সুখের ঠিকানা পর্ব-২২+২৩

0
110

#সুখের_ঠিকানা
#শারমিন_হোসেন
#পর্ব২২

হসপিটালের করিডোরের সামনে রাখা চেয়ারে বসে আছে লিয়া পাশে রাজিয়া সুলতানা সহ পরিবারের বাকি সদস্যরা। হাঁটুতে দুইহাত ভর দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে আছে লিয়া। ক্রন্দনরত চোখদুটো ফুলে লাল হয়ে আছে। অতিরিক্ত কান্নার ফলে হেডেক হচ্ছে। নামি প্রাইভেট হসপিটালের ছয়তলায় অবস্থান করছে ওরা। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে এনামুল খাঁনকে। উচ্চ রক্তচাপের জন্য হঠাৎ করেই স্ট্রোক করেছেন এনামুল খাঁন।ডিউটিরত অবস্থায় অতিরিক্ত র’ক্ত চাপের কারনে হুট করেই মাথা ঘুরে পড়ে যান।জ্ঞান না ফেরায় ইমিডিয়েইটলি অফিস থেকেই দ্রুত হসপিটালে এডমিট করায়। ড্রাইভার আঙ্কেলের ফোনকলে এনামুল খাঁনের অসুস্থতার কথা শুনতেই লিয়া থমকে যায়।বাবা শব্দে মাত্র দুইটি অক্ষর।তবে এর বিশালতা ব্যাপক।বাবা মানেই এক আকাশ পরিমাণ আনন্দ।বাবা হলেন তপ্ত রোদের মাঝে শীতল ছায়া। প্রকাশ না করা ভালোবাসার মধ্যে বাবার ভালোবাসা সর্বশ্রেষ্ঠ।সব বাবাই তার সন্তানের জীবনে বটবৃক্ষের ছায়ার মতো। ধরণীতে সৃষ্টিকর্তার অনন্য এক সৃষ্টি বাবা।বাবার ভালোবাসা স্বার্থহীন। সন্তানের জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সন্তানের মুখে হাসি ফোটায় বাবা।বাবা ডাকটাই যেনো কতো শ্রুতিমধুর।উফফ!সেই বাবার খা’রাপ নিউজ শুনলে সন্তানের ঠিক থাকা অসম্ভব।ফোনে যখন লিয়া শুনলো তার বাবাকে চেকআপ করে ডক্টর ফাস্ট লাইফ সাপোর্টে রাখতে বলেছেন এটা শোনার সাথে সাথে লিয়ার মাথা চক্কর দিয়ে উঠে।লিয়া চারিদিকে অন্ধকার দেখতে থাকে।মাকে কিকরে বাবার অসুস্থতার কথা বলবে?নিজেই যখন স্বাভাবিক থাকতে পারছে না।লিয়া কান্নায় ভেঙে পড়ে। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতেই মাকে বাবার অসুস্থতার কথা বলে। হসপিটালে আসতেই তাসনিমের সাথে ফাস্ট দেখা হয়।ডিউটিতে থাকা ডক্টরের সাথে কথা বলছিলো।লিয়ারা আসার আগেই তাসনিম হসপিটালে আসে। ড্রাইভার আঙ্কেল একএক করে সবাইকে নিউজটা দেয়। তাসনিম মেডিকেলে ছিলো ওখান থেকে সবার প্রথম আসে। লিয়ারা আসার কিছু সময় পর দাদিমনিসহ বাড়ির সকলেই আসে। ডক্টর বলেছেন পেশেন্ট খুব সিরিয়াস।আমরা সাধ্যমতো ট্রিটমেন্ট করছি আর আপনারা সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করুন।

রাত দশটা বাজতে চললো।এইতো কিছুক্ষণ আগে লিয়ার বড়মা,বড় আব্বু ওনারা চলে গিয়েছেন। হসপিটালে এতো লোকজনের ভীড় না থাকাই ভালো।লিয়ার ছোটো চাচ্চু,জান্নাত বেগম আছেন।লিয়া তাসনিমের কোমড় জড়িয়ে পেটে মুখগুজে আছে। তাসনিম তখন থেকে লিয়াকে বাসায় যাওয়ার কথা বলছে অথচ লিয়া রাজি হচ্ছে না। তাসনিম হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লিয়ার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে আদূরে গলায় ফের বললো,,

“লিয়া টেনশন করিসনা সব ঠিক হয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ।দেখ তুই যদি এভাবে কান্নাকাটি করিস তাহলে মেজোচাচিমার তো আরো খা’রাপ লাগবে।তাই বলছি এভাবে ভেঙ্গে না পড়ে শক্ত হ।আর চাচিমাকে সান্ত্বনা দে। আল্লাহর কাছে প্রে কর।”

তাসনিম একটু থেমে ফের মৃদু আওয়াজে বলতে থাকে,,”চাচিমা লিয়ার তো পরশু থেকে এক্সাম।এভাবে কান্নাকাটি করে নির্ঘুমিয়ে থাকলে তো অসুস্থ হয়ে পড়বে।তুমি একটু ওকে বুঝিয়ে বলো না, প্লিজ।”

রাজিয়া সুলতানা হাতের উল্টো পাশ দিয়ে গাল বেয়ে পড়া পানিটুকু মুছে নিলেন। মূর্তির ন্যায় বসেই ভারী গলায় ঠোঁট আওড়ালেন,,”লিয়া তাসনিম ঠিকই বলেছে।আমার মনেহয় এত লোকজনের ভীড় না থাকাই ভালো।তাই তুই বাসায় যা। আম্মাও তো অসুস্থ মানুষ।তুই তাসনিমের সাথে তোর দাদিমনি আর রাহবারকে নিয়ে বাসায় যা।আমি আর তোর ছোটো চাচ্চু আছি তো।আর ফোনকরে সবসময় খোঁজ খবর নেওয়া যাবে।”

অবশেষে মায়ের কথামতো লিয়া তাসনিমের সাথে দাদিমনি আর রাহবারকে নিয়ে বাসায় ফেরে। ছেলের অসুস্থতার কথা শুনে শোকে পাথর হয়ে গিয়েছেন জান্নাত বেগম।বৃদ্ধা মহিলা কিচ্ছুতেই হসপিটাল থেকে আসতে চাইছিলেন না।ছোটো ছেলে আর তাসনিম অনেক করে বলে কয়ে শেষমেষ রাজি করায়। বাসায় এসে তাসনিম ফ্রিজ খুলে কিছু খাবার দেখতে পায়। সেগুলো গরম করে ‌এতরাতে রান্না করতে ইচ্ছে করলো না।আর রান্না করেও লাভই বা কি কেউ যে আর খাবার খাওয়ার পরিস্থিতিতে নেই।গলা দিয়ে মনেহয়না খাবার নামবে। ‌উফ!

খাবার রেডি করে রাহবারকে প্রথমে খাওয়িয়ে দেয়।হালকা কিছু খেয়ে রাহবার আর খায়না। তাসনিম রাহবারের গায়ে চাদরটা টেনে দিয়ে লাইট অফ করে দিয়ে রুম থেকে বের হয়। অতঃপর দাদিমনির খাবার আর সাথে ঔষধ দেয়। সবশেষে লিয়ার রুমে যায়।লিয়া রুমটা অন্ধকার করে চেয়ারে বসেছিলো। উফ্!লিয়ার মনে হচ্ছে জীবন যেনো একের পর এক চমক দেখাচ্ছে। কিছুদিন আগেই নিজের সাথে এতবড় একটা দূর্ঘটনা ঘটলো।যার শেষটা কিহবে তা আজও অজানা লিয়ার।আবার বাবা নামক সবথেকে আপন জন আজ মৃ’ত্যু’র সাথে লড়ছে।চোখ বন্ধ করতেই টসটসে দুফোঁটা নোনাজল গাল বেয়ে পড়লো লিয়ার। এরমধ্যে রুমে আলো জ্বলে উঠলো। তাসনিম খাবার হাতে লিয়ার রুমে আসে। লিয়াকে বলে কয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করে।একলোকমা ভাত মুখে নিয়ে লিয়া চিবুতে থাকে।গলায় আজ মনে হচ্ছে কেউ যেনো বেড়ি পরিয়ে রেখেছে।খাবারটা গলা দিয়ে নামানো যাচ্ছে না।বাবার সকল স্মৃতি চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভাসতে থাকে। ইশশ্!আজ বাবা সুস্থ থাকলে বাসায় আসার সাথে সাথেই ছেলে মেয়ের খবর নিতো। রোজ কিছু না কিছু হাতে করে আনে।দুইভাইবোনের জন্য আলাদা আলাদা চকলেট বা আইসক্রিম বক্স।মা বকলেও বাবা কখনো ব’কে’না।সব মেয়েদের কাছে বাবা একটু বেশিই প্রিয় হয়।লিয়া অনেক কষ্টে মুখে থাকা খাবারটা গলাধঃকরণ করে ভারী গলায় বললো,,

“আপু আর নয়।জোর করো না, প্লিজ।আমার ভালো লাগছে না।কোনো কিছুই ভালো লাগছে না।”

তাসনিম খাবার প্লেটটা রেখে হাত ধুয়ে নেয়। তাসনিম লিয়াকে এটাসেটা বুঝ দিতে থাকে। তাসনিম বিছানার একসাইডে বসে লিয়া তাসনিমের কোলের উপর মাথা রেখে দুইহাতে কোমড় জড়িয়ে ধরে পেটে মুখগুজে নিশ্চুপ রয়।তাসনিম লিয়ার চুলের মধ্যে বিলি কাটতে থাকে।এভাবে কিছুক্ষণ থাকতে থাকতে লিয়া ঘুমিয়ে পড়ে। লিয়াকে বালিশে শুয়িয়ে দিয়ে লাইট নিভিয়ে তাসনিম সন্তর্পণে রুম থেকে প্রস্থান করে।ফোন করে হসপিটালে খোঁজ নিবে সেইজন্য ব্যাগ থেকে ফোন বের করতেই আলিফের একগাদা মিসড কল দেখতে পায়।ফোন সাইলেন্ট থাকায় খেয়াল করেনি।আগে ছোটো চাচ্চুর সাথে কথা বলে হসপিটালের খোঁজখবর নেয়। অতঃপর আলিফের নম্বরে কল দেয়।কল রিসিভ করতেই তাসনিম মৃদু আওয়াজে সালাম দেয়।ওদিকে ফোনের ওপাশ থেকে আলিফ ব্যতিব্যস্ত হয়ে চিন্তিত গলায় শুধালো,,

“এই তাসনিম তোমার কিহয়েছে বলো তো?এতোবার ফোন দিচ্ছি রিসিভ করছো না যে।ঠিক আছো তুমি? কোনো সমস্যা হয়নি তো? খোঁজ নিয়ে জানলাম তুমি হোস্টেলেও নাকি নেই।তুমি বাড়িতে গিয়েছো?”

ডক্টর সাহেবের উতলা হয়ে একনাগাড়ে এতগুলো প্রশ্নশুনতে তাসনিমের মন্দ লাগলো না।ডক্টর সাহেব যে এতো এতো ব্যস্ততার মাঝেও এতবার কল করেছে ইভেন হোস্টেলে পর্যন্ত খোজ নিয়েছে এটা শুনতেই তাসনিমের খুব ভালো লাগলো। প্রত্যেকটা নারীই চায় তার প্রিয় মানুষ সকল ব্যস্ততার মাঝেও তার খোজ নিক। যেখানে তাসনিম এতটা আশাই করিনি সেখানে ডক্টর সাহেব তো একদম টিনেজারদের মতো উতলা প্রেমিক হয়ে গিয়েছে দেখছি।কি সাংঘাতিক ব্যাপার স্যাপার। অজান্তেই তাসনিমের মনটা পুলকিত হলো। তাসনিম ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলো।একহাতে ফোন কানে ধরে ঘাড়টা একটু হেলিয়ে অন্যহাতে লোহার গ্রিল খুঁটতে থাকে আর মৃদুস্বরে বললো,,

“রিল্যাক্স জনাব রিল্যাক্স।এতো হাইপার হওয়ার কিছু নেই।আমি ঠিক আছি।তবে একটা বড় সমস্যা হয়েছে।”

প্রথম কথাগুলো শুনে হাফ ছেড়ে বাঁচতে না বাঁচতেই তাসনিমের শেষের কথা শুনে তাৎক্ষনিক আলিফের ভ্রু যুগল ঈষৎ কুঞ্চিত হলো।সাথে সাথেই চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করে উঠলো,,

“কি সমস্যা?কি হয়েছে?”

তাসনিম শর্টকাটে সবটা বলে।আলিফ মনোযোগ সহকারে সবটা শোনে।আলিফ ছোট শ্বাস ফেলে সান্ত্বনা দিয়ে বলে,,”চিন্তা করো না।সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লাহর উপর ভরসা রাখো। সৃষ্টিকর্তাকে বেশি বেশি স্মরণ করো। ট্রিটমেন্ট চলছে ইনশাআল্লাহ আঙ্কেল সুস্থ হয়ে যাবেন।”

একটু থেমে ফের ইতস্তত করে বললো আলিফ,,” ভাবছি কালকে আক্কেলকে একবার দেখতো যাবো ।তুমি থাকছো তো?”

তাসনিম ব্যালকনিতে থাকা চেয়ারে গা এলিয়ে বসলো। অতঃপর বলল,,”হুম।তবে কি পরিচয় দিবেন?আমার পরিবারের সদস্যরা তো থাকবে। তখন কি বলবো? বিষয়টা কিরকম হবে না?”

আলিফ স্মিত হাসলো। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,,
“তাইতো?ভেবে দেখিনি তো।এখন দেখছি পরিচয়ের জন্য হলেও আর ওয়েট করা যাবে না। খুব দ্রুতই তোমার বাড়িতে প্রস্তাব পাঠাতে হবে।”

একটু থেমে সম্মোহনি স্বরে ডাকলো,,”এই তাসনিম।”

তাসনিম ছোট করে বললো,,”হুম।”

“জানো যখন আমার একের পর এক কল তুমি তুলছিলে না।তখন আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো।এতোএতো অক্সিজেন থাকা সত্ত্বেও আমার মনে হচ্ছিলো,আমি বোধহয় সাফোকেটিংয়ে ভুগছি।বুকের বা পাশে চিনচিনে ব্যথা অনুভব হচ্ছিলো।ভাবছিলাম,হুট করে বাড়ীতে গিয়ে আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসোনি তো।আবার যদি এরকম হয়,আমি কিন্তু সত্যি তোমাকে জোর করে হলেও বিয়ের আসর থেকে তুলে নিয়ে আসবো।তাই ভুলেও এই ভুল দ্বিতীয়বার করতে যেয়ো না। এলার্ট করে রাখলাম।”

তাসনিম একহাতে কপালের উপর আসা চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে ক্ষীণ আওয়াজে বললো,,”ধ্যাত আমি টেনশনে আছি।আর আপনি ফা’জ’লা’মো করছেন।”

আলিফ লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে বললো,,”তোমার কাছে ফা’জ’লা’মো মনে হলেও,আমি কিন্তু মোটেই ফা’জ’লা’মো করছি না ‌।আ’ম সিরিয়াস যাইহোক, টেনশন করো না।খাবার খেয়েছো?”

“হুম।”

“আচ্ছা রাত অনেক হয়েছে এবার ঘুমিয়ে পড়ো।বায় টেক কেয়ার।”

“ওকে।বায়।”
.
পরেরদিন,,,
পড়ন্ত বিকেল।জারিফ ড্রয়িংরুমে বসে ল্যাপটপ কোলের উপর রেখে কিছু একটা করছিলো।এমন সময় জাহানারা বেগম এসে জারিফের পাশে বসেন।জারিফ ল্যাপটপ থেকে মাথাটা তুলে ডান সাইডে ঘাড় ঘুরিয়ে মাকে একনজর দেখে মৃদুস্বরে বললো,,”কিছু বলবে মা?তোমাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে।কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করছো নিশ্চয়।”

জাহানারা বেগম মুখটা মলিন করে চিন্তিত গলায় ঠোঁট আওড়ালেন,,”জারিফ বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে তোর বাবা এখনো বাসায় ফিরলো না যে। দুপুরে লাঞ্চ করতে আসেনি।আর রোজ তো চারটার দিকেই অফিস থেকে চলে আসে।আজ এখনো আসছে না।তারউপর কয়েকবার কল করলাম ফোন তুললো না।বেজে বেজে কে’টে গেলো।”

জারিফ ল্যাপটপ অফ করে পাশে নামিয়ে রাখলো।কপাল কুঁচকে মায়ের মুখপানে চাইলো। ব্যস্ত কন্ঠস্বরে বললো,,”আচ্ছা আমি বাবার অফিসে ফোন করে দেখছি।বাবা অফিসে আছে কিনা?”

ফোন ওপেন করতেই নীলের নম্বর থেকে একটা মিসড কল দেখতে পায়। ভার্সিটি থেকে বাসায় আসার পর ফোন চেক করা হয়নি। হয়তো দুপুরে রুমে ছিলনা এমন সময় নীল কল দিয়েছিলো।তবে জারিফ ভাবে আগে বাবার অফিসে কল দিয়ে নেই। নীলের সাথে পরে কথা বলা যাবে। কন্টাক্ট লিস্ট থেকে বাবার অফিসের টেলিফোন নম্বর খুঁজতে থাকে। আনোয়ার রহমান সরকারি চাকরি করেন****অধিদপ্তরের নবম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা।আর বছর খানেক আছে চাকরীর বয়স।এরমধ্যে নিরুপমা বেগম এসে দাড়িয়ে শাড়ির আঁচলে হাতটা মুছতে মুছতে বললেন,,”নীলেরও তো কোনো খবর নেই।সেই সকালে বেরিয়েছে দুপুরে খাবার খাওয়া নেই গোসল নেই।কোথায় টইটই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে তা আল্লাহ জানে আর ও জানে।আজ আসুক ওকে আচ্ছাকরে ব’কতে হবে।পড়ালেখার নাম গন্ধ নেই শুধু বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে বেড়ানো।”

এরমধ্যে কল্পনা বেগমও এসে সোফায় গা এলিয়ে বসেন। হঠাৎ কলিংবেলের শব্দ হয়। নিরুপমা বেগম দরজা খুলে দেন।জারিফ মাত্রই কল করতে যাবে তখন আনোয়ার রহমান আর পিছনে নীলকে দেখতে পায়।আনোয়ার রহমান সিঙ্গেল সোফায় গা এলিয়ে বসেন।একহাতে শার্টের হাতার কাছের বোতাম খুলতে থাকেন। জাহানারা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,

“জারিফের মা একগ্লাস ঠান্ডা পানি দাও তো।”

জাহানারা বেগম উঠে দাঁড়িয়ে ডায়নিংএ গিয়ে পানি এনে বাড়িয়ে দিয়ে কপাল কুঁচকে শুধালেন,,”এতো দেরি হলো যে। দুপুরে লাঞ্চ করতেও আজ আসোনি যে।কল দিলাম তুললে না।”

নীল জারিফের পাশে ফাঁকা জায়গায় ধপ করে বসে পড়ে। টিশার্ট এর উপরের বোতাম খুলে সোফায় গা এলিয়ে দেয়। নিরুপমা বেগম ছেলের দিকে কটমট চোখে তাকিয়ে আছেন।তবে বড় ভাসুর উপস্থিত থাকায় কিছু বলতে পারছেন না।না হলে এতক্ষণ ইচ্ছে মতো ঝাড়তেন।

আনোয়ার রহমান ঢকঢক করে পানিটুকু খেয়ে গ্লাস টা জাহানারা বেগমের হাতে ধরিয়ে দিয়ে একটু নড়েচড়ে বসলেন।মুখায়ব টানটান করে গম্ভীর গলায় বললেন,,”হসপিটালে গিয়েছিলাম।লিয়ার বাবা এনামুল খান খুব অসুস্থ।গতকালকে স্ট্রোক করেছেন। দেখতে গিয়েছিলাম।”

জারিফ তড়িৎ বাবার দিকে মুখটা তুলে চাইলো।জারিফের ভেতর প্রশ্নের সৃষ্টি হয় বাবাকে খবর দিলো কে?জারিফ কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করেই উঠলো,,”বাবা তোমাকে কে বললো?না মানে তুমি কিভাবে শুনলে?”

আনোয়ার রহমান ছেলের মুখশ্রীতে একনজর চাইলেন।হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গম্ভীর মুখায়ব করে বললেন,,
“তোমার তো একটিবার হলেও যাওয়া উচিৎ ছিলো জারিফ।আর আমাকে খবরটা নীলের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে।নীল দুপুরে ফোন দিয়ে বললো।অফিস থেকেই সরাসরি হসপিটালে গিয়েছিলাম।ওখানে গিয়ে নীলকে দেখতে পাই।”

জারিফ নীলের দিকে একবার তাকালো আবার বাবার দিকে তাকিয়ে ক্ষীন আওয়াজে বললো,,”আমি জানতাম না।আর খবরটা তোমার কাছ থেকেই ফাস্ট শুনছি।”

আনোয়ার রহমান গম্ভীর কন্ঠেই বলতে থাকেন,,”তুমি জানতে না সেই ব্যর্থতা তোমার।তুমি নিজেকে তাদের কাছে সেইভাবে প্রেজেন্ট করতে পারোনি।যে তাদের সুখ বা দুঃখের যেকোন পরিস্থিতির কথা তোমার কাছে শেয়ার করবে।তোমাকে কোনো খবর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করবে।নিজেকে এতটা ইম্পর্ট্যান্ট করে তুলতে পারোনি তুমি।সেই ব্যর্থতা সম্পূর্ণ তোমার।”

জারিফ মাথাটা নুইয়ে চুপচাপ থাকে। জাহানারা বেগম কিছুটা বিরক্তিকর ফেস করে বললেন,,”নীল তুই কিকরে জানলি?আর তোর বড় আব্বুকে জানানোর সময় জারিফকে একবার ফোন দিয়ে জানাসনি কেনো?”

নীল আমতা আমতা করে বললো,,”আমি লিয়ার থেকে শুনেছিলাম।আর ব্রো কে জানাতে কল করেছিলাম ব্রো হয়তো ব্যস্ত ছিলো তাই রিসিভ করেনি বা খেয়াল করেনি।তারপর ব্রো কে হটস আ্যপে মেসেজ দিয়েছিলাম।মেসেজ বোধহয় এখনও সীন করেনি।”

জারিফ বললো,,”তোর কল আমি খেয়াল করিনি। ‌এই একটু আগে তোর কল দেখলাম । ভার্সিটি থেকে আসার পর অনলাইনে আর যাইনি।তাই মেসেজ সীন করা হয়নি।”

জারিফ মনেমনে আওড়ায়,লিয়া নীলকে খবরটা দিয়েছে।অথচ আমাকে দেওয়ার একবারো প্রয়োজন বোধ করলো না।তারমানে লিয়ার সাথে নীলের রেগুলারলি কথা হয়।

লিয়ার ফেসবুক আইডির সাথে নীল এ্যড আছে। খুব কমই কথা বলা হয়।আজকে দুপুরে লিয়া একটা পোস্ট করে।যেখানে লিয়ার বাবার আইসিইউতে থাকা একটা ছবি।সাথে লেখা সবাই আমার আব্বুর জন্য দোয়া করবেন।দুপুরে এই পোস্টটা দেখার সাথে সাথেই নীল লিয়াকে কল করে।তখন সবটা জানতে পারে। আনোয়ার রহমান জারিফকে উদ্দেশ্য করে ফের বললেন,,”জারিফ সন্ধ্যার পর তুমি হসপিটালে যাবে।যাইহোক যেহেতু জানতে না।এখন তো জানলে।”

জারিফ হ্যা সূচক বলে। এমন সময় কল্পনা বেগম ফোড়ন কে’টে বললেন,,”ভাইজান তুমি মিছেমিছি ছেলেটাকে এভাবে বলছো কেনো বলোতো?তারা না জানালে এখানে জারিফের কি দোষ? আর তাড়াই বা কোন আক্কেলের লোক একবারো জানানোর প্রয়োজন বোধ করলো না।আমার মনেহয় ভাইজান যেখানে ওনারা নিজে থেকে জানাইনি সেখানে জারিফের না যাওয়াই ভালো। জারিফ কেনো হুদায় যেতে যাবে। যেখানে একটাবারো ফোন করে জানালো না।সেখানে নিজ থেকে না গেলেই ভালো হয় ‌।”

আনোয়ার রহমান শান্ত কন্ঠে বললেন,,”এটা কোনো বিয়ে বা কোনো অনুষ্ঠান নয়, যে ফোন করে জনেজনে বলবে।আর সেখানে বিনা দাওয়াতে যাওয়া যাবে না। একজন মানুষ অসুস্থ সেখানে দেখতে যাওয়া হিউম্যানিটির মধ্যে পড়ে।তাদের পরিবারের একজন গুরুত্বর অসুস্থ সেখানে তাদের মনমানসিকতা নিশ্চয় ভালো নেই। তারা বললো না সেইজন্য আমি আমার দায়িত্ব পালন করলাম না এটা কোনো মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন মানুষের কথা নয়।আগে পরিস্থিতিটা বুঝতে হবে।”

কল্পনা বেগমের মুখটা মূহূর্তেই কালো হয়ে যায়।মুখটা থমথমে হয়ে যায়।কথার পিছে বলার মতো কিছুই খুঁজে পেলেন না। জাহানারা বেগম ওনার স্বামীকে শুধালেন,,”ভদ্রলোককে এখন কেমন দেখলে।না মানে খুব সিরিয়াস কি?”

আনোয়ার রহমান বললেন,,” ডক্টর বলেছেন আটচল্লিশ ঘন্টা না যাওয়া অব্দি বলা যাচ্ছে না ডেঞ্জার মুক্ত কিনা।যাইহোক সবাই সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করো,যাতে করে মানুষটা সুস্থ হয়ে যায়। বাচ্চা ছেলে মেয়ে আছে।তাদের জন্য হলেও যেনো আল্লাহ ওনাকে হায়াত দান করেন।”

জারিফ উঠে রুমে যায়।কোনো রকমে রেডি হয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
.
লিয়ার ছোটো চাচ্চু কাজের জন্য একটু বাইরে গিয়েছে। হসপিটালে লিয়া আর রাজিয়া সুলতানা দুজনে আছে।লিয়া দুপুরে আসছে।রাজিয়া সুলতানা করিডোরের সামনে চেয়ারে বসে আছেন ‌।লিয়া মায়ের পাশে মায়ের কাঁধে মাথা দিয়ে বসে আছে।রাজিয়া সুলতানা লিয়াকে বললেন,,

“লিয়া সন্ধ্যা হয়ে আসছে।যা বাসায় যা।তোর দাদিমনি রাহবার একলা আছে।তুই যা।আর এমনিতেও তোকে বাসায় যেতে হবে।কালকে তোর পরিক্ষা।তাই এখন ড্রাইভারের জন্য বসে না থেকে রিকশা নিয়ে বাসায় চলে যা।”

লিয়া মৃদুস্বরে বললো,,”একটু পরে যাই।ভালো লাগছিলো না বাসায়।”

রাজিয়া সুলতানা ফের বললেন,,”আরেকটু দেরি করলে সন্ধ্যা হয়ে যাবে তো।তখন একা একা কিকরে যাবি? তার থেকে এখনই চলে যা কেমন।”

লিয়া মায়ের কাঁধ থেকে মাথাটা তুলে বাম সাইডে তাকাতেই দেখতে পায় জারিফ আর তাসনিম পাশাপাশি হেঁটে কিছু বলতে বলতে আসছে। তাসনিম আর জারিফকে পাশাপাশি দেখে লিয়ার মনের ভেতর কালবৈশাখীর ঝড় শুরু হয়। মূহুর্তেই মনটা বিষাদে ছেয়ে যায়।লিয়া তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে মনেমনে আওড়ায়, উফ্ফ!আপুর সাথে উনার কন্টাক্ট হয়। তারমানে উনি এখনো আপুকে চায়।”

চলবে,,,

#সুখের_ঠিকানা
#শারমিন_হোসেন
#পর্ব২৩

লিফটে জারিফের সাথে তাসনিমের দেখা হয়। তাসনিম মেডিকেল থেকে হোস্টেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে হসপিটালে আসছিলো।এমন সময় লিফটে উঠতেই কাকতালীয়ভাবে জারিফকে দেখতে পায়।সৌজন্যতার খাতিরে প্রথমে তাসনিমই কথা বলে।জারিফ স্বাভাবিকভাবে কার্টেসি মেইনটেইন করে। ছয়তলায় এসে লিফটের দরজা খুলতেই দুজনে একসাথেই আসে।জারিফ ভদ্রভাবে তাসনিমকে শুধায়,,”আঙ্কেলের কন্ডিশন এখন কিরকম?”

তাসনিম যতটুকু জানে সেটাই বলতে বলতে আসছিলো। তাসনিম আর জারিফকে পাশাপাশি দেখে লিয়ার মনের আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করে।না চাইতেও অদ্ভুত অদ্ভুত কথার সঞ্চার হতে থাকে লিয়ার মনমস্তিষ্কে।লিয়া ভাবে,ওনাদের দুজনের হয়তো যোগাযোগ আছে।আর যোগাযোগ যদি নাই থাকে তাহলে তো একসাথে আসার প্রশ্নই উঠে না।লিয়া ভগ্ন হৃদয় নিয়ে মনেমনে আওড়ায়,জারিফ আপনাকে আপুর সাথেই হসপিটালে আসতে হলো।জানি ফর্মালিটিজ মেইনটেইন করতে আসছেন।তবুও একাএকা আসা যেতো না? উফ্!আমিই হয়তো বো’কা আপনার সেদিনের আচরণে অনেক কিছু ভেবে নিয়েছিলাম।এখন দেখছি আমি সম্পূর্ণ ভুল ছিলাম।

জারিফ কাছাকাছি আসতেই লিয়া দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে।জারিফ রাজিয়া সুলতানাকে সালাম দিয়ে নরমাল কার্টেসি মেইনটেইন করে।জারিফ সবার আড়ালে লিয়ার মুখপানে চাইলো।লিয়ার মুখটা মলিন হয়ে আছে।লিয়ার মুখটা ফ্যাকাসে শুকনো দেখাচ্ছে।লিয়ার ইন্নোসেন্ট বিবর্ণ মুখটা দেখে জারিফের মায়া হলো।হৃদয়ে ব্যাথা অনুভব হলো।লিয়ার সাথে কথা বলার জন্য মনটা ব্যাকুল হতে থাকে।তবে রাজিয়া সুলতানা আর তাসনিম পাশে থাকায় লিয়াকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে ইতস্তত বোধ করে জারিফ। লিয়া জারিফের দিকে চাইলো না।অন্যদিক তাকিয়েই রাজিয়া সুলতানাকে উদ্দেশ্য করে রাশভারী কন্ঠস্বরে ঠোঁট আওড়ালো,,”আম্মু আমি আসছি।”

তাসনিম কপাল কুঁচকে বললো,,”বাসায় যাবি।একটু পরে গেলে হতো না?”

লিয়া সোজাসুজি স্পষ্টভাবে বললো,,”আপু সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে আমাকে বাসায় যেতে হবে। রাহবার,দাদিমনি একা আছে।”

এরমধ্যে রাজিয়া সুলতানা বললেন,,”তাসনিম থাক। সন্ধ্যা হয়ে আসছে লিয়া যাবে বলছে যাক।বাসায় আম্মা,রাহবার একলা আছে।কাজের মেয়েটাও নেই।ছুটিতে গ্রামে গিয়েছে।”

মায়ের সম্মতি পেতেই লিয়া কোনোদিকে না তাকিয়ে পা বাড়ায়।জারিফ সকল ইতস্তত অস্বস্তিবোধ দূরে ঠেলে স্বাভাবিকভাবে বলে উঠলো,,”এই লিয়া ওয়েট। কিছুক্ষণ ওয়েট করো আমি তোমাকে নিয়ে যাবো।”

লিয়া থেমে যায়। লিয়ার ইচ্ছে করছিলো বলতে, আমি একাই পারবো।আপনাকে খামোখা কষ্ট করতে হবে না।আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না।তবে মা আর বড় বোনের সামনে জারিফকে ছোট করতে মনটা সায় দিলো না।জারিফের কথার বিরোধিতা করে অন্যদের সামনে তাকে অপমান করতে লিয়ার ইচ্ছে হলো না।লিয়া মনেমনে পণ করলো,একাই যাবে।তবে এখন আম্মু আর আপুর সামনে সেটা প্রকাশ না করাই ভালো হবে।নিচে গিয়ে রিকশাতে যাবে বলে লিয়া মনঃস্থির করে।

জারিফ এনামুল খাঁনকে দেখে এসে।রাজিয়া সুলতানার সাথে ভালো-মন্দ কিছু কথা বলে বিদায় নেওয়ার সময় নম্র কন্ঠে বললো,,”আন্টি টেনশন করবেন না। আঙ্কেল ঠিক হয়ে যাবে।আমরা সবাই আছি তো একদম ভেঙ্গে পড়বেন না।আর আমার মনেহয় এখন থেকে ছোটো ছোটো সব বিষয়ে সিরিয়াস হওয়া দরকার।কোনো ছোটো খাটো অসুবিধাকে কিছু মনে না করে পুষে রাখা ঠিক নয়। ছোটো ছোটো সমস্যার থেকেই বড় সমস্যা ক্রিয়েট হয়।যাইহোক এখন করার কিছুই নেই।ডক্টর যেভাবে বলে সেইভাবে সবকিছু মেনে চলাই বেটার।”

রাজিয়া সুলতানা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,,”হ্যা বাবা ঠিক বলেছো।আসলে তোমার আঙ্কেলের পেশার বেশি থাকা সত্ত্বেও মুখে যা ভালো লাগতো সেটাই খাওয়ার অভ্যাস ছিলো।কোনো কিছু মানতেন না।যার ফলস্বরূপ আজ।”

এতটুকু বলে একটু থামেন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। কিয়ৎকাল পরে ভরাট গলায় বললেন,,”আচ্ছা বাবা রাত হয়ে যাচ্ছে।আর দেরি করা ঠিক হবে না তুমি লিয়াকে বাসায় পৌঁছে দাও।রাহবার একা আছে।একাএকা ওর নিশ্চয় খুব খা’রাপ লাগছে।”

যাওয়ার আগে রাজিয়া সুলতানা লিয়াকে কাছে ডেকে একটু মৃদুস্বরে বললেন,,”লিয়া রাতে হালকা কিছু রান্না করে রাখিস কেমন। সকালে সেগুলো গরম করে খেয়ে পরীক্ষা দিতে যাস।পরিক্ষা দিতে যাওয়ার আগে আমি ভিডিও কলে কথা বলে নেবো।আর চিন্তা করিস না। খাওয়া-দাওয়া করিস আর ঠিকমতো ঘুমাস। ব্রেনের উপর বেশি প্রেশার দিস না। পরীক্ষার রেজাল্ট যেনো আশানুরূপ হয়।তোর আব্বু সুস্থ হওয়ার পর যদি শোনে তোর পরিক্ষা ভালো হয়নি, তাহলে মানুষটা কিন্তু নিজেকে দায়ী ভাববে।ভাববে তার অসুস্থতার জন্যই তোর পরিক্ষা ভালো হয়নি।”

কথাগুলো বলতে রাজিয়া সুলতানার গলার স্বর ভারী হয়ে আসছিলো।লিয়া হুট করে মা’কে জড়িয়ে ধরলো। কাঁধে মাথা রাখলো। ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকানোর বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।রাজিয়া সুলতানা লিয়ার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে আদূরে গলায় বললো,,
“লিয়া মন খা’রাপ করিস না।সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।”

জারিফ একটু দূরে দাঁড়িয়ে মা মেয়ের এই সুন্দর স্নেহময় দৃশ্যটা দেখতে থাকে।লিয়া যে খুব আবেগি তা লিয়াকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে জারিফের সাথে নিচে নামে।নিচে নেমেই লিয়া জিদ ধরে বলে উঠলো,,”আমি রিকশাতেই যেতে পারবো।আপনাকে কষ্ট করে যেতে হবে না।”

জারিফ নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে শীতল চাহনিতে লিয়ার দিকে চাইলো। কন্ঠে শীতলতা নিয়ে বললো,,”তোমাকে পৌঁছে দিতে আমার কষ্ট হবে।আমি একবারো বলেছি এটা?”

“কিছু কিছু কথা বলতে হয়না।এমনিতেই বোঝা যায়।বা বুঝে নিতে হয়।”

জারিফ ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করে উঠলো,,”আমার সম্পর্কে কি বুঝেছো তুমি?টেল মি ”

লিয়া মাথা নুইয়ে ক্ষীণ আওয়াজে বললো,,”এইযে জাস্ট সৌজন্যতার জন্য আমাকে পৌঁছে দিতে চাইছেন।এটা আমি বুঝি।তাই বলছি আপনাকে এসব ফর্মালিটিজ পালন করতে হবে না।আমি একাই যেতে পারবো।”

কথাটা শেষ করে লিয়া উল্টোদিক ফিরে যেতে থাকে।লিয়ার কথা শুনে জারিফের মেজাজ বিগড়ে যেতে থাকে।এই মেয়ে সবসময় উল্টোপাল্টা বুঝবে আর সেই অনুযায়ী জিদ ধরে থাকবে।জারিফ ফোঁস করে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেললো।লিয়ার হাত ধরে টান দিয়ে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো।লিয়া জারিফের একদম কাছাকাছি গিয়ে ঠেকলো।বিষয়টাতে লিয়া ভড়কে যায়।জারিফ দুইহাতে লিয়ার দুইকাধ ধরে চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,,”তোমার প্রব্লেমটা কোথায়?বলবে তো আমার এই সমস্যা।সব সময় তুমি তোমার জিদ ইগো নিয়ে থাকো।নিজের যেটা মনেহয় সেটাই বলে ফেলো।নিজের আর্জি মতো চলো।কি করলে তোমার মনে হবে সবকিছু আমি সো কল্ড ফর্মালিটিজ থেকে করছি না।কেনো বারবার মেজাজ বিগড়ে দেও আমার।যাতে করে তোমার সাথে রুঢ় আচরণ করতে হয়।”

লিয়া জারিফের কথায় বোকা বোকা চোখে চেয়ে রইলো।জারিফ লিয়ার দুইবাহু একটু শক্ত করে ধরায় লিয়া ব্যাথা পাচ্ছিলো।লিয়া আশেপাশে তাকিয়ে দেখে লোকজন চেয়ে আছে।লিয়া ক্ষীন আওয়াজে ঠোঁট মেলে বললো,,”আহ্!আমার লাগছে ছাড়ুন।আর সবাই তাকিয়ে আছে। কি ভাবছে বলুন তো?”

জারিফ নিজেকে ধাতস্থ করে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে।লিয়াকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। অপরাধীর স্বরে বললো,,”সরি।”

চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে গম্ভীর মুখায়ব করে ফের বললো,,”লিয়া অনেক হয়েছে আর সিনক্রিয়েট করতে বাধ্য করো না।তাই বলছি আর কোনো কথা না বলে ফাস্ট গাড়িতে বসো।”

লিয়া গাল ফুলিয়ে রাখে। শেষমেষ গাড়িতে উঠে বসে। জারিফ গাড়িতে বসে সিট বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে লিয়ার দিকে চাইলো।একটু ত্যাড়া করে বললো,,”সেই তো আমার কথা শুনলে।আগে থেকে গুড গার্লের মতো কথা শুনলে তোমার সাথে রুঢ় আচরণ করতে হতো না।জিদ ধরে না থাকলে তোমাকে হার্ট করতে হতো না। অর্ধাঙ্গিনীকে নাকি বাম পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।আর বাম পাজরের হাড় বাঁকা থাকে।তোমাকে দেখে তো প্রুভ হয়ে যাচ্ছে তা।তোমাকে নিয়ে চলা আমার মুশকিল হয়ে যাবে।সবসময় সব কথায় বেঁকে বসা তোমার নেচার। উফ্! সংসার লাইফ শুরু করার আগেই তোমাকে নিয়ে চলতে আমি হিমশিম খাচ্ছি।না জানি সামনে আরো কি কি ওয়েট করছে আমার জন্য।কপাল করে এমন একটা ঘাড় ত্যাড়া বউ পেয়েছি।হে মাবুদ!রক্ষা করো।”

জারিফের মুখে বউ শব্দটা শুনে লিয়ার সারা শরীর জুড়ে শিহরণ খেলে যায়। অদ্ভুত সুন্দর এক অনুভূতি হয় লিয়ার হৃদয়ে ‌।এতক্ষণের রা’গ ক্ষোভ যেনো মূহূর্তেই বরফের মতো গলতে শুরু করে। জারিফ একমনে ড্রাইভ করছে।লিয়ার জানতে ইচ্ছে করছিলো তাসনিমের সাথে জারিফের কন্টাক্ট হয় কিনা। লিয়া উসখুস করতে থাকে। অবশেষে নিজেকে দমিয়ে রাখতে না পেরে লিয়া কৌশলে জারিফকে শুধায়,,

“আব্বুর অসুস্থতার কথা আপনি নিশ্চয় আপুর থেকে শুনেছেন?”

জারিফের তীক্ষ্ণ নার্ভ ঠিকই বুঝতে পারলো লিয়া একচুয়েলি কি বলতে চাইছে।জারিফ দৃষ্টি সামনে রেখেই মৃদু হাসলো। জারিফ উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে উঠলো,,”তাসনিম আর আমাকে একসাথে দেখে তুমি জেলাস ফিল করছিলে নিশ্চয়।তোমার রাগ ক্ষোভ হচ্ছিলো আমার উপর।কোনটা?”

লিয়া এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো।জড়তা নিয়ে তড়িৎ ঠোঁট আওড়ালো,,”ম মোটেই না। তেমন কিছুই না।”

লিয়ার জড়ানো কন্ঠের কথা শুনে জারিফের হাসিটা বৃদ্ধি পেলো।ঠোঁটের কোণে বিস্তৃত হাসির রেখা রেখেই কন্ঠে একরাশ শীতলতা নিয়ে জারিফ ফের বললো,, “তোমরা মেয়েরা হাজার এডুকেটেড হলেও এই বিষয়টার ক্ষেত্রে কেমন যেনো মূর্খতার পরিচয় দাও।তবে এটা ভালো বৈশিষ্ট্য।আই লাইক ইট।যাকে যে নির্ভেজাল ভালোবাসে সে অন্যের সঙ্গে সহজে মেনে নেয় না। নিঃসন্দেহে এটা ভালো চরিত্রের এট্রিবিউট। তাসনিমের সাথে আমার কো-ইন্সিডেন্সলি লিফটে দেখা হয়ে যায়। তাসনিম এর সাথে আমার যোগাযোগ নেই। আমি আঙ্কেলের অসুস্থতার কথা বাবা আর নীলের মাধ্যমে ফার্স্ট শুনি।”

লিয়া খুবই লজ্জিত হয়।লিয়ার নিজের উপরই রা’গ হতে থাকে। শুধুশুধু কিসব ভেবে বসেছিলো।লিয়া নিজের উপর অনুতপ্ত হয়।জারিফ একটা রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি দাঁড় করায়। গাড়ি থেকে নামতে নামতে বললো,,”লিয়া তুমি একটু ওয়েট করো।আমি এক্ষুনি আসছি।”

লিয়া ঘাড় নাড়ায়। যার অর্থ”ঠিক আছে”লিয়ার পাল্টা কোনো প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হলো না।কারন লিয়া বেশ জারিফকে বুঝতে পেরেছে।কোনো কাজ বা কারন ছাড়া জারিফ সময় অ’প’চয় করবে না। পাঁচ মিনিটের মধ্যে জারিফ চলে আসে।হাতে পলিথিনের প্যাকেট যার ভেতর খাবারের প্যাকেটগুলো দৃশ্যমান।তবে লিয়া কিছুই বললো না।লিয়াদের বাসার সামনে গাড়ি এসে থামতেই লিয়া সিট বেল্ট খুলতে থাকে।জারিফ লিয়ার দিকে ঘুরে তাকালো।লিয়াকে বললো,,

“লিয়া তোমার মোবাইলটা একটু দাও।”

লিয়া অবাক হলো। অবাক চোখে চেয়ে ঠোঁট নেড়ে রিপিট করলো,,”মোবাইল।”

জারিফ এককথায় “হুম”বলে। লিয়া পার্স থেকে ফোন বের করে জারিফের দিকে বাড়িয়ে দেয়।জারিফ সোজাসুজি বললো,,”লকড খুলে দাও।”

লিয়া ফিঙ্গার স্পর্শ করিয়ে লকড খুলতে থাকে আর ভাবে,ফোন দিয়ে কি করবে, অদ্ভুত!কিছু কি চেইক করতে চাইছে নাকি?লিয়া এসব মনেমনে বললেও মুখে কিছু না বলে জারিফের দিকে বাড়িয়ে দেয়। জারিফ সরাসরি ডায়ালে গিয়ে নিজের নম্বরটা তুলে সুন্দর করে ইংরেজি ফন্টে জারিফ নামে সেভ করে। অতঃপর কল দেয় নিজের নম্বরে। এরমধ্যে জারিফের ফোনে আলো জ্বলে উঠলো।এটা দেখে লিয়া বিষয়টা সহজেই বুঝতে পারলো।জারিফ তখনই লিয়ার ফোন লিয়ার হাতে ধরিয়ে দিলো।আর বললো,,

“কল লিস্টে সবার উপরে নিজেকে রাখলাম।যদি কোনো দরকার পড়ে সবার আগে আমাকে জানিয়ো কেমন।রাতে বা যেকোনো সময় দরকার পড়লে কোনো হেজিটেশন ছাড়াই ফোন দিও।”

লিয়া ঘাড় নাড়ায়।লিয়া নেমে দাঁড়ায়।জারিফ খাবারের প্যাকেটগুলো লিয়ার হাতে ধরিয়ে দেয়।লিয়া মৃদু আওয়াজে বললো,,”এগুলোর কি দরকার ছিলো।এত খাবার শুধুশুধু ন’ষ্ট হবে।”

“না খেলে তো ন’ষ্ট হবেই।খাবে তাহলে ন’ষ্ট হবে না।”

জারিফের স্পষ্ট জবাব। লিয়া সৌজন্যতার খাতিরে বললো,,”ভিতরে আসুন।চা বা কফি খেয়ে যাবেন।”

জারিফ স্মিত হেসে বললো,,”প্লিজ,আজ নয়।পরে আসবো।আমাকে এখন একটু টাউনহলে যেতে হবে।একটু কাজ আছে।”

জারিফ একটু থেমে ফের নরম স্বরে বলতে থাকে,,”লিয়া একদম টেনশন করো না।দেয়ার ইস নো কজ ফর ওয়ারি। আঙ্কেল সুস্থ হয়ে যাবেন।সবাই মিলে ওনার সুস্থতা কামনা করা হচ্ছে। সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয় সুস্থ করে দিবেন।মাথায় বেশি পেশার না নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করো।আর ঠিকমতো খাবার খেয়ো।ভালোভাবে পরীক্ষার প্রিপারেশন নিও কেমন।টেক কেয়ার।”

লিয়া মাথা দুলালো।যার মানে ঠিক আছে।লিয়া কোমল স্বরে বললো,,”দেখেশুনে যাবেন।বায়।”

জারিফ বিনিময়ে স্মিত হাসলো।
.
লিয়ার মনটা বেশ ভালো আছে।একটু আগে হসপিটাল থেকে ছোটো চাচ্চু ফোন করে বলেছে, ডক্টর বলেছেন পেশেন্ট এখন আগের থেকে অনেকটা বেটার আছে।এরকম থাকলে দুই একদিনের মধ্যেই বেডে শিফট করা যাবে।

রাত সাড়ে বারোটা বাজতে চলছে। ‌লিয়া পড়ার টেবিলে বসে পড়ছে।এমন সময় ফোনে আলো জ্বলে উঠলো।ফোনের স্ক্রিনে জারিফের নামটা জ্বলজ্বল করছে।লিয়া কয়েক সেকেন্ড দেখে নিয়ে কল তুললো। রিসিভ করে সালাম দিলো।জারিফ বিছানার হেডে হেলান দিয়ে পায়ের সাথে পা জড়িয়ে শুয়ে। একহাতে ফোন কানে ধরে। অপর হাতে একটা বালিশ কোলের উপর নিয়ে শান্ত কন্ঠে সালামের উত্তর দেয়।লিয়া একহাতে পেনটা নাড়তে নাড়তে বললো,,

“কখন বাসায় গিয়েছেন? আন্টি আঙ্কেল কেমন আছেন?”

“এইতো ঘন্টাখানেক আগে।সবাই ভালো আছে।তুমি কি করছো?”

“আমি পড়ছিলাম।”

“রাতে খাবার খেয়েছো?”

“হুম।আপনি?”

“হ্যা।”

জারিফ একটু থেমে নরম স্বরে বললো,,”লিয়া বেশি রাত জেগো না।এখন ঘুমিয়ে পড়ো কেমন। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ব্রেন ঠিকঠাক কাজ করে না।তাই মস্তিষ্ককে ঠিকঠাক সচল রাখতে ঘুমের প্রয়োজন।এখন ঘুমিয়ে পড়ো। সকালে উঠে একবার রিভিশন দিয়ে নিও। মাথা থেকে সকল দুশ্চিন্তা একদম ঝেড়ে ফেলো। সুস্থ, ঠান্ডা মস্তিষ্কে পরিক্ষা দিবে। আর রেজাল্ট আশানুরূপ দেখতে চাই।”

লিয়া মৃদু আওয়াজে বললো,,”দোয়া করবেন।”

“নিশ্চয়। আচ্ছা লিয়া বেশি দেরি করো না,ঘুমিয়ে পড়ো।গুড নাইট।”

“গুড নাইট।”

লিয়ার নিজের কাছে সবটা কেমন যেনো স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে।লিয়ার বিশ্বাস হচ্ছে না জারিফ নিজে থেকে লিয়ার খোঁজ খবর নিচ্ছে।লিয়াকে নিয়ে উদ্বিগ্ন আছে।এসব কিছু কেমন যেনো কল্পনা মনে হচ্ছে।লিয়া লাইট অফ করে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।জারিফের বলা প্রতিটা কথা ভাবতে ভাবতে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
.
নয়টা বাজতে পনের মিনিট বাকি আছে।দশটা থেকে লিয়ার পরীক্ষা।লিয়া শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়।চুল মুছতে থাকে।লিয়ার ভীষণ মন খা’রাপ করছে।আজ প্রথম পরীক্ষার দিন।মা থাকলে নিজে হাতে খাইয়ে দিতো।বারবার বলতো,এডমিট পেন, স্কেল সবকিছু ঠিকঠাক গুছিয়েছিস তো।মা নিজে চেক করে দিতো।বাবা প্রথম দিন সাথে করে নিয়ে যেতো।সেখানে মা বাবা দুজন কাছে নেই।মা বাবার মুখটা না দেখে পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হবে লিয়াকে।এইটা ভাবতেই লিয়ার বুকফাটা কান্না পাচ্ছে।কিছুক্ষণ আগে দাদিমনি রাতের খাবার গুলো গরম করে লিয়াকে খাওয়ার জন্য ডেকে গিয়েছে।অথচ লিয়ার ইচ্ছে করছে না ডায়নিং এ গিয়ে খাবার খেতে।এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো। লিয়া টাওয়াল দিয়ে চুলগুলো মুড়িয়ে নিয়ে দরজা খুলতে গেলো। দরজা খুলে সামনে রাজিয়া সুলতানাকে দেখে লিয়া অবাক হলো। লিয়ার অবাক দ্বিগুণ হলো পিছনে জারিফকে দেখে।সাদা টাওয়াল দিয়ে চুলগুলো মুড়িয়ে রাখা।কপালের উপর কিছু চুল বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।লিয়ার ফর্সা মুখে বিন্দু বিন্দু পানি মুক্ত দানার মত চিকচিক করছে। লিয়াকে দেখতে খুবই স্নিগ্ধ লাগছে।সদ্যফোটা সাদা বেলি ফুলের ন্যায় লাগছে।জারিফ অপলক দৃষ্টিতে লিয়ার সৌন্দর্য দেখছে।জারিফের শান্ত নজরজোড়া লিয়ার মুখশ্রীতে নিবদ্ধ হয়েছে।লিয়া অবাক গলায় বললো,,

“আম্মু তুমি।”

লিয়ার কথায় জারিফের ধ্যান ভাঙ্গে। জারিফ নিজেকে ধাতস্থ করে দৃষ্টি স্বাভাবিক করে।রাজিয়া সুলতানা লিয়ার কথার উত্তর না দিয়ে জারিফকে উদ্দেশ্য করে বললো,,”ভেতরে চলো বাবা।”

রাজিয়া সুলতানা কথাটা বলে ভেতরে যেতে থাকে।জারিফ লিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।লিয়া হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল করে জারিফের দিকে তাকিয়ে রইলো। মুচকি হাসির কারন লিয়া খুঁজে পেলো না। জারিফ হাতে থাকা খাবারের বক্স সমেত প্যাকেটটা লিয়ার হাতে ধরিয়ে দিলো।আর বললো,,

“তোমার জন্য তোমার শ্বাশুড়ি মা নিজে রান্না করে খাবার পাঠিয়েছে।”

কথাটা বলে জারিফ বাসার ভেতরে পা ফেলে।আবার কিছু ভেবে পিছিয়ে যায়।লিয়ার কানের পাশে মুখটা নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,,”তোমার গলার পাশের কালো তিলটা খুবই আকর্ষণীয় লাগছে। তবে আমার পুরুষালী নজর কিন্তু বারবার অন্যদিকে টানছে।জামাটা ঠিককরো। ছোটবড় জিনিস বরকে দেখিয়েছো ঠিক আছে।অন্যকেউ যেনো না দেখে।”

লিয়া সাথে সাথেই নিজের দিকে নজর দেয়। ঘাড়টা বাম সাইডে ঘুরাতেই লজ্জায় লিয়ার মাটির তলায় লুকোতে ইচ্ছে করছিলো। লজ্জায় আড়ষ্টতায় লিয়া একদম মরিমরি অবস্থা।লিয়া সাথে সাথেই কাঁধের থেকে ওড়না টান দিয়ে ঠিক করে ডেকে নেয়।”

জারিফ লিয়ার লজ্জা পাওয়া মুখশ্রী দেখে মজা নিতে ফের দুষ্টুমি করে বললো,,”লজ্জা পাওয়ার কিচ্ছু নেই তোমারই তো বর।তবে আমার আমানত বাইরে এভাবে বেখায়াল চলাচল করে খেয়ানত করো না আবার।”

জারিফ লিয়ার অস্বস্তি বুঝতে পেরে দ্বিতীয় কোনো কথা না বলে ভেতরে যেতে থাকে।লজ্জায় লিয়ার সারা শরীররের লোমকূপ শিহরিত হয়ে উঠলো। লিয়া বিড়বিড় করে বলে, অসভ্য লোক একটা এভাবে কেউ কাউকে লজ্জায় ফেলে নাকি?এখন তো ওনার সামনেই আমি যেতে পারবো না।

জারিফ সোফায় বসে পেপার পড়ছে।ড্রয়িংরুম থেকে একটু দূরত্বে ডায়নিং স্পেস। রাজিয়া সুলতানা লিয়াকে খাবার খাইয়ে দিচ্ছে।সোফায় বসে জারিফ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। জারিফকে খাওয়ার কথা বলতেই জারিফ না করে।বলে, বাসা থেকে খেয়ে আসছে।জারিফ প্রথমে হসপিটালে যায়।ওখান থেকে রাজিয়া সুলতানাকে বলে, আন্টি আঙ্কেল তো এখন অনেকটা বেটার আছেন।আর লিয়ার যেহেতু আজ ফার্স্ট এক্সাম।এভাবে আপনাদের দুজনের একজনকেও যদি পরীক্ষা দেওয়ার আগে কাছে না পায়।ওর মনটা খারাপ লাগবে।আর মন খা’রাপ নিয়ে ঠিকমতো পরীক্ষা দিতে পারবে না।তাই বলছি ছোটো চাচ্চু তো হসপিটালে আছেই আপনি যদি আপাতত ঘন্টা খানেকের জন্য বাসায় যেতেন।রাজিয়া সুলতানা জারিফের ভাবনা দেখে সত্যিই অবাক হন। সাথে প্রচন্ড খুশি হোন।উনি সাথে সাথেই বলেন ঠিক বলেছো। লিয়াকে খাওয়াতে খাওয়াতে রাজিয়া সুলতানা এসবটা বললেন।জারিফের প্রতি লিয়ার রেসপেক্ট আকাশসম হয়।লিয়ার খাবার খাওয়া শেষ হতেই জারিফ তাড়া দিয়ে বললো,,

“লিয়া ফাস্ট রেডি হয়ে নাও।টাইম বেশি নেই।”

লিয়া দূর থেকেই জারিফের দিকে একপলক তাকালো।জারিফের দিকে তাকিয়ে তখনকার কথা মনে হতেই ফের অস্বস্তি লিয়াকে ঘিরে ধরলো।তবে জারিফকে দেখে মনেহচ্ছে ও বেশ স্বাভাবিক। লজ্জাকর কিছুই হয়নি বা জারিফ জানেই না এমন এটিটিউড নিয়ে আছে।লিয়া রেডি হয়ে আম্মু,দাদিমনির থেকে বিদায় নিয়ে বের হওয়ার আগে জারিফ লিয়ার ছোটো চাচ্চুর কাছে হটস আ্যপে ভিডিও কলে কল দিয়ে এনামুল খাঁনের সাথে কথা বলিয়ে দেয় লিয়ার। এনামুল খাঁন কোনো কথা না বললেও এক হাত দিয়ে ইশারা করেন। লিয়া ফোনের এপাশে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে। আবেগী হয়ে আব্বু বলে বারকয়েক ডাকে। এনামুল খাঁন চোখ বন্ধ করে আশ্বাস দেন।যার অর্থ চিন্তা করো না।ভালো ভাবে পরীক্ষা দিয়ো।জারিফের প্রতি লিয়ার কৃতজ্ঞতা যেনো বেড়েই যাচ্ছে।জারিফের সাথে পাশাপাশি হাঁটছে লিয়া।জারিফ লিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে পড়াশোনার টপিক তুলে কথা বলছে।লিয়ার অস্বস্তিবোধটা এতক্ষণে কে’টে গিয়েছে। পরীক্ষা হলে গিয়ে সিট খুঁজে পেতে জারিফ হেল্প করে।লিয়া সিটে গিয়ে বসলো।জারিফ সামনে দাঁড়িয়ে।আজ গার্ডিয়ান হিসেবে বাবার জায়গায় স্বামী দাঁড়িয়ে। লিয়ার ভাবতেই অন্যরকম লাগছে।জারিফ লিয়াকে সাহস যোগাতে বললো,,

“গুড বিগেনিং ইস হাফ অফ দ্য ডান। অতএব শুরুটা যেনো ভালো হয়। অল দ্য বেস্ট।”

বিনিময়ে লিয়া স্মিত হাসলো।জারিফ চলে যায়।মিনিট খানেকের মধ্যেই হলে ডিউটিরত টিচার খাতা নিয়ে প্রবেশ করলো।
.
আজ শুক্রবার। এনামুল খাঁনকে কালকে বাসায় আনা হয়েছে।এখন ভালো আছেন।মেডিসিন চলছে। ডক্টর বেড রেস্টে থাকতে বলেছেন।এই একসপ্তাহে জারিফের সাথে লিয়ার দেখা হয়নি।তবে প্রতিদিন ফোনে কথা হয়। পরীক্ষা কেমন হয়েছে এসব কথাই হয়।জারিফ আরো দুইতিন দিন হসপিটালে গিয়ে এনামুল খাঁন কে দেখে আসছে।লিয়া রোজ হসপিটালে যেতে পারতো না এক্সামের জন্য।তবে যে সময় যেতো জারিফের সাথে দেখা হয়নি। এখন বিকেল। রোদ ঝলমলে সুন্দর একটা বিকেল।দুপুরে লিয়ার ঘুমানোর অভ্যাস।লিয়া পড়েপড়ে ঘুমোচ্ছে। কলিংবেলের শব্দ হওয়ায় রাজিয়া সুলতানা দরজা খুলে দেখে জারিফ আর নাতাশা।জারিফ সালাম দিয়ে কুশলাদি বিনিময় করে।রাজিয়া সুলতানা নাতাশাকে আদর করে বলে,,

“কি ব্যাপার আপু।কেমন আছো?নানুকে ভুলে গিয়েছো মনেহয়।”

নাতাশা মিষ্টি করে হাসলো। সুন্দর করে বললো,,”উঁহু ভুলি নাই তো।এইতো তোমাদেরকে দেখতে আসলাম।”

জারিফ ফলমূল মিষ্টি অনেক কিছু নিয়ে আসছে। শ্বশুর হসপিটাল থেকে বাড়িতে আসছে।সেই হিসেবে দেখতে আসছে।জারিফকে ড্রয়িংরুমে বসতে দেয় রাজিয়া সুলতানা।কাজের মেয়েটাকে ডেকে ফলমূল মিষ্টান্ন রাখতে বললেন। সাথে আরো বললেন লিয়াকে ডেকে দিতে।জারিফ নম্র স্বরে বললো,,

“আন্টি আঙ্কেল এখন কেমন আছেন?বাসায় আসার পর নতুন করে কোনো সমস্যা হয়নি তো?”

রাজিয়া সুলতানা নরম গলায় বললেন,,”নাহ্ বাবা এখন অব্দি নতুন করে কোনো সমস্যা হয়নি। ভালো আছে।”

জারিফ কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত কন্ঠে বললো,,”ভাবলাম আজ ছুটির দিন।নাতাশা লিয়ার কথা বারবার বলে। নাতাশাকে লিয়ার সাথে দেখা করিয়ে আনি।আর আংকেলকে একবার দেখে আসি।”

রাজিয়া সুলতানা অমায়িক হাসলেন।আদূরে গলায় বললেন,,”ভালো করেছো বাবা।তোমার আঙ্কেল ঘুমোচ্ছে।তুমি বসো লিয়াকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।তোমার বাবা মা কেমন আছে?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো সবাই আছে।”

রাজিয়া সুলতানা নাস্তা রেডি করতে কিচেনে যায়।নাতাশা রাজিয়া সুলতানার শাড়ির আঁচল ধরে পিছুপিছু যায় আর বলে,,”নানু।মামী কই গো?মামীকে দেখছি না।”

রাজিয়া সুলতানা স্মিত হেসে বললেন,,”তোমার মামী রুমে আছে। দাঁড়াও তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি। নাস্তা টা রেডি করে নেই,হ্যা।”

নাতাশা ঘাড় নাড়িয়ে হ্যা সূচক উত্তর দেয়। লিয়া ঘুমোচ্ছিলো।এমন সময় কাজের মেয়েটার হাঁক ছেড়ে ডাকে ধড়ফড়িয়ে উঠে।ঘুমের মধ্যে আচমকা এভাবে জোরে ডাকে লিয়া খানিকটা ঘাবড়ে যায়।লিয়া শোয়া থেকে উঠে বসে বুকে ফুঁ দেয়।কটমট চোখে কাজের মেয়েটার দিকে চাইলো। রা’গ করে কিছু বলবে তার আগেই মেয়েটা হাসি মুখে বললো,,

“আপামনি ভাইজান আসছে।”

লিয়া বুঝতে না পেরে।কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলো,,
“ভাইজান মানে?কার কথা বলছো?”

মেয়েটা বি’রক্ত হলো। ঠোঁট উল্টে বললো,,”আপনার স্বামীর কথা কইতাছি।জারিফ ভাইজান আইছে।”

লিয়া বিস্ময়কর চাহনিতে চাইলো।কোনো কিছু বললো না নিশ্চুপ রইলো।মেয়েটা ফের বললো,,”বসার রুমে বইয়া আছে।খালা আম্মা আপনারে ডাকতে কইলো।”

লিয়া কিছু না বলে উঠে ওয়াশরুমে যায়।চোখে মুখে পানির ছিটা দিলো।টাওয়াল দিয়ে মুখটা মুছে নিলো।ওড়নাটা নিয়ে সুন্দর করে গায়ে জড়িয়ে নেয়।সেদিনের মতো লজ্জাকর পরিস্থিতিতে লিয়া কিচ্ছুতেই আর পড়তে চায় না।লিয়া গুটিগুটি পা ফেলে ড্রয়িংরুমে যায়।জারিফ ফোন স্ক্রল করছিলো।কারো আসার শব্দ পেয়ে মাথাটা তুলে তাকালো।লিয়াকে দেখে আবার দৃষ্টি ফোনে নিবদ্ধ করলো।লিয়া মৃদু আওয়াজে সালাম দেয়। জারিফ সালামের উত্তর দিয়ে ফোনটা পকেটে পুরে রাখলো।লিয়ার দিকে সুগভীর শীতল চাহনিতে চাইলো। ঠোঁট কামড়ে ধরে বললো,,

“আমি পাত্রী দেখতে আসিনি যে তোমাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের হাইট কতটুকু সেটা দেখাতে হবে।”

জারিফের এহেন কথা শুনে লিয়া তাজ্জব বনে যায়।লিয়া বোকাবোকা চোখে চেয়ে রইলো।জারিফ ইনডাইরেক্টলি লিয়াকে দাঁড়িয়ে না থেকে বসতে বললো তা বুঝতে লিয়ার মিনিট খানেক সময় লাগলো।লিয়া সিঙ্গেল সোফায় বসলো।জারিফ তপ্ত নিঃশ্বাস ফেললো। ম্লান কন্ঠ স্বরে বললো,,

“শুনেছি স্বামী স্ত্রীর মাঝে ফাঁকা জায়গা রাখতে নেই। সামান্য পরিমাণ ফাঁকফোকর থাকলেও সেখানে শয়তান প্রবেশ করে।আরে তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে নিজ থেকে শয়তানকে ইনভাইট করছো। পাঁচ হাত দুরত্বে বসে একদম ইনভাইট কার্ড দিয়ে আমন্ত্রণ জানাচ্ছো।”

লিয়া জারিফের কথা শুনে বিস্ময়ের চরম সীমায় পৌঁছে যায়।লিয়া ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে অবাক হয়ে বললো,,”এই আপনার শরীর ঠিক আছে তো ‌।না মানে জ্বর টর আসেনি তো।আর না কোনো ঘোরের মধ্যে আছেন।কিসব বলছেন। আশ্চর্য!”

জারিফ কিছু বলতে যাবে সেই মূহূর্তে নাতাশা এসে মিষ্টি হেসে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললো,,”মামী।তুমি এখানে।আমি তোমাকে খুঁজছি তো।”

নাতাশাকে দেখে জারিফ আর কিছু বললো না।লিয়া উঠে নাতাশাকে জড়িয়ে ধরলো।দুইগালে চুমো খেলো। মিষ্টি হেসে বললো,,”সোনা তুমি কেমন আছো?”

“ভালো।”

লিয়া নাতাশার চুলগুলো একহাতে ঠিক করতে করতে বললো,,”তুমি নিশ্চয় মামাকে আসার কথা বলেছিলে।আমার কথা খুব করে মনে হয়েছিলো।তাইনা?”

নাতাশা ঠোঁট উল্টিয়ে বললো,,”উঁহু!আজ আমি আসার কথা বলিনি তো।আমি ঘুম থেকে উঠতেই মামা আমাকে বললো,নাতাশা মামীকে দেখতে চাও। নানুমনিকে বলো রেডি করে দিতে আমি নিয়ে যাবো।তোমার মামীর সাথে দেখা করিয়ে আনবো।”

নাতাশার কথা শুনে জারিফ অপ্রস্তুত হয়ে যায়।জারিফের কাঁশি উঠে যায়।জারিফ খুকখুক করে কাঁশতে থাকে।লিয়া ড্যাবড্যাব করে জারিফের দিকে তাকায়।জারিফ লিয়ার এভাবে তাকানো দেখে অপ্রস্তুত হাসলো।

চলবে,,,