হৃদয়ে লাগিল দোলা পর্ব-০৯

0
67

#হৃদয়ে_লাগিল_দোলা 🫶
#নুসাইবা_জান্নাত_আরহা
#পর্ব৯

আমার চোখের পাতায় এক ফোঁটা ঘুমও অবশিষ্ট রইল না আর। বেলকনিতে বসে গহিন অন্তরীক্ষের পানে চেয়ে বসেছিলাম খানিক সময়। আদ্রিশ ভাইয়ার বলা কথাগুলো নিয়ে ভেবেছি অনেক। প্রথমে তার বলা কথাগুলো শুনতে খারাপ লাগলেও এখন খারাপ লাগছেনা। সে কিন্তু অযৌক্তিক কোনো কথা বলেনি। আমার ভালোর জন্যই বলেছে। আমি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছি অবশেষে। ভেবেছি অনেক, নিজেকে গড়তে হলে নিজেরই সঠিকভাবে এফোর্ট দিতে হবে। আমার নিজেকে পরিবর্তন করা উচিত। আমার আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া চলবেনা। নিজেকে শক্ত থাকতে হবে। কিন্তু আদ্রিশ ভাইয়াকে দেখলেই আমার সবটা এলোমেলো হয়ে যায় কেমন। আমি বেসামাল হয়ে পড়ি। তবে এবার নিজেকে ধাতস্থ করতে হবে আমার। আদ্রিশ ভাইয়ার ঠুনকো সাহায্যের কোনো প্রয়োজন নেই আমার। সে যখন মাঝপথে আমার হাত ছেড়ে দিয়েছে তখন আমিও বাকি পথ কোনো ভাবে নিজেকে সামলে চলব নাহয়। মনে মনে নিজেকে সাহস যোগালাম। ‘খান’ বংশের একমাত্র মেয়ে আমি, আমাকে শক্ত হতে। এই মেহরুন ইবনাত খানের ভেঙে পড়লে চলবেনা।

বেলকনি থেকে ধীর পায়ে নিজের ঘরে চলে এলাম। চুপটি করে গুটিসুটি মেরে অরনীর পাশে শুয়ে পড়লাম কিন্তু ঘুম আর এলোনা। পাশ ফিরে দেখলাম অরনী আর রিশতা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ওদের দেখে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললাম। নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলাম। যেকোনো পরিস্থিতিতে সর্বপ্রথম নিজেকে শান্ত রাখা জরুরি। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছি মনে নেই ঠিক।

দেখতে দেখতে কেটে গেছে বেশ কয়েকটা দিন। নিজেকে এখন বেশ অনেকটা ধাতস্থ করতে সক্ষম হয়েছি। এ কয়দিনে আদ্রিশ ভাইয়ার সাথে চোখাচোখি হলেও খুব সুক্ষ্মভাবে এড়িয়ে চলেছি তাকে। এতো দূরন্ত , আবেগি আর এমন বেয়ারা একটা মেয়ে থেকে আচমকা এভাবে শান্ত হয়ে যাব, এটা হয়তো কেউ ভাবেনি। আমার আচরণিক পরিবর্তনে আদ্রিশ ভাইয়া ব্যতিত সবাই-ই কমবেশি অবাক হয়েছে ভীষণ। আমি এখন আমার মা, মামনিকেও অপটু হস্তে রান্নাবান্নায় সাহায্য করি। যদিও মামনি কোনো কাজ করতে দেননা তবুও আমি করি আমার সাধ্যমতোন যতটুকু পারি।

মা তো আমায় এতো ভালো হয়ে যেতে দেখে কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেসই করে বসলেন

-‘ কি রে, এতো ভালো হয়ে গেলি যে? তোর মতলব তো আমার কাছে ঠিক সুবিধার ঠেকছেনা। দুদিন পর রেজাল্ট দেবে এইজন্যই কি এতো ভালো হয়ে গিয়েছিস, যাতে মায়ের বকুনি না খেতে হয়!

আমি অবাক হয়ে নির্বিকার চিত্তে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার মতো মেয়েটা এমন লেজবিহীন ভদ্র শান্তশিষ্ট
হয়ে গেছে, আর আমার মা এসব বলছেন? ভালো হয়েও শান্তি নেই দেখছি।

আমায় নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পাশ থেকে মামনি আলতো হেসে বললেন

-‘ আরে তুমিও না ছোট বউ। কোথায় একটু প্রশংসা করবে মেয়েটার তা না। আমার কি মনে হয় জানো, আমাদের মেহুর বিয়ের ফুল ফুটেছে তাই এমন দিনদিন সুন্দরী হয়ে যাচ্ছে আর এমন ঘরকন্যা হয়ে যাচ্ছে। কি তাই না মেহু?

আমি খানিকটা লজ্জা পেলাম। তবে জানার আগ্রহ জন্মালো, সবাই যে এতো বিয়ের ফুল বিয়ের ফুল করে, এই বিয়ের ফুলটা কোন গাছে ফোটে? যদিও আমি তা জিজ্ঞেস করিনি, নিজের মাঝেই ধামাচাপা দিলাম।

মামনি আমার কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বললেন

-‘ শোন মেহু, চিন্তা নেই। আমি আর পাঁচটা শাশুড়ির মতো হবো না। তুই যেমন এ বাড়ির মেয়ে ছিলি, আমার ছেলের বউ হওয়ার পরও ঠিক তেমনই থাকবি। আমাদের সবার অতি আদরের মেহু। বংশের একমাত্র মেয়ে বলে কথা! তাকে দিয়ে কি কোনো কাজ করানো যায়?

আমার মুখে কিছুটা মেঘে ছেয়ে গেল। এদিকে মামনি চাচ্ছে আমাকে তার ছেলের বউ বানাতে, আর ঐদিকে ওনার ছেলে চায় আমার জন্যে লাল টুকটুকে বর আনতে। যদিও সেদিন তার কথার ভাঁজে ছিল রসিকতা কিন্তু আমার ব্যাপারটাকে সিরিয়াস হিসেবে নিয়ে ফেলেছি। বিয়ের সময় যদি গোলাপি শেরওয়ানি আর গালভর্তি ব্লাস না মারে, তাহলে আদ্রিশ ব্যাটার খবর আছে!

মামনি এবার কিছুটা তাড়া দিয়ে আমার উদ্দেশ্যে বললেন

-‘ মা যা তো, আদ্রিশকে গিয়ে কফিটা দিয়ে আয়।

আমি দ্বিমত পোষণ করে বললাম

-‘ আমি পারবো না মামনি। রিশু বা অরুকে বলো দিয়ে আসতে।

মামনি এবার চোখ গরম করে তাকালেন। কপট রাগ দেখিয়ে বললেন

-‘ এই মেয়ে তুই এখনই আমার মুখে মুখে তর্ক করছিস! একটা মাইর দিবো কিন্তু।

তার এমন বাচনভঙ্গি দেখে আমি ফিক করে হেসে ফেললাম। মামনি হালকা রাগ নিয়ে বললেন

-‘ আমি সত্যিই রেগে গিয়েছি কিন্তু মেহু! যেটা বলছি সেটা কর গিয়ে।

অগত্যা আমিও আর কথা না বাড়িয়ে গোমরো মুখো ঠেড়ষটার ঘরের পথে পা বাড়ালাম। ভেজানো দরজাটা ঠেলে ঘরে উঁকি দিলাম, না আদ্রিশ ভাইয়ার দেখা মিলল না কোথাও। তা দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

আমার আসার কোনো প্রকার ইচ্ছে না থাকলেও মামনির জোরাজোরিতে একপ্রকার বাধ্য হয়েই আসতে হয়েছে। টেবিলের উপর কফির কাপটা রেখে চলে আসছিলাম, এমন সময় একটা ডায়েরির দিকে নজর পড়তেই আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। আশেপাশে তাকিয়ে ভালোভাবে দেখে নিলাম, না আদ্রিশ ভাইয়া নেই কোথাও। ওয়াশরুম থেকে ঝর্ণার পানির আওয়াজ ভেসে আসছে সেইসাথে তার সুরেলা কন্ঠস্বর! আমার আর বুঝতে বেগ পেতে হয়না যে আদ্রিশ ভাইয়া শাওয়ার নিচ্ছে এ মুহুর্তে। আমার কৌতূহলী মনও বারবার বলছে ডায়রীটা দেখার জন্য। আমিও আর কাল অতিবিলম্ব না করে দ্রুত ডায়রীটা হাতে তুলে নিলাম।

ডায়রীর প্রথম পাতায় বেশ বড় বড় হরফে লেখা রয়েছে, “ডক্টর আদ্রিশ খান”। ডাক্তার হলেও তার হাতের লেখা যথেষ্ট সুন্দর! কোন এক প্রতিবেদনে দেখেছিলাম যেন, ডাক্তারদের বিভৎস হাতের লেখা দেখে নাকি প্রতি বছর প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ হার্ট অ্যাটাকে মারার যায়! যদিও কতোটুকু সত্য আমি তা জানিনা। তবে যাইহোক তার হাতের লেখা দেখে আর রোগীরা হার্ট অ্যাটাক করবেনা অন্তত।

পাতাগুলোতে নিজের সম্পর্কে বেশি বেশি ইনিয়ে বানিয়ে লিখে রেখেছে দেখছি আদ্রিশ ভাইয়া। সেসব পড়ে ঠোঁট বাকিয়ে বললাম, ” ইশ! ঢং দেখে আর বাঁচি না যেন। এমনভাবে লিখে রেখেছে যেন মনে হচ্ছে সে কোনো নবাবের ব্যাটা হবে হয়তো!”

এরপরের পৃষ্ঠাগুলো ফাঁকা পড়ে রয়েছে দেখে রেখে দিতে চাইলাম। পরে আরেক পাতা উল্টাতেই দেখলাম সেখানে লেখা রয়েছে, “আল্লাহ আমাকে বেশি বেশি করে ধৈর্য দাও আমি যেন ভালো করে পড়াশোনা করে আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারি। আর তাঁকেও যেন সর্বদা আগলে রাখতে পারি। ইশ বেচারী আমার বউটা কি মায়াবী, মাশাআল্লাহ দেখতে! তাঁকে তো আমার আগলে রাখতেই হবে। আমার ‘জানপাখি’ বলে কথা!”

প্রথম অংশটা পড়ে হালকা হাসলেও শেষোক্ত অংশটা পড়ে ভ্রু কুচকে ফেললাম। ‘বউ’ লেখাটা পড়ে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। আদ্রিশ ভাইয়ার আবার বউ এলো কোথ থেকে? দেখতে তো নিরামিষ ঢেষরের মতো, তবে এমন মনের মাধুরী মিশিয়ে কোন বউয়ের কথা এভাবে লিখে রেখেছে আদ্রিশ ভাইয়া

পরের পাতায় সুন্দর করে লিখে রেখেছে, “গভীর নিশীথে, তারা ভরা আকাশের দিকে চাহিয়া দেখিলে, কোন এক মৃদু কন্ঠস্বর কর্ণে বাজিয়া উঠিলে, হৃদয়ে লাগিল দোলা। কিঞ্চিৎ স্মরণে, মোর মনে প্রেম জাগিয়া উঠে। যে প্রেম বহুকাল ধরে অযত্নে পরে রহিয়াছে। পুনরায় শক্তি সঞ্চারিত করিয়া তাহারে সন্ধান করিতেছে, সে যেন হাহাকার মরুদ্দানে বৃষ্টি আশা করার মত এক অলীক কল্পনা। তবু চাঁদের শীতলতায় বিরহে জ্বলিত লাভা শান্ত হয়ে রই।”

ও বাবা লোকটা ডাক্তার থেকে, কবি সাহিত্যিক হলো কবে? আদ্রিশ ভাইয়ার ছোট বাচ্চাদের ধমকানো ছাড়া আর কোনো গুণ আছে বলে আমার মনে হয়না। এ নিশ্চয়ই কোনো কবিতা, উপন্যাসের অংশ হবে হয়তোবা। তবে আমার জানা নেই। বই পড়াতে আমি বড্ড উদাসীন! নিজের পাঠ্যবই-ই পড়িনা, আবার সেখানে গল্প উপন্যাস পড়া তো বিলাসিতা!

এতোটুকু পড়ে যে-ই পরের পাতা উল্টাতে যাব এমন সময় পেছন থেকে ভেসে এলো এক গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠস্বর। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে যেন বয়ে গেল কোনো শীতল স্রোত! আমি কোনো রকমে ডায়রিটা লুকিয়ে ফেললাম।

পেছনে ফিরতেই আদ্রিশ ভাইয়াকে এমন অর্ধ উন্মুক্ত অবস্থায় দেখে আমার তো চক্ষুদ্বয় চড়কগাছ! ধূসর বর্ণের একটা টাওয়াল জরিয়ে রেখেছে কোমড় থেকে হাঁটু অবধি। উন্মুক্ত হলদে বুকের উপর জলের বিন্দু বিন্দু জমে থাকা কণা, বুকের লোমের মাঝে লেপ্টে আছে। কপালের কাছে লেপ্টে থাকা চুলগুলো থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। তার এমন দৃশ্য নজরে পড়তেই আমি লজ্জায় নিজের চোখ নামিয়ে ফেললাম। ইশ, আদ্রিশ ভাইয়াকে আমি জীবনেও এমন উন্মুক্ত গায়ে কখনো দেখিনি।

আদ্রিশ ভাইয়া গম্ভীর স্বরে বলে উঠল

-‘ আমার অনুমতি ব্যতিত, আমার ঘরে কেন এসেছিস তুই?

আমি কাঁপা কন্ঠে বললাম

-‘ মামনি কফি দিতে বলেছিল, তাই এসেছি।

-‘ তো কফি রেখে চলে যাসনি কেন?

আমি ছোট করে ‘সরি’ বলে চলে যেতে নিলাম। এমন সময় খপ করে আমার হাতটা ধরে আটকে দেয় আদ্রিশ ভাইয়া। আমার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে থাকে সে। আমি ভয়ে আঁতকে উঠলাম। আদ্রিশ ভাইয়া হতে এমন আচরণ আমি কখনো আশা করিনি। সে তো এমন নয়, তবে আজ হঠাৎ কি হলো তার? বাঁকা হেসে আমার দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে আসতে আচমকা আমার একদম কাছে চলে আসে সে। চুলের পানি ঝেড়ে আমার চোখেমুখে ছিটিয়ে দেয়। আমি চোখমুখ কুচকে ফেললাম। তার এহেন কর্মকাণ্ডে আমি ভরকে গেলাম। নিজেকে ধাতস্থ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলাম।

#চলবে~