সুখের ঠিকানা পর্ব-৮+৯

0
135

#সুখের_ঠিকানা
#শারমিন_হোসেন
#পর্ব০৮

তাসনিমের নম্বরে কল দেয় জারিফ। রিং হয়ে বেজে কে”টে যায়।জারিফ কোনো রেসপন্স না পেয়ে বি’র’ক্ত হয়।একজন গেস্ট আসায় জারিফ ফোন পকেটে পুরে কুশলাদি বিনিময় করতে থাকে।জারা সেজেগুজে এসে নাতাশাকে উদ্দেশ্য করে বলে,,”নাতাশা চলো তো আমরা এগিয়ে গিয়ে দেখি তোমার মামীরা আসছে কিনা।”

কথাটা শেষ করে জারা নাতাশার হাত ধরে সামনে অগ্রসর হতে যাবে।সেই মুহূর্তে নিরুপমা বেগম লিয়াদেরকে সাথে করে ড্রয়িংরুমে নিয়ে আসে। মিষ্টি হেসে বলেন,,”তোমাদের আসতে এতো দেরি হলো যে।আর তোমাদের বাবা মা আসলেন না?”

তুষার অমায়িক হেসে নম্রভাবে বলে,,”আসলে আন্টি আব্বু একটু অসুস্থ।আর মেজো চাচ্চু ডিউটিতে আছেন।আর ছোটো চাচ্চুর কথা তো জানেনই।”

নিরুপমা বেগম ঘাড় নাড়িয়ে হাসিমুখে বললেন,,”ওহ্। আচ্ছা তোমরা বসো।আমি ভাবীকে ডেকে দেই।”

তুষারের কল আসায় ফোন রিসিভ করে বাইরে যায়।রাহবার সোফায় বসে পড়ে।লিয়া আর তুলি দাঁড়িয়ে আছে।নতুন জায়গায় ওদের দুজনের কেমন জানি আনইজি লাগছিলো।এরমধ্যে জারা নিরুপমা বেগমের কথাগুলো শ্রবণ করে এগিয়ে আসে।নাতাশাকে উদ্দেশ্য করে বলে,,ঐতো আমাদের নতুন অতিথিরা বোধহয় চলে এসেছে।”

নাতাশার নজর যায় জলপাই রঙের থ্রি পিস পরিহিত লিয়ার দিকে।লিয়াকে এখানে দেখে নাতাশা অবাক হয়।নাতাশা এক দৌড়ে লিয়ার কাছে ছুটে যায়।মাথা উঁচু করে লিয়ার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলে উঠলো,,”মিষ্টি আন্টি তুমি?”

লিয়া নাতাশার দিকে কিছুটা ঝুঁকে একহাতে নরম তুলতুলে গাল স্পর্শ করে বলে,,”হুম ,সোনা আমি।কেমন আছো তুমি?।হ্যাপি বার্থডে কিউটিপাই।ম্যানি ম্যানি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্যা ডে”

নাতাশা হাসিমুখে বলে,,”থেংকিউ।”

এমনসময় কিছু স্মরণ হতেই নাতাশা ভ্রু যুগল কুঁচকে কন্ঠে চঞ্চলতা নিয়ে ফের বলতে থাকে,,”ওহ্!এবার বুঝতে পেরেছি।তুমিই তাহলে আমার মামী হবে।তুমিই আমার মামার বউ হবে।তারমানে মিষ্টি আন্টি হলো আমার মামী।এইজন্য মামা বলছিলো আমি মামীকে আগে থেকেই চিনি।”

নাতাশার কথা শুনে লিয়া আশ্চর্য হয়।জারিফ ড্রয়িংরুমে আসতে গিয়ে নাতাশার সব কথা শুনতে পায়।লিয়া নাতাশার ভুল ভাঙ্গাতে ঠোঁট মেলে কিছু বলবে।সেইসময় পুরুষালী মোটা স্বরে বলে উঠলো,,”হেই মিস প্যারাডাইস কেমন আছেন?”

এই কন্ঠের মালিক কে?এই সম্মোধনটা কে করে তা লিয়ার ভালো করেই জানা।লিয়া সামনে তাকায়। প্রথমে জারিফের সাথে চোখাচোখি হয়।সাথে সাথেই লিয়া দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।জারিফের পিছন হতে নীল সামনে এগিয়ে আসতে থাকে। নাতাশার কথাশুনে জারাও ভাবে লিয়াই হয়তো জারিফের উডবি।জারা লিয়াকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত স্ক্যান করে। অতঃপর নীলের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বলে উঠলো,,

“এ কেমন সম্মোধন নীল ভাইয়া।শুনেছি লম্বা মানুষের বুদ্ধি থাকে হাঁটুতে।তোকে দেখে সেটা বারংবার প্রুভ হয়। বাঁশের মতো লম্বা।অথচ বুদ্ধি শুদ্ধি খুবই পোর।বড় ভাইয়ের উডবিকে কেউ কখনো এরকম করে ডাকে? আশ্চর্য!বড় ভাইয়ের হবু বউ রেসপেক্ট দিয়ে কথা বলবি।ওয়েট,আমি ছোটোমাকে বলে তোকে ব”কা শুনাবো,হুম।আর সেদিন তুই কি বলেছিলি?উমম!মনে পড়েছে।আমার বর্ণনার মেয়ে ভাইয়ার বউ হিসেবে পেতে গেলে অর্ডার দেওয়া লাগবে।ওয়াও!আমার তো নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না।সেইম আমার কল্পনার মেয়েকেই আমি ভাবী হিসেবে পেতে যাচ্ছি। টানাটানা হরিণী চোখ,দীঘল কালো চুল,ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ।সো নাইচ।একদম মিলে যাচ্ছে সব।”

জারা এক্সাইটেড হয়ে একনাগাড়ে গড়গড় করে কথাগুলো বলে।নীল জারাকে ধমক দিয়ে বলে,,”থামবি তুই।সেই তখন থেকে ছা”গ’লের তৃতীয় বাচ্চার মতো লাফাচ্ছে।আর উল্টাপাল্টা বকছে।”

এখানে আসাতে যে পরিমাণ অস্বস্তি ছিলো।তা যেনো হুরহুর করে দশগুণ বেড়ে গেলো লিয়ার।লিয়া ছোট করে শ্বাস টেনে নিয়ে ক্ষীন আওয়াজে বলতে থাকে,,”সরি।তোমার বুঝতে ভুল হচ্ছে। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।তুমি করেই বললাম। আমি লিয়া।তোমার হবু ভাবী আমার আপু।”

এরমধ্যে নাতাশা জারিফকে দেখতে পেয়ে ছুটে গিয়ে একহাত ধরে টেনে লিয়ার সামনা-সামনি আনে। অতঃপর জারিফের এক আঙ্গুল ধরে ঘাড়টা উঁচিয়ে এক্সাইটেড হয়ে বলতে থাকে,,”মামা মিষ্টি আন্টিই হলো আমার সারপ্রাইজ। মিষ্টি আন্টি মামী।তুমি তাই বলছিলে না তখন?”

প্রথম থেকেই লিয়ার আসার বিন্দু পরিমাণ ইচ্ছে ছিলো না।সবার বলাবলিতে ফর্মালিটিজ মেইনটেইন করতে আসছে।এসে আবার এরকম একটা বা”জে পরিস্থিতি ক্রিয়েট হবে।তা কল্পনাও করেনি লিয়া।লিয়া আড়ালে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে। এরমধ্যে জারিফ গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,,”নাতাশা।আমি তোমার মিষ্টি আন্টির কথা বলিনি।তোমার ভালো আন্টির কথা বলেছিলাম।আমারই বলায় ভুল ছিলো।তোমাকে পরিষ্কার করে বলা উচিত ছিলো।কারন তুমি তো তোমার ভালো আন্টিকেও চেনো।আমি সেটা ভেবেই বলেছিলাম।”

নাতাশা ভারী মুখশ্রী করে ঠোঁট উল্টে বলে,,”ওহ্!”

এরমধ্যে জাহানারা বেগম এসে লিয়া আর তুলির সাথে ভালোমন্দ কথা বলেন। অতঃপর জারিফকে উদ্দেশ্য করে শুধালেন,,”কি ব্যাপার জারিফ? তাসনিম এখনো আসছে না যে।তুই না বললি ও মেডিকেলে আছে।ওখান থেকেই আসবে।কই এখনো আসছে না ।আর তুই গিয়ে নিয়ে আসতে পারতি তো।”

ফোন দিয়েছিলো রিসিভ করেনি।জারিফ সরাসরি মাকে এটা না বলে।কথাটা চেপে গিয়ে বললো,,”উম!চলে আসবে হয়তো।”

জারিফ বাইরে গিয়ে আবার তাসনিমের নম্বরে ডায়াল করে।এদিকে জারা ম্লানস্বরে বলে,,”সরি। মিস্টেক হয়েছে।তুমি কিছু মনে করোনা, প্লিজ।”

লিয়া জোর করে মুখে হাসির রেখা টেনে এনে বলে,,”ইটস্ ওকে।ব্যাপার না।”

নীলের দিকে দাঁত কটমট করে তাকিয়ে জারা ফের অভিযোগের সুরে বলে,,”আর এরা গিয়েছিলো মেয়ে দেখতে।নিজেরা দেখেই চলে আসছে।একটা ছবিও তুলে আনেনি। ভাইয়াকে জিগ্গেস করেছি,কোনো ছবি আছে কিনা?সেখানেও ভাইয়ার নেগেটিভ উত্তর। ভাইয়ার কাছে নাকি কোনো ছবি টবিও নেই। উফ্! অদ্ভুত!”

নীল সিঙ্গেল সোফায় বসে। ফোন স্ক্রল করতে করতে বলতে থাকে,,”মিস প্যারাডাইস।দিনকাল কেমন চলছে?ভালো নাকি খা”রা’প?”

লিয়া স্মিত হেসে কোমল গলায় বলে,,”আলহামদুলিল্লাহ ভালো।কেনো খা’রাপ চলার কথাছিলো নাকি?আর না কোনো কারন আছে? মিষ্টার লালনীল?”

নীল টানটান হয়ে বসে। শান্ত চাহনিতে লিয়ার দিকে একপলক তাকায়। অতঃপর ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছু নিয়ে গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত হয়। প্রায় মিনিট খানেক পড়ে ছোট করে নিঃশ্বাস ছেড়ে সিরিয়াস ভঙ্গিমায় বলতে থাকে,,”নাহ্।আসলে মানুষের মুখ হলো মনের দর্পণ।মুখ দেখে অনায়াসেই মনের কথা বলে দেওয়া যায়।আর আমার যতটুকু সাইকোলজি সম্পর্কে জ্ঞান আছে।তাতে আপনার ফেসটা নিয়ে গবেষণা করে বোঝা যাচ্ছে ”

নীলের কথা শেষ করতে না দিয়ে জারা ফোড়ন কে’টে বলে উঠলো,,”আহ্!নীল ভাইয়া তুই কিসব শুরু করলি বলতো। তোর এই সাইক্লিং এখন রাখ।যতোসব আজগুবি কথাবার্তা বলবি।একদম লজিক ছাড়া। উফ্!জাস্ট অসয্য!”

নীল বিদ্রুপের সুরে বলে উঠলো,,”খুব তো লজিকাল হয়েছিস। ভাই একজন উদ্ভিদের ডক্টর,বউ আনতে যাচ্ছে মানুষের ডক্টর।আর তার বোন হবে ইন্জিনিয়ার।এমন ভাবসাব।”

তুলি ঠোঁট চেপে মিটমিট করে হাসছে।লিয়া নির্বিকার আছে।জারা রাগান্বিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নীলের দিকে।নীলকে আচ্ছামত ব”কার অদম্য ইচ্ছা থাকলেও নতুন মেহমানদের জন্য ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রাখে জারা।নীল ভাবলেশহীনভাবে ফোন স্ক্রল করছে আর এটাসেটা বকবক করছে।
.
.
মেডিকেলের ক্যান্টিনে ডক্টরদের জন্য রাখা আলাদা স্পেসে একপাশের নিরিবিলি কর্নারের একটা টেবিলে বসে আছে তাসনিম।আর তাসনিমের সামনাসামনি চেয়ারে বসে ধোঁয়া উঠা কফির মগে আলতোকরে ঠোঁট ছোঁয়ায় ডক্টর আলিফ। তাসনিম বারবার হাতে থাকা রিচওয়াচে সময় দেখছিলো।আলিফ মুখে থাকা কফিটুকু গলাধঃকরণ করে। অতঃপর তাসনিমের শ্যামবর্ণ মুখশ্রীতে শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললো,,

“তাবাসসুম তাসনিম।আপনি কি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত?আপনাকে অন্যমনস্ক লাগছে।”

তাসনিম তৎক্ষনাৎ নম্র স্বরে বলে উঠলো,,”নাহ্।তেমন কিছু নয়।”

জারিফের বাসায় যাওয়ার কথা।আজকে তাসনিমের নাইট শিফট আছে।স্যারকে বলে আপাতত দুই থেকে তিন ঘন্টার ছুটি নিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো।স্যারকে বলার আগেই ডক্টর আলিফের আ্যসিস্ট্যান্ট গিয়ে বলে,আলিফ স্যার নাকি তাসনিমকে দেখা করতে বলেছেন। ক্যান্টিনে ওয়েট করছেন।সেই সময় তাসনিমের মনেহয়,যতটুকু স্যারকে চিনি।এই কয়মাসে ওনাকে দেখে।ওনার কথাবার্তা, চালচলনে মনে হয়না উনি এমনি এমনি ডাকবেন। নিশ্চয় সিরিয়াস কিছু হবে।কোনো সিরিয়াস পেশেন্টের ব্যাপারে কথা বলতেও পারেন। এতকিছু ভেবে থাকলেও বিগত পাঁচ মিনিট ধরে তাসনিম বুঝতে পারছে না।আসলে আলিফ কিজন্য ডেকেছে?আলিফ আয়েশি ভঙ্গিতে কফি খাচ্ছে। তাসনিম কপাল কুঁচকে ক্ষীণ স্বরে বেশ ভদ্রভাবে বলে,,

“স্যার কিজন্য ডেকেছেন? নাহ্!মানে।কিছু বলার আছে?”

আলিফ টেবিলের উপর দুইহাত ভাঁজ করে রাখে।শীতল চাহনিতে তাসনিমের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,,”হুম।বলার আছে।”

কিয়ৎক্ষন থেমে। একটু নড়েচড়ে বসে।মুখায়ব টানটান করে।কিছুটা জড়তা নিয়ে বলতে থাকে,,”মিস তাবাসসুম তাসনিম।আমি কোনো কথা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলতে পছন্দ করিনা।আর কখনো সেরকম বলিও না।আমি স্পষ্ট কথা বলতে পছন্দ করি।জানিনা কথাটা শোনার পর আপনার রিয়াকশন কেমন হবে?আপনি আমার ব্যাপারে কিরুপ ভাববেন?আমার প্রতি ব্যাড ধারণাও জন্মাতে পারে।যাইহোক।”

একটু থেমে একহাত ঝরঝরে চুলের মধ্যে চালনা করে। তাসনিমের চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলে উঠলো,,”ডু ইউ ম্যারি মি?”

এরকম একটা কথা শোনার জন্য তাসনিম মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। তাসনিমের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। ডক্টর খাঁন সরাসরি তাসনিম কে বিয়ের প্রস্তাব দিবে।এটা তাসনিম কল্পনাও করেনি।আজ কয়েক মাস ধরে স্যারের সাথে রাউন্ডে যায়। বিভিন্ন কথাবার্তা হয়।তবে ঘুনাক্ষরেও বোধগম্য হয়নি। তাসনিমের উপর আলিফের কোনো ফিলিংস আছে। তাই বিষয়টাতে তাসনিম একটু বেশিই আশ্চর্যান্বিত হয়। তাসনিম যেনো বাকশুন্য হয়ে পড়ে।অবাক চোখে সামনে বসা গাম্ভীর্য মানবের সুদর্শন ফেসের দিকে ঠায় তাকিয়ে রয়। তাসনিমের কোনো উত্তর না পেয়ে আলিফ গম্ভীর কন্ঠে ফের শুধালো,,

“এইতো গতমাসে আমার আম্মু যখন ময়মনসিংহে আমার বাসায় আসছিলো।সেইসময় একদিন মেডিকেলে ঘুরতে আসছিলো।একজন পেশেন্টের ফাইল হাতে আপনি আমার চেম্বারে এসেছিলেন। আপনার মনে আছে? সেইসময় একজন মাঝ বয়সী ভদ্রমহিলা আমার কেবিনে ছিলেন।উনি আমার আম্মু।”

তাসনিম মাথায় চাপ দিয়ে স্মরণ করতে থাকে।আবছা সেই ফেসটা মনেহয়। তাসনিম জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে ক্ষীণ আওয়াজে বলে,,”হুম।আমার মনে আছে।”

আলিফ ছোট শ্বাস ফেলে।নরম কন্ঠে ফের আওড়ালো,,”সেইদিনের পর থেকে আমার আম্মু আপনার কথা অলওয়েজ বলে।আপনাকে নাকি খুব মনে ধরেছে আমার আম্মুর। ইভেন আপনার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার জন্য একদম উঠেপড়ে লেগেছে।তো আমার কেনো জানি মনেহলো, আপনার বাড়িতে প্রস্তাব পাঠানোর আগে।এ ব্যাপারে আপনার সাথে কথা বলা দরকার।আপনার মতামত আগে নেওয়া জরুরী।তাই আমি আগ পিছ না ভেবে। আপনাকে সরাসরি কথাটা বললাম।বাকিটা আপনার ইচ্ছে।”

তাসনিম হতভম্ব হয়ে যায়।কথা বলতে তাসনিমের কন্ঠনালী কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠেই বলে উঠলো,,”সরি।স্যার।বাসায় আমার বিয়ের কথাবার্তা চলছে।সব কিছুই প্রায় ঠিক।শুধু ডেট ফিক্সিড হয়নি।”

তাসনিমের এহেন জবাবে আলিফের মুখটা লহমায় বিবর্ণ হয়ে যায়।কেনো জানি হৃদস্পন্দন স্থির হয়ে যায়। বুকের বা পাশে হালকা ব্যাথা অনুভব হয়।আলিফ মনেমনে আওড়ায়,মায়ের কথায় প্রস্তাবটা আমি রেখেছি। এখানে নেগেটিভ উত্তর হওয়ায় তো আমার কিছু আসা যাওয়ার কথা নয়।তবুও কেনো এই নেগেটিভ উত্তরটা আমার মন মেনে নিতে পারছে না।আলিফের নিজের প্রতি কনফিডেন্স ছিলো।কোনো মেয়ে তাকে রিজেক্ট করবে।তা ভাবতে পারিনি।আলিফ মুখশ্রীতে স্বাভাবিকতা বজায় রেখে অপরাধীর স্বরে বলতে থাকে,,

“সরি।আমি জানতাম না। প্লিজ,ডোন্ট মাইন্ড।এগেইন সরি।আপনার মূল্যবান সময় ন’ষ্ট করার জন্য।”

তাসনিম ম্লান স্বরে বলল,,”ইটস্ ওকে।”

আলিফ ব্যাথাতুর নয়নে তাসনিমের দিকে তাকিয়ে ফের কৌতুহল বশত বলে ফেলে,,”এ্যট ফাস্ট সরি। পার্সোনাল বিষয়ে কিছু জানতে চাওয়ার জন্য।তবুও কিওরিওসিটি কাজ করায় না বলে থাকতে পারলাম না।আপনি তাকে পছন্দ করেন।আই মিন সেই সৌভাগ্যবান মানুষকে ভালোবাসেন।”

আলিফের কথা কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে তা তাসনিমের তীক্ষ্ণ নার্ভ ঠিকই ধরেছে।তাই তাসনিম অসহায় ফেস করে মৃদুস্বরে আওড়ালো,,”আমি তাকে ভালোবাসি কিনা।সেটা এখন ম্যাটার করছে না।আমি এখন কমিটেডের মধ্যে আছি।আর আমার ফ্যামেলি খুব রেস্ট্রিকটেড।আমি সবসময় আমার পরিবারের মতামতকে প্রায়োরিটি দিয়ে এসেছি।আর ভবিষ্যতেও দিতে চাই।আর স্যার আপনাকে,এখন শুধু একটা কথাই বলার আছে,আপনার আরো আগে বলা উচিত ছিলো।লেইট হয়ে গিয়েছে।আমার পক্ষে কমিটমেন্ট ভাঙ্গা পসিবেল নয়।”

আলিফ মেকি হেসে স্পষ্টভাবে বললো,,”কনগ্রাচুলেশন।শুভ কামনা রইলো।আপনার জীবন সবসময় আনন্দে ভরে থাকুব এই কামনা করি।আর আমার একটা রিকোয়েস্ট থাকবে।আপনি আগের মতো স্বাভাবিক থাকবেন।এসব কথা পাড়লে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিবেন। এসবের জন্য কোনো হেজিটেশন ফিল করবেন না।”

তাসনিম ঠিক আছে বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মৃদুস্বরে বলে,,”আমার একটু তাড়া আছে।আসছি স্যার। আসসালামুয়ালাইকুম।”

তাসনিম চলে আসতে থাকে।কিছুটা দূরে এসে আবার ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকায়।আলিফ চেয়ারের হেডে কাঁধ রেখে একহাতে চুলগুলো মুঠো করে রেখেছে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তাসনিম ক্যান্টিন থেকে বেড়িয়ে আসে। তাসনিম কর্তব্যরত ডক্টরস রুমে আসে।সেখানে নিজের ব্যাগ থেকে ফোন বের করে ওপেন করতেই।জারিফের অনেকগুলো মিসড কল দেখতে পায়। তাসনিম অস্পষ্ট স্বরে বলে, উফ্!ব্যাগের ভেতর ফোন ছিলো। এদিকে জারিফ তো অনেকবার কল দিয়েছে দেখছি। এখনো তো স্যারের থেকে ছুটিই নেওয়া হয়নি।এদিকে কত লেইট হয়ে গেলো।

এখনকার ডিউটিতে থাকা এমবিবিএস ডক্টরকে উদ্দেশ্য করে তাসনিম ছুটির কথা বলতে যাবে।তার আগেই ডক্টর কিছু লিখতে লিখতে তাসনিমকে ডেকে বলে উঠলো,,”মিস তাসনিম **নম্বর বেডে একজন সিরিয়াস পেশেন্ট আছে। অনেক পানি বের করা হয়েছে। বাচ্চাটা খুব উইক।আর এখন আ্যলবুটিন দিতে হবে।আ্যলবুটিন চলাকালীন পুরোটা সময় আপনি পর্যবেক্ষণ করবেন।কোনো সমস্যা হলে সাথে সাথে আমাকে ইনফর্ম করবেন। ক্লিয়ার?”

তাসনিম অসহায় নজরে তাকিয়ে সাহস জুগিয়ে জড়তা নিয়ে বলে,,”স্যার আমি বলছিলাম যে।আমার এখন বাইরে যেতে হবে।”

কিছুটা কঠোরভাবে বলে উঠে,,”আশ্চর্য!একজন পেশেন্ট সিরিয়াস।আর আপনি এখন বাইরে যেতে চাইছেন।আর আপনার শিফট এখন। খা’রাপ কিছু হলে এর দায়ভার কিন্তু শুধু আমার উপর নয়।আপনার উপরও পড়বে। জবাবদিহিতা করতে হবে।সো বলছি নিজের কাজে সিরিয়াস হোন।”

কথাটা শেষ করে প্যাড থেকে কাগজটা ছিঁড়ে তাসনিমের হাতে ধরিয়ে দেয়। তাসনিম কাগজটা নিয়ে নেফ্রোলজি ওয়ার্ডে গিয়ে পেশেন্টের বাড়ির লোকের হাতে ঔষধের নাম লেখা কাগজটা দিয়ে বলে,,” ইমিডিয়েটলি আ্যলবুটিন দিতে হবে।আর এটা বাইরে থেকে নিতে হবে।কুইকলি নিয়ে আসুন।”

তাসনিম করিডোরে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে,আ্যলবুটিন শেষ হতে মিনিমাম টু আওয়ার্স লাগবে।এরমধ্যে হাতে থাকা ফোনটা কেঁপে উঠে। তাসনিম তৎক্ষনাৎ রিসিভ করে।ফোনের ওপাশ থেকে তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে চিন্তিত গলায় জারিফ বলে উঠলো,,”হ্যালো! তাসনিম তুমি ঠিক আছো?”এতোবার কল দিচ্ছি রিসিভ করছো না কেনো?আর এখনো আসছো না?কোনো সমস্যা?”

তাসনিম এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে। ম্লান স্বরে ঠোঁট আওড়ালো,,”সরি!জারিফ।আমি যেতে পারবো না।এখানে ইমার্জেন্সি আমাকে থাকতে হবে।সিরিয়াস পেশেন্ট আছে।তাই এখন যাওয়া কোনোভাবেই পসিবেল নয়।”

এমন জবাব জারিফ মোটেও আশা করেনি। মূহূর্তেই জারিফের মেজাজ বিগড়ে যায়।জারিফ কন্ঠে কঠোরতা নিয়ে বলে উঠলো,,”তুমি মজা করছো?এখানে সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।নাতাশা বারবার তোমার কথা বলছে।মা ছোটোমা বারবার আমাকে জিগ্গেস করছে তোমার আসতে দেরি হচ্ছে কেনো।আর এতক্ষণ ফোন না ধরে এখন এসে তুমি মজা করছো।”

“আমি মোটেও মজা করছি না।আর ফোন ব্যাগে ছিলো।আমি বিজি থাকায় খেয়াল করিনি।ডিউটিতে থাকা স্যারের কাছে ছুটির কথা বলেছি।বাট লাভ হয়নি।”

তাসনিমের শেষের কথা শুনে জারিফের রা’গ টা একটু কমে।জারিফ ফের নরম গলায় বললো,,”আচ্ছা ঠিক আছে।আমি আসছি।আমি ফোনে ডক্টর খানের সাথে কথা বলে নিবো।ওনাকে বলবো তোমার ছুটির জন্য।”

ডক্টর খানের কথা শ্রবণ হতেই তাসনিম সাথে সাথে বলে উঠলো,,”নাহ্।থাক স্যারকে বলতে হবে না।আর এখানে রিয়েলি একজন সিরিয়াস পেশেন্ট আছে।এভাবে আমার দায়িত্ব ফেলে আমি কিকরে যাই? হিউম্যানিটিরও ব্যাপার আছে।”

জারিফ তাচ্ছিল্য করে বলে,,”আচ্ছা।তুমি তোমার হিউম্যানিটি নিয়ে থাকো।আসতে হবে না। এখানে এতগুলো মানুষ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।সেখানে তোমার কোনোই দায়িত্ব নেই।”

তাসনিম চোখ বন্ধ করে তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে,,”তুমি ভুল বুঝছো।আমি ওভাবে বলিনি।আর ইনভাইট রক্ষার্থে আমার বাড়ির কেউ যায়নি এমনতো নয়।আমার ভাইবোনেরা তো গিয়েছে।”

জারিফ কন্ঠে কঠোরতা মিশিয়ে ফের বললো,,
“তোমাকে দিয়েই তোমার বাড়ির সবার সাথে আমাদের পরিচয় হতে যাচ্ছে।তাদের থেকেও তোমার থাকাটা ইম্পর্ট্যান্ট ছিলো।”

“আমি বুঝতে পারছিনা।সামান্য একটা বিষয়ে তুমি রিয়াক্ট কেনো করছো। আশ্চর্য!”

জারিফ রা’গটা কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে।চোখ বন্ধ করে বড় করে শ্বাস টেনে নেয়। স্পষ্ট গলায় বলে,,”এখানে আমি নাতাশাকে কথা দিয়েছিলাম।আজকে ওর সাথে তোমার মিট করিয়ে দেবো।নাতাশা বারবার একই প্রশ্ন করে চলেছে। বাচ্চা একটা মেয়ে আশা করেছিলো।এখন আমি যদি বলি,তুমি আসছো না। ও ভীষণ মন খা’রাপ করবে।আর এটাকে তোমার রিয়াক্ট মনে হচ্ছে।”

“সময় চলে যাচ্ছে না।আজ হলো না।আমি পরে পাছে নাতাশার সাথে দেখা করে নেবো।আর নাতাশা আমাকে চেনে না এমন তো নয়।”

তাসনিমের এমন কথায় জারিফের রা’গটা তরতর করে আকাশ ছুঁইয়ে যায়।জারিফ আর দ্বিতীয় কথা না বলে খট করে কল কে’টে দেয়।

জারিফ বাড়ির সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে দেয়। তাসনিম আসতে পারবে না।ওর আজকে নাইট শিফট ছিলো। কোনোভাবেই ম্যানেজ করতে পারেনি।তাই ওর জন্য আর লেইট না করে কেক কাটা যাক।জারিফ একটা বড় টেডি গিফট করে নাতাশাকে।নাতাশা তবুও গাল ফুলিয়ে থাকে।হবু মামী না আসাতে।নীল একটা বড়সড় বক্স এনে নাতাশার সামনে ধরে।তারপর মুচকি হেসে বলে,,

“উফ্!সরি নাতাশা বেবি।আজকেও বাতাসা আনতে ভুলে গিয়েছি। গালটা কমলার মতো ফুলিয়ে রেখো না।আজকের মতো এই গিফট নাও। নেক্সট বার্থডে তে বাতাসা আনবো।”

নাতাশা দুইহাত কোমড়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,,”আবার বাতাসা।নীল মামু কতবার তোমাকে বলবো আমি বাতাসা খাই না।”

নীল বক্সটা খোলে। বক্সের ভেতর থেকে একটা সাদা বিড়াল মাথা উঁচু করে আশেপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে মিঞ ডেকে উঠে। নাতাশার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জারা হলুদ চোখের প্রাণীটির আচমকা ডাক শুনে একলাফে ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ায়।বুকে থুতু ছিটিয়ে জারা বলে উঠলো,,”কি আশ্চর্য!আমি তো চমকে উঠেছি।এটাও কেও গিফট দেয়! অদ্ভুত!”

নাতাশা ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে।হাসিমুখে বলে,,”ওয়াও!ক্যাট।দেখতে খুব প্রিটি।”

নীল জারাকে উদ্দেশ্য করে বলে,,”সরফরাজ অভ্রনীল মানুষটাই অদ্ভুত।তাই তার কাজকর্ম সব কিছুই সবার থেকে আলাদা।তার দেওয়া গিফটও অদ্ভুত!বুঝলি জারা?”

জারা বিড়বিড় করে বলে,,নিজের গায়ের রঙ যেমন সাদা বিলাইয়ের মতো। ঠিক অমনি দেখতে একখান সাদা বিড়াল গিফট করছে।হু।

নাতাশা একহাত বিড়ালের গায়ে আলতোকরে ছুঁইয়ে বলে,,”নীল মামু একে কি বলে ডাকা যায়।এর নাম কি রাখবো,উম!”

নীল পাশে থাকা লিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,,”মিস লিয়া এর একটা সুন্দর নাম সিলেক্ট করেন তো।”

লিয়ার ইচ্ছে করছিলো বিড়ালটাকে কোলে নিতে।লিয়ার বিড়াল ভীষণ পছন্দ।লিয়া দশ সেকেন্ড ভেবে বলে উঠলো,,” স্যান্ডি। স্যান্ডি রাখলে কেমন হবে?”

নীল বাহবা দিয়ে বলে উঠে,,”এক্সিলেন্ট!ধন্যবাদ এত সুন্দর একটা নাম বলার জন্য।”

জারিফ এসে গম্ভীর মুখশ্রীতে বলে,,”এসব নামটাম রাখা শেষ হলে। অনুষ্ঠান শুরু করা যাক। এমনিতেই অনেক লেইট হয়ে গিয়েছে।আর টাইম ওয়েস্ট করা ঠিক হবে না।”

নাতাশার একপাশে জারিফ দাঁড়িয়ে আছে।অন্যপাশে জারা।এমনসময় নাতাশা লিয়ার একহাত ধরে টেনে এনে নিজের পাশে দাঁড় করিয়ে বলে,,”মিষ্টি আন্টি তুমি এখানে দাঁড়াও।”

জারাও ইশারায় লিয়াকে থাকতে বলে। কেক কেটে একটুকরো কেক নিয়ে প্রথমে নাতাশা জারিফকে খাওয়ায়।জারিফ একপাশে হালকা বাইট দেয়।নাতাশা তারপর হাতে থাকা সেই কেকের টুকরা লিয়ার সামনে ধরে।লিয়া ঠোঁট কামড়ে ধরে নির্বাক থাকে।সেই সময় নাতাশা ঠোঁট মেলে বলতে থাকে,,”কিহলো মিষ্টি আন্টি। নিচ্ছো না যে। আমার হাত ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে তো।কতক্ষণ এভাবে ধরে রাখবো,হ্যা।”

জারিফ দৃষ্টি সরু করে লিয়ার দিকে তাকায়।লিয়া খেয়ালি নজরে তা দেখে নির্বিকার থাকে।লিয়া তৎক্ষণাৎ এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে।নিরুপমা বেগম হাসিমুখে লিয়াকে উদ্দেশ্য করে মায়াভরা আদূরে গলায় বললেন,,”লিয়া তুমি বুঝি কেক খাওনা।নাতাশা যখন এতো করে বলছে।তখন আজকের জন্য নাহয় একটু মুখে নাও। বাচ্চা মেয়ে বলছে।নাতাশা আবার ভীষণ অভিমানী।”

অবশেষে লিয়া নাতাশার সামনে হাঁটু ভেঙ্গে বসে।একহাতে নাতাশার হাতটা ধরে আলতোকরে হালকা বাইট দেয়।তারপর বাকিটুকু নাতাশার মুখে দিয়ে দেয়।

কেক কাটা পর্ব শেষে জাহানারা বেগম আক্ষেপ করে বললেন,,”তাসনিম আসতে পারলো না। আচ্ছা যাইহোক তোমরা রাতে ডিনার করে যাবে।”

.

তুলি বিরক্তিকর ফেস করে লিয়ার কানের পাশে মুখটা নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,,”আমার আপুর কান্ডজ্ঞান দেখেছিস।ওর হবু শ্বশুর বাড়ির সবাই ওর জন্য অপেক্ষা করছিলো।আর ও আছে ওর ডিউটি নিয়ে। অদ্ভুত! মানুষ একটা।”

বড়রা টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে।ছোটরা সোফায় বসে।এরমধ্যে গিটার হাতে নীল আসে।সোফায় জারিফের পাশে বসে পড়ে।জারিফ তুষারের সাথে কথা বলছিলো। নাতাশা জারিফের কোলের উপর বসে ছিলো।গিটারে টুং টুং শব্দ তুলে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নীল । জারা লিয়া তুলি গল্প করছিলো।সবার দৃষ্টি নীলের দিকে যেতেই নীল গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,,”গাইস।এখন একটা গান হলে কেমন হয়।এখানে কে ভালো গাইতে পারে?”

নীলের কথাটা বলতে দেরি তুলির উত্তর দিতে দেরি হয়না।তুলি উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে ফেলে,,”লিয়া।লিয়া খুব ভালো গাইতে পারে।”

লিয়া কথাটা শোনার সাথে সাথেই ঝড়ের বেগে তুলির দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায়।তুলি ফাঁকা ঢুক গিলে নেয়। মনেমনে আওড়ায়,এইরে এটা তো বাড়ি নয়।নতুন একজায়গায় এসে।এভাবে লিয়ার নামটা বলা মোটেও আমার উচিত হয়নি। লিয়ার ফেস দেখে মনে হচ্ছে ও তো বেশ চটেছে আমার উপর।

লিয়ার কথা শোনার সাথে সাথেই জারা এক্সাইটেড হয়ে বলে,,”বাহ্!তাই নাকি। আচ্ছা তুমি তবে এবার একটা গান গাইয়ে শুনাও।আমি তো খুব এক্সাইটেড।”

জারার সাথে নীলও একই সুরে বললো।তবুও লিয়া কিচ্ছুতেই রাজি হচ্ছিলো না।নাতাশা এসে লিয়া আর তুলির মাঝে বসে বলে,,”প্লিজ, মিষ্টি আন্টি।গাও না।আমার বার্থডে স্পেশাল গিফট হিসেবেই নাহয় গাও।”

এত সুন্দর মায়াময় আবদার কি ফেলা যায়?লিয়া নাতাশার আবদার রাখতে অবশেষে গাইতে থাকে।একহাতে নাতাশার মিষ্টি তুলতুলে গালটা টিপে দেয়। অতঃপর গায়,,

হিরে মানিক তো নয়,
আমি শুধুই তোমায়,
ভালোবাসি🖤🖤
রুপকথার চেয়েও
নীল পাখির থেকেও
তোমায় আমি ভালোবাসি🖤🖤

হিরে মানিক তো নয়,
আমি শুধুই তোমায়, ভালোবাসি 🖤🖤

[চলবে…ইন শা আল্লাহ]

#সুখের_ঠিকানা
#শারমিন_হোসেন
#পর্ব০৯

লিয়ার গালে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে নাতাশা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলতে থাকে,,”থেংকিউ মিষ্টি আন্টি।এত সুন্দর একটা গান গাওয়ার জন্য।অনেক অনেক থেংকিউ।”

লিয়া স্মিত হাসলো।এমন সময় নাতাশা জারিফের সামনে গিয়ে একহাত কোমড়ে রেখে স্ট্রেইট দাঁড়ালো। তৎক্ষনাৎ ডানহাতটা বাড়িয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে বলতে থাকে,,”মামা তোমার ফোনটা একটু দাও তো।”

জারিফ বিনাবাক্য ব্যয়ে সাথে সাথেই একহাত দিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করে নাতাশার হাতে দেয়।নাতাশা কপাল কুঁচকে বলে,,”লকড খুলে দিবে তো।”

জারিফ মৃদু হাসলো। কিয়ৎক্ষন পরেই শীতল কন্ঠে বললো,,”পিন আর ফেস লকড দেওয়া আছে।পিনটা আমার জন্য আর ফেস লক তো তোমার জন্য।তোমারই তো ফেস লক দেওয়া আছে।”

নাতাশা একহাত কপালে রেখে ঠোঁট উল্টে বলে,,”ওহ্। উফ্!ভুলে গিয়েছিলাম তো।”

নাতাশা মিষ্টি হেসে জারিফের খোঁচা খোঁচা দাড়ি ওয়ালা গালে চুমু খায়। অতঃপর লিয়াদের পাশে এসে বসে।ক্যামেরা অন করে লিয়া আর তুলিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,”আন্টি তোমাদের সাথে সেলফি তুলতে চাই।নাও এবার সেলফি তুলো।”

লিয়ার দিকে ফোনটা ধরে নাতাশা কথাগুলো বলে।লিয়া ফোনটা ধরতে চাইছে না।লিয়ার মনমস্তিষ্ক ফোনটা ধরতে অনীহা প্রকাশ করছিলো।সেইসময় পাশ থেকে তুলি ফোনটা ধরে ফন্ট ক্যামেরা অন করে।তুলির হাতে ফোন ।নাতাশা লিয়ার গলা জড়িয়ে ধরে লিয়ার গালের সাথে মুখটা লাগিয়ে রাখে।ফলে নাতাশার ঠোঁট লিয়ার ফর্সা গাল অনায়াসেই স্পর্শ করে।একসাথে ওরা সেলফি তোলে।আবার নাতাশা ফোন হাতে ক্যাচক্যাচ শব্দ তুলে লিয়ার কয়েকটা ছবি তোলে।লিয়ার চোখমুখ বিরক্ত প্রকাশ করছিলো।তবুও লিয়া মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছিলো না। নাতাশা লিয়ার কোলের উপর বসে ছবি গুলো দেখাতে থাকে।যতই লিয়া সবকিছু স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করছে।ততই যেনো পরিবেশ পরিস্থিতি কেমন এলোমেলো হয়ে আসছে।যার ছায়া থেকেও নিজেকে একশোগজ দূরে রাখার চিন্তা ভাবনা মনমস্তিষ্কে গেঁথে রাখার চেষ্টা করে চলছে। তথাপি সিচুয়েশনের জন্য বারংবার সব কিছুতে না চাওয়া সত্বেও মানুষটা জড়িয়ে যাচ্ছে।এখান থেকে বাসায় না ফিরা অব্দি লিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে না।দম বন্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে লিয়ার কাছে।সবাই কত সুন্দর স্বাভাবিক ভাবে গল্প গুজব করছে। আনন্দঘন পরিবেশটা উপভোগ করছে। কিন্তু লিয়া পারছে না এই আনন্দঘন পরিবেশটা ইনজয় করতে। দাঁতে দাঁত চেপে মনের মধ্যে পুষে রাখা ব্যাথাটা থেকে থেকেই যেনো অসয্য জ্বলনে পরিনত হচ্ছে।সেই জ্বলনে ঘি ঢালার জন্য যেনো পরিবেশটাও অনুকূল ভূমিকা পালন করছে।লিয়া ব্যাথাতুর ভগ্ন হৃদয় নিয়ে দৃষ্টি ফ্লোরে নিবদ্ধ করে নিজেকে নির্বিকার রাখে।

“আমি এমন একটা তুমি চাই!এমন একটা তুমি চাই!যে তুমিতে আমি ছাড়া অন্য কেউ নাই!তুমি একবার বলো যদি আমি পারি দিবো খরস্রোতা নদী! তুমি একবার বলো যদি আমি পারি দিবো খরস্রোতা নদী! ভালোবাসা দিবো পুরোটাই!!!”

নীল গিটারে টুং টুং শব্দ তুলে গলা ছেড়ে গাইতে থাকে।লিয়া মাথাটা তুলে নীলের দিকে একপলক তাকায়।মনেমনে নিজের উপর নিজেই তাচ্ছিল্য হাসে।জারা ভেংচি কাটলো।বিড়বিড় করে বলতে থাকে,হু!যে তুমিতে আমি ছাড়া অন্যকেউ নেই।নিজের মনের ভেতর কুড়িজন রেখে সেকিনা এমনটা আশা করে। ভাবা যায়! উফ্!যার কিনা সেকেন্ডে সেকেন্ডে এ বেবি সে বেইবি ফোনের পর ফোন দিতেই থাকে।ওর মনের গলিতে তো জ্যামে ভরা।একদম লেডিসদের যানজট।তার মুখে এমন গান। হুঁ।

জারার বিড়বিড় করা কথাগুলো হালকা লিয়ার কর্ণদ্বয় শ্রবণ হতেই লিয়া মৃদু হাসে। নীল গান শেষ করে গিটারটা জারিফের দিকে বাড়িয়ে দেয়।তারপর অন্যহাতে কপালের উপর আসা ঝাঁকড়া চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে বলতে থাকে,,”ব্রো এবার তোর পালা।নে ধর।আর একটা সুন্দর গান গেয়ে এই সুন্দর উপভোগ্য মূহূর্তটা আরো আনন্দময় করে তোল।”

জারিফ সোজা বসা থেকে ফট করে উঠে দাঁড়ায়।তারপর কাঠকাঠ গলায় বলে,,”অসম্ভব। তোরা গাইতে থাক।”

এতটুকু বলে জারিফ গটগট করে নিজের রুমের দিকে যেতে থাকে।নাতাশা তুলি আর লিয়ার মাঝে বসে জারিফের ফোনে গেইমস খেলছিলো।এরমধ্যে নিরুপমা বেগম এসে সবাইকে ডিনারের জন্য ডাকে।সবাই ডায়নিং এ গিয়ে বসে। জারা চেয়ার টেনে বসতে যাবে সেইসময় জাহানারা বেগম বললেন,,”জারা যাতো।জারিফকে ডেকে আন।সবাই একসাথেই খেয়ে নিবে।”

“ঠিক আছে।”

বলে জারা জারিফকে ডাকতে যায়।জারা মিনিট খানেক পরে এসে চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলে,,”ভাইয়া আসছে।”

এরমধ্যে একটা ফাঁকা চেয়ারে জারিফ বসে পড়ে। জাহানারা বেগম আর নিরুপমা বেগম খাবার সার্ভ করছেন।বাকিরা সবাই খেতে বসেছে।জারা,তুলি লিয়া পাশাপাশি চেয়ারে ।ওদের ঠিক সামনা-সামনি চেয়ারে তুষার ,রাহবার, জারিফ।জারিফের উপস্থিতি বুঝতে পারার সাথেসাথেই লিয়া নিজেকে একদম গুটিয়ে নেয়।মাথা নুইয়ে একহাতে প্লেটের খাবার নেড়ে চলছে। নিরুপমা বেগম একনজর লিয়ার দিকে তাকিয়ে মায়াজড়ানো গলায় বললেন,,”আরে লিয়া তুমি তো দেখছি খাবার শুধু নেড়েই চলছো। খাবার ভালো লাগছে না বুঝি? রান্না ভালো হয়নি বোধহয়?”

নিরুপমা বেগম ছেলের মতোই খুব মিশুক স্বভাবের।সহজ সরলভাবে সবকিছু বলে ফেলেন।এটা ওনার স্বভাবসুলভ আচরণ।লিয়া তৎক্ষণাৎ মাথাটা তুলে নিরুপমা বেগমের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসার চেষ্টা করে। ঠোঁটের কোণে জোরকরে হাসি ফুটিয়ে বলে উঠলো,,”নাহ্ আন্টি।খাবার অনেক টেস্টি হয়েছে। খাচ্ছি তো।”

নিরুপমা বেগম অমায়িক হাসলেন। চিংড়ির মালাইকাড়ির বোলটা একহাতে তুলে নিয়ে আদুরে গলায় ফের বললেন,,”আমার হাতের মালাইকাড়ি।খেয়ে দেখো তো কেমন হয়েছে?”

কথাটা শেষ করেই লিয়ার প্লেটে চিংড়ির মালাইকাড়ি দিতে থাকেন।লিয়া একবার প্লেটের দিকে তাকালো আবার নিরুপমা বেগমের মুখের দিকে। কত সুন্দর আদর করে ভালোবেসে তুলে দিলেন। ‌তাই লিয়া ভদ্রতা রক্ষার্থে কিছু বলতে পারলো না।লিয়ার চিংড়ি মাছে এলার্জি। চিংড়ি খাওয়া কড়াকড়ি ভাবে নিষেধ।লিয়া মনেমনে আওড়ায়,একদিনই তো হালকা একটু খেলে সমস্যা হবে না।লিয়া এইভেবে খেতে থাকে।

সবারই খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। জাহানারা বেগম নিরুপমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,”ছোটো তুই এদিকটা দেখিস ।আমি যাই দেখে আসি।নাতাশা ঘুম আসছে কিনা?চারু তো কখন নাতাশাকে ঘুমাতে নিয়ে গিয়েছে।এখনো ফিরছে না যে।চারু বেচারিকে একের পর এক গল্প শোনানোর জন্য জ্বালাতন করছে হয়তো।”

জাহানারা বেগম কথাটা শেষ করে রুমে যান।লিয়ার খাবার খাওয়া প্রায় শেষ।এমন মূহূর্তেই লিয়ার মুখ হাত চুলকাতে শুরু করে।লিয়া বেকায়দায় পরে যায়।বাম হাত দিয়ে আলতোকরে মুখের একপাশে চুলকাতেই আরো যেনো বৃদ্ধি পেতে থাকে। সাথে হালকা কাঁশি শুরু হলো। লিয়াকে কাঁশতে দেখে সবার দৃষ্টি যায় লিয়ার দিকে। লিয়াকে দেখে সবাই হকচকিয়ে উঠে।ডানপাশে বসা জারা বড়বড় চোখ করে চেয়ে চিন্তিত গলায় শুধালো,,”একি তোমার মুখটা এতো লাল হলো কিকরে?কিহয়েছে?”

জারিফ সামনে বসা লিয়ার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়।সবার দৃষ্টি লিয়ার উপর। নিরুপমা বেগম চিন্তিত হয়ে ব্যতিব্যস্ত গলায় বললেন,,”লিয়া কিকরে হলো এসব? মাত্রই তো সব ঠিক ছিলো। হঠাৎ করে কি এমন হলো।”

লিয়ার চুলকানি, কাঁশি সাথে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।যার ফলে লিয়ার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিলো।লিয়ার প্লেটে থাকা চিংড়ি মাছের দিকে নজর পড়তেই তুলি বলে উঠলো,,”একি লিয়া তুই চিংড়ি খেয়েছিস।তোর না চিংড়িতে এলার্জি।”

তুলির কথাটা শ্রবণ হতেই জারিফের একসেকেন্ডও বাকি থাকে না যে এটা মূলত এলার্জির জন্য হয়েছে।জারিফ লিয়ার দিকে একপলক তাকায় অতঃপর খাবার রেখেই হাত ধুয়ে নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে যায়।সবাই এটাসেটা হুহতাশ করেই চলছে। নিরুপমা বেগম তখন থেকেই আফসোস করে চলেছেন।উনি লিয়ার গায়ে অনবরত হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন আর অপরাধীর স্বরে বলছেন,,”ইশ!আমার জন্য এরকমটা হলো।কেনো যে আমি মালাইকাড়িটা দিতে গেলাম।সব দোষ আমার।আমার জন্য এখন মেয়েটাকে এত কষ্ট পেতে হচ্ছে।”

লিয়া মুখ হাত চুলকাচ্ছে। কাঁশি সাথে শ্বাসকষ্ট। শ্বাসকষ্টটা যেনো সময়ের সাথে সাথে বাড়ছে। নিরুপমা বেগম নীলকে উদ্দেশ্য করে শুধালেন,,”এই নীল এভাবে চুপ করে বসে থাকবি ।যা ডক্টরকে ফোন কর।আর নাহয় এখনি মেয়েটাকে হসপিটালে নিয়ে চল।”

আকস্মিক ঘটনায় সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছে।নীল চিন্তিত হয়ে বলে,,”মিস লিয়া আপনি চিন্তা করবেন না।আমি এক্ষুনি ডক্টরকে ফোন করছি।”

তুলি তুষারকে বলে মেজো চাচিমার কাছ থেকে ফোন দিয়ে জেনে নিতে।এরকম হলে লিয়াকে কি মেডিসিন দেয়।তুষার তখনই চেয়ার ছেড়ে উঠে যায় কল দিতে।নিরুপমা বেগম একহাতে লিয়াকে জড়িয়ে আছেন।অন্যহাত লিয়ার মাথায় আর পিঠে হাত বুলাতে থাকেন।নীল ফোন বের করে ডক্টরের নম্বরে ডায়াল করতে করতে বলে,,”আম্মু তোমার একটু বুঝে শুনে দেওয়া লাগতো।নতুন পরিবেশে লিয়া লজ্জায় মুখফুটে বলতে পারেনি। উফ্!দেখছো তোমার জন্য এখন কিরকম একটা বাজে সিচুয়েশন ক্রিয়েট হলো।ওনাদের বাড়ির লোকজন কি ভাববে? প্রথম দিন ঘুরতে এসেই।তাদের বাড়ির মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লো। বিষয়টা দৃষ্টিকটু লাগবে না।”

নিরুপমা বেগম অসহায় মুখশ্রীতে তাকিয়ে আফসোস করে ফের বলতে লাগলো,,”উফ্!কি থেকে কি হয়ে গেলো।কেনো যে আমি মেয়েটাকে জোর করে মালাইকাড়ি দিতে গেলাম।”

কথাটা শেষ করে নিরুপমা বেগম আল্লাহ কে স্মরণ করতে থাকেন।হে মাবুদ সবটা দ্রুত ঠিক করে দাও।লিয়ার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে দেখে সবারই ভীষণ খা’রাপ লাগতে থাকে।লিয়া চোখ বন্ধ করে টেনে টেনে শ্বাস নিতে থাকে।লিয়ার ফর্সা দুইগাল ফুলেছে অনেকটা। সাথে র”ক্তা”ক্ত বর্ণ ধারণ করেছে।ডক্টর ফোন রিসিভ না করায় নীলের ইচ্ছে করছে ফোনটা ছুড়ে ফ্লোরে ফেলতে। এরমধ্যে জারিফ এসে লিয়ার সামনা-সামনি দাঁড়ায়।হাতে থাকা একটা মেডিসিনের পাতা থেকে একটা বড়ি বের করতে করতে গম্ভীর গলায় বলে,,

“সমস্যাটা যার তার তো না জানার কথা নয়। সেতো বাচ্চাও নয় যে ভুলে যাবে। আর তার জন্য নিষিদ্ধ খাবারগুলোই আগে খাবে।সবাইকে টেনশনে ফেলবে।”

জারিফের কথা শ্রবণ হয়ে নিউরনে সাড়া জাগাতেই লিয়ার ভীষণ কান্না পায়। একটা মানুষ যেকিনা অসুস্থ আর তারজন্য তাকেই কিনা দোষারোপ করা হচ্ছে।লিয়া ক্লান্ত চোখে ঘন পল্লব তুলে তাকায় জারিফের গম্ভীর মুখশ্রীতে।জারিফ লিয়ার হাতে বড়িটা ধরিয়ে দেয়। অতঃপর পানির গ্লাসটা জারাকে দিতে বলে।জারা দ্রুত এগিয়ে এসে লিয়াকে হেল্প করে।লিয়া বড়িটা গলাধঃকরণ করে।জারিফ গম্ভীর মুখাবয়ব করেই ফের বলে উঠলো,,

“ছোটোমা যখন তোমার প্লেটে চিংড়ি দিয়েছিলো।সেই মূহূর্তেই তোমার বলা উচিত ছিলো।তোমার এটাতে এলার্জি আছে।”

এরমধ্যে তুষার এসে বলতে থাকে,,”মেজো চাচিমার থেকে শুনেছি।**এই ট্যাবলেট দিলেই চুলকানি কমে যাবে।সাথে সাফোকেটিংও।”

জারিফ দুইহাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে শান্ত কন্ঠে বললো,,”আমি ডক্টর এর থেকে ফোনে শুনে নিয়েছি।আর আপাতত এই গ্রুপের একটা ট্যাবলেট বাসায় ছিলো।সেটা দিয়েছি। আশা করা যায় দ্রুতই ঠিক হয়ে যাবে। আধা ঘন্টার মধ্যে যদি না কমে তবে হসপিটালে এডমিট করতে হবে।ডক্টর এমনটাই বলেছেন।”

জারিফ জারাকে ডেকে বলে,,”জারা লিয়াকে তোর রুমে নিয়ে যা।ও আপাতত রেস্ট করুক।”

লিয়া টেনেটেনে শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে বলতে থাকে,,”আ আমি বাসায় যাবো।”

জারিফ কিছুটা কঠোরভাবে বলে,,”জারা তোকে কি বললাম শুনতে পাসনি।আর বাসায় বা যেখানেই যাক কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর।”

নিরুপমা বেগম লিয়াকে উদ্দেশ্য করে আদূরে গলায় বললেন,,”লিয়া সোনা আম্মু।জারিফ ঠিকই বলেছে ‌এভাবে যাওয়া মোটেও ঠিক হবে না।এসেছো সুস্থ সবল মানুষ।এখন এরকম অসুস্থ অবস্থায় গেলে আমাদের নিজের কাছেই খা’রাপ লাগবে।তাই বলছি না থেকো যেয়ো।তবে একটু বেটার হও তখন।”

পাশ থেকে তুষারও একই সুরে বলে উঠলো,,”হ্যা লিয়া আন্টি একদম ঠিক বলেছে।কিছুক্ষণ ওয়েট করি।যখন একটু বেটার ফিল করো তখন যাবো।কেমন?”
.

জারার রুমে বিছানার হেডের সাথে বালিশ ঠেকিয়ে তাতে হেলান দিয়ে পা মেলে শুয়ে আছে লিয়া।লিয়ার পাশে জাহানারা বেগম বসে। নিরুপমা বেগম অপর পাশে মুখভার করে বসে।জারা তুলি পা ঝুলিয়ে বিছানার একপাশে বসে।সবারই মুখভার।ঘড়ির কাঁটা রাত সাড়ে দশটার ঘরে। প্রায় একঘন্টার মতো হবে লিয়াকে মেডিসিন খাওয়ানো হয়েছে।আগের থেকে লিয়া এখন অনেকটা বেটার ফিল করছে। শ্বাসকষ্টটা কমে এসেছে সাথে চুলকানিও কমেছে।তবে মুখটা লাল আছেই।জারিফ তুষার আর নীল ড্রয়িংরুমে বসে ছিলো।জারিফ লিয়ার অবস্থা জানার জন্য উঠে আসে।হালকা কেশে জারার রুমে প্রবেশ করে।রুমে প্রবেশ করতেই বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে থাকা লিয়ার দিকে দৃষ্টি যায়। ফর্সা গাল ফুলে রক্তিম হয়ে আছে। টানাটানা হরিণী বড়বড় কালো মিচমিচে চোখের মনি চোখদুটো ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে।লিয়ার ক্লান্তিমাখা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতেই লিয়ার সাথে চোখাচোখি হয়।লিয়া এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে।লিয়া কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে দ্রুত দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়।জারিফ রুমের মাঝবরাবর দাঁড়িয়ে কন্ঠে একরাশ শীতলতা নিয়ে লিয়াকে শুধায়,,

“এখনও কি আগের মতো সমস্যা হচ্ছে?কমেনি একটুও?বেশি কষ্ট হচ্ছে কি?”

দুদিকে ঘাড় নাড়ায় লিয়া।যার অর্থ না কষ্ট হচ্ছে না।ঠিক আছি।লিয়া দৃষ্টি নুইয়ে রেখেই জবাবে মৃদুস্বরে ফের আওড়ালো,,”এখন সমস্যা নেই।অনেকটা বেটার ফিল করছি।”

পরপর তুষার আর নীলও ভেতরে ঢোকে।লিয়া আবার বাসায় চলে যাওয়ার কথা বলে।সেইসময় একইসুরে
তুষার জাহানারা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলে,,”আন্টি এখন নাহয় আমরা আসি।লিয়া তো এখন অনেকটাই ভালো আছে।”

জাহানারা বেগম সাথে নিরুপমা বেগম অনেক করে আজকে থাকার কথা বললেও লিয়া তুলি তুষার ওরা অনেক কিছু বলে কয়ে বুঝিয়ে -সুঝিয়ে চলে আসে।এখান থেকে ক্যান্টনমেন্ট বেশি দূরে নয়।তাই রাত হলেও যাওয়া ব্যাপার নয়। অনেক করে বলার পর ওনারা যেতে দেন।
.
খোলা আকাশের নিচে চাঁদের মৃদুআলোয় ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে জারিফ।জারিফের মনটা আজকে বিষন্ন লাগছে।জারিফ আশা করেছিলো, তাসনিম হয়তো কল ব্যাক করবে।সরি বলবে।নিজ থেকে কথা বলবে।না এমন কিছুই হলো না। বরঞ্চ এসব ভেবে জারিফ কিছুটা আহত হয়।জারিফের হৃদয় হতাশ হয়।জারিফ ঠোঁট গোল করে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে। পরক্ষণেই জারিফের মনেহয়,তখনকার কথায় তাসনিম মাইন্ড করতে পারে।হয়তো ও অভিমান করে আছে। সেইজন্য ফোন ব্যাক করেনি।আমার কথায় হয়তো হার্ট হয়েছে। এটা ভাবতেই জারিফের নিজের কাছে অপরাধবোধ লাগছে।মনটা বারবার কুঁড়েকুঁড়ে খাচ্ছে। অনুশোচনায় জড়জড়িত হচ্ছে মন।এখন এই শান্ত নিস্তব্ধ পরিবেশে জারিফের মন বলছে ,তখন বোধহয় তাসনিমের সাথে একটু বেশিই রিয়াক্ট করে ফেলেছি।কড়া করে অনেক কিছুই বলে ফেলেছি।যা একদম উচিত হয়নি।আমার তো তাসনিমকে নিয়ে আরো প্রাউড ফিল করা উচিত ছিলো।ওর কাছে ওর মানবতাবোধ, রেসপনসিবিলিটি আগে। অনেস্টলি নিজের দায়িত্ব পালন করে। উফ্!তখন কি হয়েছিলো?নিজেও বুঝতে পারছিনা।

নীল ফোন স্ক্রল করতে করতে ছাদে আসে।জারিফকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে যায়।আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকা চাঁদমামার দিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে গায়, রাতের আকাশ যেমন চাঁদের আলোয়!তোর কথা মনে হলে লাগে ভালো। এতটুকু গেয়ে দুইহাতে ভর দিয়ে ধপ করে রেলিং এ বসে পড়ে।জারিফ সরু দৃষ্টিতে একবার নীলের দিকে তাকায়। অতঃপর দূরে অন্ধকারে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখে।জারিফের কোনো কথা না পেয়ে নীল মুখে মুচকি হাঁসি নিয়ে বলে উঠল,,

“কি ব্যাপার ব্রো।খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে জোৎস্না গায়ে মেখে ভাবীর কথা স্মরণ করছিস বুঝি।আর নাকি ভাবীর সাথে ফোনে প্রেমালাপ করছিস?কোনটা?”

নীলের এহেন প্রশ্নে জারিফের ভ্রু যুগল কুঁচকে যায়।জারিফ কিঞ্চিত ভ্রু খানিকটা সরল করে নীলের দিকে মৃদু রা’গ দেখিয়ে বলে উঠলো,,”খেয়ে দেয়ে কোনো কাজ নেই তোর?সবসময় উল্টাপাল্টা বলা ছাড়া।”

নীল অবাক গলায় বলে উঠে,,”আরে বাস! উল্টাপাল্টা কি বললাম?তুই তোর হবু বউয়ের সাথে ফোনে প্রেমালাপ করতেই পারিস।এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।আর আমার মনেহয় যদি হবু বউয়ের সাথে ফোনে মিষ্টি মিষ্টি আলাপন না হয়।তাহলে সেটাই অস্বাভাবিক।হুম।এখানে কিছু একটা কম আছে।কারো দিক হতে ঘাটতি আছে।”

নীলের শেষের কথাটা জারিফকে বেশ ভাবাচ্ছে।আসলেই কি কোনো কিছুর ঘাটতি আছে? পরক্ষণেই জারিফ মনেমনে আওড়ালো,এই গাধাটার কথা শুনে দিনদিন বুদ্ধি শুদ্ধি হ্রাস পাচ্ছে।কিসব ভাবছি। উফ্!জারিফকে অন্যমনস্ক দেখে নীল ফোন স্ক্রল করতে করতে প্রশ্ন করে উঠলো,,”তা ব্রো তোর বোধহয় মন খা’রাপ।ভাবী আজকে আসেনি সেইজন্য তোর খুব অভিমান জমেছে।আমি ভাবতে পারছিনা আমার গোমড়ামুখো ব্রো কিনা শেষমেষ মেয়েদের মতো অভিমানী হয়ে গেলো।লাইক সিরিয়াসলি?”

কথাটা শেষ করেই নীল শব্দ করে হেসে উঠলো।জারিফের একটা ধমকে মূহূর্তেই সেই হাসিটা থেমে যায়।জারিফ ধমক দিয়ে বলে,,”আজেবাজে কথা রাখ।আর আমাকে ডিস্টার্ব না করে যা ঘুমিয়ে পড়।অনেক রাত হয়েছে।”

নীলের চোখেমুখে কৌতুহল খেলে যায়।নীল ভাবে কিছু একটা হয়েছে। সেইজন্য হয়তো ব্রো এর মেজাজটা খা’রাপ আছে।নীল কৌতুহলী হয়ে ফের শুধালো,,”ব্রো কি হয়েছে?সাত পাঁচ না ভেবে আমাকে বলে ফেল।দেখি তোকে হেল্প করা যায় কিনা।ঐ কথায় আছে না উড়াইয়া দেখো ছাই,পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রত্ন।তো আমাকে বল ভালো কোনো ডিসিশন দিতেও তো পারি।”

নীলের একরোখা প্রশ্নের কাছে হার মেনে জারিফ বলে,,”তখনকার ফোনকলে হয়তো তাসনিম হার্ট হয়েছে।আমার উচিত হয়নি রিয়াক্ট করা।ভাবছি ফোন করে সরি বলে নেবো।”

নীল ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে উঠলো,,”ওকে ব্যাপার না।মাঝে মাঝে মান অভিমান হওয়া ভালো।এতে করে সম্পর্কটা আরো শক্তপোক্ত হয়।

কিয়ৎক্ষন থেমে ফের সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলতে থাকে,,”ব্রো একটা ভালো আইডিয়া দেই।তুই সরাসরি ভাবীকে এখন ফোনে সরি না বলে।ভাবীকে টেক্সট করে দিবি রেস্টুরেন্টে দেখা করার জন্য।আর একগুচ্ছ সাদা গোলাপ নিয়ে গিয়ে সরি বলবি আর সাথে প্রোপোজ করবি। তোর কথাশুনে বুঝলাম তুই কখনো অফিসিয়ালি প্রপোজ করিসনি।তার আগেই ফ্যামেলির মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিস।এটা তো ব্যাক ডেটেড।আর এখনকার মেয়েরা চায়

নীলকে থামিয়ে দিয়ে জারিফ বলে উঠলো,,”থামবি তুই। তোর আইডিয়া মোটেও আমার কাছে গ্রহণযোগ্য হলো না।অন্যকিছু বল।”

নীল আবারও একইসুরে একই কথা বললো। অবশেষে জারিফ ছাঁদ থেকে প্রস্থান করতে করতে বললো,,” আচ্ছা ভেবে দেখবো।”

পিছন থেকে নীল একহাত উঁচু করে গলা ফাটিয়ে বলতে থাকে,,”দেখবো টেকবো নয়।আমি কালকে একটা রেস্টুরেন্ট বুকড করে রাখবো। সেখানে তুই একদম ফিটফাট হয়ে প্রস্তুতি নিয়ে যাবি।”
.
সকালে ডায়নিং এ খাবার সাজাচ্ছেন নিরুপমা বেগম।জারিফ চেয়ারে বসে হালকা নাস্তা শেষে চা খাচ্ছে জাহানারা বেগম এসে একটা চেয়ার টেনে বসে চা খেতে থাকেন। নিরুপমা বেগম ম্লান গলায় হঠাৎ করেই বলে উঠলেন,,”জারিফ বাবা মেয়েটার খবর নিয়েছিস?এখন কেমন আছে?”

ছোটোমার এমন প্রশ্নে জারিফ কিছুটা অবাক হয়।জারিফের বোধগম্য হয়না কার খোঁজ নেওয়ার কথা বলছেন।জারিফ কপাল কুঁচকে বললো,,”ছোটোমা কার কথা বলছো? বুঝতে পারছি না।”

“আরে লিয়ার কথা বলছি।কাল রাতে ওভাবে চলে গেলো।আহারে হঠাৎ করে অমন অসুস্থ হয়ে পড়লো।”

জারিফ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে,,”নাহ্।আর ফোন করা হয়নি। বাসায় পৌঁছে তুষার ফোন করেছিলো। ঠিকঠাক পৌঁছেছে।আর লিয়ার বেশি সমস্যা হয়নি। এতটুকুই জানি।”

নিরুপমা বেগম ছোট করে বললেন,,”ওহ্!”

একটু থেমে আফসোস করেই ফের বললেন,,”মেয়েটা খুব মিষ্টি দেখতে।আমার তো খুব ভালো লেগেছে। আচ্ছা ভাবী তোমার হবু বৌমা কেমন?তাকে তো এখন পর্যন্ত দেখাই হলো না।”

জাহানারা বেগম গালে থাকা চা টুকু গিলে নেন। অতঃপর শান্ত গলায় বলেন,,”তাসনিম দেখতে অনেকটা লিয়ার মতোই।চাচাতো বোন হলেও যে কেউ দুইজনকে একসাথে দেখলে আপন বোন বলবে বাহ্যিক দিক হতে।তবে লিয়ার থেকে গায়ের রঙটা একটু চাপা তাসনিমের।তবে লক্ষি মন্ত শান্ত শিষ্ট বললে একবাক্যে যে কেউ তাসনিমকে বলবে।এইজন্য তাসনিমকে আমার একটু বেশিই ভালো লাগে।তবে ঐ পরিবারের সবার আচরণই আমাকে মুগ্ধ করেছে।”

নিরুপমা বেগম একগাল হাসেন। ঠোঁটের কোণে বিস্তৃত হাঁসি রেখেই ফের আবেগি গলায় বললেন,,”হুম ঠিকই বলেছো।তবে জানো আমার নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছিলো ।কালকে আমার জন্য এত সুন্দর মিষ্টি মেয়েটাকে কতটা কষ্ট পেতে হলো।আমার মুখের উপর লজ্জায় বলতে না পেরে আমার তৈরি খাবার খেয়েই মেয়েটার কি বেহাল দশা হলো।ছি ছি কি একটা বিশ্রী অবস্থা হলো।লিয়ার মুখটাই যেনো একটা আস্ত মায়ায় জড়ানো। আমার মনে তো গেঁথে আছে মেয়েটার ফেস।আমার তো ইচ্ছে করছে পারলে মেয়েটাকে আমার কাছে রেখে দিতাম।”

এরমধ্যে নীল এসে চেয়ার টেনে বসতে বসতে মৃদুস্বরে বললো,,”তবে দাও রেখে।রাখার তো অপশন আছেই।চোখ কান খুলে তাকালেই মেয়েটাকে তোমার কাছে সব সময় রাখার অপশন পাবে।”

নীলের কথা জারিফের কর্ণগোচর হতেই জারিফ বাঁকা চোখে নীলের দিকে তাকায়। জাহানারা বেগমও অবাক চাহনিতে তাকায়। নিরুপমা বেগম বোকা বোকা চোখে চেয়ে নীলকে প্রশ্ন করে উঠলেন,,”মানে?কি বলতে চাইছিস?”

নীল একহাতে নাইফটা নিয়ে তাতে জেল জড়িয়ে ব্রেডে জড়িয়ে নেয়।বড় করে একটা বাইট দিয়ে মুখে ব্রেড পুড়ে নেয়। অতঃপর চিবুতে চিবুতে দেখে উপস্থিত সবাই নীলের দিকে অবাক হয়ে জিগ্গাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।নীল নিজের একটু আগে বলা কথা স্মরণ হতেই ভ্যাবাচেকা খায়।নীল খাবার টুকু কোনো রকমে গলাধঃকরণ করে থমথমে মুখাবয়ব করে ক্ষীণ আওয়াজে বলে,,”আরে ওর বোন আর কদিন পর এবাড়ির বউ হয়ে আসছে।আর আত্বীয় হলে তো মাঝে মাঝে ঘুরতে আসবেই।তখন নাহয় জোর করে দুইচার দিনের জন্য আটকিয়ে রেখো।”

কথাটা শেষ করে নীল জোরকরে হাসার চেষ্টা করে।জারিফ উঠে চলে যায়। ভার্সিটি যেতে হবে।আজ নয়টায় প্রথম ক্লাস নেওয়ার আছে।
.
জারিফ ক্লাস নিয়ে বের হচ্ছে।সেইসময় নীল ফোন করে বলে, রেস্টুরেন্ট বুকড করে রেখেছি।আর রেস্টুরেন্টের নামঠিকানাও বলে দেয়।জারিফ কিছুটা জড়তা নিয়ে বলে,আজই কেনো?সেখানে নীলের স্পষ্ট জবাব।মান অভিমান পুষে রাখতে নেই।তাই দেরি করা ঠিক হবে না।তাই আজকে বিকেলেই রেস্টুরেন্টে দেখা করবি।
.
বিকেল পাঁচটা বাজে।জারিফ আর নীল সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে।তিনতলার করিডোরে আসতেই নীল জারিফকে শুধায়,,”ব্রো ভাবীকে মেসেজ দিয়েছিস তো। রেস্টুরেন্টের ঠিকানা সেন্ট করেছিস তো।”

“হুম।হটস আ্যপে সেন্ট করেছি। তাসনিম সিন করে রিপ্লাই দিয়েছিলো।আসবে দেখা করতে।”

নীল ফোঁস করে নিঃশ্বাস নিয়ে বলে,,”গুড।”

কাঁচের পোল মি দরজার সামনে আসতেই নীল আর জারিফের নজর যায় ভিতরে উল্টো দিক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শুভ্র রঙের থ্রি পিস পড়িহিত মানবীর দিকে।নীল মুচকি হেসে বললো ,,”বাহবা ভাবী তো আগেই এসে ওয়েট করছে।”

জারিফ ফোনে সময় দেখে নিয়ে বলে,,”আমাদেরই লেইট হয়েছে। পাঁচটা পার হয়ে গিয়েছে দেখ। মেসেজে পাঁচটার কথা উল্লেখ করেছিলাম।”

নীল ওর হাতে থাকা সাদা গোলাপ গুলো জারিফের হাতে দিয়ে বলতে থাকে,,”আচ্ছা ব্রো যা যা বলেছি মনে আছে তো।দারুন একটা রোমান্টিক পরিবেশে।হালকা মিউজিক চলছে।সেখানে তুই গিয়ে ভাবীর কোমড় জড়িয়ে ধরবি।তারপর স্লো ভয়েজে সরি বলবি।তারপর হাঁটু গেড়ে বসে প্রোপোজ করবি।”

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে নীল।জারিফ মোটা চোখে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললো,,”নেভার এসব জড়িয়ে ধরা আমার পক্ষে পসিবেল নয়। এটা আপাতত বাদ থাক।”

নীল একহাত কপালে রেখে বলে,,”ওহ্ ব্রো!এসব নব্বই দশকের মতো বিহেভ বাদদে।আর কদিন পরে তোদের বিয়ে।তাই এটা বেশি কিছু নয়।আর মেয়েদের মন গলানোর এটা একটা টপিকস, হুম।ভাব বিয়ের পরতো আরো কতো ক্লোজ হবি। যাইহোক সেসবে আবার আমার কোনো এক্সপ্রিয়েন্স নেই।তাই রেফারেন্স টানতে পারলাম না।”

এই গাধাটার সাথে কথা বলাই বেকার। লাগামহীন কথাবার্তা।জারিফ আর কথা না বাড়িয়ে একহাতে দরজাটা টান দিয়ে ভেতরে যায়।নীল অল দ্যা বেস্ট বলে।জারিফ কিছুটা নার্ভাস ফিল করছে।কেমন জানি আনইজি লাগছে।সামনের টেবিলের উপর গোলাপ গুচ্ছ নিঃশব্দে রাখে। অতঃপর এগিয়ে যায় ধীর পায়ে। কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে দৃষ্টি সামনের রাস্তায় নিবদ্ধ।কোনোকিছু নিয়ে গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত।তাইতো কারো উপস্থিতি এখন অব্দি টের পায়নি শুভ্র রঙের পোশাক পড়া রমণী।জারিফের নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে যায়।জারিফ অনেকটা আনইজি নিয়েই পিছন হতে কোমড় জড়িয়ে ধরে। কাঁধে থুতনি রাখে।

নীল দরজার সামনে থেকে চলে যেতে থাকে। করিডোর দিয়ে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই নীলের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায়। নীলের দৃষ্টি বড়বড় হয়ে যায়।সাথে মুখটা হা হয়ে যায়।নীল মনেমনে আওড়ায়,এই রে হবু ভাবী এখানে তাহলে ভেতরে কে?আর ব্রো কার কোমড় জড়িয়ে ধরলো? আল্লাহ মালুম।এইবার তো ব্রো এর কপালে দুঃখ আছে।কোনো অচেনা মেয়েকে হুট করে জড়িয়ে ধরার জন্য ব্রো এর মুখে না ঠাসঠাস করে থা’প্প’ড় পড়ে।হে গড!কোনো লোহার হাতের অধিকারী মেয়ে ব্রো এর গালে চ’ড় না বসিয়ে দেয়।

একহাত আলতোকরে নিজের গালে ডলে নিয়ে ফের আওড়ায়,লে বাবা। ব্রো এর ফর্সা গালে এবার পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ বসে যাবে, নিশ্চিত।আর হবু ভাবীতো এসব দেখে নির্ঘাত ভুলটুল বুঝবে। এবার কি হবে?আর উক্ত মেয়ে যদি ব্রো এর নামে ইভটিজিং এর মামলা দায়ের করে। ব্রো এইসবের প্লান কারির নাম হিসেবে আমার নামটা বললে।তখন তো দুইভাই একসাথে কারাগারে যাবো।

তাসনিম যতই এগিয়ে আসছে।নীলের ভাবনা ততই বেড়ে চলছে।সাথে হাত পা কাঁপতে থাকে।নীল শুকনো ঢুক গিলে নিয়ে ভাবে,, তিনতলার এইপুরোটা স্পেস তো আমি নিজেই আজকে বুকড করে রেখেছিলাম।সেখানে অন্য মেয়ে কিকরে ভেতরে? স্ট্রেইন্জ?

[চলবে…ইন শা আল্লাহ]