হৃদয়ে লাগিল দোলা পর্ব-১৮+১৯

0
76

#হৃদয়ে_লাগিল_দোলা 🫶
#নুসাইবা_জান্নাত_আরহা
#পর্ব১৮

-‘ উহু, এই মুহুর্তে আমি আর কোনো এক্সকিউজ শুনতে চাই না মেহরুন। তোকে যা বলেছি তুই তাই কর আগে।

আমি ছলছল দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম সামনে থাকা ব্যক্তিটির দিকে। মানুষ এতোটা নির্দয় কিভাবে হতে পারে? আমার মতো একটা নিষ্পাপ শিশুকে নির্যাতন করে, উনি দাঁত কেলিয়ে হাসছেন! ওনার কি বিন্দুমাত্রও মায়া হচ্ছে না আমার প্রতি?

কিছুক্ষণ আগে…

আমাকে আদ্রিশ ভাইয়া ডেকে যাওয়ার পরও আমি যাইনি। প্রথমত ওনার মুখোমুখি হওয়ার বিন্দুমাত্রও ইচ্ছে ছিল না আমার। তাই আমি তেমন ভ্রুক্ষেপ করিনি তার কথায়। ভাবলেশহীনভাবে আহিরকে নিয়ে আমাদের বাড়ির পেছনের বাগানটাতে এসেছিলাম। নতুন করা হয়েছে আমার এই শখের বাগানটা। বাগানে রয়েছে সারি সারি ফুলের গাছ! ও কখনো আমার করা বাগান দেখেনি, তাই নিয়ে এলাম। ঘুরে ঘুরে বাগান দেখতে দেখতে আহির হুট করে বলে উঠল

-‘ মেহুবুড়ি! আদ্রিশ ভাই ডাকার পরও তো তুই গেলি না। ওনার ভাবেসাবে মনে হলো বেজায় চটে আছেন আমাদের উপরে। তার উপর আবার উনার কথার খেলাপ, এখন কি হবে আমাদের?

আমি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বেশ ভাব নিয়ে বললাম

-‘ আরে ভয় পাস না তো! আমি কি ভয় পাই নাকি তাকে? উল্টে আমায় দেখলে আরও ভয়ে পালায় আদ্রিশ ভাইয়া।

কথাটা বলেই শব্দ করে হেসে উঠলাম আমি। আহির মুখে জোরপূর্বক হাসি ফোটালেও পরক্ষণেই কি মনে করে মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। আগের বারের থাপ্পড়টা এখনো মনে পড়লেই তার গালটা কেমন যেন নড়ে ওঠে। বিলাপ করে তাই বলল

-‘ তুই যা বলেছিস, আমি কিন্তু তা-ই করেছি। কিন্তু এখন যদি তোর চাচাতো ভাই এসে আমার এমন শুকনো পাটকাঠির মতো শরীরে বেদম প্রহার করে তাহলে কেউ আর আমাকে পটল তোলার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না রে। আমি এতো তাড়াতাড়ি ম’রতে চাই না। ও বউ কোথায় তুমি? বাঁচাও আমারে!

আমি আমার চুল উড়িয়ে ভাবলেশহীনভাবে বললাম

-‘ আরে তুই শুধু শুধুই টেনশন করছিস ভাই। আদ্রিশ ভাইয়ার কিছু বলার সাহস আছে নাকি…

আমার কথার মাঝেই কর্ণকুহুরে এক গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই থেমে গেলাম আমি। পরপর কয়েকটা শুকনো ঢোক গিললাম। পেছন ফিরে তাকিয়ে মেকি হাসার বৃথা চেষ্টা করলাম মাত্র।

আহির দাঁতে দাঁত চেপে অস্ফুটস্বরে বলল

-‘ মেহুবুড়ি, তুই আজ শেষ রে! আমি চলি নয়তো আমিও…

আদ্রিশ ভাইয়া আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে আলতো হেসে বলল

-‘ আরে আহির যে। কেমন আছো ভাই আমার?

আহির কোনো মতে মেকি হাসি দিয়ে বলল

-‘ এই তো ভাই ভালো আছি। আপনি মেহুর সাথে কথা বলেন, আমি তবে যাই।

-‘ আরে আরে তুমি পালাচ্ছো কেন আহির? আমি তো তোমার বড় ভাইয়ের মতোই, তাই না?। বড় ভাইকে দেখলে পালাতে হয় বুঝি?

আদ্রিশের হঠাৎ এমন ভালো মানুষী রূপ দেখে কিছুটা ভড়কে যায় আহির। আমতা আমতা করে তাই বলল

-‘ না মানে ভাই আসলে আমার না এখনো বিয়ে করা বাকি পড়ে রয়েছে। আমি তাহলে যাই।

আদ্রিশ কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ ফেলে সন্দিহান চিত্তে বলল

-‘ এই তুমি না সবে এসএসসি দিলে? তো এই বয়সেই বিয়ে করার শখ জেগেছে তোমার! ইশ বাচ্চা বাচ্চা পোলাপানও আজকাল বিয়ে করতে চায়। কি করলাম তবে আমি এই জীবনে? আমার যে বউ থাকতেও বউ নাই!

শেষোক্ত কথাগুলো বিলাপের সুরে বলে থামল আদ্রিশ।
আমার দিকে এগিয়ে এসে আদ্রিশ ভাইয়া পুনরায় আহিরের উদ্দেশ্যে বলল

-‘ আচ্ছা আহির তুুুুমি মেহমান মানুষ। যাও ঘরে গিয়ে রেস্ট নাও। আমি একটু তোমার মেহুবুড়ির সাথে জরুরি কথা বলে আসি, কেমন?

আহির মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে দ্রুত প্রস্থান করে। যেন পালিয়ে বাঁচতে পারলেই ছেলেটা বাঁচে। হুট করে ওর আচরণের এমন আমূল পরিবর্তন দেখে আমার সন্দেহ হয়, আদ্রিশ ভাইয়া আবার সত্যি সত্যিই ছেলেটাকে ধোলাই দিয়ে বসল না তো?

-‘ কি ব্যাপার মেহুপাখি, চুপ করে এভাবে দাঁড়িয়ে আছো যে? চলো আমার সাথে। তোমার একটু খাতির যত্ন করার সুযোগ দাও এই অধমকে!

আদ্রিশ ভাইয়ার এমন মিষ্টি মিষ্টি বুলি শুনে এ মুহুর্তে আমার মনে ভয় জেঁকে বসল। এখন তো এতো ভালো ব্যবহারের কথা নয়, তাহলে কি তার মনে অন্যকিছু চলছে? নিশ্চয়ই কোনো ফন্দি আঁটছে, আমায় শায়েস্তা করার জন্য। ভয়ার্ত চাহনিতে আমি একবার দৃষ্টিপাত করলাম তার মুখশ্রীর পানে। এক দৃষ্টিতে একদম শান্ত চাহনিতে সে চেয়ে রয়েছে আমার পানে। আজ তার নেত্রের মাঝে কোনো চঞ্চলতার ভাব নেই। এটা কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস নয় তো? এসব ভেবেই আমার মুখটা একেবারে পাংশুটে হয়ে গেল যেন।

আদ্রিশ ভাইয়া এবার আর কোনো কথা না বলে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় নিজের কক্ষে। আমি বাঁধা দিতে চাইলেও পারলাম না। ঘরে এসেই ঠাস করে দরজা দিয়ে দেয় আদ্রিশ ভাইয়া। আমার বুকটা ধক করে ওঠে। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইলাম তাই। উনি এ মুহুর্তে ঠিক কি করতে চাইছে, তা বোঝা বড় দায়। সে আমার দিকে যত এগিয়ে আসছে, আমার ভয় তত বেড়েই চলেছে! মনের কোণে সন্দেহের দানা উঁকি দিল, ‘ওনার মনে খারাপ কিছু নেই তো?’ আমার পড়নে থাকা কামিজটা খামছে ধরলাম আমি। তবুও নিজেকে শান্ত রাখলাম।

আমার দিকে এগিয়ে এসে কন্ঠে কিছুটা গাম্ভীর্যতা এনে বলল

-‘ তুই এমন কেন মেহু? তুই কি সত্যিই কিছু বুঝিস না, নাকি না বোঝার ভান করিস?

তার কথায় আমি চকিত তাকাই। আমি জানি সে কি বলতে চাইছে। তবুও তার মুখ থেকেই শোনার জন্য আমি নির্বিকার দাঁড়িয়ে রইলাম।

আদ্রিশ ভাইয়া এবার আমার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে করুন সুরে বলল

-‘ তুই সবটা জেনেও এমন করছিস কেন মেহু? তোর পাশে অন্য কাওকে সহ্য হয়না যে আমার!

আমি তবুও নির্বিকার রইলাম। উৎসুক হয়ে তার পানে চেয়ে রইলাম। এবার সে আমার হাতটা ছেড়ে দেয়। মুখে কিছুটা কাঠিন্য ভাব এনে শক্ত কন্ঠে বলল

-‘ নেক্সট টাইম যেন তোর পাশে আহিরের ছায়াও না দেখি আমি। তা না হলে কিন্তু আমার চাইতে খারাপ কেউ হবেনা।

আমি এবার চুপ থাকতে পারলাম না। মৃদু স্বরে বললাম

-‘ আহির তো আমার খালাতো ভাই হয়। ও আমার সাথে থাকলে কি সমস্যা?

আমার কথা শুনে আদ্রিশ ভাইয়া থমথমে গলায় বলল

-‘ খালাতো ভাই হোক বা পাড়াতো, যে ভাই-ই হোক না কেন সবার থেকে দশ ফিট দূরে থাকবি তুই। খবরদার আমার কথার যেন নড়চড় না হয়।

আমি এবার কিছুটা অবাক হয়ে বললাম

-‘ তাহলে সবার আগে তুমি দূরে সরো। তুমি তো আমার চাচাতো ভাই, আপন ভাই তো আর নও।

এবার আদ্রিশ ভাইয়া বোধহয় তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। দ্বিগুণ তেজে তাই বলে উঠল

-‘ এমনিতেও ভুল করেছিল। তার উপর আবার আমার মুখে মুখে তর্ক! এই এক্ষুনি দুশোবার কান ধরে উঠবস কর। এটা তোর পানিশমেন্ট।

তার দিকে আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। আরে আমি ভুলটা কি বললাম। এই ব্যাটা বলে কি এসব।

আমায় হা করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আদ্রিশ ভাইয়া টেবিলের উপর থেকে একটা স্টিলের স্কেলটা নিয়ে এসে বলল

-‘ এই তুই কান ধরে উঠবস করবি নাকি আমার হাতে স্টিলের স্কেলের মাইর খাবি, কোনটা?

এই রে স্টিলের স্কেলের মাইর তো সাংঘাতিক! একবার স্কুলে বাঁদরামি করার জন্য স্যার মেরেছিল। মনে পরলে এখনো জ্বলে ওঠে পিঠটা! না বাবা এর থেকে কান ধরে উঠবস করা ঢের ভালো। তবে আদ্রিশ ভাইয়ার সামনে কাভি নেহি!

উপায়ন্তু না পেয়ে তাই আমি এবার মিথ্যা কান্নার অভিনয় জুড়ে করুণ সুরে বললাম

-‘ সরি ভাইয়া, আর হবেনা কখনো।

পানিশমেন্ট মওকুফের জন্য ইনিয়েবিনিয়ে আরও নানান কথা বলেও ঠেড়ষটার মন গলাতে পারলাম না। শেষমেশ সে আমায় উপরোক্ত কথাটা বলে বসল।

আমায় নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আদ্রিশ ভাইয়া তাড়া দিয়ে বলে উঠল

-‘ কি হলো, দাঁড়িয়ে আছিস যে? ফটাফট দুশোবার কান ধরে উঠবস কর। এটাই তোর মতো বিচ্ছুর জন্যে পারফেক্ট শাস্তি!

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় আমার ভাবনার সুঁতোয় টান পড়ে। মেয়েদের কান্নায় নাকি পাথরেরও মন গলে। আমি এবার তাই কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে উঠলাম

-‘ এমন করছো কেন ভাইয়া? আমার মতো একটা নিষ্পাপ নাদান বাচ্চাকে শাস্তি দিতে তোমার খারাপ লাগছে না একটুও।

আদ্রিশ ভাইয়া এবার আমার একদম কাছাকাছি এসে কিছুটা ঝুঁকে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল

-‘ সিরিয়াসলি তুই বাচ্চা? তাহলে তোর আচার আচরণ এমন ইচরেপাকাদের মতো কেন?

আমি নিরুত্তর। তবে মনে মনে ওনার চৌদ্দ গুষ্টির শ্রাদ্ধ পড়াতে গিয়ে নিজেকেই নিজে ধমক দিলাম। আরে ওনার চৌদ্দ গুষ্টি মানে তো আমারও চৌদ্দ গুষ্টি। ছি ছি নিজের বাপ দাদা পূর্বপুরুষদের কি কেউ গালি দেয়!

আদ্রিশ ভাইয়া এবার থমথমে গলায় বলে উঠল

-‘ তুই যে আমার ডায়রি পড়েছিস, তা বুঝতে আমার বাকি নেই। তুই তো সবই জানিস, তাহলে এমন না জানার ভান ধরেছিস কেন? এতোকিছুর পরেও তুই কেন বুঝতে চাইছিস না যে তোকে আমি ঠিক কতটা ভা…।

আমি উৎসুক হয়ে শুনছিলাম তার কথা। কিন্তু ব্যাটা প্রত্যেকবারই ভা ভা করতে করতেই মাঝপথে থেমে যায়। কোনদিন পেত্নীতে এসে ভাউ দিবে তখন বুঝবে ঠ্যালা। এবার সত্যিই আমার মেজাজ সপ্ত আসমানে চড়ে গেল। ইচ্ছে করছে কামড়ে দিতে, কিন্তু আফসোস আমি তো আর রাক্ষসী নই!

আদ্রিশ ভাইয়া আবারও মুখ খোলার পূর্বেই দরজায় টোঁকা করে। আমার ধড়ে প্রাণ ফিরে এলো যেন। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখলাম গরম খুন্তি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মামনি। সুযোগ পেয়ে আমিও কান্নার সুর জুড়ে দিয়ে সবকিছু বলে দিলাম। সব শুনে মামনি রেগে যায়। মামনি খুন্তি নিয়ে তাড়া করে আদ্রিশ ভাইয়াকে। পশ্চাৎদেশে গরম খুন্তির ছ্যাকা পড়তেই ‘উহ’ করে মৃদু চিৎকার করে ওঠে আদ্রিশ ভাইয়া।

তাড়া করতে করতে ক্ষিপ্ত গলায় মামনি বলল

-‘ তবে রে! তোর এত্তো বড় সাহস, আমার মেয়েকে কান ধরে উঠবস করানো। দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা।

পশ্চাৎদেশে হাত দিয়ে ডলতে ডলতে আদ্রিশ ভাইয়া আকুতি ভরা কন্ঠে বলে উঠল

-‘ আম্মু আমি আর জীবনেও মেহুকে কান ধরে উঠবস করানোর কথা স্বপ্নেও ভাববো না। উহ, পেছনটা বোধহয় ঝলসে গেল রে বাপ!

মা ছেলের এমন কান্ডকারখানা দেখে আমি হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলাম। এবার বোঝ ঠ্যালা আদ্রিশ চাঁন্দু! এই মেহরুন ইবনাত খানের পেছনে লাগতে আসলে ওমনই গরম খুন্তির স্পেশাল ছ্যাকা খেতে হয়। ভা ভা করতে গিয়ে এখন বেচারা ম্যা ম্যা করছে🧛🏻‍♀️

#চলবে ~

#হৃদয়ে_লাগিল_দোলা 🫶
#নুসাইবা_জান্নাত_আরহা
#পর্ব১৯ [বৃষ্টি বিলাশ স্পেশাল]
#বোনাস_পর্ব

চোখের পলকেই এর মাঝে কেটে গেছে দুটো দিন। এই দুদিনে আমরা সব কাজিনরা মিলে অনেক আনন্দ উল্লাসে মেতেছিলাম। তবে আজ যখন ওদের ফিরে যাওয়ার পালা, তখনই মনটা আমার কেমন তীব্র বিষন্নতায় ছেয়ে যায়! ওদের সবাইকে বিদায় জানিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে কক্ষে এসে বসে রইলাম খানিকক্ষণ।

গত দুদিনে একবারের জন্যেও আদ্রিশ ভাইয়ার সাথে আমার আর সাক্ষাৎ ঘটেনি। আমার অবাধ্য দুই নয়ন তাকে খুঁজেছে বারবার কিন্তু তার দেখা আর মিলল কই। থম মেরে সারাক্ষণই গৃহবন্দি হয়ে বসে রইল সে। আমিও তাকে নিয়ে আর মাথা ঘামাইনি। সে তার মতো থাকুক আর আমি আমার মতো। হয়তো আমার উপরে চটে আছে খুন্তিপোড়ার বিষয়টা নিয়ে। এজন্যই বোধহয় আর সামনে পড়েনি।

রিশতা আর আহিরের মাঝেও এ কয়দিনে বেশ ভাব জমে উঠেছে। ওদের দুজনের দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া আর খুনসুটি বেশ উপভোগ করি আমি। সবার জীবনেই তো প্রেমের বসন্ত এলো, তবে আমার জীবনে আর এলো কই? এসব মিলিয়ে মনটা কেমন ভারী হয়ে উঠল আমার।

কাঁধে হাত রেখে আমার পাশে এসে বসল রিশতা। আমার মুখটাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে, আমার দুই গালে দুহাত রেখে ও বলল

-‘ তোর মন খারাপ মেহু?

আমি মাথা নাড়ালাম। তপ্ত শ্বাস ফেলে রিনরিনে কন্ঠে আবারও রিশতা বলে উঠল

-‘ আমি জানি, তোর মন খারাপ তবে মেহমান চলে যাওয়ায় না, আদ্রিশ ভাইয়ার জন্য। তাই তো?

আমি নির্বিকার চিত্তে সেখানেই ঠায় বসে রইলাম। রিশতা এবার আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আদুরে ভঙ্গিতে বলল

-‘ এতো মিষ্টি একটা মেয়ের এমন মুখটা মেঘে ছেয়ে থাকলে কি ভালো লাগে? একটু হাস নয়তো কিন্তু সুরসুরি দিবো আমি।

কথাটা বলতে দেরি কিন্তু ওর সুরসুরি দিতে দেরি হয়না। আমি না চাইতেও এবার হেসে ফেললাম এবার।

হুট করে ভেসে এলো মেঘেদের গর্জন! এলোমেলো বাতাস বইতে শুরু করে চারপাশে। কিছু মুহুর্তের মাঝেই অন্তরীক্ষ যেন ঘন কালো মেঘে ছেয়ে যায়। দীর্ঘ তাপদাহের পর আজ আকাশের বুক চিরে ধরনীর বুকে নেমে আসবে বৃষ্টির ফোয়ারা!

বর্ষণমুখর এমন শীতল পরিবেশ দেখে খুশিতে নেচে উঠল রিশতার মন। হাত ধরে তাই টেনে নিয়ে অতি উচ্ছাসের সহিত রিশতা বলে উঠল

-‘ আজ কতদিন পর বৃষ্টি হচ্ছে, মেহু! আমার তো ভিজতে মন চাচ্ছে। আর আদ্রিশ ভাইয়াও তো ঘাপটি মেরে ঘরে বসে আছে। এটাই তো মোক্ষম সুযোগ! চল আমরা ছাঁদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে আসি।

মুহুর্তেই আমার মনের সকল বিষন্নতা কেটে গেলো যেন। দুজনে হাত ধরে এক ছুটে চলে এলাম ছাঁদে। ঝমঝমিয়ে রহমতের বৃষ্টি বর্ষণে শুষ্ক খাঁ খাঁ করা আমাদের ছাঁদের মেঝে আজ বৃষ্টির পানিতে টইটম্বুর হয়ে উঠেছে! আমি আর রিশতা হাত ধরাধরি করে এক নাগারে বৃষ্টিতে ভিজেই চলছি। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে! কি সুন্দর অনুভুতি!

একটু পর আমাদের এই বৃষ্টি বিলাশে এসে যোগ দেয় অরনীও। আমরা একে অপরের গায়ে বৃষ্টির পানির ছিঁটা দিচ্ছি আর খিলখিলিয়ে হেসে চলেছি।

..

কি মনে করে যেন ছাঁদে এসেছিল আদ্রিশ। এসেই নজরে পড়ল বৃষ্টি বিলাশে মগ্ন তিন রমনীকে। এদের মাঝে থাকা বৃষ্টি বিলাসিনী এক রমনীকে দেখে থমকে যায় আদ্রিশ। আদ্রিশ মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকে তার বক্ষপিঞ্জরে পাকাপোক্ত ভাবে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলা, নিজের একান্ত ব্যক্তিগত বৃষ্টি বিলাসিনীর দিকে। বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে জুবুথুবু অবস্থা হয়েছে মেহরুনের। পড়নে থাকা হালকা রঙের সালোয়ার কামিজ ভিজে পুরো শরীরে লেপ্টে আছে তার। ফলে শরীরের আকর্ষনীয় ভাঁজ দৃশ্যমান হয়ে ধরা দিয়েছে তার নেত্রের মাঝে। মেহরুনের প্রতিটি নেত্রপল্লবের ডানা ঝাপটানিতে যেন বুকের মাঝে রীতিমতো তোলপাড় বয়ে যাচ্ছে আদ্রিশের। আদ্রিশ বেসামাল হয়ে পড়ে মেহরুনের এমন রূপে! প্রতিনিয়ত এই রমনীটির প্রতিটা পদক্ষেপে তাকে একটু একটু করে ঘায়েল করে ফেলছে। শত চেষ্টা করেও আজকাল নিজেকে সামলে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে সে। কি আছে এই মেয়েটার মাঝে যা প্রতিনিয়ত ঘায়েল করে চলেছে তাকে। আজ মনের কোণে নানান অবাধ্য ইচ্ছারা উঁকি দিচ্ছে! আচ্ছা একটু ছুঁয়ে দিলে কি খুব বেশি একটা ক্ষতি হয়ে যাবে?

হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে নেয় আদ্রিশ। বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। তাকে তো এভাবে বেসামাল হয়ে পড়লে চলবে না। মেয়েটা তো এখনো ছোট, ও বোঝে কি এসবের? ইচ্ছায় এই মেয়েটা হতে দূরে দূরে থাকে আদ্রিশ? মেয়েটাকে দেখলেই যে সে নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। অথচ অবুঝ মেয়েটা সব জেনেও না জানা ভান করে, ইচ্ছে করে চুমু দিয়ে একেবারে সোজা করে দিতে কিন্তু আফসোস মেহরুন তার জন্য বৈধ না হওয়া অবধি তাকে ছুঁয়ে দেখারও সাধ্য যে নেই তার। মনের কোণে সে ইতোমধ্যে এক রঙিন পরিকল্পনার ছক এঁকে ফেলেছে! কিছুটা ভেবে সে বাঁকা হেসে সামনে এগিয়ে যায়।

..

ঝড়ের বেগে কোথ থেকে উড়ে এসে আমার কান টেন ধরল। কান ধরে টানতে টানতে ছাউনির নিচে নিয়ে এলো। চোখ মুখ কুঁচকে সামনে তাকাতেই, আদ্রিশ ভাইয়াকে দেখে হা হয়ে গেলাম আমি। বৃষ্টির পানি তার শরীর ছুঁয়েছে। ঘন কালো চুল বেয়ে টপটপ করে পানি ঝড়ছে। এক দৃষ্টে চেয়ে আছে সে আমার পানে। তার চোখ যেন আজ কি বলতে চাইছে। বহুরূপি মানবটা আজ অনন্য রূপে ধরা দিয়েছে আমার সামনে। আমি কিছু বলার জন্যে মুখ খুলতেই আমার ওষ্ঠাধরে হাতের একটি আঙ্গুল ছুঁইয়ে আড়ষ্ট কন্ঠে সে বলে উঠল

-‘ হুশ চুপ। কোনো কথা নয়।

আমি একবার ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকিয়ে আরও এক দফা অবাক হলাম। রিশতা, অরনী নেই। ছাঁদ শূন্যই পড়ে আছে। আদ্রিশ ভাইয়া ফিচালো হেসে আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল

-‘ মেহুপাখি, বলেছিলাম না, আমার অবাধ্য না হতে। তবুও তুমি বিরাট বড় এক অন্যায় করে ফেলেছো। এর শাস্তি কিন্তু তোমায় পেতেই হবে।

পরপর কয়েকটা শুকনো ঢোক গিললাম আমি। এই লোকটাকে আমার সুবিধার ঠেকছেনা। এদিকে রিশতা, অরনীও কোথায় হারিয়ে গেল কে জানে? আমি ভয়ে ভয়ে মুখ বাড়িয়ে একবার চাইলাম তার পানে। সে পূর্বের দৃষ্টিতেই চেয়ে আছে আমার পানে। আচমকা সে আমার গাল টেনে দিয়ে আলতো করে হেসে বলল

-‘ মেহুপাখি, বৃষ্টিতে ভিজলে তো জ্বর বাঁধিয়ে ফেলবে। তখন তো তোমার এই ডাক্তার সাহেবের তন্বীতেই ফিরে আসতে হবে। যদিও তোমার ডাক্তার সাহেব এখনো পুরোপুরি ডাক্তার হয়নি। তবুও আমারই তো চিকিৎসা করে সারিয়ে তুলতে হবে তোমায়।

কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আমি বলে ফেললাম

-‘ স’রি ভাইয়া। আমি আসলে নিজে থেকে ভিজতে চাইনি, ওরাই তো…

-‘ ওরা তোমায় বলল আর তুমিও নাচতে নাচতে চলে এলে মেহুপাখি?

আমি ভড়কে গেলাম। যেভাবে কান টেনে ধরে এনেছিল, আমি তো ভেবেই বসেছিলাম এ লোক নির্ঘাত আমায় মে’রে বসবে। কিন্তু আমায় অবাক করে দিয়ে হলো ঠিক তার উল্টোটা। আবার সে আমায় তুই থেকে ‘তুমি’ বলেও সম্মোধন করছে? আবার এমন মিষ্টি মিষ্টি বুলিও আওড়াচ্ছেন! হয়েছেটা কি এনার? মামনির হাতের খুন্তি পোড়া খেয়ে কি ইনি সত্যিই পাগল হয়ে গেছে নাকি? এমন অসংখ্য প্রশ্ন প্রতিনিয়ত বিচরণ করছে আমার মস্তিষ্কের করোটিতে। আমি স্বপ্ন ভেবে নিজেকে চিমটি কাটলাম। ‘উহ’ না স্বপ্ন নয় বাস্তব!

আদ্রিশ ভাইয়া আমার এহেন কর্মকান্ডে ঠোঁট চেপে হাসল। আমার একদম গাঁ ঘেষে দাঁড়িয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল

-‘ আমার আচরণে কি চমকে গেলে মেহুপাখি? এরপর আরও চমক বাকি! সবে তো শুরু। শুধু তুমি চমক দিবে আর আমি বসে বসে আঙ্গুল চুষব তা কি করে হয় বলো তো?

আমি হতভম্ব বনে গেলাম। আমায় নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হালকা কেশে আদ্রিশ ভাইয়া পুনরায় বলে উঠল

-‘ তুই কি এখনো স্টাচু হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবি এখানে? কাপড় পাল্টে নে, ঠান্ডা লেগে যাবে তো! নাকি আমি এসে পাল্টে দিয়ে যাব। যদি তোর কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে আমারও নেই।

শেষোক্ত কথাটা দুষ্ট হেসে বলল আদ্রিশ ভাইয়া। আমার বোধগম্য হতেই একরাশ লজ্জারা এসে ঘিরে ফেলল আমায়। আমি যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই আমার হাত টেনে ধরল আদ্রিশ ভাইয়া। আমি পেছন ফিরে উৎসুক হয়ে তার পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই, আদ্রিশ ভাইয়া আড়ষ্ট কন্ঠে বলে বসল

-‘ ‘ভালোবাসি’ মেহুপাখি।

আমার চরণ দুখানি থমকে যায়। এক শীতল হাওয়া এসে আমার মনে দোলা দিয়ে যায়। সে হতে এহেন বাক্য শোনার জন্যই তো আমি ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলাম। তাহা হইতে এহেন বাণি আমার কর্ণকুহুর স্পর্শ করতেই যেন আমার #হৃদয়ে_লাগিল_দোলা। মুহুর্তেই আমার হৃদয়ের কোলে বয়ে যায় স্রোত! আমিও অস্ফুটস্বরে বলে ফেললাম

-‘ আমিও।

তারপর আর কিছু বলতে পারলাম না। দুহাতে লজ্জায় রঞ্জিত হওয়া আমার মুখশ্রী ঢেকে এক দৌড়ে নিজের কক্ষে চলে এলাম।

আদ্রিশ শব্দ করে হেসে ওঠে তার প্রেয়সীর যাওয়ার পানে চেয়ে।

#চলবে ~