সুখের_ঠিকানা পর্ব-৪+৫

0
132

#সুখের_ঠিকানা
#শারমিন_হোসেন
৪+৫
#পর্ব০৪

“নীল রঙের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কত জানিনা।তবে আমার সামনে থাকা, কারেন্টের খুঁটির মতো লম্বা নীলের দৈর্ঘ্য জানি। পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি।”

কথাটা শেষ করেই জারার চোখে মুখে বিশ্ব জয় করা হাসি ফোটে।জারার মুখের এক্সপ্রেশন দেখে মনে হচ্ছে,নীলকে জব্দ করার মতো একখানা কথা সে বলেছে। প্রশ্নের সঠিক উত্তর পারেনি তাতে কি হয়েছে।নীলকে বাঁকা উত্তর দিয়েই জারার শান্তি লাগছে।এতেই যেনো জারার মনেপ্রাণে শান্তির বন্যা বয়ে যায়। আহ্!কি শান্তি লাগছে এবার।এমন মুখাবয়ব করে জারা সোফার হেডে মাথাটা আস্তে করে রাখে। চোখ বন্ধ করে মনেমনে হাসে। গোলগাল ফর্সা মুখে চমৎকার হাসি নিয়ে নিরুপমা বেগম জারাকে সাপোর্ট দিয়ে বললেন,,

“একদম ঠিক বলেছিস জারা।তোর উত্তর টা আমার বেশ মনে ধরেছে।নিজের পড়াশোনার কোনো খোঁজ নেই।সেদিকে নজর নেই।নিজের লেখাপড়ার ব্যাপারে উদাসীন।বাতাসে গা ভাসিয়ে চলে।আর অন্যদের প্রাইভেট, কোচিং নিয়ে মশকরা করে।নিজে তো সারাদিন বাইক নিয়ে সারা শহর টইটই করে মাড়িয়ে বেড়ায়।”

কিয়ৎক্ষন থেমে নীলকে উদ্দেশ্য করে মোটা চোখে তাকিয়ে কন্ঠে খানিকটা রা’গ মিশিয়ে বলতে থাকেন,,”বাড়িতে তো আরো একটা ছেলে আছে।তাকে দেখেও তো কিছু শিখতে পারিস নীল।বড় ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু আচরণ-ও তো শিখতে পারিস।এই যে জারিফকে দেখ কত সুন্দর নিপুণতার সহিত সব কিছু করে। ছেলেটা সবদিকে নজর দিয়ে চলে।ভাবী হাই প্রেশারের মানুষ।প্রায় সময় অসুস্থ থাকে।আবার জারার প্রাইভেট কোচিং আছে।নাতাশাকে নিয়ে মিসের কাছে পড়াতে দিয়ে ওদের অপেক্ষা করার অবস্থা নেই। জারিফ নিজেই নাতাশাকে নিয়ে গিয়েছে।জারিফকে বলা কওয়া লাগেনি।আবার নাতাশাকে চেকআপ করাতে একাই নিয়ে যায়।জারিফ নিজ থেকে দেখেশুনে চমৎকার করে সবকিছু সামলে নেয়।আর তুই? কানের পাশে হাজারবার ঘ্যানঘ্যান করেও তোকে দিয়ে সুতোটিও নাড়ানো যায়না।তুই তাহলে কি পারিস?পারিস তো শুধু টাকা উড়িয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে,আর শপিং করতে।”

শুরু হয়েছে কানের পাশে ভাঙা টেপ রেকর্ডার। উফ্!অসয্য।ধ্যাত একই প্যাচাল সকাল -বিকেল শুনতে আর ভালো লাগে না।কে বলেছিলো ব্রো কে সবদিক দিয়ে এতো পার্ফেক্ট হতে। কথাগুলো মনেমনে আওড়ালো নীল।তবে মুখে সেটা প্রকাশ করেনি।এসব কিছু ভেবে মনেমনেই মাথা ঝাড়া দিলো।নীল না পারছে এখানে থাকতে।আর না পারছে মায়ের কথা উপেক্ষা করে উঠে যেতে।নীল মায়ের কাছে বাদড় ছেলে হতে রাজি আছে।তবে বেয়াদবি করতে রাজি না।মা যে তার ভালোর জন্যই সব সময় এরকমটা বলে তা নীল ভালোই জানে বোঝে। কিন্তু কি করার অলসতা,আর ফোরটুয়েন্টি স্বভাব যে নীলের শিরায় শিরায়।তাই তো পড়াশোনায় মনোযোগহীন। অন্যদিকে আড্ডাতে বাজিমাত তার। উফ্!জারার উপর তরতর করে নীলের রাগের পারদ বাড়তে থাকে।এই শাকচুন্নীর জন্য এখন মায়ের কাছে তার বকুনি শুনতে হচ্ছে।নীল এটা ভেবে জারার দিকে কটমট চোখে তাকায়।নীলের রাগের তোয়াক্কা না করে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে জারা উঠে দাঁড়ায়। অতঃপর জারা মুখ ভেংচি কে’টে নিজের রুমের দিকে যেতে থাকে।নীলের রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় শব্দ করে বাজা নীলের ফোনের রিংটোন জারার কানে আসে।জারা কানটা আরেকটু সজাগ করে শিয়র হয়।তারপর ভিতরে গিয়ে নীলের রুমের বেডের উপর ফোনটা দেখে। জারা হাত দিয়ে ফোনটা ধরার আগেই বেজে বেজে কল কে’টে যায়।ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে জারা আওড়ালো,ভাইয়ার কাছে দিয়ে আসি।এমন সময় আবার রিং বেজে উঠে।ফোনের স্ক্রিনে ইংরেজী ফ্রন্টে এলিনা নামটা জ্বলজ্বল করছে।আবার কল কে’টে যেতে পারে এইভেবে জারা রুম থেকে বের হয়ে কয়েক পা এগিয়ে যেতে যেতেই কলটা রিসিভ করে।রিসিভ করার সাথে সাথেই ফোনের ওপাশ থেকে মেয়েলি স্টাইলি চিকন গলার স্বর ভেসে আসলো।কথাটা শোনার সাথে সাথে জারার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো।

“নীল বেব।তুমি কোথায়?আমি এতবার তোমায় কল করছি।তুমি রিসিভ করছো না যে।”

জারা চোখ বড়বড় করে কথাগুলো হজম করার চেষ্টা করে।ফোনের এপাশ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে।ফোনের ওপাশের মানবী ফের মলিন স্বরে শুধালো,,”কিহলো বেবি।কিছু বলছো না কেনো?”

এবার আর জারা চুপ থাকতে পারলো না।হালকা কেশে গলাটা ঝেড়ে নেয়।ভাব নিয়ে চিকন স্বরে যাকে এককথায় বলে কোকিল কন্ঠে বলে উঠলো,,”সরি।আমি আপনার বেবি টেবি নই।ওয়েট,কলে থাকুন।আপনার বেবির কাছে নিয়ে যাচ্ছি।”

ফোনের ওপাশের মানবী উৎসুকভাবে জানার জন্য প্রশ্ন করে,,”হু আর ইউ?”

জারা সেসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে গটগট করে ড্রয়িংরুমে চলে আসে।নীলের সামনে দাঁড়িয়ে একহাত কোমড়ে দিয়ে অন্যহাতের ফোনটা নীলের দিকে বাড়িয়ে দেয়। কন্ঠে শীতলতা নিয়ে বলে,,”এইযে ভাইয়া।ফোন রুমে রেখে এখানে আয়েশ করে শুয়ে স্পোর্টস দেখছিস।ওদিকে তোর মাম্মি তো ফোনের উপর ফোন দিয়ে যাচ্ছে।এবার ফোনটা ধর আর কথা বল।আর তোর মাম্মিকে চিন্তামুক্ত কর।”

জারার কথা নীলের মাথার উপর দিয়ে যায়।নীল জারার কথার আগা গোড়া কিছুই বুঝতে পারছে না।নীল শোয়া থেকে উঠে বসে।একহাতে কুশনটা কোলের উপর নেয়। অতঃপর একবার জারার দিকে দৃষ্টি দেয়।আবার সামনের সোফায় বসে থাকা নিজের মায়ের দিকে দৃষ্টিপাত করে।নীল যেনো কোনো সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত।নীল জারার হাতে নিজের ফোনটা দেখে মনেমনে আওড়ালো, শাকচুন্নী টা আবার কি ফন্দি এঁটেছে। আম্মু তো আমার সামনেই আছে।কার কথা বলছে।নীল একটু নড়েচড়ে বসে।গম্ভীর মুখাবয়ব করে জারার পানে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠলো,,

“আমার জানামতে,আমার কোনো স্টেপ মাদার নেই।ঝেড়ে কাশ।কার কথা বলছিস? ক্লিয়ার করে বল।”

জারার স্বভাব সুলভ বাঁকা জবাব এলো,,”তুই নিজে দেখ। তোর কয়টা মাম্মি আছে তা তুই-ই ভালো জানিস।”

জারার কথাগুলো শুনে নিরুপমা বেগম ভ্রু কুঁচকে ছেলের দিকে চেয়ে আছেন। এহেন কথা শুনে কপালের ভাঁজগুলো প্রগাঢ় হয়।নীল জারার হাত থেকে ফোনটা নিতে যাবে,সেই মূহূর্তে মায়ের গম্ভীর মুখপানে চেয়ে শুকনো ঢোক গিলে নেয়।তারপর কিছু ভেবেই অবাক হয়। চোখে মুখে চিন্তার ছাপ টেনে এনে বলে,,

“আম্মু তোমার বর আমাদেরকে না জানিয়ে কোনো অঘটন ঘটায়নি তো। সারাক্ষণ চোর ডাকাতের পিছনে ছুটতে গিয়ে।কোনো মহিলার খপ্পরে পড়েনি তো।”

কথাটা শেষ করে নিজের ফোনে নজর পড়তেই নীল সাইলেন্ট হয়ে যায়।নীলের মুখের কথা হাওয়া হয়ে যায়।নীলের দুই ঠোঁট আর একসাথে হয়নি।বড়সড় একটা হা হয়ে রয়েছে।যেখানে একটা গোলগাল বড়সড় লাড্ডু অনায়াসেই ঢুকে যাবে।জারা নীলের মুখের দিকে তাকিয়ে শয়তানির হাসি হাসে।ছেলের কথাশুনে নিরুপমা বেগম চোখ পাকিয়ে তাকায়। মায়ের রাগি দৃষ্টি নজরে পড়তেই নীলের মুখটা চুপসে যায়।লহমায় একদম আমসত্ব হয়ে যায় নীলের মুখটা।

নিরুপমা বেগম রাগি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভরাট গলায় বলেন,,”দিনদিন তোর কথাবার্তা আর কাজ কর্ম দেখে আমি চরমভাবে হতাশ হয়ে যাচ্ছি।এতবড় ছেলে মুখে কোনো প্রকারের লাগাম নেই।নিজের বাপকে নিয়ে কেউ এমন মজা করে।দিনদিন তোর ইঁতুড়ে স্বভাব বেড়েই যাচ্ছে।আর এটা হয়েছে তোর বাপের জন্য।এক সন্তান বলে আদরে আদরে বাদড় হয়েছিস।”

নীল মোবাইলটা হাতে চেপে ধরে।স্যান্ডেলের ভিতর পা দিতে দিতে জারাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,,
“শুনেছি পরিবারের ছোটো মেয়েরা শয়তানের হাড্ডি হয়।তাদেরকে দেখলে শয়তানও নাকি ভয় পায়।”

উঠে দাঁড়িয়ে জারার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ফিসফিসিয়ে বললো,,”শাকচুন্নী তোকে লাড়াতে শয়তানও তো ভ’য় পাবে।”

জারা মুখে বাঁকা হাসি নিয়ে জবাবে বললো,,”গুড,ভাইয়া। বুঝেছিস তবে লেইট করে।”

নীল নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে আওড়ায়,,আরেক পেত্নী কল দিয়েছে।”রুমে গিয়ে ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে।
.
.
সুন্দর ঝলমলে একটা নতুন দিন।নাতাশার চেকআপ এর ডেট আজকে।জারিফ নিজেই ডক্টরের কাছে নাতাশাকে নিয়ে যায়। প্রায় দুইমাসের মতো হবে মেডিকেলের একজন শিশু ডক্টর নাতাশার ট্রিটমেন্ট করছে। প্রথমে যখন নাতাশার রোগটা ধরা পড়ে তখন পপুলারে এডমিট ছিলো।তারপর ওখান থেকে একজন ডক্টর খানের কথা বলেন।যে কিনা এই রোগের স্পেশালিস্ট।তারপর থেকে ডক্টর খানের কাছে আসে। মেডিকেলের পার্কিং লনে গাড়িটা পার্ক করে জারিফ।গাড়ি থেকে নেমে অপর পাশের ডোরটা খুলে।নাতাশার সিট বেল্ট খুলে নাতাশাকে নিচে দাঁড় করিয়ে মুখে মাস্ক পড়িয়ে দেয়। মাস্ক পড়ার পর নাতাশা বুক ভরে জোরে করে শ্বাস টেনে নেয়।জারিফ স্মিত হেসে মায়াভরা আদূরে গলায় বলে,,

“কোনো সমস্যা হচ্ছে সোনা। কষ্ট হচ্ছে কি?”

নাতাশা মুখটা উঁচু করে জারিফের দিকে তাকিয়ে দুদিকে ঘাড় নাড়িয়ে বলে,,”উঁহুম।একদম না।আমার তো খুব ভালো লাগছে।”

জারিফ গাড়ি থেকে সবুজ রঙের বড় মেডিকেল রেকর্ড ফাইলটা বের করতে থাকে।নাতাশা সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া করা অনেক লোকজন কপাল কুঁচকে দেখতে থাকে। হঠাৎ নাতাশার কিছু মনে হতেই ভ্রু কুঁচকে জারিফের এক আঙ্গুল ধরে ঝাঁকিয়ে মিষ্টি স্বরে ফের বলে,,”মামা।আজকে ভালো আন্টির সাথে দেখা হবে তো।সেদিন তো ভালো আন্টির সাথে দেখা হয়নি।সেইজন্য আমার ভীষণ ভীষণ মন খা’রাপ হয়েছিলো।”

শেষের কথা মুখটা ভারী করে ঠোঁট উল্টিয়ে বলে নাতাশা।নাতাশার কথা শ্রবণ হতেই জারিফের মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠে সেই মায়াবী নিষ্পাপ মুখটা। মায়াবী ফেসের অধিকারীনীর গোলাপী পাতলা ওষ্ঠ দ্বয় নেড়ে ধীরে ধীরে বলা শান্ত গলার কথা।সবযেনো ছবি হয়ে জারিফের দুচোখে ভেসে উঠলো। শুভ্র বেলি ফুলের পাপড়ির ন্যায় স্নিগ্ধ মুখটা বারংবার জারিফের দুনয়নে ভাসতে লাগলো।এখানে যে কয়বার চেকআপের জন্য আসা হয়েছে সেই কয়বারই সেই মানবীর সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল। লাস্ট চেকআপেই দেখা হয়নি। প্রথমদিন ভুলবশত জারিফ নাতাশার ফাইলটা ফেলে চলে গিয়েছিল।সেই মানবীর মাধ্যমেই জারিফ ফাইলটা ফিরে পেয়েছিলো।ফাইলের উপর পেশেন্টের নাম আর মোবাইল নম্বর থাকায়। ইন্টার্নের মেয়েটা সেটা হাতে পেয়ে,ফেরত দেওয়ার জন্য উক্ত নম্বরে কল দেয়।ফোন রিসিভ করে ধীরে ধীরে বলা মেয়েলি সফট ভয়েজে নাতাশার ফাইলের কথা বলে।পরে বিকেলেই মেডিকেলে আসে জারিফ ফাইলটা নিতে।এসে মেয়েটার থেকে ফাইল নেয়।আর নাতাশার অসুখের ব্যাপারে অনেক কিছুই জানে।এরপর যে কয়বার দেখা হয়েছে মেয়েটার সাথে হালকা কথাবার্তা হয়েছে।সেটা অবশ্য নাতাশাকে নিয়েই। লাস্ট যেদিন এসেছিলো।সেদিন জারিফের নজরজোড়া বারবার মায়াময় স্নিগ্ধ মুখটার খোঁজ করছিলো।সেদিন নাতাশাকে নিয়ে ফেরার সময় জারিফের হৃদয় বারংবার বলছিলো,আজকে কিছু একটা অপূর্ণতা রয়ে গেলো।তবে জারিফের মস্তিষ্ক সেসব মানতে নারাজ ছিলো।তাইতো মনের ভাবনাকে পাত্তা দেয়নি। একয়দিনে আর বিশেষ করে মনেও পড়েনি মেয়েটির কথা।এখন নাতাশার মুখে মেয়েটির কথা শুনে জারিফের মেয়েটির কথা স্মরণ হয়।আর মনটাও যেনো তার দর্শন একনজরের জন্য হলেও পেতে চাইছে।জারিফ নাতাশার দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে শুধালো,,

“ভালো আন্টিকে তোমার পছন্দ। ভালো আন্টির কথা তোমার মনেই আছে যে দেখছি।”

নাতাশা মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠলো,,”হ্যা পছন্দ তো। একটু আধটু নয়। অনেক অনেক পছন্দ।”

শেষের কথা দুই হাত মেলে ধরে বলে নাতাশা। শিশুবিভাগের গেইটের সামনে এসে দাঁড়ায় ওরা।গেইটের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য কাঠের টুলের উপর বসেই একরোখা ভাবে বললো,,”এখন যাওয়া যাবেনা।ভিজিটর এলাউ হবে না।এখন রাউন্ড চলছে।একটার পর আসুন।”

জারিফ কথার পাল্টা কোনো কিছুই বললো না।শুধু হাতে থাকা ফাইলটা আনসার সদস্যের সামনে ধরলো। বয়স্ক লোকটার বুঝতে বাকি থাকলো না,যে এনারা ভিজিটর নয়।এনারা পেশেন্ট।তাইতো লোহার গ্রিল দেওয়া দরজাটা খুলে দিলো।জারিফ নাতাশার হাত ধরে এগিয়ে গেলো। ডক্টর খানের কক্ষের দরজা খোলাই ছিলো।একসাইডে দেওয়ালে টানানো,,
ডা:আলিফ শাহরিয়ার খাঁন
এমসিপিএস(শিশু)
এমডি,পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি (*****)
কনসালটেন্ট শিশু বিভাগ।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তাকাতেই সোজাসুজি টাওয়েল দিয়ে রাখা চেয়ারটা ফাঁকা দেখলো।তারমানে ডক্টর খাঁন নেই।বোধহয় রাউন্ডে আছে।জারিফ নাতাশাকে নিয়ে শিশু নেফ্রোলজি ওয়ার্ডের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো।

পরনে মিষ্টি কালারের থ্রি পিস।উপরে সাদা এপ্রোন।
গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলানো।হাতে একটা নীল রঙের প্লাস্টিকের ফাইল। নেফ্রোলজি ওয়ার্ডের থেকে বের হয়ে তাবাসসুম তাসনিম আসছে।এমন সময় সামনা-সামনি জারিফের সাথে দেখা হয়। তাসনিম দাঁড়িয়ে পড়ে।জারিফও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। তাসনিম প্রথমে সালাম দেয়।তারপর নাতাশার দিকে ঝুঁকে একহাতে নাতাশার নরম তুলতুলে গালে চিকন শ্যাম বর্ণের হাত ছোঁয়ায়।আদূর মিশ্রিত স্বরে বলে,,

“কিউটি পাই কেমন আছো? কি খবর?আবার দেখা হয়ে গেলো।”

নাতাশার চোখে মুখে খুশি উপচে পড়ছে।নাতাশা ঝকঝকে তকতকে দাঁত বের করে হাসি মুখে বলে,,”আমি ভালো আছি।ভালো আন্টি তুমি কেমন আছো?”

“ভালো সোনা।তোমার সাথে দেখা হয়ে আমার ভালোর পরিমাণ টা যে আরো বেড়ে গেলো।”

নাতাশার সাথে কথাশেষ করে মাথা উঁচু করে জারিফের দিকে তাকাতেই দুজনের চোখে চোখ পড়ে।জারিফ দৃষ্টিটা সরিয়ে নেয়।তারপর আমতা আমতা করে বলে,,”ই ইয়ে ডক্টর খাঁন কে ওনার রুমে দেখলাম না।উনি রাউন্ডে আছেন কি?”

মুখের উপর আসা এলোমেলো কিছু চুল একহাতে আলতোকরে কানের পাশে গুঁজে নেয়।তারপর মিষ্টি কন্ঠস্বরে বলে,,”নাহ্।আজকে স্যারের ক্লাস ছিলো তো।স্যার ক্লাস নিতে গিয়েছেন। ক্লাস শেষ করে এসে তারপর রাউন্ডে যাবে।”

হাতে থাকা রিচওয়াচের দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিয়ে ফের কোমল গলায় বলে,,”উঁমম!এতক্ষণে ক্লাস হয়তো শেষ হয়ে গিয়েছে ।আপনি ওয়েট করুন।স্যার চলে আসবে এক্ষুনি।”

“থ্যাংকস।”

এরমধ্যে তাসনিমের নজর যায় নেভি ব্লু শার্টের উপর সাদা এপ্রোন পড়া লম্বা চওড়া বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী বেশ সুদর্শন মানবের উপর। ডক্টর খাঁন কে দেখিয়ে তাসনিম বলে উঠলো,,”ঐতো স্যার চলে এসেছেন।”

জারিফ ডক্টর খানের সাথে দেখা করে সালাম দেয়। ডক্টর খাঁন সালামের উত্তর দিয়ে নিজের কক্ষে যান।গিয়ে নিজ আসনে বসে দুইহাত টেবিলের উপর ভাঁজ করে রাখে। নির্বিকার ভঙ্গিতে সামনের চেয়ার দেখিয়ে বলে,,”প্লিজ,টেক আ সিট।”

জারিফ নাতাশাকে নিয়ে বসে। ডক্টর খাঁন নাতাশার ফাইলটা উপরে মোটা কাঁচ সেট করা টেবিলের উপর মেলে ধরে ভ্রু যুগল কুঁচকে চেক করতে থাকেন।তারপর আ্যলবুমিন টেস্টের রিপোর্ট দেখে জারিফকে উদ্দেশ্য করে বলে,,”আ্যলবুমিন তো নিল আছে।এটা রুটিন চেক।আপাতত প্রবলেম নেই।ইউরিন হিট কেমন?বাসায় নিয়মিত ইউরিন হিট চেক করেন তো।”

জবাবে জারিফ বলে,,”ইউরিন হিট ক্লিয়ার আছে, আলহামদুলিল্লাহ।আর রেগুলারই করা হয়।”

জারিফ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মলিন মুখে শুধায়,,”আচ্ছা ডক্টর এটা একেবারে কিওর হবে না?”

ডক্টর খান টেবিলের উপর থাকা পেপার ওয়েট টা একহাতে নাড়তে নাড়তে বলে,,”দেখুন মিস্টার আয়মান জারিফ।আমি আপনাকে আগেও বলেছি।আবার বলছি, নেফ্রোটিক সিনড্রোম এমন একটা রোগ যা দীর্ঘ মেয়াদি।এটা পনের থেকে বিশ বছর পর্যন্ত বারবার হতে পারে।তবে এই রোগে আক্রান্ত নাইনটি পার্সেন্ট পেশেন্ট সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় সুস্থ হয়ে যায়।তাই বলছি এতো ভয়ের কিছু নেই।”

ডক্টর খাঁন নাতাশাকে দেখে। অতঃপর উনার রুমে থাকা পিওনকে ডেকে বলেন,,,”বাচ্চার বিপি মাপতে হবে। ইন্টার্ন এর কাউকে ডেকে দিন।”

এইসময় জারিফ বেশ ভদ্রভাবে বলে,,”ডক্টর আপনি তো মনেহয় এখানে কোথাও প্রাকটিস করেন না।”

গম্ভীর মোটা স্বরে সোজাসুজি বলে,,”নাহ্।আমি প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা চলে যাই। শনিবারে আবার ময়মনসিংহে আসি।ঢাকাতে আমার চেম্বার আছে। ঐখানে যেহেতু আমার বাসা।তাই ছুটির দিনগুলোতে ওখানে চেম্বারে বসি।আর এখানে তো মেডিকেলেই আছি।তাই আর এক্সর্টা করে চেম্বার দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করিনি।”

এরমধ্যে তাসনিম আসে।এসে ডক্টর খাঁন কে নম্র স্বরে সালাম দেয়। তাসনিমের একহাতের মুঠোয় সুন্দর করে স্টেথোস্কোপটা মুড়ানো। তাসনিম বিপি মেপে বলে,,”স্যার **বাই** ।”

ডক্টর খাঁন সেটা প্রেসক্রিপশনের সাইডে লিখে রাখে।তারপর জারিফের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে থাকে,,”পেডনোসলিন ইউস করার ফলে বিপি টা স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশি থাকে।আর এই পেশেন্টদের ইমিউনিটি একদম কম থাকে।সেটা অবশ্য পেডনোসলিন ইউস করার জন্য। তাই বলছি, কেয়ার নিবেন বাচ্চার।আর সব সময় এলার্জি,তেল চর্বি জাতীয় ফুড এভ্যয়েড করবেন।আর ইউরিন হিট ক্লিয়ার থাকলে আমরা ধীরে ধীরে পেডনোসলিনের পরিমাণ কমিয়ে দেবো।”

ডক্টর আরো কিছু কথা বলেন।সাথে ঔষধ লিখে দেন।আর তাসনিম কে উদ্দেশ্য করে বলেন,,”মিস তাবাসসুম তাসনিম আপনি ওনাকে সবটা ভালো করে বুঝিয়ে দিন।”

কথাটা শেষ করেই ডক্টর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।যাওয়ার সময় ফের বলে,,”আসি মিষ্টার আয়মান জারিফ।আমাকে এখন রাউন্ডে যেতে হবে।”

জারিফ অমায়িক হেসে এক শব্দে বলে,,”শিয়র।”

যাওয়ার সময় নাতাশার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে যায়।মেয়েটাকে দেখলেই কেমন জানি অদ্ভুত মায়া কাজ করে।একে তো মা হারা তার উপরে এতবড় একটা অসুখ।উফফ!সত্যি বিষয়টা বেদনাদায়ক।

তাসনিম জারিফকে সুন্দর করে সব কিছু বোঝাতে থাকে।যদিও জারিফ সবটা অনেক আগেই বুঝে গিয়েছে।একনজর প্রেসক্রিপশন দেখেই।তারপরেও মুখে সেটা ঘুনাক্ষরেও বললো না।মেয়েটার ধীরে ধীরে বলা কোমল স্বরের প্রতিটা কথা শ্রবণ করছে।জারিফের নজর যেনো আজ বেহায়া হতে চাইছে। বারংবার জারিফের দুইনয়ন চোরাচোখে মায়াবী মুখে নিবদ্ধ হচ্ছে।

অবশেষে তাসনিম এর থেকে বিদায় নিয়ে জারিফ নাতাশার হাত ধরে বাইরের দিকে যেতে থাকে।তাসনিম ওদের যাওয়ার পানে চেয়ে থাকে।দুই হাত সাদা এপ্রোন এর পকেটে গুঁজে। হঠাৎ নাতাশা পিছন ফিরে একহাত উঁচু করে নাড়িয়ে বলে,,”বাই।ভালো আন্টি। উম্মাহ।”

তাসনিমও একহাত নাড়িয়ে মিষ্টি হেসে বলে,,”বাই।কিউটি পাই।লাভিউ।”

জারিফ নাতাশাকে ফলো করে পিছনে তাকায়। তাসনিমের সাথে চোখাচোখি হয়।জারিফ স্মিত হাসে।বিনিময় তাসনিমও মিষ্টি করে হাসে।
.
.
ঘড়ির কাঁটা রাত আটটার ঘরে।ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করছে জারিফ।এমন সময় গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে নীল আসে।এসে জারিফের পাশে হাত পা ছড়িয়ে সটান হয়ে বসে পড়ে।মাথাটা সোফার হেডে রাখে।জারিফ একনজর নীলের দিকে শান্ত চাহনিতে চেয়ে পরক্ষণেই দৃষ্টি ফোনে নিবদ্ধ করে।নীল একটু নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসে।হালকা কেশে গলা পরিষ্কার করে বলতে থাকে,,”ব্রো।বাড়িতে তো তোর বিয়ের কথা চলছে। বড়মা বড় আব্বু কে এই নিয়ে কথা বলতে শুনলাম।”

জারিফ দৃষ্টি ফোনে রেখেই বাঁকা করে বলে,,”তোর তো খেয়ে কোনো কাজ – কর্ম নেই।ফোরটুয়েন্টি করা,এরওর কথা শুনে খবরদারি করা।”

কে বলেছে কাজ নেই।এসব করাই কি চার্টি খানিক কথা।কেউ চাইলেও কি সহজে খবরদারি কাজ করতে পারবে।উহুম!পারবে না।আর সেই কাজ কি-না নীল স্বইচ্ছায় করে বেড়ায়। খবরদারি কাজের জন্য কাউকে যদি নোবেল দেওয়া হতো।তাহলে নীল মনেহয় নোবেলটা আগে আ্যসিভ করতো,হুম।এসব ভেবে নীল মনেমনেই নিজেকে আস্বস্ত করে। অতঃপর কোনো কথা গায়ে না মেখে জারিফকে বলে উঠলো,,”ব্রো।আমি সিরিয়াসলি বলছি এবার।রিয়েলি।তোর বিয়ে নিয়ে কথা আমি শুনেছি।”

“এখন আপাতত আমি বিয়ে টিয়ে নিয়ে ভাবছি না। তাই এই টপিক বাদ থাক,কেমন?”

নীল কুশনটা কোলের উপর নিয়ে মুখটা ভার করে। ম্লান স্বরে বলে,,”তুই বিয়ে না করা অব্দি তো আমার পথ ক্লিয়ার হচ্ছে না। তাই বলছি নিজের জন্য না হলেও আমার জন্য অন্তত বিয়েটা করেনে ব্রো।”

নীলের কথা শুনে জারিফের কাঁশি উঠে যায়।জারিফ দুইবার কেশে নেয়।নিজেকে স্বাভাবিক করে।কি সাংঘাতিক ব্যাপার স্যাপার অন্যজনের জন্য হলেও নাকি জারিফকে বিয়ে করতে হবে। উফ্! ভাবা যায়।এমন কথা কোনোকালে কেউ বলেছে? এটা ভাবতেই জারিফ অবাকের চরম সীমায় পৌছে যায়।জারিফ বিস্ফোরিত নয়নে নীলের দিকে তাকায়।গলার স্বর রুক্ষ করে বললো,,”এসব কি কথাবার্তা তোর নীল।আমাকে বিয়ে করতে হবে তাও তোর জন্য।মাথা খা’রাপ হয়েছে আমার। না-কি পা’গলা কুকুরে কামড়িয়েছে আমাকে।”

নীল একহাতে কপালে হালকা করে চাপড় দিয়ে হতাশ গলায় বলে,,”উফ্!কি জ্বালা। বললাম এক আর বুঝলি আরেক।বলছি যে,তুই বিয়ে করলে আমার পথ ক্লিয়ার হবে।বড় ভাইকে রেখে ছোট ভাই কিকরে বিয়ে করে।সেটা বলতে চেয়েছি।”

নীলের কথায় জারিফও খানিকটা বোকা সেজে যায়। উল্টো বোঝার জন্য।নীল সিরিয়াস মুখাবয়ব করে বেশ কৌতূহল নিয়ে জারিফকে শুধায়,,”আচ্ছা ব্রো এসব বাদ দে।তবে বলতো তোর কেমন মেয়ে পছন্দ।ঠিক কোন কোয়ালিটির মেয়ে তুই লাইক করিস।”

“ভেবে দেখেনি।তাই বলতে পারছি না।”

নীল ঠোঁট গোল করে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে,,”ভেবে দেখতে হবে না।এখন ভেবে নিয়ে বল।যেমন বর্ণনা দিবি,ঠিক তেমনই মেয়ে খুঁজে বের করবো।সেই মেয়ে যেখানেই থাকুক না কেনো। উগান্ডা থাকলে উগান্ডা থেকেই ধরে বেঁধে আনবো,হুম।”

জারিফ নীলের দিকে তাকাতেই নীল থেমে যায়। দশ সেকেন্ড পরে ফের শুরু করে,,”তবে শুনেছি,যে যেরকম টা চায়।তার কপালে নাকি ঠিক উল্টো টা থাকে।জানিনা তোর সাথে আবার এরকমটা হবে নাতো।”

নীল বারবার প্রশ্ন করায় জারিফ কিছু সময় চোখ বন্ধ করে ভেবে নেয়। অতঃপর চোখে মুখে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে বলতে থাকে,,”শ্যামবর্ণের কোমল স্বভাবের মেয়ে আমার পছন্দ। মায়াবী ফেস।যে ফেসের দিকে তাকালেই মনে হবে পবিত্র নিষ্পাপ।কোনো মেকির ছাপ থাকবে না।কথা বার্তায় যেমন নরম হবে।ঠিক তেমনি নরম মনের অধিকারী হবে।তার মধ্যে উচ্ছৃঙ্খলতার ছায়াও থাকবে না।উমম!এককথায় বলতে পারিস বেশি চঞ্চল মেয়ে আমার পছন্দ নয়।সাদা সিদে ঠান্ডা মেজাজের, কোমল মনের মেয়ে আমার পছন্দ। সর্বোপরি হাই পার্সোনালিটি সম্পন্ন একজন ভালো মনের মানুষ হতে হবে।তার অহংকার হবে তার পার্সোনালিটি।ইগো নয় প্লেস্যান্ট পার্সোনালিটি সম্পন্ন হতে হবে।”

কথাগুলো বলার সময় না চাইতেও আপনা-আপনি জারিফের দুচোখে আবছা আবছা তাসনিমের ফেস ভেসে আসছিলো।

চলবে…
#সুখের_ঠিকানা
#শারমিন_হোসেন
#পর্ব০৫

“ব্রো তুই হলি শান্ত স্বভাবের, ঠান্ডা মেজাজের। আবার তোর বউ।আই মিন ফিউচার ভাবিও যদি তোর মতো শান্ত শিষ্ট হয়।তাহলে কেমন হয়ে যাবেনা।তোদের দুজনের জ্বীন একহয়ে তোদের বাচ্চা তো আরো হিম শীতল হবে।একদম হিমালয় পর্বতের বরফের ন্যায় হবে তার জেনেটিক্স বৈশিষ্ট্য। ওহ্ নো।”

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামে নীল।কথা শেষ করে নীল এমন ভাবভঙ্গি করে,মনে হচ্ছে এমন হলে সাংঘাতিক বড়সড় ভুলটুল হয়ে যাবে।নীল হাঁটুর উপর কনুই ভর দিয়ে একহাত গালে রাখে।খুব সিরিয়াস ভাবভঙ্গি নিয়ে একমনে কিছু ভেবে চলছে।নাশার গবেষণা কেন্দ্রে বসেও কেউ এতটা ভাবুক ভঙ্গিমা করবে কিনা, সন্দেহ। নীলের ফেসে যতটা সিরিয়াসনেস দেখা যাচ্ছে।উফফ!ভাবা যায়।নীল মনেহয় নিজের ক্যারিয়ার গঠন করা নিয়েও এতটা সিরিয়াস নয়।এই মুহূর্তে যতটা সিরিয়াস ভাইয়ের ফিউচার বউ নিয়ে।জারিফ নীলের এসকল কথা কানে না দিয়ে নির্বিকার ভাবে থাকে। দুইহাতে ফোন স্ক্রল করতে থাকে।ওদিকে খানিকটা সময় ধরে ভেবে নিয়ে নীল টানটান হয়ে বসে। চোখেমুখে চিন্তার রেশ ফুটিয়ে তুলে বলে উঠলো,,

“ব্রো এখনও সময় আছে।তাই বলছি পছন্দ টা চেঞ্জ কর। অনেক ভাবাভাবি করে দেখলাম।দুইজনের জ্বীন একই রকম নরম কোমল স্বভাবের হলে। বাচ্চা তো একদম কাঁদা মাটির মতো হবে।আর এখনকার মেয়েরা যে ডেঞ্জারাস। উফ্!বিয়ে করতে চায়।সহজ সরল দেখে।যাতে কান ধরে উঠবস করাতে পারে।তাই নিজের কথা না ভেবে ভবিষ্যৎ বংশধর।আইমিন তোর ফিউচার ছেলের কথা ভেবে হলেও একটু চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে দেখে বিয়ে কর।”

“একজন মানুষের নেচার নরম।তারমানে এই নয়যে,সে বো”কা।তাকে সাত চ”ড় দিলেও রা থাকবে না।এমন নয়।অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রটেস্ট করবে না,বেকবোন থাকবে না।মোটেও এরকম নয়।”

জারিফের কথার মাঝেই জারা আসতে আসতে কন্ঠে চঞ্চলতা নিয়ে বলে উঠল,,”সচারাচর আমি যদিও নীল ভাইয়ার কোনো কথায় সহমত পোষণ করিনা।তবে আজকে নীল ভাইয়ার এইকথার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করলাম।”

কথাটা শেষ করেই জারা জারিফের পাশে ফাঁকা জায়গায় ধপাস করে বসে পড়ে।দুই আঙ্গুল মুখের সাথে ধরে পাঁচ সেকেন্ড কিছু ভেবে নিয়ে ফের কন্ঠে শীতলতা নিয়ে বললো,,”ভাইয়ার বউ হিসেবে একটা চঞ্চলা হরিণী মিষ্টি ভাবী চাই।যে সারাক্ষণ আমাদের এই সুখের ঠিকানাকে তার চঞ্চল স্বভাব দিয়ে হাসি খুশিতে ভরে রাখবে। উফ্!কোথায় পাওয়া যাবে এমন মিষ্টি ভাবী?যার টানাটানা হরিণী কালো মিচমিচে চোখের মনি।পাপড়িগুলো বেশ বড়সড়। ধবধবে সাদা ফর্সা।টুকা দিলে যেনো র”ক্ত চুইয়ে পড়বে।দীঘল কালো মিচমিচে চুল।যার হাসির ঝংকারে সবাই মুগ্ধ হবে।যার সবকিছুই হবে আকর্ষণীয়।”

“অর্ডার দেওয়া লাগবে।”

থমথমে মুখাবয়ব করে স্পষ্টকরে নীলের জবাব।ফের দাঁতে দাঁত চেপে বলে,,”এই জারা এমন বর্ণনা দিছিস।তোর বর্ণনা শুনে তো মনে হচ্ছে এমন মেয়ে অর্ডার দেওয়া লাগবে।তবে সমস্যা হলো,এখন অর্ডার দিলে ডেলিভারী পেতে পেতে তো ব্রো এর বিয়ের বয়স পার হয়ে যাবে।আর নাকি ব্রো রূপবান এর মেইল ভার্সন হয়ে বউকে কোলে পিঠে করে মানুষ করবে।রুপবান যেমন রহিমকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিলো। ব্রো রাজি আছিস?এরকম করতে?”

নীলের কথা শুনে জারা শব্দ করে হেসে ফেলে।জারা হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে।নীল জিগ্গাসু দৃষ্টিতে জারিফের পানে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।নীলের এহেন কথাবার্তায় জারিফ নীলের দিকে কটমট চোখে তাকিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা নিজের রুমে চলে যায়।জারিফ ভালো করেই জানে এই ফা’জি’লের সাথে কথা বলা মানেই নিজের মানসম্মানের দফারফা করা।
.
ডায়নিং টেবিলের উপর দুইহাতের কনুই ঠেকিয়ে গালে হাত দিয়ে বসে আছে লিয়া।মুখটা ভার করে। রাজিয়া সুলতানা টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখছেন।কাজের মেয়েটা হাতে হাতে সাহায্য করছে।লিয়া একটু নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসে। অতঃপর কাঁ’টা চামুচ হাতে নিয়ে সালাতের থেকে একটুকরো শসা তুলে নিয়ে মুখে পুড়ে দেয়।শসার টুকরো চিবাতে চিবাতে ম্লান গলায় বলে,,

“বলছি যে আম্মু।আমার কেনো জানি মনটা ভীষণ খা’রাপ করছে।ভালো লাগছে না।মুড সুয়িং চলছে।মুডটাকে রিফ্রেশ করতে। ইনভায়রনমেন্ট

লিয়াকে থামিয়ে দিয়ে রাজিয়া সুলতানা মেয়ের দিকে শান্ত চাহনিতে চেয়ে ভরাট গলায় বলেন,,
“ইনভায়রনমেন্ট চেন্জ করা দরকার।এতো হেয়ালি না করে সোজাসুজি স্পষ্টভাবে বললেই পারিস। দাদুবাড়িতে যেতে চাচ্ছিস।এতো ইনিয়েবিনিয়ে বলা আমার মোটেও পছন্দ নয়।যা বলবি পরিষ্কার করে,হুম।”

লিয়া দুইহাত টেবিলের উপর ভাঁজ করে রেখে ঠোঁট উল্টে ফের বলে,,”আরে নাহ্।আগে পুরো কথাটা তো শুনবে।দাদুবাড়ি থেকে তো কদিন আগেই আসলাম। অনেকদিন হলো নানুবাসায় যাইনা। নানুভাইকে দেখি না।নানুভাইকে খুব করে দেখতও ইচ্ছে করছে।”

রাজিয়া সুলতানা চেয়ার টেনে বসেন। তাচ্ছিল্যর হাসি দিয়ে শক্ত কন্ঠে বললেন,,”হুম!আসছে। নানুভাইয়ের উপর দরদ উথলে পড়ছে।ভাইবোন দুইটাই তো হয়েছিস বাপের মতো।আমার বাবার বাড়ির নামই শুনতে পারিসনা।এদিকে দাদুবাড়ির চৌদ্দ গুষ্টি বলতেই পা’গল।বছরে একবার বাবার বাড়ি যাই। তোদের ভাইবোনের জন্য দুইরাতের বেশি তিনরাতও কা’টা’তে পারিনা।”

মায়ের ব্লেইম শুনে লিয়ার মনটা আরো খা’রাপ হতে থাকে। ফর্সা মুখে মূহূর্তেই আমাবস্যা নেমে আসে।চোখমুখ আরো ভার হয়ে আসে।ধ্যাত আবার সুইচড অন করে দিয়েছি।এখন কতক্ষণ এটা চলে, আল্লাহ মালুম।মায়ের বরাবরের মতো একই অভিযোগ।এসব ভেবে লিয়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাল ছেড়ে দিয়ে মুখটা বাংলা পাঁচের মতো করে রাখে।রাজিয়া সুলতানা দৃষ্টি সরু করে লিয়ার দিকে চেয়ে শান্ত গলায় বলেন,,”রাহবারের স্কুল আছে।তোরও তো কলেজ প্রাইভেট আছে।তাই এখন যাওয়া চলবে না। পরে পাছে সময় করে যাবো।”

“দুইদিন থাকবো বেশি নয়। প্লিজ আম্মু।”

“উহুম!এখন সম্ভব নয়।এখন আমার নিজেরও জার্নি করতে ইচ্ছে করছে না।”

মায়ের কথার পিঠে লিয়া ফট করে বলে উঠলো,,”আম্মু তোমরা না গেলে।আমি একাই যেতে চাই।আমার ভীষণ ট্রেন ভ্রমণ করতে ইচ্ছে করছে।এবার ট্রেনে যেতে চাই।”

লিয়া এক্সাইটেড হয়ে কথাটা বলে।লিয়ার কথা শুনে রাজিয়া সুলতানা অবাক হন।মেয়ে যেতে চাইছে একা তাও আবার ট্রেনে। বিস্ফোরিত নয়নে মেয়ের দিকে তাকিয়ে কন্ঠে কঠোরতা নিয়ে বলেন,,”তুই নানু বাসায় যাবি। তাও একা ট্রেনে। ইম্পসিবল।তোর আব্বু শুনলে তোকে সহ আমাকে শু’লে চড়াবে।এইসব পা’গ’লামি, ছেলেমানুষী আবদার বাদদে।আর এখন চুপচাপ খাবার খেয়েনে।”

লিয়া গাল ফুলিয়ে রাখে।পাশ থেকে অল্প বয়সী কাজের মেয়েটা বলে উঠলো,,”আপামনি।আপনে একলা যাইতে চান।তাও ট্রেনে। নাহ্ আপামনি ট্রেনে মেনে একলা যাইয়েন না।এমনিতেই আপনারে লইয়া আমার ভীষণ ডর করে।”

লিয়া মৃদু হাসে। কিয়ৎক্ষন পরে আশ্চর্যান্বিত হয়ে মেয়েটাকে শুধায়,,”হোয়াট?ডর মানে ভ’য় লাগে।আমাকে নিয়ে।হাউ ফানি। কিন্তু কেনো?আমাকে ভ’য় লাগার মতো আমি আবার কি করলাম। স্ট্রেইন্জ!”

মেয়েটা ভিতু ফেস করে।বারকয়েক চোখ টিপটিপ করে।শুকনো ঢোক গিলে নিয়ে ঠোঁট আওড়ায়,,”ঐযে আপনে মাঝে মধ্যে বেহুঁশ হইয়া থাকেন।আমিতো খালাআম্মারে বলিযে,আপনার গায়ের উপর আছড় আছে।না হইলে একজন সুস্থ সবল মানুষ একাই দাঁত লাইগা যায়।”

রাজিয়া সুলতানা ঠোঁট টিপে মিটমিট করে হাসে।লিয়া একহাত কপালে দিয়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে ঠোঁট মেলে বলে,,”ওহ্!গড। অতিরিক্ত টেনশন করলে আমি সেন্সলেস হয়ে পড়ি।আর ব্লা’ডে আমার ফিলোবিয়া আছে। অতিরিক্ত ব্লা’ড এসব দেখলে আমার কেমনজানি লাগে।আর আমি সেটা সয্য করতে পারিনা তাই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। বুঝলে?”

মেয়েটা কি বুঝলো আল্লাহ মালুম।কারন ফের ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে উঠলো,,”আপনারা শিক্ষিত মানুষ।লেহাপড়া করেন।আপনেরা তো অতশত বিশ্বাস করেন না।তবে মনেহয় খালাআম্মা আপামনিরে একবার কবিরাজের কাছে নিয়ে যাওন লাগে।একখান তাবিজ দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।আপনে যে চুলটুল ছেড়ে দিয়ে রাতবিরাত বারান্দায় বইসা থাকেন।আর আপনার বারান্দার পাশেই তেঁতুল গাছ। ওনারা তো তেঁতুল গাছেই থাকে।”

কত সুন্দর সম্মান প্রদর্শন করে ওনারা বলে সম্বোধন করছে। উফ্! মনে হচ্ছে জ্ঞানী-গুণী , বিশিষ্টজনদের কথা বলছে।এর কথাশুনে লিয়া চরম বি’র’ক্ত হয়।লিয়া চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় রাগান্বিত স্বরে বলে,,”উফ্!কি এক জ্বা’লা। এমনিতেই মন মেজাজ ভালো নেই।আর এর উল্টাপাল্টা কথা।আর এমনভাবে বলছে,ওনারা।আইমিন ভুত মহাশয়রা ওর খুব পরিচিত। তাদের বাসভবনের এড্রেসও জানে। আশ্চর্য!

রাজিয়া সুলতানা মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে বলে,,”তুমি থামো।আর লিয়া খাবার না খেয়ে উঠে দাঁড়ালি যে।”

“তোমাদের কথা বার্তায় খাবার খাওয়ার ইচ্ছেটাই চলে গিয়েছে।খেতে ইচ্ছে করছে না।”

রাজিয়া সুলতানা লিয়াকে কয়েকবার খাওয়ার কথা বলেন।মায়ের কথায় লিয়া অবশেষে খাবার খেতে বসে।এমন সময় মেয়েটা ফের জিগ্গাসু দৃষ্টিতে লিয়ার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে উঠলো,,”আচ্ছা আপামনি।এইযে আপনে মাইয়া মানুষ হইয়া একলা যাইতে চাইতাছেন। আল্লাহ নাকরুক কোনো বিপদ আপদ হলে কিকরবেন?”

লিয়া খাবার চিবুতে চিবুতে বলে,,”ফ্যারি টেলস দেখেছিস কখনো?নাকি রুপকথার গল্প শুনেছিস কারো থেকে কখনো?”

মেয়েটা দুদিকে ঘাড় নাড়ায়।যার অর্থ না।না টিভিতে দেখেছে আর না কারো থেকে গল্প শুনেছে।লিয়া ফের শীতল চাহনিতে চেয়ে বলতে থাকে,,”রুপকথার গল্পে রাজকন্যা যখন কোনো বিপদে পড়ে তখন রাজপুত এসে থাকে উদ্ধার করে।ঠিক তেমনি আমি কোনো সমস্যায় পড়লে রাজপুত না হলেও আমার জন্য নির্ধারিত থাকা মানবটা আমাকে হেল্প করতে আসবে,হুহ।”

রাজিয়া সুলতানা মেয়ের দিকে মোটা চোখে তাকাতেই লিয়া মুখটা থমথমে করে রাখে। ‌হালকা হাসার চেষ্টা করে বাম হাতে মাথা চুলকিয়ে বলে উঠে,,”এমনি মজা করছিলাম তো।”
.
.
রাতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে লিয়া। বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।এমন সময় দরজার দাড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে রাজিয়া সুলতানা হালকা কেশে শুধালেন,,”লিয়া ঘুমিয়ে পড়েছিস?”

“নাহ্, আম্মু।ভিতরে আসো।”

রাজিয়া সুলতানা লিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।আর লিয়া চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছে।মায়ের দেওয়া খবরে লিয়ার মনটা পুরোপুরি নাহলেও অনেকটা খুশি হয়েছে। লিয়ার বাবা এনামুল খাঁন লিয়াকে নানু বাসায় যাওয়ার পারমিশন দিয়েছে।তবে একা নয় আর ট্রেনেও নয়। ড্রাইভার আঙ্কেল পৌঁছে দিয়ে আসবে।আর দুইদিন বা তিনদিন পর লিয়ার মামা নিজে লিয়াকে পৌঁছে দেবে।এরকম শর্তারোপ করেছেন।ঢাকাতে লিয়ার নানুবাসা।কাল সকাল সকাল জার্নি করে অতদূর যেতে হবে।তাই মায়ের আদেশ এখন ফোন চালানো যাবে না। আর্লি ঘুম থেকে উঠতে হবে।তাই এখন আর্লি ঘুমাতেও হবে।
.
নানুবাসায় বেশি মানুষজন নেই। বৃদ্ধ নানুভাই,একমামা মামী আর ছোটো ছোটো মামাতো ভাইবোন।কালকে দুপুরে নানুবাসায় আসছে লিয়া।অথচ রাত থেকেই আবার মনটা বাসায় ফেরার জন্য ছটফট করছে। পিচ্চি পিচ্চি দুইটা মামাতো ভাইবোন তাদের সাথে কি আর গল্প করে সময় কাটানো যায়।আসার পর থেকে নানুভাইয়ের সাথে হালকা গল্প আর পিচ্চিদের সাথে এটা সেটা খেলেই সময় কাটিয়েছে।ভোরে আজানের ধ্বনি শুনে লিয়ার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছেড়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দুইহাত বুকে গুঁজে দাঁড়ায়। গায়ের উপর পাতলা শাল জড়ানো। হাড়কাঁপানো শীত পড়ছে। ঠান্ডায় লিয়ার পুরো শরীর মৃদু কেঁপে কেঁপে উঠছে। লিয়ার এখন আফসোস হচ্ছে।বাসায় থাকলে, কত্ত মজা হতো।কলেজে গিয়ে ফ্রেন্ডদের সাথে আডডা দিতে পারতো।ধ্যাত ভালো লাগে না। উফ্!কেনো যে একা একা আসতে গেলাম।এখানকার প্রতিটি সেকেন্ড আমার কাছে ঘন্টায় রুপ নিয়েছে।আরো দুইদিন কিকরে এখানে থাকবো।এটা ভাবতেই লিয়ার গলা শুকিয়ে আসছে।লিয়া মনেমনে ফের আওড়ায়,যে করেই হোক।নানুভাইকে রাজি করিয়ে চলে যেতে হবে। এখানে আরো দুইরাত থাকলে দম বন্ধ হয়ে আমি প্রাণ হারাবো।
.
জাহানারা বেগম ফজরের নামাজ আদায় করে জায়নামাজে তসবিহ পড়ছিলেন।এমন সময় দরজার দাড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে জারিফ হালকা কেশে মা বলে ডাকে। জাহানারা বেগম জায়নামাজ টা সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখেন। তাসবিহটাও জায়গামত রাখেন।ছেলের কাছে এগিয়ে গিয়ে আদূরে গলায় বলেন,,”উঠেছিস বাবা।চল হালকা নাস্তা তৈরি করে দেই। খেয়ে তারপর যাবি।”

ভার্সিটি থেকে থিসিসের ডাটা কালেক্ট করতে জারিফকে ঢাকা যেতে হবে আজ।জারিফ মায়ের কথার জবাবে বলে,,”এতো সকালে খাবো না।এতো সকালে খাওয়া যায় তুমিই বলো।তুমি তো আমাকে ভালো করেই জানো।তাই এখন কষ্ট করে তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে নাহ্।আমি পথে কিছু একটা খেয়ে নেবো। চিন্তা করো না।নাতাশা ঘুমিয়ে আছে।ওকে আর তুললাম না।”

অনেক করে বলার পরও জারিফ খেয়ে যেতে রাজি হলো না। অবশেষে মায়ের হাতের এককাপ চা সাথে বিস্কুট খেলো।মায়ের আবদার খালি মুখে এতভোরে কোথাও যেতে নেই। হাতে থাকা রিচওয়াচে সময় দেখে নিয়ে জারিফ মৃদুস্বরে বললো,,”মা গাড়ির সময় হয়ে যাচ্ছে।এবার আসি তাহলে।”

“ঠিক আছে বাবা।”

কথাটা বলেই কিছু মনে হতেই জাহানারা বেগম খানিকটা অবাক হয়। অতঃপর অবাক গলায় শুধায়,,”গাড়ির সময় হয়ে যাচ্ছে মানে।তুই কি বাসে যাবি নাকি?বাড়ির গাড়িই তো আছে।”

নীল রাতে বলেছিলো ও নাকি বন্ধুদের সাথে কোথাও পিকনিকে যাবে।তাই আজকে গাড়িটা ওর লাগবে।জারিফ ছোট ভাইয়ের আবদার রাখতে বলে,ঠিক আছে।এদিকে আজকে নিজের প্রয়োজন ছিলো।সেটা আর নীলকে বলেনি। জাহানারা বেগমের কাছে নীলের বিষয়টা না বলে জারিফ এমনি খোড়া অজুহাত দিয়ে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়। জাহানারা বেগম ফের মায়াময় আদূরমাখা স্বরে বলেন,,”কখন ফিরবি বাবা।ফিরতে কি খুব বেশি দেরি হবে।বেশি রাত করিস না বাবা। এমনিতেই প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ছে।দেখে শুনে যাস কেমন? এক্সট্রা শীতের পোশাক নাহয় সাথে নিয়ে যা।যদি প্রয়োজন হয়।”

“নাহ্।লাগবে না।পড়েছি তো।রওনা দিতে দিতে বিকেল হয়ে যাবে।বাসায় আসতে আসতে সন্ধ্যা পার হয়ে যাবে।টেনশন করো না।”
.
ওদিকে লিয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছে।লিয়ার পক্ষে নানুবাসা এখন জেলখানায় রুপ নিয়েছে। লিয়ার মোটেও ভালো লাগছে না।তাইতো লিয়া বৃদ্ধ নানুভাইকে ইমোশনাল ব্লাকমেইল করে আজকেই চলে আসার জন্য বলে।নানুভাই বেচারা পড়েছে বেকায়দায়।একে তো একলা ছাড়তে পারছে নাহ্।আবার নাতনির কথাও ফেলতে পারছে না।নানুভাই অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে করুন কাঁপাকাপা গলায় বলেন,,”আপা আজকে থেকে গেলে হতো না।তোমার মামা তো অফিসে আছে।আর ব্যাংক থেকে ফিরতে ফিরতে তো রাত আটটা বেজে যাবে।তাই আজকে আর হবেনা কালকে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তোমাকে বাসায় দিয়ে আসবে।তোমার বাবা মার কাছে। ‌আর তোমাকে একলা ছাড়লে। তোমার কিছু হলে,তোমার বাবা আমাকে রক্ষা করবে না।এই বৃদ্ধকে কাঠগড়ায় তুলবে।শেষ বয়সে এসে জেলের ভাত খেতে হবে আমায়।আর এদিকে বয়সের ভারে অতটা পথ জার্নিও করতে পারিনা।তাই বলছি।”

লিয়া তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে,,”নানুভাই আজ দুইদিন আছি।আমার আর মোটেও মা বাবা ভাইকে ছাড়া থাকতে ভালো লাগছে না। আর না এখানে কেউ আছে আমার বয়সী।যে তার সাথে অন্তত গল্প করে সময় কাটাবো। পিচ্চিদের সাথে খেলি।তাও ওরা সারাদিন স্কুলে থাকে।আর নানুভাই তুমি জানো তো আমার যখন একবার যেটা থেকে মন উঠে যায়।হাজার চেষ্টা করেও মন বসাতে পারিনা।আর এখন আমার মন কিচ্ছুতেই এখানে থাকতে যাইছে না।আর বলছি তো কিছু হবে না।তুমি গাড়িতে তুলে দিবে।সোজা গাড়ি ময়মনসিংহ চলে যাবে।তারপর ড্রাইভার আঙ্কেল এসে আমাকে নিয়ে যাবে।তুমি কি আমাকে লোকাল বাসে তুলে দিবে নাকি?যে হারানোর ভয় থাকবে।”

নাতনির একরোখা জিদ আর ইমোশনাল ব্লাকমেইল এর কাছে পরাজিত হয়ে বৃদ্ধ নানুভাই লিয়াকে গাড়িতে তুলে দেয়।অবশ্য ফোনে মেয়ের থেকে সম্মতি নিয়েই।লিয়াকে লাক্সরি হিনো গাড়িতে তুলে দেয়।আগে থেকে সিট বুকিং না দেওয়ায়।সিটটা পিছনে হয়।বিকেল চারটা বাজে ময়মনসিংহ যেতে যেতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যাবে।লিয়াকে সিটে বসিয়ে দিয়ে নানুভাই আড়ালে চোখের পানিটুকু মুছে নেয়।লিয়ার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে। অজস্র দোয়া করতে থাকে।লিয়া নানুভাইকে আলতোকরে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানায়।গাড়ির ড্রাইভার সিটে বসে। গাড়ি স্টার্ট দিবে।সেইসময় নানুভাই গাড়ি থেকে নেমে যায়।

লিয়ার পাশের সিট এখনো ফাঁকা পড়ে আছে।লিয়া কপাল কুঁচকে ভাবছে এখানে আবার কে বসবে আল্লাহ মালুম।ভালো হতো দুইটা সিটই কিনে নিলে।মেয়ে মানুষ ছাড়া যদি ছেলে মানুষ বসে তখন।হায়! আল্লাহ।এটা তো ভাবিনাই।আর নানুভাইয়েরও হয়তো তাড়াহুড়োয় এসব মনে নেই।লিয়া দ্রুত গাড়ির কন্টাক্টটরকে ডেকে বলে,,”এই সিটটা বুকিং না থাকলে।আমি কিনতে চাই।”

জবাব এলো,,”সরি ম্যাডাম। সম্ভব নয়। অলরেডি এটা বিক্রি হয়ে গিয়েছে।”

এটা শুনে লিয়া হতাশ হয়ে জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি দেয়।সাথে একগাদা সংশয় মনে উদয় হতে থাকে। লিয়া মনেমনে নিজেকে সাহস যোগায়।ব্যাপার নাহ।লিয়া যথেষ্ট ব্রেভ এন্ড ক্লেভার গার্ল।যেকোনো সিচুয়েশন মোকাবেলা করতে পারবে,হু।লিয়া নিজেকে আরো আত্মবিশ্বাসী করে তোলার চেষ্টা করে।লিয়ার দৃষ্টি জানালা দিয়ে বাইরে।এমন সময়..

[চলবে…ইন শা আল্লাহ]