পরটা নাশতা করতে দিয়ে শ্রাবণ নিজ হাতেই পারভীনের জন্য পরটা নিয়ে যায়। এবং এ-ও বলে আসে, “দুপুরেও না জানি পরটাই কিনে আনতে হয়, আম্মা। নাশতা করে নিন।”
হয়তো একটা ধমক মেরে তাড়াতেন পারভীন। কিন্তু আফজাল হোসেন সামনে থাকায় দেননি। একইভাবে বসে আছেন। শ্রাবণ চলে গেলে আফজাল হোসেন বলেন,
“খাইয়া নেও, পারভীন। ছেলের বউয়ের উপর রাগ কইরো না। বুদ্ধিমতী সংসারে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।”
“আপনার ভাগ্য খুলছে, আপনিই খান। বইসা বইসা তামাশা দেখতে আপনার মজাই লাগছে। আমার এতো মজা নাই। নির্লজ্জ মেয়েদের ছেলের বউ মানতে আমারই লজ্জা লাগে।”
“নির্লজ্জ বইলো না। বেশ লজ্জাশীল আর আত্মসম্মান সম্পন্ন মেয়ে এইটা। তুমি তারে চেনো নাই।”
“আর কত চেনা বাকি? আর কত চিনতে বলেন? নির্লজ্জ না হইলেই দৌড় দিয়া শ্বশুর বাড়ি উঠে? ভালো ঘরের মেয়ের কোনোদিন এমন বেহায়ার মতো ঠাঁই নিতো না।”
“সে তো আসে নাই। আমিই নিয়ে আসছি।”
“আপনে!”
.
দুপুরে শ্রাবণই চুলের গোছা খোপায় বেঁধে আঁচল গুজেছে কোমড়ে। রান্না বসিয়েছে এই কড়া রোদের ঝলকে। গরমে ঘেমে একাকার। ইফতেখার গোসলের জন্য কাজে বিরতি নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। গোসলে যাওয়ার আগে শ্রাবণের গলা শুনে রান্নাঘরে উঁকি দেয়। পরীকে পুঁইশাক ধুয়ে দিতে বলছে ঝটপট। এটা হলেই তার রান্না শেষ। এরইমধ্যে দরজায় দাঁড়িয়ে ইফতেখার প্রশংসা ঢালে,
“দায়িত্ব নিয়ে নিলে তবে? সুন্দর লাগছে দেখতে।”
শ্রাবণ ঘাড় ঘুরিয়ে এদিকে তাকাতেই ওদিকে পরী প্রত্যুত্তর করে,
“ভাইজান যে কী কন! ভাবি কীজন্য সুন্দর হইতে যাইবো! সুন্দরী কইবেন, সুন্দরী।”
“সে যা-ই হোক। রান্নাটা প্রতিদিন তুমিই করো নাহয়। মাকে একটু আরাম করার সুযোগ দাও।”
শ্রাবণ কাজে মনোযোগ দিয়ে প্রত্যুত্তরে বলে,
“আম্মা দায়িত্ব অর্পণ করলে প্রতিদিনই করবো। সমস্যা নেই। তবে বেশি কথা না বলে এবার ছোট ভাইয়ের বউ নিয়ে আসুন। রাগ ভেঙে যেন একত্রেই পুত্রবধূদের হাতে দায়িত্ব অর্পণ করতে পারেন।”
“পান্তা চাইলে নুনের প্রস্তাব! এক ঝামেলাই শেষ হচ্ছে না, তুমি আরেক দাবিদার!”
কথা বলতে বলতে হাত বাড়িয়ে ফ্যানের সুইচটা অন করে দিয়েছে ইফতেখার। শ্রাবণ পিছু ফিরে বলে,
“আবার ফ্যান অন করে কে!”
“ঘেমে তো ভিজে গেছো একেবারে।”
শ্রাবণ এগিয়ে এসে নিজেই সুইচ অফ করে দেয়।
“ফ্যানের গরম বাতাসে আরও অশান্তি। আপনি আপনার কাজে যান।”
ইফতেখারের পিছুই ওদিকে বিপুর দেখা পায় তাদের পুরাতন রুমটায় যেতে। স্কুল থেকে ফিরেছে এক বান্ডেল খাতা হাতে। শ্রাবণ ডেকে বলে,
“বিপু ভাই, দাওয়াত তো পেলামই না। মিষ্টি খাওয়াবেন কবে? নাকি গলার কাছে ছুরি চালাতে হবে?”
ঘাড় ঘুরিয়ে একবার পিছু দেখে নেয় ইফতেখারও। বিপু মৃদু হেসে জবাব দিয়ে যায়,
“আয়োজন করেন আগে। মিষ্টি এমনি চলে আসবে।”
“কী ঠ্যাকা আমার! দাওয়াতই পেলাম না। আবার আয়োজন!”
পরক্ষণে গলা নামিয়ে পাশে থাকা ইফতেখারকে বলে,
“আপনার বিয়েতেও তো মিষ্টি পাইনি।”
“খাওয়াইনি?”
“মনে পড়ছে না তো! কী, পরী? মিষ্টি পেয়েছিলে?”
“কই! না তো। সব কিপ্টা গো, ভাবি। দুই ভাইয়ের কাছে চকলেট পাওয়াই নাকানিচুবানি খাওয়ার ব্যাপার। মিষ্টি পাওয়া তো বিলাসিতাই।”
“আবার বিলাসিতাও বুঝো!”
“আপায় কয় কথায় কথায়। আমিও তাই অভ্যাসে ধইরা নিছি।”
হাতের গামছা গলায় ঝুলিয়ে ইফতেখার কেটে পড়ে এখান থেকে।
“মাথায় পানি ঢালি গিয়ে। তোমাদের বকবকে আরও গরম লাগছে।”
শ্রাবণ পিছু বলে দেয়,
“নতুন ব্যবসায়ের মিষ্টিও পাইনি।”
পারভীনকে গোসলের সময় একটু বের হতে দেখা গেছে। কিছুক্ষণ পরেই পরীকে দিয়ে খাবার পাঠিয়ে দিয়েছে তার ঘরে। দুই ভাই নিজেদের মতো খেয়ে বেরিয়ে গেছে যার যার কাজে। আফজাল হোসেন একটু দেরি করেই বাড়ি ফিরেছে যোহর বাদ। তাই দুপুরের খাবারটাও একটু দেরিতে খাওয়া। বলতে গেলে সবার শেষে। খেতে বসেছেন তার পুরাতন ঘরটায়। মূলত এখানেই খাওয়াদাওয়া হয়। শ্রাবণ নিজেই থালা বাটি এগিয়ে দিচ্ছে একে একে। ভাতে হাত দিয়ে আফজাল হোসেন জিজ্ঞেস করেন,
“তোমার আম্মা খাইছে?”
“জানি না। খাবার পাঠিয়েছিলাম অনেকক্ষণ আগে। যাওয়া হয়নি ওই ঘরে।”
“রাগ কমলে খাইবোনে আপনাপনি। উল্টাপাল্টা কইলে মনে ধইরো না। রান্নাবান্না করতে থাকো পরীকে সাথে নিয়া।”
“পরীকে কেন, আব্বা? পরী তো পরীর কাজ করছেই। এইটুকু কাজ কী ছেলের বউদের দিয়ে করালেই হয় না? ছোট জনকে আনছেন না কেন অযথা?”
সুযোগে কোপ মারে শ্রাবণ। লোকমা মুখে নিয়েও চোখ তুলে তাকায় আফজাল হোসেন। পরক্ষণে থালায় মনোযোগ দিয়েই শান্ত গলায় জানতে চায়,
“কার কথা কও?”
“আমার পরে কান্তা ছাড়া আর কে আছে? আমি নাহয় নতুন জানি। পাড়ার লোক তো আর নতুন জানছে না। নানান দিকে নানান কথাই উঠছে আগে পিছে।”
“ওসবে ফিরা তাকাইয়ো না। কাহিনী কম হয় নাই। জঘন্য কাহিনী করছে।”
“জঘন্য কাহিনীর দায়টা কিন্তু আপনার পরিবারেরই।”
“জানোয়ার পুষেই সম্মান নিয়া আজ ভারি টানাটানি।”
“গালি দিয়েন না আব্বা। সন্তানদের গালি দিলে তো সেটা নিজের গায়েই ফিরে আসে। বলুন? কী আর করবেন এখন। আপনার রক্ত তো। তাই আপনার মতো একই ভুল আপনার সন্তানও করে বসেছে।”
মর্মে আঘাত হানে আফজাল হোসেনের। খাওয়ায় বিরতি নিয়ে আবারও তাকায় শ্রাবণের দিকে। মনে আঘাত লেগেছে, শ্রাবণ বুঝতে পেরেছে সেই চোখ দেখেই। কিন্তু চোখের গহ্বরে কোনো রাগের উত্তোলন দেখেনি তার বিপরীতে। শ্রাবণ মুখে মুচকি হাসি টেনে বলে,
“ভুলের গাঢ়ত্ব আর না বাড়ালেই ভালো, আব্বা। একই বাড়ির আরেকটা নারীর সাথে একই ভুল আবার করবেন না যেন। সময় থাকতে নিয়ে আসুন। সমাজে আপনার পদমর্যাদার সময়ও কিন্তু দিন দিন কমে আসছে। সম্মুখে গালি খাওয়ার আগে অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া উত্তম।”
থমথমে মুখে থালায় তাকায় আফজাল হোসেন। শ্রাবণ নিশ্বাস ফেলে বলে,
“যাই, আম্মা খেয়েছেন কি না দেখে আসি। আপনার কিছু লাগবে কোনো, আব্বা?”
“উহুম।”
জবাবে মাথাও দু’দিকে নেড়ে ভাত তরকারিতে মাখাতে থাকে আফজাল হোসেন। শ্রাবণ দুই কদম এগিয়ে গেলেই পিছু বলেন,
“কথার মতো রান্নাও বেশ ভালো জানো। শরীফ আহমেদের মেয়েই তো, তুমি?”
হুট করেই পিছু ফিরে তাকায় শ্রাবণ। শক্ত চোখ জোড়া উত্তপ্ততার সাথে দেখে যায় আফজাল হোসেনের শান্ত চোখের দিকে। কয়েক সেকেন্ড আগেও থমথমে থাকা মুখটায় যেন ভারি স্বস্তিকর এক ছাপ ভেসে আছে আফজাল হোসেনের। অথচ শ্রাবণ চোখে দগ্ধ বিস্ফোরণ ঘটানোর উল্লাস!

“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ৬৫
(নূর নাফিসা)
.
.
শ্রাবণকে এতোদিনে চিনে উঠতে পেরেছে তবে? যে দুই কদম এগিয়েছিলো, তা পুনরায় অতিক্রম করে পিছু আসে শ্রাবণ। চোখের মতো গলার স্বরও শক্ত হয়ে উঠেছে যেন। আফজাল হোসেনকে প্রশ্ন করে,
“মনে আছে তবে শরীফ আহমেদকে?”
আফজাল হোসেন হাস্যোজ্জ্বল মুখে উত্তর করার চেষ্টা করে,
“মনে থাকবো না ক্যা? ভালো বন্ধু ছিলাম আমরা।”
“তাই? কিন্তু আমি তো জানি, স্বার্থের কাছে কখনো ভালো বলে কিছু থাকে না।”
“যোগাযোগ না থাকলে মানুষ এমনি হারায় যায়। স্বার্থ লাগে না। তা কেমন আছে তোমার আব্বা আম্মা?”
“প্রশ্নটা যদি আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে আপনি নিজেকেই করতেন, হয়তো ভালোই দেখতেন। ত্রিশ-ই আর কেন! পনেরো, বিশ বছর আগেও যদি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যেতেন; সুন্দর একটা জবাব পেয়ে যেতেন। আজ খবর নেওয়া অহেতুকী নাটকীয় সংলাপ ব্যতীত কিছুই না।”
“তোমার কথা এই বয়স্ক লোকের মাথার উপর দিয়েও উড়ে যায় কখনো কখনো। ভাইবন্ধুর খবর নেওয়াটা কী দোষের দেখাইলা, মা?”
“ভাইবন্ধু!”
তাচ্ছিল্যের হাসি ঠেসে দেয় শ্রাবণ ঠোঁটের এক কোণে। পরক্ষণে বলে,
“এতো বয়স হওয়ার পরেও যে আপনি ঠিকঠাক নাটক চালিয়ে যেতে পারেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কিন্তু কী বলুন তো আব্বা। এই নাটকগুলো সবার আবেগকে ছুঁয়ে যেতে পারে না। ভাইবন্ধু শব্দটাও আপনার মুখে মানায় না। আপনার সাথে কারো সম্পর্ক ভাইবন্ধু পর্যায়ে পৌঁছাতেই পারে না। বরং প্রতারক খেতাবটাই আপনার পদবি হওয়া বেশ মানানসই।”
“তুমি ভুল বুঝতাছো মা। কী কারণে এমন রাগ হও এই বুড়ো বাপের উপর, তুমিই ভালো জানো।”
“তাই? সত্যিই আপনি জানেন না? আপনি জানেন না তবে শরীফ আহমেদকেও? আপনি জানেন না তবে শরীফ আহমেদের সাথে আপনার পরিচয়ের সুত্র? আপনি জানেন না তবে শরীফ আহমেদের সাথে আপনার শেষ চুক্তি? এতো প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মুখে কী আদৌও এই কথা সাজে, আব্বা? মনে পড়ে? একদা, শরীফ আহমেদের কাছ থেকে আপনি কথা নিতে চেয়েছিলেন। ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়ে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা পারিবারিক পর্যায়ে নিয়ে আসবেন? তিনি কথা দিয়েছিলেন। আপনার ইচ্ছায় সম্মত হয়েছিলেন। অতঃপর বহু দিনের ব্যবধানে কথা রাখতেও সমর্থ হয়েছেন। এই দেখুন, তার মেয়ে আজ আপনার ঘরে। আসলে তিনি এমনই। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে উনাকে কখনোই দেখিনি। যা উনার দ্বারা সম্ভব না, তার প্রতিশ্রুতিও তিনি দিতেন না। ছোটকালে উনার গলা ঝাপটে না ধরে এই বড় মেয়েটা ঘুমাতো না। চোখ বন্ধের আগে আবদার করতেও ভুলতো না। যদি বলতো, তার একটা নতুন কলম চাই; চিপস চকলেট চাই। তিনি বলতেন সকালে অফিস যাওয়ার আগে এনে দিয়ে যাবেন। এবং সকালেই আনতেন। সেই সকাল কখনো বিকেলে গড়ায়নি। আবার যদি বলতো, তার রোবোটিকস খেলনাগাড়ি চাই। তিনি বলতেন এতো টাকা তার নেই। ওই গাড়ি কিনতে হলে বেশি টাকার দরকার হয়। বেশি টাকার মালিক তিনি নন। শুধু মেয়ের ক্ষেত্রেই না। প্রতিটি সম্পর্কে, প্রতিটি মুহুর্তে তিনি সাধ্যাতীত প্রতিশ্রুত হয়েছেন এবং রক্ষা করেছেন। বন্ধুত্বেরও অমর্যাদা করেননি। মেয়ে ঠিকই পৌঁছে গেছে আপনার ঘরে। বন্ধুত্বের সুতো টেনে পরিবার গঠিত হয়েছে। আর আপনি কি করেছেন? প্রতারণা?”
“আমি কোনো প্রতারণা করিনি।”
“এই মুখোশটা শ্রাবণ এখনই চাইলে টেনে নামিয়ে নিতে পারে আফজাল হোসেনের মুখ থেকে। আল্লাহ এমন সুযোগ এই শ্রাবণকে দিয়ে রেখেছেন। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আপনার ইউনিয়নের আনাচে-কানাচেতে আগুনের ফুল্কির মতো জ্বলে ছড়িয়ে পড়তে পারে আপনার ইজ্জতের ফুল্কি। ফাতিহা নামটাই তার জলন্ত প্রমাণ। আপনার সেই দিনের কৃতকর্মের কথা কিন্তু মানুষ ভুলে যায়নি৷ সুযোগ পেলেই উতলে উঠে তাদের মনে। আপনার পেছনে যে বাপ তুলেও আপনাকে গালি দিতে বাঁধা পায় না লোকে, তা হয়তো জেনেও মানতে নারাজ আপনি। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, শ্রাবণ একটা কথা রটিয়ে গেলে তা বিশ্বাসে মিলিয়ে নিতে এই মানুষগুলো কতটা সময় নিবে? শ্রাবণ একটু উষ্কে দিয়ে এলে আপনার ঘর বাড়িতে ভাঙাভাঙি করতেও খুব বেশি সময় লাগবে না। কেননা, শ্রাবণ আপনারই ঘরের সদস্য; আপনারই পুত্রবধূ বলে কথা!”
আফজাল হোসেনের থমথমে মুখ দেখে তাচ্ছিল্যভরে আরও একবার কোণঠাসা হাসে শ্রাবণ। পরক্ষণেই বলে,
“বেশি ভাববেন না, আব্বা। বয়স হয়েছে আপনার। দুর্ঘটনা যেকোনো সময় একটা ঘটে যেতে পারে এতো দুশ্চিন্তা করলে। আমি সাবধান করছি মাত্র আপনাকে। এতো প্রত্যক্ষ মিথ্যাচার আমার প্রাণে সয় না আবার। ফাতিহা নামক নারীর সাথে যে প্রতারণা হয়েছে, সেই যন্ত্রণাই তো আপনার জীবনের অন্তিমেও শেষ হবে না। একটা অবহেলিত নারীর অব্যক্ত অভিশাপ কিন্তু ঠিকই লেপ্টে আছে আপনার এতো ধনদৌলতের শিরাগুচ্ছে। যার কারণে, সব থেকেও সুখ জিনিসটাই নেই হয়ে আছে আপনার সাজানো এই সংসারে। এই অসুখ কোনো ওষুধেও কাজ করবে না।”
কথা শেষ করে হনহন পায়ে বেরিয়ে আসে শ্রাবণ। উঠুনেই ইফতেখারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খানিকটা থমকে যায় তার চোখ। একবার তাকিয়েও যে ক্ষিপ্ততা নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলো তা কিছুটা কমিয়ে নিয়ে হেঁটে যায় দালানে। মনের ভেতর কেমন হাসফাস লাগে, সে কখন এলো? কথাবার্তা শুনে ফেললো নাকি কিছু? কেমন করে তাকিয়ে ছিলো যে তার দিকে! ভাবতে ভাবতেই পারভীনের ঘরে এসে উঁকি দেয়। বিছানার কোণে ভাত রাখা। পারভীন নেই রুমে। বাথরুমে গেছে হয়তো। শ্রাবণ আরেকটু এগিয়ে অর্পার ঘরে আসে। অর্পা স্কুলে। পরী দুপুরের খাবার খেয়েই গরমের উত্তাপ হতে স্বস্তি পেতে ঠান্ডা মেঝেতে বালিশ পেতে দিয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। উপরে শো শো শব্দে চলছে বৈদ্যুতিক পাখা। শ্রাবণ খাটের এক কোণে পাখার নিচেই বসে একটু জিড়িয়ে নিতে। অপলক দৃষ্টি স্থির রাখে জানালার বাইরে। মনের ক্ষিপ্ততার রেশ কমিয়ে আনে ধীরে ধীরে। ভাবে আবার ইফতেখারের দাঁড়িয়ে থাকা নিয়েও৷ সে একটু আগে বেরিয়ে এখনই ফিরে এলো কেন? কী না কী শুনলো তা-ই ভাবাচ্ছে তাকে। আব্বার সাথে আবার এসব বিষয় ঘাটতে চলে যায়নি তো ওদিকে? এমনটা মনে হতেই শ্রাবণ দ্রুত উঠে যায় বসা থেকে। অর্পার রুম ছেড়ে বেরিয়ে আসে পুরাতন ঘরের উদ্দেশ্যে। এরইমধ্যে দেখে পারভীন উঠুন পেরিয়ে ওদিকে যাচ্ছে। আর তাদের নিজেদের ঘরে ফ্যান চলছে। তাহলে ইফতেখার আফজাল হোসেনের নিকট যায়নি, রুমেই আছে। শ্রাবণ পায়ের ব্যস্ততা কমিয়ে নিজেদের ঘরেই যায় দরজা ঠেলে। ফ্যানের নিচে ভাবুক বেশে বসে আছে ইফতেখার। শ্রাবণের প্রবেশে দরজার দিকে তাকায়। শ্রাবণ জিজ্ঞেস করে,
“তখন তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আবার চলে এলেন যে এখনই?”
“কাজ শেষ, তাই এসে পড়েছি। রোদে অযথা ঘাম ঝরানোর কী দরকার।”
“না, ঠিকই আছে। ঘুমিয়ে থাকুন একটু। ভালো লাগবে।”
“তুমি আব্বার সাথে এভাবে কেন কথা বলো?”
শ্রাবণের হৃদয় কিছুটা ধুক করে উঠে। নিশ্চিত সে শুনেছে কিছু। কিন্তু সে তো চায়নি, ইফতেখার কিছু জেনে উঠুক! জবাবে কিছুই বলে না শ্রাবণ। তাকায়ও না তার দিকে। থমথমে মুখে ঝাড়ু হাতে নিয়ে মেঝের ধুলো সরাতে থাকে। তারও মেঝেতেই একটু ঘুমানো দরকার। ঠান্ডা লাগবে। ইফতেখার কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলে,
“শ্রাবণ, কোনো একটা ব্যাপার নিয়ে এতো মাতামাতি ভালো না। তুমি কিন্তু জানো না, আব্বা যে আম্মাকে ঘরে তুলতে চেয়েছিলো। না জেনে এই বিষয়টা টেনে কেন বারবার খারাপ আচরণ করো তুমি আব্বার সাথে?”
শ্রাবণ স্বস্তি পায় এই ভেবে যে, আগের কথাগুলো সে কিছুই শোনেনি। তবে শেষ কিছু শুনেছে এবং তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেছে ঠিকই। তাই এবার জবাবে কিছু বলে সে।
“আমি নিজের কানেই তো শুনেছি, তিনি আপনাকে নিষেধ করেছেন আম্মাকে ঘরে ডাকতে। আপনি আমায় ভুল ভাবনায় পড়তে ডাকবেন না তাই।”
ইফতেখার হতাশিত গলায় বলে,
“হ্যাঁ, করেছিলেন আমাকে নিষেধ। কিন্তু ব্যাপারটা সেখানেই থেমে থাকেনি, শ্রাবণ। তিনি চেয়েছেন, আম্মা আসুক। আশ্রমে কথাও বলে এসেছেন। যেটা তোমার জানা নেই। তোমার সমস্যাটা হচ্ছে, তুমি শুধুমাত্র ভুলের মধ্যেই স্থির থাকতে চাইছো। আমার কথা বিশ্বাস না হলে তুমি সেখানেই জিজ্ঞেস করে এসো। আব্বা ঠিকই চেয়েছেন উনাকে নিয়ে আসতে। আশ্রমে কথাও বলে এসেছেন। তারা বলেছিলো এলাকায় লোক পাঠাবে, খবর নিবে। যাচাইয়ের পর আম্মার ছাড়পত্র দিবে। আমরাও অপেক্ষা করছিলাম তাদের আসার। নয়তো মৃত্যুর পরই তারা উনাকে দিতে রাজি হতো?”
“হয়েছে। বাদ দেন। এখন আর ওসব বলে লাভ নেই।”
“লাভ না থাকলেও তো কথায় কথায় হেয় করছো, অপমান করছো। একটা মানুষকে বারবার এমন আচরণের সম্মুখীন করার তো কোনো মানে হয় না। আব্বা তোমাকে একটু বেশিই পছন্দ করেন বলে একটা ধমক পর্যন্ত দেন না। আমাদের ভাইবোনদের কেউ হলে পরিস্থিতিই অন্যরকম হতো। আদর করে যখন, আদরের মর্যাদাটুকুও দিয়ো। সকলের কাছে অপছন্দের হয়ে উঠলে সম্পর্কও অনর্থক হয়ে উঠে। মা এমনিতেই অসন্তুষ্ট তোমার উপর। আব্বাও যেন এমন না হোন, তোমার সেদিকে বিশেষ যত্ন নেওয়া উচিত। পছন্দের মানুষের কাছে অপছন্দনীয় কাজ কেউই প্রত্যাশা করে না।”
“আপনার কাছেও অপছন্দের হয়ে যাচ্ছি, সেটাই স্পষ্ট করতে চাইছেন কী?”
“এক কথায়ই তো বললাম। শুধু আমি কেন? তোমার মা-ও অসন্তুষ্ট হবেন অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিতে।”
“বেশ তো। সকলকে সন্তুষ্ট করাটাই বুঝি স্ত্রীজাতের কর্তব্য! মাথায় রাখলাম আপনার কথা।”
কথার সংক্ষিপ্তকরণে ইচ্ছাকৃত কিছুটা অভিমান ঢেলে দেয় শ্রাবণ। ইফতেখার কিছুটা বিরক্ত হয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অভিমানের উপস্থিতি দেখে। নিজেই চুপ হয়ে যায় তাই। কিছু না বললেও ঝামেলা বৃদ্ধির শংকা, আর কিছু বলতে গেলে অভিমানের জন্ম৷ সে যা বুঝাতে চাইলো, তা-ই মাঝখানে ফাঁদে পড়ে রইলো! শ্রাবণ ঝাড়ু রেখে বালিশ ফেলে দেয় মেঝেতে। এখানে শুয়ে পড়তে দেখেই সে জিজ্ঞেস করে,
“নীচে ঘুমাচ্ছো কেন?”
“মেঝে ঠান্ডা আছে।”
“উপরেও ততো গরম না।”
শ্রাবণ কোনো জবাবই দেয় না আর৷ চোখ বুজেছে তো বুজেছেই। কথা বলতে একদমই ইচ্ছে করছে না তার। ইফতেখার কিছুক্ষণ বসে থাকে জিড়োতে। পুরোটা সময়ই চোখ দুটো স্থির রাখে শ্রাবণের মুখপানে। পরক্ষণে ক্লাবের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায় দরজাটা ঠিকঠাক চাপিয়ে রেখে। খাওয়ার পর আফজাল হোসেন বসে থাকেন টিন চালার ঘরের বারান্দায়। থালাবাটি পারভীন নিজেই গুছিয়ে রেখেছে। তিনি আরেকবার জিজ্ঞেস করেছেন, পারভীন খেয়েছে কি না। জবাবে না বলতেই হুকুম করেন খেয়ে নিতে। চুপচাপ খেতে চলে যায় পারভীন। আফজাল হোসেন দাঁত খিলাতে খিলাতে তাকিয়ে থাকেন শূন্য উঠুনটায়। মনজমিনে আউড়ে তুলেন পুরনো সম্পর্কের পাতা।
প্রায় ত্রিশ বছর আগের কথা। রাজনীতি নিয়ে আগে থেকেই ছুটাছুটি আফজাল হোসেনের। আর রাজনীতির সূত্র ধরেই একবার দুর্ঘটনার শিকার হোন তিনি। প্রয়োজনীয় কাজে শহরের রাস্তা অতিক্রমে রাজনীতিতে জড়িত প্রতিপক্ষ দল দ্বারা হঠাৎ ধুমধাম জখমের শিকার হয়ে যান। আক্রমণ করেই জনচোখে পড়ার আগে পালিয়ে যায় আক্রমণকারীরা। তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তা হতে তুলে সেদিন হাসপাতালে ভর্তি করেছিলো অপরিচিত শরীফ আহমেদ। রক্তদানও করেছিলো। চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেছিলো নিজের পকেটের অর্থ থেকে। সেখান থেকেই শরীফ আহমেদের সাথে বন্ধুত্বের সৃষ্টি। তখন নতুন বিবাহিত আফজাল হোসেন। আর অবিবাহিত শরীফ আহমেদ। একদিকে বন্ধুত্বের গভীরতা বাড়তে থাকে, অন্যদিকে নিজ ঘরে সন্তানের আগমনী বার্তা পেয়েই এক পর্যায়ে আফজাল হোসেন প্রতিশ্রুতি চায় শরীফ আহমেদের কাছে। তার জোরাজুরিতে বন্ধুত্বের খাতিরে শরীফ আহমেদ প্রতিশ্রুত হয়, হয়তো ছেলে দিয়ে তার ঘরে মেয়ে আনবে। আর নাহয় আফজাল আহমেদের ছেলে বড় আর তার মেয়ে ছোট হলে মেয়ে পাঠিয়ে দিবে। অথচ তখন পর্যন্ত শরীফ আহমেদ ছিলো এই শহরের আগন্তুক। কর্ম সন্ধানেই ঠাঁই গেঁড়েছিলো অপরিচিত শহরের বুকে। বিয়ে তো দূর, নিজের নির্দিষ্ট কোনো আশ্রয়স্থলের ব্যবস্থাই করতে পারছিলো না শরীফ আহমেদ। পরক্ষণে চাকরি নির্ভর হয়েই পরিবার গঠণের জন্য ভাবে। মেয়ে পছন্দ করে বিয়ে করে ভাড়া বাড়িতে থেকেই। তাদের তখন জেলায় জমির দখলদারি চলছে। ঝামেলাপূর্ণ এলাকা ছেড়ে চেয়েছিলো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিটা বিক্রি করে কোনো উন্নত জায়গায় নিজের এক টুকরো বাড়ি গড়তে। ঢাকার পার্শ্বজেলা নারায়ণগঞ্জেই বন্ধু আফজাল হোসেনের বাড়ি। ব্যাপারটা তাকে জানালে সে জানায় তার বাবা-ই জমি বিক্রি করবে। সে চাইলে সেখান থেকেই জমি কিনে নিতে পারে। বাড়ির একাংশ কিনে নিতে পারলেই একটা আবাসস্থল নির্ধারিত হয়ে উঠবে। সেই বিশ্বাস নিয়ে দামটুকু দিলেও আফজাল হোসেনের পিতা কর্তৃক জমিটুকু আর দেওয়া হয়নি শরীফ আহমেদকে। ক’দিন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে টাকার ব্যাপারটাও পুরোপুরি অস্বীকারে চলে আসে। পৈতৃক সম্পদের বিনিময়ে পাওয়া পুঞ্জিভূত সম্বলটুকুও বিলুপ্ত হয়ে গেলো বিশ্বাসঘাতকতায়। নির্দিষ্ট আবাসহীন এই শহরেই বহু কষ্টে অতিবাহিত হতে থাকলো শরীফ আহমেদের দিন। প্রিয় সঙ্গিনী আর দুই কন্যা নিয়ে চলে গেছে তার একের পর এক কষ্টের সফল বুননের দিন। টাকার ব্যাপারটা অস্বীকারকৃত হয়ে উঠলে বন্ধুত্বের পরিচয়টাও যেন অস্বীকারেই মিলিয়ে দেয় আফজাল হোসেন। রাজনীতি নিয়ে চরম ব্যস্ততা। বন্ধুর পরবর্তী হাল চালের বার্তা জানাটা মোটেও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেনি। শ্রাবণ যখন এবাড়ি এলো, কেবল সন্দেহের ধারই বয়ে গেলো একেকটা কথার তেজে। মনে হচ্ছিলো পরিচিত কেউ। ফাতিহার ব্যাপারটা সামনে এলেই সন্দেহ সেখানেই স্থির করে দেয়। ভেবেছিলো ফাতিহার জন্যই তার প্রতি তীব্র ক্ষোভ শ্রকবণের মনে। কিন্তু সেদিন বিপুর বিয়ের খবর পেয়ে যখন কাজীর কাছে সত্যতা যাচাইয়ে গেলেন, ইফতেখারের বিয়ের কাগজপত্রও ঘেটে এলেন। আর সেখান থেকেই স্পষ্ট অবগত হোন শ্রাবণের পরিচয়ের ব্যাপারে। পিতার নামে শরীফ আহমেদ দেখতেই অবিলম্বে মনে পড়ে যায় সেই অতীতের বন্ধুকে। ভাবনার পাতায় পাতায় আরও স্পষ্ট করেন এবাড়িতে শ্রাবণের বউ হয়ে আসার কারণ। এতে বড় সৌভাগ্যবান মনে করলেন নিজেকে। একে তো শ্রাবণের রূপ, গুণ ও জ্ঞানের প্রাচুর্যতা। অন্যথায় বন্ধু থেকে নেওয়া পুরনো কথা! বড়ই আনন্দ জাগে যেন তার মনে, শ্রাবণকে পুত্রবধূ হিসেবে পেয়ে। সেদিন কথা না নেওয়া হলে হয়তো আজ এমন একটা শ্রাবণ তার পাওয়া হতো না। আর তাই তখন পারভীনকেও খুব আনন্দ এবং অহংকারের সাথে বললেন, শ্রাবণকে তিনিই এনেছেন!

“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ৬৬
(নূর নাফিসা)
.
.
ভাবতে ভাবতে হাতের আঙুলগুলোর দিকেও তাকান আফজাল হোসেন। প্রতিপক্ষের সেই হামলাতেই হাতের কনিষ্ঠা আঙুল হারাতে হয়েছে তাকে৷ পায়ে, পিঠে ছুরি কোপের দাগও আছে। শরীফ আহমেদ সময়মতো হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছে না দিলে হয়তো পথেই রক্তাক্ত অবস্থায় প্রাণটা চলে যেতো। আবারও শূন্যে তাকায় উঠুনের দিকে। তাকায় ইফতেখারের বারান্দার দিকেও। ইফতেখারের জনশূন্য বারান্দা। কিন্তু স্ত্রী হওয়া সত্ত্বে এর অর্ধেক দখলদার এখন শ্রাবণ৷ শুধু কী তাই? শরীফ আহমেদের অংশটুকুও নিতে এসেছে কড়ায়গণ্ডায়। তা ভেবেই মনে মনে হাসে আফজাল হোসেন৷ বুদ্ধিমতী মেয়ে পাঠিয়ে বড় বুদ্ধিমানের পরিচয় দিয়েছে বুঝি শরীফ আহমেদ। যাক, দেনা মিটিয়ে দেওয়া যাবে। তার আর কম আছে নাকি?
প্রায়শই ইফতেখারের রাতের খাবার খাওয়া হয় সবার পরে। আজও একই কান্ড। মালামাল নামিয়ে ফিরেছে দেরি করে। শ্রাবণ অপেক্ষায় ও ধ্যানমগ্নতায় বসেছিলো ঘুমানোর সময় হয়ে উঠার পরও। ধ্যানে থাকার কারণে মোটরসাইকেলের আওয়াজ কানে পৌঁছালেও খেয়ালে ধরেনি ঠিকঠাক। ইফতেখার রুমে এসেই বলে,
“আমার জন্য বসে আছো?”
ধ্যানভঙ্গ হতেই জবাবহীন মশারীর ভেতর থেকে নেমে আসে শ্রাবণ। চুলের খোপা করে চুপচাপ বেরিয়ে যায় খাবার দেওয়ার জন্য। ইফতেখার ঘড়ি, চাবি রেখে ঘামে ভেজা শার্টটাও চেঞ্জ করে। পরক্ষণে হাতমুখ ধুয়েই খেতে যায় ওইঘরে। খেতে বসেও শ্রাবণকে জিজ্ঞেস করে,
“সবার খাওয়া দাওয়া শেষ?”
“হুম।”
ছোট করে জবাব দিয়ে বারান্দায় চলে যায় শ্রাবণ। ইফতেখার লক্ষ্য করছে তার গড়া অভিমান বেশ ভারি রূপ নিয়েছে। ভেবে রাখে ছাদে গিয়ে নিরিবিলি প্রহরে একটু হাঁটবে, কথায় কথায় চাঁদের জ্যোছনায় অভিমান কাটাবে। তাই এখন কিছুই বললো না। খেতে মনোযোগ দেয় চুপচাপ। এরইমধ্যে আফজাল হোসেন আসেন এই ঘরে। ঘরে থেকেই মোটরসাইকেলের শব্দে বুঝতে পেরেছেন ইফতেখার এসেছে। মিনিট কয়েক পর তাকে পাশের রুমে না পেয়ে এখানেই আসেন। আফজাল হোসেনকে দেখে বারান্দায় শ্রাবণ পায়চারিও থামিয়ে দেয়। আফজাল হোসেন ইফতেখারের কাছে যেতে যেতে শ্রাবণকেও ডেকে যায়,
“আসো, কথা আছে।”
কথা তো দূর! তার ডাকেই বিরক্ত হয় শ্রাবণ। তবুও এগোয়। তবে রুমের ভেতরে যায় না। দরজা ঘেঁষে হালকা হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আফজাল হোসেন ইফতেখারের পাশে বসে শ্রাবণকে বলে,
“বসো, আইসা?”
শ্রাবণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে বলে,
“বলুন, শুনতে পাচ্ছি।”
কথা অমান্য করায় বাবা ছেলে, দুজনের চোখই শ্রাবণের দিকে উঠে। আফজাল হোসেন সেদিকে তোয়াক্কা না করে কথা শুরু করে। কিন্তু ইফতেখার ঠিকই কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে মুখের উপর কথা অমান্য করায়। শ্রাবণ তার দৃষ্টি উপেক্ষা করে আফজাল হোসেনের মুখে তাকায় কথা শুনতে। আফজাল হোসেন ইফতেখারের উদ্দেশ্যে বলেন,
“বিয়ে যেভাবেই হোক না কেন, সংসার তো হইছে। আমরাও জানছি, তারাও জানছে। আমরাও মানছি, তারাও মানছে। এতোদিন ঘরের কাজকর্মে ব্যস্ত থাকায় কথায় এগোতে পারি নাই। এখন সব ঠিকঠাক হইছে, এইবার তোর শ্বশুর শাশুড়িরে দাওয়াত কর আসার জন্য। আলাপ আলোচনা আর আপ্যায়নেও তো সম্পর্ক সুদৃঢ় হওয়ার দরকার আছে। নাকি? ফোন নম্বর থাকলে দে, আমিই দাওয়াত করি তোর শ্বশুর শাশুড়ির কাছে।”
শ্রাবণ শুষ্ক চোখে তাকিয়ে কেবল তার নাটক দেখে যায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। ওই মুখের ভঙ্গিমাতেও যেন তার বিরক্তি! সবই কেমন নাটকীয় দৃশ্য তার চোখে। দাওয়াত দিয়ে কী করতে চাইছেন তিনি হঠাৎ? এদিকে ইফতেখার খাওয়ার মাঝখানে পিতার কথার পরপর জবাব দেয়,
“শ্বশুর নেই। শাশুড়ি আর শ্যালিকা আছে একজন।”
“শ্বশুর নেই মানে? কী হইছে?”
প্রশ্ন করে দুজনের মুখেই তাকায় আফজাল হোসেন। শ্রাবণ নিশ্চুপ চোখে তাকিয়ে থাকে এবং ইফতেখারই আবার জবাব দেয়,
“মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগেই।”
“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। দিন না ফুরাইতেই ক্যামনে মারা গেলো?”
“অসুস্থ ছিলেন নাকি আগে থেকেই।”
শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে আফজাল হোসেন জিজ্ঞেস করেন,
“কী হইছিলো?”
শ্রাবণ সহজ কথায় শুকনো মুখে জবাব দেয়,
“হার্ট ব্লক ছিলো।”
আফজাল হোসেন চিন্তিত মুখে একটু থেমে থাকেন। পরক্ষণে বলেন,
“তোমার আম্মার সাথে যোগাযোগ করা যাইবো? উনার কাছেই দাওয়াত করি তবে।”
“না। করা যাবে না। দাওয়াতেরও কোনো প্রয়োজন হবে না। আম্মা আসবেন না।”
আবারও ক্ষিপ্ত চোখে তাকায় ইফতেখার। আফজাল হোসেনও মুখের উপর জবাব পেয়ে লজ্জিত হন। তবুও বলেন,
“সে কী, মেয়ের সংসার দেখবো না আইসা?”
“মেয়ে তো নিজে নিজেই সংসার গড়ে নিয়েছে৷ তাই এখানে দেখার কিছু নেই।”
“রাগ করে আছেন নাকি তোমার উপরে?”
“সেটা আমার আর আমার মায়ের ব্যাপার, আমাদের গন্ডির মধ্যেই থাক। আপনার না জানলেও চলবে।”
“ফোন নম্বর থাকলে দেও, আমি কথা বলে দেখি ব্যাপার সহজ করতে পারি কি না। রাগারাগি হইতেই পারে, স্বাভাবিক। আমাদের মাঝেও তো হইছিলো, সেই তো মানলামই। কতক্ষণ আর রাগারাগি।”
“তবে বিপু ভাইয়ের ব্যাপারটা মানছেন না কেন? কান্তাও তো চেয়ারম্যান বাড়ির বউ। ঘরে তুলছেন না কেন তাকে?”
এক আলোচনার মধ্যে আরেক ব্যাপার বড়ই অপ্রত্যাশিত ছিলো যেন আফজাল হোসেনের কাছে। তবুও নিয়তি হারিয়ে দেয় এই মেয়েটার যুক্তির কাছে। বিপুর ব্যাপারটা একদমই মাথায় নিয়ে আসেননি তিনি। অথচ সময়োপযোগী বাক্যে কোপ মারতে দেরি করেনি এই শ্রাবণ। আফজাল হোসেন খানিক চুপ থেকে বলেন,
“দেখা যাইবো পরে সবই। তোমারে যা বললাম, তা-ই করো। সম্পর্ক গড়ছো যখন, আমাদের তোমার বাড়ি যাওয়া হইবো; তোমার আম্মাও আসবো মেয়ের কাছে। এ-ই তো নীতি। দেখো দাওয়াত করার সুযোগ করতে পারো কি না।”
“আমার আম্মাকে দাওয়াত না করলেও হবে। আপনার জন্য এখন বিশেষ জরুরি কান্তার পরিবার। এলাকার সবারই চেনাজানা ওই পরিবার। আপনি রাস্তায় বের হলেও যেমন পুত্রবধূর কথা জিজ্ঞেস করবে লোকে, ওই পরিবার থেকে কেউ বের হলেও মেয়ের শ্বশুর বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করবে মানলো কি মানলো না। এসব কানেমুখে হতেই থাকবে সময় যত গড়াবে। আমার পরিবার কেউ চিনেও না, এলো কি এলো না তার খবরও রাখবে না। আমার পরিবারের চিন্তা বাদ দিয়ে আপনি কান্তার পরিবার নিয়ে ভাবলেই ভালো হয়। দুইটা পরিবারেরই সম্মান বাঁচে। একটা নারীর অধিকার বাঁচে।”
আফজাল হোসেন আর কথা বলারই ইচ্ছে রাখলেন না। চুপচাপ উঠে চলে গেলেন। ইফতেখার শুধু শ্রাবণের মুখের উপর জবাব দেওয়ার প্রতি ক্ষিপ্তই নয়, দাওয়াত সম্পর্কিত উদ্যোগে বাবার প্রত্যাশার অপূর্ণতায় হতাশাগ্রস্তও হয়। আফজাল হোসেন দালানঘর ছুঁতে ছুঁতে প্লেটের খাবারটুকু শেষ করে প্লেটেই হাত ধুয়ে নেয় ইফতেখার। পরক্ষণেই শ্রাবণকে বলে,
“এসবের মানে কী? আব্বা দাওয়াত করতে চাইলো, তুমি নিষেধ করলে কেন?”
শ্রাবণ জবাব না দিয়ে এগিয়ে এসে পানি ভর্তি প্লেটটা তুলে নিয়ে যায়। ইফতেখার বড্ড অসন্তুষ্ট হয় তার আচরণের উপর। সে শ্রাবণের পিছু নিতে রান্নাঘরেই যায়। আবারও জিজ্ঞেস করে,
“আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি তোমাকে, জবাব দিচ্ছো না কেন? নিষেধ করার পরেও বারবার এমন আচরণ কেন করো আব্বার সাথে?”
শ্রাবণ হাতের কাজ শেষ করে ফিরে তাকায় তার দিকে। সুস্পষ্ট কণ্ঠে জানতে চায়,
“ভুল কী বললাম?”
“সঠিক কোনটা বললে, তা-ই তো বুঝলাম না। আব্বা একটা প্রস্তাব নিয়ে এলেন, আর তুমি তা পরিবার পর্যন্ত না পৌঁছাতেই নিজেই প্রত্যাখান করে দিলে। এটা সঠিক বলতে চাইছো তুমি?”
“এরচেয়ে বড় ব্যাপারগুলো কী আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে না? আমার পরিবার দাওয়াতের প্রত্যাশায় বসে থাকেনি, দাওয়াত এখন কান্তার পরিবারে যাওয়াটা ভীষণ জরুরী। একটা বিবাহিতা মেয়ে বাবার ঘরে পরে আছে, স্বামীর পরিবার যেখানে স্বীকৃতিই দেয়নি এখন পর্যন্ত। দাওয়াতটা কী আগে সেখানে যাওয়া প্রয়োজন না?”
“বিয়েটা আমি সম্পন্ন করিয়ে রেখেছি, এবং ভেবেই রেখেছি। সময় সুযোগ ফুরিয়ে যায়নি। তাছাড়া কান্তাকে ফেলেও দেওয়া হয়নি এই পরিবার থেকে। বরং কান্তাকে টেনে এনে তুমি নিজেকে ঢেকে নেওয়ার চেষ্টা করছো। সবকিছুতে মাতব্বরি ভালো না। আব্বা যেখানে তোমার পরিবারের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম খুঁজলেন, সিদ্ধান্তটা তোমার পরিবার থেকেই আসতো। সেই সুযোগ না রেখে মুখের উপর এভাবে জবাব দেওয়া কী তোমার উচিত হয়েছে?”
“অনুচিত হলেইবা আর কী? আমি তো আগেই আপনাকে জানিয়েছি, শ্রাবণ বেয়াদব।”
“তুমি বেয়াদব নও। কিন্তু মনের ভেতর ভারি ক্ষোভ জমা রেখেছো আম্মার বিষয়টা নিয়েই। এই একটা বিষয়ের উপর এতো ক্ষোভ নিয়ে লড়ে যাওয়া তো ঠিক না শ্রাবণ। অনেক হয়েছে। থামো এবার। তোমাকে বারবার বলেও আমি বুঝাতে পারছি না। বুঝাতে বুঝাতে নিজেই ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি, তবুও তোমার কোনো ক্লান্তি নেই। কেন আব্বার বিরুদ্ধে অবিরত লড়তে চাইছো এভাবে? কী লাভ এতোসবে?”
এমনিতেই দুপুরে আফজাল হোসেনের সাথে পরিবার নিয়ে প্রত্যক্ষতা করার পর থেকে তার মনটা বিবশ হয়ে আছে। এখন ইফতেখারের শক্ত গলা যেন তার মেজাজেও অনেকটা প্রভাব ফেলে দেয়। যার জন্য মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে,
“আমি লড়তে এসেছিলাম নারীর জন্য। কিন্তু উনার প্রতি ক্ষোভ আমার শুধুমাত্র ওই নারীই না।”
“তবে কিসের ক্ষোভ তোমার?”
প্রশ্নে শ্রাবণ নিজেই থমকে আসে নিজের ক্ষোভ স্পষ্ট করার মতো ভুল করায়। মুখ এভাবে ফসকালো কেন! ওফ্ফ! এখন যে এটা নিয়েই ঘাটতে থাকবে ইফতেখার! নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হয় শ্রাবণ। ওদিকে ইফতেখার উদগ্রীব জবাবের প্রত্যাশায়।
“বলো, কীসের ক্ষোভ?”
“আমার আল্লাহ ব্যতীত তা আর কেউ না জানুক।”
“না, তোমায় বলতে হবে। কথার অর্ধেক বাঁকে কেন থেমে যাবে?”
“আমি কথা তুলতেই চাইছি না, আপনি বাঁক খুজে বেড়াচ্ছেন কেন? আমি যেজন্য লড়তে আসিনি, সেটা অপ্রকাশ্যই থাকুক। আমাকে এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করা থেকে বিরত থাকুন। ওসবে আমার কিছুই বদলাবে না।”
“কিন্তু তোমার জন্য এ পরিবার বদলে যাচ্ছে। আমরা কেউই প্রত্যাশা করছি না এমন অশান্তির। তুমিই বারবার সেখানে জটলা পাকিয়ে যাচ্ছো।”
“আমি কোনো অশান্তির চেষ্টা করছি না।”
“কিন্তু হচ্ছে তো!”
খানিকটা ধমকে উঠে ইফতেখারের গলা। শ্রাবণ পূর্বের মতোই শক্ত গলা স্পষ্ট রেখে বলে,
“বেশ তো। আমার জন্য যখন শান্তি বদলে যাচ্ছে, তবে আমিই চলে যাবো।”
হনহন পায়ে দালানে চলে আসে সে। ইফতেখার ক্ষিপ্ত চোখে তাকিয়ে থাকে তার যাওয়ার দিকে। শ্রাবণের জেদ তার মনপুত হচ্ছে না। নিজের মেজাজ চড়ে যাচ্ছে তাতে। অথচ নিজেকে শান্ত রাখার তীব্র চেষ্টা বহমান তার মাঝে। গেটে তালা লাগিয়ে উঠুনে পায়চারি করে সে কিছুক্ষণ। পরক্ষণে ঘরে এসে দেখে শ্রাবণ ঘুমাতে প্রস্তুত। তাই সে-ও আর কথা বাড়ায়নি কোনো। নিজের মধ্যেও জমিয়ে রেখেছে কিছু স্বল্পমেয়াদী ক্ষোভ।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুধুমাত্র পরীর সাথে সাক্ষাৎ করে বেরিয়ে গেছে শ্রাবণ। যাওয়ার আগে বলে গেছে,
“আম্মাকে বলো নাশতা তৈরি করতে। আমি চলে যাচ্ছি।”
“চলে যান মানে! কই যান, ভাবি?”
“মায়ের কাছে।”
“সে কি! ফিরতে না ফিরতেই আবার কীজন্য!”
“এতোকিছু বলার সময় নেই। তোমাকে যা বললাম, বলে দিয়ো। নয়তো সকলের নাশতা রেডি হবে না সময়মত।”
এইটুকু কথা রেখে তখনই দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায় শ্রাবণ। পরী বিস্মিতভাবে খানিক দাঁড়িয়ে থেকে ভোঁ দৌড় দেয়। দরজা চাপানো থাকায় ডাকেও না আবার পারভীনকে৷ সকাল তো এখনো ফুটেনি ঠিকঠাক। কাকা তো ঘরে। যদি ঘুম নষ্ট করে দেয় সে! একটু অপেক্ষা করে তাই। ভাবতে থাকে ভাবির আবার কী হলো? কাল রান্নাবান্না নিয়ে যুদ্ধ করে আজই আবার বাড়ি ছাড়লো কেন! ভাবতে ভাবতেই নিজের দিনলিপি অনুযায়ী টুকটাক কাজ সেরে নেয় পরী। কিছুক্ষণ পর বাইরে গোয়ালের কাছে পারভীনের গলা শুনতেই শ্রাবণের বার্তা পৌঁছে দেয়। রান্নাবান্নার কাজে পারভীনকেই হাত দিতে হয় রাগ নিংড়াতে নিংড়াতে। এক দিনেই বুঝি হাপিয়ে গেছে গুণবতী! ভোর হলেই যখন তখন ছুটে বাপের বাড়ি। আবারও চিলের মতো হট্টগোল পাকাতে উড়ে এসে জুড়ে বসে যায়। যবে যখন, একবারে যায় না কেন? নাকি গেলোই এবার?
ইফতেখার ঘুম থেকে উঠেছে দেরিতে। অলসভাবেই ফ্রেশ হতেও সময় নিয়েছে নিজের মতো করে। নাশতার জন্য টিনচালার ঘরে গেলে রান্নাঘরে দেখতে পায় মাকে। জিজ্ঞেস করে নাশতা করা যাবে কি না। পারভীন হ্যাঁ সূচক জবাব দিতেই নাশতা দিতে বলে তার পুরনো ঘরে গিয়ে বসে। পরীকে দিয়ে রুটি সবজি পাঠিয়ে দেয় পারভীন। পরী নাশতার থালা দিয়ে আবার পানির জগ নিয়ে আসে। ইফতেখার জিজ্ঞেস করে,
“তোর ভাবি কোথায়? দেখলাম না যে?”
“ভাবি তো চইলা গেছে। আপনারে বইলা যায় নাই?”
“চলে গেছে? কোথায়?”
“বাপের বাড়ি।”
অহেতুক উল্টাপাল্টা বলে চমকে দেওয়া পরীর স্বভাব। তাই বিশ্বাসে নেয় না ইফতেখার সাথে সাথেই। এক টুকরো রুটি ছিঁড়ে মুখে তুলে বলে,
“সিরিয়াস সময়ে উল্টাপাল্টা বলবি তো মাইর খাবি। দেখলে সত্যিটা বল, না দেখলে চুপ থাক। দালানে কাজ করছে?”
“আরে সত্যি কথা কইলেও যে বিশ্বাস করেন না, আপনাগো এইসব তামাশাই ভাল্লাগে না। সকাল সকাল বের হইয়াই ভাবি আমারে জানাইলো উনি চলে যান। তাই যেন আম্মারে বইলা দেই নাশতা তৈর করতে। জিগাইলাম, কই যান? জানাইলো মা’র কাছে যায়। হের পরেও বিশ্বাস না করলে এইবার নিজে খুইজ্জা বাইর করেন গিয়া।”
ঠমক নেড়ে চলে যায় পরী। ইফতেখার বসে থাকে থমকানো মুখে। মুখের রুটিও নড়চড় হচ্ছে না। বরং দাঁতের পাটির শক্ত চাপে পড়ে আছে অনুরাগে। শ্রাবণ সত্যিই চলে গেছে? তার উপর অভিমান করেই? গতকাল থেকেই তো প্রায় কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলো তার সাথে। গত রাতেও কথায় মনোমালিন্য হলো দুজনার। শ্রাবণ বললো, চলেই যাবে। তা-ই কী গেলো সত্যি সত্যি? দিয়ে গেলো তাদের অশান্তি থেকে মুক্তি?

চলবে।