হে সখা পর্ব-৩+৪

0
101

#হে_সখা
#অক্ষরময়ী
তৃতীয় পর্ব

শুক্রবার শপিং মলে উপচে পরা ভীড়। শহরের কর্মজীবী মানুষেরা ছুটির দিনের প্রিয়জনের সাথে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বাইরে কিছু শৌখিন কেনাকাটার জন্য ছুটে আসে। মলের ফুডপোর্টের একটি চেয়ারে ক্লান্ত আলিয়া ধপ করে বসে পরলো। টেবিলের অপরপাশে বসে দিহান বললো,
– কি খাবে?
– তোর যা মন চায় অর্ডার কর। তার আগে একদম ঠান্ডা দেখে ড্রিংকস নিয়ে আয়, ভাই। গরমে শরীর জ্বলে যাচ্ছে। আজকে মার্কেটে এতো মানুষ আসলো কই থেকে!
– সবার বাড়িতে মনে হয় আচানাক বিয়ে লাগছে।

কথা না বাড়িয়ে দিহান জলদি চলে গেলো খাবার আনতে। আলিয়ার ফর্সা মুখখানা গরমে লাল হয়ে গেছে। আতেফ আকবরের বড় আদরের মেয়ে আলিয়া। বংশের প্রথম মেয়ে হওয়ায় সে অবশ্য সবার আদুরে। সারাদিন আরাম করে শুয়ে বসে সময় কাটানো মেয়েটা নিজে আগ্রহ করে গুলিস্তার বিয়ের কেনাকাটার দায়িত্ব নিয়েছে। সকাল থেকে অনেক বাছাই করে বিয়ের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনেছে। ওর সাথে পাঠানো হয়েছে দিহানকে। একা আদরের মেয়েকে শপিংমলের উপচে পরা ভীড়ের মধ্যে পাঠানোর পক্ষে কেউ ছিলো না। দিহান অবশ্য জানে আলিয়ার এতো আগ্রহ, আনন্দের কারন কি? দিহানের সেজো ভাই দাউদের সাথে আলিয়া অপ্রকাশিত প্রণয় সম্পর্কে আছে। কখনো প্রকাশ্যে না আসলেও বাড়ির সকলে বিষয়টি সম্পর্কে অবহত এবং আগ্রহীও বটে। গুলিস্তার বিয়ে হয়ে গেলেই দানেশ এর বিয়ের আয়োজন করা হবে। এরপর আলিয়া-দাউদের বিয়ের আলোচনা সহজ হবে। এটাই মূল আলিয়ার আনন্দের কারন। দুপুরের মধ্যেই আলিয়া-দিহান কেনাকাটা শেষ করে বাড়ি ফিরে গেলো। রাতের বাসের টিকিট কেটে ছিলো দানেশ ও দাউদ। একসাথে ঢাকা হতে বগুড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলো। ওরা সকালে বাড়ি পৌঁছে গেছে। শর্মী দুই চাচী শাশুড়ির সহযোগিতায় রান্নার দিকটা সামলে নিচ্ছে।

আলিয়া বাড়ি ফিরে দেখলো বসার ঘরে পুরুষ সদস্যরা গল্প করছে। দাউদ সেখান থেকে উঠে এসে আলিয়ার হাত থেকে ব্যাগগুলো নিলো। ওকে দেখে এক মুহুর্তে ক্লান্তি দূর হয়ে গেলো আলিয়ার।

– তুমি কখন এলে?
– তুই বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই। ঘেমেনেয়ে তো একাকার হয়ে গেছিস। যা, গোসল করে নে।

আলিয়া মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে গুলিস্তার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। গুলিস্তাকে সাজানোর দায়িত্বও সীমা বেগম আলিয়াকে দিয়েছেন। গোসল সেড়ে গুলিস্তা ও আলিয়াকে দুপুরের খাবার দিয়ে দেওয়া হলো। পরে আর সময় পাওয়া যাবে না।

এমনিতেই পুতুলের মতো দেখতে গুলিস্তা, তাই বেশি সাজাতে হলো না। হালকা গোলাপি শাড়ি গায়ে জড়াতেই তাকে সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপের ন্যায় দেখাচ্ছে। মুখে হালকা সাজসজ্জা করতে নিয়ে আলিয়া বলল,
– কেমন হুট করে সবকিছু হয়ে যাচ্ছে। এতো ভালো ছেলে, এতো ধনী পরিবার! স্বপ্নের মতো সব পেয়ে গেলি রে। আমার কী যে ভালো লাগছে।

উত্তরে গুলিস্তা কিছু বললো না দেখে আলিয়া আবার বলল,
– কী রে কিছু বল।
– কি বলবো?
– তোর অবাক লাগছে না?
– হুম লাগছে।

এরপর আলিয়া নিজের মতো করে কথা বলে গেলো। গুলিস্তা পুতুলের ন্যায় বসে আছে। আলিয়ার অনবরত কথা ওর কানে পৌঁচ্ছাছে কিনা কে জানে!

দুপুর দুটা নাগাদ একটি কার এসে থামলো আকবর বাড়ির সামনে। ভর দুপুরের নিজের বাড়িতে খাওয়াদাওয়া নিয়ে ব্যস্ত প্রতিবেশীরা তা খেয়াল করলো না। আতেফ আকরব বাইরে এসেছেন অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাতে। তিনি সবাইকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যেতেই আদিল আকবর ড্রাইভকে অনুরোধ করলেন বাড়ি থেকে একটু দূরে ফাঁকা জায়গায় গাড়িটা পার্ক করে রাখতে। ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখলে জ্যাম লেগে যেতে পারে।

আম্বিয়া খাতুনের দুই ছেলে, রেহবার ও রাহিল। বড় ছেলে রেহবারের বিয়ের উদ্দেশ্যে তিনি সুদূর সিলেট থেকে বগুড়ায় এসেছেন। বিয়ের জন্য আজকাল ভালো মেয়ে খুঁজে পাওয়া এতোটা দুর্সাধ্য হয়ে দাড়িয়েছে এটা তিনি রেহবারের বিয়ের আয়োজন না করলে বুঝতে পারতেন না। একে তো মেয়ে খুঁজে পাওয়া মুশকিল, তার উপর হাতে সময় খুবই কম। শেষ মুহুর্তে যখন একদম আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন তখন রাহিলের কলেজ ফ্রেন্ড আসাদের মাধ্যমে গুলিস্তার খোঁজ পেলেন। ছবি দেখেই মেয়েটাকে উনার খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছে। মায়াবি চেহারায় সরলতার ছাপ স্পষ্ট। পরিবার, বংশ মর্যাদা, আর্থিক অবস্থান এসন্দ আম্বিয়া খাতুনের আগ্রহ নেই। উনার শুধু একটা লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে হলেই চলবে।

বসার ঘরে আম্বিয়া, রেহবার ও রাহিলকে বসতে দেওয়া হয়েছে। শর্মী হালকা নাস্তা ও শরবত দিয়ে গেছে। সীমা বেগম আতেফ আকবর ও আদিল আকবর সবার সাথে টুকটাক আলোচনা করছেন। বাড়ির ছেলেরা এখানে কেউ নেই। নাস্তা শেষে আম্বিয়া খাতুন মেয়ে দেখতে চাইলেন।

গুলিস্তাকে নিয়ে এলো আলিয়া। গুলিস্তা গুটি গুটি পায়ে মাথা নিচু করে সীমা বেগমের পাশে বসলো। শাড়ি পরিবাহিতা গুলিস্তার মাথায় খোপা করে ঘোমটা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, চোখে কাজল আর একটুখানি ফেস পাউডার দিয়েছে মনে হয়। তাতেই গুলিস্তার চেহারায় খানিকটা যুবতী ভাব চলে এসেছে। মেয়ের সাজসজ্জা দেখে সীমা বেগম নিজেই বাক্যহারা হয়ে গেলেন। উজ্জ্বল চোখে আলিয়ার দিকে তাকিয়ে নিরবে তার গুনের প্রশংসা করতে ভুললেন না। গুলিস্তা চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখে সীমা বেগম ফিসফিসিয়ে বললেন,
– মুরুব্বিদের সালাম দেও।

সেই একবার শুধু গুলিস্তা মুখ তুলে সালাম দিয়ে আবার মাথা নিচু করে নিলো। এরপর আর সামনে তাকায়নি। নিখুঁত সৌন্দর্যের মেয়েটিকে একপলক দেখেই আম্বিয়া খাতুন মুগ্ধ হলেন। ছবির থেকেও সামনাসামনি অত্যাধিক সুন্দর দেখাচ্ছে গুলিস্তাকে। আম্বিয়া খাতুন আরও কিছু প্রশ্ন করার পর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন ছেলের বিয়ে আজকে সম্পন্ন করেই যাবেন।

অনেক পথ জার্নি করে আসায় মেহমান ক্লান্ত থাকবে সেই বিবেচনা করে একটি ঘর গুছিয়ে রাখা হয়েছে। দুপুরের খাবারের পর রেহবার সেখানে বসে তার মাকে বলল,
– এতো তাড়াহুড়ো করছো কেনো মা?
– মেয়ে আমার পছন্দ হয়েছে তাই। তোর অপছন্দ হলে বল।
– পছন্দ হয়েছে সে ভালো কথা কিন্তু একটু খোঁজ খবর নিয়ে দেখা দেখবে না?
– আসাদ আর রাহিল মিলে যতোটুকু দরকার খোঁজ নিয়েছে। আমাদের দরকার একটা ভালো মেয়ে, সেটা যখন পেয়ে গেছি আর ওতো খোঁজ নিয়ে কি হবে?
– মেয়ের বয়সটাও কম মনে হচ্ছে।
– আঠারো পেরিয়েছে। আইন অনুযায়ী বিয়ের বয়স হয়েছে। আর বাকি যতোটুকু ছেলেমানুষী আছে সেটা তুই ধৈর্য্য ধরে সামলে নিলেই হয়ে যাবে।
– তবুও মা। এমন হুট করে বিয়ে হয়! চেনা নেই, জানা নেই। এক দেখায় বিয়ের পিড়িতে বসতে বলছো। একটু সময় দরকার ছিলো।
– বিয়ের পরে অনেক সময় পাবি। ইচ্ছা থাকলে তখন বেশি ভালো জানা শোনা হবে।

রেহবারের অস্বস্তিকে পেছনে ফেলে বাদ মাগরিব গুলিস্তার সাথে রেহবারের বিয়ে হয়ে গেলো। রেহবার ভেবেছিলো মেয়ে পক্ষ থেকে অন্তত আজকেই বিদায় নিয়ে আপত্তি করবে। কিন্তু সীমা বেগমের মেয়ে বিদায় নিয়ে উৎসাহ দেখে অবাক হতে হলো। রাত আটটার দিকে মেয়ে বিদায়ের সময় সবাই ভারাক্রান্ত চেহারা নিয়ে হাজির হলেও কারও চোখে পানি দেখা গেলো না। এমনকি বেচারা রেহবারের সদ্য বিবাহিত স্ত্রীরের চোখের কোণেও জল জমা হলো না। সে শুধু অস্থির দৃষ্টি মেলে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে।

শর্মী একটা লাগেজ গুছিয়ে গাড়িতে তুলে দিলো। বাবার বাড়ি থেকে নেওয়ার মতো তেমন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিছু নেই। বিয়ের সাজপোষাকেই গুলিস্তা এতোদূর পাড়ি দিবে ভেবে শর্মী একবার সীমা বেগমকে বলেছিলো হালকা কোনো পোষাক পরিয়ে দিবে কিনা। সীমা বেগম না করে দিয়েছেন। বিদায়বেলায় বাড়ির সদস্য একে একে গুলিস্তাকে বিদায় জানালো। সীমা বেগম মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
– ও বাড়ি থেকে যেনো কোনো অভিযোগ না আসে।

ভাইয়েরা তেমন কোনো আগ্রহ দেখালো না। শুধু দিহান গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
– যথেষ্ট বড় হয়েছিস। কোথায়, কীভাবে থাকলে ভালো থাকবি একটুকু বুদ্ধি নিশ্চয়ই হয়েছে। বুদ্ধি খাটিয়ে পরিবেশ বুঝে নিজেকে নতুন করে গড়ে নিবি। ভালো থাকিস।

কারে ওরা মোট চারজন এসেছিলো। যাওয়ার বেলায় একজন বেশি হওয়ায় পেছনের সীটে তিনজনকে কষ্ট করে বসতে হলো। আম্বিয়া খাতুন গুলিস্তা ও রেহবারকে পাশাপাশি বসিয়ে নিজে একপাশে বসলেন। রাতের জ্যাম বিহীন রাস্তায় ঢাকা পৌছাতে বেশি সময় লাগলো না। কিন্তু ততোক্ষণে ক্লান্ত গুলিস্তা রেহরাবের কাঁধে মাথায় রেখে ঘুমিয়ে গেছে। ঘুমের মাঝে কাঁধে হেলে পরাতে প্রথমে রেহবারের খানিকটা অস্বস্তি হচ্ছিলো। কিন্তু নিজের সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর সহজাত আচরণের কাছে নিজের অস্বস্তি খানিকটা ব্যাকডেটেড ঠেকাচ্ছে। নিজেকে খুব দ্রুত সামলে নিয়ে পরক্ষণেই এক হাতে আগলে নিলো স্ত্রীকে।

অনেকদিন বাদে গুলিস্তা কোনো ভয় ছাড়া শান্তিতে ঘুমালো। গভীর ঘুমের মাঝে তার মনে হলো দূর থেকে কেউ ডাকছে,
গুলিস্তা, ওঠো। এই গুলিস্তা..
গুলিস্তা পিটপিট করে তাকিয়ে দেখলো তার সামনে ঝুঁকে আছে তার সদ্য বিয়ে করা বর। আর সে নিজে তার বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে এতোক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলো। ঘুম কেটে যাওয়ায় সোজা হয়ে বসে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো প্রচুর আলো, দ্রুতগামী যানবাহন, উঁচু বিল্ডিং এবং কোলাহল। বর মানুষটা গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বললো,
– আমরা ঢাকা পৌঁছে গেছি। এখন এয়ারপোর্টের সামনে আছি। এখান থেকে ফ্লাইট নিয়ে সিলেটে পৌঁছে যাবো। বেশিক্ষণ লাগবে না। এই ধরো এক ঘন্টা।

প্রায় তিনঘন্টার গাঢ় ঘুমে গুলিস্তার সকল ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। আম্বিয়া খাতুন নিজেও কিছুক্ষন ঘুমিয়ে নিয়েছেন। রাহিল সবার জন্য কফি নিয়ে এসেছে। সেটাই তিনি গুলিস্তাকে এগিয়ে দিলেন। মেয়েটা এখনো মাথা ঢেকে গুটিশুটি মেরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এই বয়সের ছেলেমেয়ের প্রচুর কৌতুহল থাকে অথচ গুলিস্তা ভীষণ চুপচাপ। নতুন মানুষদের পাশে ভয় পাচ্ছে, ব্যাপারটা এমনও নয়। ওর চেহারায় কোনো ভয় নেই। হয়তো সংকোচ বোধ করছে। অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই দুপুরবেলা দেখা হলো আর রাতেই সেই মানুষগুলোর সাথে অচেনা গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। মেয়েদের জীবনটাই এমন। আম্বিয়া বেগম নিজেও তো এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন। বয়স কম ছিলো, ভীতু ছিলেন। আম্বিয়া বেগম গুলিস্তার হাতে কফি দিয়ে ওর মাথার উপর থাকা শাড়ির আঁচলটা নামিয়ে দিলেন।
– কফিটা খাও। ফ্রেশ লাগবে।

গুলিস্তা তার জীবনকালে কখনো বগুড়া শহরের বাইরে যায়নি। এই প্রথম ঢাকা শহরে এসে শহুরে ব্যস্ততা তাকে অবাক করলেও সে নির্লিপ্ত রইলো। মনোযোগ দিয়ে কফির কাপে চুমুক দিয়ে আম্বিয়া বেগমের পাশে বসে রইল।

প্রথমবার ফ্লাইটে উঠার কারনে টেক অফের সময় যখন বুক ধক করে উঠলো, সে বড় বড় শ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে নিলো। রেহবার আড় চোখে তাকিয়ে ছিলো গুলিস্তার দিকে। প্রথমবার ওর বিমান ভ্রমণে অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর ছিলো না। মায়ের হাত শক্ত করে ধরে সাহস যুগিয়েছিলো। গুলিস্তার মুখশ্রীতে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট কিন্তু ওর সাথে মা নেই সাহস দেওয়ার জন্য। রেহবার হাত বাড়িয়ে গুলিস্তার হাত ধরলো। গুলিস্তা চোখ খুললো না। শুধু শক্ত করে রেহবারের হাত চেপে ধরলো।

ওরা যখন বাড়ি পৌছালো তখন ঘড়ির কাটা বারোটার ঘর ছুয়েছে। প্রত্যেকে ভীষণ ক্লান্ত থাকায় ধুমধাম নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো। আম্বিয়া খাতুন গুলিস্তাকে রেহবারের ঘরে পৌঁছে দিয়ে নিজের ঘরের চলে গেলেন। তার এখন বয়স হয়েছে। শরীর একটুতেই ক্লান্ত হয়ে যায়।
বেড রুমের একপাশে গুলিস্তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রেহবার দ্রুত ঘরে প্রবেশ করলো। গুলিস্তার বাড়ি থেকে পাঠানো লাগেজটা একপাশে রেখে বললো,
– দাঁড়িয়ে আছো কেনো? ক্লান্ত লাগছে না? বসো ওখানে।

ঘরের ঠিক মাঝখানে বেড, সামনের দিকে দু সীটের সোফা সেট। গুলিস্তা কোথায় বসবে নির্ধারণ করতে না পেরে দু দিকে চেয়ে দেখলো। তা দেখে রেহবার বললো,
– বিছানাতেই বসো।

ঘরের একদিকে দুটো দরজা। একটা দরজা খুলে রেহবার লাগেজ নিয়ে ভেতরে চলে গেলো। খানিক বাদে লাগেজ রেখে এসে গুলিস্তাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– এটা চেঞ্জিং রুম। আর এই পাশেরটা বাথরুম। অপরপাশে যে দরজটা দেখছো ওটা বারান্দা। তুমি খানিকটা জিরিয়ে নেও। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।

মেহরার ও গুলিস্তা দুজনে গোসল সেরে নামাজ আদায় করে যখন বিছানায় গেলো তখন রাত একটার কাছাকাছি। গুলিস্তা একটা শাড়ি পরে শুতে এসেছে। কখনো শাড়ি না পরা মেয়েটা শাড়ি পরে ঠিকঠাক শুয়ে থাকতে পারছে না। বারবার এপাশ ওপাশ করছে। তা দেখে রেহবার বললো,
– শাড়ি না পরে সালোয়ার কামিজ পরে নিলেই পারতে। বিয়ের পর শাড়িই পরতে হবে এমন কোনো বাধ্য বাধকতা নেই।

গুলিস্তা ক্ষীনকাল পরে জবাব দিলো,
– সালোয়ার কামিজ সাথে নেই। লাগেজে শুধু শাড়ি পেয়েছি।

মেহরার নিজের বালিশে মাথা রেখেই অপরপ্রান্তের বালিশে শুয়ে থাকা মেয়েটির দিকে গভীর চোখে তাকালো। ঘরে হালকা নীলচে রঙের একটা বাল্ব জ্বলছে। তাই দেখতে অসুবিধা হচ্ছে না। সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর সাথে ওর কথাবার্তা হয়েছে খুবই অল্প। কিন্তু এইটুকু সময়ে সে খেয়াল করেছে গুলিস্তা খুব কম কথা বলে। তাও আবার কেউ প্রশ্ন করলে শুধু সেটুকুর উত্তর দেয়। নিজে থেকে কোনো কিছু জানতে চায় না। হয়তো অস্বস্তি বা ভয়ের কারনে। তবে যেটুকু কথার জবাব দেয় সেটাও প্রশ্ন করার পর কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর উত্তর দেয়। যেনো কথাগুলো বুঝতে তার কিছু সময় লাগছে। প্রশ্ন শুনে অনেক ভেবে চিন্তে উত্তর খুঁজে তারপর বলে। যদিও মাত্র কয়েক সেকেন্ড এর ব্যবধান, তবুও খুব অদ্ভুত ঠেকায় রেহবারের নিকট। সে তাকিয়ে আছে দেখে গুলিস্তাও কিছুক্ষণ রেহবারের দিকে তাকিয়ে ছিলো। তারপর দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু রেহবার সেভাবেই তাকিয়ে থেকে বললো,
– হুট করে সব হয়ে গেলো কেনাকাটার তেমন সময় হয়ে উঠেনি। মা পছন্দ করে তোমাদের ওখান থেকে কয়েকটা শাড়ি কিনে নিয়েছে। কালকে মায়ের সাথে গিয়ে তোমার কি কি প্রয়োজন কিনে নিও। আমার তো এসবের ধারণা নেই। মা ভালো বুঝবে।

গুলিস্তা শুধু মাথা নেড়ে সায় দিলো। রেহবার হাত বাড়িয়ে নব পরিণীতার কোমল গাল ছুঁয়ে দিলো। স্বামীর প্রথম নিবিড় স্পর্শে গুলিস্তা চকিতে চোখ তুলে তাকালো। সেই চোখে কিছু সময়ের জন্য অস্বস্তি, সংকোচ, ভয়, জড়তা সব ছিলো। তা দেখে রেহবার নিজেকেই প্রশ্ন করলো, বড্ড তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে কি? গুলিস্তার কি সময় প্রয়োজন? যখন ঠিক করলো হাত সরিয়ে নিবে তখনি খেয়াল করলো গুলিস্তার দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এখন বেশ মনোযোগ দিয়ে রেহবারের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে। রেহবার ওর তুলতুলে গালে আলতো করে আঙ্গুল ছুঁয়ে দিতে দিতে বললো,
– তোমার যেকোনো সুবিধা অসুবিধার কথা আমাকে মুখ ফুটে বলবে। আমরা যেহেতু একজন আরেকজনকে চিনি না, তাই দুজনকেই মুখ ফুটে নিজেদের কথা জানাতে হবে, জানতে হবে। তুমি কি আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে চাও? কিছু জানতে চাও?

গালে স্বামীর উষ্ণ স্পর্শে গুলিস্তা ততোক্ষণে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। রেহবারের কথায় শুধু না বোধক মাথা দুলালো। পাশে শুয়ে থাকার অপরুপ সৌন্দর্যের স্ত্রীকে আলতো ভাবে কাছে টেনে নিলো রেহবার। গুলিস্তার গা থেকে মিষ্টি একটা ঘ্রাণ ভেসে আসছে। ভেজা লম্বা চুলগুলো একপাশে ছড়িয়ে রাখা। মায়াবী মুখশ্রী তীব্র আকর্ষণে কাছে ডাকছে। সে ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য রেহবারের নেই। গুলিস্তার আনকোরা ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁতেই মেয়েটা খানিকটা কেঁপে উঠে মেহরাবের বাহু চেপে ধরলো। রেহবার আরেকটু কাছে টেনে নিলো ওকে। সে জানে তার স্ত্রী জগতের পংকিলতা থেকে দূরে থাকা একটি মেয়ে। রক্ষণশীল পরিবারে বড় হওয়ার কারনে আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে খুবই কম। ওর চোখে মুখে সরলতার ছাপ মিথ্যে নয়। রেহবার তাকে যেমন আয়না দেখাবে তেমনি প্রতিবিম্ব ফেরত পাবে।
কোমল ত্বকে চুম্বনের মাঝে গুলিস্তার কানে ফিসফিসিয়ে বললো,
– এতো কষ্ট করে শাড়ি পরে তোমাকে ঘুমাতে হবে না, ফুল।

কানের লতিতে আলতো চুমু দিয়ে শাড়ির আঁচল সরিয়ে দিলো। গুলিস্তা খানিকটা কেঁপে উঠে আরেকটু শক্ত করে চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো। সারারাত আর সেই চোখ জোড়া আর খুললো না।

(চলবে…)

#হে_সখা
#অক্ষরময়ী
চতুর্থ পর্ব

আজকাল আম্বিয়া খাতুনের দিন কাটে ভীষণ ব্যস্ততায়। ঘর গুছিয়ে প্রতিদিন কিছু কেনাকাটার জন্য মার্কেটে যেতেই হয়। তাই সকাল সকাল ঘরের রান্না শেষ করে বাকি কাজ গুছিয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। আজকেও সকালে উঠে রান্নাঘরে নাস্তার প্রিপারেশন নিচ্ছিলেন। গুলিস্তাকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে দেখে বললেন,
– এতো সকালে নিচে নামতে গেলে কেনো? আরেকটু বিশ্রাম নিতে। কালকে কতো রাতে বাড়ি ফিরলাম।
– ঘুম ভেঙ্গে গেলো।
– ঘুম ভালো হয়নি? নতুন জায়গা তো। নিজের ঘর ছেড়ে নতুন জায়গায় এডজাস্ট হতে একটু সময় লাগবে। এতোদিনের অভ্যাস বলে কথা!

কথা বলতে বলতে গুলিস্তা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে আসছে দেখে আম্বিয়া বেগম এগিয়ে এসে বললেন,
– এদিকে কোথায় আসছো? রান্না আমি সামলে নিচ্ছি। তুমি ডাইনিং এ বসো।

একটা চেয়ার টেনে গুলিস্তাকে বসিয়ে দিলেন। মেয়েটা আবার মাথায় ঘোমটা দিয়েছে। দেখতে একদম নতুন বউ লাগছে। অবশ্য নতুন বউ-ই তো। আম্বিয়া খাতুন ওর মাথার ঘোমটা নামিয়ে দিয়ে বললেন,
– ওতো ঘোমটা দিয়ে চলতে হবে না। এটা এখন থেকে তোমার নিজের বাড়ি। যেভাবে স্বস্তি পাও সেভাবে চলবে। ওতো ফর্মালিটি করে চলতে হবে না।

গুলিস্তা অভ্যাস অনুযায়ী মাথা দুলিয়ে সায় দিলো। আম্বিয়া খাতুনের ভীষণ মনে ধরেছে মেয়েটাকে। যাকে একবার মন থেকে ভালো লেগে যায়, পরবর্তীতে তার সবকিছু এমনিতেই ভালো লাগতে থাকে। এজন্যই সামনে-পিছনে কোনো কিছু বিবেচনা না করে এক দেখায় ছেলের বিয়ে দিয়ে গুলিস্তাকে নিয়ে এলেন। উনার একটা মেয়ের ভীষণ শখ ছিলো। রেহবারের পর যখন আবার সন্তানসম্ভাবা হলেন, ভীষন করে চেয়েছিলেন যেনো একটা মেয়ে হয়। কিন্তু জন্ম নিলো রাহিল। পরবর্তীতে আবার সন্তান নিতে চাইলে স্বামী সায় দেয়নি। গুলিস্তাকে পেয়ে উনার সেই শখের তরীতে হাওয়া লেগেছে। মনে হচ্ছে উনার ঘর আলো করে মেয়ে এসেছে। কিন্তু মেয়েটা সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকে। যেনো রাজ্যের উদাসীনতা তার চোখে মুখে লেপ্টে আছে। এইটুকু বয়সে প্রজাপতির মতো চঞ্চল হওয়ার কথা। আম্বিয়া খাতুন এই বয়সে এসেও মনকে প্রফুল্ল রাখতে কতো ছেলে মানুষী করেন! ছেলের এমন হুট করে বিয়ে দেওয়াটাও উনার কাছে একটা এডভেঞ্জার ছিলো। এখন উনি রান্নার ফাঁকে গুলিস্তার সাথে গল্প করছেন, গুলিস্তা শুধু আগ্রহ নিয়ে শুনে যাচ্ছে।

নাস্তার পর্ব শেষে ছুটা বুয়া এসে বাকি কাজগুলো করতে শুরু করলো। এই ফাঁকে আম্বিয়া খাতুন গুলিস্তাকে পুরো বাড়ি ঘুরিয়ে দেখালেন। বাড়িটা শহরের খুব কাছেও না, আবার খুব বেশি দূরেও নয়। এমন জায়গা দেখে বাড়ি করেছিলেন রাতুল আহসান। ঢাকা নিবাসী রাতুল, যুবক বয়সে চাকরী সুবাদে এসেছিলেন এই সিলেট শহরে। প্রকৃতিপ্রেমী মানুষটি ধুলোবাড়ির শহরে আর ফিরে যাননি। স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকলেন কয়েক বছর। তারপর ধীরে ধীরে তৈরী করলেন নিজস্ব নীড়। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে সুখেই দিন কাটিয়েছিলেন। বার্ধ্যকের কারনে একদিন সাদরে মৃত্যু গ্রহণ করে পাড়ি জমালেন পরপারে। বাড়ির শেষ সীমানায় উনাকে দাফন করা হয়েছে। স্বামীর কবরের সামনে দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণ করছিলেন আম্বিয়া খাতুন।
– আমার বড় ছেলেটাও হয়েছে বাবার মতো। বাড়ি ছেড়ে, সিলেট ছেড়ে কোথাও যাবে না। ঢাকায় নামকরা একটা কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ পেয়েও গেলো না। এখানে ছোট করে নিজের ব্যবসা শুরু করলো। আমি তো ভয়ে ছিলাম ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবে কিনা? ওর বাবার পেনশনের প্রায় পুরো টাকাই তুলে দিয়েছিলাম ওর হাতে। সেই কোম্পানি লসের মুখ দেখলে আমরা একদম পথে বসে যেতাম। কিন্তু বছর শেষ হওয়ার আগেই রেহবার ওর কোম্পানিকে মোটামুটি একটা ভালো পর্যায়ে নিয়ে গেলো। এখন আর দুশ্চিন্তা হয় না। আমি জানি ও পারবে।

তখন শহরে বাইরে জমির দাম ছিলো ভীষণ কম। রাতুল আহসান নিজের জমানো টাকা দিয়ে খুব সহজে অনেকখানি জমি কিনতে পেরেছিলেন। সেখানে ছোট করেই একটা দোতলা বাড়ি তুলে বাকি অংশে গাছপালা লাগিয়ে তৈরি করলেন বন্য আবহ। দোতলা বাড়িটিতে চারটি শোবার ঘর আছে। উপর তলায় তিনটে আর নিচতলায় একটি। আম্বিয়া খাতুন গুলিস্তাকে সবকিছু দেখালেন।
– এই কয়েকদিনে সবকিছু বুঝে নেও। আমি চলে যাওয়ার পর সবকিছু তোমাকেই সামলাতে হবে। এখানে আমাদের নিকট আত্মীয় কেউ নেই। একাই চলতে হয়।

গুলিস্তা অবাক হয়ে বললো,
– কোথায় যাবেন?

গুলিস্তা দেখতে যেমন আদুরে বাচ্চার মতো, ওর কন্ঠও তেমন আদুরে শোনালো আম্বিয়া খাতুনের কানে। সেই কন্ঠে মন খারাপের আভাস পেয়ে তিনি হালকা হেসে গুলিস্তার হাত দুটো নিজের হাতে ধরে বললেন,
– তোমাকে হয়তো কেউ জানানোর সুযোগ পায়নি। আমি আর রাহিল এই সপ্তাহেই ফ্লোরিডা যাচ্ছি। মূলত এই কারনেই রেহবারের সাথে তোমার বিয়ে এতো তড়িঘড়ি করে দেওয়া হলো। ছেলেটাকে একা রেখে যেতে মন টানছিলো না। ওদিকে আবার রাহিল আমাকে ছাড়া থাকতে পারে না। রেহবারকে বললাম আমাদের সাথে যেতে কিন্তু কোম্পানি ফেলে এভাবে হঠাৎ করে অন্য দেশে পাড়ি জমানো সহজ কথা না। তাই ওকে থেকে যেতে হলো।
– ফ্লোরিডা? সে তো অনেকদূর। ওখানে কেনো যাবেন?

গুলিস্তার কথায় আম্বিয়া বেগম হেসে ফেললেন। মেয়েটা ভীষণ সরল। মাত্র একদিনেই এতো আপন হয়ে গেলো যে এখন ওকে রেখে চলে যেতে হবে ভাবতেই আম্বিয়া খাতুনের কষ্ট হচ্ছে। তিনি ঠিক করলেন এই কয়েকদিন যতোটুকু সম্ভব গুলিস্তাকে নিজের কাছাকাছি রাখবেন। ছেলে তার বউয়ের সাথে সময় কাটানোর আরও অনেক সময় পাবেন কিন্তু তিনি তার মেয়ে স্বরূপ এই আদুরে বাচ্চাটাকে বেশিদিন কাছে রাখতে পারবেন না।
– ফ্লোরিডায় আমার বড় ভাই থাকেন। উনার ওখানকার সিটিজনশীপ আছে। ফ্লোরিডার একটি ভার্সিটিতে রাহিলের মাস্টার্স পড়ার সুযোগ হয়েছে। সেই সাথে ওর মামা যেখানে জব করে সেখানে ওর জবের বন্দোবস্তও করে ফেলেছেন। এতো বড় সুযোগ রাহিল হাতছাড়া করতে চাচ্ছে না। আবার আমাকে ছাড়া থাকাও নাকি ওর পক্ষে সম্ভব না। ছেলেটা আমার ভীষণ মা নেওটা। ছোট ছেলে তো, সারাক্ষণ নিজের সাথে রেখে ওর অভ্যাস বিগড়ে দিয়েছি। এখন এই বয়সে এসেও মা ছাড়া কিছু বুঝে না। এখন আপাতত আমরা দুজন যাচ্ছি। রেহবার এদিকটা সামলে নিক, তারপর তোমাদের দুজনকেও নিয়ে যাবো।

রেহবার-গুলিস্তার সারাদিনে খুব একটা দেখা হলো না। খাবার টেবিলে সামনাসামনি হয়েছিলো এরপর রেহবার চলে গেছে তার অফিসে। রাহিল ছুটোছুটি করছে বাইরে। আম্বিয়া খাতুন গুলিস্তাকে নিয়ে মার্কেটে গেলেন। দু হাত ভরে নিজের পছন্দ মতো শপিং করেও তিনি হাঁপিয়ে উঠছেন না। বারবার গুলিস্তাকে বলছেন আর কি নেওয়া বাকি আছে? এখুনি মনে করো। আর কিছু লাগবে না বলার পরেও তিনি নিজে খুঁজে খুঁজে কিনেই যাচ্ছেন। গুলিস্তাকে জামা কাপড় চুজ করতে বলেছিলেন কিন্তু গুলিস্তা কিছু ডিসাইড করতে পারছিলো না। আম্বিয়া খাতুন বেশ আগ্রহ নিয়ে কয়েকটা সালোয়ার কামিজ কিনলেন। লাগেজ ভরা শাড়ি আছে, তা সত্ত্বেও কিনলেন আরোও কিছু শাড়ি। গুলিস্তা একবার বারণ করতে গিয়েছিলো, আম্বিয়া খাতুন বললেন,
– ওগুলো তো বগুড়ায় কেনা শাড়ি। এখান থেকে কয়েকটা শাড়ি কিনে দেই। তবেই না শ্বশুরবাড়ির শাড়ির ফিল আসবে। তাছাড়া এখনি যা কেনার কিনে নেও। পুরুষ মানুষের উপর ভরসা করে থাকলে তোমার আর শপিং করা হবে না। একা একা কেনাকাটা করবা সেই সম্ভাবনাও শুণ্য।

কাপড় কেনা শেষে টয়লেট্রিজ, বিউটি প্রোডাক্টসসহ যাবতীয় কেনাকাটা শেষ করে সন্ধ্যা পেরিয়ে ওরা বাড়ি ফিরলো।
রেহবার ঘরে ফিরে দেখলো সোফা সেট শপিং ব্যাগে ঢেকে গেছে। মায়ের ছেলেমানুষির নমুনা দেখে খানিকটা হেসে ফ্রেশ হতে চলে গেলো। খেতে বসে মাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– শপিং করেছো দেখলাম। শপিংমলে অন্যদের জন্য কিছু রেখে এসেছো নাকি সব তুলে নিয়ে এসেছো?

ভাইয়ের কথা শুনে রাহিল ফিক করে হেসে ফেললো। আম্বিয়া বেগম দুই ছেলের দিকে কটমটে দৃষ্টি দিয়ে বললেন,
– কার্ডের ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলো বলে সব নিয়ে আসতে পারলাম না। আমার তো ইচ্ছে ছিলো সবগুলো নিয়ে আসি।
– ইশ্! আমাকে কল দিলে না কেনো, মা? আমার কার্ড নিয়ে হাজির হয়ে যেতাম। ভাই স্বল্প খরচে বিয়ে করে নিলো। এইটুকু জরিমানা তো করাই যায়।

মায়ের সাথে তাল মিলিয়ে রাহিলও দুষ্টামি করতে পিছপা হলো না।

রুমে ফিরে গিয়ে গুলিস্তা চর্তুদিকে ছড়ানো ব্যাগের মধ্যে বসে সেসব গুছানো শুরু করলো। কিন্তু সবকিছু তার কাছে এলোমেলো মনে হচ্ছে। আম্বিয়া বেগম সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ঘুমাতে গেছেন। উনাকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না। আবার ঘরে ব্যাগ ছড়িয়ে রাখলে রেহবার বিরক্ত হতে পারে। রেহবার স্টাডি রুম থেকে ফিরে এসে দেখলো একগাদা জিনিসপত্রের মাঝে খেই হারিয়ে বসে আছে গুলিস্তা। সালোয়ার কামিজ গায়ে ওকে হাইস্কুল পড়ুয়া এক কিশোরী মনে হচ্ছে। আদতে সে কিশোরী-ই বটে। আঠারো পেরিয়েছে সবে মাত্র।
সোফা থেকে কয়েকটা ব্যাগ উঠিয়ে রেহবার বসার জায়গা করে নিলো। গুলিস্তা ফ্লোরে বসে ছিলো। ওকে উঠিয়ে সোফায় বসিয়ে দিয়ে নিজেও পাশে বসে পরলো।
– মা মাঝেমধ্যে কীসব বাচ্চামী করে বসে! এতো কেনাকাটা কেউ একসাথে করে।

এই বলে রেহবার নিজেও কাপড় গুছানো শুরু করলো। তা দেখে গুলিস্তা বললো,
– আমি গুছিয়ে নিচ্ছি। আপনি রেস্ট নিন।
– একা গুছাতে গেলে রাত পেরিয়ে যাবে। বউ রেখে আমার আবার ঘুম আসবে না।

গুলিস্তাকে চোখ বড় বড় করে তাকাতে দেখে রেহবার শব্দ করে হেসে ফেললো। তা দেখে গুলিস্তা দ্রুত হাত চালিয়ে কাপড় গুছাতে শুরু করলো।

পরবর্তী কয়েকটা দিন আম্বিয়া খাতুন গুলিস্তাকে ছেলের পছন্দের সাথে পরিচয় করালেন। রেহবার কি খেতে পছন্দ করে, কেমন পোষাক পরে, কি কি পছন্দ করে, কোনগুলো অপছন্দ ইত্যাদি খুটিনাটি বিষয়গুলো জানিয়ে দিলেন। যাতে রেহবারকে বুঝতে গুলিস্তার সুবিধা হয়। এমনিতেই গুলিস্তা খুব ভালো ছাত্রী ছিলো। সে খুব দ্রুত সবকিছু আয়ত্ব করে ফেললো।

গুলিস্তার বিয়ের সপ্তম দিনে রাহিল ও আম্বিয়ার খাতুনের ফ্লাইট। সকাল বেলা সবকিছু গুছিয়ে লাগেজ রেডি করে সকলে ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরলো। আম্বিয়া খাতুন স্বামীর স্মৃতি বিজরিত বাড়িটির দিকে বারবার ফিরে তাকাচ্ছেন। এইতো সেদিন এই বাড়িতে ছোট রেহবারকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেন। ছেলেটা গুটিগুটি পায়ে হাটতে শিখলো। সিঁড়ি থেকে পরে ব্যথা পেতে পারে, তাই নিচতলার রুমে শিফট করলেন। তারপর আর উপরের রুমে ফিরে যাননি। রাহিল জন্ম নিলো। রাতুল আহসান মারা গেলেন। আম্বিয়া খাতুনের পুরো জীবনটাই যেনো এই বাড়িতে পরে আছে। তিনি যথেষ্ট শক্ত মনের মানুষ। বাস্তবিকতা মেনে নিয়ে চলতে পছন্দ করেন। কিন্তু বিদায় বেলায় স্মৃতিরা যে এত পোড়াবে এটা ভাবতেই পারেননি। এই বয়সে এসে চোখের কোণে দ্রুত জল জমে যায়। গাড়িতে বসে তিনি নীরবে জল ফেলতে লাগলেন। পেছনের সিটে গুলিস্তা বসেছিলো আম্বিয়া খাতুনের সাথে। উনাকে কাঁদতে দেখে গুলিস্তা উনার বাহুতে হাত পেচিয়ে ধরে বাহুতে মুখ গুজে দিলো। আম্বিয়া খাতুনও মেয়ে সমান গুলিস্তাকে পরম স্নেহে আগলে বসে রইলেন।
প্লেনে উঠার আগে রেহবারকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললেন,
– যাবার বেলায় এতো কষ্ট লাগবে কে জানতো? এখন সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছি বুঝলি। ওখানে গিয়েও যদি মন ভালো না হয়, বাড়ির জন্য এভাবেই মন পুড়ে তাহলে আমি এই বাদরটাকে ওখানে রেখে চলে আসবো। তুই শুধু আমাকে টিকিটের টাকা পাঠিয়ে দিবি।

রেহবার মায়ের বাচ্চামী দেখে আবার হেসে ফেললো। তারপর সম্মতি জানিয়ে মায়ের মাথায় আলতো করে চুমু খেলো। আজ থেকে মায়ের শিশুসুলভ কাজকর্মগুলো ভীষণ মিস করবে। এই প্রথম মা-ভাইকে রেখে এতোদিনের জন্য আলাদা থাকতে যাচ্ছে। কেমন কাটবে তার আসন্ন দিনগুলো?

গুলিস্তাকে জড়িয়ে ধরে আম্বিয়া বেগম হাপুশ নয়নে কাঁদতে শুরু করলেন। গুলিস্তা শুধু নির্বিকার চেয়ে রইলো। আম্বিয়া বেগম বললেন,
– তুমি আমাকে রোজ ভিডিও কল দিবে।
রাহিল ভাইকে বললো,
– এদিকে সবকিছু গুছিয়ে তুমি দ্রুত চলে এসো। তোমাকে রেখে যেতে কষ্ট হচ্ছে।

রাতের আঁধারে একটি বিমান আম্বিয়া খাতুন ও রাহিলকে নিয়ে উড়াল দিলো। রেহবারের বুকের ভেতরটা ভীষণ ফাঁকা লাগছে। মনে হচ্ছে তার হৃদপিন্ডটা কেউ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। সে হাত বাড়িয়ে গুলিস্তার হাতটি শক্ত করে ধরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।
বাড়ি ফিরে সেদিন রেহবার আর অফিস গেলো না। দিনের বাকিটা সময় বাগানে ঝুলানো বারান্দায় সে আর গুলিস্তা বসে রইলো। এক হাতে গুলিস্তার কোমড় জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে বললো,
– বাড়িটা কেমন ফাঁকা লাগছে, ফুল। রাহিল সারাক্ষণ মায়ের সাথে খুটসুটি করতো। উল্টাপাল্টা কাজ করে মাকে জ্বালাতো। সেই নিয়ে মা ওকে রাতদিন বকাবকি করতো। আর এখন দেখো বাড়িটা কেমন নিশ্চুপ।

(চলবে…)