হে সখা পর্ব-২৭+২৮+২৯

0
96

#হে_সখা
#অক্ষরময়ী
সপ্তবিংশ পর্ব

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষটির একপাশে বিশালাকার জানালা। সেখান থেকে মস্ত বড় আকাশ দেখা যায়। ভূমিতে বিস্তৃত বালুরাশি। অনেক অনেক দূর পেরিয়ে সমুদ্রের নীল জলরাশি উঁকি দিচ্ছে। রেহবার অস্থিরভাবে রুমের এপাশ থেকে ওপাশে হাটাহাটি করে, জানালাটির সামনে গিয়ে স্থির হলো। ঘড়ির কাঁটা যেনো আজকে খানিক বিশ্রাম নিতে চাইছে। প্রতিটি মিনিট ঘন্টার সম পরিমাণ মনে হচ্ছে। ডা. রুবাইয়া রানুর ডেস্কের অপরপাশে একটি মনিটরের স্ক্রীনে হলরুমের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখা যাচ্ছে। যেখানে গুলিস্তা ও ডা. রুবাইয়া রানুকে দেখা গেলেও তাদের মধ্যকার কথোপকথন শোনা যাচ্ছে না। জানালার একপাশে দাঁড়িয়ে রেহবার আড়াআড়ি ভাবে চোখ রাখলো স্ক্রীনের দিকে। গুলিস্তার অস্থিরভাবে সিড়ির দিকে তাকানো, রেহবারের জন্য ওর প্রতিক্ষা রেহবারকে স্থির থাকতে দিচ্ছে না। ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে ভীতু মেয়েটাকে বুকের মাঝে আগলে নিতে। ভয় কীসের আমি আছি তোমার পাশে। কিন্তু পাশে যাওয়া বারণ। রেহবারের পা দুটো যেনো নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। কখন যেনো এই বদ্ধ কক্ষ ছেড়ে ছুটে যায় তার মুষড়ানো ফুলের কাছে বলা যাচ্ছে না। রেহবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। মেঘেরা উড়ে চলে যাচ্ছে দূর দেশে। ওদের ছুটে চলা দেখতে দেখতে সময় কেটে গেছে অনেকখানি। ক্লান্ত দৃষ্টি ফিরিয়ে স্ক্রীনের দিকে তাকাতেই মনে হলো কেউ বুকের ভেতর থেকে টান দিয়ে হৃদপিন্ড ছিনিয়ে নিলো। দরজা খুলে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গুলিস্তার কাছে চলে এলো। ততোক্ষণে রানু দু হাতে আগলে নিয়েছে ওকে। ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে গুলিস্তার বেদনাক্রান্ত করুন মুখটি দু হাতের মাঝে নিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জানতে চাইলো ,
– কি হয়েছে ওর?

রানুর ডাকে ততোক্ষণে হাসপাতাল কতৃপক্ষ হতে ওয়ার্ডবয় স্ট্রেচার নিয়ে হাজির হয়েছে। এমন জটিল পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে অভিজ্ঞ রানু দিশেহারা হলো না।
– ওকে রুমে নিয়ে যেতে হবে। তেমন কিছু হয়নি। ডোন্ট প্যানিক।

রেহবার নিজেকে ধাতস্থ করে গুলিস্তাকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে বললো,
– কোথায় নিয়ে যেতে হবে বলুন। আমি নিয়ে যাচ্ছি।

ডা. রুবাইয়া রানুর কেবিনে বসে রেহবার নিজের অস্থির মনকে শান্ত করার চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই শান্ত হতে পারছে না। হার্ট বিট অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পানির গ্লাস রেহবারের দিকে এগিয়ে দিয়ে রানু বললো,
– আপনি শান্ত হয়ে বসুন। গুলিস্তা এখন একদম সুস্থ আছে।

পানির গ্লাসে ধীরে চুমুক দিয়ে নিজের শুকনো গলা ভিজিয়ে নিয়ে রেহবার জানতে চাইলো,
– হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেললো কেনো?
– প্রচন্ড মানসিক চাপের কারনে এমন হয়। আমার সাথে কথা বলার সময় গুলিস্তার হয়তো ছোটবেলার কথা মনে পরেছিলো। আপনার কাছে যেটুকু শুনেছি, তা থেকে ধারণা করা যাচ্ছে চাইল্ডহুড ট্রমা থেকেই গুলিস্তার সমস্যার শুরু। ওকে এই সমস্যা থেকে বের করে আনতে আবার সেই শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ব্যাপারটা ওর জন্য অনেক যন্ত্রণাদায়ক হতে চলেছে। আপনাকেও মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। এতো তাড়াতাড়ি ভেঙে পরলে চলবে?
– হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে গেলো তো, ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
– এখনো ভয় পাচ্ছেন। স্ত্রীকে খুব ভালোবাসেন?

রেহবারের মুখে গর্বের হাসি। স্ত্রীকে ভালোবাসার মতো কাজটি নিজেকে যেমন প্রশান্তি দেয়, তেমনি অন্যের চোখে নিজের জন্য সম্মান দেখার সুযোগও পাওয়া যায়।

– আপনাদের রিলেশনের বিয়ে? কতো দিনের চেনাজানা?
– উহু। পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছে। মায়ের পছন্দ।
– ইন্টারেস্টিং! মায়ের পছন্দের পাত্রীকে এতোটা ভালোবেসে ফেললেন! বিয়ের কতোদিন হলো?
– এখনো এক বছর হয়নি।

কথায় কথায় রেহবার কিছুটা স্বাভাবিক হলো। কাউন্সিলিং এর জন্য পরবর্তী শিডিউল ও মেডিসিন নিয়ে রেহবার ফিরে গেলো গুলিস্তার কক্ষে। হাসপাতালের সাদা বেডশীটের উপর ঘুমিয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে দুঃখিনী রাজকন্যা। সমুদ্র তীরের বেপরোয়া বাতাসে গুলিস্তার খোলা চুলগুলো চঞ্চল হয়ে উঠেছে। ঢেকে দিচ্ছে শুভ্র ক্লান্ত মুখটি। রেহবার খুব ধীরে বিনা শব্দে গুলিস্তার পাশে বসলো। মুখের উপরে পরে থাকা চুলগুলো সযত্নে সরিয়ে দিয়ে অপলক চেয়ে রইলো মুখের পাণে। গুলিস্তার একটি হাত তুলে নিজের দু হাতের মাঝে চেপে রেখে ভাবতে লাগলো। নির্যাতিত অতীতের বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোতে ফিরে যেতে গুলিস্তার ঠিক কতোখানি কষ্ট হচ্ছে। ছোটবেলায় অনেক অনুভূতির সাথে পরিচয় ছিলো না। অন্যায় হতে দেখেও বুঝার ক্ষমতা না থাকায় সেগুলো কম যন্ত্রণা দিয়েছিলো। কিন্তু এখন গুলিস্তা একজন প্রাপ্তমনস্ক নারী। সেই অবুঝ শিশুটি আর নেই। সীমা বেগমের দ্বারা নির্যাতিত শিশুটির সাথে হওয়া প্রতিটি অন্যায় গুলিস্তা এখন বুঝতে পারবে। প্রতিটি ক্ষত তাকে যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি দিবে। কারণ অনুভূতিগুলো এখন সে বুঝতে শিখেছে। ছোটবেলার থেকেও কয়েকগুন বেশি মানসিক কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে হবে ঠুনকো এই মেয়েটিকে। হতাশাগ্রস্থ গুলিস্তাকে আগলে রাখার দায়িত্ব রেহবারকেই নিতে হবে। কিন্তু রেহবার, সে কি তৈরী?

গুলিস্তা খানিকটা নড়েচড়ে উঠলো। ভাবনার অতল সাগর থেকে রেহবার ফিরে এলো বাস্তবিকতায়। গুলিস্তার গালে হাত রেখে ধীরে ধীরে ডাকলো,
– ফুল, উঠো। বাড়ি ফিরতে হবে।

চোখে খুলে অপরিচিত পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগলো। অচেনা কক্ষ, অপরিচিত পরিবেশে একমাত্র পরিচিত রেহবার। গুলিস্তার স্বস্তি, আশ্রয়স্থল। উঠে বসতে নিলে রেহবার ওর হাত ধরে বসতে সাহায্য করলো।
– কেমন লাগছে এখন?
– ভালো।

পাশে রাখা গ্লাসটি নিয়ে গুলিস্তাকে পানি খেতে দিলো। এখানে কীভাবে এলো ঠিকঠাক মনে করতে পারছে না গুলিস্তা। ওর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে রেহবার নিজেই বললো,

– হঠাৎ মাথা ঘুরে পরে গিয়েছিলে। দীর্ঘ জার্নি সেই সাথে শারীরিক দূর্বলতার কারনে এমন হয়েছে। চিন্তার কিছু নেই। বেশি করে খেতে হবে এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। চলো, বাড়ি ফেরা যাক।

গুলিস্তার বেশি কিছু মনে পরছে না। রানুর সাথে কথা বলছিলো এরপর মাথার ভেতর তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো। আর কিছু মনে নেই। মনে করার চেষ্টা করলে আবার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যাচ্ছে। সে বেশি চেষ্টা করলো না।

ফ্লোরিডার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় শহর ভেনিস। পুরাতন ফ্লোরিডার ভাইব পাওয়া যায় এই শহরটিতে। আম্বিয়া খাতুনের বড় ভাই ইমতিয়াজ মামুন পেশায় একজন ইঞ্জিনিয়ার। রুয়েট থেকে কম্পিউটার সাইন্স নিয়ে পড়াশোনা করার পর কয়েক বছর ঢাকায় একটি বেসরকারী আইটি কোম্পানিতে চাকুরী করেছিলেন। সেখানে প্রমোশন পেলে উনাকে রেফার করা হয় ফ্লোরিডার একটি আইটি কোম্পানিতে। ইমতিয়াজ মামুন অনেক কয়েক বছর ধরে ফ্লোরিডায় বসবাস করছেন। স্ত্রী সায়ীদা জামান এর সাথে সেই যে দেশ ছাড়লেন তারপর আর ফিরে যাওয়া হয়নি। এখানেই জন্ম নেয় উনাদের দুই ছেলে-মেয়ে ইমরাজ ও ইমু। ওরা ফ্লোরিডা শহরে একটি স্কুলে পড়াশোনা করে। ইমরাজ গ্রেড এলিভেনে ও ইমু গ্রেড টেনে। পিঠাপিঠি দু ভাই-বোনের অবস্থান এখন স্কুল ডরমেটরিতে। ছুটি পেলে দুজনে ছুটে চলে আসে বাবা-মায়ের কাছে। কয়েক বছর আগে ইমতিয়াজ মামুন হলিউড বিচ এরিয়ার একটি বাড়ি কিনেছেন। অর্থের প্রয়োজনে বাড়ির মালিক দ্রুত বাড়িটি বিক্রি করতে চাইছিলেন। কম দামে পেয়ে ইমতিয়াজ মামুন নিজের সমস্ত পুঁজি দিয়ে কিনে নিয়েছেন বিলাস বহুল বাড়িটি। সমুদ্র পাড়ের মনোরোম পরিবেশ সেই সাথে বিশাল অঙ্কের বাড়ি ভাড়া থেকে মুক্তি পাওয়ায় তিনি এখন নিশ্চিন্তে দিন কাটাচ্ছেন। বাকিটা জীবন যে টুকু আয় করবেন, ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখবেন। কটেজ আকৃতির বাড়িটিতে সব মিলিয়ে ছয়টি বেডরুম। অথচ উনারা দুজন মানুষ এখানে বাস করেন। ইমতিয়াজ মামুনের সারাদিন কেটে যায় অফিসে। বাড়িতে সায়ীদা একা। রাহিল যখন পড়াশোনা করার জন্য ফ্লোরিডায় আসতে চাইলো ইমতিয়াজ মামুন তাকে অন্য কোথাও বাড়ি ভাড়া করতে দিলেন না। মামার জেদের কাছে হার মেনে রাহিলকে ব্যধ্য হয়ে এখানেই থাকতে হচ্ছে। যদিও এখান থেকে কলেজ যেতে প্রায় দু ঘন্টা সময় লেগে যায়। ভাগ্য ভালো তাই কলেজের নিজস্ব ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসে আসা যাওয়াটা সহজ হয়ে গিয়েছে। এছাড়া এই বাড়িটি কটেজ আকৃতি হওয়ায় প্রাইভেসির কমতিও হয় না। তিনটি কটেজ একে অপরের সাথে সংযুক্ত। প্রতিটি কটেজে দুটো করে বেডরুম। আম্বিয়া খাতুন ও রাহিল মাঝখানের কটেজে থাকেন। প্রবেশ পথের কটেজে ইমতিয়াজ ও সায়ীদা থাকে। ইমু ও ইমরাজ যে অংশে থাকতো সেখানের একটি কক্ষ দেওয়া হয়েছে রেহবার ও গুলিস্তাকে। বাড়ির শেষের অংশটি এমনিতেই নিরিবিলি। পেছনের দিকে একটি খোলা বারান্দা রয়েছে। কাচে ঘেরা বারান্দাটি থেকে সমুদ্র পাড় দেখা যায়।

রেহবারের গাড়িটি ডানে ঘুরে মনরো স্ট্রিটে প্রবেশ করলো। গুলিস্তা তখনো রেহবারের কাধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলো। রেহবার তাকে ডেকে দিলো। হলিউড বিচের বিখ্যাত ব্লু মিকি হাউস এর পাশের বাড়িটিই ইমতিয়াজ মামুনের। ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করতেই আম্বিয়া খাতুনের দুর্ভাবনাগ্রস্থ মুখটির দেখা মিললো। তিনি গুলিস্তাকে দেখে এগিয়ে এলেন। মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন,
– সেই কখন বেড়িয়েছো, এখনো কিছু খাওনি নিশ্চয়ই। দ্রুত হাত মুখ ধুয়ে এসো।

ড্রয়িং রুমে বসে সায়ীদা মুভি দেখছিলেন। রেহবার ও গুলিস্তাকে দেখে বললেন,
– তোমরা এসে গেছো! তোমাদের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়েছি।

কথায় আছে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। বাঙ্গালির হয়েছে সেই স্বভাব। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে চলে গেলেও বাঙালি ভাতকে ছাড়তে পারে না। খাবার হিসেবে তাদের ভাত আর মশলা মিশ্রিত তরকারী চাই, চাই। গুলিস্তা ও রেহবারের জন্য আম্বিয়া খাতুন নিজে হাতে রান্না করেছেন। আলু ও টমেটো দিয়ে মাছ, বেগুন ভাজি, ঢেঁরস এর ঝাল সেই সাথে গরম ভাত। রেহবার ও গুলিস্তা যতোক্ষণ খেলো আম্বিয়া খাতুন পাশে বসে রইলেন। ছেলেকে পাশে বসিয়ে নিজে হাতে তুলে খাওয়ানো হয় না অনেকদিন। দুপুরের খাবার শেষ করে গুলিস্তার হাতে রেহবার কিছু ঔষধ ধরিয়ে দিলো। গুলিস্তা যেহেতু প্রশ্ন করবে না তাই রেহবার নিজে থেকে বললো,
– মাথা ঘুরে পরে গিয়েছে। শরীর ভীষণ দূর্বল। ডাক্তার কিছু মেডিসিন পেসক্রাইব করে দিয়েছে। এগুলো খেতে হবে।

গুলিস্তা বিনাবাক্যে বড় বড় কয়েকটা ঔষধ গিলে ফেললো। মিথ্যে বলতে রেহবারের খারাপ লাগছিলো কিন্তু এছাড়া উপায় নেই। ঔষধগুলো ডা. রুবাইয়া রানু গুলিস্তাকে খাওয়াতে বলেছেন। যেহেতু গুলিস্তার সমস্যা অনেকদিন ধরে তাই শুধুমাত্র কাউন্সিলিং করে সুস্থ হওয়া সম্ভব নয়। মানসিক অস্থিরতার সাথে লড়াই করতে এই ঔষধগুলো সাহায্য করবে। ঔষধ খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই গুলিস্তা ঘুমিয়ে গেলো।

ওর গায়ে কম্ফোটার দিয়ে এসির তাপমাত্রা খানিকটা নামিয়ে দিয়ে কক্ষ থেকে রেহবার বেরিয়ে এলো। আম্বিয়া খাতুন তখনো অস্থিরভাবে পায়েচারি করছিলেন। রেহবারকে দেখে দ্রুত এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন,
– ডাক্তার কি বললো?

পুরো ঘটনা বর্ণনা করার পর রেহবার বললো,
– অনেকদিন ধরে পুষে রাখা রোগ। একটু সময় তো লাগবে। কিছু মেডিসিন দিয়েছে। সেই সাথে কাউন্সিলিং চলবে।
– কীভাবে কি করবি, কিছু ভেবেছিস? ওখানে অফিস রেখে এতোদিন কীভাবে থাকবি?
– বুঝতে পারছি না, মা। অন্তত বছর খানিক কাউন্সিলিং চালিয়ে যেতে হবে।
– গুলিস্তাকে এখানে রেখে তুই ফিরে যেতে পারতি৷ কিন্তু তোকে ছাড়া ও এখানে থাকবে না। তুই আবার ওকে কিছু জানাতেও দিচ্ছিস না।
– আমি ভাবছি, বছর খানিকের জন্য এখানেই থেকে যাই।
– আর তোর কোম্পানি?
– কোম্পানি তো এখন গ্রো করে গেছে। সেল করে দিলে ভালোই প্রফিট পাওয়া যাবে।
– সেল করে দিবি? তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? ওটা তোর স্বপ্ন। রাত দিন এক করে, কতো পরিশ্রম করেছিস কোম্পানিটাকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য। এখন বিক্রি করার বলছিস কীভাবে? কোম্পানি বিক্রি করে দিয়ে কি করবি?
– আমার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে। চাকরির অভাব হবে না। মামার সাথে কথা হয়েছে। উনার কোম্পানিতে মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে জয়েন করতে পারবো। যথেষ্ট ভালো পোস্ট। হ্যান্ডসাম সেলারি।
– সিলেট ছেড়ে, নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে এক সপ্তাহ থাকতে পারিস না। এক বছর এখানে থাকতে পারবি?
– পারতে হবে, মা। কষ্ট হবে তবুও ওর মুখের দিকে চেয়ে মানিয়ে নিবো। তুমি শুধু আমার পাশে থেকো।

এই মুহুর্তে আম্বিয়া খাতুনের নিজের উপরেই রাগ লাগছে। তিনি নিজে হাতে ছেলের গোছানো জীবনটা এলোমেলো করে দিয়েছেন। কখনো কখনো গুলিস্তার উপর ভীষণ রাগ হয়। কিন্তু পরমুহূর্তে ওই পবিত্র, মায়াবী মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে তিনি শিউরে উঠেন। ভাগ্যিস রেহবারের সাথে গুলিস্তার বিয়ে দিয়েছিলেন। তা না হলে অন্য কারোর ঘরের বউ হতে হতো গুলিস্তাকে। তারা কি মানসিক ভাবে ভেঙে পরা মেয়েটিকে মেনে নিতো? কখনোই নিতো না। সবাই সর্বগুণসম্পন্ন একজন জীবনসঙ্গী খোঁজে। আর যখন বাড়ির বউ এর কথা আসে তখন তো রুপে, গুনে ধন-সম্পদে দূর্গা রুপে লক্ষ্মীর প্রত্যাশা করে। গুলিস্তার ভাগ্যে অসম্ভব ভাবাপন্ন নির্যাতন জুটতো। হয়তো খুব বেশিদিন শ্বশুরবাড়িতে জায়গাও হতো না। ফিরে যেতে হতো ইহজগতের জাহান্নাম রুপী বাপের বাড়িতে। সেখানে সবাই মিলে তার জীবনটা নরক বানিয়ে ফেলতো। ধীরে ধীরে তাকে ঠেলে দিতো আত্মহত্যার দিকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আম্বিয়া খাতুন আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। তার কাছে শুধু একটাই আবদার, সংগ্রামের এই পথ যেন তিনি সহজ করে দেন।

(চলবে…)

#হে_সখা
#অক্ষরময়ী
অষ্টাবিংশ পর্ব

ধিমে হয়ে আসা বিকালে গুলিস্তাকে নিয়ে বীচে হাঁটতে বেড়িয়েছে রেহবার। ডা. রুবাইয়া রানুর দেওয়া মেডিসিন খাওয়ার পর থেকে গুলিস্তার বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটে। যেটুকু সময় জাগ্রত থাকে, মনমরা হয়ে ডুব দেয় নিজস্ব জগতে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিশাল সমুদ্রের নীল জলরাশিতে কিছু একটা খোঁজে। গুলিস্তার নিজস্ব জগতে রেহবারের কোনো অস্বস্তি নেই। রেহবারের ফুলটি ধীরে ধীরে রেহবারের থেকে আরও দূরে চলে যাচ্ছে। কিছুদিন পূর্বেও যে মেয়েটি রেহবারের আগে পিছে ঘুরাঘুরি করতো, রেহবারের প্রয়োজনে সদা উউপস্থিত থাকতো সে এখন রেহবারের দিকে ফিরেও চায় না। রেহবার নিজেও ওকে বিরক্ত করে না। দূর থেকে লক্ষ্য করে শুধু। গুলিস্তার সান্নিধ্য রেহবারের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাইতো কাছে থেকেও মনের এ দূরত্ব রেহবারকে ভীষণ যন্ত্রণা দিচ্ছে। তাই তো আজ জোর করেই গুলিস্তাকে সাথে নিয়ে হাঁটতে বেড়িয়েছে৷ হলিউড বীচের তপ্ত বালিতে খালি পায়ে হাঁটছে ওরা দুজন। এই সময় এপাশটায় তেমন ভীড় নেই। যেকজন দর্শনার্থীকে দেখা যাচ্ছে, তারা ক্লান্ত হয়ে শুয়ে আছে সমুদ্র তীরের কিটকটে। অপেক্ষা করছে প্রকৃতির আরেক সৌন্দর্য, সূর্যাস্তের। ঘন্টা খানিক পরে বিশাল সমুদের বুকে তলিয়ে যাবে কমলা রঙের দানবীয় সূর্যটা।

রেহবার ও গুলিস্তা নিশ্চুপ হাঁটছে৷ কারো মুখে কোনো কথা নেই। রেহবার মাঝেমধ্যে গুলিস্তার দিকে তাকিয়ে দেখছে। আজকাল ওর সাথে কথা বলতে কেনো যেনো অস্বস্তি হয়৷ হয়তো অপরাধবোধের কারনে এমন হচ্ছে। ওকে মিথ্যে বলে মেডিসিন খাওয়ানো, কাউন্সিলিং চালিয়ে যাওয়া৷ এসবের কারনে রেহবারের নিজের কাছে নিজেকে দোষী মনে হয়। এছাড়াও কোম্পানি সেল করা এবং ফ্লোরিডায় নতুন কোম্পানিতে জয়েন করার ব্যাপারেও অনেক ছোটাছুটি করতে হচ্ছে৷ সারাদিন বাইরেই কেটে যায়। ঘরে ফিরে গুলিস্তার নিঃপ্রাণ, মলিন মুখটা দেখে রেহবারের জীবনীশক্তি যেনো আরও ক্ষয়ে যায়। লড়াই করতে করতে সে নিজেও ক্লান্ত৷ দীর্ঘশ্বাস ফেলে গুলিস্তার হাতটি শক্ত করে ধরলো। গুলিস্তা ফিরে তাকালো না। পায়ের দিকে তাকিয়ে একধ্যানে হেঁটে যাচ্ছে। আলতো করে বালুর উপর পা ফেলতেই পা ডুবে যাচ্ছে বালুর ভেতর৷ মুহূর্তেই সেখানে তৈরি হচ্ছে অদ্ভুত সুন্দর এক শিল্পকর্ম।
কিছু দূর যাওয়ার পর গুলিস্তাকে একটি কিটকটে বসিয়ে রেহবার বললো,
– কিছুক্ষণ পরে সূর্য ডুবতে শুরু করবে৷ সমুদ্র তীরে সূর্যাস্ত অনেক সুন্দর দেখায়। তুমি এখানে বসো আমি দুটো ডাব নিয়ে আসছি। কোথাও যাবে না কিন্তু৷

গুলিস্তা মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। এমনিতে সে অনেক ক্লান্ত বোধ করছে। আজকাল সারাক্ষণ ক্লান্তি জাপটে ধরে থাকে। যখন তখন ঘুম পায়। যেটুকু সময় জেগে থাকে, ভীষণ অস্থির লাগে। কিটকটে গা এলিয়ে দিতেই চোখে আবার ঘুম নেমে এলো৷

– সমুদ্র তীরে এসে কেউ এভাবে ঘুমায়!

হঠাৎ নারী কন্ঠ কর্ণগোচর হতেই চমকে উঠলো। আবার সেই মেয়েটি! গুলিস্তা ভীষণ বিরক্ত হলো৷
– আপনি এখানে?
প্রশ্ন করে গুলিস্তা নিজেই অবাক হলো। সে কেনো অপরিচিত এই মহিলার সাথে আলাপ করছে? অযথা আগ্রহই বা কেনো দেখাচ্ছে? নিজেকে ভীষণভাবে শাসালো। এই মহিলার আশেপাশে থাকলে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। আর কোনো কথা বলা যাবে না। ভালো হয়, যদি এখান থেকে উঠে চলে যাওয়া যায়।

– আমি তো ঘুরতে এসেছি। ঘরবন্দী থাকতে ভালো লাগে না। তুমি এখানে বসে ঘুমাচ্ছিলে কেনো? ঘরে ঘুমানোর জায়গা পাচ্ছো না বুঝি?

গুলিস্তার ভীষণ রাগ হলো। এমনভাবে মজা করার কি আছে! একজন মানুষের ঘুম পেলে সে ঘুমাতেই পারে৷ কেনো যেনো আজকাল মেজাজ নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সে চোখ মুখ শক্ত করে সমুদ্র পাণে চেয়ে বললো,
– এখানে ঘুমালে সমস্যা কি?
– ঘুম পেলে ঘুমাতে হবে কেনো? নিজের উপরে তোমার নিয়ন্ত্রণ নেই? ঘুমানোর জন্য একটি বিশাল রাত রয়েছে। দিন রাত মিলিয়ে কতো সুন্দর একটি রুটিন। সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করতে হয়। ভোরবেলা ঘুম থেকে জেগে উঠা, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরা, তিনবেলা সময়মতো পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, কায়িকশ্রম করা। এই কাজগুলো প্রতিদিন নিয়ম অনুযায়ী করলে দেখবে শরীর ও মন দুটোই ভালো লাগবে। অথচ তুমি এই পড়ন্ত বিকেলে ঘুমাচ্ছিলে। আমার মা কি বলতো জানো? সূর্য ডোবার এই ক্ষণে ঘুমাতে হয় না৷ মাগরিবের ওয়াক্ত হলে তো বিছানাতেই বসতে দিতো না।

মায়ের প্রসঙ্গ আসতেই গুলিস্তা আনমনে বলে উঠলো,
– আমার মা কখনো এসব বলেনি।
– তাহলে তোমার মা তোমাকে কি বলেছে?
– আপনাকে কেনো বলবো?
হঠাৎ গুলিস্তার কি হলো কে জানে! ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ালো। অসহ্য লাগছে গায়ে পরা মহিলাটিকে। দূর থেকে আড়ালে দাঁড়িয়ে গুলিস্তার উপর নজর রাখছিলো রেহবার। গুলিস্তাকে উঠে যেতে দেখে সে দ্রুত এগিয়ে আসতে শুরু করলো। গুলিস্তার পরিবর্তনশীল আচরণে সে খানিকটা ভড়কে গেছে। আগে কখনো এভাবে রিয়েক্ট করতো না। কোনোকিছু না ভেবে বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছে কিন্তু বাড়ি চিনতে পারবে তো? খানিকবাদে গুলিস্তার পরবর্তী পদক্ষেপ রেহবারকে থেমে যেতে বাধ্য করলো।

কয়েক কদম এগিয়ে যাওয়ার পর গুলিস্তা থমকে দাঁড়িয়েছে। কি করতে যাচ্ছিলো সে! যাওয়ার আগে রেহবার কোথাও যেতে বারণ করে গিয়েছিলো। তাছাড়া রানুর সামনে থেকে ওভাবে চলে আসাও ঠিক হয়নি৷ খুব বেয়াদবি হয়ে গেলো। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো রানু হাসি মুখে ওর দিকে চেয়ে আছে। ধীর পায়ে ফিরে এসে আবার নিজের স্থানে বসে রইলো চুপচাপ। হালকা হেসে ওর দিকে একটি ডাব এগিয়ে দিলো রানু৷ হাত বাড়িয়ে সেটি গ্রহণ করলেও মুখে দিলো না। নিজের এলোমেলো আচরণ সামলাতে ভীষণ বেগ পেতে হচ্ছে। এর থেকে ঘুমিয়ে থাকাই শ্রেয়। মিনমিনে কন্ঠে জানতে চাইলো,

– আপনি আমার পেছন পেছন ঘুরছেন কেনো?
– পেছনে ঘুরছি কীভাবে বুঝলে?
কি উত্তর দিবে বুঝতে না পেরে গুলিস্তা চুপ করে রইলো। রানু আবার বললো,
– মাত্র দুবার দেখা হলো আমাদের৷ কাকতালীয়ও হতে পারে। কি, হতে পারে না?
– হুম।
– সেদিন তুমি সাইকোলজিস্ট এর কাছে কেনো গিয়েছিলে?

গুলিস্তার বেশ রাগ হলো। রানু বারবার একই কথা কেনো বলছে? সে তো এমন কারো কাছে যায়নি। বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করলো,
– সাইকোলজিস্ট এর কাছে কেনো যাবো? রেহবারের বন্ধু, মানে আমার হাসবেন্ডের বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সাইকোলজিস্ট আবার কে?

প্রশ্ন করে আবার নিজের উপর বিরক্তবোধ হলো। কথা বলতে বলতে অপরিচিত একজন মহিলাকে সব তথ্য দিয়ে দেওয়া নেহাৎ বোকামি। দু হাতে মুখ ঢেকে নিজেকে খানিকটা সময় দিলো। তারপর রানুর মুখোমুখি হয়ে বসে বললো,
– আমি আপনার সাথে আর কথা বলবো না। আপনি চলে যান এখান থেকে।

রানু তার মিষ্টি হাসিটি হেসে উঠলো। চতুর্দিকে যেনো কাঁচের চুড়ি রিনঝিন শব্দ করে বাজছে। গুলিস্তা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখলো। কারো হাসি এতো সুন্দর হতে পারে!
– এই সুযোগ গতদিনেই শেষ হয়ে গিয়েছে৷ এখন তুমি বললেও আমি যাচ্ছি না৷ তোমাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে৷

গুলিস্তার গালে লালচে আভা দেখা গেলো। সে আভা পড়ন্ত বিকেলের কমলা রঙের সূর্যের কারনে নাকি রানুর প্রশংসায় কারনে দেখা গেলো ঠিক বুঝা যাচ্ছে না।
– সাইকোলজিস্ট এর ব্যাপারে জানতে চাইছিলে না? যারা মানসিক রোগের চিকিৎসা করেন তাদের সাইকোলজিস্ট বলে। মানসিক রোগ হচ্ছে মনের রোগ। বুঝতে পেরেছো?
– মনের আবার রোগ হয়?
– কেনো হবে না! শরীরের রোগ হলে মনেরও রোগ হতে পারে। শরীর যেমন চিরন্তন সত্য, তেমনি মনও সত্য৷ আমাদের সকলের একটি মন আছে, এ কথা তুমি কি অস্বীকার করতে পারবে? এই যে আমরা বলি, আমার আজকে মন ভালো লাগছে না, মনটা অস্থির লাগছে৷ ভালো লাগা, খারাপ লাগা, আনন্দিত হওয়া, দুঃখ পাওয়া এসব কিছু তো আমাদের মন নিয়ন্ত্রণ করে। তুমি যদি মনকে অস্বীকার করতে চাও তাহলে অনুভূতিকেও অস্বীকার করতে হবে। আর যদি বলো, মন আছে তাহলে এটাও মানতে হবে মানসিক রোগও আছে। আমাদের সবার মধ্যে কখনো না কখনো মানসিক রোগ দেখা দেয়। কারো ক্ষেত্রে সেটি প্রবল আকার ধারণ করে। তখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়৷ কিছু রোগীর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কাউন্সিলিং এর মাধ্যমে মানসিক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এদের চিকিৎসা যারা করেন, তাদের সাইকোলজিস্ট বলা হয়। যাদের সমস্যা গুরুতর, শরীরের অভ্যন্তরীণ পরিক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়, তাদের শুধুমাত্র কাউন্সিলিং এর মাধ্যমে সুস্থ হয়না৷ এদের ঔষধের প্রয়োজন হয়৷ প্রপার ট্রিটমেন্ট, মেডিসিন এর মাধ্যমে যারা চিকিৎসা প্রদান করে তাদের সাইক্রিয়াটিস্ট বলে।
– আপনাকে দেখে অসুস্থ মনে হচ্ছে না।
– মানসিক রোগীদের বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না৷ মন কি বাইরে থেকে দেখা যায়, বলো? মনকে বুঝতে হয় মন দিয়ে।
– কীভাবে বুঝলেন আপনার মানসিক সমস্যা রয়েছে? মানসিক সমস্যা কি রকম?
– যেকোনো স্বাভাবিক বিষয়কে অস্বাভাবিক মনে হলেই বুঝবে কিছু একটা ঠিক নেই। আমরা হাসছি, কাঁদছি, ঘুরছি, ফিরছি, রাগ করছি, অভিমান করছি, ঝগড়া করছি, স্বপ্ন দেখছি এসব স্বাভাবিক ঘটনা। যখন দেখবে তোমার হাসতে ইচ্ছে করছে না, কান্না পাচ্ছে না, আনন্দ, দুঃখ, হতাশা কোনো কিছু তোমাকে ছুঁতে পারছে না। কোনো বিষয়ে, কোনো কিছুতে তুমি আগ্রহ খুজে পাচ্ছো না৷ তখন বুঝবে তোমার মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি হয়ে গেছে৷

রানুর কথাগুলো বেশ আগ্রহ নিয়ে শোনার পর গুলিস্তার মনে হলো সে যেনো অন্য কোনো গ্রহের প্রাণী। রানুর ভাষায় যেসব স্বাভাবিক, গুলিস্তার নিকট সেসব অস্বাভাবিক। বাতিল, নিষিদ্ধ, প্রত্যাহারকৃত এই অনুভূতিগুলো অনেক বছর আগে ফেলে আসতে হয়েছিলো। এখন তাদের কোথায় খুঁজে পাবে? আনমনে সে বলে উঠলো,
– তাহলে আমি তো আপাতমস্তক একজন অস্বাভাবিক মানুষ। মনের রোগী, মানসিক রোগী, উন্মাদ।

নির্লিপ্ত চেহারায় এমন ভারী কথাগুলো ভীষণ করুণ শোনালো। অথচ গুলিস্তার কোনো হেলদোল নেই৷ সমস্ত কথা যেনো ফুরিয়ে এসেছে। রানু নিজেও বুঝতে পারছে না, মেয়েটিকে আরেকটুখানি তাড়িয়ে বেড়ানো ঠিক হবে কি না। ওর মনে নিশ্চয়ই নিজেকে নিয়ে শংকা জন্মেছে৷ আজকে এখানেই থেমে যাওয়া যাক। নিজের অস্তিত্বে যখন প্রশ্ন চিহ্ন লেগে যায় তখন চেনা পৃথিবীটা ধুলোর মতোন হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে থাকে।
গুলিস্তার কাধে হাত রেখে রানু তার স্নেহভরা কন্ঠে বললো,
– আমি প্রায় বিকেলে এখানে হাঁটতে আসি৷ আমার সাথে কথা বলতে চাইলে এখানে চলে এসো। আজ আসি।

রানুর প্রস্থানে গুলিস্তার মাঝে কোনো পরিবর্তন হলো না। এমনকি রেহবারের আগমনও তাকে প্রভাবিত করতে পারলো না।
সারাদিন তেজ দেখানো দূর্বার সূর্যটিকে বিদায়বেলা কেমন কোমল, দূর্বল, ক্ষুদ্র মনে হয়। হেরে যাওয়া ক্লান্ত সৈনিকের ন্যায় লুটিয়ে পরে সমুদ্রের বুকে। শান্ত সমুদ্র পরম যত্নে নিজের বিশালতায় ঠাঁই দেয় সেই তেজী, অহংকারী সূর্যকে।
সমুদ্র ও সূর্যের অপরুপ মিলনের সাক্ষী হতে সমুদ্রে ভীড় জমিয়েছে অসংখ্য প্রকৃতি প্রেমী মানুষ। তাদের চোখে মুখে বিস্ময়। হাসি লেপ্টে আছে ঠোঁটে। উচ্ছ্বসিত মানুষগুলো ব্যস্ত এই স্মৃতিটুকু ক্যামেরায় বন্দী করতে। গুলিস্তা গভীরভাবে তাদের পর্যবেক্ষণ করছে৷ কই সে তো এভাবে হাসতে পারছে না। সমুদ্রের বুকে চিকচিক করতে থাকা সোনালী রোদ্দুর তার চোখ ঝলসে দিতে পারছে না। কেনো মনের আয়নায় এমন অপরুপ সৌন্দর্যটির প্রতিবিম্ব সৃষ্টি হচ্ছে না? কেনো মনের কোণে ঝলকানি দিচ্ছে না মুগ্ধতা? তার কি মন নেই? মন ছাড়া আবার মানুষ বাঁচে নাকি! মন আছে। নিশ্চয়ই আছে। হয়তো পাথরে পরিণত হয়েছে। তবে এই পাথুরে মনে হঠাৎ শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে কেনো? কীসের এতো হাহাকার? থেকে থেকে নিজস্ব অপূর্ণতা গর্জন তুলছে গুলিস্তার মনের গহীনে। পাশে বসে থাকা রেহবার হয়তো সেই উত্তাল ঢেউয়ের আভাস পেলো। গুলিস্তার পাশে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে এক হাতে ওর কোমড় জড়িয়ে ধরলো। খেঁই হারানো গুলিস্তা যেনো কিনারা খুঁজে পেলো। পরম নির্ভরতায় মাথা এলিয়ে দিলো রেহবারের কাঁধে।

(চলবে…)

#হে_সখা
#অক্ষরময়ী
ঊনত্রিংশ পর্ব

আজকাল কোনো এক অমোঘ টানে রোজ বিকেলে গুলিস্তা ঘর ছাড়ে। বাড়ির পাশে সমুদ্র তীরে হাঁটতে যায়। নিজস্ব ব্যস্ততা থাকায় রেহবার ওকে সময় দিতে পারে না। তবে কড়া নির্দেশ জারি করা আছে, মোবাইল যেনো সবসময় সাথে থাকে এবং বেশি দূরে না যাওয়া হয়। বেশি দূরে যাওয়ার অবশ্য প্রয়োজনও হয় না। প্রথমদিনের মতোই সমুদ্রতীরের কিটকটে বসে রানুর সাথে গল্প করে গুলিস্তা৷ কখনো একটু হেঁটে বেড়ায়৷ যে মেয়েটির থেকে সে এতোদিন পালিয়ে বেড়িয়েছিলো, কেনো যেনো ওর কাছেই ছুটে আসে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ওর কথা শোনে। রানুর রিনরিনে কন্ঠের সরল, সহজ কথাগুলো শুনতে গুলিস্তার ভীষণ ভালো লাগে। এ কথা কিন্তু গুলিস্তা কাউকে জানায়নি৷ এমনি রানুকেও নয়। সেদিনের পর রানুর সাথে আরেকবার দেখা করার প্রত্যাশা নিয়ে সাগরপাড়ে এলোমেলো হাঁটাহাঁটি করছিলো সে। হঠাৎ করেই আবার সামনে চলে এলো রানু। বিরক্ত হওয়ার ভান করে সেদিন গুলিস্তাই প্রথম কথা বলেছিলো,
– আপনি আজকেও আমার পিছু নিয়েছেন?

বিপরীতে রানু শুধু তার চিরপরিচিত হাসিটি ফিরিয়ে দিয়েছিলো।
এরপর থেকে রোজ তাদের দেখা হয়, কথা হয়। রেহবারের সাথে চুক্তি হয়েছিলো, প্রথম কয়েকমাস সপ্তাহে একদিন কাউন্সিলিং করানো হবে। এরপর গুলিস্তার অবস্থার উন্নতি হলে সেটি সপ্তাহ পেরিয়ে মাস করা হবে। কিন্তু এখন রানু নিজেই রোজ বিকেলবেলা এক ঘন্টা ড্রাইভ করে ছুটে আসে হলিউড বীচে৷ ডা. রুবাইয়া রানু নিজের প্রফেশন থেকে বেরিয়ে এসে একজন বাঙালি ঘরের সাধারণ মেয়ে রানু হয়ে উঠেছে। গুলিস্তার প্রতি স্নেহ থেকে নাকি নিজ দেশের মানুষের প্রতি মায়ার কারনে রানু এতোটা আন্তরিকতা দেখাচ্ছে সে জানে না। শুধু জানে এই মেয়েটির সাথে কথা বলতে তার ভীষণ ভালো লাগে। প্রায় সপ্তাহ খানেক ধরে ওদের দুজনের প্রতিদিন কথা হচ্ছে তবুও গুলিস্তা নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরতে পারেনি৷ পুরোটা সময় রানু নিজেই কথা বলে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে শোনায় গুলিস্তাকে। ভিন্ন ভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরে ওর সামনে৷ রানু চেষ্টা করছে গুলিস্তা নিজে থেকে নিজের সমস্যাটি বুঝুক এবং সেটি নিয়ে রানুর সাথে কথা বলুক। রোগী যতোক্ষণ নিজেই নিজেকে সাহায্য করতে চাইবে না, রোগ হতে মুক্তি পেতে চাইবে না ততোক্ষণ কোনো চিকিৎসকের সাধ্য নেই তাকে সুস্থ করে তোলে। যেকোনো চিকিৎসায় রোগীর নিজের চেষ্টা এবং বিশ্বাস মুখ্য ভূমিকা পালন করে৷ গুলিস্তা হয়তো নিজের সমস্যাগুলো বুঝতে পেরেছে তাই তো আগ্রহ নিয়ে রানুর কথা শোনো। আরও গভীরভাবে বুঝতে চায়৷ কিন্তু নিজের সমস্যার কথা না স্বীকার করছে, আর না সাহায্য চাচ্ছে। তাই তো বাধ্য হয়ে রানু নিজে থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চাইলো।

– আমাদের প্রায় প্রতিদিন কথা হচ্ছে, অথচ নিজেদের ব্যাপারে তেমন কিছুই জানি না৷ অন্য কেউ হলে প্রথম দেখাতেই আমার নাড়ি-নক্ষত্রের সব খবর জেনে নিতো। তুমি একটু আলাদা, গুলিস্তা।

‘অন্যদের থেকে আলাদা’ এই কথাটি গুলিস্তার জন্য একটি আতংক। প্রথম যখন হাইস্কুলে গেলো সেখানে কীভাবে যেনো কথা ছড়িয়ে গেলো, গুলিস্তা সবার থেকে আলাদা৷ ততোদিনে গুলিস্তা নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছিলো৷ প্রয়োজনের বাইরে কারো সাথে বেশি কথা বলতো না। কিন্তু এ কথা ছড়ানোর সাথেই স্কুলের সবাই ওকে এড়িয়ে চলা শুরু করলো। প্রয়োজনীয় কথা বলতে গেলেও কেউ আগ্রহ দেখাতো না। সহপাঠী থেকে শুরু করে সিনিয়র, জুনিয়র এমনকি শিক্ষক পর্যন্ত গুলিস্তার দিকে বাঁকা নজরে তাকাতো। এভাবে ধীরে ধীরে একলা, একঘরে হয়ে গিয়েছিলো গুলিস্তা৷ রানুর মুখে আজকে আবার সেই কথাটি শুনে গুলিস্তার পা দুটো থমকে গেলো। রানুও কি তাহলে এখন থেকে ওকে এড়িয়ে যাবে? হারিয়ে ফেলার ভয়ে ভেতরটা তটস্থ হয়ে গেলেও নির্লিপ্ত মুখে চাইলো রানুর দিকে।
– সবাই এমনটাই বলে।
– কেনো বলে জানো?
– নাহ৷

গুলিস্তার আগ্রহহীন উত্তর শুনেও রানু দমে গেলো না। ওর হাত ধরে বললো,
– চলো হাঁটি।

হঠাৎ মনটা ভীষণ ভার হয়ে এসেছে। সমুদ্রপাড়ের বিশালতা বিশ্রী লাগছে। পাশে হাঁটতে থাকা অপরুপ সুন্দর মেয়েটিকে অসহ্য ঠেকছে। তবুও বাধ্য হয়ে গুলিস্তা হাঁটা শুরু করলো।

– অন্যদের থেকে আলাদা হওয়া কিন্তু মন্দ কিছু নয়৷ আমরা প্রত্যেকে ভিন্ন একজন মানুষ। কিছু ক্ষেত্রে একে অপরের থেকে আলাদা৷ তবে তোমার মধ্যে এই আলাদা হওয়ার মাত্রাটুকু একটু বেশি। একটু সহজ করে বলি। এই যেমন ধরো, আমার সাথে তোমার আলাপ হয়েছে বেশ কিছুদিন হলো। তুমি কিন্তু আমাকে নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখাওনি। এর মানে হলো, যেকোনো বিষয়ে তোমার আগ্রহ খুব কম বা একদমই নেই। প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্যের এতো কাছে থেকেও তুমি উচ্ছ্বসিত নও। এতোদিনেও আমি তোমাকে হাসতে দেখিনি, কাঁদতে দেখিনি। তুমি সবসময় আনরীড্যাবল ফেস নিয়ে ঘুরো। তোমার চোখ-মুখের ভাষা পড়া যায় না। মানুষের মৌলিক যে অনুভূতিগুলো থাকে, সেগুলো তোমার নেই। হয়তো আছে, তবে সেগুলো তুমি প্রকাশ করো না। এজন্যই মানুষ তোমাকে আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করে। তুমি কি বুঝতে পেরেছো, আমার কথা?

গুলিস্তা বোকার মতো চেয়ে আছে। ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত করে বুঝার চেষ্টা করছে৷ রানুর প্রশ্নের উত্তরে সহজভাবে জবাব দিলো,
– নাহ। বুঝিনি৷

রানু দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে বুঝালো। এ কাজ এতো সহজ হবে না৷ মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো,
– আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার কথা মনে আছে?
– হ্যাঁ।
– সেদিন তোমাকে বলেছিলাম, তোমার মনে অনেক প্রশ্ন উঁকি দেয়৷ যেটা খুব স্বাভাবিক। মানুষ মাত্রই জানার আগ্রহ থাকবে। অজানা কিছু আমরা জানতে চাই, প্রশ্ন করি৷ এখানেই তুমি অন্য সবার থেকে আলাদা৷ তোমার মনে প্রশ্ন জন্ম নিলেও তুমি সে প্রশ্ন প্রকাশ করো না৷ জানতে চাও না। কেনো?

গুলিস্তা হাঁটা থামিয়ে সমুদ্রের ঘোলা জলের দিকে তাকালো। ঢেউ এসে তীর ছুঁয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে৷ রেখে যাচ্ছে কিছু ফেনা। অজস্র বুঁদবুঁদ একখানে হয়ে ফেনা সৃষ্টি করেছে। গুলিস্তার মাথার ভেতরেও স্মৃতিরা বুঁদবুঁদ তৈরি করছে। একসাথে হয়ে এমন ফেনা সৃষ্টি করবে হয়তো। ওকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকতে দেখে রানু ওর কাঁধে ধাক্কা দিলো। ওকে নিজের দিকে ফিরিয়ে তাড়া দিতে থাকলো,
– বেশি কিছু ভেবো না। শুধু আমি যেটুকু জানতে চেয়েছি, তার উত্তর দেও। আমাদের দিকে তাকাও। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেও৷

গুলিস্তার মনে হচ্ছে সে অন্ধকার কোনো গহীনে হাঁটছে। আশেপাশে সবকিছু অস্পষ্ট। দূর থেকে ভেসে আসছে কোনো শিশুর আওয়াজ। খুব মনোযোগ দিয়ে সে আওয়াজ শোনার চেষ্টা করলো। কিন্তু রানুর ডাকে ফিরে আসতে বাধ্য হলো৷ ওকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে রানু আবার জানতে চাইলো,
– মনে করে দেখো, কবে থেকে প্রশ্ন করা বন্ধ করেছো। কেনো করেছো? তোমার মা তোমাকে কি বলেছিলো?
– বেশি কথা বলতে হয় না৷ পাগলেরা সারাক্ষণ কথা বলে। এতো প্রশ্ন করতে হয় না। প্রশ্ন করলে মা বিরক্ত হয় না৷

অদ্ভুত এক ঘোরে পেয়ে বসেছিলো গুলিস্তাকে। একটানা কথাগুলো বলার পর হুঁশ ফিরে এলো। কি করলো সে এটা! যে স্মৃতি সে নিজেই আর কখনো মনে করতে চায় না। যে কথা কখনো কাউকে বলেনি তা আজ রানুর মতো স্বল্প পরিচিত একজন মেয়েকে কেনো বলতে গেলো৷ নিজের উপর প্রচন্ড রুষ্ট হয়ে রানুকে পেছনে ফেলে দ্রুত পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করলো। অনেক হয়েছে আর নয়। রানুর কাছাকাছি থাকলে ওর সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে৷

বাড়ি পেছনে ফেলে ওরা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলো। এদিকে সূর্য ততোক্ষণে ডুবতে শুরু করেছে৷ এক্ষুণি ফিরতে হবে। কিন্তু গুলিস্তা হাঁটতে শুরু করেছে উল্টোদিকে৷ ওর কাছাকাছি পৌছাতে রানুকে ছুটতে হলো৷ গুলিস্তার কাছাকাছি পৌছাতেই ও আরও জোরে হাঁটতে শুরু দিয়েছে। বাধ্য হয়ে রানু বললো,
– উল্টোদিকে হাটছো কেনো? বাড়ি ফিরতে হবে না? চলো ফিরে যাই।

রানুর সাথে আরও কয়েক মুহূর্ত কাটাতে হবে ভাবতেই গুলিস্তার রাগ হলো। সে যাবে না রানুর সাথে। গুলিস্তা কিছুতেই থামছে না দেখে রানু দু হাতে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। অকস্মাৎ এমন আচরণে গুলিস্তা হতবাক। কতো বছর পর কেউ এমন স্নেহভরে তাকে জড়িয়ে ধরলো? মনে পরছে না। ওকে শান্ত হয়ে যেতে দেখে রানু বললো,
– সূর্য ডুবে গেছে, দেখো। তোমার বাড়ির লোকেরা চিন্তা করবে না, বলো? চলো এখন ফিরে যাই৷

গুলিস্তা বাধ্য মেয়ের মতো গুটি গুটি পায়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো৷ নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য খানিকটা সময় দেওয়ার পর রানু বলতে শুরু করলো,
– সত্যি কি প্রশ্ন করতে হয় না? একবার ভেবে দেখো তো৷ প্রশ্নের কারনে, জানার আগ্রহের কারনে আজ আমরা চাঁদের মাটিতে পা রাখছে সক্ষম হয়েছি। একটি ছোট শিশুকে দমিয়ে রাখতে তার মা কিছু কথা বলেছিলো। যা তুমি আজও ধরে বসে আছো। এখন তুমি সেই ছোট বাচ্চাটি নেই৷ বড় হয়েছো, বুঝতে শিখেছো। নিজের জ্ঞান-বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে ভেবে দেখো৷ তোমার মা তোমাকে যা যা বলেছিলো সেগুলো কি আদোও যুক্তিসঙ্গত? তুমি পড়াশোনা করেছো। শিক্ষিত এবং বুদ্ধিমতী একজন মেয়ে৷ এখনো কেনো মায়ের কথাগুলোকে ভিত্তি করে জীবনযাপন করছো। এটা কি ঠিক হচ্ছে? তোমার আশেপাশের মানু্ষগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে দেখো। তারা কি কথা বলছে না? হাসছে না? কাঁদছে না? এই যে আমি তোমার সাথে এতো এতো কথা বলছি, তাহলে তোমার মায়ের ভাষ্যমতে আমি পাগল। তাই তো? তোমার কি আমাকে পাগল মনে হয়?
– নাহ।
– তাহলে তোমার মা যা বলেছিলো, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। বুঝতে পারছো?

গুলিস্তা মাথা উপর-নিচ করে সম্মতি জানায়।

ওরা যখন বাড়ির কাছাকাছি পৌছালো, ততোক্ষণে চারদিকে অন্ধকার ছড়িয়ে পরেছে। সমুদ্রতীরের লাইটগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দূর হতে রেহবারকে দেখা যাচ্ছে। কিটকটের সামনে অধৈর্য্য হয়ে এপাশ ওপাশ করে হাঁটছে৷ রানু মেসেজ করে জানিয়ে দেওয়ার পরেও ওকে এতো অস্থির হতে দেখে রানু খানিকটা অবাক হলো। এতোটা তীব্রভাবে কেউ ভালোবাসতে পারে! পাশে হাটতে থাকা গুলিস্তাকে নিচু গলায় বললো,
– তুমি ভীষণ ভাগ্য করে এমন একজন জীবনসঙ্গী পেয়েছো। তোমার জন্য কতো চিন্তা করে দেখেছো? তোমাকে খুঁজতে সাগরপাড়ে পৌঁছে গেছে। দেখে তো মনে হচ্ছে বাইরে থেকে ফিরে বাইরের পোষাক না ছেড়েই তোমাকে খুঁজতে বের হয়েছে৷ এই মানুষগুলোর জন্য হলেও স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করো। আমি জানি, মুখে বলা যতো সহজ, তোমার জন্য কাজটি ততোটা সহজ হবে না৷ তবুও চেষ্টা করবে৷ কিছু জানতে ইচ্ছে করলে, প্রশ্ন করবে৷ অন্য কাউকে প্রশ্ন করতে ভয় হলে, উনাকে প্রশ্ন করবে। মানুষটা তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে, গুলিস্তা৷ উনার দ্বারা কখনো তোমার ক্ষতি হবে না। উনার থেকে তুমি কখনোই আঘাত পাবে না। এইটুকু বিশ্বাস রেখো। নিজের অনুভূতি বুঝতে না পারলেও উনার অনুভূতিগুলোকে বুঝার চেষ্টা করো। ভালোবাসাকে যত্ন করে আগলে রাখতে হয়৷ ক্ষণে ক্ষণে স্বীকারোক্তি প্রদান করে সামনের মানুষটাকে জানান দিতে হয়, তুমি তাকে কতোটা ভালোবাসো৷ সে তোমার জন্য ম্যাটার করে, এটা তাকে ফিল করাতে হয়। দেখবে যেটুকু ভালোবাসা তুমি তাকে দিবে, তার দ্বিগুণ ভালোবাসা সে তোমাকে ফিরিয়ে দিবে। তোমার এই পাথুরে জীবনে অনেক অনেক ভালোবাসা দরকার।

রানুর কথায় অনেকদিন পর গুলিস্তার বুকের বা পাশে চিনচিনে ব্যথা অনুভব হলো। নতুন এই অনুভূতির সাথে সে পরিচিত নয়৷ তাই বুঝতে পারছে না, তার এমন কেনো লাগছে। ওরা কাছাকাছি আসতেই রেহবার ছুটে গেলো গুলিস্তার কাছে। রানু মিষ্টি হেসে বললো,
– আজ আসি। আবার দেখা হবে গুলিস্তা।

রানু চলে যেতেই গুলিস্তাকে সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলো রেহবার। ওর শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
– তুমি ঠিক আছো?

স্বভাব অনুযায়ী মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো গুলিস্তা। ওর ডান হাতটি বুকের বাম পাশে দেখে রেহবার বললো,
– বুকে হাত দিয়ে আছো কেনো? ব্যথা করছে? পানি খাও। ভালো লাগবে।

পানির বোতল এগিয়ে দিলো গুলিস্তার দিকে। একটু পানি খেয়ে বোতলের ঢাকনাটি নিজের হাতে মধ্যে রেখে খোলা বোতলটি রেহবারের দিকে এগিয়ে দিলো। বাইরে থেকে ফিরে নিশ্চয়ই কিছু খায়নি। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। উনারও একটু পানি খাওয়া দরকার। গুলিস্তার নীরব ভাষা বুঝতে রেহবারের অসুবিধা হয় না। বোতলে চুমুক দিয়ে পানি খেয়ে নেয়। ক্লান্ত দুজন মানুষ ফিরে যায় নীড়ের দিকে।

(চলবে…)