হৃদয়ে লাগিল দোলা পর্ব-২৬+২৭

0
74

#হৃদয়ে_লাগিল_দোলা 🫶
#নুসাইবা_জান্নাত_আরহা
#পর্ব২৬

ড্রয়িং রুমে আমরা সবাই মিলে গোল হয়ে বসে গল্প করছিলাম এমন সময় সবার মধ্যে থেকে আদ্রিশ ভাইয়া আমাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে বসল।

-‘ বল তো এমবিবিএস মানে কি?

-‘ আমি বলবো ভাই! এমবিবিএস মানে হচ্ছে মা বাবার বেকার সন্তান!

আদ্রিশের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে ৩২ পাটি দাঁত বের করে কেবলা মার্কা হাসি দিয়ে উক্ত কথাটি বলে উঠল আলভি।

সবেমাত্র পানির পটটা হাতে নিয়ে পানি খেতে যাচ্ছিল আদ্রিশ, এমন সময় ফট করে আলভির এহেন উত্তরে হাত থেকে পানির পট পড়ে যায় তার। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে সে থমথমে মুখে বলল

-‘ মানে আমায় দেখলে কি তোর বেকার বলে মনে হয় আলু! সবেমাত্র এমবিবিএসটা শেষ করলাম। নিশ্চয়ই এখনই কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে আমারে কেউ নেবে না। এখনও অনেক প্রসেসিং বাকি। এসব বললে তোদের একটার মাথাতেও ঢুকবে না। তাই আর বেকার বেকার বলে সময় নষ্ট করতে চাই না আমি।

একে নাগারে এতোটুকু বলে মেঝে থেকে পানির পট উঠিয়ে, উঠে দাঁড়ায় আদ্রিশ। আলভি এগিয়ে এসে বলল

-‘ ভাই মজা করেছিলাম আপনার সাথে, রে’গে গেলেন নাকি?

-‘ আজকাল আমায় নিয়ে মজাও করছিস দেখি, বাহ শুনে ভালো লাগল খুব।

আলভি কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই, ওকে থামিয়ে দিয়ে আদ্রিশ বলে উঠল

-‘ আচ্ছা শোন সবাই। আমার কিছু বলার আছে।

আমরা সবাই উৎসুক হয়ে চেয়ে রইলাম তার পানে। তপ্ত শ্বাস ফেলে সে বলল

-‘ এবার অনেকদিনই তো বাড়িতে ছিলাম। এভাবে আর কতদিন! আমাকে তো আমার নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে তাইনা? আগামী কাল সকালেই তাই ফিরে যেতে হবে আমায়। তোদের সাথে কাটানো মুহুর্তগুলো মিস করব ভীষণ!

এলোমেলো ভাবে কথাগুলো বলে থামল আদ্রিশ। আদ্রিশের আচমকা এমন কথার আগামাথাও বুঝলো না কেউ। আলভি তাই আদ্রিশের কাঁধে হাত রেখে বলল

-‘ ভাই কি হয়েছে আপনার? হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তের কারণ!

আদ্রিশ কিয়ৎক্ষণ নির্বিকার থেকে, ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে। আলভিকে খানিকটা দূরে নিয়ে গিয়ে, কণ্ঠ কিছুটা খাদে নামিয়ে বলল

-‘ এমবিবিএস শেষ করেই তো একলাফে কার্ডিওলজিস্ট হয়ে যায় না কেউ। এখনো অারও ধাপ বাকি। সে উদ্দেশ্যেই আগের জায়গায় ফিরে যাব আমি। যদিও বাড়িতে থেকেও স্টাডিটা কনটিনিউ করা যেত কিন্তু এতে দুজনেরই কর্নসার্নট্রেট ব্রেক হতে পারে, সেইজন্যই এমন সিদ্ধান্ত! আশা করি বুঝতে পেরেছিস।

আলভি মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। আদ্রিশ দৃঢ় চিত্তে পুনরায় বলে উঠল

-‘ তোর কিন্তু অনেক দায়িত্ব আলভি! আমার পরিবর্তে আমাদের বাপ চাচার ব্যবসাটা তুই দেখিস ভাই। কেননা পরিপূর্ণ ডাক্তার হওয়ার পর রোগী দেখব নাকি এসব ব্যবসা সামলাবো, বল তো? বাবাকে বোঝালেও তো মানতে চায়না। তবুও অনেক কষ্টে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি তাকে। আর নিশ্চয়ই তুই তোর দায়িত্বের হের ফের করবি না, এ বিশ্বাস আছে তোর প্রতি আমার।

আলভি মন দিয়ে শোনে আদ্রিশের কথাগুলো। হুট করে ভারী গলায় আলভি বলে উঠল

-‘ আপনাকে খুব মিস করব ভাই!

-‘ এমন একটা ভাব করছিস যেন মনে হচ্ছে আমি আর জীবনেও ফিরব না! ক’টা দিনেরই তো ব্যাপার।

এতোটুকু বলে হেসে ফেলে আদ্রিশ। আলভির কাঁধ চাপড়ে আবারও সে বলে উঠল

-‘ যা বললাম তা কিন্তু অক্ষরে অক্ষরে পালন করা চাই!

আলভি আবারও মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। তা দেখে শুধু মুচকি হাসে আদ্রিশ কিন্তু মনে মনে যে তার অন্তর্দহন চলে!

আদ্রিশ ভাইয়া আবারও চলে যাবে শুনতেই একরাশ বিষন্নতায় মন ছেয়ে যায় আমার। আমি তাই সেখানে বসে না থেকে নিজের কক্ষে চলে এলাম। মাথাটা ভীষণ ধরেছে তাই মাথায় তেল দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাটিতে তেল ঢেলে ড্রেসিং টেবিলের সামনে টুলে বসে পড়লাম।

-‘ তোর মাথায় তেল দিয়ে দিবো আমি?

কক্ষে প্রবেশ করতে করতে উক্ত কথাটা বলে উঠল রিশতা। ওর দিকে ফিরে মাথা নাড়ালাম শুধু। ও এগিয়ে এলো আমার দিকে। ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে তেলের বাটিটা নিয়ে ওর দিকে এগিয়ে দিলাম। আমার হাত থেকে নিতে গিয়ে হুট করে হাত ফোসকে মেঝেতে পড়ে গেল বাটিটা। তা দেখে আমি কিছুটা চেঁচিয়ে বলে উঠলাম

-‘ বোকা নাকি! সামান্য একটা তেলের বাটিও ধরতে পারিসনা?

আমার এমন তিরস্কারে রিশতা কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

-‘ মেহুবুড়ি আসবো?

দরজার দিকে উঁকি দিতেই আহিরকে দেখতে পেলাম। অধরের কোণে খানিকটা হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়ালাম শুধু। আমার অনুমতি পেতেই ও চলে এলো। কক্ষে প্রবেশ করতে করতে পুনরায় বলে উঠল

-‘ তোর পছন্দের মিষ্টি নিয়ে এলাম আর তুই এখনো মুখেও তুললি না!

আহির কথার পিঠে কিছু বলার পূর্বেই রিশতা মৃদু চেঁচিয়ে বলে উঠল

-‘ এদিকে এসো না আহির। ফ্লোরে তেল পড়ে পিচ্ছিল হয়ে আছে।

এতোটুকু ঠিক ছিল তবে বিপত্তিটা ঘটল আহিরের দিকে চেয়ে চেয়ে ওকে সতর্ক করতে গিয়ে নিজেই চিত পটাং হয়ে পড়ে গেল। রিশতাকে পড়ে যেতে দেখে আগের বারের মতো আর আহির হাসলও না আবার চিংড়ি মাছ চিংড়ি মাছ বলে চেঁচালও না। ওর দিকে এগিয়ে এসে টেনে তুলল ওকে। আমিও সাহায্য করলাম। বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বিচলিত হয়ে রিশতার উদ্দেশ্যে আহির বলল

-‘ তুমি ঠিক আছ রিশতা? কোথাও ব্যথা পেয়েছো কি?

‘না’ সূচক মাথা নাড়িয়ে, পূর্বের ন্যায় মাথা নত করে নেয় ও। আহিরের সামনে আবারও পড়ে গিয়েছে ভাবতেই লজ্জায় মিইয়ে যাচ্ছে ও। আহির কিয়ৎক্ষণ বসে রয় ওর পাশে। টুকটাক ভাব বিনিময় করে চলে যায় ও। যাওয়ার পূর্বে আবারও রিশতার উদ্দেশ্যে বলে যায়

-‘ নিজের খেয়াল রেখো রিশতা। কোথাও ব্যথা পেয়ে থাকলে মেহরুনকে বলো কেমন! আজ আসি তাহলে। আর মেহুবাড়ি চলি তবে, আবারও দেখা হবে।

মেঝেতে পড়ে থাকা তেলটুকু পরিষ্কার করে নিয়ে, আহিরকে বিদায় জানিয়ে পুনরায় নিজের কক্ষে চলে এলাম। পায়ে ভালোই ব্যথা পেয়েছে রিশতা। তাই তেল গরম করে ওর পায়ে মালিশ করে দিলাম খানিক সময়। অরনীও চলে এলো কক্ষে। ওর মন খারাপ ভীষণ। আমি আর তাই ঘাটালাম না ওকে। চুপচাপ পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুমের আর সহজে ঠাঁই মিলল না আমার নেত্রপল্লবের কোণে।

একটা নির্ঘুম রাত্রি যাপনের পর অবশেষে সূয্যি মামার দেখার মিলল! বেলকণিতে বসে ভোরের আলো ফুটতে দেখছিলাম এতোক্ষণ যাবত। কয়েলও ফুরিয়ে এলো এতোক্ষণে। কয়েল না জ্বালালে হয়তো মশায় খেয়ে ফেলত আমায়!

দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম আমি। ড্রয়িং রুমে আসতেই দেখলাম ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিশ ভাইয়া। সাথে আলভি ভাইয়া, মা, বাবা, চাচ্চু আর মামনি। মামনির চোখে অশ্রু টলমল করছে। হয়তো আবারও ছেলেকে ছেড়ে থাকতে হবে, এ কথা ভেবেই তার এ দশা!

আমায় দেখে মা অবাক হয়ে বলে উঠলেন

-‘ এই সাত সকালে উঠে পড়েছিস! কানের ধারে ড্রাম বাজালেও তো ঘুম ভাঙে না তোর! আজ সূর্য কোন দিয়ে উঠল! আমি তো নিজের চোখও বিশ্বাস করতে পারছি না!

এতোটুকু বলে চোখ ডলে আবার আমার দিকে ফিরে তাকালেন মা। সকাল সকাল মায়ের এমন কান্ড কারখানায় উপস্থিত সবাই ফিক করে হেসে ফেলে। বাদ যায়নি আদ্রিশ ভাইয়াও। হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে সে আমার উদ্দেশ্যে বলে বসল

-‘ মেহুপাখি চলে যাচ্ছি আমি। আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। তুই কিন্তু ভালোভাবে পড়াশোনা করবি, একদম ফাঁকিবাজি করবিনা। এসএসসিতে গোল্ডেন পেয়েছিস বলে ইন্টারে গা ভাসিয়ে দিস না যেন! ইন্টারে কিন্তু হিউজ পড়া, সময় কম। এসএসসির মতো এতো সময় পাবিনা, মাত্র আঠারো মাস সময়! আর যেহেতু সাইন্স নিয়ে পড়বি, তাই বি কেয়ারফুল। আর হ্যাঁ মুখস্থ নয়, মন দিয়ে বুঝে বুঝে পড়বি কেমন! আসি তাহলে।

আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে চেয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। তারপর ভারী গলায় বললাম

-‘ কথা দিলাম, ভালোভাবেই পড়াশোনা করব। তবে একটা কথা। আমায় না সারপ্রাইজ দেওয়ার কথা ছিল, এটাই কি তবে আমার সারপ্রাইজ?

আমার কথায় মলিন হেসে সে বলল

-‘ তবে তুই যা ভাবছিস তাই।

তার কথায় হাসলাম শুধু। কন্ঠে কিছুটা বিষাদ ঢেলে বললাম

-‘ আপনার সারপ্রাইজে আমি সত্যিই সারপ্রাইজড। এমন সারপ্রাইজ আমি সারাজীবন মনে রাখব ভাইয়া।

আমার কথার পিঠে আর কোনো কথা বাড়ায় না সে। শুধু এক চিলতে হাসি উপহার দিয়ে নিজের গন্তব্যের পথে পা বাড়ায় সে। পেছনে আর ফিরেও তাকায় না সে।

আদ্রিশ ভাইয়া চলে যেতেই মামনি কেঁদে ওঠেন। সামলে নিলাম মামনিকে। নিজেকেও ধাতস্থ করে নিলাম। মনে মনে পণ করলাম পড়াশোনাটা ভালোভাবেই করব আমি। পরিশ্রমীরা কখনো হেরে যায় না। আমি হবো সেই পরিশ্রমী ব্যক্তি। নিজের লক্ষ্যকে স্থির রেখে সে পথেই পদার্পণ করব। যত বাধা বিপত্তিই আসুক না কেন আমি পারব, আমায় পারতেই হবে! সম্পর্কের গুরুত্ব বুঝতে মাঝে মাঝে দূরত্বেরও প্রয়োজন পড়ে। আমাদেরও দূরত্বের সত্যিই প্রয়োজন ছিল। নইলে কেউ-ই হয়তো আশানুরূপ ফলাফল পেতাম না। আবারও দেখা হবে। ভাগ্য সহায় থাকলে ভালোকিছুই হবে ইনশাআল্লাহ।

#চলবে~

#হৃদয়ে_লাগিল_দোলা 🫶
#নুসাইবা_জান্নাত_আরহা
#পর্ব২৭

চোখের নিমেষেই জীবন থেকে চলে গেছে আড়াইটা বছর! এই আড়াই বছরে বদলেছে অনেককিছুই। সেই ছোট্ট মেহু বড় হয়েছে এখন। চঞ্চলতা ছেড়ে এখন কিছুটা শান্ত হয়েছে তবুও তার চঞ্চলতার আধিপত্যের দেখা মেলে। এদিকে অরনীরও বিয়ে হয়ে গেছে প্রায় মাস খানিক হতে চলল! প্রণয়ের সম্পর্কের থেকেই তা রূপ লাভ করে বৈবাহিক সম্পর্কের। আরাভের সাথে প্রণয় থাকলেও পারিবারিক ভাবেই বিয়েটা হয়েছিল তাদের।

জানালার ধারে দাঁড়িয়ে এতোক্ষণ যাবত এসব ভাবছিলাম আমি। মনের কোণে নানান রকম চিন্তারা আঁতিপাঁতি করছে। আজ ইন্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হবে আমার! এসএসসির মতো ইন্টারেও জিপিএ ফাইভ পেয়েছিলাম তবে গোল্ডেন হয়নি। বায়োলজিতে প্লাস মিস করেছিলাম। আর তাছাড়াও আমি বরাবরই ম্যাথে ভালো। তাই মেডিক্যাল বাদ দিয়ে ইন্জিনিয়ারিং এ পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভাগ্য সহায় থাকলে চান্স হতেও পারে আবার না-ও পারে।

কাঁধে কারও শীতল স্পর্শে পেতেই একপলক চাইলাম সেদিক পানে। তপ্ত শ্বাস ফেলে পাশে থাকা ব্যক্তিটি বলে উঠল

-‘ টেনশন করছিস না মেহু। ইন্জিনিয়ারিং এ টিকে যাবি দেখিস।

আমি নির্বিকার দাঁড়িয়ে রইলাম শুধু। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে ব্যক্তিটি এবার আমায় নিজের দিকে ফিরিয়ে, আমার গালে দুহাত ঠেকিয়ে বলল

-‘ আমার উপরে এখনও রেগে আছিস বুঝি?

তার প্রশ্নের কোনো প্রকার জবাব না দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। আমার এমন ব্যবহারে মানুষটা ব্যথিত হয় ভীষণ। ভারী কন্ঠে তাই পুনরায় সে বলে উঠল

-‘ আমাদের ভালোর জন্যই তো এমন ডিসিশন নিতে হয়েছিল তখন। একবার ভেবে দেখ আমি এখানে থেকে গেলে তুই কি কোনোভাবে পড়াশোনায় কর্নসার্নট্রেট করতে পারতিস আর না আমি পারতাম। এতোকিছুর পরেও ভুল বুঝলি আমায়?

আমি তবুও নির্বিকার চিত্তে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। আপাতত অনর্থক বাক্যচয়নে অনিচ্ছুক আমি।

এরই মাঝেই কোথ থেকে ছুটে এসে আলভি ভাইয়া বেশ উচ্ছ্বাসের সহিত বলে উঠল

-‘ তোমরা সবাই দেখো আমাদের মেহু চান্স পেয়ে গেছে!

এই একটা কথা শুনতেই অনেক বেশি উৎফুল্ল হয়ে পড়লাম আমি। ছুটে গিয়ে জাপটে ধরলাম আলভি ভাইয়াকে। আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ভাইয়া বলে উঠল

-‘ বলেছিলাম না মেহু, তুই চান্স পাবি। ভাই হিসেবে আমার আজ ঠিক কতটা গর্ব হচ্ছে বলে বোঝাতে পারব না তোকে! আমার বোনটার আজ থেকে নতুন পরিচয় যুক্ত হলো তবে!

হেসে ফেললাম আমি। আজ আমি ভীষণ খুশি। আজকের এই দিনটার জন্যই তো অপেক্ষার প্রহর গুণতাম। অবশেষে অবসান ঘটল তবে!

মা, বাবা, চাচ্চু, মামনি খুশি হলো ভীষণ। মা আমায় জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। কান্নার সুরে বললেন

-‘ এই দুই আড়াই বছর তুই যে পরিশ্রমটা করেছিলি, আমি সবসময় তোর জন্য দোয়া করতাম মা। যেন ভালোকিছুই হয় আমার মেয়েটার সাথে। আর আজ সেই আনন্দের দিনটা দেখতে হলো। আমার লক্ষ্মী মেয়েটা। জীবনে অনেক বড় হবি মা!

আর বাবা তো খুশিতে বলেই বসলেন, ‘আমার মেয়ে আমার গর্ব।’

মা বাবা দুজনকেই খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম আমি। আজ আমার চোখেমুখে প্রাপ্তির আনন্দ! সবাই শুধু আমার এই সাফল্যটাই দেখবে কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকা আমার কষ্টগুলো, কতটা ঝড় ঝঞ্জা বয়ে গেছে আমার উপর দিয়ে তা কখনো কেউ দেখবে না। চার দেয়ালের মাঝে আঁটকা পড়ে থাকা আমার চাঁপা আর্তনাদগুলো কেউ খতিয়ে দেখবে না। সবাই আমার বাইরের রূপটাই দেখবে ভেতরের ক্ষতগুলো নয়!

আদ্রিশ ভাইয়া এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলল

-‘ কংগ্রাচুলেশনস মেহু! বেস্ট উইশেস ফর ইউ!

তার কথায় এক পলক তাকিয়ে আবারও চোখ ফিরিয়ে নিলাম আমি। স্বার্থপরের মতো যে মানুষটা কিছু না বলেই চলে যেতে পেরেছিল, তার সাথে আর কি কথা থাকতে পারে আমার? হোক সে ভালোর জন্যই কিন্তু আমায় একটাবার বলে যেতে তার কিসে বিঁধেছিল।

পরবর্তীতে অবশ্য আদ্রিশ ভাইয়া বিসিএস দিয়েছিল পাশাপাশি এফসিপিএস ডিগ্রিও অর্জন করেছিল। এখন একটা সরকারি হাসপাতালে সে জয়েন করেছে।

যথারীতি বাবা, চাচ্চু আর আলভি ভাইয়া মিলে মিষ্টির দোকানে চলে যায়। মা আর মামনি যায় সংসারের হেঁশেল সামলাতে। আর ওদিকে রিশতা এখন ভার্সিটি কোচিং-এ ব্যস্ত। ড্রয়িং রুমে শুধু আমি আর আদ্রিশ ভাইয়াই পড়ে রইলাম।

নিরবতা ঠেলে আমার দিকে এগিয়ে এসে আদ্রিশ ভাইয়া ভারী গলায় বলে উঠল

-‘ সবই তো ঠিক ছিল তবে আজ কেন এতো দূরত্ব?

-‘ আপনি নিজেই এই দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন, আমি নই!

আমার সোজাসাপ্টা উত্তর। আদ্রিশ ভাইয়া হোঁচট খায় আমার এহেন জবাবে।

-‘ আচ্ছা দূরত্ব যখন আমিই তৈরি করেছি তখন আমিই নাহয় মিটিয়ে দিব। তবুও ভুল বুঝিস না আমায়।

অস্ফুটস্বরে উক্ত কথাগুলো আওড়ালেও শুনতে অসুবিধে হয়না আমার। তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বাঁকা হাসলাম শুধু। এবার আমি বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললাম

-‘ চিন্তা নেই, আপনার জন্য এবার একটা লাল টুকটুকে বউ নিয়ে আসব আমি। হাজার হোক আমাদের ডাক্তার ভাইয়া বলে কথা। তো এমন ডাক্তার ছেলের জন্য মেয়ের অভাব পড়বে না এটলিস্ট! দরকার পড়লে বিজ্ঞাপন রটিয়ে দিব। তবুও আপনার জন্যে আমি লাল টুকটুকে বউ এনেই তবে ছাড়ব!

হুট করে আমার এহেন কথায় আদ্রিশ ভাইয়া বোকা বনে যায়। তার মুখের এমন শ্রী দেখে আমার হাসি পায় ভীষণ। এ কয়দিনে উঠতে বসতে যে পরিমাণে ঠ্যাস মেরেছি, বেচারা ভুল স্বীকার করতে বাধ্য! তবুও চোখেমুখে কাঠিন্যতা বজায় রেখে বসে রইলাম আদ্রিশ ভাইয়ার উত্তরের অপেক্ষায়। আদ্রিশ ভাইয়া এবার গলা ঝেড়ে থমথমে গলায় বলল

-‘ বাহ্ আমার ডায়লগ আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছিস! আচ্ছা সময়মতো আমিও দেখে নিব।

এতোটুকু বলেই বাইরে চলে যায় সে। আমি হেসে ফেললাম এবার। ফোনটা হাতে নিয়ে আহিরকে ফোন দিলাম। ফোনের অপর প্রান্ত হতে ভেসে এলো

-‘ আরে মেহুবুড়ি যে কি অবস্থা তোর?

-‘ ভাই কুয়েটে এ চান্স পেয়েছি আমি! ভালোই হয়েছে বাড়ির মেয়ে বাড়িতেই থাকতে পারব, দূরে কোথাও যেতে হবেনা আমার।

-‘ ওয়াট অ্যা গুড নিউজ! কংগ্রাচুলেশনস সিস! এবার আমার পালা। দোয়া কর যেন এক চান্সেই ঢাকা ভার্সিটিতে হয়ে যায়।

আরও কিছুক্ষণ ভাব বিনিময় করে ফোন রেখে দিলাম আমি। বেশ কিছুক্ষণ পর আমার কথামতো আহির এসে হাজির হয় আমাদের বাসায়। এর মাঝে রিশতাও ফিরে আসে। দুজন দুজনকে দেখে বেজায় খুশি হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, ওদের মাঝে দুই বছরের প্রেমের সম্পর্ক চলছে! সবার জীবনেই তো প্রণয়ের বসন্ত নেমে এলো, আমার জীবনটাই কেন এমন অঁমানিশার আঁধারে ছেয়ে গেল তবে!

তিনজন মিলে বেশ অনেকক্ষণ যাবত আড্ডা দেওয়ার পর তাড়া দেখিয়ে আহির উঠে যায়। ওকে আরও কিছু সময় বসতে বললাম কিন্তু বসল না ও।

আহিরকে বিদায় দেওয়ার জন্য এগিয়ে এলাম। যাওয়ার পূর্বে হাসতে হাসতে বলে বসল

-‘ আমি কিন্তু আবারও আসব তবে জামাই সেজে!

আমি, রিশতা হেসে ফেললাম দুজনেই তবে রিশতা হয়তো কিছুটা লজ্জা পেয়েছিল। আহিরও মাথা চুলকে হেসে ফেলে। এরই মাঝে আদ্রিশ ভাইয়া ফিরে আসে। আমাদের দিকে সে ভ্রু কুচকে চেয়ে রইল খানিক সময়।

আচমকা বলিষ্ট হাতের শক্ত বাঁধনে আমার কোমল হাত আঁকড়ে ধরে আদ্রিশ ভাইয়া। চোখমুখ শক্ত করে চেয়ে থাকে আমার পানে। ওনার এহেন অবস্থা দেখে বুঝতে বাকি রইল না আমার। আগুনে ঘি ঢালার উদ্দেশ্যে তাই বাঁকা হেসে বললাম

-‘ পছন্দ হয়নি আপনার জামাইবাবুকে?

-‘ রাখ তোর জামাইবাবু। ঘাট হয়েছে আমার! আর জীবনে কোনদিনও আমি মনের ভুলেও ওসব উল্টা পাল্টা বকবো না আর না ওসব ছাইপাঁশ অভিনয় করব। বহুত নাটক হয়েছে আর না।

চিবিয়ে চিবিয়ে এতোটুকু বলে থামল সে। আমি কুটিল হাসলাম শুধু। অনেক জ্বালিয়েছ, এখন বোঝ কেমন লাগে! তবে আমার এই হাসি বেশিক্ষণ স্থির হলো না, আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে সে বলল

-‘ তোকে নিয়ে আর কোন রিস্ক নিতে চাই না আমি। এবার একটা হেস্তনেস্ত করে তবেই ছাড়ব!

ওরা চলে যেতেই আহির আর রিশতা হাতে হাত মিলিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল। রিশতা এবার বাঁকা হেসে বলল

-‘ মেহু তুই বোধহয় আজ শেষ!

#চলবে~