হৃদয়ে লাগিল দোলা পর্ব-১৪+১৫

0
73

#হৃদয়ে_লাগিল_দোলা 🫶
#নুসাইবা_জান্নাত_আরহা
#পর্ব১৪_১৫(ধামাকা🎉)
#বোনাস_পর্ব

নিত্যদিনকার মতো আজও কফির পাত্র হাতে এসেছি আদ্রিশ ভাইয়ার কক্ষে। তার কক্ষের সামনে আসতেই কপালে যৎ কিঞ্চিৎ ভাঁজ পড়ে গেল আমার। পুরো কক্ষের মাঝে থাকা জিনিসপত্র বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে মেঝেতে। দেখলে মনে হবেনা এটা কোনো মানুষের ঘর, মনে হচ্ছে যেন কোন গোয়ালঘরের সামনে এসে হাজির হয়েছি আমি। কক্ষের মধ্যে কফি হাতে প্রবেশ করতে করতে বলে উঠলাম

-‘ কি ব্যাপার তোমার রুমের এই হাল কেন ভাইয়া?

আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে না ফিরে কিছুটা অন্যমনস্ক হয়েই বলল

-‘ সেই কখন থেকে একটা জিনিস খুঁজেই চলেছি কিন্তু কিছুতেই পাচ্ছি না। কোথায় যে গেল?

আমার আর বুঝতে বেগ পেতে হলো না আদ্রিশ ভাইয়া আসলে ঠিক কি এতো খুঁজচ্ছে! অধরের কোণে বাঁকা হাসির রেখা ঝুলিয়ে, টেবিলের উপর কফির কাপটা রেখে, আমি বেরিয়ে এলাম। কিছুক্ষণ পর আবারও আদ্রিশ ভাইয়ার কক্ষে গিয়ে তাকে পেছন থেকে ডাক দিলাম। সে পেছনে ফিরে আমার দিকে ভ্রু কুটি করে তাকাল।

আমি একগাল হেসে তার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আমার হাতে থাকা ডায়রিটা দেখিয়ে বললাম

-‘ ভাইয়া এইটা খুঁজচ্ছিলে বুঝি এতোক্ষণ যাবত?

আদ্রিশ ভাইয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আমার পানে। হয়তো অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়ে, নিজের বাকশক্তিটাও হারিয়ে ফেলেছে ইতোমধ্যে। পিনপতন নীরবতার পর সে থমথমে গলায় বলে উঠল

-‘ তুই এটা কিভাবে পেয়েছিস? আমি তো…

আদ্রিশ ভাইয়ার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে, আমি ঠাট্টার ছলে বললাম

-‘ তুমি এটা কাবার্ডে জামাকাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছিলে, কিন্তু এখন পাচ্ছো না তাই তো?

আদ্রিশ ভাইয়া দুম করে আমার হাত থেকে ডায়রিটা কেড়ে নিয়ে কিছুটা গম্ভীর স্বরে বলল

-‘ তুই কিন্তু বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছিস মেহু। আমার ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দেওয়ার সাহস কি করে হয় তোর?

অন্যসময় হলে তার থেকে এমন তিরস্কারের বাণী শুনলে হয়তো মনটা ভার হয়ে যেত কিন্তু আজ আমার ভীষণ হাসি পাচ্ছে। আচ্ছা উনি এতোদিন ধরে এতো এতো অনুভুতি লুকিয়ে রেখেছিল কিভাবে? অনুভূতিগুলো চেপে রাখতে গিয়ে ব্যাটা ভাগ্যিস বেলুনের মতো ফুলে উড়ে যায়নি! যদিও উনি আগের চাইতে কেমন যেন ফুলে ফুলে যাচ্ছেন দিনকে দিন। হয়তো মনের কোণে থাকা সুপ্ত অনুভূতিগুলো জমিয়ে রাখতে গিয়েই আজ তার এই দশা!

আদ্রিশ ভাইয়া ডায়রিটা নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে নিয়ে ভ্রু কুচকে আমায় বলল

-‘ এই ডায়রিটা তো পুরো ফাঁকা পড়ে আছে। কিন্তু আমার আসল ডায়রি কই?

আমি বিগলিত হাসলাম। হাসি থামিয়ে বিদ্রুপের সহিত বললাম

-‘ তা আমি কি জানি? তোমার বুকসেলফ ঘেটে এটা পেয়ে, এটা নিয়েছিলাম। কিছু লেখা নেই দেখে তোমায় আবার ফেরত দিতে চলে এলাম। আমি আবার না বলে কারও জিনিস নেই না।

-‘ কিন্তু না বলে ঠিকই অন্যের ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দিতে পারিস।

আমি আবারও হাসলাম। আদ্রিশ এবার কিছুটা চিন্তিত সুরে বলে উঠল

-‘ আমার ডায়রিটা গেল কোথায় তবে?

আমি সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললাম

-‘ সব জায়গায় খুঁজেছ ভাইয়া? কোথাও বাদ পড়েনি তো?

আদ্রিশ ভাইয়া মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। আমি ভ্রু কুচকে বললাম

-‘ সব জায়গায় খুঁজলে তো পাওয়ার কথা!

আমার কথা শুনে চকিত তাকায় আদ্রিশ ভাইয়া। অবাক হয়ে বলে

-‘ তুই কোথাও সরিয়ে রাখিস নি তো?

আমি ঠোঁট চেপে হেসে জবাব দিলাম

-‘ প্রায় সবখানেই তো খুঁজলে, তো একবার নিজের বালিশের তলায় খুঁজে দেখো, পাও কিনা?

আদ্রিশ ভাইয়া দ্রুত বিছানার কাছে বালিশ উল্টে পাল্টে দেখল। অবশেষে নিজের কাঙ্ক্ষিত ডায়রিটা হাতে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

খানিক সময় বাদে আমার দিকে ফিরে কিছুটা বিষ্ময় নিয়ে সে বলল

-‘ তুই কিভাবে জানলি যে এটা এখানেই আছে? তার মানে তুই-ই সরিয়েছিস?

আমি বাঁকা হাসলাম। ইশ আজকে না আদ্রিশ ভাইয়াকে একদম ধরা পড়া চোরের মতো লাগছে! কিন্তু একটা জিনিসে খটকা লাগল আমার। তার বালিশের তলায় যে ডায়রি রয়েছে এটা তো সে ঘুমাতে গেলেই বুঝে যাওয়ার কথা ছিল! তবে কি সে গতরাতে ঘুমায়নি?

তার প্রশ্নের আর কোন জবাব না দিয়ে আমি নিঃশব্দে বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে। সবসময় ভোলাভালা ভাব ধরে রাখতাম বলে আমাকে বোকা-ই মনে করত সবাই। একবার আমরা সব কাজিনরা মিলে গোল হয়ে বসে গল্প করছিলাম, এমন সময় হাসতে হাসতে আদ্রিশ ভাইয়া বলেই ফেলেছিল, ❝মেহুপাখি তোকে না আমার উজবুক বানাতে হেব্বি লাগে। তোর ঐ বোকা বোকা চাহনিতে তোকে একদম পিচ্চি পিচ্চি দেখায়। ইচ্ছে করে গাল দুটো একটু টেনে দিতে।❞ ব্যাস এতোটুকু বলে সেদিন সে থেমে যায়। আর কোনো কথা না বলে চলে গিয়েছিল সে। হয়তো মুখ ফোসকে বেরিয়ে গিয়েছিল কথাটা। আমিও তার এহেন বাক্যে সেদিন বেশ অবাকই হয়েছিলাম। তারপর থেকেই রিশতা এটা নিয়ে খেপায় আমাকে। তবে আজ নিজেই যে এমন উজবুক বোনে যাবে তা কে জানত! নিজেকে খুব চালাক মনে করে কিন্তু আমিও কোনো অংশে কম নই যে। কারণ ঐ যে আমরা দুজনেই তো ‘খান’ ‘খান’!

আদ্রিশ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে মেহরুনের যাওয়ার পানে। “এই মেয়েটা কি তবে সব বুঝে ফেলেছে? কি সাংঘাতিক মেয়ে রে বাবা! যতটা বোকা ভেবেছিল ততটা দেখি না। ঠিকই খুঁজে খুঁজে বের করেই ছেড়েছে। মেহরুনের ভবিষ্যত জামাই থুড়ি নিজের কথা ভেবেই তার কেমন বুকটা ঢ্যাপঢ্যাপ, ট্যাপট্যাপ, প্যাটপ্যাট করছে!” বুকে হাত দিয়ে তাই থম মেরে বিছানায় বসে রইল আদ্রিশ! মনে মনে একটা উড়ো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে, ❝আদ্রিশের যদি মেয়ে হয়, তবে তার নাম রাখবে ‘আমেনা’। বুকে এমন দ্রুমদ্রুম করলেই, সোজা বুকে হাত দিয়ে বাংলা সিনেমার মতো করে তার বউকে বলবে, ‘আমেনার মা’! একটু জলবাতাসের ব্যবস্থা কর। নয়তো তোমার সোনার চাঁদ এক্ষুনি লটকে যাবে!❞

আমি নিজের কক্ষে এসে পেটে হাত চেপে হাসতে হাসতে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আজকের দিনটা বেশ মজার! বিকেলের দিকে রিশতা, অরনীও ফিরে আসবে ওদের দাদু বাড়ি থেকে। সাথে ওদের চাচাতো, ফুফাতো ভাইবোনও আসবে আমাদের বাড়িতে। আর ওদিকে কিছুক্ষণ পর আমার খালাতো, মামাতো ভাইবোনও আসতে চলেছে। যাক ভালোই হবে তবে, পুরো কাজিনমহল মিলে আজ জম্পেশ মোজ মাস্তি করা যাবে!

বিছানায় উবু হয়ে শুয়ে কোলবালিশটা জড়িয়ে নিয়ে ডুব দিলাম সেদিনকার ঘটনায়।

..

আলভি ভাইয়া চলে যেতেই, আমি পা টিপে টিপে আদ্রিশ ভাইয়ার কক্ষে চলে যাই। এদিক ওদিক খুঁজে, ডায়রি না পেয়ে হতাশ হতে হলো আমায়। তারপর কি মনে করে কাবার্ডের দিকে এগিয়ে গেলাম। কাবার্ড মধ্যে থাকা জামাকাপড়ের ভাঁজে লক্ষ্য করলাম ডায়রিটা। এবার আর ভুল করলাম না উল্টে পাল্টে ভালোভাবে দেখে নিলাম, না ঠিকই আছে। আমি আবার সুন্দর করে জামাকাপড় গুছিয়ে রেখে চলে এলাম। কি শেয়ানা প্রডাক্ট রে বাবা! কিন্তু আমিও তো কোন অংশে কম নই, ঠিকই বের করে ফেলেছি। এখন আমার প্রধান কাজ এটা পড়ে দেখা। কি এমন লেখা যা দেখতে আমার মানা!

আমার কক্ষে এসে দ্রুত দরজা আটকে দিলাম। বিছানায় বসে ডায়রির ঠিক যেখান থেকে শেষ করেছিলাম, সেখান থেকে পড়া আরম্ভ করলাম।

সেখানে লেখা রয়েছে, ❝এই মেয়েটা কিচ্ছু বোঝেনা, কবে বুঝবে সবকিছু? এতো আবেগি হলে কি চলে? আল্লাহ মনে হয় দুনিয়ার সব আবেগ এই মেয়ের মধ্যে দিয়ে দিয়েছে। উফফ এরে নিয়ে আমি আর পারিনা। এ পাগল বানায় দিবে আমারে। বিয়ের পর না জানি কি করে বসে আমার সাথে? এই চিন্তায় এখনই আমার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।❞

এতোটুকু পড়তেই আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। আদ্রিশ ভাইয়া কি আমার কথা লিখেছে নাকি! আমি দ্রুত পরের পাতা উল্টালাম, ❝আমার মিসেসের নামের প্রথম অক্ষর “ম” দিয়ে শুরু। নামের সাথে সাথে আমার বউটাও মাশাআল্লাহ দেখতে অনেক সুন্দর! ওরে দেখলেই আমার প্রচুর প্রেম প্রেম পায়! ইচ্ছে করে চুমু দিয়ে খেয়ে ফেলি একদম। কিন্তু আফসোস ও তো বাচ্চা একটা মেয়ে, এসবের কি বোঝে ও?❞

এতোটুকু পড়তেই লজ্জায় আমার কান মাথা গরম হয়ে যায়। আদ্রিশ ভাইয়াকে আমি ভদ্র ভেবেছিলাম, কিন্তু উনি যে এতো হাই ভোল্টেজের দুষ্ট, তা কে জানত?

আমার চিন্তাকে দূরে ঠেলে দিয়ে আমি আবারও পড়তে শুরু করলাম, ❝ছোট থেকেই আমি ওকে প্রচন্ড রকমের ভালোবাসি। আচ্ছা ও কি আমায় ভালোবাসবে কখনো? তবে হ্যাঁ এখনই কোনো কিছু প্রকাশ করা যাবেনা, নিজেকে সংযত রাখতে হবে। ও জানলে, ও যেরকম মানুষ পড়াশোনা ওর চাঁন্দের দেশে চলে যাবে। আমি ওর পড়াশোনা নিয়ে অনেক বেশি কনসিয়াস। ওকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আমি চাই আমার সে আমার চাইতেও বড় হোক। এটা আদ্রিশ খানের নিজের কাছে নিজের প্রমিস।❞

এতোটুকু পড়ে অজান্তেই আমার চোখের কার্নিশে অশ্রুকণারা এসে ভির জমায়। এটা কষ্টের না, এটা আনন্দের!

আরেক পাতায় লেখা, ❝ওর থেকে আমার দূরে থাকা উচিত। আজকাল মেয়েটাকে দেখলেই আমার নিজেকে সামলে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আমি কখনোই চাইনা, আমিই আমার মেহুর জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠি। যেহেতু মেহু বড় হয়েছে, আর আমিও যথেষ্ট এডাল্ট। তাই দূরত্ব বজায় রাখাই শ্রেয়। এরজন্য একটু আধটু ধমক দেই। যদিও আমার প্রচন্ড কষ্ট হয়, তবুও এছাড়া আর উপায় নেই। বেশিরভাগ মানুষ এই উঠতি বয়সটাতেই ভুল করে বসে।❞

অপর পাতায় লেখা, ❝ইশ মেয়েটা আমার আম্মুকে ❝শাশুড়ি আম্মু❞ বলে ডাকে। তার মানে ও আমায় ভালোবেসে ফেলেছে। আর ভালোবাসবে না-ই বা কেন, আমি দেখতে যা হ্যান্ডসাম, তারউপর আবার ডাক্তার! মেয়েরা তো আমার পাশে লাইন দিয়ে পড়ে থাকে। কিন্তু ঐ যে আমি আমার মিসেসকে মন দিয়ে ফেলেছি তো সেই কবেই, এজন্য আর পরনারীর দিকে তাকানোর কথা চিন্তাই করিনা। আমার বউকে আমি একদম পিচ্চি থেকে কোলে পিঠে বড় করেছি। ভালো শুধু ওকেই বাসি আমি।❞

পরের পাতা উল্টালাম, ❝আম্মু ছোট থেকেই চাইতেন মেহুকে আমার বউ বানাবে। তবে আমার মায়ের মুখে যেদিন প্রথম শুনেছিলাম মেহুকে আমার বউ বানাবে, সেদিন থেকেই আমি ওর প্রতি তীব্র টান অনুভব করি। যদিও এটা আরও আট- নয় বছর আগের কাহিনী, লিখতে ভুলে গিয়েছিলাম।❞

অপর পৃষ্ঠায় সুন্দর করে লেখা, ❝তোমায় নিয়ে আমার সকল আবেগ সকল অনুভূতি। তুমিই আমার প্রথম প্রেম, আমার প্রথম ভালোবাসা। ইশ কবে অবসান ঘটবে আমাদের মাঝে এই আকাশসম দূরত্বের, আর যে সইতে পারছিনা আমি। ধৈর্যে আর সত্যিই কুলায়না আমার।❞

আরেক পাতা উল্টালাম, চড়ুইভাতির দিনের কথা লেখা, ❝ইশ মেয়েটা আজ কালো রঙের থ্রিপিস পড়েছে। ফর্সা গায়ে বেশ মানিয়েছে। ওর ঘরে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম। আমি সেদিন পড়েছিলাম সাদা পাঞ্জাবি, ওকে কালো পড়তে দেখে আমিও দ্রুত কালো পাঞ্জাবি পড়ে নিলাম। ব্যাস্ ম্যাচিং ম্যাচিং হয়ে গেল আমাদের।❞

ওহ তার মানে সেদিন ওটা মিরাক্ক্যাল ছিলনা, ব্যাটা ইচ্ছে করেই করেছিল। মানুষ এতো চাপা স্বভাবের কিভাবে হতে পারে? আমি তার পুরাই উল্টো। আমার মুখে যা আসে আমি তা-ই চট করে বলে ফেলি।

ছলছল নয়নে হাসিমাখা বদনে অপর পাতা উল্টিয়ে দেখলাম, ❝এই মেয়ে তুই কবে বুঝবি আমায়? আমার মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে শুধু। অভদ্র মেয়ে। দাঁড়াও চাঁদ তোমার সাথে আগে শুধু বিয়েটা হোক তারপর বুঝাবো এই আদ্রিশ কি চিজ!❞

এটা পরে হালকা হাসলাম। ইনি যা দুষ্ট, এখন দূরে দূরে থাকছে ঠিকই, বিয়ের পর না জানি কি করতে কি করে বসে আমার শাশুড়ির ছেলেটা! ইশ ভাবতেই লজ্জায় আমার নাক – কান গরম হয়ে যাচ্ছে!

অপর পাতা উল্টিয়ে দেখলাম, ❝ইশ মেয়েটা আজ জড়িয়ে ধরেছে আমায়। আমারও ইচ্ছে করেছিল জড়িয়ে ধরতে কিন্তু পারলাম না। একটা বাঁধা রয়ে যায়। আমি ওয়াদা করেছি বিয়ের আগে ওকে ভুল করেও ছুঁবোনা, একদম বোনের নজরে দেখবো। কিন্তু না মেয়েটা তো বোঝেই না। কাঁদতে কাঁদতে আবেগি মেয়েটা আমায় ভালোবাসে, একথাটা বলেই ফেলল। আমি কল্পনাও করিনি মেহু আমায় ভালোবাসে।আমারও মাঝে মধ্যে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়, তোকে বড় ভালোবাসি মেহু! কিন্তু পারিনা, আমি সত্যিই পারিনা। বিয়ের আগে কোনো হারাম সম্পর্কে জড়াতে চাইনা আমি। কারণ হারামে শান্তি নেই! শান্তি শুধুমাত্র হালালেই। আমি তোকে হালাল ভাবেই চাই মেহুরানী! কিন্তু এই অবুঝ মেয়েটা কবে বুঝবে আমায়? ও বুঝতে বুঝতে আমি হয়তোবা মরেই যাব একদিন! এমনিতেও আজকাল শরীরটা ভালো লাগেনা আমার। হয়তো সময় ফুরিয়ে আসছে আমার!❞

শেষের অংশটুকু পড়ে আমার খুব খারাপ লাগল। আমার মুখে মরে যাওয়ার কথা শুনলে তো ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়। তাহলে সে যে এমন করে, তাকে কি করা উচিত আমার। ডায়রিতে আর কিছু লেখা পেলাম না। এখনো অনেকটা পাতা ফাঁকাই পড়ে রয়েছে। তবে কয়েক পাতায় দেখলাম চোখের পানির ছাপ! আদ্রিশ ভাইয়া কি কেঁদেছে! পুরুষ মানুষ কাঁদতেও পারে বুঝি! ডায়েরির একেবারে শেষের পাতায় লেখা, ❝A+M❞
❝আমি💖আমার আম্মুর বৌমা❞

এই অংশটা দেখতেই আমার অধরের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। এতো ভালোবাসা লুকিয়ে রেখেছে বিচ্ছুটা! কিন্তু আমি তো এতো সহজে গলবো না, নাহ কিছুতেই না। আমি অনুমানে না, প্রমাণে বিশ্বাসী। যতদিন না সে নিজে থেকে এসে আমার সামনে এসব স্বীকার করবেনা, ততদিন আমি কিছুতেই মানবোনা। কথায় আছে না, কোনো মানুষের দূর্বলতা সম্পর্কে একবার জেনে গেলে, অপর মানুষটা ভাব দেখানো শুরু করে। আমিও ঠিক তাই করবো। আদ্রিশ ভাইয়াও তো তাই করেছিল আমার সাথে, সবটা জেনে বুঝেও হার্ট করেছিল আমায়। যদিও যা করেছিল, আমার ভালোর জন্যই, তবুও। হোক সেটা অভিনয় কিন্তু আমি তো সিরিয়াসলি নিয়ে ফেলেছি। আর তাছাড়া ওনার ভাষ্যমতে, ওটা নাকি আমার আবেগ ছিল, আমি কখনো ভালোই বাসিনি তাকে। আর সত্যি তো এটাই। এখন দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা! এই মেহরুন ইবনাত খান যে কি চিজ, এইবার হাড়ে হাড়ে টের পাবা! বাচ্চাদের মতো যদি না কেঁদেছ তবে আমার নামও মেহরুন নয়। হুহ।

..

আহিরের ডাকে আমার ভাবনার সুঁতোয় টান পড়ে। আমার ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে আবারও বাস্তবে ফিরে এলাম তাই। বিছানা ছেড়ে উঠে আহিরের কাছে এগিয়ে এলাম। অধরের কোণে মুচকি হাসির রেখা টেনে উচ্ছাসিত কন্ঠে বললাম

-‘ আরে, আহির যে! কি রে কি খবর? ভাই কতোদিন পরে দেখলাম তোকে? কেমন আছিস?

আহির আমার দিকে এগিয়ে এসে হাসি মুখে বলল

-‘ এইতো ভালোই আছি, মেহুবুড়ি! এখন বল তোর কি অবস্থা?

আমি হাসিমাখা মুখে বললাম

-‘ তোকে দেখার পর ভালো না থেকে কি পারা যায়, ভাই?

আমার কথায় হেসে ফেলে আহির। খুব হাসিখুশি মিষ্টি একটা ছেলে। আহির আমার বয়সী। আমার মতো ও এবার এসএসসি দিয়েছে। সম্পর্কে ও আমার খালাতো ভাই হয়। তবে আমরা মিশি বেস্টফ্রেন্ডের মতো।

মেহরুনের সাথে আহিরকে এভাবে কথা বলতে দেখে আদ্রিশের কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ চলে আসে। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শোনার চেষ্টা করে কি বলছে ওরা।কিন্তু হাসাহাসি ব্যতিত আর কিছুই শুনতে পারেনা সে। আদ্রিশের পুরো শরীর জ্বলে যায়। হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসে তার। ছোট থেকে কি আগলে রেখেছে, এসব দিন দেখার জন্যে? রাগ হলেও মুখ ফুটে কিছু বলল না সে। ধুপধাপ পদধ্বনির আওয়াজ তুলে নিজের কক্ষে গিয়ে শব্দ করে দরজা দেয় আদ্রিশ।

আমার মুখে ফুটে ওঠে বাঁকা হাসি। এসব কিন্তু আমার নজর এড়ায়নি। এখন শুধু দেখবে আর লুচির মতো ফুলবে! ইশ কেমন পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি যে! সবে তো শুরু। ক্লাইমেক্স আভি বাকি হ্যা ইয়ার!🧛🏻‍♀️

#চলবে~