হৃদয়ে লাগিল দোলা পর্ব-০৮

0
76

#হৃদয়ে_লাগিল_দোলা 🫶
#নুসাইবা_জান্নাত_আরহা
#পর্ব৮

নিকষ কালো রাত্রি। আঁধারে ছেয়ে আছে চারপাশ। আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে তারাদের মিটিমিটি হাসি! প্রান্তর ছুঁয়ে ধেঁয়ে আসা শীতল হাওয়ায় হৃদয়ের কোণে আচমকাই দোলা দিয়ে যায়। কেড়ে নেয় শরীরের শেষ উষ্ণতাটুকুও। রাতের প্রকৃতির এমন রূপরহস্য কেড়ে নেয় প্রকৃতি প্রেমীদের মন!

ধীর পায়ে ছাঁদের পথে পা বাড়ালাম। বুকের মাঝে অজানা ভয়ে শিহরণ জাগে! না জানি আদ্রিশ ভাইয়া আবার কি বলে বসে আমায়! দুরুদুরু বুকে কিছুটা সাহস সঞ্চার করে এগিয়ে যাই সে পথে।

আদ্রিশ ভাইয়া ছাদের রেলিং এ হাত রেখে প্রকৃতি বিলাশ ব্যস্ত। বাতাসে ভেসে আসে তার গুনগুনিয়ে গানের আওয়াজ!

-‘ “|রাতের সব তারা আছে,
দিনের গভীরে।
বুকের মাঝে মন যেখানে,
রাখবো তোকে সেখানে।
তুই কি আমার হবি রে…
মন বাড়িয়ে, আছি দাঁড়িয়ে
তোর হৃদয়ে, গেছি হারিয়ে
তুই জীবন-মরন সবই রে..
তুই কি আমার হবি রে…|”

আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আদ্রিশ ভাইয়ার গানের গলা সত্যিই অসাধারণ! আমি যতবারই শুনেছি বিমোহিত হয়েছি শুধু। খানিকসময় অতিবাহিত হওয়ার পর, পেছন থেকে আমি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললাম

-‘ আদ্রিশ ভাইয়া আমায় ডেকেছিলে?

আমার ডাকে সে পেছন ফিরে তাকায়। চারপাশে বইতে থাকা মাতাল করা হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে সে আমার পানে এক মাতাল করা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছে। তার এমন মাতাল করা চাহনিতে তো আমি ভস্ম হয়ে যাব প্রায়! তাই আর বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে না পেরে, চোখ নামিয়ে নিলাম। আদ্রিশ ভাইয়া এক পা এক পা করে এগিয়ে এলেন আমার পানে। তা দেখে আমি আমার পড়নের কামিজটা খামচে ধরলাম। মনের কোণে সন্দেহ উঁকি দেয়, ‘আদ্রিশ ভাইয়া আবার খারাপ কিছু করে বসবে না তো?’

আদ্রিশ ভাইয়া কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। আচমকা জিজ্ঞেস করে উঠল

-‘ মেহু, তোর বয়স কতো?

আমি চমকে তাকালাম তার পানে। হঠাৎ তার এহেন প্রশ্নের কি মানে তা বোধগম্য হয় না আমার। আমার বোকা বোকা চাহনি দেখে সে ফিক করে হেসে বলল

-‘ আমি তোকে এমন কিছু জিজ্ঞেস করিনি যে এমন করে তব্দা খেয়ে যাবি? আমি তোর বয়স জানতে চাইছি, আর কিছু নয়।

আমি কিছুটা ইতস্ততভাবে জবাব দিলাম

-‘ সামনের মাসে সতেরোতে পড়বে।

সে এবার খানিক্ষন চুপ থেকে বলল

-‘ ওহ তাহলে তো এখনো পিচ্চিই আছিস। এজন্যই আচার আচরণও ঐ বাচ্চাদের মতোই।

কথাটা বলেই সে বিস্তর হাসল। আমি কপট রাগ দেখিয়ে বললাম

-‘ আমি মোটেও পিচ্চি নই, যথেষ্ট বড় হয়েছি আমি।

আদ্রিশ ভাইয়া এবার মিনমিনিয়ে বলল

-‘ তবে স্বীকার করছিস, তুই সত্যিই বড় হয়ে গেছিস?

আমি মাথা নাড়িয়ে সায় জানালাম। তা দেখে আদ্রিশ ভাইয়া আলতো হাসল। তারপর কিছুটা গম্ভীর স্বরে বলল

-‘ তুই যেহেতু বড় হয়েছিস সেহেতু সর্বপ্রথম তোর এই বাচ্চামো স্বভাবটাকে বাদ দিতে হবে মেহু। নিজের মধ্যে ভারবুদ্ধি আন, নিজেকে নিজের মতো করে গড়ে তোল। তোকে এসে কিন্তু কেউ গড়ে দিয়ে যাবেনা। তাই নিজেরটা নিজে গুছিয়ে নে।

আমি ধরার গলায় বললাম

-‘ তুমি তো আছোই ভাইয়া। তুমি থাকতে আমার কোনো চিন্তা নেই।

আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে শক্ত কন্ঠে বলল

-‘ আমি সারাজীবন তোর পাশে থাকবো না মেহু। পরের উপর নির্ভর না করে, নিজের জীবনকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নে।

আমি ছলছল নয়নে তার পানে চেয়ে বললাম

-‘ তুমিই তো আমার সবচেয়ে ভরসার স্থান ছিলে ভাইয়া। সারাজীবন আমায় আগলে রেখে তবে মাঝপথে আমার হাতটা ছেড়ে দিতে চাইছো কেন?

আদ্রিশ ভাইয়া মুখে কিছুটা কাঠিন্য ভাব ফুটিয়ে বলল

-‘ মেহু, এতোটা আবেগে গা ভাসিয়ে দিস না। দিনশেষে তোরই ক্ষতি হবে। কোনোকিছুই তোর কাছে চিরকাল থাকবেনা। নশ্বর এই পৃথিবীর সবকিছুই নশ্বর। তাই স্বনির্ভর হতে শেখ।

আমি নির্বিকার চিত্তে দাঁড়িয়ে রইলাম। আদ্রিশ ভাইয়ার মতো এতো নিষ্ঠুর মানব আমি আর কোথাও দেখিনি! তিনি প্রতিনিয়ত আমার বুকে ছুরিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে তুলছে! সবটা জানার পরও কেন এতো ভঙ্গিতা করছে সে? এতো অবহেলা আমি আর সত্যিই সইতে পারছিনা।

আদ্রিশ ভাইয়া ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল

-‘ শোন মেহু, তুই যতই মুখে ফটর ফটর করিস না কেন, তুই এখনো ছোটই। তুই তোর আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিসনা। এই আবেগ জিনিসটাই বড্ড ভয়ানক। এইযে সেদিন তুই আমার সামনে ভালোবাসার দাবি নিয়ে দাঁড়ালি, এটাও কিন্তু আবেগ!

আমি ভাঙা কন্ঠে বললাম

-‘ এটা আবেগ নয় ভাইয়া। তুমি সবটা জেনেও এমন করছো কেন? তুমি আমায় এভাবে কষ্ট না দিয়েও পারতে, ভাইয়া।

আদ্রিশ ভাইয়া এবার চোখ বন্ধ করে বলল

-‘ আমি তোকে কষ্ট দিচ্ছি না মেহু। আমি তোকে বাস্তবতাটা বোঝাচ্ছি। এই বয়সটাতে প্রেম ভালোবাসা আসবে যাবে। যাকে দেখবি তোর তাকেই ভালো লাগবে…

আদ্রিশ ভাইয়াকে মাঝপথে থামিয়ে বললাম

-‘ আমার ক্ষেত্রে তো এমনটা ঘটেনি।

আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে একপলক তাকিয়ে বলল

-‘ সবাই সমান নয়। শোন আমি বলি, এই সব ছেড়ে পড়াশোনায় মন দে। তোর এখনো সুন্দর একটা ভবিষ্যত পড়ে রয়েছে। আমি চাইনা আমার কারণে কারও ভবিষ্যত নষ্ট হোক।

আমার নেত্র হতে কয়েক ফোঁটা উষ্ণ অশ্রু গরিয়ে পড়ে শুষ্ক কপোল বেয়ে। আমি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে তা মুছে নিলাম।

তা দেখে আদ্রিশ ভাইয়া মলিন হেসে বলল

-‘ তুই জানিস তোর পড়াশোনা নিয়ে আমি কতোটা কনসিয়াস! তোকে নিয়ে আমার কত স্বপ্ন জানিস তুই! তুই যে আমার কাছে ঠিক কি, সেটা তুই কখনো জানতেও পারবিনা। তোর যতটুকু জানার তুই ততটুকুই জানবি। কারণ আমি তোর মতো এতো আবেগি নই যে নিজের আবেগটা চট করে প্রকাশ করে ফেলব। কিন্তু তুই দেখ অল্পতেই কেঁদে ফেলিস নয়তো একটুতেই রেগে যাস। সবচেয়ে বড় কথা তুই তোর আবেগ অনুভূতি প্রকাশ করে ফেলিস, এমনটা করলে তো চলবেনা। তোকে স্ট্রং হতে হবে। এতো দূর্বল হলে এই নিষ্ঠুর দুনিয়াতে চলতে পারবিনা। প্রতি পদে পদে হেনস্তার স্বীকার হতে হবে। এভাবে হেলাফেলা করে নিজের সুন্দর জীবনটাকে ধ্বংস করিস না মেহু। শুধুমাত্র তোর পড়াশোনার জন্য আমি সব করতে পারি।

-‘ আপনি আমায় নিয়ে এতো ভাবেন কেন? এসব কি শুধুই দায়িত্ববোধের থেকেই করেন?

আমার দিকে তাকিয়ে সে নির্বিকার দাঁড়িয়ে রইল। আমিও তার উত্তরের অপেক্ষায় উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম।

হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে আসা এক দমকা হাওয়ায় আমার গায়ে থাকা শিফনের ওড়নাটা মেঝেতে পড়ে যায়।

মেহরুনের ওড়না সরে যাওয়ায় অর্ধ উন্মুক্ত ধবধবে সাদা বুক নজরে আসতেই দ্রুত চোখ সরিয়ে ফেলে আদ্রিশ। গম্ভীর কণ্ঠে সে বলল

-‘ একটা ওড়নাও ঠিক মতো সামলাতে পারিস না, ম্যানারলেস কোথাকার!

আকস্মিক এমন ঘটনায় আমি হতভম্ব হয়ে যাই। মেঝে থেকে ওড়নাটা তুলে দ্রুত গায়ে জড়িয়ে নিলাম। অসাবধানতাবশত কেমন একটা ঘটনা ঘটে গেল! আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে নজর পড়তেই আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম। ইশ আদ্রিশ ভাইয়া না জানি কি মনে করে বসল!

আদ্রিশ ভাইয়া ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলে গম্ভীর কন্ঠে বলল

-‘ কাল থেকে এসব ছাইপাঁশ ওড়না পরবিনা, সুঁতির ওড়না ভালো করে গায়ে জড়িয়ে থাকবি। তবে ভয় নেই, আমি তোকে নিয়ে কোনো বিরুপ চিন্তা করিনি। আমি তোকে যতটা না স্নেহ করি তার থেকেও বেশি সম্মান করি। তোর সম্মানে আঘাত লাগুক এমন কোনোকিছুই আমি করব না।

আমি মাথা নাড়ালাম। তা দেখে তিনি থমথমে গলায় বলল

-‘ আমি হয়তো তোর কাছে পৃথিবীর সবচাইতে নিকৃষ্ট মানব। তবে আমায় তুই যা-ই ভাবিস না কেন, তোর ভালোর জন্য আমি সবকিছু করতে রাজি। আমি চাই তুই আমার চাইতেও বেশি ভালো থাক। তোর জন্য আমি আমার থেকেও বেটার কাউকে এনে দিবো, চিন্তা করিস না। একদম লাল টুকটুকে বর আনবো তোর জন্যে, কেমন?

আদ্রিশ ভাইয়ার থেকে এমন কথা শুনে আমি নিজের চোখের পানি আটকাতে পারলাম না। মনে মনে আওড়ালাম, “তোমাকে ছাড়া আমি যে আর কাওকে চাইনা আদ্রিশ ভাইয়া। আফসোস তুমি আমায় বুঝলেনা?”

মেহরুনকে ছুটে চলে যেতে দেখে আদ্রিশ মলিন হাসল। সে সত্যিই নিষ্ঠুর!

#চলবে ~